ফন্ট সাইজ:
থিম:
বনফুল

৮ম পর্ব

লেখক: নূপুর ইসলাম

#বনফুল 

#নূপুর_ইসলাম 
#পর্ব_০৮
নাজিমের পুরো নাম নুরুজ্জামান নাজিম। এই নামে অবশ্য এখানের কেউ চিনে না। পুরো কাজী পাড়ার সবাই চিনে শুধু নাজিম নামে। অনেকে নাট বল্টু নাজিমও বলে। তবে তার মায়ের কাছে ছিল বাবু। তার আদরের ছোট ছেলে বাবু। 
তাদের দুই ভাইয়ের নাম নিয়ে তাদের মায়ের তেমন মাথাব্যথা ছিল না। তিনি তার আদরের হাবু আর বাবুতেই সন্তুষ্ট ছিলেন। তবে সমাজ, স্কুল, কলেজে এই নাম চলার কথা না। তাই তাদের বাবা এক গরু কেটে দুই ছেলের আকিকা সম্পূর্ণ করলেন। করে সমাজে টেকার মতো ভারী আর ওজনদার নাম রাখলেন। বড় ছেলের নাম আসাদুজ্জামান নাসির, ছোটটার নাম নুরুজ্জামান নাজিম। সেই নামই কেটে ছেঁটে নাসির আর নাজিম পর্যন্ত এসে ঠেকেছে। তবে শুধু এই ইট পাথরের শহরে। গ্রামে তাদের এখনো তাদের এক নাম হাবু আর বাবু।
অপূর্ব ছিল তাদের মায়ের বড় নাতি। ছেলে মেয়ের ঘরে একমাত্র অপূর্ব বলতে গেলেই কিছুটা আদর দাদির পেয়েছে। নাবিলা তো তখন সবেমাত্র দুনিয়ায় আসা। এলেও রোকেয়া অতি দরকার ছাড়া কখনো গ্রামে যায়নি, গেলেও মায়ের ধারে কাছে খুব একটা ঘেঁষতে দেয়নি। সেই দিকে ভাবি ছিল অন্যরকম। বাচ্চারা দাদা দাদির আদরের আঁচলের মুড়িয়ে থাকবে, এটাই তো স্বাভাবিক। তাই যা আদর দেওয়ার, তার মা বুক উজার করে অপূর্বকেই দিয়েছেন।
অপূর্বর এই সব খুব একটা মনে থাকার কথা না, তাই এটাও নেই। তাদের বাপ চাচার হাবু বাবুর মতো তারও এক অতি সুন্দর এক নাম তার দাদি দিয়ে গেছেন। আর সেই অতি সুন্দর নাম হলো “গেদা”।
অপূর্ব শুনেই হেসে ফেলল। তার মনে না থাকলেও, এই নাম সে জানে। মা, বাবার ব্যাপারে কখনো কিছু না বললেও, দাদির ব্যাপারে বলে। দাদির সঙ্গে তার বন্ডিং অন্যরকম ছিল।
হেসে ফেলল নোভা, নাবিলও। তাদের আইপিএসে কি সমস্যা হয়েছে, এখনো ঠিক বলা যাচ্ছে না। বাড়ির সবকিছু দেখাশোনা করেন বড় চাচা। তিনি ফিরেই চেক করলেন। পানি টানি সব ঠিকই আছে। কানেকশনে কোনো সমস্যা হয়েছে কি না, বুঝতে পারছেন না। তাই কাল পর্যন্ত কষ্ট করতেই হবে। 
তাই এই দ্বিতীয় বারও যখন তাদের বাড়ি অন্ধকারে তলিয়ে গেল। এটা নিয়ে তাদের আর কারো মাথা হলো না। কারেন্টের কাজই আসা যাওয়া। তাই গরমের বেরাম ছাড়া তারা কোনো কষ্টে টষ্টে নেই। বরং তারা জমিয়ে ড্রয়িংরুমে আড্ডা দিচ্ছে। সেই আড্ডার মধ্যমণি হচ্ছে বাবা। সে এমনিতেই আমুদে মানুষ, তার মধ্যে ঢোলের বাড়ি হিসেবে আজ অপূর্ব আছে। তাই আড্ডা জমে উঠতে সময় লাগেনি। 
অবশ্য চারজন মিসিং। সেই চারজনের প্রথমে আছে তাদের বড় আপা। সে সামাজিক রীতিনীতিতে এমনিতেও নেই। নিজের রুমে সে পড়ে পড়ে ঝিমুতে পছন্দ করে। তাই আজও পড়ে পড়ে ঝিমুচ্ছে। 
দ্বিতীয় বড় চাচাও নেই। কাল রাত ছিল তার নির্ঘুম, আজ সারাদিন গেছে দৌড়াদৌড়িতে। বয়স তো আর কম না। শরীর ঝিমিয়ে গেছে। তাই থানা থেকে ফিরে কয়টা খেয়েই গা এলিয়ে দিয়েছেন। সেই দেওয়ায় এই গরমেও দিন দুনিয়ায় হুঁশ নেই। না থাকলেও তাদের আপা এক ফাঁকে ঠিক জানালা খুলে, মশারি টানিয়ে দিয়েছে। 
আর আসমানি খালা তো খালাই, গরম থাক, ঝড় তুফান যাই থাক, রাত হলে সে দুনিয়ায় কাউকে আর চেনে না। তার তখন একটাই গন্তব্য, ঘুম। আর সে তার গন্তব্যে ঠিক পৌঁছে গেছে। 
আর এর মধ্যে সর্বশেষ হলো তার মা জননী। তিনি অবশ্য এখনো ঘুমোতে যাননি। থানা থেকে ফিরে নাবিলকে একচোট হুমকি ধমকি দিয়েছেন। দিয়ে সোজা বলেছেন,-- খালিদের কাছ থেকে দূরে! একদম দূরে। যদি আর একবার আশে পাশে থাকা তো ভালোই, কোনো কথাও শোনা যায়, সোজা বাড়ি থেকে বাইরে। 
নাবিলের শুনে কোনো ভাবান্তর হয়নি। তবে এই ছেঁচা মুখে আজ আর এক্সট্রা চড় থাপ্পড় পড়েনি, আপাতত সে এতেই খুশি।
তারপর আকডুক বাকুম করে নিজের রুমে চলে গেছেন। ড্রয়িংরুমের হি-হি-হা-হা সবই তার কানে যাচ্ছে। আর বিরক্তিতে চোখ-মুখ কুঁচকে ফেলছে। তবে বাড়ির মেহমানদের তো আর চাইলেই কিছু বলা যায় না। তাছাড়া দুদিনের জন্য এসেছে, আবার চলে যাবে। এই দুদিনের জন্য চোখ মুখ কালো করে ভাসুরের সাথে মনোমালিন্য করতে চাইছে না। তাই তার এমন ভাব, যা খুশি করুক।
তার মধ্যে নিয়ে এসেছে একগাদা শপিং করে। মা দেখে কিছু বলেননি। খুশিও হয়নি, বেজারও না। তবে খাবার টেবিলে একটুখানি ভদ্রতার হাসি হেসে বলেছেন,-- এই সবের প্রয়োজন ছিল না।
অপূর্ব ভাইয়া তার মতো হেসে বলেছে,
-- মাঝে মাঝে প্রয়োজনের বাইরেও কিছু করতে হয়, চাচি। আর আমি খুবই দুঃখিত, ওখান থেকে কিছু আনতে পারিনি। আসলে এখানের সম্পর্কে তো আমার কোনো ধারণা ছিল না।
-- না থাকাই তো স্বাভাবিক। তবে তুমি চাইলেই খবর দিয়ে আসতে পারতে। আফসানা কাছে তো ঠিকানা ছিল। 
-- তা ঠিক, তবে এভাবে এলাম বলেই তো কত কিছু জানতে পারলাম। 
-- মানে? 
