#অন্তঃসমর ( পর্ব—০৯ )
#লেখনীতে_মোহনা_আক্তার_মাহিয়া
.
দুপুরের শেষ ভাগে ওসমান আড়তে যায়। বস্তা ভর্তি ভুট্টা ট্রাক থেকে নামিয়ে আড়তের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। বাইরে দাঁড়িয়ে সবকিছু তদারকি করছে আয়াজ। ওসমানকে দেখে সে এগিয়ে আসে। মৃদু হেসে সালাম দিল,
“আসসালামু আলাইকুম, মেজো ভাইজান।”
“ওয়া আলাইকুম আসসালাম। সব ঠিকঠাক হচ্ছে তো আয়াজ? কোনো সমস্যা হচ্ছে না তো? ”
“না, মেজো ভাইজান। এখনও সব ঠিকঠাক। দেড়শ বস্তা ভুট্টা আজকে এসেছে, আর আগামীকাল আসবে আরও পঞ্চাশ বস্তা। মুজাফফরাবাদ থেকে এবার বেশি অর্ডার এসেছে।”
“আলহামদুলিল্লাহ। ইসলামাবাদেও কিন্তু পাঠাতে হবে। ব্যবসায়ীরা আজ-কালকের মধ্যেই যোগাযোগ করবেন। আমি সবাইকে জানিয়েছি তোমার সাথে যেন ভুট্টার বিষয়ে আলোচনা করেন।”
“শুকরিয়া। আমি ভাবতেও পারিনি যে, আমি আড়তে বসব— এই বিষয়ে আপনি আমার এক কথায় রাজি হবেন।”
ওসমান ছোট ভাইয়ের কাঁধ চাপড়ে মৃদু স্বরে বলল, “তুই আমার ছোট ভাই, আয়াজ। কোলেপিঠে করে বড় করেছি। শহরে তোর আমি ছাড়া কে ছিল বল তো? এখন যদি আমার ভাই আমার কাছে কিছু চাইলে আমি কি না দিয়ে পারি? তাছাড়া এই ব্যবসা তোরই। আমরা ভাইয়েরা ভাইয়েরা মিলেমিশে থাকলে কোনো শত্রুই আমাদের নাগাল পাবে না। দোয়া করি আয়াজ, একদিন অনেক বড় হবি। ”
আয়াজ কেমন করে যেন তাকাল তার মেজো ভাইজানের দিকে। দৃষ্টিতে কি ছিল কে জানে! তবে তার দৃষ্টি যে ঝাপসা হয়েছে তা ওসমান স্পষ্ট দেখতে পেয়েও কিছু বলল না। বরং মুচকি একটা হাসি দিয়ে চলে গেল।
—
মাগরিবের নামাজ আদায় করে নূর রুম থেকে বেরোয়। করিডোরে মুখোমুখি হয় ওসমান। সে মাত্রই বাড়ি ফিরেছে। নূরকে এক পলক দেখে থেমে গেল। নূর তার থেকে দূরত্ব রেখে দাঁড়িয়ে মৃদু স্বরে বলল,
“শরীর এখন কেমন?”
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো, আপনি ভালো আছেন?”
“আলহামদুলিল্লাহ। ক্যামেরাটা থেকে কিছু জানতে পেরেছেন?”
“না। ক্যামেরাটা বন্ধ ছিল। হয়তোবা যে ক্যামেরা রেখেছিল সে চালু করতে ভুলে গিয়েছে! ”
“ওহ আচ্ছা। আপনি বোধহয় ঘরে যাচ্ছিলেন।”
কথাটা বলতে বলতে নূর এক পাশ হয়ে দাঁড়িয়ে ওসমানকে যাওয়ার রাস্তা করে দিল। বলাবাহুল্য এই করিডোরের মতো জায়গাটা বেশ চওড়া। ওসমান মাথা নাড়িয়ে নূরকে পাশ কাটিয়ে যেতে নিলে নূর হঠাৎ পিছু ডাকল,
“একটা কথা ছিল।”
ওসমানের পা থেমে গেল। পিছু না ফিরেই প্রশ্ন করল, “জ্বি, বলুন?”
“আপনার কালো পাঞ্জাবি কাউকে আয়রন করতে বলেছিলেন?”
ওসমানের কপালে ভাঁজ পড়ল। সে পিছু ফিরে তাকায় নূরের দিকে। কৌতূহলী হয়ে বলল, “কোথায়, না তো! কাউকে বলিনি। কেন কোনো সমস্যা?”
