ফন্ট সাইজ:
থিম:
এক তোমাতে আসক্ত

৭ম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া শিমু

#এক_তোমাতে_আসক্ত

#সুমাইয়া_শিমু

#পর্ব_৭

___________________________

আরমান আবরার চৌধুরীর আজিমপুরের ব্যবসা সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ কিছু কাজ সরকারি অফিসে আটকে আছে। এই কাজগুলো শেষ হলে একটা বড় প্রজেক্ট তার হাতে আসবে। ফলে মিরপুর এবং আজিমপুরের বিজনেসের মধ্যে সমন্বয় করলে আরো বড় বিজনেস প্রতিষ্ঠা করতে পারবেন তিনি। কিন্তু কোন একটা কারনে কোন সরকারি অফিসারের কাছে ব্যবসার ফাইলগুলো আটকে আছে। এটা নিয়ে তিনি বেশ কয়েকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছেন সেই অফিসারের সাথে। কিন্তু কোনভাবেই তার সাথে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। তাই বাধ্য হয়ে তিনি তার অফিসেই চলে এসেছেন।

আহনাফ আহমেদ চৌধুরী তার কেবিনে কাজ করছিলেন। হঠাৎ কারো উপস্থিতি টের পেয়ে তিনি সামনে তাকালেন। মধ্যবয়স্ক বেশ সুদাম দেহের অধিকারী একজন স্যুট-প্যান্ট পরা ভদ্রলোককে দেখতে পেলেন তিনি।

- কে আপনি? আর এখানে কি চাই?

- আমি আরমান আবরার চৌধুরী। একজন বিজনেসম্যান। আজিমপুরে আমার বেশ কয়েকটা ব্যবসা আছে। ব্যবসা সংক্রান্ত কিছু কথা বলতে এসেছি।

- জ্বী বসুন।

আরমান আব্রার চৌধুরী সামনের চেয়ারটিতে বসে পড়লেন।

- এবার বলুন কি সমস্যা আপনার?

- ব্যবসা সংক্রান্ত বেশ কিছু ফাইল আপনার কাছে অনেকদিন যাবত আটকে আছে। আপনার সাইন হলেই সেগুলোর কাজ হয়ে যাবে। আমার ব্যবসাতে একটা নতুন প্রজেক্ট পেতে পারবো। কিন্তু কোন ভাবে আপনার সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হচ্ছিল না। তাই সরাসরি নিজে দেখতে চলে এসেছি।

আহনাফ আহমেদ চৌধুরী অনেকগুলো ফাইল ঘেঁটে কিছু ফাইল বের করে তার টেবিলে রাখলেন। তারপর আরমান আবরার চৌধুরীর দিকে এগিয়ে দিয়ে বললেন, দেখুন তো এগুলো কিনা?

আরমান আবরার চৌধুরীর ভালো মত ফাইলগুলো দেখে বললেন, হ্যাঁ এইগুলোই। এবার দয়া করে এগুলোতে সাইন করে দিন। সাইন না হওয়ার জন্য আমার কাজ আটকে আছে।

আহনাফ আহমেদ চৌধুরী দুই হাতের আঙ্গুল পরস্পর মুষ্টিবদ্ধ করে বললেন, এই ফাইলগুলোতে সাইন করা যাবে না।

আরমান আবরার চৌধুরী ভ্রু কুঁচকে বললেন, কেন?

- কারণ আপনার ফাইল গুলোতে টেন্ডার সংক্রান্ত অনেক ঝামেলা রয়েছে। তাছাড়া আপনার ব্যবসা থেকে অনেক দিন যাবত ট্যাক্স দেওয়া হচ্ছে না। যা সম্পূর্ণ ইলিগ্যাল। তাই এগুলো সাইন করা সম্ভব নয়।

- টেন্ডার সংক্রান্ত যত ঝামেলা আছে আমি অতি দ্রুত সব মিটমাট করে নিব। আর ট্যাক্সের ফাইন ভরতেও আমি রাজি। কিন্তু তাও এগুলোতে সাইন করে দিন।

- সরি মিস্টার আরমান আবরার চৌধুরী। ঝামেলা শেষ না হওয়া পর্যন্ত সাইন করা সম্ভব নয়।

আরমান আব্রার চৌধুরী উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলে জোরে একটা থাপ্পড় মেরে শক্ত কণ্ঠে বললেন, এতক্ষণ ধরে ভদ্র ভাষায় কথা বলছি কিন্তু আপনি শুনছেন না। জানেন আমি কে? আরমান আবরার চৌধুরী। ঢাকা শহরের একজন বিশিষ্ট শিল্পপতি। ঢাকা শহরের বিভিন্ন জায়গায় আমার অসংখ্য বিজনেস রয়েছে। এখানকার সামান্য একটা বিজনেসের জন্য আমার কিছুই হয়ে যাবে না। এটা আমার কাছে কিছুই না। আমি আপনার কাছে রিকোয়েস্ট করছিলাম। কিন্তু আপনার মত সামান্য একজন সরকারি চাকরিজীবীর কাছে রিকোয়েস্ট করা আমার উচিত হয়নি। আসল কথা কি জানেন? আপনি আমার থেকে কৌশলে ঘুষ নিতে চেয়েছিলেন। সোজা সাপ্টা বললেই পারতেন টাকা দিয়ে দিতাম। এত ভনিতা করার কি প্রয়োজন ছিল?

বলেই আরমান আব্রার চৌধুরী পকেট থেকে ২ লাখ টাকার দুটো বান্ডিল আহনাফ আহমেদ চৌধুরীর দিকে ছুড়ে মারলেন। আহনাফ আহমেদ চৌধুরী এবার প্রচন্ড রেগে গেলেন। চাকরিজীবনের শুরু থেকেই বেশ সৎ। কখনোই কারো কাছ থেকে ঘুষ নেননি। অন্যায় ও অবৈধ কাজ হতে দেননি। আজ তাকেই কেনা ঘুষের মিথ্যা অপবাদ দিয়ে অপমান করছে একটা লোক? এটা কিছুতেই মেনে নিতে পারেননি তিনি।

আহনাফ আহমেদ চৌধুরী উঠে দাঁড়িয়ে রাগী কন্ঠে বললেন, আপনার মত অবৈধ ব্যবসাকারীর মুখে এসব কথা মানায় না। কিসের এত অহংকার করছেন আপনি? আপনার কোটি কোটি টাকার বিজনেস এর চেয়ে আমার মূল্য আর সম্মান অনেক বেশি। কারণ সামান্য কয়েকটা ফাইলের জন্য আমার সাইনের প্রয়োজন আপনার। এতেই বোঝা যায় মূল্য কার কতটা বেশি। আর সামান্য চাকরিজীবী বললেন কাকে? আমি এই জীবনে যতটুকু সম্মান আর শ্রদ্ধা অর্জন করেছি, সেটা আপনি পুরো জীবনেও অর্জন করতে পারবেন না। অন্যায় ও অবৈধ কাজে আমি কখনোই সাপোর্ট দেইনি আর দেবোও না। আর আমাকে ঘুষের কথা বলছেন? আপনাদের মত লোক গুলো নিজেদের স্বার্থ হাসিল করার জন্য ঘুষের মাধ্যমে কাজ চালিয়ে নেন। কতটা আত্মসম্মান হীন আর নিচ হলে মানুষ এমনটা করতে পারে। আপনার টাকা আপনিই নিয়ে যান। আপনার এই অবৈধ টাকা আমার কোন প্রয়োজন নেই।

বলে টেবিলে রাখা আরমান আবরার চৌধুরীর টাকাগুলো তার মুখের দিকে ছুড়ে মারলেন আহনাফ আহমেদ চৌধুরী। আরমান আবরার চৌধুরীর রাগে থরথর করে কাঁপতে লাগলেন। তার দীর্ঘ ক্যারিয়ারে কেউ তাকে এমন অপমান করার সাহস পায়নি। রেগে কটমট করে কিছু বলতে যাবেন তখনই আহনাফ আহমেদ চৌধুরী শান্ত কন্ঠে বললেন, আপনাকে সসম্মানে বলছি এখান থেকে বেরিয়ে যান। না হলে সিকিউরিটি গার্ড দিয়ে অপমান করে তাড়াতে বাধ্য হবো।

রাগে চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে আরমান আব্রার চৌধুরীর। সারা শরীর, মুখ ঘেমে নেয়ে একাকার হয়ে গেছে। রক্তবর্ণচক্ষু নিয়ে আহনাফ আহমেদ চৌধুরীর দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে শব্দ করে পা ফেলে সেখান থেকে চলে গেলেন আরমান আবরার চৌধুরী।

______________________

- শ্রেয়া! শ্রেয়া! কোথায় গেলি তুই?

জোরে জোরে ডাকতে ডাকতে শ্রেয়সীর রুমে প্রবেশ করল শ্রেয়ান। তার চোখে মুখে খুশির আভা বিরাজ করছে। উত্তেজনায় সারা শরীর কাঁপছে। শ্রেয়সী বিছানায় বসে একটি বই পড়ছিল। ভাইয়ের এমন হাকডাক শুনে হকচকিয়ে উঠে পড়লো সে।

শ্রেয়ান দৌড়ে এসে ধপ করে শ্রেয়সীর খাটে বসে পড়ল।

- কি হয়েছে ভাইয়া? তোমাকে এত খুশি খুশি লাগছে কেন?

শ্রেয়ান লাজুক কণ্ঠে বললো, আজকে বাবা-মা শ্রাবণীকে দেখতে যাবে।

শ্রেয়সী খুশিতে উত্তেজিত হয়ে বলল, তাই নাকি? কখন যাবে?

- এইতো আর একটু পর। তোকে আর আমাকে রেডি হতে বলেছে।

একটু থেমে শ্রেয়ান শ্রেয়সীর গাল টেনে দিয়ে বলল, থ্যাংক ইউ শ্রেয়া। থ্যাংক ইউ সো মাচ। তুই না থাকলে হয়তো বাবা-মাকে আমি কখনোই শ্রাবণীর কথাটা বলতে পারতাম না। তুই তো একেবারে সম্বন্ধ রেডি করিয়ে দিলি।

শ্রেয়সী মুচকি হাসলো কেবল। ভাইকে এতটা খুশি দেখে তারও ভীষণ ভালো লাগছে। আসলে সে-ই কালকে রাত্রে তার বাবা-মাকে বুঝিয়ে শ্রাবণীর কথাটা বলেছে। বাবা মা শ্রেয়সীর কথাকে যথেষ্ট গুরুত্ব দেন। তাই শ্রাবণীর সম্পর্কে যথাযথ ইনফরমেশন নিয়ে তার ফ্যামিলির সাথে যোগাযোগ করেন তারা। শ্রাবনীর ফ্যামিলিও ছেলেকে দেখে, ছেলের চাকরি এবং ফ্যামিলি ব্যাকগ্রাউন্ড দেখে রাজি হয়ে যায়।

কিছুক্ষণ পর শ্রেয়ান মুখ কিছুটা কালো করে বলল, কিন্তু শ্রাবণী যদি আমাকে পছন্দ না করে? তখন কি হবে শ্রেয়া?

- আরে ভাইয়া তুমি কোন টেনশন করো না। তোমাকে পছন্দ না করার কোন কারণই নেই। এত ভালো ভাইয়া আমার, মেয়েরা তোমার জন্য লাইন ধরে অপেক্ষা করে। তোমাকে পছন্দ করবে না তো কাকে পছন্দ করবে শুনি?

শ্রেয়ান কিছুটা আশ্বস্ত হয়ে বলল, তুই থাকতে আমার কোন চিন্তা নেই শ্রেয়া। আমি জানি সবকিছুর মতো এটাও তুই ম্যানেজ করে দিবি।

- শুধু আমি ম্যানেজ করে দিলেই হবে ভাইয়া? বিয়ে করবে তুমি, তার সাথে সংসার করবে তুমি। তোমাকেই তো আন্ডারস্ট্যান্ডিং টা ভালো করতে হবে। তার সাথে মানিয়ে নিতে হবে।

- কিন্তু,,,,

- কোন কিন্তু নেই ভাইয়া। তুমি শ্রাবণী আপুর সাথে নিজে কথা বলবে। জড়তা, লজ্জা, সংকোচ সবকিছু কাটাতে হবে তোমার। আর ভালোবাসার মানুষের কাছে এত লজ্জা-সংকোচ কিসের? মনের থেকে সব ভয় দূর করে ফেলো। দেখবে কিচ্ছু হবে না।

শ্রেয়ান হেসে বোনের মাথায় হাত বুলালো। শ্রেয়সীকেই তার বড় বোন হওয়া উচিত ছিল। তাকে বড় বোনের মত উপদেশ দেয়, হাসিখুশিতে রাখে সব সময়।

- তুই অনেক বড় হ শ্রেয়া। দোয়া করি তোর লাইফ পার্টনারও যেন তোর মনের মত হয়। আমার বোনকে আমি বিশ্বস্ত কারো হাতেই তুলে দিব।

শ্রেয়সীর চোখের সামনে ফারজাদের মায়াবী চেহারাটা ভেসে ওঠে। একটা অদ্ভুত শিহরণ বয়ে যায় মনে। চোখে মুখে লাজুকতা ভর করে। ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠে মিষ্টি হাসি।

_____________________

- আম্মু তুমি ভাবির ছবি দেখতে চেয়েছিলে না? দেখো তোমার মেয়ে ছবি তুলে নিয়ে এসেছে।

মিসেস ফারজানাকে ভিডিও কলে কথা গুলো বলল ফাইজা। ফারজাদ তখন ওয়াশরুমে গিয়েছে। তাই বোনের করা কাণ্ড সম্পর্কে সে কিছুই জানে না।

মিসেস ফারজানা উত্তেজিত হয়ে বললেন, কোথায় দেখি?

- তোমাকে হোয়াটসঅ্যাপে সেন্ড করে দিয়েছি। ওইখান থেকে দেখে নাও। দেখে বলো তোমার হবু পুত্রবধূ দেখতে কেমন?

মিসেস ফারজানা কল কেটে ছবিগুলো দেখতে লাগলেন। দেখেই তার চোখ জুড়িয়ে গেল। একদম তার মনের মতো মেয়ে। যেমন সুন্দরী, তেমনি স্নিগ্ধ আর মায়াবিনী। চেহারায় একটা লক্ষী লক্ষী ভাব আর কোমলতা বিরাজ করে। এমন মেয়েই তো তিনি ফারজাদের জন্য খুঁজছিলেন।

ফাইজা মেসেজ দিয়ে লিখলো, কি আম্মু ভাবি সুন্দর না?

মিসেস ফারজানা প্রত্যুত্তরে লিখলেন, অসম্ভব সুন্দর!

তখনই ড্রয়িং রুমের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল নুসরাত। দুদিন হল সে এখানে এসেছে। ফারজাদ বাড়িতে না থাকায় বেশ স্বস্তি পাচ্ছে সে। কিন্তু মনে মনে অন্য কিছু করার পায়তারা করছে।

হঠাৎই মিসেস ফারজানাকে কারো ছবি মনোযোগ সহকারে দেখতে দেখে সে থমকে গেল। পেছন থেকে উঁকি দিয়ে দেখতে লাগলো ছবিগুলো। কিছু বুঝতে না পেরে মিসেস ফারজানাকে জিজ্ঞেস করল, এগুলো কার ছবি আপা?

মিসেস ফারজানা হাসিমুখেই উত্তর দিলেন, আমার হবু বৌমা।

নুসরাত চমকে উঠলো। ফারজাদ বিয়ে করে নিলেই তো সমস্ত সম্পত্তি তার হয়ে যাবে। যে সম্পত্তির জন্য সে এতগুলো বছর অপেক্ষা করেছে, সেটা এত সহজে অন্য কারো হয়ে যাবে, সে মানতে পারছে না। মনে মনে রাগে ফুঁসতে লাগলো সে। কিন্তু মুখে মধু মিশিয়ে বলল, বাহ খুব সুন্দর তো মেয়েটা। একেবারে যেন চাঁদের পরী। ফারজাদের সাথে খুব মানাবে।

মিসেস ফারজানা বোনের কথায় খুশি হয়ে গেলেন। কিন্তু তিনি জানতেই পারলেন না তার মনে এখন কি চলছে।

- হ্যাঁ খুব সুন্দর। এবার ফারজাদ আর ওর বাবা ফিরে আসলে ফারজাদের বিয়ের কথাটা বলব। কত মেয়েকে দেখালাম আমার ছেলেকে, কাউকেই সে পছন্দ করলো না। অবশ্য পছন্দ না করে ভালোই করেছে। না হলে এমন চাঁদের মতন একটা বৌমা তো পেতাম না। যে করেই হোক এই মেয়েকে আমার বাড়ির বউ করে আনবো।

নুসরাত মনে মনে প্রচন্ড ফুসতে লাগলো। মনে মনে বলল, উহ ন্যাকা! ঘরে বৌমা আনবে। চাঁদের মতন বউমা আনবে। আনাচ্ছি তোকে বৌমা। আমার এত বছরের স্বপ্ন এক নিমিষেই ভেঙ্গে যেতে দিব না আমি। যে সম্পত্তির জন্য এতগুলো বছর মুখ বুজে সব কিছু সহ্য করেছি, তা এত সহজে হাত থেকে ছেড়ে দেই কি করে? এই সম্পত্তির জন্য যা করা লাগে তাই করবো আমি। প্রয়োজনে সব ধ্বংস করে দেব।

এসব ভাবতে ভাবতে সিঁড়ি দিয়ে উপরে উঠে গেল নুসরাত। মিসেস ফারজানার বিয়ের সময় থেকেই মিস্টার আরমান এর উপর তার নজর ছিল। বয়সে তার থেকে অনেক বড় হলেও সেদিকে তার কোন খেয়াল ছিল না। টাকার জন্য সে সবকিছু করতে পারে। যত নিচে নামা লাগুক নামতে পারে। সেজন্য বড় ভাইয়ের মত দুলাভাই কেউ অন্য নজরে দেখতো সে, এখনো দেখে। কিন্তু মিস্টার আরমান কখনোই নুসরাতকে পাত্তা দেননি। প্রথম প্রথম ছোট বোন হিসেবে ভালবাসতেন। কিন্তু যখন তার মনের ভাব বুঝতে পারলেন তখন থেকেই তার থেকে দূরত্ব বজায় রাখতে শুরু করলেন। কাউকেই নুসরাতের মনোভাবটা বুঝতে দেন নি তিনি। তাতে হয়তো নুসরাত এর সাথে ফারজাদের সম্পর্ক আরো খারাপ হবে। আর ফারজাদ তাকেও হয়তো ভুল বুঝতে পারে এই ভয়ে আর কিছু বলেননি তিনি।

______________________

হালকা মেঘ যুক্ত কালো আকাশের দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে ফারজাদ। আকাশে একটা শুভ্র থালার মতো চাঁদ উঠেছে। মেঘগুলো বারবার চাঁদকে আড়াল করে দিচ্ছে। কিন্তু কিছুক্ষণ পরপরই চাঁদ ভেসে উঠছে আকাশের বুক চিরে। ফারজাদের বিষন্ন মন থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে পড়ে। চাঁদের মতো সেও যে ভীষণ একা অনুভব করছে। আকাশে লক্ষ তারা থাকার পরও চাঁদের যেমন কোন সঙ্গী নেই, তেমনি তার আশপাশে অসংখ্য মানুষ থাকার পরও তার একাকীত্ব অনুভব হচ্ছে। কারণটা অবশ্যই শ্রেয়সী। মেয়েটাকে বড্ড মিস করছে সে। সারাদিন প্রতিটা মুহূর্তে, প্রতিটা কাজে তাকে মনে পড়ে। ভীষণভাবে মনে পড়ে। তার মায়াময়ী মুখটা চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কোন কাজেই ঠিকমত মনোযোগ দিতে পারে না সে। আরমান আবরার চৌধুরি অনেকবার জিজ্ঞেস করেছেন তাকে কি হয়েছে। সে কোন কিছুরই জবাব দিতে পারেনি। আবার দুইদিন পরেই এখান থেকে চলে যেতে হবে তাকে। আরমান চৌধুরী এখানকার কোন বিজনেস আর করবেন না বলে জানিয়ে দিয়েছেন। কারণটা তাকে বলেন নি মিস্টার আরমান।ফারজাদও আর জানতে চায়নি।

বারান্দার রেলিং ঘেঁষে দাঁড়িয়ে গিটার হাতে টুংটাং শব্দ করে যাচ্ছে ফারজাদ। গিটার থেকেও যেন আজ বিষন্ন সুর বেরিয়ে আসছে। কোন ভাবেই সুরের লহরী সৃষ্টি করতে পারছে না সে। এক সময় বিরক্ত হয়ে গিটারটা পাশে রেখে দিল। হঠাৎই মনে হলো শ্রেয়সীকে কল করলে কেমন হয়? ফোনটা বের করে কয়েকবার কল দিতে নিয়েও দিল না। কেমন যেন অস্বস্তি হচ্ছে। অনেকক্ষণ মনের সাথে যুদ্ধ করার পর অবশেষে কল দিয়েই দিল। কয়েকবার রিং হওয়ার পরও ফোন যখন ধরল না, তখন ফারজাদের মনটা আরো খারাপ হয়ে গেল। মলিন মুখে ফোনটা রেখে যেতে নিলেই হঠাৎ করেই রিং বেজে উঠলো। ফোনের স্ক্রিনে শ্যালু নামটা ভেসে উঠতেই সাথে সাথেই তার মুখটা খুশিতে জ্বলজ্বল করে উঠলো। দ্রুত ফোন রিসিভ করে তাড়াতাড়ি বলতে লাগলো, হ্যালো শ্যালু। কেমন আছো তুমি?

ফারজাদ ঘন ঘন নিঃশ্বাস নিতে লাগলো। ফোনের ওপাশ থেকে মধ্যবয়সী একটা মহিলার কণ্ঠস্বর শোনা গেল।

- হ্যালো কে আপনি?

ফারজাদ মুহূর্তেই দমে গেল যেন। ভালোমতো নাম্বারটা চেক করে দেখল এটা শ্রেয়সীরই নাম্বার। তাহলে অন্য মহিলা তার ফোন ধরল কেন?

- জ্বি আপনি কে বলছেন?

- আমি শ্রেয়সী আহমেদ চৌধুরীর মা। ও একটু ওয়াশরুমে গেছে। আমি রুমে এসেছিলাম তাই ওর ফোনটা ধরেছি। আপনি কে বলছেন?

ফারজাদ কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। কিছু একটা ভেবে ঝটপট বলে ফেলল, আমি ওর ক্লাসমেট বলছিলাম। আসলে ওর থেকে কিছু নোটস নেওয়ার ছিল। তাই ফোন দিয়েছিলাম আর কি।

- ও আচ্ছা। ও আসলে আমি ওকে বলে দিব ঠিক আছে?

- আচ্ছা আমি এখন রাখছি।

বলেই ফারজাদ দ্রুত ফোন রেখে দিল। আরেকটু হলেই ধরা খেয়ে যেত সে। জোরে জোরে কয়েকটা শ্বাস নিল। কিন্তু তার অশান্ত মন শান্ত হওয়ার পরিবর্তে আরও দ্বিগুণভাবে অশান্ত হয়ে পড়ল। শ্রেয়সীর কণ্ঠস্বর না শোনা পর্যন্ত তার মন কিছুতেই শান্ত হবে না। জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সে বারান্দাতে দাঁড়িয়ে সিগারেটে একটা টান দিল। যখন খুব কষ্ট হয় তখনই সিগারেট খায় সে। তাতে কষ্টটা কিছুটা লাঘব হয়। তার মা তাকে হাজারবার মানা করেছে। কিন্তু তবু মনের দুঃখ ভোলার জন্য হাজার বারণ ভঙ্গ করে সে সিগারেট আগুন ধরালো। আজ বহুদিন পর সিগারেট টান দিল। এর ভেতরে জমানো কষ্টগুলো সিগারেটের ধোয়ার সাথে বেরিয়ে আসলো যেন।

কিছুক্ষণ পর আবার ফোনটা বেজে উঠল ফারজাদের। এবারও আগের মতো ভদ্রমহিলা ফোন করেছে ভেবে সে ফোনটা ধরল না প্রথমে। কিন্তু লাগাতার কল দেওয়াতে সে ইতস্তত করে ফোনটা ধরেই ফেলল।

কাঁপা কন্ঠে হ্যালো বলতেই ওপাশ থেকে ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পেল সে। তার বুঝতে বাকি রইলো না ফোনের ওপাশের মানুষটা কে। সেই মানুষটার নিঃশ্বাস যে তার ভীষণ চেনা।

ফারজাদের হৃদস্পন্দন ক্রমেই বাড়তে লাগলো। কেউই কোন কথা বলছে না। দুপাশ থেকে প্রগাঢ় নীরবতা ভেদ করে শুধু নিঃশ্বাসের শব্দই শোনা যাচ্ছে। দুজনের হার্টবিট প্রবল ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

অবশেষে নীরবতা ভেঙ্গে শ্রেয়সী বলল,তুমি কল করেছিলে আমায়?

ফারজাদ ঘোর থেকে বের হয়ে আসলো যেন। ঝটপট বললো, হ্যাঁ করেছিলাম। তোমার আম্মু ধরেছিলেন।

শ্রেয়সী হেসে বললো, কি বলেছিলে? তুমি আমার ক্লাসমেট হও? নোটস নেওয়ার জন্য ফোন করেছিলে?

ফারজাদ ফিক করে হেসে ফেলল। ওপাশ থেকে শ্রেয়সীও হেসে ফেলল। পরক্ষণে দুজনে আবার চুপচাপ হয়ে গেল।

ফারজাদ প্রচন্ড বিষাদিত স্বরে বলল, তোমায় প্রচন্ড মিস করছিলাম শ্যালু।

ফারজাদের কণ্ঠস্বর শুনে শ্রেয়সীর বুকটা ধক করে উঠলো। কি ছিল সেই কন্ঠে তার জানা নেই। প্রবল আবেগ মেশানো ছিল সেই বাক্য।যা শ্রেয়সীকে একদম বাক্যহীন করে দিয়েছে।

ফারজাদ আবারো বলতে শুরু করল, আমার কি হয়েছে আমি নিজেও জানিয়ে শ্যালু। আমি আগে এমনটি ছিলাম না। এখন কেমন জানি হয়ে যাচ্ছি। কোন কাজেই মন বসাতে পারি না। তোমাকে ছাড়া একটি মুহূর্তও ভালো লাগে না। প্রতিটা কাজে, প্রতিটা মুহূর্তে শুধু তোমার কথাই ভাবি। মানসপটে শুধু তোমার ছবিটাই ভেসে ওঠে। তুমি হীনা প্রতিটা মুহূর্ত যেন হাজার যুগ মনে হয়। প্রতিটা মুহূর্তে তোমাকে কাছে পেতে মন চায়। মনে হয় তোমার থেকে হাজার হাজার পথ দূরত্বে আছি আমি। সমস্ত পথ অতিক্রম করে তোমার কাছে ছুটে যেতে মন চায় বারবার। এই অবাধ্য মনটাকে যে আমি কিছুতেই শান্ত করতে পারি না। তুমি থাকলে মনে হয় হৃদয়ে বসন্তের সুবাতাস বইছে। আর তুমি হীনা এই হৃদয় রিক্ত শূন্য ক্ষতবিক্ষত হয় প্রতিটা মুহূর্তে। আমি কিছুই ভাবতে পারি না তোমাকে ছাড়া। কি করবো আমি এখন বলো? তোমার কি জানা আছে এই রোগের সমাধান?

শ্রেয়সী চুপচাপ। চোখ থেকে কেবল অঝোরে অশ্রু ঝরে পড়ছে। ঠোঁট জোড়া অনবরত কাপছে। গলা ধরে আসছে যেন। এক সময় না পেরে ফুপিয়ে কেঁদে উঠলো।

ফারজাদ ওপাশ থেকে অস্থির হয়ে বলল, একি শ্যালু তুমি কাঁদছো কেন? প্লিজ কেঁদোনা। তুমি কাঁদলে যে আমার ভীষণ কষ্ট হয়।

ফারজাদের চোখ থেকে দু ফোটা অশ্রু টপ করে ঝরে পড়ল। দুজনেই সমানতালে বিরতিহীন ভাবে কেঁদে যাচ্ছে। এই কান্না কিসের দ্বারা কেউই জানেনা। হয়তো বিরহের, হয়তোবা সত্যিকারের ভালোবাসা পাওয়ার আনন্দে। কিন্তু এই কান্না কোন কষ্টের কান্না নয়। এক সীমাহীন ভালোবাসার।

এভাবে অনেকক্ষণ সময় কেটে গেল। শ্রেয়সী আর ফারজাদ দুজনই অনেকটা স্বাভাবিক হলো।

- আমাকে ভালোবেসে কাছে টেনে নিতে পারবে না তুমি ফারজাদ?

- অবশ্যই নিব শ্যালু। তুমি শুধু আমার। আর আমি শুধুই তোমার। কেউ আমাদেরকে আলাদা করতে পারবে না। শুধু একটু অপেক্ষা করো, তোমাকে খুব দ্রুত আমার করে নিব আমি।

- কিন্তু আমার স্বপ্নপূরণ? আমার বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণের কি হবে ফারজাদ?

- বিয়ের পরেও তুমি পূর্ণ স্বাধীনতা পাবে শ্রেয়সী। এতোটুকু বিশ্বাস তুমি আমার উপর করতে পারো। দাম্পত্য জীবনের কোনো প্রভাব তোমার উপর পড়বে না। তুমি আগের মতোই স্বাধীন থাকতে পারবে। তোমার স্বপ্ন পূরণ আমার সবকিছু আগে।

শ্রেয়সী হেসে ফেলল। তারপর খুশি হয়ে বলল, জানো ফারজাদ ভাইয়ার বিয়ে ঠিক হয়ে গিয়েছে। আজকেই মেয়ে দেখে এসেছি। মেয়ে পছন্দ হয়েছে সবার। ভাইয়া নিজে পছন্দ করে বিয়ে করেছে।

ফারজাদ খুশী হয়ে বলল, বাহ এটা তো খুব খুশির খবর। আমার জন্য ভালই হলো। বড় ভাইয়ের বিয়ে হয়ে গিয়েছে, এবার তোমাকে বউ করে নিতে আমার কোন সমস্যা হবে না।

বউ ডাকটা শুনে শ্রেয়সী বেশ লজ্জা পেল। লজ্জায় চিবুক লাল হয়ে গেল তার। ফারজাদ যদি এটা দেখতো তাহলে কি করত এটাই ভাবছে সে।

- রাতের এই অপরূপ পরিবেশে আমি কিছু কবিতার লাইন বানিয়ে ফেলেছি। শুনবে?

- হুম।

ফারজাদ বলতে শুরু করলো,,,

নীলাভ গগনে উঠিল শশী

স্নিগ্ধ কায়া পবন,,,

মায়াবী রাত্র করেছে আপন

আঁখিতে লাগিল স্বপন।

ওহে মায়াবিনী কন্যা,,,

ডুবেছি তোমার মায়াবী চোখের জাদুতে।

হৃদয়হরণী প্রেয়সী আমার,,,

হারিয়েছি তোমার ওই নজর কাড়া চাহনিতে।

ওহে কেশবতী কন্যা,,,

তোমাতেই জীবন আমার,, তোমাতেই মরণ।

ভালোবেসেছি তোমায়,, ভালোবেসে যাবো আমরণ।

তোমার ভালোবাসায় হৃদয় হয়েছে আরক্ত

আমি যে শুধু #এক_তোমাতে_আসক্ত 💙

শ্রেয়সী পরম মুগ্ধ হয়ে শুনছিল তার ভালোবাসার মানুষটির প্রবল ভালোবাসাময় কথাগুলো। কি জবাব দেবে সে ভেবে পাচ্ছে না। কেবল হৃদস্পন্দন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে।

শ্রেয়সী পরম আবেগে বলতে লাগলো,

" প্রথম যেদিন তোমার ওই চোখ জোড়ায় আবদ্ধ করেছি আমার চোখ,,, হারিয়েছি আমি আমার আমি কে। আমি যে আমার মধ্যে নেই। পুরোটাই যে তোমাতেই সপে দিয়েছি। তোমার মধ্যেই আমার জীবন মরণ। আমার সমস্ত হৃদয় তোমার নামে উৎসর্গ করেছি। যতদিন এই শ্বাস চলবে, এই শ্বাসের প্রত্যেকটা নিঃশ্বাস তোমার নামেই উৎসর্গ হবে। শেষ নিঃশ্বাস, শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তোমাকে ভালোবেসে যাবো। মৃত্যুও তোমাকে আমার কাছ থেকে আলাদা করতে পারবে না। ভালোবাসি তোমাকে ফারজাদ। প্রচন্ড ভালোবাসি। নিজের থেকেও হাজার গুণ বেশি। "

এভাবে হাজারো কথা, গল্প আর খুনসুটির মধ্যে কোথা দিয়ে যে রাত পার হয়ে যাচ্ছে সে খবর কেউ রাখলো না। গভীর রাতে দুজন ভালবাসার কপোত-কপোতির ভালোবাসার সাক্ষী হলো দূর আকাশের লক্ষ তারা আর আকাশের বুকে থাকা শুভ্র চাঁদ।

( ভুল-ত্রুটি ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন। গল্পটা কেমন লাগছে জানাতে ভুলবেন না ❤️)

চলবে,,,,,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন