✖️কপি করা কঠোর ভাবে নিষিদ্ধ ✖️
🌙 মুগ্ধতার মায়াবৃত্ত
পর্ব–২
✍🏻 রিত্লব
বিকেলের_অপেক্ষা....….......
সকাল গড়িয়ে কখন যে দুপুর হয়ে গেছে, রিতারা খেয়ালই করেনি।
বেহরান বিকেলে সবাইকে নিয়ে বাইরে যাওয়ার কথা বলেছে—এই একটা কথাই যেন তার মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে।
ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বিরক্ত হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিল সে।
রিতারা: উফ! সময়টা আজকে এত ধীরে যাচ্ছে কেন?
পাশে বসে থাকা সিনহা হেসে বলল—
সিনহা: তুমি এত অস্থির হচ্ছো কেন আপু ?
রিতারা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
রিতারা: আমি অস্থির হচ্ছি? একদম না।
সিনহা: হুমম, বুঝেছি।
রিতারা: কী বুঝেছিস?
সিনহা: কিছু না।
রিতারা: কিছু না বলেই এমন হাসছিস কেন?
সিনহা এবার মুখ চেপে হাসতে লাগল।
রিতারা বালিশটা তুলে তার দিকে ছুড়ে মারল।
রিতারা: বেশি কথা বললে কিন্তু মারব!
সিনহা বালিশটা ধরে হেসে বলল—
সিনহা: আচ্ছা আচ্ছা, রাগ করো না আপু।
ঠিক তখনই দরজার বাইরে থেকে লিলি বেগমের কণ্ঠ শোনা গেল—
লিলি: রিত!
রিতারা সঙ্গে সঙ্গে উঠে বসল।
রিতারা: জি আম্মু?
লিলি ঘরে ঢুকে বললেন—
লিলি: দুপুরের খাবার খেয়ে নে। আর বিকেলে কোথাও যাওয়ার আগে পড়াশোনাটা একটু করে নিস।
রিতারা মুখ বাঁকিয়ে বলল—
রিতারা: আম্মু, আজকে তো বাইরে যাব।
লিলি: বাইরে যাবি বলে পড়াশোনা বন্ধ হয়ে যাবে নাকি?
রিতারা কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে মুচকি হেসে বলল—
রিতারা: না আম্মু।
লিলি মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন—
লিলি: ভালো মেয়ে।
লিলি চলে যেতেই সিনহা ফিসফিস করে বলল—
সিনহা: কাকিয়া কিন্তু ঠিকই বলে।
রিতারা: তুই চুপ কর।
দুজন আবার হাসতে শুরু করল।
দুপুরের খাবার..............
ডাইনিং টেবিলে সবাই একসঙ্গে বসেছে।
বাঁধন মির্জা, লিলি বেগম, বাদল মির্জা, সুরেলা বেগম, সিয়াম, রিতারা আর সিনহা।
তবে একজনের দেখা নেই।
রিতারা চারপাশে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল—
রিতারা: বেহরান ভাইয়া কোথায়?
সিয়াম ভাত মাখতে মাখতে বলল—
সিয়াম: অফিসের একটা কাজে গেছে। বলেছে বিকেলের আগেই চলে আসবে।
সিনহা সঙ্গে সঙ্গে বলল—
সিনহা: ভাইয়া কি সত্যিই আমাদের ঘুরতে নিয়ে যাবে?
সিয়াম হেসে বলল—
সিয়াম: তোদের নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে যখন, নিয়ে যাবে।
সিনহা আনন্দে হেসে উঠল।
রিতারা চুপচাপ খেতে লাগল।
কিন্তু অদ্ভুতভাবে বেহরানের কথা মনে পড়তেই তার সকালের ঘটনাটা আবার মনে পড়ে গেল।
বারান্দা...
কালো বাইক...
আর সেই গম্ভীর চোখের দৃষ্টি।
রিতারা নিজের অজান্তেই একটু হেসে ফেলল।
সিয়াম খেয়াল করে বলল—
সিয়াম: কী হলো? একা একা হাসছিস কেন?
রিতারা চমকে উঠল।
রিতারা: কই? কিছু না।
সিয়াম: কিছু না হলে হাসছিস কেন?
রিতারা দ্রুত মাথা নিচু করে খাবারে মন দিল।
রিতারা: এমনি।
সিনহা পাশে বসে সবকিছু বুঝে ফেললেও কিছু বলল না।
শুধু মুচকি হাসল।
------------------
বিকেলের প্রস্তুতি.......
বিকেল গড়িয়ে আসতেই মির্জা বাড়িতে যেন ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেল।
সিনহা নিজের ঘরে ঢুকে পোশাক বের করতে ব্যস্ত।
আর রিতারা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল ঠিক করছে।
সিনহা দরজার সামনে এসে বলল—
সিনহা: আপু, তুমি এখনও রেডি হওনি?
রিতারা আয়নায় তাকিয়েই বলল—
রিতারা: আরে হচ্ছি তো!
সিনহা: কতক্ষণ লাগবে?
রিতারা: পাঁচ মিনিট।
সিনহা: তুমি পাঁচ মিনিট বলে আধা ঘণ্টা পার করে দিলে !
রিতারা হেসে বলল—
রিতারা: তুই আগে যা। আমি আসছি।
সিনহা চলে গেল।
রিতারা আবার আয়নার সামনে দাঁড়াল।
আজ সে পরেছে হালকা নীল রঙের একটি থ্রি-পিস। চুলগুলো খোলা। কপালের সামনের ছোট ছোট চুলগুলো বাতাসে বারবার মুখের ওপর এসে পড়ছে।
নিজেকে একবার দেখে নিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল সে।
সিঁড়ি দিয়ে নামতেই দেখল—
বেহরান নিচে দাঁড়িয়ে আছে।
কালো শার্ট, কালো প্যান্ট।
চোখে সেই চেনা গম্ভীর ভাব।
রিতারা এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
সকালের দৃশ্যটা আবার চোখের সামনে ভেসে উঠল।
বেহরানও তার দিকে তাকাল।
কয়েক সেকেন্ড দুজনের চোখাচোখি হলো।
তারপর রিতারাই দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল।
বেহরান শান্ত গলায় বলল—
বেহরান: এতক্ষণ লাগল কেন?
রিতারা একটু অবাক হয়ে বলল—
রিতারা: আমি তো সবে এলাম!
বেহরান: সবে?
রিতারা মাথা নিচু করে বলল—
রিতারা: হুম।
বেহরান আর কিছু বলল না।
ঠিক তখনই সিনহা দৌড়ে নিচে এসে হাজির।
সিনহা: ভাইয়া! আমরা রেডি!
বেহরান ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল—
বেহরান: সবাই এসেছে?
সিয়াম: হ্যাঁ।
বেহরান: তাহলে চল।
---------
গাড়ির ভেতর
দুটি গাড়ি বের হলো মির্জা বাড়ি থেকে।
একটিতে বাঁধন মির্জা, লিলি বেগম ও সুরেলা বেগম।
অন্য গাড়িতে বেহরান, সিয়াম, রিতারা ও সিনহা।
সিনহা আর রিতারা পেছনের সিটে পাশাপাশি বসেছে।
সামনে ড্রাইভিং সিটে বেহরান।
তার পাশের সিটে সিয়াম।
গাড়ি চলতে শুরু করল।
সিনহা জানালার বাইরে তাকিয়ে একের পর এক জায়গার নাম বলতে লাগল।
সিনহা: আপু! ওইদিকে দেখো!
রিতারা জানালার বাইরে তাকিয়ে বলল—
রিতারা: কী?
সিনহা: কত সুন্দর জায়গা!
রিতারা হেসে বলল—
রিতারা: হুম।
সিয়াম পিছনে তাকিয়ে বলল—
সিয়াম: তোরা এত চুপচাপ কেন?
সিনহা: আমরা তো কথা বলছি।
সিয়াম: আমার তো মনে হচ্ছে তোরা কোনো ষড়যন্ত্র করছিস।
রিতারা সঙ্গে সঙ্গে বলল—
রিতারা: আমরা আবার কী ষড়যন্ত্র করব?
সিয়াম: তোদের দুজনকে বিশ্বাস করা যায় না।
সিনহা মুখ বাঁকিয়ে বলল—
সিনহা: ভাইয়া!
সিয়াম হেসে ফেলল।
গাড়ির ভেতরের পরিবেশটা হাসি-ঠাট্টায় ভরে উঠল।
শুধু বেহরান চুপচাপ গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে।
হঠাৎ রিতারার চোখ গিয়ে পড়ল তার হাতের দিকে।
স্টিয়ারিং ধরে থাকা হাতটা শক্ত করে রাখা।
কেন জানি সেই দৃশ্যটাও তার চোখে আটকে গেল।
সে দ্রুত চোখ সরিয়ে জানালার বাইরে তাকাল। --------------
নার্সারি...........?
কিছুক্ষণ পর গাড়ি এসে থামল একটি বড় নার্সারির সামনে।
সিনহা গাড়ি থেকে নেমেই প্রায় দৌড়ে ভেতরে ঢুকে গেল।
রিতারা তার পেছন পেছন গেল।
চারপাশে সারি সারি ফুলের গাছ।
কত রকমের রঙ!
সিনহার চোখ আনন্দে চকচক করে উঠল।
সিনহা: আপু! এটা নেবো?
রিতারা: কোনটা?
সিনহা একটা ছোট্ট ফুলের গাছ দেখিয়ে বলল—
সিনহা: এটা।
রিতারা: সুন্দর তো।
সিনহা: তাহলে এটা নেব।
দুজন মিলে গাছগুলো দেখতে লাগল।
বেহরান কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে তাদের দেখছিল।
সিয়াম তার পাশে এসে বলল—
সিয়াম: ওদের নিয়ে আসা ঠিক হয়েছে।
বেহরান: হুম।
সিয়াম কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল—
সিয়াম: তুমি অনেকদিন পর একটু স্বাভাবিকভাবে বাইরে এলে।
বেহরান ভ্রু কুঁচকে তাকাল।
বেহরান: আমি কি অস্বাভাবিক?
সিয়াম হেসে বলল—
সিয়াম: তুমি জানো আমি কী বলতে চাইছি।
বেহরান আর কিছু বলল না।
তার দৃষ্টি আবার গিয়ে থামল রিতারার ওপর।
রিতারা তখন একটা সাদা ফুলের গাছ হাতে নিয়ে সিনহাকে কিছু একটা বলছে।
হাসতে হাসতে তার গালে ছোট্ট টোল পড়েছে।
বেহরান কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইল।
তারপর দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
-------
অচেনা ছায়া
নার্সারির বাইরে তখন একজন অপরিচিত পুরুষ দাঁড়িয়ে ছিল।
কালো শার্ট।
চোখে কালো চশমা।
হাতে ফোন।
সে মির্জা পরিবারের গাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর ফোন বের করে কারও সঙ্গে কথা বলল।
লোকটি: ওরা বেরিয়েছে।
ওপাশ থেকে কিছু একটা বলা হলো।
লোকটি ধীর গলায় বলল—
লোকটি: হ্যাঁ... মেয়েটাও সঙ্গে আছে।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর লোকটি আবার বলল—
লোকটি: আজ না। সময় হলে জানাব।
কল কেটে দিয়ে সে আবার একবার নার্সারির ভেতরের দিকে তাকাল।
তার দৃষ্টি গিয়ে থামল রিতারার ওপর।
তারপর ধীরে ধীরে সে সেখান থেকে সরে গেল।
কিন্তু কেউই তাকে খেয়াল করল না।
---
ফেরার পথে
সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে।
আকাশের পশ্চিম পাশে সূর্য ডুবে যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
গাড়ির জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রিতারা মুগ্ধ হয়ে গেল।
আকাশের রঙ ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে।
সিনহা পাশে বসে গাছগুলোর কথা বলছে।
রিতারা হেসে হেসে তার কথা শুনছে।
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ গাড়ি থেমে গেল।
রিতারা অবাক হয়ে সামনে তাকাল।
রিতারা: কী হয়েছে?
বেহরান গাড়ি থামিয়ে বাইরে তাকিয়ে বলল—
বেহরান: কিছু না।
সিয়ামও জানালা দিয়ে বাইরে তাকাল।
রাস্তার পাশে একটা ছোট্ট চায়ের দোকান।
সিয়াম বলল—
সিয়াম: চা খাবে?
বেহরান: হুম।
সিয়াম গাড়ি থেকে নেমে গেল।
কিছুক্ষণ পর সে চার কাপ চা নিয়ে ফিরে এল।
এক কাপ বেহরানকে দিয়ে আরেক কাপ রিতারার দিকে বাড়িয়ে দিল।
রিতারা অবাক হয়ে বলল—
রিতারা: আমার জন্য?
সিয়াম: হ্যাঁ। নে।
রিতারা কাপটা নিল।
সিনহা সঙ্গে সঙ্গে বলল—
সিনহা: আমার?
সিয়াম: তোর জন্যও আছে।
সিনহা খুশি হয়ে চা নিল।
রিতারা চায়ের কাপে ফুঁ দিতে দিতে বাইরে তাকাল।
ঠিক তখনই দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একটি কালো গাড়ি তার চোখে পড়ল।
গাড়ির পাশে একজন লোক দাঁড়িয়ে।
চোখে কালো চশমা।
রিতারার কেমন যেন পরিচিত মনে হলো তাকে।
সে একটু ভালো করে তাকানোর আগেই গাড়িটা দ্রুত সেখান থেকে চলে গেল।
রিতারা কিছুক্ষণ সেই গাড়ির দিকে তাকিয়ে রইল।
সিনহা জিজ্ঞেস করল—
সিনহা: কী দেখছো আপু....?
রিতারা ধীরে মাথা নাড়ল।
রিতারা: কিছু না।
কিন্তু তার মনের ভেতর অদ্ভুত একটা অস্বস্তি তৈরি হলো।
---------
রাত
রাত অনেক হয়েছে।
সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
রিতারা নিজের ঘরের বারান্দায় দাঁড়িয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে।
আজকের দিনটা অদ্ভুতভাবে তার মনে জায়গা করে নিয়েছে।
সকালের সেই মানুষটা...
বিকেলের ঘোরাঘুরি...
আর রাস্তার পাশে দেখা সেই অচেনা লোকটা।
হঠাৎ পেছন থেকে দরজায় টোকা পড়ল।
রিতারা চমকে ঘুরে তাকাল।
দরজার বাইরে বেহরান দাঁড়িয়ে।
রিতারা কিছুটা অবাক হয়ে বলল—
রিতারা: ভাইয়া?
বেহরান: ঘুমাসনি?
রিতারা: না।
বেহরান কয়েক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বলল—
বেহরান: বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে থাকিস না।
রিতারা ভ্রু কুঁচকে বলল—
রিতারা: কেন?
বেহরান: এমনি বললাম।
রিতারা: কিন্তু...
বেহরান তার কথা শেষ করার আগেই বলল—
বেহরান: দরজা বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়।
এইটুকু বলেই সে চলে গেল।
রিতারা দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো—
আজকের বেহরান ভাইয়াটা যেন অন্যরকম।
কিছু একটা বলতে চেয়েও যেন বলল না।
---
অন্যদিকে...
শহরের অন্য প্রান্তে একটি অন্ধকার ঘরে বসে আছে সেই অচেনা পুরুষ।
তার সামনে টেবিলের ওপর একটি ছবি রাখা।
ছবিটা হাতে তুলে নিয়ে সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল—
“সময় খুব কাছেই চলে এসেছে।”
তার ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল।
“এবার মির্জা বাড়ির পুরোনো হিসাবটা মিটিয়ে দেওয়ার সময়।”
ঘরের নীরবতার মধ্যে তার কথাগুলো যেন আরও ভয়ংকর শোনাল।
কিন্তু তার আসল উদ্দেশ্য কী?
মির্জা পরিবারের সঙ্গে তার সম্পর্কই বা কী?
আর কেন তার নজর রিতারার ওপর?
এসব প্রশ্নের উত্তর এখনও অজানা।
তবে একটা বিষয় নিশ্চিত—
মির্জা বাড়ির শান্ত জীবনের ওপর অদৃশ্য কোনো ছায়া ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে।
আর সেই ছায়া কতটা ভয়ংকর হবে...
তা সময়ই বলে দেবে।
চলবে......
✍🏻 রিত্লব
🌙 মুগ্ধতার মায়াবৃত্ত