#এক_তোমাতে_আসক্ত
#সুমাইয়া_শিমু
#পর্ব_৬
________________________
- শ্রেয়া, আমাকে একটা হেল্প করতে পারবি?
হাত কচলাতে কচলাতে আমতা আমতা করে বলল শ্রেয়ান। শ্রেয়সী ভ্রু কুচকে সেদিকে তাকিয়ে রইল।
- আরে ভাইয়া আমার সাথে কথা বলতে এত লজ্জা বোধ করছো কেন? আর এত ফরমালিটির কি আছে? তোমারই বোন আমি। কি বলবে ঝটপট বলে ফেলো।
শ্রেয়ান চারদিকে ভালো করে লক্ষ্য করে দরজা আটকে শ্রেয়সীকে তার পাশে বসিয়ে ধীরে ধীরে বলল, শ্রেয়া আমি একটা মেয়েকে ভীষণ ভালবাসি। কিন্তু আজ পর্যন্ত ওকে বলতে পারিনি। কয়েকদিন পরেই মেয়েটির বিয়ে ঠিক হয়ে যাবে। তখন ওকে একেবারে জন্য হারিয়ে ফেলবো। এখন একমাত্র তুই আমাকে সাহায্য করতে পারবি বোন। প্লিজ আমাকে হেল্প কর।
শ্রেয়সী মনোযোগ সহকারে শ্রেয়ানের কথাগুলো শুনছিল। তার ভাই অনেকদিন আগেই আর্মিতে জয়েন করেছে। খুব দ্রুতই পদোন্নতি হলে আর্মি অফিসার হয়ে যাবে। তাদের ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ডও বেশ ভালো। তাহলে শ্রেয়ান নিজের মুখে বলতে এত সংকোচবোধ কেন করছে সেটাই শ্রেয়সী বুঝতে পারছে না।
- ভাইয়া তুমি তো নিজেই বাবার সাথে কথা বলে মেয়েটার বাসায় বিয়ের প্রস্তাব পাঠাতে পারো। তাছাড়া তুমি দেখতে শুনতে ভালো, ভালো চাকরি আছে, তাদের তো মেয়ে দিতে কোন সমস্যা নেই।
শ্রেয়ান কিছুটা অসহায় ভাবে বলল, তুই তো জানিস শ্রেয়া এসব বিষয়ে আমি খুব নার্ভাস হয়ে পড়ি। কখনোই প্রেম করিনি তাই প্রেমের অভিজ্ঞতাও নেই। মেয়েটার বাড়িতে বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেও তাকে তো কনভিন্স করতে হবে। সে যদি আমাকে পছন্দ না করে তাহলে তো আর বিয়ে হবে না।
- এবার বুঝতে পেরেছি। তোমার সমস্যা মেয়ের ফ্যামিলিকে নিয়ে নয় মেয়েকে নিয়ে। টেনশন করো না, আমি তোমার পছন্দের মেয়েটিকে তোমার সাথে মিলিয়ে দিবো।
- সত্যি শ্রেয়া?
শ্রেয়ান উত্তেজিত হয়ে বলল।
শ্রেয়সী মুচকি হেসে বলল, হ্যাঁ ভাইয়া। এখন বলো আমার হবু ভাবির নাম কি? কোথায় থাকে, কি করে সে?
শ্রেয়ান লাজুক কণ্ঠে বলল, ওর নাম শ্রাবণী। পুরান ঢাকার ওইদিকে থাকে। মেডিকেল কলেজে পড়ে। দুই বছর ধরে ওকে ভালো লাগে। কিন্তু কখনো সাহস করে বলে উঠতে পারিনি।
- আচ্ছা চিন্তা করো না। আমি সব ম্যানেজ করে নিব। কিন্তু তার আগে আব্বু আম্মুকে সবটা বলতে হবে। তারা মেয়েটার বাসায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে গেলে তারা যদি রাজি হয়ে যায়, তাহলে মেয়েকে বানাতে কোন সমস্যা হবে না।
একটু থেমে আবার বলল, কিন্তু ভাইয়া তোমাকেও লাজুকাতা ছাড়তে হবে। এত লাজুক হলে চলবে? ছেলেদের এত লাজুক হতে নেই। তাহলে মেয়েটা তোমার উপর ইমপ্রেস হবে কিভাবে?
শ্রেয়ান নড়েচড়ে বসে নিজেকে কিছুটা স্বাভাবিক করে বলল, আমি এখন থেকেই নিজেকে ঠিক করার চেষ্টা করব বোন। তুই শুধু আমাকে হেল্প করিস। তোর যা লাগে আমি তোর জন্য সব করব।
শ্রেয়সী মুচকি হাসে।
_________________________
রিকশাতে বসে উশখুস করছে শ্রেয়সী। তাকে আজ খুব সুন্দর লাগছে। এমনিতেও ওকে সুন্দর লাগে কিন্তু শাড়িতে ওকে অন্যরকম লাগছে। আকাশি নীল রঙের একটা শাড়ি পড়েছে সে। সাথে ম্যাচিং জুয়েলারি। চুলগুলো খোলা। মুখে তেমন মেকআপ নেই। তবুও কাজল কালো চোখ দুটোতে শ্রেয়সীকে অপ্সরার মত লাগছে। ন্যাচারাল লুকেই ওকে অসাধারণ লাগে।
পাশে ওর বান্ধবী সুমি বসে আছে। সুমি ওর বেস্ট ফ্রেন্ড। শ্রেয়সী যেখানেই যাবে সুমিকে সঙ্গে নিয়ে যাবে। আজকে ফারজাদ আর ফাইজা রমনা পার্কে ওকে দেখা করতে বলেছে। একা যেতে ওর ভীষণ লজ্জা করছিল। যদিও ফারজাদের সঙ্গে একবার একা গিয়েছিল, কিন্তু এবার তো সাথে ফাইজাও আছে। তাই একটু লজ্জা লাগছে। এজন্য সুমিকে অনেক বলে করে তার সাথে নিয়ে এসেছে। সুমি আবার কাবাব মে হাড্ডি হতে চাইনি। কিন্তু শ্রেয়সীর জোরাজোরিতে অবশেষে রাজি হতে হলো।
- তুই এমন উসখুস করছিস কেন রে শ্রেয়া?
শ্রেয়সী চমকে উঠে বলল, আসলে একটু নার্ভাস লাগছে।
- নার্ভাস হওয়ার কি আছে? তুই তো দুলাভাইয়ের সাথে আগেও দেখা করেছিস।
শ্রেয়সী আবারো চমকে উঠলো। দুলাভাই!
- এই তুই দুলাভাই কাকে বলছিস? মাত্র তো পরিচয় হলো। এখন একেবারে দুলাভাইয়ের পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছিস?
সুমি মুখ টিপে হেসে বললো, আজ না হয় কাল তো দুলাভাই-ই হবে তাই না? আগে থেকে বললে সমস্যা কি?
শ্রেয়সী হালকা করে সুমির মাথায় একটা থাপ্পড় মেরে বলল, খুব কথা শিখে গেছিস তাই না?
তারপর আবার বলল, আমাকে আজকে কেমন লাগছে রে?
তুমি মাথা থেকে পা পর্যন্ত শ্রেয়সীকে স্ক্যান করে বলল, তোকে তো জাস্ট হুরপরীর মত লাগছে। ট্রাস্ট মি, আমি ছেলে হলে তোকেই বিয়ে করে নিতাম।
শ্রেয়সী মুচকি হেসে বলল, যাহ,,,
রমনা পার্কের কাছে এসে রিক্সা থেকে নামলো শ্রেয়সী আর সুমি। রমনা পার্কের সামনে একটি কালো মাইক্রো গাড়ি পার্ক করে রাখা। শ্রেয়সীর মনে হচ্ছে এটা আগে কোথাও সে দেখেছে। তখন হঠাৎই মনে পড়ল গাড়িটা ফারজাদের। তার মানে ওরা ভেতরেই অপেক্ষা করছে। লেকের ধারে ওকে থাকতে বলেছিল ওরা। শ্রেয়সী আর সুমি ভেতরে চলে গেল।
ফারজাদ অস্থিরভাবে পায়চারি করছে আর একটু পর পর ঘড়ি দেখছে। সময় যেন আজকে কাটতেই চাইছে না। এক ঘন্টা ধরে অপেক্ষা করছে শ্রেয়সীর জন্য।ফাইজা ওকে অনেকক্ষণ ধরে লক্ষ্য করে যাচ্ছে।
আজকে ফারজাদ কে অনেক সুন্দর লাগছে। স্কাই ব্লু কালারের টি-শার্ট, ব্ল্যাক জিন্স, চুলগুলো বরাবরের মতো স্পাইক করা, চোখে কালো সানগ্লাস। হাতে কালো রঙের ঘড়ি। ট্রিম করা চাপ দাড়িগুলো যেন ওর মুখের সৌন্দর্য দ্বিগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে। যেকোনো মেয়েই প্রথম দেখাতে ক্রাশ খেতে বাধ্য। ইতোমধ্যে অনেকগুলো মেয়ে ওর দিকে ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে রয়েছে।
- আরে ভাইয়া এত অস্থির হচ্ছিস কেন?
- ও এখনো আসছে না কেন? ওর আবার কোন সমস্যা হলো না তো?
ফাইজা কিছু বলতে যাবে তখনি সামনের দিকে তাকিয়ে ওর চোখ স্থির হয়ে গেল। আকাশে নীল রঙের শাড়ি পড়া শ্রেয়সীকে দেখে এসে অবাক চোখে সেদিকে তাকিয়ে রইল। অসম্ভব সুন্দর লাগছে শ্রেয়সীকে আজকে।
উত্তেজিত হয়ে ফারজাদকে বলল, ভাবি এসে গেছে ভাইয়া!
ফারজাদ চমকে উঠে দ্রুত পেছনে তাকালো। সাথে সাথেই তার চোখ স্থির হয়ে গেল। দেহ থমকে গেল। সানগ্লাস এর ওপর দিয়ে অসাধারণ সুন্দরী শ্রেয়সীকে দেখে তার হার্টবিট দ্বিগুণ হারে বেড়ে গেল। আলগোছে সানগ্লাসটা খুলে সেদিকে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। চোখে মুখে তার হাজারো মুগ্ধতা বিরাজ করছে।
শ্রেয়সীও ফারজাদ কে দেখে থমকে গেল। ফারজাদকে অসাধারণ সুন্দর আর সুদর্শন লাগছে। পুরুষ মানুষও যে এত সুন্দর হয় সেটা ফারজাদকে না দেখলে শ্রেয়সীর জানা হতো না। নাকি ভালোবাসে বলে শুধু তার চোখেই এতটা সুন্দর লাগছে? উত্তর জানা নেই শ্রেয়সীর।
ফারজাদের চমক ভাঙ্গালো ফাইজা আর শ্রেয়সীর চমক ভাঙ্গালো সুমি। দুজনেই বাস্তবতায় ফিরে এসে বেশ খানিকটা লজ্জা পেল।
ফাইজা দ্রুত গিয়ে শ্রেয়সীকে জড়িয়ে ধরে খুশিতে আটখানা হয়ে বলল, তোমাকে এর আগেও একবার দেখেছিলাম ভাবি, কিন্তু এবার যেন তোমার সৌন্দর্য দ্বিগুণ বেড়ে গিয়েছে। কারণ আজকে তুমি শাড়ি পড়ে এসেছো। আর শাড়িতে নারীদের সৌন্দর্য কয়েকগুণ বেড়ে যায়। একটা কথা আছে না? শাড়িতেই নারী! সত্যিই অসাধারণ সুন্দরী তুমি। এতটাই মায়াবী আর সুন্দরী তুমি যে মেয়ে হয়েও তোমার প্রতি ক্রাশ খেয়ে গেলাম। ইউ আর সো বিউটিফুল মাই লাভলি ভাবি।
শ্রেয়সী লজ্জায় পুরো মিলিয়ে গেল ফাইজার মুখ থেকে এত প্রশংসা আর ভাবি ডাক শোনে। লজ্জায় সে মাথাই তুলতে পারছে না। শ্রেয়সীর অবস্থা বুঝতে পেরে তাকে কমফোর্ট ফিল করানোর জন্য অন্য প্রসঙ্গে কথা বলতে শুরু করল। তবুও শ্রেয়সীর লজ্জা কমলো না। কিন্তু ফাইজার মিশুক স্বভাবের জন্য খুব তাড়াতাড়ি ওর সাথে শ্রেয়শীর ভাব হয়ে গেল। তাছাড়া তাদের তো একদিন দেখা হয়েছিলই। ফাইজার সুমির সাথেও ভাব জমিয়ে ফেলল খুব অল্প সময়ে। বেচারা ফারজাদ ফাইজার জন্য শ্রেয়সীর সাথে একটু কথা বলতে পারছে না।
এক সময় ফারজাদ ফাইজাকে আড়ালে ডেকে নিয়ে বলল, বনু কালকে তো তুই তোর ভাবির সাথে ইচ্ছে মতো কথা বলেছিস। আজকে আমাকে আর ওকে একটা প্রাইভেসি দে? অনেক কষ্টে বাবার থেকে সময় ম্যানেজ করেছি আমি।
ফাইজা সরু চোখে তাকিয়ে বলল, তুই আমাকে আমার ভাবির সাথে কথা বলতে মানা করছিস?
- আরে তোকে মানা করলাম কই? বলেছি আজকে ওর সাথে আমাকে টাইম স্পেন্ড করতে দে। আরেকদিন আবার বাসায় নিয়ে গিয়ে যত ইচ্ছা কথা বলিস।
ফাইজা একটা দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল,আচ্ছা দিতে পারি। কিন্তু ট্রিট দিতে হবে।
ফারজাদ ঝটপট বললো, কত টাকা লাগবে?
- ৫০০০ টাকা।
- এত টাকা দিয়ে কি করবি?
- বাহ রে তোমাদেরকে প্রাইভেসি দিব, বাসায় গিয়ে একা বোরিং সময় স্পেন্ড করব, তার জন্য টাকা দিতে হবে না? বাসায় গিয়ে বোর হতে পারব না আমি, সুমি আপুকে নিয়ে গিয়ে পার্টি করব।
ফারজাদ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে মানিব্যাগ থেকে ১ হাজার টাকার পাঁচটা নোট বের করে ফাইজার হাতে দিল। ফাইজা খুশি হয়ে সেটা পার্সে ভরে নিল। এরপর শ্রেয়সীর কাছে গিয়ে ফটাফট ওর কয়েকটা ছবি তুলে নিল। শ্রেয়সী অবাক হয়ে ছবি তোলার কারণ জানতে চাইলে সে বলল, আমার মা তোমার ছবি দেখতে চেয়েছে। সে তো মিরপুরে থাকে, তাই তোমাকে দেখতে পারবেনা। তাই ছবিগুলো তুলে নিয়ে তাকে ফোনে সেন্ড করে দিব।
শ্রেয়সী অবাক হয়ে জানতে চাইলো, আমার কথা তোমার মা-ও জানেন?
- হ্যাঁ ভাইয়া তো আম্মু কল করলেই তোমার কথা বলে। তোমার বর্ণনা এতভাবে আম্মুকে দিয়েছে যে তোমাকে এক নজর দেখলেই আম্মু চিনে ফেলবে। আর জানো ভাইয়া তোমার স্কেচও তৈরি করেছে। অনেক সুন্দর হয়েছে। তুমি দেখলে বলতে কতটা সুন্দর হয়েছে। আমার মা দেখেও অনেক প্রশংসা করেছে তোমার।
শ্রেয়সী এক দৃষ্টিতে ফারজাদের দিকে তাকাল। ফারজাদ তার দৃষ্টি অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিল। এই মুহূর্তে কেন যেন তার ভীষণ লজ্জা লাগছে। মনে হচ্ছে দৌড়ে পালিয়ে যেতে পারলেই বাঁচে।
এরপর ফাইজা ঝটপট বললো, ভাইয়া তোমার সাথে একান্ত কিছুটা সময় কাটাতে চায়। আমরা আর কাবাব মে হাড্ডি হয়ে কি করব। তাই আমি আর সুমি আপু বাসায় চলে যাচ্ছি। তুমি আর ভাইয়া দুজনে সুন্দর কিছু সময় কাটাও।
এই মুহূর্তে ফারজাদের ইচ্ছে করছে ফাইজার মুখটা টেপ লাগিয়ে বন্ধ করে দিতে। মেয়েটার মুখে কিছুই আটকায় না। টাকা দিয়ে কি লাভ হলো? শ্রেয়সীর সামনে সব তো বলেই দিল। এবার ওর সামনে দাঁড়াবে কি করে?
শ্রেয়সীর থেকে বিদায় নিয়ে ফাইজা আর সুমি চলে গেল। শ্রেয়সী আর ফারজাদ দুই পাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল। কেউ কোন কথা বলছে না।
অনেকক্ষণ পর ফারজাদ ইতস্ততা ভেঙে বলল, লংড্রাইভে যাবে শ্যালু?
শ্রেয়সীর চমক ভাঙলো যেন। লজ্জায় মাথা নিচু করে নিল। মাথা দুদিকে দুলিয়ে সম্মতি জানালো।
_______________________
হাইওয়ে ধরে শা শা করে ছুটে চলছে কালো রঙের একটি মাইক্রো গাড়ি। ড্রাইভিং সিটে বসে ড্রাইভ করছে ফারজাদ আর ফ্রন্ট সিটে বসে আছে শ্রেয়সী। দুজনেই চুপচাপ বসে আছে। খোলা জানালা দিয়ে অবাধ্য তীব্র বাতাস এসে শ্রেয়সীর চুল গুলোকে এলোমেলো করে দিচ্ছে বারবার। চোখে মুখে চুলগুলো বারবার আছড়ে পড়ছে। ফারজাদের ইচ্ছে করছে নিজের হাত দিয়ে চুলগুলোকে কানের পাশে গুঁজে দিতে। অনেক কষ্টেও নিজের ইচ্ছেগুলোকে দমিয়ে রাখতে পারল না। এক হাতে ড্রাইভ করতে করতে অন্য হাত দিয়ে শ্রেয়সীর একগুচ্ছ চুলগুলোকে কানের পাশে গুঁজে দিল। শ্রেয়সী এক পলক ফারজাদের দিকে তাকিয়ে আবার জানালার দিকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠেছে যেটা ফারজাদের দৃষ্টি এড়ালো না। হাসলে শ্রেয়সীর বাম গালে সুন্দর একটা টোল পড়ে। তখন তাকে আরও মায়াবী লাগে। চিবুকের নিচে কুচকুচে কালো একটা তিল। সেটা ফারজাদকে প্রবল ভাবে কেন যেন বারবার আকর্ষণ করে। ফারজাদ একদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকে। একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে সে তার প্রেয়সীকে দেখে। শ্রেয়সীর টোলটা তাকে অজানা আকর্ষণে টানে। প্রবলভাবে টানে। শ্রেয়সীর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে সে।
- জানো শ্যালু? আমার জীবনে দুইজন নারী ছাড়া আর কোন নারীর অস্তিত্ব ছিল না। এক ছিলেন আমার মা আর দ্বিতীয় জন হলো আমার বোন ফাইজা। এই দুজনের বাইরে অন্য কোন নারীর সংস্পর্শে কখনোই আসা হয়নি। বলতে গেলে আমার কোন ইন্টারেস্ট ছিল না। কখনো ভাবিইনি আমার জীবনেও প্রেম আসবে। আমিও কাউকে পাগলের মতো ভালোবাসবো। আমার মনও প্রবল অস্থিরতায় কারো জন্য অপেক্ষা করবে। তুমি আমার জীবনে না আসলে হয়তো এই দিনগুলো দেখা হতো না। আমারই শুষ্ক হৃদয়ে হয়তো প্রেমের ভালোবাসার ফুলও ফুটতো না। তুমিই আমার জীবনের প্রথম ভালোবাসা আর শেষ ভালোবাসা।
শ্রেয়সীও আজকে নিজের অব্যক্ত কথাগুলো আড়াল করে রাখলো না। আনমনেই বলতে লাগলো, আমিও কখনো ভাবিনি আমার আমার জীবনেও কখনো ভালোবাসা আসবে। ভেবেছিলাম হয়তো কারো সাথে জীবনটা মানিয়ে নিতে হবে। বাবা-মা আর ভাইয়াকে নিয়েই আমার পৃথিবী ছিল। বাইরের কেউ এই পৃথিবীতে দখল করতে পারেনি কখনোই। আমিও ভেবেছিলাম হয়তো এই জীবনে আর মনের মানুষকে পাওয়া হবে না। সত্যিকারের ভালোবাসা পাওয়া হবে না। আমিও হয়তো কাউকে সত্যিকারের ভালবাসতে পারব না। স্কুল লাইফ থেকেই অসংখ্য প্রপোজাল পেয়েছিলাম, কিন্তু বারবার রিজেক্ট করে দিয়েছি। কারণ যারা আমায় প্রপোজ করেছিল তারা প্রত্যেকেই আমার সৌন্দর্যে মুগ্ধ হয়ে প্রোপোজ করেছিল। আমাকে ভালোবেসে করেনি। তাদের চোখে আমি কখনোই ভালোবাসা দেখিনি। তাই বারবার রিজেক্ট করে দেওয়াতে তারা ভাবতো আমি বোধহয় অহংকারী। আমি অ্যাটিচিউড দেখাই। কিন্তু আসলে তেমনটি ছিল না। আমি মন প্রাণ দিয়ে আমার স্বপ্ন পুরুষের অপেক্ষায় ছিলাম। আমার বিশ্বাস ছিল একদিন না একদিন সে আসবে। আর সত্যি তেমনটাই হলো। তুমি আমার জীবনে ভালোবাসার অফুরন্ত ভান্ডার নিয়ে আসলে। তোমার চোখেমুখে আমি সেই ভালোবাসা দেখেছি, যা আজ পর্যন্ত কারো চোখে দেখিনি আমি। তোমাকে প্রচুর ভালবাসতে ইচ্ছে করে, অগাধ বিশ্বাস করতে ইচ্ছে করে। নিজের থেকেও বেশি। অনেক অনেক বেশি। আমার বিশ্বাস তুমিই সেই স্বপ্ন পুরুষ, যে মৃত্যুর শেষ মুহূর্ত পর্যন্তও আমার হাত ধরে থাকবে। কখনোই আমার হাত ছেড়ে দেবে না। সত্যিকারের ভালবাসবে আমাকে। তোমার মত করে আমিও বলতে চাই, তুমিই আমার জীবনে প্রথম ভালোবাসা আর তুমিই শেষ ভালোবাসা।
দুজন আজ নিজেদের মনের অব্যক্ত সমস্ত কথা বলে দিল একে অপরকে। এক অপরিসীম প্রশান্তি আর তৃপ্তি বিরাজ করছে দুটি মনে। হৃদস্পন্দন বেড়ে গেছে বহুগুণ।
তখন পড়ন্ত বিকেল বেলা। বর্ষা শেষে শরতের আগমন ঘটছে ধীরে ধীরে। বাগান জুড়ে শুভ্র কাশফুলের সমারহ ঘটছে। ছাই বর্ণ মেঘের আকাশ পেরিয়ে এখন শুভ্র মেঘের ছড়াছড়ি। আকাশী নীল রঙের সুন্দর আকাশ।
কাশবনের একপাশে ছোট্ট একটি নদী। সেখান থেকে শীতল মৃদু মন্দ হওয়া ভেসে আসছে। ফারজাদ আর শ্রেয়সী প্রাণভরে উপভোগ করছে সেই অপরূপ পরিবেশ আর বাতাস। গাড়ির সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে দুজন। হঠাৎ ফারজাদ কয়েকটি কাশফুল ছেড়ে এনে শ্রেয়সীর হাতে ধরিয়ে দিল। কাশফুল হাতে শ্রেয়সীকে একদম শুভ্র কন্যা লাগছে। আরেকটি বেলী ফুলের গাজরা বেঁধে দিল শ্রেয়সীর চুলে। অপরূপা লাগছে তার মায়াময়ীকে। ফারজাদ এই অপূর্ব দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করতে ভুললো না।
দুজন নদীর পাড় ধরে অনেকক্ষণ হাঁটলো। জীবনের ঘটে যাওয়া নানা কথা বলতে লাগলো একে অপরকে। নিজেদের শত অনুভূতি, স্বপ্ন, ইচ্ছা,আকাঙ্ক্ষার গল্প করতে লাগলো। যেন একে অপরের কত যুগের চেনা। কোন সংকোচ, জড়তা, অস্পষ্টতা নেই। শুধু আছে একরাশ ভালোলাগা, মুগ্ধতা আর অপরিসীম বিশ্বাস। সত্যিকারের ভালোবাসার অনুভূতি গুলো এরকমই হয়।
সন্ধ্যার ম্লান আলোতে দুজনের মনেই স্বর্গীয় অনুভূতির সৃষ্টি হলো। গভীরভাবে অনুধাবন করতে পারলো, তারা একজন আরেকজনকে ঠিক কতখানি ভালবেসে ফেলেছে। অনুভূতিগুলো প্রখর হলো। প্রথমবারের মতো হাত ধরল ফারজাদ আর শ্রেয়সী। কি মধুর আর স্বর্গীয় সুধায় ভরা সেই অনুভূতি।সেই অনুভূতি হয়তো ভাষায় বর্ণনা করা যাবে না।
____________________
এভাবে হাসি-আনন্দ আর অনুভূতির খেলায় দিন কেটে যেতে লাগলো। ফারজাদ-শ্রেয়সীর দুজনেরই একটা অন্যরকম রঙিন আর রোমান্টিক জগত তৈরি হয়েছে। যে জগতে বিচরণ করে শুধুই তারা দুজন। আর বাকি সব কিছু যেন থমকে থাকে। সেই জগতের নিজস্ব মালিক তারা। যে জগতে শুধুই ভালোবাসা আর ভালোবাসা। অপরিসীম মুগ্ধতা, অনুভূতি আর মায়ায় ভরা। যেখানে আছে শুধু নিঃস্বার্থ ভালোবাসা।
ফারজাদ আর শ্রেয়সী শহরের বাইরে গ্রামের মতো একটি জায়গায় সাইকেল নিয়ে ছুটে চলছে। কে কার আগে যেতে পারে এই প্রতিযোগিতা। গ্রাম্য রাস্তার দু'পাশে সরষে ফুলের ক্ষেত। মাঝখানে মেঠো পথ। তারই দুই পাশে ফারজাদ আর শ্রেয়সী সাইকেল চালিয়ে যাচ্ছে। গ্রাম্য এলাকা বলে মানুষজন তেমন একটা দেখা যাচ্ছে না। তাই তারা মনের আনন্দে সাইকেল চালাতে পারছে।
কখনো ফারজাদ এগিয়ে যাচ্ছে, তো আবার কখনো শ্রেয়সী এগিয়ে যাচ্ছে। এভাবেই চলতে চলতে এক সময় তারা বড় একটি সরিষা ক্ষেতে এসে পড়ল। শ্রেয়সীর সরিষা বাগান ভীষণ পছন্দের। আজও সে হলুদ রঙের একটি জামা পড়েছে। একদম একটা হলুদ পরী লাগছে সরিষা ক্ষেতের সাথে পুরো মিলে গেছে সে। ফারজাদ কয়েকটা সরিষা ফুল ছিড়ে শ্রেয়সীর কানের পাশে গুঁজে দিল। শ্রেয়সী মনের আনন্দে পুরো বাগান জুড়ে ছুটতে লাগলো। ফারজাদ তার বিভিন্ন অ্যাঙ্গেলের ছবি ডিএসএলআর দিয়ে তুলতে লাগলো। যেন কোন একটা হলুদ পড়ি ছুটে চলছে হলুদ বাগান জুড়ে।
গ্রামে একটা মেলা বসেছে। সেখানে গিয়ে ফারজাদ আর শ্রেয়সী অনেক মজা করলো। মেলা থেকে অসংখ্য গ্রাম্য জিনিস কিনল। গ্রামের ঐতিহ্যবাহী বিভিন্ন খাবার খেলো। শ্রেয়সীর কথা মত নাগরদোলা, চরকিতেও চড়ল। জীবনটা আসলে কত সুন্দর সেটা ছোটখাটো অনেক জিনিস থেকেও উপভোগ করা যায়। শুধু সবকিছুতেই আনন্দ খুঁজে নিতে হয়।
গ্রামবাসীর সাথে মিলে অনেক সময় কাটালো ফারজাদ আর শ্রেয়সী। তাদের উৎসব ও যোগ দিয়ে তাদেরই মত হয়ে গেল। গ্রামবাসীও তাদেরকে আপন করে নিল। গ্রামবাসীরা ভাবল তারা হয়তো স্বামী-স্ত্রী। ফারজাদ আর শ্রেয়সী কিছু বলল না। একে অপরের দিকে তাকিয়ে হাসলো। স্বামী-স্ত্রী বন্ধনটা কতই না পবিত্র। খুব দ্রুত এই বন্ধনে বাঁধা পড়তে যাচ্ছে তারা, ভাবতেই মনের ভেতর একটা অদ্ভুত প্রশান্তি বিরাজ করে।
শ্রেয়সীর দিকে গভীর ভালোবাসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে ফারজাদ কোমল ও গভীর আবেগী স্বরে বলল রবীন্দ্রনাথের সেই অমর প্রেমের উক্তি: " প্রহর শেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্র মাস,,, তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ! "
চলবে,,,,,