“না, এমনিই। আচ্ছা আপনি যান, ফ্রেশ হয়ে নিন। আমি আরাবিয়া ভাবীজানের কাছে যাচ্ছি।”
নূর চলে গেলেও ওসমান পূর্বের স্থানেই কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইল। নূর হঠাৎ এমন প্রশ্ন করল কেন? ভাবতে ভাবতে সেও নিজের রুমে চলে যায়।
নূর দাঁতে দাঁত চেপে রান্নাঘরের দিকে তাকাল। সে ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে মালাকে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে। মেয়েটা কতটা মিথ্যুক তা নূর আজ প্রমাণ পেয়ে গেল। ওদিকের নূরের দৃষ্টি খেয়াল করতেই মালা সেখান থেকে সরে যায়।
নূরের ধ্যান ভাঙল আরাবিয়ার ডাকে,
“কোথায় হারালে, মারিয়াম?”
নূর দৃষ্টি সরিয়ে আরাবিয়ার দিকে তাকায়। মৃদু হেসে বলল, “কোথাও না, ভাবীজান।”
“তোমার চা ঠান্ডা হয়ে গেল যে! দাঁড়াও আমি মালাকে ডাকছি। মালা? কোথায় তুমি?”
আরাবিয়া ডাকতে দেরি হলেও মালার ছুটে আসতে সময় লাগল না। অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নূরের সামনে তাকে বারবার আসতে হচ্ছে। মাথাটা নিচু করে বলল,
“জ্বি ভাবীজান?”
“মারিয়ামের চা ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। নতুন করে চা দিয়ে যাও তাকে। ”
মালা মাথা নাড়িয়ে চায়ের কাপ নিয়ে চলে গেল। এতটা তাড়াহুড়ো করল যেন এখান থেকে পালাতে পারলেই বাঁচে! এমন দৃশ্য দেখে নূর মুচকি হাসল।
—
আজাদ কাশ্মীরে নূরের আজ পনেরোতম দিন। এই কয়েক দিনে সে নিজেকে একেবারে মানিয়ে নিয়েছে শাহ পরিবারের সবার সাথে। তবে যে যেমন নূর তার সাথে ঠিক তেমনি। সকালের নাস্তা আজ বাগানে হচ্ছে। স্নিগ্ধ সকালের মনোমুগ্ধকর বাতাস মন ছুঁয়ে যাওয়ার মতো। নীলম নদীর স্বচ্ছ পানির সাথে ভেসে যাচ্ছে কুয়াশার ভেলা। বাগানে থাকা কেদারায় বসে আছে পুরো সর্দার বাড়ি। জামিলা বানুর এক পাশে নূর, অন্যপাশে আরাবিয়া। ওসমান নূরের বরাবর কেদারায় বসে চা খাচ্ছে। ওসমানের পাশেই ওমর এবং আয়াজ। ওমর মায়ের সাথে টুকটাক কথা বলছে। আয়াজ চা শেষ করে কথা শুরু করে। তার কথা বলা মানে আড্ডা জমজমাট। এরই মাঝে ওসমানের মোবাইল বেজে উঠে। সে চায়ের কাপ রেখে মোবাইল নিয়ে একটু দূরে চলে যায়। কল রিসিভ করে কানে ধরতেই ওপাশ থেকে গুলবাহারের নীচু কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“সালাম সর্দারজি। ”
“ওয়া আলাইকুম আসসালাম। কী হয়েছে, গুলবাহার?”
“আপনি কী আজই যাবেন?”
“হুম, একটু এখনি রওনা দিব। সবাই রেডি আছো?”
“জ্বি সর্দারজি। আপনি এলেই আমরা বেরোব।”
“ঠিক আছে, আমি আসছি।”
ওসমান ফোন কেটে নিয়ে সবার মাঝে এসে বসল। জামিলা বানু ছেলের উদ্দেশ্যে মৃদু স্বরে বললেন,
“কোনো সমস্যা, ওসমান?”
“না, আম্মাজান। আমি একটু বের হচ্ছি। চিন্তা করবেন না।”
ওসমানের কথায় ওমর আর আয়াজ চোখাচোখি করল। সেটা আবার নূরের চোখে ধরা পড়লে সে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাকিয়ে থাকে এক মুহূর্ত। জামিলা বানু বললেন,
“সাবধানে যেয়ো, বেটা।”
ওমর গম্ভীর গলায় প্রশ্ন করল, “কোথায় যাচ্ছ ওসমান?”
“আমার একটা জরুরী কাজ আছে।”
ওসমানের উত্তরটা ওমরের পছন্দ হলো না তা মুখ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। আয়াজ এক্ষেত্রে চুপ করে আছে। ওসমান মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়। যাওয়ার সময় এক পলক চোখাচোখি হলো নূরের সাথে।
—
কুট্টন গ্রামটি ছোট হলেও এখানে বেশ কিছু পরিবারের বসবাস। তাদেরই মধ্যে আগারবুল শাহের পরিবার অন্যতম। মুসাফির গিয়েছে লাহোর। কারণ, লাহোরে অবস্থিত আল্লামা ইকবাল মেডিকেল কলেজের এমবিবিএস প্রথম বর্ষের ছাত্রী ইয়ানা শাহ—আগারবুল শাহের কনিষ্ঠ মেয়ে।
আবহাওয়া পরিবর্তনের কারণে ইয়ানা একটু অসুস্থ হয়ে পড়েছে। তাই কলেজের প্রিন্সিপালের কাছে আবেদনপত্র দিয়ে এক সপ্তাহের ছুটি চেয়েছিল। ইয়ানার শারীরিক অবস্থা বিবেচনা করে তিনি ছুটি মঞ্জুর করেছেন। বলাবাহুল্য, বেশ অনেকটা দিন হয়ে গেছে ইয়ানা বাড়িমুখো হয়নি। পড়াশোনার চাপও একটু বেশিই। আপাতত কলেজে আর কোনো পরীক্ষা নেই, তাই ইয়ানা বাড়ি ফিরবে। নয়তো তাও আসত না। মেয়েটার একমাত্র স্বপ্ন—ডাক্তার হওয়া।আগারবুল শাহর অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও মেয়ের ইচ্ছাকে প্রাধান্য দিয়েছেন।
মুসাফির বোনকে নিয়ে বাড়ি ফিরতে প্রায় দুপুর হয়ে গেল।
দিলারা বানু মেয়ের পছন্দের সব খাবার রান্না করেছেন। বাইরে গাড়ির শব্দ কর্ণকুহরে পৌঁছাতেই সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। ইয়ানা গাড়ি থেকে নেমে প্রথমেই জড়িয়ে ধরে তার প্রিয় বাবাকে। তারপর মা, ভাই সবাইকে জড়িয়ে ধরে। আগারবুল শাহ মেয়ের মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে শীতল গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“আম্মাজান, আপনি কেমন আছেন?”
সবার সামনে নিজেকে পরিণত প্রমাণ করা মেয়েটা এবার আসল রূপে ফিরে এলো। ঠিক যেমন ছোট্টবেলার আহ্লাদী বাবার আদরের মেয়েটা! ইয়ানা মিষ্টি করে হেসে বলল,
“এতক্ষণ ভালো ছিলাম না। কিন্তু এখন অনেক ভালো আছি, আব্বাজান। আপনাদের সবাইকে দেখে অনেক ভালো লাগছে আমার।”
“সব কথা বাইরে দাঁড়িয়েই বলবে নাকি ভেতরে যাবে?”
মায়ের কথায় সম্মতি দিল দানিশ। সে বোনকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে চলে যায়। মুসাফির গাড়ির ডিকি থেকে ইয়ানার ব্যাগপত্র নামিয়ে নিয়ে একটু পর ভেতরে প্রবেশ করে। ড্রয়িংরুমের প্রাণটা যেন বহুদিন পর ফিরে এসেছে। ইয়ানার খিলখিল হাসির শব্দে পুরো ঘর মুখরিত। দিলারা বানু মেয়ের জন্য শরবত নিয়ে এলেন। ইয়ানা আগে হাতমুখ ধুয়ে এলো। গায়ের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের তুলনায় একটু বেশি। দানিশ ততক্ষণে ডাক্তার নিয়ে আসার ব্যবস্থা করে ফেলেছে। হয়তোবা আরেকটু পর চলেও আসবে। অনেকটা পথ অতিক্রম করে আসায় একটু ক্লান্ত লাগছে ইয়ানার। তাই সে নিজের রুমে চলে গেল। মেয়ের যাওয়ার পানে দিলারা বানু কেমন করে যেন তাকিয়ে রইলেন। যেই চোখের ভাষা তিনি ছাড়া কেউ পড়তে পারে না।
ইয়ানা আসবে বলে দিলারা বানু নিজ হাতে মেয়ের রুমটা পরিপাটি করে গুছিয়েছেন। রুমের পরিবেশ দেখে ইয়ানার মনটা আরো ভালো হয়ে গেল। সে এগিয়ে যায় রুমের এক কোণায় থাকা ড্রেসিং টেবিলের দিকে। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে মুচকি হাসে ইয়ানা। আগের সেই গুলুমুলু মোটাসোটা ইয়ানা নেই, চোখদুটোয় অসম্ভব মায়া তার, ফর্সা গোলগাল মুখখানা হুবুহু দিলারা বানুর মতো। তবে তার কপালের ডান পাশের ভ্রুর উপরে একটা কাটা দাগ। যেটা সে ছোটবেলায় পড়ে গিয়ে ব্যথা পেয়েছিল। তিনটে সেলাই দিয়েছিল হাসপাতালে নেওয়ার পর। আগারবুল শাহর সে-কি কান্না!
পুরোনো স্মৃতি মনে করে ইয়ানা মলিন হাসল। মাঝেমধ্যে তার ইচ্ছে করে সেই ছোট্ট ইয়ানা হয়ে যেতে। পরিবার ছেড়ে এতদূর হোস্টেলে থাকতে তার ভালো লাগে না। কিন্তু তার স্বপ্ন পূরণ করতে হলে এটুকু মানিয়ে নিতেই হবে।
—
মধ্যরাতের নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে সর্দার বাড়িতে। আবছা অন্ধকারে বাগানে পায়চারি করছে নূর। গায়ে কালো শালের আড়ালে ঢেকে আছে তার দেহখানি। তার অস্থির লাগছিল সন্ধ্যা থেকেই। শত চেষ্টা করেও ঘুম আসছিল না বিধায় বাইরে এসেছে। প্রকৃতির মাঝে একাকিত্ব ভাগাভাগি করলে নিজেকে হালকা লাগে। নূর হাঁটতে হাঁটতে চলে এলো ওমরের রুমের পেছনের দিকে। নূর হাঁটার মাঝে থমকে দাঁড়ায় কারোর মৃদু চিৎকার শুনে। সে আশেপাশে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেল না। নিজের ভ্রম ভেবে সে আবারও চলে যাওয়ার জন্য পা বাড়াতেই এবার ভেসে এলো আরাবিয়ার কান্না মিশ্রিত আরেকটি চাপা চিৎকার,
“ভুল হয়ে গেছে আমার। আর মে'রো না। দোহাই লাগে ছেড়ে দাও। আর কখনো তোমাকে প্রশ্ন করব না।”
নূর আবারও থেমে গেল। এবার স্পষ্ট শুনতে পেয়েছে ওমরের রুম থেকে আরাবিয়ার কণ্ঠস্বর। কারোর ঘরে আড়ি পাতা অনুচিত একা নূর জানে। কিন্তু এই মুহূর্তে নিজের অযাচিত মনকে মানাতে পারছে না সে। বারবার মনে হচ্ছে ভেতরে কোনো অন্যায় হচ্ছে। নয়তো আরাবিয়া এভাবে চিৎকার করল কেন? নূর শব্দহীন পায়ে এগিয়ে গিয়ে বারান্দায় উঠল। তারপর ওমরের রুমের জানালার আড়ালে দাঁড়িয়ে চোরা দৃষ্টিতে ভেতরে তাকায়। পর্দার ফাঁকফোকর দিয়ে যেই দৃশ্যটা নূর দেখল, তা দেখার জন্য মোটেও প্রস্তুত ছিল না।
আরাবিয়ার ডান হাত গুড়িয়ে পিঠে চে*পে ধরে রেখেছে ওমর। অন্যহাতে আরাবিয়ার মুখ চে*পে ধরেছে যেন শব্দ করতে না পারে। ওমরের রাগান্বিত কণ্ঠস্বর শুনতে পেল নূর,
“তোকে বলেছি না, আমার বিষয়ে কথা বলবি না? ভালো আচরণ করি হজম হয় না, না? আমি কখন কি করব তোকে কৈফিয়ত দিব না। আর কখনও কোনো প্রশ্ন করবি না।”
এই বলে আরাবিয়াকে ধাক্কা দিয়ে মেঝেতে ফেলে দিল ওমর। তারপর গটগট পায়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায়। খাটের কোণায় ঠোঁট কেটে গেল আরাবিয়ার। মুখে হাত দিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। নূর এমন দৃশ্য দেখে হতবাক হয়ে গেল। এত লক্ষী একটা বউয়ের সাথে কেউ এমন আচরণ করতে পারে? রাগে গা জ্বলে উঠল তার। সবার সামনে যেই রূপ দেখায় সেটা ওমরের আসল রূপ নয়, এটা নূরের কাছে আজ প্রমাণিত হয়ে গেল। চাইলেও গিয়ে আরাবিয়াকে ধরতে পারল না সে। বিষয়টা দৃষ্টিকটু লাগবে। তাছাড়া এই মুহূর্তে নূর সামনে গেলে আরাবিয়া লজ্জায় পড়বে, যা সে চাচ্ছে না। পরে না হয় এবিষয়ে কথা বলা যাবে! নূর আর বাইরে থাকল না। সোজা চলে গেল নিজের রুমে। এদিকে ওসমানও বাড়ি ফিরে নি। জামিলা বানুকে জানিয়েছিল ফোন করে, একদিন পর সে ফিরবে। ওসমান কোথায় গিয়েছে বাড়ির কারোর জানা নেই। নূর একবার ভাবল ওসমানকে ফোন করে বিষয়টি জানাবে। আবার ভাবল না হুট করে সবটা না জেনে এভাবে ঘটনাটা কাউকে বলা ঠিক হবে না। নূরের আগে জানতে হবে আসল ঘটনা কি!
—
সকাল সকাল ইয়ানার ঘুম ভেঙে গেল। সে তড়িঘড়ি করে তৈরি হয়ে ড্রয়িং রুমে উপস্থিত হয়। সোফায় বসে থাকা আগারবুল শাহ মেয়েকে দেখে এক গাল হেসে কাছে ডাকলেন,
“মাশাআল্লাহ। আসেন, আম্মাজান। এখানে বসেন। কোথায় যাচ্ছেন শুনি? ”
ইয়ানা মুচকি হেসে বাবার পাশে বসে। মৃদু স্বরে বলল,
“বড় আম্মাজানের সাথে দেখা করতে যাব। ছোট ভাইজানকে বলুন না আমায় পৌঁছে দিতে! ”
বড় আম্মাজান বলতে ইয়ানা জামিলা বানুকে বুঝিয়েছে। ছোট থেকে এই নামে সম্বোধন করে আসছে সে। আগারবুল শাহর সর্দার বাড়ির সাথে শত্রুতা থাকলেও ইয়ানা ছোট থেকেই ও বাড়ির ভক্ত। সর্দার বাড়ির সাথে ইয়ানার উঠাবসায় কেউ বাঁধা দিতে পারেনি। সর্দার বাড়িতে তাকে যেতে না দিলে কান্নাকাটি করে বাড়ি মাথায় তুলে ফেলত। তখন আগারবুল শাহ মেয়েকে শান্ত করতে রাজী হতেন। বলাবাহুল্য শাহ বংশের একমাত্র মেয়ে ইয়ানা শাহ। বংশে যতটা সন্তান হয়েছে, সব পুত্র ছিল। কখনো কন্যা হয়নি। এই প্রথম দিলারা বানুর ঘরে কন্যা সন্তান হয়। তাই সর্দার বাড়িতে ইয়ানার আদর যত্নের কমতি থাকেনি কখনোই। এমনকি আগারবুল শাহ নিজেও জানেন তার মেয়েকে ওই বাড়িতে সবাই কতটা ভালোবাসে। যদিও দানিশ পছন্দ করে না ইয়ানার সর্দার বাড়িতে যাতায়াত করাটা। তবুও বোন কষ্ট পাবে বলে কিছু বলেও না। বাড়িতে থাকেই বা ক'দিন!
প্রতিবারের মতো এবারও মুসাফির ইয়ানাকে নিয়ে গেল কুন্দন শাহী গ্রামে। সর্দার বাড়ির মূল প্রবেশদ্বারের সামনে মুসাফির গাড়ি থামায়। ইয়ানা গাড়ি থেকে নেমে ভাইকে সাথে যেতে বলে। কিন্তু মুসাফির বরাবরের মতো এবারও কাজের তাড়া দেখিয়ে সর্দার বাড়ির সীমানার বাইরে থেকেই চলে গেল। ইয়ানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বাড়ির সীমানা প্রবেশ করল।
নাস্তা শেষ করে উঠোনে হাঁটাহাঁটি করছেন জামিলা বানু। পাশে নূরও আছে। দু'জন টুকটাক কথা বলছে আর হাঁটছে। এমন সময় তাদের পেছন থেকে একটা মিষ্টি কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“আসসালামু আলাইকুম, বড় আম্মাজান।”
চেনা পরিচিত কণ্ঠস্বর কানে যেতেই জামিলা বানু মুচকি হাসলেন। তিনি পেছন ফিরে তাকালেন। নূরও পেছনে ফিরে তাকালে ভ্রু বেঁকে উঠে। এই মেয়েটি কে? নূর তো এতদিন ধরে আছে একদিনও দেখেনি। ইয়ানা এগিয়ে এসে জামিলা বানুকে জড়িয়ে ধরে। ভদ্রমহিলা মেয়ের মাথায় ঠোঁট ছুঁয়ে দিলেন। ইয়ানা সোজা হয়ে দাঁড়ালে জামিলা বানু তার মাথায় হাত বুলিয়ে মৃদু স্বরে বললেন,
“ওয়া আলাইকুম আসসালাম। কেমন আছো, বেটি?”
“আলহামদুলিল্লাহ। আপনি কেমন আছেন?”
“আলহামদুলিল্লাহ। এতদিন পর আমার কথা মনে পড়ল?”
“আহা বড় আম্মাজান! রাগ করছেন কেন? পড়াশোনার অনেক চাপ। কিছুতেই ছুটি মিলে না। এবার তো একটু অসুস্থ দেখে ছুটি পেলাম।”
“কেমন শুকিয়ে গিয়েছে মেয়েটা। ঠিকমতো খাওয়া-দাওয়া করো না?”
ইয়ানা দীর্ঘশ্বাস ফেলে কিছু বলতে যাবে তখনই চোখ পড়ে নূরের দিকে। নূর কপাল কুঁচকে তাদের দিকেই তাকিয়ে আছে। ইয়ানা নূরের দিকে দৃষ্টি স্থির রেখেই জামিলা বানুকে প্রশ্ন করল,
“বড় আম্মাজান, উনি কে?”
জামিলা বানু নূরের দিকে তাকালেন। এগিয়ে গিয়ে এক হাত নূরের মাথায় রেখে মৃদু হেসে বললেন,
“তোমার মতো আমার আরেকটা মেয়ে। ইয়ানা, ওর নাম মারিয়াম। আর মারিয়াম, ইয়ানা আমার আরেকটি মেয়ে। আমাদের বংশের একমাত্র মেয়ে, যাকে আমরা খুব ভাগ্য করে পেয়েছি।"
ইয়ানা লাজুক হাসল। নূর যদিও সম্পর্কটা ঠিকঠাক বুঝল না, তবে জামিলা বানু নিজের মেয়ে হিসেবে অপরিচিত মেয়েটির সামনে পরিচয় করিয়ে দেওয়ায় নূরের ভেতরটা প্রশান্তিতে ভরে গেল। ইয়ানা খুবই মিশুক প্রকৃতির মেয়ে। নূরের সাথে প্রথম কথা সে-ই আগে বলল,
“আসসালামু আলাইকুম, আপু। কেমন আছেন আপনি?”
নূর দেখল মেয়েটা তার থেকে বয়সে একটু ছোট। ইয়ানার এমন আন্তরিকতা দেখে নূরের ভালো লাগল। বিশেষ করে সম্মান দিয়ে 'আপু' সম্বোধন করায়। তাই সেও মৃদু হেসে জবাব দিল,
“ওয়া আলাইকুম আসসালাম। আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তুমি কেমন আছো?”
“জ্বি আলহামদুলিল্লাহ। আমার নাম ইয়ানা শাহ। লাহোরে থেকে পড়াশোনা করি। এবার এমবিবিএস প্রথম বর্ষে। আপনি নিশ্চয়ই পড়াশোনা করেন?”
“আপাতত করছি না। তোমার ভবিষ্যতের জন্য দোয়া ও শুভকামনা রইল। ”
“শুকরিয়া। ”
“এখানে দাঁড়িয়ে সব গল্প করবে? চলো, সবাই ভেতরে চলো।”
জামিলা বানু নূর আর ইয়ানাকে নিয়ে বাড়ির ভেতরে চলে গেলেন। কে বলবে, একজন সর্দারের স্ত্রী, একজন সর্দারের মা হয়েও এতটা আন্তরিক এবং সহজ সরলভাবে চলাফেরা করেন তিনি!
______________
চলবে...!
গল্পটা দেরি করে দেওয়ার জন্য দুঃখিত! তবে এখন থেকে একটু দেরিতে গল্প আসবে, কারণ আমার এক্সাম শুরু হয়ে যাবে। যারা গল্প পড়েন, রেসপন্স করুন।