-- তেমন কিছু না, চাচি। 
মা আর কিছু বলেনি। তার নিজের ব্যাপার ছাড়া কোনো কিছুতেই তার তেমন আগ্রহ নেই। এতটুকু ভদ্রতা ধার ধরেছে এই তো কত? তাই নিজের মতো খেয়ে রুমে চলে গেছেন।
আর তাদের আড্ডা ঝমঝমিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। সেই যাওয়ার মাঝেই বাবা আরো আরাম করে বসে বললেন,
-- আর এই গেদার জীবনের সবচেয়ে মহামূল্যবান কাজটা কিন্তু এই চাচার গলা জড়িয়ে ধরেই করেছে! হাজার দূরে যাক, হাজার বড় হোক। আসল কাজতো এই চাচাকে দিয়ে হয়েছিল।
অপূর্ব ঠোঁট টিপে হাসল। নাবিল প্রথমে বুঝল না, নোভা তো আরো বুঝল না। সে বসেছে বরফের টুকরো বাটিতে নিয়ে। একটু পরপর মুখে ঘষছে। যে গরম, সকালে উঠেই দেখবে তিন-চারটা পাহাড় মুখে উঁকি দিয়ে আছে। আর এই পাহাড় নিয়ে তো আর ভার্সিটিতে যাওয়া যায় না। তাই দেহ জাহান্নামে যাক, মুখ আগে ঠান্ডা। তাই সেই বরফ এক টুকরো হাতে নিয়েই বলল, -- কিসের আসল কাজ?
নাজিম আয়েশে কণ্ঠে বলল,
-- আরে, বড় ভাই তো তখন দুনিয়ায় ব্যস্ত। মা ফোন করে বলল, -- ও বাবু, আমাগো গেদার সুন্নতে খৎনা করব। হাবুর তো ছুটি মেলে না। তুই বাড়িত আয়, তাড়াতাড়ি আয়। এমন কাজে একটা বেটা মানুষ না থাকলে চলে? ছেলেটা ভয়ে আধমরা।
চাচা হিসেবে একটা দায়িত্ব আছে না! তাই সাথে সাথেই রওনা দিলাম। আর আমাদের বাড়ির একমাত্র গেদা চাচার গলা ধরেই মহামূল্যবান কাজের বিরাট চিৎকারটা দিল।
নোভার হাতের বরফ ঠাস করে বাটিতে পড়ে গেল। তার বাপের আসলেই আক্কেল নেই। নাবিল এবার বুঝল। বুঝে হেসে গড়িয়ে পড়ার অবস্থা।
নাজিম অবশ্য গড়িয়ে পড়ল না। সে বসে আছে খালি গায়ে, নিচে লুঙ্গি। আধুনিক হতে হতে পুরো বাড়িতে একটাও হাতপাখা পাননি। আপাতত হিসেবের খাতায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। সেই যাওয়ার মাঝেই আবার বলল, -- অপূর্ব যে কী পরিমাণ বিটলা ছিল রে, সেটা তার চেহারা দেখে বোঝার উপায় নেই। চেহারা তো না, যেন সরোবরে ফোটা কোমল পদ্মফুল। সে ডান, বাম, আসমান, জমিন কিছুই চেনে না। তবে কাজ, সে কিরে বাবা! মায়ের একটা মুরগির গায়েও ফোর থাকত না। তাজা জীবন্ত মুরগি হাঁটছে, খাচ্ছে, কিন্তু গায়ে একটাও ফোরও নাই! সুযোগ পেলেই টেনে হিঁচড়ে সব শেষ।
সেটা তো থাক নিজেদের মুরগি। ফোর থাকলেও চলে, না থাকলেও চলে। জীবন আছে, এই তো কত? তবে পাশের বাড়িতে ছিল লায়ের বিরাট মাচা। কোন ফাঁকে গিয়ে গোড়ায় মাটি খুঁড়ে ভেতর থেকে কেটে আবার সুন্দর মতো ঢেকে চলে আসত, কেউ বলতেও পারত না। ব্যস, ঘণ্টা পেরুতেই গাছ নেতিয়ে শেষ। “কি হলো, কি হলো?" ধরন্ত গাছ। পরে টেনে দেখতে গিয়ে দেখে গোড়া থেকে শেষ।
অপূর্ব বসেছে নাজিমের পাশে। তার অবস্থাও খুব একটা সুবিধার না। নিচে হাফপ্যান্ট, নোভা আছে তাই আপাতত ম্যাগি হাতার একটা গেঞ্জি কোনোরকম গায়ে জড়িয়ে আছে। সেই গেঞ্জিও ঘামে গায়ে লেপ্টে আছে। সেই লেপ্টে যাওয়া ঘাম নিয়ে অবশ্য তার তেমন ভাবান্তর নেই। বরং হাত পা আরেকটু ছড়িয়ে বসতে বসতে বলল, -- এগুলো তো ট্রেলার ছিল, চাচা। এখন কি কি যে করি, তুমি ভাবতেও পারবে না।
-- বলিস কিরে?
-- জি?
-- ভাই, ভাবি তো ভদ্র সভ্য মানুষ। তুই এমন বংশছাড়া বিটলা হলি কোথা থেকে?
অপূর্ব আবারও হেসে ফেলল। তখনই নাবিলা রুম থেকে বেরোল। হাতে কতগুলো ভাজ কড়া কাপড়। গায়ে লাল জামা, ভেজা চুলগুলো পিঠে ছড়িয়ে আছে। রাতে গোসলের তার অভ্যাস নেই, তবে গত দুদিন কেমন সব ওলটপালট হচ্ছে। সারাদিন তো গোসল করার সুযোগও পায়নি। তার মধ্যে এই গরম! জান বেরোয় বেরোয় অবস্থা। তাই ঝট করেই গোসল সেড়ে ফেলেছে। 
তাকে দেখেই নাজিম গলা ছেড়ে ডেকে বলল, -- নাবিলা, কিচেনে গেলে ঠান্ডা কিছুর ব্যবস্থা করিসতো মা। জান তো বেরিয়ে যাবে রে! এসির নিচে থাকতে থাকতে চামড়া বড়লোক হয়ে গেছে। এই সাধারণ গরমেই এখন ফোসকা পড়ার অবস্থা।
নাবিলার কথা শুনেই অপূর্ব সেই দিকে তাকালো। আধো আলো, আধো অন্ধকারে অবশ্য চেহারা ঠিকঠাক বোঝা যায় না। তবুও অপূর্ব সোফায় গা এলিয়ে চাচার পেছন দিয়ে ঠিক তাকিয়ে দেখল।
তখন ধাক্কায় পড়ে নাবিলা হয়তো তার দিকেই তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছিল, কে। আর সে ঝট করে ঝুঁকে নিচু হয়েছে। অন্ধকারে অনুমানটা ঠিক করতে পারেনি। ব্যস, দুজনের মুখ বরাবর হয়ে গেছে। আর বরাবর হলে কি হয় সেটা আর বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এমন অবস্থা যে কোনো ছেলে মেয়ের জন্যই অস্বস্তিকর। তাও যদি সম্পর্কে হয় বোন। আর বোন, এটাই তার জন্য সবচেয়ে বড় জটকা পটকা কারণ হয়ে গেছে। 
অবশ্য জড়তা, সংকোচ, অস্বস্তি, জটকা পটকা সবই বলতে গেলে তার কম। তবে এই মেয়ের হাবভাব অনুমান করতে পারে নি। কিন্তু তার দিকে মেয়েটা ভুলে একবারও তাকায়নি। নোভার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে শুধু বলেছে,
-- অন্ধকার তো, বুঝতে পারিনি, পড়ে গেছি।
নোভা উত্তর দেয়নি। হঠাৎ অন্ধকারে সে নিজেই ভয় পেয়ে গেছে, আর আপা তো আরেক নমুনা। পড়ে যাওয়া বড় কথা না! তাই বিরক্ত সুরে বলল, -- আইপিএসে কি হলো?
-- জানি না। 
-- এখন করবটা কি? 
-- নাবিলা উত্তর দিল না। নিজের মতো নিজের রুমের দিকে এগিয়ে গেল। নোভা দেখে তার মতোই বলল,-- আপা অন্ধকারে পড়েছে, আপনার কাহিনি কি?
অপূর্বও নিজের মতো বলল, -- নাথিং। আমিতো আমার জুতো জায়গামতো রাখতে এসেছিলাম। বলেই ছিটকে পড়া দুই কোণা থেকে দুই জুতা এক করে শু র্যাকে রাখল।
-- না থাকলে তো ভালোই। তবে আপনি আমার বোনের জন্য কুফা। বাড়িতে যখন থেকে পা রেখেছেন, আপা এখানে ওখানে শুধু ধপাস ধপাস করে পড়ছে। 
অপূর্ব তখন হেসে ফেললো ! হেসেই ঐ যে সাদা পর্দার আড়ালে রুমটা, সেটার দিকে আরেকবার তাকালো।
সেই পর্দা ভেদ করে অবশ্য আর বেরই হয়নি। বেরিয়েছে একেবারে খাবারের সময়। তখন সব স্বাভাবিকই দেখল। সবাই ভাত মাছ খেল, আর সে খেল দুধে ভেজানো পাউয়ারুটি।
আসমানি খালা হাজার বলল, -- সারাদিন না খাওয়া! পেটে তো ভাতের এক দানাও নাই। শরীরে আসল শক্তি হলো ভাত। আসো, ডাল দিয়ে চেঁচকিয়ে দুটো ভাত খাইয়ে দিই, এই ডাল ভাতে দাঁতের কিছু হইত না, আসমানির গ্যারান্টি।
সে শুনে সব সময়ে মতো হালকা হাসল। হেসে নিজের মতো খেল। এর মাঝে বাবা, ছেলে ফেরার খুশিতে আহ্লাদে জিজ্ঞেস করল,-- নাবিলা, অপূর্বর সাথে পরিচয় হয়েছে?
তাদের যেই পরিচয় হয়েছে, ফাস্ট মিটিংয়ে এমন পরিচয় কারো হয়েছে বলে মনে পড়ে না। তবে এই মেয়ে হেসে খুব স্বাভাবিকভাবে মাথা নাড়ল। যেন ফুলের তোড়া টোড়া সম্ভাষন ওয়ালা পরিচয় হয়েছে। তবে একবারের জন্যও তার দিকে চোখ তুলল না। তার সাইড বাদে সবই করল খুব খুব স্বাভাবিক ভাবে। কিন্তু কেন? আশ্চর্য! এমন আজব কিছিমের মেয়ে তো, জীবনে দেখেছে বলে মনে পড়ে না। 
আর এই যে এখনো তাই করলো। তার দিকে একটুর জন্যও চোখ ফেরালো না। শুধু বাবার দিকে তাকিয়ে, বাবার উদ্দেশ্য হালকা হেসে মাথা নাড়ল। নেড়ে মায়ের রুমের দিকে গেল। আর সেই যাওয়ার দিকে অপূর্ব অন্ধকারের মাঝেও এক পলকে তাকিয়ে রইল। 
রোকেয়া কপালে হাত, চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছেন। নাবিলা এক পলক তাকিয়ে চোখ ফিরিয়ে নিজের মতো কাপড়গুলো কাবার্ডে গুছিয়ে রাখল। বাবা ফিরে কাপড় ছেড়ে এখানে ওখানে ছড়িয়ে রেখেছেন। সেগুলো ক্লথ স্ট্যান্ডে গুছিয়ে রাখতে লাগল।
রোকেয়া যেভাবে ছিলেন, সেভাবেই চোখ বন্ধ করে বলল,-- খালিদের সাথে কি তোর কোনো যোগাযোগ আছে?
নাবিলা উত্তর দিল না। রোকেয়া উত্তর না পেয়ে উঠে বসল। হাজার রাগের মাঝেও এই মেয়েটার ওপর তিনি রাগ দেখাতে পারেন না। তাই উঠে শান্তভাবেই বলল,-- কথা বললে কথার উত্তর দিস না কেন?
-- ইচ্ছে করে না।
-- কেন?
-- এমনিই।
-- আমার উচিত তোকে ঠাসঠাস করে কতগুলো লাগানো। সময় মতো লাগাইনি, তার ফল এখন ভোগ করছি।
-- ভোগ করতে তো কাউকে বলিনি। আমাকে আমার মতো ছেড়ে দিলেই তো পারো। 
-- একবার দিয়েই তো ভুগছি! নিজের ওরজাত মা-ই বেইমান। সেখানে মেয়ের কাছে আর কী আশা করব?
নাবিলা ফিরে মায়ের কাছে এগিয়ে এলো। এসে দাঁড়ালো সোজা মায়ের মুখোমুখি। দাঁড়িয়ে আগের মতোই শান্ত ভাবে বলল,
-- নানুর কোনো দোষ নেই।
রোকেয়া তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। তবে মুখে আর একটা শব্দও উচ্চারণ করল না। মুখ খুললেই যে, তার মেয়েরই মরণ। মরতে মরতে একবার ফিরে এসেছে, আর কত?
তাই আগের মতোই আবার শুয়ে পড়ল। নাবিলা কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর কিচেন দিকে এগিয়ে গেল।
ফ্রিজে ফ্রিজিং নাগেট, সমোচা ছিল। সেগুলো নিয়ে ভাজল, বরফ কুচি মিশিয়ে ঠান্ডা শরবত করল। তারপর সুন্দর মতো গুছিয়ে ড্রয়িংরুমে এলো।
ততক্ষণে অপূর্ব তার ল্যাপটপ খুলে বসেছে। সবাই উপুর হয়ে সেখানেই তাকিয়ে আছে। নাবিলা আস্তে করে টি-টেবিলে রেখে ফিরে যাবে, তখনই অপূর্ব বলল,-- নাবিলা।
নাবিলা সাথে সাথে ফিরল। তবে চোখ তুলে অপূর্ব দিকে তাকাল না। সে তাকিয়ে রইল, ঐ যে ল্যাপটপটা সেখানে। অপূর্ব সেই নিচু চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, -- চাইলে বসতে পারো।
নোভা সাথে সাথে সুর মেলাল, -- হ্যাঁ, বসো না আপা। এমনিতেও তো এখন ঘুমাবে না। অন্ধকারে রুমে একা একা বসে করবে টা কি?
নাবিলা কথা বাড়াল না। বরং স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে এলো। ল্যাপটপের সামনে সবাই ঝুঁকে বসে আছে। সে গিয়ে বসল বাবার পাশে গা ঘেঁষে।
অপূর্ব ল্যাপটপটা আরেকটু ঐ দিকে ঠেলে নিজে সোজা হয়ে বসল। নিজের ল্যাপটপের ছবি, নতুন করে দেখার কিছু নেই। সে দেখল, ঐ যে ল্যাপটপের দিকে দুটো ক্লান্ত চোখ, যেই চোখ দুটো। যেই চোখ দুটো কোনো কারণে তার দিকে ফিরে তাকাচ্ছে না। মানছে একটা ইন্সিডেন্ট হয়েছে, অস্বস্তি কাজ করতে পারে। তবে চোখ মুখ পুরো স্বাভাবিক রেখে, চোখ তুলে না তাকানোর মানেটা কি?
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন