ফন্ট সাইজ:
থিম:
অন্তঃসমর

৮ম পর্ব

লেখক: মোহনা আক্তার মাহিয়া

#অন্তঃসমর ( পর্ব—০৮ )

#লেখনীতে_মোহনা_আক্তার_মাহিয়া

.

গাছের ডালে চিকচিক করা ছোট্ট পাথরের মতো কিছু একটা নূরের চোখে পড়ল। ওসমানকে ইশারায় দেখালে সে বাঁ হাত বাড়িয়ে জিনিসটা হাতে নিল। বলাবাহুল্য ওসমান বেশ ভালোই লম্বা চওড়া। তাই সহজেই গাছের ডাল পর্যন্ত হাত চলে গিয়েছে। ওসমান নূরকে বলল,

“আপনার মোবাইলের ফ্লাস অন করুন। ”

নূর দ্রুত তার হাতের মোবাইলের লাইট অন করে ওসমানের হাতের দিকে তাক করল।‌ ওসমান হাতে থাকা জিনিসটা দেখে ভ্রু কুঁচকে বলল,

“এখানে ক্যামেরা! তাও এত ছোট হিডেন ক্যামেরা?”

নূর চিন্তিত গলায় বলল, “এখানে ক্যামেরা কেনই বা লাগাবে! আর কেই বা লাগাল বলুন তো? ”

ওসমান একটু ভেবেচিন্তে বলল, “যেই এই কাজ করুক না কেন, সে আমাদের বাড়ির উপর নজর রাখতে চাচ্ছে। কারণ এখানে থেকে সর্দার বাড়ির পুরো দৃশ্য দেখে যায়।”

ওসমানের কথা শুনে নূর এবার পুরো বাড়ির দিকে চোখ বুলায়। সত্যিই এখান থেকে সর্দার বাড়ির প্রবেশদ্বার, বারান্দা, উঠান সব দেখা যায়। সে দৃষ্টি ফিরিয়ে ওসমানের দিকে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

“আমার মনে হয় আরো সাবধান থাকা উচিত সবার। ”

ওসমান মাথা নাড়ায়। ক্যামেরাটা পকেটে রেখে নূরকে বলল,

“চিন্তা করবেন না, সব ঠিক হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ।‌”

“ইনশাআল্লাহ।”

“রাত অনেক হয়েছে, আপনি এবার নিজের ঘরে যান।”

নূর সম্মতি দিয়ে সামনে পা বাড়িয়েও থেমে গেল। ওসমান ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “কী হলো?”

“আপনি অসুস্থ? ”

ওসমানের চোখের কোণে ক্ষীণ বিস্ময় ফুটে উঠল। মেয়েটা কীভাবে বুঝল? সরাসরি উত্তর না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল ওসমান,

“কেন মনে হলো? ”

“আমি আপনাকে বাঁ হাতে কিছু করতে দেখিনি কিন্তু একটু আগেই আপনি বাঁ হাতে বন্দুক ধরেছিলেন। তাছাড়া আপনার শরীরের তাপমাত্রা অস্বাভাবিক গরম। ”

ওসমান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মৃদু হাসল। নূর তখন তার মুখ চেপে ধরেছিল বিধায় গায়ের তাপমাত্রা আঁচ করতে পেরেছিল। এছাড়াও ওসমান ডান হাতে সব কাজ করে। ওসমান চাইলেই এখন কথা ঘুরিয়ে নূরকে ভুংভাং বোঝাতে পারবে। কিন্তু সে মিথ্যা বলল না,

“আপনার বুদ্ধির তারিফ করতেই হয়, মারিয়াম! একটু অসুস্থ আমি।‌ কাউকে বলবেন না দয়া করে। ”

“কী হয়েছে আপনার? ”

“দুপুরে ডান হাতে গুলি লেগেছিল। ”

নূর হতভম্ব হয়ে গেল। লোকটার গুলি লেগেছিল? আর সারাটা দিন এতটা স্বাভাবিকভাবে কাটিয়েছে যে বুঝার উপায় ছিল না। এখনো কেমন শান্তভাবে উত্তর দিচ্ছে। নূর এক কদম এগিয়ে এসে চিন্তিত গলায় বলল,

“কি বলছেন আপনি! হাসপাতালে গিয়েছিলেন? ”

“জ্বি। ”

“রাতের মেডিসিন খেয়েছেন?”

ওসমান দুদিকে মাথা নাড়িয়ে না করল। অর্থাৎ সে খায়নি‌। মূলত ওসমানের একটুও মনে ছিল না। নূর এবার তাকে তাড়া দিয়ে বলল,

“আপনি এখনি রুমে গিয়ে আগে মেডিসিন নিবেন। আপনার গায়ে জ্বর উঠেছে।”

“আপনি যান আমি একটু পর চলে যাব।”

ওসমান খুব শান্ত সুরে কথা বলল। নূরের মনে হলো সামনে দাঁড়ানো মানবটার শরীর দুলছে। তবুও আগ বাড়িয়ে কিছু করল না। উল্টো ঘুরে নিজের রুমের দিকে চলে যায়। নূর চোখের সমানে থেকে যেতেই ওসমান ঘাসের উপর বসে পড়ল। মাথাটা ঘুরছে হঠাৎ। চোখের সামনে সব ঝাপসা হতে লাগল। মাথা দিয়ে গরম ধোঁয়া বেরোচ্ছে তার। সে কিছু সময় পেরিয়ে উঠে দাঁড়ায়। দুই কদম এগোতেই পুরো শরীর টলে উঠল। পড়ে যাওয়ার আগে কেউ একজন ওসমানের কাঁধে হাত রেখে ধরে ফেলল।‌ সে পাশ ফিরে তাকাতেই নূরের জ্বলজ্বল করা চোখদুটো আবছা দেখতে পেল। অস্পষ্ট গলায় বলল,

“মারিয়াম! আপনি রুমে যাননি? ”

“না। ঠিকমতো হাঁটতেই পারছেন না। বাড়িতে কাউকে বললে অন্তত আপনার সেবা করত, তাহলে এখন এই অবস্থা হয় না! ”

“কাউকে বলা যাবে না। আমার শত্রু কোথা ছড়িয়ে আছে আমি জানি না। নিজের দুর্বলতা প্রকাশ করতে অনিচ্ছুক।”

“কিন্তু আমি তো ধরে ফেললাম। ”

“আমি ধরা দিয়েছি বলেই ধরতে পারলেন! ”

“হয়তো! ”

বলতে বলতে ওসমানের রুমের সামনে এসে দাঁড়ায় দু'জন। ওসমানের বাহু ছেড়ে দিল নূর। সদর দরজা যেভাবে বন্ধ ছিল ওভাবেই নূর বন্ধ করে এসেছে আসার সময়। ওসমানের রুমের দরজার একটা কপাট খুলে দিয়ে নূর নিচু স্বরে বলল,

“মেডিসিন নিয়ে ঘুমাবেন। ”

“হুম। ”

ছোট একটা জবাব দিয়ে ওসমান রুমের ভেতরে চলে যায় হেলেদুলে। নূর দীর্ঘশ্বাস ফেলে নিজেও চলে যায়।

ওসমান এসে সোফায় বসে পড়ল। পাশের ছোট টেবিলের ড্রয়ারে সমস্ত ঔষধপত্রের ব্যাগটা রাখা আছে। হাত বাড়িয়ে সেগুলো নিয়ে সামনের টি-টেবিলে রাখল। পানির গ্লাস হাতে নিয়ে রাতের মেডিসিন গুলো খেয়ে নিল। পকেট থেকে ক্যামেরাটা নিয়ে ড্রয়ারে রেখে দেয়। পরে এটা খুঁটিয়ে দেখা লাগবে। গায়ের জামাটা খুলে হাতের ব্যান্ডেজের দিকে তাকায়। সাদা ব্যান্ডেজ হালকা রক্তিম। পরিবর্তন করা উচিত কিন্তু ওসমান এক হাতে পারবে না বিধায় ওভাবেই রেখে দিল। জামা পাল্টে একটা পাতলা ফতুয়া গায়ে জড়িয়ে শুয়ে পড়ল।

—

স্নিগ্ধ ভোরের সৌন্দর্য একমাত্র সে-ই উপভোগ করতে পারে, যে ফজর ওয়াক্ত জাগ্রত থাকে। প্রতিদিনের মতো আজও ওসমান ঘুম থেকে উঠে নামাজ আদায় করে। গতকাল থেকে জ্বরটা তীব্র হয়েছে। ওসমানের ফর্সা মুখখানা লাল এবং মলিনতায় ছেয়ে আছে। সে জায়নামাজ বিছিয়ে বসে রইল কিছুক্ষণ। পাশ থেকে তাসবিহ হাতে তুলে নেয়। তারপর বিড়বিড় করে সৃষ্টিকর্তার নাম জপতে থাকে‌।

প্রকৃতির কালো অন্ধকার কেটে গেলেও জীবনের কালো অধ্যায়গুলো থেকে যায়। নূর রুমের মধ্যে পায়চারি করছে অস্থির চিত্তে। গতকাল বাকি রাতটুকু সে চোখের পাতা এক করতে পারেনি। চোখ বন্ধ করলেই স্মৃতিরা মাথাচাড়া দিয়ে উঠছিল। এছাড়া গতকাল রাতের ঘটনাটা নিয়েও একটু চিন্তিত সে‌। ভাবনায় বুঁদ থাকা নূরের ধ্যান ভাঙে পাখিদের টুকটাক কিচিরমিচির শব্দে। সে কাঁচের জারে থেকে ভারী পর্দা সরিয়ে দিল। আকাশে আজ গুমোট ভাব। আজাদ কাশ্মীরের আবহাওয়া বারো মাসই শীতল থাকে। তবে শীতকালে একটু বেশিই ঠান্ডা পড়ে এখানে। কখনো কখনো তুষারপাতও হয়ে থাকে। নূর গায়ে পাতলা চাদর জড়িয়ে রুমের পেছনের দরজা দিয়ে বের হয়। বারান্দায় পা রাখতেই একটা দমকা হাওয়া বয়ে গেল। নূর একটু কেঁপে উঠল শীতলতায়। কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করতেই স্নিগ্ধ বাতাসে মনটা ফুরফুরে হয়ে উঠে।

হঠাৎ তার মনে পড়ল ওসমানের কথা। লোকটা যে অসুস্থ সেটা তার এখন মনে পড়ল। অথচ ওসমান বাড়ির কাউকে জানায়নি পর্যন্ত অসুস্থতার কথা। নূর বারান্দা দিয়ে সোজা এগিয়ে যায় ওসমানের রুমের দিকে। পাশাপাশি রুম হওয়ায় বাড়ির পেছনের দিক দিয়ে অনায়াসেই যাতায়াত করা সম্ভব। নূর ওসমানের রুমের দরজার সামনে এসেও আবার সরে গেল। এখনও পুরোপুরি সকাল হয়নি। এভাবে কারোর ঘরে যাওয়া ঠিক হবে? মানুষটিকে বিরক্ত করলে বিষয়টা দৃষ্টিকটু লাগবে না? কিংবা হুট করে যদি কেউ এসে তাকে ওসমানের ঘরে দেখে তখন হট্টগোল শুরু হবে নিশ্চিত। তবুও বিবেক বলছে যাওয়া উচিত। সে ছাড়া বাড়ির কেউই জানে না ওসমানের অবস্থা।‌ সে যেহেতু জানে তাই একটি বার অন্তত ভালোমন্দ খোঁজখবর নেওয়া উচিত। সে অতশত আর ভাবল না। অযাচিত মনে সাহস জুগিয়ে দরজায় টোকা দিল। দুইবার টোকা দিতেই কাঠ এবং কাঁচের তৈরি দরজা থেকে পর্দা সরে গেল। ওসমান পর্দা সরিয়ে সামনে তাকাতেই সাদা কাঁচের ওপাশে নূরের মিষ্টি মুখটা দেখতে পেল। ওসমান কয়েক মুহূর্ত এক পলকে তাকিয়ে থেকে দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। দ্রুত দরজা খুলে দিয়ে সে শান্ত গলায় বলল,

“আপনি এখানে? কিছু হয়েছে? ”

নূর একটু ইতস্তত করল। অপরিচিত ছেলে মানুষের সাথে কথাবার্তা বলার অভ্যাস নূরের ছিল না। যদিও ওসমান অতটাও অপরিচিত নয়, শুধু তাদের সাক্ষাৎকার হয়নি এটুকুই। এছাড়া আহানের কাছে ওসমানের কতশত গল্প শুনেছে সে! আহান তাকে এতটাই আদর স্নেহ করত যে নূর নিজের জীবন বলতে তার একমাত্র ভাইজানকেই বুঝত। কিন্তু বাস্তবতা এবং ভাগ্য খুবই নিষ্ঠুর। নূরের অস্বস্তি বুঝতে পারল ওসমান। তাই নূরকে স্বাভাবিক করতে বলল,

“আমি ঠিক আছি, আলহামদুলিল্লাহ। ক্যামেরাটা এখনও খুঁটিয়ে দেখিনি। ”

নূর চোখ তুলে তাকায়। লোকটা তার মনের প্রশ্ন পড়ে ফেলল কীভাবে? সে এবার গলা খাঁকারি দিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক করে বলল,

“গতকাল অন্ধকার ছিল তাই তেমন কিছুই পাওয়া যায়নি। কিন্তু এখন তো আলো আছে, গাছের দিকটা আরেকবার ঘুরে দেখা উচিত না? যদি কিছু পাওয়া যায়! ”

ওসমান মাথা নেড়ে নূরকে সম্মতি দিল। সে দরজা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে। তারপর বাড়ির সামনের দিকের উঠোনের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। নূর এখনও পূর্বের স্থানে ভ্রু কুঁচকে দাঁড়িয়ে আছে। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি ওসমানের হাঁটার দিকে। হেলেদুলে হাঁটছে লোকটা। নূর যা বোঝার বুঝে গেল, ওসমানের শরীর এখনও বেশ খারাপ। তার খারাপ লাগল। যতোই হোক ওসমান তার সম্মান বাঁচিয়েছে, এখনও হেফাজতে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছে। সেজন্য নূর তার প্রতি অনেক কৃতজ্ঞ। ওসমান পিছু ফিরল না একবারও। কারণ সে জানে নূর ওখানেই দাঁড়িয়ে আছে।

সেই গাছের নিচে এসে ওসমান থামে। আশেপাশে চিরুনি তল্লাশি চালিয়েও কিছু পেল না ঠিকই কিন্তু শেষ মুহূর্তে একটা পাথর চোখে পড়ে। তার কপালে গাঢ় ভাঁজ পড়তে দেখা গেল। ওসমান বাঁ হাত বাড়িয়ে ঘাসের ভেতর থেকে গোলাকৃতির নীল রঙের পাথরটি হাতের তালুতে রাখে। খুব চেনা চেনা লাগছে তার কাছে। কিন্তু কোথায় দেখেছে মনে করতে পারছে না। এরই মাঝে উপস্থিত হয় নূর।

“কিছু পেলেন?”

নূরের কণ্ঠস্বর শুনে ওসমান পিছু ফিরে। হাতের পাথরটি নূরকে দেখিয়ে বলল, “একটা পাথর পেলাম। দেখে মনে হচ্ছে কোনো আংটির মধ্যে লাগানো ছিল আর সেটি খুলে পড়ে গিয়েছে।”

ওসমানের কথা শুনে নূর তার হাতের দিকে তাকায়। মুহূর্তেই মেয়েটার চোখ-মুখের রং পাল্টে যায়। চোখের আকৃতি বড় হয়ে যায়। দু'হাতে মুখ চেপে অস্বাভাবিকভাবে শ্বাস নিতে থাকে। সেই আংটি, সেই পাথর, এতটা মিল কীভাবে থাকতে পারে? ওসমান নূরের অবস্থা দেখে উদ্বিগ্ন হয়ে উঠে। পাথরটি পকেটে রেখে নূরের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন করল,

“মারিয়াম, আপনি ঠিক আছেন?”

নূর কোনো কথা বলছে না। রীতিমত ঘামছে মেয়েটা। ওসমান আশেপাশে দৃষ্টি বুলিয়ে কাউকে পেল না। নূর কম্পিত কণ্ঠে বলল,

“প-পাথর! আংটি! ”

নূর আর এক মুহূর্তও দাঁড়ায় না।‌ ছুটে চলে যায় নিজের বরাদ্দকৃত রুমে। ব্যাপারটা কি হলো ওসমান ঠাহর করতে পারল না সাথে সাথে। নিজের অসুস্থতার কথা ভুলে সেও দ্রুত এগিয়ে যায় নূরের পিছুপিছু।

নূর নিজের রুমে না গিয়ে বারান্দায় পেতে রাখা কেদারায় বসে পড়ল।‌ দুহাতে মুখ ঢেকে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা চালিয়ে গেল। ওসমান এসে মেয়েটাকে এভাবে বসে থাকতে দেখে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এগিয়ে গিয়ে নূরের পাশের কেদারায় বসে। মধ্যকার দূরত্ব থাকলেও নূর টের পেল পাশে কেউ বসেছে। সে হাতের আঙুল চোখ থেকে সরিয়ে পাশে তাকালে ওসমানের সাথে চোখাচোখি হয়ে। ওসমান সামনে থাকা টেবিল থেকে পানি এগিয়ে দিল তার দিকে। নূর পানির গ্লাস থেকে অর্ধেক পানি খেয়ে গ্লাস রেখে দেয়। লম্বা একটা শ্বাস টেনে নিজেকে সামলে নিল। ওসমান তাকে সময় দিল স্বাভাবিক হওয়ার জন্য। নূর স্বাভাবিক হলে ওসমান মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল,

“কী হয়েছে, মারিয়াম? এত প্যানিক করলেন কেন?”

“এমনি, এমনি কিছু হয়নি আমার।”

ওসমান জানে নূরের মতো শান্তশিষ্ট মেয়ে অযথা এত অস্থির হবে না। তবুও নূর যেহেতু বলতে চাচ্ছে না তাই সে জোর করল না। ওদিকের নূরও দ্বিধাদ্বন্দ্বে এখনও ভুগছে। ওসমানকে ভরসা করা যায়, কিন্তু নূরের কাছে তার ভাইজান ব্যতীত অন্য কোনো ব্যক্তি বিশ্বস্ত হতে গেলে একটু সময় লাগবে। নূর বিনা বাক্যে নিজের রুমে চলে গেল।‌ ওসমান মেঝের দিকে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কিছুক্ষণ থম মেরে বসে থেকে বেরিয়ে গেল।

—

সময় গড়িয়ে সকাল দশটা বাজল। পাহাড়ের চূড়ার বড় ঝোপের ভেতরে ওসমান ছোটখাটো একটা দুর্গের মতো বাড়ি। ঝোপ বললে ভুল হবে, বনের চেয়ে কোনো অংশে কম নয়। ওসমান প্রায় সময়ই এখানে আসে। বলাবাহুল্য এই জায়গাটা ওসমানের গোপন আস্তানা। গুলবাহার, ফারুক সহ আরও কয়েকজন সহকর্মী ছাড়া কেউই জানে না এখানকার কথা। পাথরের তৈরি ছোট বাড়িটায় তিনটা কক্ষ। কয়েকটি দরজা জানালা আছে কিন্তু কোনো কপাট নেই। প্রথম কক্ষে একটা পাথরের উপর বসে আছে ওসমান। গতকাল মধ্যরাতে ব্যথার ঔষধগুলো খাওয়ার ফলে এই মুহূর্তে ওসমান যথেষ্ট সুস্থবোধ করছে। গুলবাহার তার হাতের ব্যান্ডেজ পরিবর্তন করে দিচ্ছে। সে টুকটাক প্রাথমিক চিকিৎসা জানত। গুলবাহার নিচু স্বরে বলল,

“আপনাকে খুব চিন্তিত লাগছে, সর্দারজি। ”

“আমার মনে হয় দুশমন আমাদের মধ্যেই আছে।”

“কিন্তু সে কে আমরা কীভাবে জানব? ”

“জানতে হবে না, বুঝতে হবে গুলবাহার। এখন থেকে কে কখন কোথায় যাচ্ছে সবার উপর নজর রাখবে। তবে সাবধান কেউ যেন কিছু বুঝতে না পারে।”

“ঠিক আছে, সর্দারজি। ”

“ফারুক? ”

ফারুক বাহিরেই ছিল, ওসমানের ডাকে দৌড়ে এসে মাথা নিচু করে বলল, “জ্বি সর্দারজি। ”

“আড়তের খবর কী? ”

“ভুট্টার চালান এসেছে। ছোট সাহেব সবটা সামলে নিচ্ছেন।”

“আয়াজ আমার ছোট ভাই। ও পড়াশোনা করা শহরের ছেলে, হুট করে ব্যবসা-বাণিজ্য বুঝবে না, তুমি ওর সাথে সাথে থেকো। কোনো গন্ডগোল যেন না হয়।”

“জ্বি আচ্ছা। ”

ফারুক চলে গেল। গুলবাহার ব্যান্ডেজ বদলে দিয়ে সরে দাঁড়ায়। ওসমান কিছু বলতে যাবে তার আগেই মোবাইল ফোন বেজে উঠল। সে পাঞ্জাবির পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখতে পেল 'মারিয়াম' নামটা। রিসিভ করে মোবাইল কানে ধরতেই নূরের শীতল কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,

“আসসালামু আলাইকুম। ”

“ওয়া আলাইকুম আসসালাম। কী হয়েছে মারিয়াম?”

“আপনি কোথায়? ”

“একটা কাজের জন্য বাড়ি থেকে দূরে আছি। কেন?”

“নাস্তা না করে কোথায় গেলেন সেটা জানার জন্যই ফোন করেছি। আম্মি আমার সামনেই আছে, কথা বলুন। ”

নূর মোবাইলটা জামিলা বানুর হাতে দেয়। ভদ্রমহিলা মোবাইল কানে ধরে প্রশ্ন করলেন,

“ওসমান, বেটা? কোথায় তুমি? ”

“আম্মাজান, আমি একটা কাজে এসেছি। আপনি চিন্তিত হবেন না, আমি খুব দ্রুত ফিরে আসব। ”

“কিছু তো খাওনি। ”

“খেয়ে নিব। আপনি নিজের খেয়াল রাখবেন। ”

“ঠিক আছে বেটা। সাবধানে থেকো। আল্লাহ হাফেজ।”

“আল্লাহ হাফেজ, আম্মাজান। ”

জামিলা বানু ফোন কেটে নূরের মোবাইল ফিরিয়ে দিলেন। নূর মৃদু স্বরে বলল,

“আপনি বিশ্রাম নিন, আম্মি। আমি এখন আসি। ”

জামিলা বানু মেয়েটার মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিলেন। নূর মুচকি হেসে চলে গেল জামিলা বানুর রুম থেকে।

নিজের রুমে যাওয়ার জন্য ওসমানের রুমের দরজার মুখোমুখি হতে হয় নূরকে। সে দরজার পাশ কাটিয়ে চলেই যাচ্ছিল, কিন্তু হঠাৎ কিছু একটা চোখে পড়তেই থেমে যায়। ঘাড় ঘুরিয়ে ওসমানের রুমের দরজার দিকে তাকায়। দরজা ভিড়িয়ে রাখা ঠিকই কিন্তু ভেতর থেকে গুনগুন শব্দ ভেসে আসছে। ওসমান তো বাড়িতে নেই, তাহলে ভেতরে কে? অযাচিত মনে সন্দেহ নিয়ে দরজা হালকা খুলে রুমের ভেতরে দৃষ্টিপাত করে নূর। ভেতরের দৃশ্য দেখে চোখেমুখে বিস্ময় প্রকাশ পেল।

ওসমানের একটা কালো পাঞ্জাবি বুকে জড়িয়ে বিছানায় বসে আছে মালা। চোখদুটো তার বন্ধ, ঠোঁটের কোণে লাজুক হাসি। নূর এক মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে যায়।‌ সে ঠিক দেখছে নাকি চোখের ভুল? তবে মালার বেহায়াপনা দেখে নূরের রাগ হলো। সে শব্দ করে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে। হঠাৎ শব্দে মালা চমকে উঠল। হাত থেকে পড়ে গেল ওসমানের নতুন পাঞ্জাবিটা। মালার চোখের আকৃতি বড় হয়ে যায়, ভয়ে ঘামতে শুরু করে। নূর মৃদু পায়ে এগিয়ে এসে তার সামনে দাঁড়ায়। ঘাড় কাত করে মালাকে পরখ করে বাঁকা হেসে বলল,

“ভয় পেলে বুঝি? তা এমন কাজ করো কেন, যার জন্য ভয় পেতে হয়?”

মালার বয়সটা ঊনিশ কিংবা বিশের কাছাকাছি। সেই তুলনায় নূর মালার চেয়ে পাঁচ বছরের বড়।‌ মালা ঘনঘন চোখের পলক ফেলে। আমতা আমতা করে বলল,

“ক-কী বলছেন আপনি? আমি, আমি কেন ভয় পাব?”

“ভয় না পেলে ঘামছো কেন?”

“গরম লাগছে তাই।”

“এটা শীতকাল। আর তুমি হয়তো ভুলে গিয়েছো আজাদ কাশ্মীরে গ্রীষ্মকালেও এতটা গরম লাগে না যতটা তুমি ঘেমে যাচ্ছ। সর্দারের পাঞ্জাবি নিয়ে কী করছিলে? ”

মালা চোরা দৃষ্টিতে তাকায় মেঝেতে পড়ে থাকা পাঞ্জাবির দিকে। তাকে কোনো কথা বলতে না দেখে নূর হঠাৎ ধমকে উঠল,

“কী হলো? উত্তর দাও। কী করছিলে তুমি?”

মালা খানিকটা কেঁপে উঠল। চোখ বন্ধ করে নিজেকে ধাতস্থ করে বলল, “আপনি মেহমান হয়ে আমার সাথে এমন ব্যবহার করতে পারেন না। ”

নূর শব্দ করে হেসে উঠল।‌ এবার আর মালা ঘাবড়ে গেল না তেমন। সে মনে মনে নিজেকে যথেষ্ট শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। নূর হাসি থামিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,

“তুমি বড়োই নাদান মেয়ে। তোমার বেহায়াপনা যে আমার চোখ ধুলো দিয়ে পারল না! ”

মালা এবার দৃঢ় গলায় বলল, “আপনি মিথ্যা বলছেন। কী প্রমাণ আছে আপনার কাছে?”

নূর এবার মুচকি হেসে বলল, “প্রমাণ ছাড়াও আমি অনেক কিছু করতে পারি। দেখতে চাও তুমি?”

নূরের আত্মবিশ্বাসের কাছে মালা এবার চুপসে গেল।‌ সে পাঞ্জাবিটা নিচ থেকে তুলে যথাস্থানে রেখে দিল।‌ তারপর চলে যেতে যেতে ব্যস্ত গলায় বলল,

“সর্দারজির পাঞ্জাবি আয়রন করে রাখতে এসেছিলাম। আমার অনেক কাজ আছে। আপনার মতো বেকার নই আমি। ”

মালার কথাটা নূরের আত্মসম্মানে লাগল। সে দাঁতে দাঁত চেপে রাখে। মালা যে মিথ্যা কথা বলেছে তা নূর নিজের চোখেই দেখেছে। তবুও সে আপাতত থেমে গেল। কিন্তু মালার বলা এই বাঁকা কথার শোধ সে সময় মতো নিবে।

_________________

চলবে...!

পড়াশোনা বাদ দিয়ে আপনাদের জন্য গল্প লিখি, তারপরও গল্প পড়ে রেসপন্স করবেন না? 🥹 দুক্কু পেলুম বাপু! কেমন হয়েছে পর্বটা জানাবেন।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন