✖️কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ✖️
🌙 মুগ্ধতার মায়াবৃত্ত
পর্ব–৩
✍🏻 রিত্লব
সকালের অস্বস্তি......
সকালের নরম রোদে মির্জা বাড়ির চারপাশটা ধীরে ধীরে প্রাণ ফিরে পাচ্ছে। পাখিদের কিচিরমিচির, রান্নাঘর থেকে ভেসে আসা বাসনের শব্দ—সব মিলিয়ে প্রতিদিনের মতোই স্বাভাবিক একটা সকাল।
কিন্তু রিতারার কাছে আজকের সকালটা যেন একদমই স্বাভাবিক নয়।
সারারাত ঘুমানোর চেষ্টা করেও ঠিকমতো ঘুমাতে পারেনি সে।
বারবার বেহরানের কথাগুলো মনে পড়েছে।
“বারান্দায় একা দাঁড়িয়ে থাকিস না।”
কেন বলেছিল কথাটা?
শুধু কি বড় ভাই হিসেবে চিন্তা করেই?
নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে?
রিতারা বিছানায় বসে কিছুক্ষণ চুপচাপ ভাবল। তারপর বিরক্ত হয়ে নিজের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল—
রিতারা: উফ! আমি এত কিছু ভাবছি কেন?
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
সিনহা: আপু! উঠেছো?
রিতারা দ্রুত বিছানা থেকে উঠে দরজা খুলে দিল।
দরজা খুলতেই সিনহা হাতে একটা বালিশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
রিতারা অবাক হয়ে বলল—
রিতারা: হাতে বালিশ কেন?
সিনহা হেসে বলল—
সিনহা: তোমাকে ঘুম থেকে উঠানোর জন্য।
রিতারা: আমাকে ঘুম থেকে উঠানোর জন্য বালিশ লাগে?
সিনহা: তোমাকে তো ডাকলেও উঠো না। তাই ভাবলাম বালিশ দিয়ে একটা ব্যবস্থা করি।
রিতারা চোখ বড় বড় করে তাকাল।
রিতারা: বেশি পাকামি করিস না।
সিনহা হেসে দৌড়ে পালাতে লাগল।
সিনহা: আগে নিচে আসো!
রিতারা মাথা নাড়িয়ে দরজা বন্ধ করতে যাবে, ঠিক তখনই তার চোখ জানালার দিকে চলে গেল।
হঠাৎ তার বুকটা কেঁপে উঠল।
রাস্তার ওপাশে একটা কালো গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে।
একই রকম গাড়ি...
যেটা সে গতকাল ফেরার পথে দেখেছিল।
রিতারা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে তাকিয়ে রইল।
গাড়ির কাঁচ কালো হওয়ায় ভেতরে কাউকে দেখা যাচ্ছে না।
রিতারা ধীরে ধীরে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল।
রিতারা: এটা কি সেই গাড়ি?
কিছুক্ষণ পর গাড়িটা ধীরে ধীরে চলতে শুরু করল।
রিতারা তাড়াতাড়ি জানালার কাছে গিয়ে ভালো করে দেখার চেষ্টা করল।
কিন্তু কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই গাড়িটা রাস্তার বাঁক ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল।
রিতারার মনে অদ্ভুত একটা অস্বস্তি তৈরি হলো।
---------
নাস্তার টেবিলে......
ডাইনিং টেবিলে সবাই বসে নাস্তা করছে।
বাঁধন মির্জা পত্রিকা পড়ছেন। লিলি বেগম সবার প্লেটে খাবার তুলে দিচ্ছেন।
সিয়াম আর সিনহা নিজেদের মধ্যে কোনো একটা বিষয় নিয়ে তর্ক করছে।
রিতারা চুপচাপ বসে আছে।
লিলি বেগম খেয়াল করে বললেন—
লিলি: কী হয়েছে রিত? এত চুপচাপ কেন?
রিতারা মাথা তুলে মৃদু হেসে বলল—
রিতারা: কিছু হয়নি আম্মু।
সিয়াম সঙ্গে সঙ্গে বলল—
সিয়াম: কিছু হয়নি মানে? আজকে তো দেখি আমাদের চঞ্চল মেয়েটা একদম চুপ।
সিনহা মজা করে বলল—
সিনহা: আপুর হয়তো ঘুম হয়নি।
রিতারা চোখ রাঙিয়ে তাকাল।
রিতারা: তুই চুপ কর।
সিনহা মুখ টিপে হাসল।
ঠিক তখনই বাঁধন মির্জা পত্রিকা থেকে চোখ তুলে বললেন—
বাঁধন: বেহরান কোথায়?
সিয়াম বলল—
সিয়াম: ভাইয়া সকালেই বের হয়ে গেছে।
বাঁধন: এত সকালে?
সিয়াম: অফিসে নাকি জরুরি কাজ আছে।
রিতারা চুপচাপ কথাগুলো শুনছিল।
হঠাৎ বাঁধন মির্জার মুখটা কিছুটা চিন্তিত হয়ে উঠল।
তিনি নিচু গলায় বললেন—
বাঁধন: আবার যেন কোনো ঝামেলায় না জড়ায় ছেলেটা।
সিয়াম অবাক হয়ে তাকাল।
সিয়াম: কী হয়েছে বাবা?
বাঁধন কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বললেন—
বাঁধন: কিছু না।
তারপর আবার পত্রিকার দিকে মন দিলেন।
কিন্তু রিতারার মনে হলো—
“কিছু একটা আছে।”
--------
অন্যদিকে—অফিসে......
বেহরান নিজের কেবিনে বসে ল্যাপটপে কিছু একটা দেখছে।
চেহারায় আগের মতোই গম্ভীর ভাব।
ঠিক তখন দরজা খুলে সিয়াম ঢুকে পড়ল।
সিয়াম: ভাইয়া।
বেহরান চোখ না তুলেই বলল—
বেহরান: কী?
সিয়াম চেয়ার টেনে বসে বলল—
সিয়াম: তোমার সঙ্গে একটু কথা ছিল।
বেহরান এবার ল্যাপটপ বন্ধ করে সিয়ামের দিকে তাকাল।
বেহরান: বল।
সিয়াম কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল—
সিয়াম: গতকাল থেকে তোমাকে একটু অন্যরকম লাগছে।
বেহরান ভ্রু কুঁচকে বলল—
বেহরান: কীভাবে?
সিয়াম: সেটা তুমিই ভালো জানো।
বেহরান চুপ।
সিয়াম এবার একটু গম্ভীর হয়ে বলল—
সিয়াম: গতকাল নার্সারির বাইরে একজন লোককে দেখেছিলাম।
বেহরানের চোখের দৃষ্টি মুহূর্তেই বদলে গেল।
বেহরান: কেমন লোক?
সিয়াম: কালো শার্ট, কালো চশমা। মনে হলো আমাদের গাড়িগুলোর দিকে তাকিয়ে ছিল।
বেহরান কিছুক্ষণ নিশ্চুপ রইল।
তারপর ধীরে ধীরে জিজ্ঞেস করল—
বেহরান: তুই নিশ্চিত?
সিয়াম: হ্যাঁ।
বেহরান চেয়ার থেকে উঠে জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়াল।
তার মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।
সিয়াম বলল—
সিয়াম: লোকটা কি তোমার পরিচিত?
বেহরান ধীরে মাথা নাড়ল।
বেহরান: না।
সিয়াম: তাহলে এত চিন্তিত হচ্ছ কেন?
বেহরান কিছু বলল না।
কিছুক্ষণ পর শান্ত গলায় বলল—
বেহরান: কারণ কিছু মানুষকে চিনতে হয় না। তাদের উদ্দেশ্য চিনলেই যথেষ্ট।
সিয়াম চুপ করে গেল।
---
মির্জা বাড়িতে......
দুপুরের দিকে রিতারা নিজের ঘরে বসে বই পড়ছিল।
কিন্তু বইয়ের পাতায় মন বসছে না।
বারবার সেই কালো গাড়িটার কথা মনে পড়ছে।
হঠাৎ ফোনে একটা মেসেজ এল।
Unknown Number:
“গতকাল যা দেখেছ, সেটা ভুলে যাও।”
রিতারার হাত কেঁপে উঠল।
সে কিছুক্ষণ ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর দ্রুত রিপ্লাই করল—
“আপনি কে?”
কয়েক সেকেন্ড পর আবার মেসেজ এল।
“সময় হলে নিজেই জানতে পারবে।”
রিতারার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
সে তাড়াতাড়ি নম্বরটায় কল দিল।
কিন্তু—
নম্বরটি বন্ধ।
রিতারা কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে বসে রইল।
রিতারা: এটা কীভাবে সম্ভব?
ঠিক তখনই দরজায় টোকা পড়ল।
সে চমকে ফোনটা বালিশের নিচে রেখে দিল।
দরজা খুলতেই সামনে সিনহা।
সিনহা: আপু, কী করছো?
রিতারা নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বলল—
রিতারা: কিছু না।
সিনহা: তোমার মুখ এমন লাগছে কেন?
রিতারা মুচকি হেসে বলল—
রিতারা: আমার মুখ আবার কেমন?
সিনহা: মনে হচ্ছে ভূত দেখেছো।
রিতারা হেসে বলল—
রিতারা: তুই না একদম পাগল।
কিন্তু তার হাসির আড়ালে ভয়টা লুকিয়ে রইল।
---
সন্ধ্যার আগে......
বেহরান আজও বাড়িতে ফিরেছে একটু দেরিতে।
গাড়ি থেকে নেমেই সে চারপাশে একবার তাকাল।
তার চোখে যেন কিছু খোঁজার চেষ্টা।
ঠিক তখন বারান্দা থেকে রিতারা তাকে দেখতে পেল।
বেহরানের চোখ হঠাৎ তার চোখের সঙ্গে মিলল।
রিতারা কিছু বলতে চেয়েও থেমে গেল।
বেহরান সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠতে লাগল।
রিতারা দরজার পাশে দাঁড়িয়ে রইল।
বেহরান পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় থেমে গেল।
বেহরান: রিত।
রিতারা অবাক হয়ে তাকাল।
রিতারা: জি?
বেহরান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল—
বেহরান: আজ বাইরে গিয়েছিলি?
রিতারা মাথা নাড়ল।
রিতারা: না।
বেহরান: ভালো।
রিতারা অবাক হয়ে বলল—
রিতারা: কেন?
বেহরান কোনো উত্তর দিল না।
শুধু বলল—
বেহরান: নিজের খেয়াল রাখিস।
এইটুকু বলেই নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
রিতারা তার চলে যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মনে হলো—
বেহরান কিছু একটা জানে।
---
রাতের রহস্য......
রাত প্রায় বারোটা।
মির্জা বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে।
বাড়ির পেছনের রাস্তা একদম নির্জন।
হঠাৎ একটা কালো গাড়ি এসে কিছুটা দূরে থামল।
গাড়ি থেকে সেই অচেনা লোকটি নামল।
চারপাশে তাকিয়ে সে ফোন বের করল।
লোকটি: আমি নিশ্চিত। মেয়েটা এখনো মির্জা বাড়িতেই আছে।
ওপাশ থেকে কিছু বলা হলো।
লোকটি মৃদু হেসে বলল—
লোকটি: চিন্তার কিছু নেই। সবকিছু আমার পরিকল্পনা অনুযায়ীই হচ্ছে।
কিছুক্ষণ চুপ থেকে সে আবার বলল—
লোকটি: কিন্তু একটা সমস্যা আছে।
ওপাশ থেকে প্রশ্ন আসতেই লোকটি ধীরে ধীরে বলল—
লোকটি: বেহরান।
কিছুক্ষণ নীরবতা।
তারপর লোকটি বলল—
লোকটি: ওকে সরানো সহজ হবে না।
---
অন্যদিকে—বেহরানের ঘরে
বেহরান জানালার পাশে দাঁড়িয়ে আছে।
হাতে একটি পুরোনো ছবি।
ছবিটা অনেক বছরের পুরোনো।
ছবিতে কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে আছে।
বেহরানের আঙুল গিয়ে থামল ছবির এক ব্যক্তির মুখের ওপর।
তার চোখে কঠিন দৃষ্টি।
বেহরান খুব নিচু গলায় বলল—
বেহরান: তুমি ফিরে এসেছ...
কিছুক্ষণ পর সে ছবিটা উল্টে দেখল।
পেছনে লেখা—
“মির্জা পরিবারের হিসাব কোনোদিন শেষ হবে না।”
বেহরানের চোখে এবার রাগ স্পষ্ট।
বেহরান: এবার তোমাকে আমি খুঁজে বের করব।
ঠিক তখনই তার ফোন বেজে উঠল।
স্ক্রিনে একটি অচেনা নম্বর।
বেহরান কয়েক সেকেন্ড ফোনটার দিকে তাকিয়ে থেকে কল রিসিভ করল।
ওপাশ থেকে কোনো কথা নেই।
বেহরান গম্ভীর গলায় বলল—
বেহরান: কে?
নীরবতা।
তারপর খুব ধীর একটা কণ্ঠ ভেসে এল—
“যাকে তুমি খুঁজছো, সে তোমার খুব কাছেই আছে।”
কল কেটে গেল।
বেহরানের চোখ সরু হয়ে এল।
সে জানালার বাইরে তাকাল।
ঠিক সেই মুহূর্তে তার চোখ গিয়ে থামল রিতারাদের ঘরের জানালায়।
জানালার পর্দা নড়ছে।
বেহরানের মনে হঠাৎ একটা অজানা আশঙ্কা জেগে উঠল।
সে দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
---
শেষ দৃশ্য......
রিতারা নিজের ঘরে বসে ফোনটা হাতে নিয়ে সেই অচেনা নম্বরটার দিকে তাকিয়ে আছে।
তারপর হঠাৎ আবার একটি মেসেজ এল।
“তোমার পরিবার সম্পর্কে যা জানো, সব সত্যি নয়।”
রিতারার চোখ বড় হয়ে গেল।
তারপর আরেকটি মেসেজ—
“তোমার অতীতের সঙ্গে মির্জা পরিবারের সম্পর্ক আছে।”
রিতারার হাত থেকে ফোনটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
রিতারা ফিসফিস করে বলল—
রিতারা: আমার অতীত?
ঠিক তখনই দরজার বাইরে কারও পায়ের শব্দ শোনা গেল।
রিতারা দ্রুত ফোনটা লুকিয়ে ফেলল।
দরজার হাতল ধীরে ধীরে নড়ল।
সে নিঃশ্বাস বন্ধ করে দরজার দিকে তাকিয়ে রইল।
দরজা খুলে গেল।
সামনে দাঁড়িয়ে—
বেহরান।
তার চোখে আজকের চেনা গম্ভীরতা নেই।
বরং এক অদ্ভুত উদ্বেগ।
বেহরান ধীরে বলল—
“রিত... তোর সঙ্গে আমার কিছু কথা আছে।”
রিতারা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
আর সেই মুহূর্তেই তার মনে হলো—
আজ হয়তো এমন কিছু জানতে চলেছে, যা তার পুরো জীবনটাই বদলে দিতে পারে।
চলবে......
✍🏻 রিত্লব
🌙 মুগ্ধতার মায়াবৃত্ত