#বনফুল
#নূপুর_ইসলাম
#পর্ব_০৭
নাবিলা ক্লান্তভাবে চেয়ারে এসে বসল। গায়ের ওড়নাটা সুন্দর করে গুছিয়ে মাথায় টেনে নিলো। মুখটা শুকিয়ে এতটুকু হয়েছে, ঠোঁট দুটো শুকনো। সেই শুকনো ঠোঁট দুটো জিভ দিয়ে ভিজিয়ে, ঐ যে দেয়ালে লাগোয়া টিভিটা অনবরত চলছে, সেখানে তাকিয়ে রইল। সে অবশ্য একা না, প্রাইভেট ক্লিনিক। তেমন ভিড়ভাট্টা না থাকলেও, কিছু কিছু মানুষের আনাগোনা ঠিক আছে। তবে কেউ কারো দিকে তাকানোর ফুসরত নেই।
সকাল থেকে এখন বিকেল। সন্ধ্যা হবে হবে করছে। যে নাবিলা ঘর থেকে বেরই হয় না, আর আজ সারাদিন বাহিরে বাহিরে। খাওয়া দাওয়া তো ভালোই, অন্য কিছু করবে সেই সুযোগও হয়নি।
অবশ্য নাবিলাকে তেমন বিচলিত দেখা গেল না। তবে ইনজেকশনের ডোজ মনে হয় চলে গেছে । বাসায় ফিরে হালকা পাতলা খেয়ে ওষুধ খাওয়ার কথা ছিল। তা সময়মতো হয়নি। তাই ব্যথা ব্যথা অনুভব হচ্ছে। সেই ব্যথার গালে হাত রেখে টিভির দিকে তাকিয়ে রইল। টিভিতে অবশ্য সাউন্ড নেই, শুধু ঠোঁট নাড়িয়ে এক মহিলা বসে বসে সন্ধ্যার নিউজ গুলো বলে যাচ্ছে।
তখনই নাবিলার বাবা আর খালিদ হাসপাতালে এলো। খবর শুনে তারা আর বাড়ির দিকে যায়নি। যেখানে ঝামেলা হয়েছিল, সেখানে গেছে। গিয়ে শুনল, নাবিলা নাবিলকে নিয়ে ডাক্তারের কাছে গেছে। আশে পাশে কাছে বলতে এই ক্লিনিকই। এদিকেই আসবে বুঝতে সময় লাগেনি, তাই সোজা এখানেই চলে এসেছে।
নাবিলা তাদের দেখেই ফিরে তাকালো। তারপর হালকা হাসলো। যেন কিছুই হয়নি।
খালিদ এই হাসি দিকে একপলক তাকালো। তারপর বড় একটা শ্বাস ফেলে, চোখ ফিরিয়ে নিলো। তবে নাজিম চিন্তিত ভাবে এগিয়ে বলল, -- তোর কিছু হয়নি তো মা?
নাবিলা দু'পাশে মাথা নাড়ল। মেয়ে যে ঠিক আছে, তাতেই নাজিমের শক্তি ফিরে এলো। তাই নিজের গতিতে বলল, "ঐ শয়তান কে আবার হাসপাতালে আনতে গেছিস কেন? এমন দু'চার ঘুষিতে কি হয়? বাসায় ফিরে গোসল করে, দুটো নাপা খেলেই সব ঠিক। অযথা কতগুলো টাকা নষ্ট।
নাবিলা কিছুই বলল না। সারা জীবন যে, কাগজের নৌকার মতো টাকা জলে ভাসিয়ে এসেছে। তার টাকা চিন্তা দেখে, কি বা বলবে সে ? তবে নাজিম আশ পাশে তাকিয়ে আগের মতোই বলল, - কোথায় হতচ্ছাড়া? তোর মা যে কথায় কথায় চাপড়ে দাঁত খুলে, আসলে ভুল করে না। এমন বান্দর পুলাপানের জন্য চড় থাপ্পড়'ই ঠিক।
নাবিলা এবারো কিছু বলল না। তবে নাবিলার বাবা যে কার্টুনের এক পিস, খালিদ ভালো করেই জানে। যে কোনো ডাক্তারের কাছে গিয়ে তিনি ঝামেলা পাকিয়ে ফেলতে পারে। এত ঝামেলায় আর নতুন ঝামেলা ভালো লাগবে না। তাই সব সময়ের মতো অতি কোমল নরম গলে গিয়ে বলল,-- চাচা, আপনি নাবিলার সাথে এখানেই বসেন, আমি দেখছি।
-- আরে তুমি কি দেখবা? আজকাল ডাক্তারগো তো আর তুমি চিনো না। সব বাটপার।
তার কথা শুনেই আশ পাশের মানুষ চোখ ফিরিয়ে তাকালো। খালিদ দেখে, আগের মতোই বলল, -- সমস্যা নেই চাচা। আমি দেখছি। আপনি বরং নাবিলা কে পানি, হালকা পাতলা কিছু খাবার কিনে দিন ।
বলেই আর দাঁড়ালো না। কথা বললেই সময় নষ্ট। ঐদিকে থানায় ঐ বদ মহিলা লাগিয়ে ফেলেছে, আরেক ঝামেলা।
ডাক্তার আগেই দেখানো হয়ে গেছে। এখন নার্স ড্রেসিং করছে। ওরা ছিল বেশ কয়েকজন, নাবিল একা। তাই তার মারধরের পরিমাণও বেশি। নাক মুখ বলতে গেলে থেতলে গেছে।
খালিদের উপরের পোষা রাগ যে এর ওপর ঢেলেছে, তাতে সন্দেহ নেই। অবশ্য থাকারই কথা। ছোট বেলা থেকেই তার রেকর্ড ভালো না। এতিম পুলাপান। বড় হয়েছে এতিমখানায়। এই কাউন্সিলর সানাউল্লাহ তার কোন আপন চাচা না। তার শক্ত মানুষ দরকার ছিল। তাকে নিয়ে এসেছে। আর আসতেই ধীরে ধীরে সব নিজেদের হাতে নিয়েছে। এটা বাকি সবার হজম করা, চাট্টিখানি কথা না।
তাই স্বাভাবিকভাবেই পাশের চেয়ারে বসতে বসতে বলল, -- রক্তের তেজ জায়গামতো দেখাতে হয়। সব জায়গায় দেখাতে গেলে হিতে বিপরীত হয়।
-- হোক, তাই বলে মুখ বুঝে বোনের অপমান হজম করব?
-- হজম করতে তো বলছি না। বুদ্ধিমানরা বুদ্ধি দিয়ে কাজ করে।
-- আপনি করেন?
-- আমি তো আর তুমি না।
-- আপনি কী?
-- আমি খালিদ। আমার সামনে রাস্তার কুকুরে ঘেউ ঘেউ করবে না।
-- তা ঠিক। তবে পিঠ পিছে ঠিক আঙুল তুলতে পারে।
-- সেটা সবার ক্ষেত্রেই পারে।
-- একটা কথা জিজ্ঞেস করব?
-- করো।
-- আপনি বিয়ে টিয়ে করছেন না কেন?
খালিদ হাসল! হেসে নড়ে চড়ে আরাম করে বসে বলল,
-- কেন, আমি বিয়ে করলে তোর বোনের বদনাম শেষ?
নাবিল উত্তর দিল না। খালিদ, আপার ব্যাপারটা কি, সে বুঝতে পারে না? বোঝার মতো কিছু চোখেও পড়ে না? খালিদ ভাই খালিদ ভাইয়ের মতো, আর আপা তো আপাই। বাড়ির সবাইকে দেখে গলে ভদ্রভাবে কথা বললেও, আপার সাথে সেইটুকুও নেই। এমনকি আপার দিকে অতি দরকার ছাড়া তাকিয়েও দেখে না। তারপরও যদি সামনাসামনি পড়ে, চোখ নামিয়ে নেয়।
সেই নামিয়ে নেওয়ার মাঝে অন্য কিছু নাবিলের চোখেও পড়ে না। অথচ লোকে কত কথা বলে! তবে একটা কিন্তু অবশ্যই আছে। এই যে খালিদ ভাই খবর শুনেই এখানে চলে এসেছে, এমন তিনি নিশ্চয়ই এলাকার সব ছেলেদের কাছেই দৌড়ে যাবেন না। বরং এলাকায় তার মতো খালিদ ভাইয়ের দলে হাজার ছেলে আছে। এমন ঝামেলা অহরহ হচ্ছে। সেই ক্ষেত্রে সবাই উল্টো খালিদ ভাইয়ের কাছেই যায়। শুধু তাদের ক্ষেত্রেই সব কিছু একটু ভিন্ন হয়। আর হয় বলেই, এই যে এত এত কথা।
-- নাবিল?
-- হুম।
-- দুনিয়ার লোকের কাজ হচ্ছে বলা, তারা বলবেই। সব কিছু গায়ে মাখতে নেই। এর পর থেকে এমন কিছু হলে, অন্তত আপার কথা ভেবে চুপ থাকবে। কুকুর সুযোগ পেলে মানুষকে কামড়ে ধরবে, এটাই স্বাভাবিক। তবে মানুষ কখনও সাথে সাথে কুকুরকে কামড়ে ধরবে না। সে ধরবে সুযোগ মতো। আমি তো আছিই, সেই সুযোগের জন্য অপেক্ষা করবে।
নাবিল হাসল! এজন্যই খালিদ ভাইকে তার ভালো লাগে। তিনি সব কিছু করেন ঠান্ডা মাথায়। তাই হেসেই বলল,
-- আমাদের সব বিপদে দৌড়ে আসেন, আমার আপার বেলায় এত পিছিয়ে কেন?
খালিদ ভ্রু কুঁচকে তাকাল। নাবিলের ড্রেসিং শেষ। নার্স সব গুছিয়ে ওষুধ বুঝিয়ে দিল। দিয়ে যেতেই নাবিল বলল,
-- কেউ আপার পেছনে লেগে আছে। বিয়েগুলো ভাঙছে।
খালিদ নিজেও উঠে দাঁড়াল। দাঁড়াতে দাঁড়াতে বলল,
-- লোকের কথা শুনে যারা বিয়ে ভাঙে, তাদের মতো মানুষের সাথে সম্পর্ক না হওয়াই তো ভালো। এমন মানুষ খুঁজে বের করো, যে সব কিছুকে তুচ্ছ করে, এগিয়ে আসবে।
-- এমন মানুষ নাটক, গল্পে হয়। বাস্তব ভিন্ন ।
-- নাটক, গল্প সব বাস্তবের ধোঁয়াশা থেকেই হয়।
-- বিয়েগুলো কি আপনি ভাঙছেন, খালিদ ভাই ?
খালিদ হেসে ফেলল! হো হো করা হাসি। তার বিশাল মুখের বিশাল হাসিটা ক্লিনিকের ছোট্ট কেবিনটা গমগম করে উঠল। তারপর শান্ত হয়ে সেই কথার দিকে আর গেল না। বরং ঘুরিয়ে বলল, -- থানায় যাওয়ার মতো এনার্জি আছে?
নাবিল ভ্রু কুঁচকে তাকাল। খালিদ আগের মতোই হেসে বেরোতে বেরোতে বলল,
-- এত অবাক হয়োও না ছেলে। যে বোম ঘরে নিয়ে বসে আছো। সেই বোম থানায় গিয়ে ঘণ্টা বাজিয়ে ফেলেছে। চাচাকে ফোন করে তোমাদের নিয়ে সোজা থানায় যেতে বলেছে।
নাবিল হাসল! তার মায়ের পুরো জীবনে হজম বলে কোনো শব্দ নেই। আর এখানে তার মেয়েকে রাস্তায় ইভটিজিং, ছেলেকে মারধর, সে বুঝি ছেড়ে কথা বলবে। তারা তো ভালোই তার গালেও যে কয়টা পড়ে, আল্লাই জানে।
-- নাবিল?
-- হুম?
-- নাবিলাকে থানায় নেওয়ার দরকার নেই। আমি পরিচিত অটো বলে দিচ্ছি, ঠিক বাড়িতে পৌঁছে দেবে। বাকিটুকু আমি সামলে নেব।
নাবিল আর কিছু বলল না। আপাকে সত্যিই না নিলেই ভালো হবে। ডাক্তার ওষুধ দিয়েছিল। সেগুলোও সময় মতো খাওয়া হলো না। ধুর! সে বেরিয়েই বাবাকে বলল। নাজিম মেয়ের শুকনো মুখ দেখে, নিজেও সম্মতি দিলো। তাছাড়া থানা পুলিশ থেকে মেয়েটা দূরে থাকাই ভালো।
তাছাড়া, সিয়ানা মেয়ে থানায় দৌড়াদৌড়ির দরকার কী? রোকেয়াও ফোন করে বলল, " ঐ সোহাগ হারামজাদারাও নাকি এসেছে। থানার ভেতরে গিয়ে কি গুটুর গু নাকি করেছে। এখন তাদের কেসই নিচ্ছে না।
তবে যাই থাক, এই ভর সন্ধ্যায় মেয়েকে একা ছাড়ায় তার মন সায় দিল না। তাই তাদের যেতে বলে নাবিলাকে বাসায় পৌঁছে দিতে গেল। দিয়ে তারপরে যাবে। অবশ্য দেরি হলেও সমস্যা নেই। তার বউ আছে, সে একাই একশোতে পাঁচশ।
এদিকে থানায় লেগে গেছে দুনিয়ার ঝামেলা। তারাও তাদের লোক নিয়ে হাজির। যত মার নাবিল দেয়নি, তার চার গুণ তাদের চোখে মুখে দেখা গেল। তারাও উল্টো কেস করবে। তারা নাকি কিছুই করেনি! একা একা এই পাগল মেয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। মাথা যে সমস্যা ছিল, তা তো পুরো এলাকাই জানে। তারা ভেবেছে, হারিয়ে গেছে কি না। তাই এগিয়ে জিজ্ঞেস করতে গিয়েছিল। এই ছেলেটা তো খালিদের জন্য এমনিতেই মাটিতে হাঁটে না, অকারণে তেজ দেখিয়েছে। ব্যস, লেগে গেছে।
তাদের বলতে দেরি, রোকেয়া এক চড় একজনের গালে পড়তে দেরি হয়নি৷ তার মেয়েকে বলে পাগল। এতো সাহস! নাবিল এদের আস্ত রাখছে কেন? নাবিলের জায়গার সে থাকলে, মাথা ছেঁচে না ভর্তা করে ফেলতো।
তারাও কম কি, যা মুখে আসছে বলছে। আর এদের মাঝে আসাদুজ্জামান পড়েছে মহা ফেছাদে। সে এসেছে মাত্রই, এলাকায় পা রাখতেই শুনে এই কাহিনী। তাই বাড়ির দিকে আর যায়নি। রোকেয়াকে ফোন দিতেই শুনলো থানায়। থানায় আসতেই দেখে এই কাহিনী। অনেক কষ্টে রোকেয়াকে ফেরালো। এমন মার মুখো মহিলা সে জীবনে দেখেনি।
থানার পুলিশ দু'ই পক্ষকে শান্ত করল। আসাদ্দুজামানকে ভাইয়ের বউ সামলে রাখার অনুরোধ করলেন। হাজার হলেও রিটায়ার্ড আর্মি, সেই হিসেবে কিছুটা সম্মান করেই বললেন। বললেও রোকেয়ার উপরে বেজায় বিরক্ত। তবে খালিদের নাম শুনে কড়া করে কিছু বলল না। তবে অন্য পক্ষও ফেললা না। খালিদের চাচা এবার পরপর দু'বার কাউন্সিলর হলেও, এর আগে তারা ছিল। এলাকায় তাদের রাজত্বও কম না। তাছাড়া এসেই তারা, পকেটে যা ঢালার ঢেলেছে। যাতে যাই হোক, কেসটা টেসের দিকে যেন না যায়। তাই বিরক্ত কণ্ঠেই বলল, পাশাপাশি এলাকার ছেলে মেয়ে। দু'পক্ষের'ই ভুল আছে। তাই এলাকায় ফিরে গিয়ে নিজেদের মধ্যে মিটমাট করে ফেলেন। তার সাথে এও বোঝালেন, থানার মধ্যে কারো গায়ে হাত তোলা অপরাধ, সেই অপরাধ তারা দেখছে না। তাই সব ভুলে বাড়িতে ফিরতে।
তখনই খালিদ থানায় পৌঁছাল। সে অবশ্য আশেপাশে কিছুই দেখল না। সে গেল সোজা অফিসার ইন চার্জের রুমে। ভেতরে গিয়ে কী করল কে জানে! তবে তার কিছুক্ষণ পরেই পুলিশের সব ভোল পাল্টে গেল। আর ঐ পক্ষের লোকেরা রেগে ফেটে পড়ল।
রোকেয়া সবই দেখল। দেখে তার তেমন পরিবর্তন হলো না। বরং সব কয়টার বিরুদ্ধে ইভটিজিংয়ের কেস করল, করে খালিদকে ভ্রু কুঁচকে বলল, -- তুমি আমার পুরো গোষ্ঠী থেকে দূরে।
খালিদও গলে গিয়ে বলল, -- আমি সব সময় দূরেই চাচি।
-- এই ভেমড়া মার্কা মুখ নিয়ে গলে যাওয়ার নাটক করবে না। একবার শুধু বাগে পাই, চিপড়ে রস বের করে ফেলব। ফাজিলের ফাজিল। বলেই হনহনিয়ে বেরিয়ে গেলেন।
নাবিল দেখে বড় একটা শ্বাস ফেলে বলল, -- কিছু মনে করবেন না, খালিদ ভাই। মা সবার সাথেই এমন।
খালিদ হেসে ফেলল! আসাদুজ্জামানও সেই হাসি দূর থেকে দেখলো। দেখে মাথা নাড়ল। কত টাকা খাইয়েই সব সেট করেছে, কে জানে?
......
নাবিলা বাড়ি ফিরল নিস্তেজ হয়ে। সন্ধ্যার আজান পড়েছে কিছুক্ষণ আগে। আসমানি খালা দরজা খুলতেই সোজা রুমে চলে এলো। এসে চুপচাপ অনেকক্ষণ সেভাবেই বসে রইল।
নাবিলার রুমটা সুন্দর। না, আহামরি তেমন কিছু নেই। নোভার রুমের মতো আধুনিকতার ছোঁয়া নেই, ড্রেসিং টেবিলের সামনে কসমেটিকসের বাহার নেই। নেই হাজার রকম শৌখিন জিনিস। তবে সুন্দর একটা বইয়ের তাক আছে। সেই তাক ভর্তি হাজারো গল্প উপন্যাসের সমাহার আছে। আছে ছিমছাম গোছানো, পরিপাটি, স্নিগ্ধ কোমল একটা আবেশ। সেই আবেশের সাথে আছে, দেখলেই ঘুম ঘুম পায় এমন সিম্পল একটা ডিভান।
সেই ডিভানের সামনে আছে, নরম কোমল বিছানা বরাবর বড় একটা জানালা। যেই জানালা খুললে, শহরের ধুলোবালিতে মনমাতানো বাতাস গা ছুঁয়ে না গেলেও, মধ্যরাতে চাঁদের জ্যোৎস্না ঠিক ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়।
সেই জানালাটা খুলেই নাবিলা বিছানায় শুয়ে পড়ল। দাঁতের ব্যথা, মাথা ব্যথার ঘোরের মাঝে কেউ ফিসফিস করে বলল, " এই নাবিলা, আমার হবে?
নাবিলা দু'হাতের চাদর মুড়িয়ে, মাথা চেপে ধরল। তখনই মৃদু একটা বাতাস তাকে ছুঁয়ে গেল, ছুঁয়ে গেল বারান্দায় রাখা উইন্ড চাইমটাও। তাই তো সাথে সাথেই টুং টাং করে বেজে উঠল। ঠিক তখনই বেজে উঠল তাদের বাড়ির কলিং বেল। নাবিলা যেমন আছে, তেমনি পড়ে রইল। তবে নোভা দৌড়ে এগিয়ে এলো। এসেই দরজা খুলল।
খুলতেই অপূর্ব হেসে বলল, -- হেই, প্রিটি গার্ল! গুড ইভনিং।
-- আপনার গুড ইভনিং, আমাদের না।
অপূর্ব আগের মতোই হাসল। এলাকায় আসতেই সব শুনল। শুনেই বাবা থানার দিকে গেলো। সে নিজেও অবশ্য যেতে চেয়েছিল। তবে বাবা একটু হেসে বলল,
-- তুমি বাসায় যাও, ফ্রেশ হও। আমরা আসছি। বাংলাদেশে এইসব আহামরি কিছু না। অহরহ হচ্ছে। মানুষ দেখে, দুদিন এলাকা, চায়ের দোকানে রমরমা গল্পের মতো চলে, তারপর আবার যা তাই। কারো মনেও থাকে না।
অপূর্ব তার দু'হাতের শপিং ব্যাগগুলো নোভার হাতে ধরিয়ে দিল। দিয়ে আগের মতোই দরজার সামনে জুতা খুলল। খুলে সেখানে রেখেই রুমের দিকে এগোল।
নোভা অবাক হয়ে বলল, -- এগুলো কি ?
-- আমি কি জানি?
-- কি করব?
-- যা, ইচ্ছে।
অপূর্ব রুমে চলে গেছে। নোভা কি করবে, বুঝে উঠতে পারল না। তাই নাবিলার রুমে চলে এলো। এসে সব ব্যাগ এক এক করে খোলা শুরু করল। মায়ের মেজাজ একশো ডিগ্রিতে চড়ে আছে। তার মধ্যে আবার তার অনুমতি ছাড়া জিনিস নিতে দেখলে ঘন্টা বাজিয়ে দেবে। অবশ্য সবার ঘন্টা বাজালেও, আপাকে কিছু বলবে না। তাই বলবে আপার কাছে দিয়েছে।
নাবিলা সব কিছুক্ষণ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখল। জামা কাপড় তো ভালোই, পারফিউম, ওয়াচ, চকলেট কিছু আর বাকি রাখেনি।
সে তার মতো উঠে দাঁড়ালো। কিছু খাওয়া দরকার। খেয়ে টেয়ে ওষুধ টা ও শুরু করা দরকার।
তবে বেরুতেই দরজার সামনে সেই কালকের জুতোজোড়া দেখল। ধুলো বালিতে মাখামাখি। তাই কিচের রুমের দিকে না গিয়ে, আগে জুতোর দিকে গেলো। ঠিক তখনই পুরো বাড়ি অন্ধকারে তলিয়ে গেল। নোভা তো এক চিৎকার দিল! তাদের বাড়িতে আইপিএস আছে। কারেন্ট আসা যাওয়া করে, তবে কখনো এমন অন্ধকার হওয়ার কথা না। আসমানি খালার গলার আওয়াজও পাওয়া গেল । নিশ্চয়ই কোনো সমস্যা হয়েছে।
নাবিলা মাথা ঘামাল না। সারা রাত ঘরের এই কোণা ওই কোণা হাঁটাহাটি করে। পুরো বাড়ি তার মুখস্থ। তাই এগিয়ে নিচু হয়ে জুতোজোড়া নিয়ে সোজা ফিরে দাঁড়াতেই খেলো এক ধাক্কা । যেন তেন ধাক্কা না, বলতে গেলে ছিটকে পড়ল। না পড়ে উপায় কি? ছোট খাটো মানুষ সে। তার মধ্যে কোনো স্বাভাবিক মানুষ অন্ধকারে এমন হন্তদন্ত হয়ে হাঁটতে পারে তার ধারণাই ছিল না।
আর পড়তে না পড়তেই অন্ধকার থেকে ভেসে এলো, “ওহ শিট, শিট! নোভা, ইজ দ্যাট ইউ? স্যরি, স্যরি! আমি তো আমার জুতোর জন্যই এসেছিলাম। হঠাৎ লোডশেডিং হবে, আমার ধারণা ছিল না। " বলেই যেভাবে হন্তদন্ত হয়ে হেঁটে এসেছে, তেমনি হন্তদন্ত হয়ে ধরার জন্য অন্ধকারে এগিয়ে নিচু হলো। আর তখনই দ্বিতীয় অঘটনটা ঘটল।
অপূর্ব ঝট করে সোজা দাঁড়িয়ে গেল। নাবিলার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে, পুরো শরীর শক্ত হয়ে গেল। ঠিক তখনই নোভা পেছন থেকে মোবাইলের ফ্ল্যাশলাইট তাদের দিকে ধরল। আলো ফেলে অবাক হয়ে বলল,
-- আল্লাহ! কী হয়েছে আপা? পড়লে কীভাবে?
নোভার কণ্ঠস্বর শুনে অপূর্ব চমকে পেছনে ফিরল। তারপর সাথে সাথেই আবার সামনে তাকালো। আধো আলো আধো অন্ধকারে সেই শক্ত হয়ে যাওয়া মুখটার মানুষটাকেও এক পলকে তাকিয়ে দেখল আর মনে মনে আবারো বলল,- শিট, শিট, শিট...
চলবে.........