ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমায় দিও একটু খানি ছুয়ে

৪র্থ পর্ব

লেখক: মিমি মুসকান

আমায়_দিও_একটুখানি_ছুঁয়ে 🌺

মিমি_মুসকান ( লেখনিতে )
পর্ব_৪
অনুষ্ঠান শেষ হতে হতে বিকাল পেরিয়ে গেলো। অন্তু আর অদিতি নিজের ডিপার্টমেন্ট থেকে বেরিয়ে এদিক ওদিক ঘুরে ঘুরে পুরো ক্যাম্পাস দেখে নিচ্ছে। হাতে তাদের ফুলের তোড়া আর কিছু উপহার যা কিছুক্ষণ আগেই ডিপার্টমেন্ট থেকে পেয়েছে। ক্যাম্পাসে প্রথম প্রথম পা রেখেই এদের মন উচ্ছ্বাসে ভরে গেল। চোখে হাজারো স্বপ্ন। এখন থেকে নতুন গন্তব্য শুরু তাদের। নতুন পথচলা। গোটা চার বছর একসাথে পার করার, কতো কতো স্মৃতি জমা হবে তাদের। এসব ভাবনা চিন্তার মধ্যেই অদিতি হঠাৎ লাফিয়ে উঠল। ক্যাম্পাস সেই কখন থেকে ফাঁকা ফাঁকা দেখে সন্দেহ হচ্ছিল। অতঃপর এখন তার মনে পড়ল, ভার্সিটি বাস তো চলে গেছে। কথাটা অন্তুর কাছে বলতেই তার চোখ মুখের রঙ উবে গেল। অদিতি আমতা আমতা করে বলল,
“তোমার কি হয়েছে?” 
“তুমি কি বললে? বাস চলে গেছে? সত্যিই চলে গেছে।”
“হ্যাঁ, কেন? তোমার বাসা না ঢাকায়।”
অন্তু সেখানে আর এক মূহুর্ত না দাঁড়িয়ে ছুটে এলো ভার্সিটি গেইটের সামনে। দাড়োয়ান মামা তখন গেটে তালা দিচ্ছে। তার পিছন পিছন অদিতিও ছুটে এলো। অন্তু হাঁপাতে হাঁপাতে মামা কে জিজ্ঞেস করল, 
“মামা, বাস কি চলে গেছে।”
“হ মামা। এই তো একটু আগে গেল। কেন? বাস কি মিস করে ফেলছো?” 
অন্তু মাথায় হাত। অদিতি তার পিছন পিছন ছুটে এসে বলল, কি ব্যাপার এমন ছুটলে কেন? কি হয়েছে?”
“আমি বাস মিস করেছি।
“সেটা তো আমিও করেছি। 
“আরে আমি তো ঢাকা শহরের কিছু চিনি না। এখন কি হবে? 
“ওমা? তুমি না ঢাকায় থাকো। কিছু চিনো না মানে!” 
অন্তু স্ত*ব্ধ হলো। অদিতির পানে তাকিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। সে ঢাকায় থাকে কিন্তু নতুন এসেছে। সবে কিছুদিন হলো ঢাকায় এসেছে। খুলনায় তারা স্থানীয় ছিল কিন্তু সেখানে বাড়ি বিক্রি করে আপাতত ঢাকা এসেছে। তাই ঢাকার রাস্তাঘাট সম্পর্কে তার কোনো ধারণা নেই। এ কথা শুনতেই অদিতির মাথায় হাত।
“এই মেয়ে বলো কি তুমি? আমায় তো এই কথা বলোনি। আমি আরো ভাবলাম তুমি ঢাকায় থাকো তাহলে সবকিছু চিনো। হায় হায় এখন কি হবে? আমার বাসা তো এই কাছে। হোস্টেলে উঠেছি, ১০ মিনিটের পথ। হেঁটেই যাওয়া যায় বলে বাস নিয়ে কোনো মাথাব্যথা ছিল না কিন্তু এখন?” 
অন্তু বুঝল অদিতি তাকে নিয়ে ভীষণ দু*শ্চিন্তা করছে। সে তাকে সান্ত্বনা দিয়েই বলল, “আরে আরে এতো ভেবো না, আমি এখান থেকে একটা রিক্সা করে চলে যাব।”
“সত্যি বলছো? অসুবিধে হবে না তোমার?” 
অন্তু শান্ত হবার চেষ্টা করল। মুখে মলিন হেসে বলল, না না। তুমি বাসায় চলে যাও। আমিও এখান থেকে একটা রিক্সা নিয়ে চলে যাব। বাস থাকলে একটু সুবিধা হতো। দ্রুত পৌঁছে যেতাম। কিন্তু রিক্সায় একটু সময় লাগবে এই আর কি!” 
“তাহলে কোনো অসুবিধে নেই বলছো?” 
“হ্যাঁ,একদম। তুমি যাও অদিতি। আমি যেতে পারব!” 
হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো অদিতি। অন্তুকে বিদায় দিয়ে সেও হাঁটা ধরল বাসার পথে। অদিতি যাওয়া অবধি তো সব ঠিক ছিল কিন্তু অন্ত এখন পড়ল বি*পদে। তার বাসা দূরে হওয়ায় কোনো রিক্সাই যেতে রাজি হচ্ছে না। তার সবাই বলছে মেইন রোড অবধি দিয়ে আসতে পারবে। এরপর সেখান থেকে অন্য‌‌ রিক্সা নিতে হবে। এসব ঝামেলার কথা শুনেই অন্তুর চোখ মুখ শুকিয়ে গেল। কি বিপদে পড়ল এবার সে। এখন কি করবে? মামা কে কল করবে? ড্রাইভার মামাকে বলেছিলো ভার্সিটি বাসে করেই চলে যাবে। তাই গাড়ি ঠিক করে আর এদিকে না আসতে। কিন্তু এখন? এখন মনে হচ্ছে অনেক বড় বি*পদে পড়ে গেছে সে। ভ*য়ে এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখছে। এরই মধ্যে দাঁড়োয়ান মামার নজরেও এসে গেছে সে। মামা একটু বাদে বাদে তার দিকে নজর দিচ্ছে। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে যাচ্ছে। এখন রওনা না দিলে শেষে অন্ধকার। অচেনা ঢাকা শহরে রাতের আঁধারে কোথায় কোথায় ঘুরবে সে। 
অতঃপর একজন রিক্সাওয়ালা বলল, সামনের থেকে বাস নিতে। তাও আবার সেই বাস গুলিস্তান গিয়ে বদলাতে হবে। এই কথা শুনতে পেয়েই অন্তুর চোখে মুখে হতাশা ছড়িয়ে পড়ল। গুলিস্তান তার কাছে খুব জ*টলা পূর্ণ একটা জায়গা। সেখানে গিয়ে আরো বিপাকে পড়বে সে। মামাকে কল করে আসতে বললেও তো অনেক সময় লেগে যাবে। কিন্তু উপায়ান্তর না পেয়ে এবার মামাকেই কল করল। ফোন বাজল। এক বার, দু বার,‌তিনবার অতঃপর কেটে গেল। মামা ফোনটা তুলল না। অন্তুর ভীষণ মন খারাপ করল । কান্না পাচ্ছে। এখন কোথায় যাবে সে? 
আচমকা মনে পড়ল তুহিন ভাইয়ের কথা। ফোন করবে তাকে? তুহিন ভাইয়ের নাম্বার কি তার কাছে আছে? আছে বোধহয়। অন্তু ফোন লিস্ট খুঁজে খুঁজে নাম্বার বের করল। চেক করে দেখল লাস্ট কল দিয়েছিলো ২ বছর আগে। এটা দেখেই শুকনো ঢোক গিলল সে। এই নাম্বার এখনো আছে তো ভাইয়ের কাছে? 
ফোন দিল। ফোন বাজছে দেখে তার বুক ধুকপুক শুরু করে দিল। দু বার বাজতেই সে নিজে ফোন কেটে দিল। তার সাহস হচ্ছে না তুহিন ভাইয়ের সাথে কলে কথা বলার। এতো ভ*য় লাগছে তার। অবশেষে অস**হায় অন্তু আবারো এসে দাঁড়াল ভার্সিটির সামনে। হঠাৎ দেখল একজোড়া চোখ তার দিকেই ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। এই চোখ সে চিনে। চোখজোড়া দেখেই ভ*য়ে চমকে উঠল। নিহাম! শাহরিয়ার নিহাম! 
সে কথা বলছে দাঁড়োয়ান মামার সাথে। মামা আঙুল তুলে তাকেই দেখাচ্ছে। নিশ্চিত তাকে নিয়েই কথা বলছে। কথাবলা শেষে নিহাম এদিক পা বাড়াল। তার পা বাড়ানো দেখে অন্তু চোখের চশমা ঠিক করে জড়োসড়ো করে দাঁড়াল। নিহাম তার কাছে এসেই থেমে গেল। শান্ত ভঙ্গিতে বলল, 
“তুমি বাস মিস করেছো?” 
অন্তু একবার চোখ তুলে তাকাল। নিহামের শান্ত দৃষ্টি জোড়া তাকে ভ*য় দেখাচ্ছে না। কেমন আশ্বাসের আভাস দিচ্ছে। একটু শান্ত হলো। মাথা নেড়ে বলল, হ্যাঁ।
“কোথায় যাবে তুমি?” 
“লালবাগ!” 
“লালবাগ কোথায়?”
“মির্জাবাড়ি!” 
“ওহ!” 
নিহাম এরকম ভাবে বলল যেন মির্জাবাড়ি সে চিনে। অন্তু ঠোঁট কামড়ে এদিক ফিরে তাকাল। নিহাম সামনের রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে। অন্তু ঠোঁট কামড়ে তাকে দেখছে। কানের কাছে চুলগুলো বাতাসে দোল খাচ্ছে। সে ঢোক গিলে বলল, “আসো আমার সাথে!” 
কোথায় যাব জিজ্ঞেস করার আগেই নিহাম হাঁটা ধরলো। অন্তু এদিক ওদিক ফিরে উপায়ান্তর না পেয়ে তার পিছন পিছন হাঁটা ধরলো। ব্যাগ খাম*চে ধরে হাঁটছে তার পিছন পিছন। দুজন হাঁটছে মাঝরাস্তার পাশ দিয়ে। অন্তুর মাথায় ততোক্ষণে গোলমাল পাকিয়ে গেছে। সে কোথায় যাচ্ছে? নিহামকে সে কি চিনে? না চিনে না। আজ একদিনের পরিচয়ে কেনই বা তার পিছন পিছন যাচ্ছে সে। এটা কি ঠিক হচ্ছে? মাথায় হাজারো চিন্তা। হাঁটার সময় তাই সামনে পিছন না তাকিয়ে মাথা তুলে তাকিয়ে আছে নিহামের দিকে। কথা জিজ্ঞেস করার আগেই কথা ভুলে যাচ্ছে। এরই আচমকা নিহাম তার বাহু আঁকড়ে ধরে ডানপাশ ছেড়ে ছিট*কে টেনে তার কাছে এনে দাঁড় করাল। 
অন্তু হতভম্ব! তার স্তব্ধ চাহনি সামনের দিকে। চোখ বড় বড় করে সামনে চেয়ে আছে হা করে। নিহামের শার্টের কলারের কাছে দুটো খোলা বোতামে‌ তার বক্ষ ভাঁজের আধো আধো ছায়া দেখতে পাচ্ছে। হুশ ফেরেনি তখনো। নিহাম মাথা নিচু করে এদিক ফিরে ধম*কে উঠল। বলল, 
“চোখে দেখো না। পিছনে বাইক আসছে শুনতে পাও নি। আর হা করে চেয়ে আছো কি? আর ওটাও একটা রাস*কেল। মাঝরাস্তা ছেড়ে এদিক এসেছে মর*তে। দেখি এপাশে হাটো আমার।” 
বলেই তাকে বামপাশে ছেড়ে দিল। অন্তু এখনো তার কল্পনা ছেড়ে বেরিয়ে আসতে পারছে না। মস্তিষ্ক কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে। নিহাম ছেড়ে দিয়েছে সেই কখন অথচ তার এখনো মনে হচ্ছে কেউ তার বাহু চেপে ধরে আছে। নিহাম ততোক্ষণে কয়েক পা এগিয়ে গেছে। অন্তুকে পিছন পিছন না আসতে দেখে পিছন ফিরে বলল,‌ “কি হলো?” 
অন্তু হুঁশ ফিরল। নিহাম তাকে ছেড়েই অনেকদূর চলে গেছে। অন্তু এবার ব্যাগ আঁকড়ে ধরে ছুটতে লাগল। ছুটতে ছুটতে তার পাশে এসে দাঁড়াল। নিহাম আবারো হাঁটা শুরু করে বলল, “কোথায় হারিয়ে যাও বার বার? রাস্তাঘাটে হাঁটার সময় এতো কি ভাবো?” 
অন্তু অপ”রাধীর ন্যায় মাথা নিচু করে নিল। জবাব দিলো না। হাঁটতে হাঁটতে মেইন রোড পেরিয়ে তারা এসে দাঁড়াল বাস স্ট্যান্ডের কাছে। অন্তু সাহস জুগিয়ে এখন জিজ্ঞেস করল, “আপনি মির্জা বাড়ি চিনেন?” 
নিহাম ভ্রু কুঁচকে তাকাল। তার চাহনিতে অন্তু উচানো গলা নিমিয়ে গেল। নিহাম শান্ত গলায় শুধাল, “লালাবাগে মির্জা বাড়ি তো একটাই!” 
অন্তু মাথা দুলাল। সে আদৌও জানত না ওদিকে মির্জাবাড়ি একটাই আছে। তার মানে নিহাম চিনে। নিহাম আবারো বলল, জারুল গাছ আছে না বাড়ির সামনে? 
অন্তু চট করে বলল, আমগাছ ও আছে!” 
নিহাম মাথা দুলাল। অন্তু এবার শতভাগ নিশ্চিত হলো। কিন্তু নিহাম কিভাবে চিনে মির্জা বাড়ি? সেও কি ওখানে থাকে? 
নিহাম সামনে বাস স্ট্যান্ডের দিকে তাকিয়ে আছে। অন্তু চেয়ে দেখল তাদের আশেপাশে তেমন মানুষ নেই। পিছনে একজন হকার বসে আছে আর সামনে তারা দু'জনেই। বাবা বলেছিলেন অচেনা কারো সঙ্গে না বলতে না। অথচ একজন অচেনা ব্যক্তির সঙ্গে হাঁটতে হাঁটতে সে এতো দূর চলে এলো। এখন কি বাসেও চলবে নাকি। একটু ভ*য় ভ*য় লাগছে। যদি তাকে ধরে পাচা*র করে দেয়। মাথার মধ্যে অসংখ্য কথা গিজগিজ করছে। এরই মধ্যে একটা বাস এসে থামল তাদের সামনে। হেল্পার মামা এসেই, গুলিস্তান, গুলিস্তান বলে চেঁচিয়ে যাচ্ছে। নিহাম ইশারা করল তার দিকে। অন্তু শক্ত মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছে। এক পা ও আগাচ্ছে না। 
নিহাম বলে উঠলো, “কি‌ হলো যাচ্ছ না কেন?” 
অন্তু জবাব দিলো না। প্রশ্নসূচক চাহনিতে তাকিয়ে রইল। নিহাম বলল, তোমার কি ভ*য় করছে আমার সাথে যেতে? 
অন্তু দ্রুত মাথা নাড়ল। সে আবারো বলল, তাহলে?” অন্তু মাথা নিচু করে পায়ের দিকে‌ চেয়ে রইল। নিহাম শব্দ করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল, দেখো, তোমাকে নিয়ে সিএনজি করে দেয় যেতে পারতাম। কিন্তু আমার মনে হয় না রিক্সা বা সিএনজি কোনোটাতে তুমি কমফোর্টেবল ফিল করতে। তাই বাসে করে নিয়ে যাচ্ছি। যাবে না?” 
অন্তু এখনো দাঁড়িয়ে। নিহাম এবার একটু ধম*কে বলল, উঠো বলছি।
অন্তু ভ*য় পেয়ে ছুটে এলো। বাসের ভেতর উঠে চারদিক চোখ বুলিয়ে আবারো ঘুরে তাকাল। নামবার জন্য পা বাড়াতেই নিহাম বলল, কি হয়েছে? 
“বাস খালি।”
“খালি তো কি হয়েছে?” 
অন্তু দুই হাতে ব্যাগ চেপে বলল, আমি বাসে যাবো না। 
নিহাম তার কথা শুনেও না শোনার ভান করে বাসে উঠে পড়ল। তার সামনেই দাঁড়ানো অন্তু। এই মূহুর্তে ড্রাইভার মামা বাস স্টার্ট দিয়ে দিলেন। চলন্ত বাসে অন্তু ছিটকে এসে পড়ল নিহামের বুকের উপর। চোখ মুখ খিচে রইল। হাত খা*মচে ধরে নিহামের শার্ট। নিহাম জোরে বলল, মামা বসতে তো দেন। এতো কিসের তাড়া আপনাদের? 
অন্তু চোখের চশমা ঠিক করে নিহামের দিকে তাকাল। নিহাম বলে উঠলো, “তোমাকে নিয়ে পা*চার করে দিব। এরপর তোমার মামার কাছে অনেক টাকা চাইব। মির্জা বাড়ির লোকজন অনেক বড়লোক তাই না! 
অন্তু নাক মুখ ফুলিয়ে তাকিয়ে রইল। এই লোককে এতোক্ষণ ভালো ভাবছিলো সে? এই লোক তো খুব শে*য়ানা। 
“কি বললেন আপনি?” 
নিহাম জবাব না দিয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসল। তাকে ধরে মেয়েদের সিটে বসিয়ে বলল, “এতো বড়লোক হয়ে কি লাভ। তোমাকে তো কিছু খেতে দেয় না। শরীরে এতো টুকু মাংস নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করবে কি করে?” 
“আমার মাংস নিয়ে আপনি কি করবেন? খা*বেন নাকি?”
নিহাম এবারো জবাব না দিয়ে মৃদু হাসে। অতঃপর তার সামনের একটা খালি সিটে বসে পড়ে। অন্তু নিজের সিটে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে থাকার পর দেখল বাসে মানুষ উঠতে শুরু করেছে। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে সে। তখনি চোখাচোখি হলো নিহামের সাথে। নিহাম তাকে দেখেই হেসে ফেলল। অন্তু দ্রুত চোখ সরিয়ে নিল। লোকটা তাকে নিয়ে মজা করছে! কি সাং*ঘাতিক! 
এরই মধ্যে একজন বয়স্ক লোক বাসে উঠে এলো। তিনি এসেই বসলেন অন্তুর পাশে। অন্তু চোখমুখ কুঁচকে বলল, এটা তো মেয়েদের সিট আপনি বসলেন কেন? 
লোকটা অন্তুর দিকে একবার তাকিয়ে পাত্তা না দিয়ে নিজের ফোন বের করল। অন্তু চোখ মুখ কুঁচকে দ্বিতীয় দফায় কিছু বলতে যাবে তার আগেই নিহাম ডেকে উঠল। বলল, 
“এদিকে আসো!” 
অন্তু ফিরে চাইল। নিহাম উঠে দাঁড়িয়ে তার পাশের সিটে অন্তুকে বসতে বলছে। তখন এই বয়স্ক লোকটার চাইতেও নিহামের প্রতি অন্তুর বিশ্বাস শতগুণ বেশি। দ্বিতীয় কোনো চিন্তা না করেই সে এসে বসল নিহামের পাশে। গুটিসুটি মেরে বসে রইল যাতে গা ঘসাঘসি না হয়। বাস চলতে শুরু করল এবার। 
অন্তু জানালার পাশে বসে বাইরের দিকে চেয়ে রইল। মাথায় তখনো কোনো চিন্তা এসে ভর করেনি। নিহামের ব্যাপারে তখন একটা পজিটিভ দিকই বার বার ঘুরপাক খাচ্ছিল তার মাথায়। সেটা হলো, লোকটা ভালো! 
এরই মধ্যে নিহাম আবারো শুধায়, নাম কি তোমার? 
অন্তু চমকে উঠে। আশ্চর্য সে অন্তুর নাম না জেনেই এতো সাহায্য করছিলো। কেন? ডিপার্টমেন্টের সিনিয়র বলে কেবল। 
“অন্তিকা কবীর।”
“সুন্দর নাম। আমার নাম জানো তো?” 
অন্তু মাথা নাড়ল। নিহাম বলল, গুড। ডিপার্টমেন্টের সিনিয়রদের নাম জানা খুব দরকার। ছেলে মেয়ে সবার নাম জেনে রাখবে আর তাদের দেখলেই সালাম দিবে।”
“কেন?” 
“কেন সেটা কালই জানতে পারবে। ক্লাস আছে না কাল। সিনিয়রাই বলে দিবে।”
অন্তু চুপসে গিয়ে দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। একটু আগেই ক্লাসে এই কথাই চলছিলো। সিনিয়ররা কাল ক্লাস নিবে। অন্তুর মাথায় ঢুকছে না তারা কেন ক্লাস নিবে? তারা ক্লাস নেবার কে? স্যাররা ছাড়া তারা ক্লাসে এসে কি বলবে? অনেকেই বলছিলো অনেক কিছু। রুলস রেগুলেশন শিখাবে। ভার্সিটিতে থাকতে হলে সবাইকে শিখতে হবে। কে জানে কাল কি আছে তার কপালে। 
নিহাম আবারো বলল, ভেবো না র্্যা”গ দিবে না।
র্্যাগে”র কথা শুনেই অন্তু ঘাবড়ে গেল। নিহাম বলে উঠলো, প্রথম প্রথম তো। একটু জ্বালাবে””। কিছুদিন দিন পর এদের আর দেখতে পারবে না। পড়াশোনা নিয়ে সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়বে।” 
অন্তু মাথা দুলাল। বলল, “আপনিও জ্বালা*বেন?”
“আমি কি জ্বালা*বো? তুমিই তো আমায় জ্বালা*চ্ছো! বাসা আমার কোথায় আর তোমার জন্য কোথায় যেতে হচ্ছে? 
অন্তুর বলতে ইচ্ছে করল, তো আমি তো আপনাকে আসতে বলিনি। আপনি এলেন কেন? কিন্তু বলল, সরি! 
“সরি বললেই কি হয়ে যাবে।
“তাহলে আর কি করব? 
“ভাবো, তুমি আর কি করতে পারো।
অন্তু চোখ মুখ কুঁচকে নিল। এখন তার মাথায় ঘুরছে, না নিহাম ছেলেটা ওতোও ভালো না। লোকটা হাড়ে হাড়ে ব”জ্জাত।
“আচ্ছা রাস্তাঘাট তো কিছু চিনো না, কাল ভার্সিটিতে আসবে কি করে?” 
“গাড়ি করে।”
“তোমার নিজের গাড়ি?”
অন্তু মাথা নাড়ল। 
“তাহলে গাড়ি আজ কোথায়?” 
“আসার সময় ন*ষ্ট হয়ে গেছিল, তাই ঠিক করতে পাঠিয়েছি।”
“ওহ, ভালোই বড়লোক তুমি। বড়লোকেদের বাসে চড়তে অনেক অসুবিধে হয়। তোমার হচ্ছে না তো!”
অন্তুর ফের মনে হলো, লোকটা তাকে নিয়ে উপহাস করছে। মাথায় ফের ঘুরপাক খাচ্ছে, লোকটা হাড়ে হাড়ে শয়*তান। 
এরই মধ্যে গাড়ির ঝাঁকুনি খেয়ে অন্তু জানালার সাথে বা*ড়ি খেতে গেল। নিহাম তৎক্ষণাৎ তার মাথায় হাত দিয়ে বলল, “দেখলে তো, ঠিক বলেছি আমি।”
অন্তু লজ্জা পেয়ে গেল। আর একটাও কথা বাড়াল না সে।
বাস এসে থামল গুলিস্তানে। নিহাম আর অন্তু নেমে পড়ল। অন্তু এদিক সেদিক তাকিয়ে নিহামের দিকে ফিরতেই সে বলল, এই পিচ্চি মেয়ে। আবার হারিয়ে যেও না এখানে। আমার সাথে সাথে থাকো।
অন্তু নাক উঁচিয়ে বলল, আমি পিচ্চি না।
“পিচ্চি নয়তো কি? ফিডার খাওয়া বাচ্চা তুমি। গাড়ি পাও নি বলে ভার্সিটির সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছিলে।
“মিথ্যে বলবেন না। আমি একদম কাঁদিনি।
“দেখেছি আমি।
“আপনি বানিয়ে বানিয়ে কেন এসব বলছেন বলুন তো।
চলতে চলতে কথা বলছিলো তারা। আচমকা নিহাম তার দিকে ফিরে তাকাতেই। অন্তু তৎক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। নিহাম বলল, দেখো, গাড়ি এসে সবসময় এদিকে থামবে। তোমার এদিক থেকে রাস্তা পেরিয়ে ওদিক যেতে হবে। এরপর ৫ মিনিট ধরে হাঁটলে সেখান থেকে লালবাগের গাড়ি পাবে। চিনে নাও বুঝলে। তোমায় চিনিয়ে দিচ্ছি। বড়লোকের মেয়ে তুমি, গাড়ি ন”ষ্ট হয়ে কান্নাকাটি না করে একা একা বাড়ি চলে যাবে। পারবে না?”
উপ*হাস! আবারো উপ*হাস করছে লোকটা। অন্তু নাক মুখ ফুলিয়ে বলল, “এভাবে কেন বলছেন আপনি বারবার? আমি কতো বড়লোক?”
“অনেক বড়লোক।”
“আপনি জানেন কিভাবে?” 
“জানি আমি। আসো ঝগড়া না করে গাড়িতে উঠতে হবে। মাঝরাস্তায় দাঁড়িয়ে সিনিয়রের সাথে ঝগড়া করছো?” 
“আমি কিছু করিনি। আপনিই তো..
কিছু বলার আগেই নিহাম তার হাত টেনে ধরল। আবারো তাড়া চড়ল গাড়িতে। এবার সময় লাগল না বেশিক্ষণ। অন্তু এতোটাই রে*গে গেল যে কোনো কথাই বলল না বাসের মধ্যে। নিহাম নিজেও ফোনে ব্যস্ত ছিল। লালবাগ আসতেই নেমে গেল তারা। অন্তু নেমে নিহামকে দেখে খানিকটা হক*চকিয়ে গেল। এই লোক এবার তার সাথে বাড়ি অবধি যাবে নাকি? 
দুজনে হাঁটছে রাস্তার পাশ দিয়ে। নিহাম ফোন টিপতে টিপতে হাঁটছে। অন্তু একটু হাঁটছে আবারো তার দিকে ফিরে তাকাচ্ছে। এই লোক তার সাথে বাসায় গেলে বাড়ির সবাইকে কি বলবে সে? ভাবনায় পড়ে গেল। মামাও তো বাসায় থাকবেন। যদি জিজ্ঞেস করে? তখন..
হঠাৎ নিহাম বলে উঠলো, “ফোন বাজছে তোমার!”
“হ্যাঁ?”
“তোমার ফোন বাজছে!” 
অন্তু হকচকিয়ে উঠল। সত্যিই তো তার ফোন বাজছে। সাইলেন্ট মুডে ছিল বলে খবরই ছিলো না কোনো। মামার কল! ২০ টা মিসকল দেখে তার আ*ত্মা শুকিয়ে গেল। ফোন বাজছে আবারো। অন্তু এবার চট করে ফোন তুলে ফেলল। মামা বললেন, “কোথায় তুই? ফোন ধরছিলি না কেন?”
“সাইলেন্ট ছিলো মামা। শুনতে পাইনি। এই তো চলে এসেছি। বাড়ির সামনে। আমি আসছি।”
বলেই ফোন কেটে দিল। গোল গোল চশমার উপর ছায়া পড়ল দেয়ালের ফটকের। মির্জা বাড়ি নামটা জ্বল*জ্বল করছে। অন্তুর মাথায় হঠাৎ এলো, নিহাম বাড়িটা চিনল কি করে? আশ্চর্য! নিহাম তখন বাসে মামার কথাও তো বলল। সে কিভাবে জানল এটা তার মামা বাড়ি? আক*স্মিক চমকে উঠে নিহামের দিকে ঘুরে তাকাল অন্তু। নিহাম ফোনটা পকেটে ঢুকিয়ে সহজ গলায় বলল, 
“ভেতরে গিয়ে তুহিন কে আসতে বলো। বলবে নিহাম নিচে দাঁড়িয়ে আছে বুঝলে!”
অন্তুর মাথায় আসমান ভে*ঙ্গে পড়ল। কিহহ! তাহলে তারা চিনে একে অপরকে।‌ তুহিন ভাইকে চিনত বলেই এই মির্জাবাড়ি আর তাকেও… হত*বাক নয়নে চেয়ে রইল অন্তু! 
#চলবে….

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন