আমায়_দিও_একটুখানি_ছুঁয়ে 🌺
পর্ব_২৮
মিমি_মুসকান ( লেখনিতে )
ছাদের কিনারে একা দাঁড়িয়ে অন্তু। এ বাড়ির ছাদে তার তেমন একটা আসা যাওয়া নেই। তাদের আগের বাড়িতে আবার যাওয়া আসা ছিল ঘনঘন। ছাদে দোলনা ছিল, বাগানের একপাশ ভর্তি ছিল বাহারি ফুলের গাছ। ছাদে এলেই বেলী ফুলের গন্ধে চারদিক মৌ মৌ করত। একেক বাড়ির সৌন্দর্য আবার একেক রকম। মির্জা বাড়ির পেছন দিকে বিরাট খালি জায়গা রয়েছে। সবুজ ঘাস বিছানো যেন জমিতে। সেখানে একটুকরো বাগান বিলাস। উঁচু দেয়াল দিয়ে ঘেরাও করা চারদিক। শেষ দিকের দেয়াল জুড়ে বাগানবিলাস। এজন্য বোধহয় ছাদটা ফাঁকা ফাঁকা। তবে পরিষ্কার। এখানে এসে দাঁড়ালে ঠান্ডা বাতাসে শরীর শীতল হয়ে উঠে। তবুও দাঁড়িয়ে থাকতে ইচ্ছে করে। অন্তু উড়না পেঁচিয়ে দাঁড়িয়ে রইল সেখানেই। একের পর এক বাতাস এসে তার শরীর এলিয়ে দিচ্ছে। চুলগুলো করে দিচ্ছে এলোমেলো। সোনালী নিভো নিভো আলোয় তার মুখে স্পষ্ট বিষাদের ছাপ দেখা যায় কৌশলে।
বাইকের আওয়াজ কানে আসতেই মস্তিস্ক সজাগ হয়ে উঠল।চোখ দুটো চঞ্চল হয়ে উঠল। বুকটা হুট করে টিপ টিপ করছে। ধকধক হৃৎস্পন্দনে শরীর কেঁপে উঠছে। কিসের জাগান দিচ্ছে তারা।
তুহিন বাইক পার্ক করে ঘরে ঢুকেই মতি মিয়ার সঙ্গে দেখা। তাকে জিজ্ঞেস করল, অন্তু কোথায়?
মতি মিয়া মাথা নাড়ল। তুহিন এবার একটু জোরেই জিজ্ঞেস করল, অন্তু কোথায়?
“ওহ আপামনি। আপামনি ছাদে।"
তুহিন বাইকের হেলমেট হাত থেকে ছুঁড়ে সোফায় ফেলে সিঁড়ি বেয়ে উপরে চলল। রহিমা খালা রান্নাঘর ছেড়ে উঁকি দিলেন। গত রাত থেকে তুহিন বাসায় নেই, এই কথাটা একমাত্র তিনিই জানেন।
ছাদে আসতে অল্প সময় লাগল। অন্তু স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে জুতোর শব্দ। শব্দটা তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে। জাগান দিচ্ছে সে কাছেই আসছে। বাতাস বয়ে চলল আরো জোরে। আচমকা বাতাসের মধ্যেই ঝড়ের গতিতে এসে হাজির এলো তুহিন। তার আভাস ঝড়ের চেয়েও তীব্র। কাছে আসা মাত্রই অন্তুর হাতটা হিচকে টেনে ধরে ফিরাল তার দিকে। অন্তু চমকালো না। সে বুঝি জানত তুহিন ভাই আসবেই।
সোনালী আলোর নিভো নিভো আলোয় দুজন দুজনকে দেখতে লাগল অনিমেষ। শীতল গলায় তুহিন বলে উঠল, “তুই রোহানকে দেখতে গেছিলি?"
“হ্যাঁ গেছিলাম।"
“কেন?"
“কেন? যেতে পারি না।"
বাহুতে সর্বস্ব জোর খাটিয়ে বলে উঠলো, "তুই কি বুঝতে পারছিস না? রোহান আমাকে নিচে নামানোর জন্য তোকে ব্যবহার করছে। ও যা করছে সব জেনেবুঝে করছে। এই কথাটা তোর মাথায় ঢুকে না। চশমা থেকেও কি চোখে দেখতে পাস না।”
অন্তুর তৎক্ষণাৎ হাত ছাড়িয়ে বলে উঠলো, "চশমা নিয়ে কিছু বলবেন না খবরদা*র।”
"তুই আমার মুখে তর্ক তর্ক করছিস?”
"আপনি শুরু করেছেন।”
"আমি করেছি।”
"তা নয়তো কি? সব আপনি শুরু করেছেন। সব দোষ আপনার। আপনি সত্যি করে বলুন, রোহান ভাইয়ের এ*ক্সিডেন্ট আপনার কারণে হয়েছে। আপনি করিয়েছেন? সত্যি করে বলুন আমায়। সবাই বলছে এ কথা, আপনি…
বাকি কথা বলার আগেই তুহিন তার দু গাল চেপে ধরল। ব্যাথায় ছটফ*ট করতে লাগল অন্তু। দু হাতে তার জামা আঁকড়ে ধরল। তুহিন দাঁতে দাঁত চেপে বলে উঠলো, “তোর মনে হয় আমি তোকে কৈফিয়ত দিব। তোর সাহস কতোবড় তুই আমায় জিজ্ঞেস করছিস? বেশি বড় হয়ে গেছিস?"
জলজল চোখে অন্তু চোখ নামিয়ে ফেলল। তুহিন তার গাল দুটো ছেড়ে দিল দুই পা পিছিয়ে গেল। হ্যাঁ এই ভয়*টাই সবসময় পায় সে। না চেয়েও বারবার রাগের কারণে অন্তুর উপর হাত তু*লে ফেলে। অথচ সে চায় না এমনটা। তবুও বার বার হয়ে যায়। কি করে হয়ে যায় সে জানে না। অন্তু ঠোঁট কামড়ে ধরল। কোনো জবাব না দিয়ে চলে যেতে নিতেই তুহিন তার হাত আটকে ধরে দাঁড়াল। শান্ত গলায় বলে উঠলো,
"রোহানের সঙ্গে আর কোনো ধরণের যোগাযোগ রাখবি না বুঝতে পারলি।”
অন্তু জবাব দিল না। তুহিন তাকে টেনে নিজের কাছে আনল। হাত ছাড়িয়ে বলল, "কি বললাম শুনতে পেলি?”
অন্তু তবুও জবাব দিলো না। তুহিন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। নিজের মাথা ঠান্ডা রাখার সব চেষ্টা তার ব্য*র্থ হয়ে উঠছে। ধ*মকে বলে উঠলো, “তোকে কি বললাম শুনতে পেলি?"
ভ*য়ে কেঁপে উঠল অন্তু। হাত ছাড়া পেয়ে সে ছুটে দরজার কাছে গেল। সেখান থেকে দাঁড়িয়ে হরহর করে বলতে লাগল, “পাইনি। আমার যা মন চায় আমি তাই করব। আপনার কোনো কথা শুনব না। বুঝতে পারলেন।"
“কি বললি? দাঁড়া ওখানে।"
অন্তু আর দাঁড়ায়। সে এক দৌড়ে ছুটে তার ঘরে চলে এসে দরজা ধপাস করে বন্ধ দিল। দরজার সামনে এসে দাঁড়াল তুহিন। দরজা বন্ধ করে সেখানেই ঠেসে দাঁড়িয়ে রইল অন্তু। তুহিন জানত অন্তু এখানেই, কিংবা বুঝতে পারল। সে দরজার কাছে দাঁড়িয়ে বলে উঠলো, “আমি বলে দিচ্ছি অন্তু। আমার কথা না শুনলে খুব খারাপ হয়ে যাবে। একদম বাড়াবাড়ি করবি না। নাহলে কিন্তু আমি কি করব আমি নিজেও জানি না।"
গাল ভেংচি কেটে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিল তুহিন মির্জার কথা অন্তিকা কবীর। সে ভিতু নয়। তুহিন ভাইয়ের কথা মানতে হবে সেটাও না। সে স্বাধীন। আঠারো বছর হয়ে গেছে তার। নিজের ইচ্ছে মোতাবেক চলার পুরো অধিকার আছে তার। সেখানে কেউ হ*স্তক্ষেপ করতে পারে না। মনের মধ্যেই কথাগুলো আওড়ালো সে। তুহিন ভাইয়ের সামনে বলতে পারলে আরো ভালো লাগত। শান্তি পেত সে। দরজা বন্ধ করার শব্দ। নিশ্চিত তিনি ঘরে ঢুকে গেছেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলো অন্তু। আয়নার সামনে এসে দাঁড়িয়ে মুখের হালত দেখতে লাগল। গাল দুটো পুরো লাল হয়ে গেছে। রে*গে বলে উঠল, আমি তো কাল যাবোই রোহান ভাইয়ের সঙ্গে দেখা করতে। দেখি কে আটকায় আমায়। হুহ!”
পরদিন সকাল বেলা মিশন শুরু। যেভাবেই হোক অন্তু আজ বাসা থেকে বের হবেই। তুহিন ভাই বুঝি সেটা বুঝতে পেরেছেন। নাস্তার টেবিলে আজ তিনিও আছেন। সাথে বড় মামা। অন্তু খাবার না খেয়ে ভাবছে। তুহিন ভাই কিভাবে তার যাওয়া আটকাতে পারে? মামার সামনে অবশ্যই কিছু বলতে পারবে না। কিন্তু মামা তো এখুনি চলে যাবে। তখন? হ্যাঁ তার গাড়ি পাংচার করে দিতে পারে যেটা আগেও করেছে। এরপর সেদিনের মতো বাসেও উঠতে দিবে না। তাহলে? তাহলে কিভাবে যাবে সে? অন্তু ভাবনায় পড়ে গেল। ভাবতে ভাবতে আর খাওয়া হলো না তার। মামা ততোক্ষণে খেয়ে উঠে গেছেন। তিনি এই বেরুবেন। সঙ্গে সঙ্গে অন্তু বলে উঠলো, “মামা। আমি আজ তোমার সঙ্গে যাবো।"
“হ্যাঁ কি? আমার সঙ্গে? কেন?"
“এভাবেই মামা। আজ তোমার সঙ্গে যাবো।
বলেই তাকাল তুহিন ভাইয়ের দিকে। তার চোখ মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। হয়তো তার ভাবনা চিন্তায় এই ব্যাপারটা ছিলো না। মামা বললেন,
“কিন্তু তুই তো নাস্তাই করলি না!
অন্তু সঙ্গে সঙ্গে দুটো কলা হাতে নিয়ে বলল, গাড়িতে খেয়ে নিব। চলো চলো।
"হ্যাঁ যাচ্ছি। এতো তাড়াহুড়োর কি আছে?
অন্তু ফিসফিসিয়ে বলল, অনেক কিছু আছে মামা। কিভাবে বলি তোমায়। হি*টলার যেভাবে তাকিয়ে আছে হুমম। এখানেই মে*রে ফেলবে আমায়।”
তারা চলে যেতেই তুহিন এক চুমুকে জুসের গ্লাস শেষ করল। অন্তুর বুদ্ধি দেখে সে হতভম্ব হয়ে গেছে। এই মেয়েটা তো গাধা নয়।
—-----
মামার সঙ্গে এসে নেমেছে ভার্সিটিতে। মামা তাকে নামিয়ে দিয়েই চলে গেছে। কিন্তু এখানে এসে লাভ কি হলো? পরক্ষণেই মনে পড়ল, রোহানের পায়ের যা অবস্থা, তাকে তো হাসপাতাল ছেড়ে উঠার কথাই না ভার্সিটি তো দূরে থাক। ধ্যাত ধ্যাত এখানে এসেই ভুল করল সে। কিন্তু মামার সঙ্গে এসে তো আর অন্য কোথাও নামা যায় না। যাক মির্জা বাড়ি থেকে বেরুতে পেরেছে এটাও অনেক। এখান থেকে সে বেরিয়ে হাসপাতালে তো যেতে পারবে। হ্যাঁ চিনে সে। গতকালই তো গেলো। অতঃপর ব্যাগটা শক্ত করে ধরে রেখে মেইন গেইট দিয়ে রাস্তা দিয়ে বেরুতেই ফট করে আবারো ভার্সিটিতে ঢুকে পড়ল। তুহিন ভাই বাইক নিয়ে এদিকেই তো আসছে।
অন্তু লুকিয়ে পড়ল গাছের আড়ালে। বাইক ভেতরে ঢুকতেই ছুটে বেরিয়ে গেল। দ্রুত বাইরে এসে সিএনজিতে চড়ল সে। অতঃপর হাঁফ ছেড়ে বাঁচল। খুব বাঁচান বেঁচে গেছে যে।
রোহানের সঙ্গে আজ হাসপাতালে ছিল অরিত্র। সে গতরাত থেকেই তার সঙ্গে আছে। অরিত্র কমলার খোসা ছাড়িয়ে রোহানকে দিচ্ছে। রোহান একটা একটা করে কমলা মুখে দিচ্ছে। অরিত্র জিজ্ঞেস করল, “অন্তুকে নিয়ে তোর মাথায় কি চলছে?"
রোহান অবাক হবার ভান করে বলল, কি আবার চলবে?
“নাটক করিস না। আমি সব বুঝি। সত্যি করে বল।
রোহান মুচকি হাসি দিয়ে বলল, বোধহয় ওর প্রেমে পড়ে গেছি।
অরিত্র চোখ মুখ কুঁচকে তাকিয়ে রইল। রোহান ফের হাসল। রোহানের কথাটা অরিত্র হজম করতে পারছে না।
এরই মধ্যে দরজায় কড়া নাড়ল। অরিত্র জিজ্ঞেস করল,কে?
রোহান জবাবে বলল, “অন্তু বোধহয়..
সত্যি সত্যি দরজা খুলে অন্তিকা বেরিয়ে এলো। অরিত্রের মুখ থেকে চোয়াল খসে পড়ার মতো অবস্থা। সে রোহানের দিকে ফিরতেই রোহান ভ্রু নাচিয়ে হাসল। অরিত্র বলে উঠল, “অন্তিকা তুমি?
অন্তিকা মুচকি হেসে ভেতরে ঢুকল। ঠিক তার পিছন পিছন ঢুকে ভেতরে এলো তুহিন মির্জা। রোহান আর অরিত্র দুজন বিস্ময়ে স্তব্ধ হয়ে গেল। অন্তিকা হাসি থামিয়ে শুকনো ঢোক গিলল। সে ভেবেছিল তুহিন ভাইয়ের হাত থেকে সে পা*লিয়ে বেঁচেছে। কিন্তু আদৌও সেটা নয়। সিএনজি থেকে নেমে দেখল হাসপাতালের সামনে বাইকে বসে তুহিন ভাই সিগারেট ফুঁকছে। এতো শত করে এভাবে তার সামনে ধরা পড়ে যাবে এটা আদৌও ভাবেনি সে। পড়ল তো পড়ল এমন ভাবে ধরা পড়ল যে আর বেরুনোর কোনো পথ নেই। অবশেষে তার হার মানতেই হলো।
অরিত্র কিঞ্চিত হেসে বলল, “আরে কে এসেছে? তুহিন ভাই যে!
তুহিন মৃদু হাসল। অন্তুকে রেখেই সে সামনে এগিয়ে এলো। রোহানের চোখে মুখে বেপরোয়া ভাব। সে আগে যেভাবে ছিল এখনো তাই আছে। চুপচাপ কমলা গিলছে। তুহিন এগিয়ে এসে তার সামনে টুল টেনে বসে পড়ল। অন্তু মনে মনে দোয়া দরুদ পড়ছে। কোন বি*পদ যে হবে এবার।
তুহিন বলে উঠল, “শুনলাম তুমি নাকি অসুস্থ তাই দেখতে এলাম।
রোহান হেসে জবাব দিল, তেমন বেশি কিছু না। এই একটু লেগেছে।
বলেই পা উঁচিয়ে দেখাল। তুহিন বলল, "ভাগ্য ভালো তোমার।
“হ্যাঁ, বলতে পারো। কেউ দয়া দেখিয়েছে।
"হয়তো শেষবারই দয়া দেখাল।
“হ্যাঁ, কিংবা শেষ বারই আমি তাকে ছেড়ে দিলাম।
অরিত্র বুঝলো তাদের কথাবার্তা কোন দিকে আগাচ্ছে। কিন্তু অন্তু কিছু বুঝল না। কারণ তাদের কথার আওয়াজ সে শুনতেই পারছে না। তবুও পা উঁচিয়ে কান খাড়া করে শোনার চেষ্টা করছে। কি আশ্চর্য! এতো আস্তে আস্তে কেন কথা বলছে। বিড়বিড় করে বলল, “কি প্রেমালাপ করছে আল্লাহ জানে!”
জটিল মূহুর্তে অন্তিকার কাণ্ড দেখে অরিত্রের মুখ টিপে হাসল। তবে হাসা যাবে না। তুহিন উঠে দাঁড়িয়ে বলল, "বোধহয় তুমি এবার শুধরে যাবে। রাত বেরাতে এভাবে আর বাইক চালাবে না।”
রোহান হেসে বলল, পা ঠিক হবার পর ভেবে দেখব।
"হ্যাঁ ভাবনা চিন্তা করার জন্য ভালো সময় পাচ্ছ। পুরো একমাস।
রোহান দাঁতে দাঁত চেপে হাসার চেষ্টা করল। তুহিন হেসে বলল, “অন্তু বলছিলো তোমাকে দেখতে আসবে। তাই ভাবলাম চলে আসি। এদিকে আয় অন্তু, দেখে যা।”
অন্তু কয়েক পা সামনে এগিয়ে হাত নাড়ল। হাসার চেষ্টা করল যদিও তার হাসি পাচ্ছে না। বলল, এখন কেমন আছেন রোহান ভাই?
"ভালো আছি। ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছি। তোমার আর আসতে হবে না।
অন্তু কিছু বলার আগে তুহিন বলে উঠলো, “তাহলে তো ভালোই হলো। তাহলে শেষবারের মতো দেখে যা অন্তু। তোকে আর আসতে হবে না।"
চোখ মুখ রাঙি*য়ে কথাটা বলল অন্তিকাকে। অন্তিকার মুখের রঙ উবে গেল। রোহান বলল, “হ্যাঁ সেটাই তো। ফোন আছে, দরকার পড়লে ফোন করে খোঁজখবর নিও। নাম্বার মুখস্থ আছে তো আমার?"
অন্তিকা জবাব দেবার আগে তুহিনের দিকে ফিরে তাকাল। তুহিন ভাই রেগে ফু*লে ঢোল হয়ে আছে একদম। এই বো*ম কখন ফেটে যায় সে নিজেও জানে না। আচমকা অন্তর হাত ধরে বলল, “দেখা হয়ে গেছে। চল এবার।"
হনহন করে তার হাত ধরে বেরিয়ে এলো তারা। যেতে যেতে রোহান হাসি মুখে হাত নাড়িয়ে বিদায় দিল অন্তুকে। অরিত্র হা হয়ে দেখছে সব।
বাইকের হেলমেট ধপ করে অন্তুর মাথায় পরিয়ে বলল, “বস বাইকে।"
“আমি যেতে পারব তুহিন ভাই।
"আর একটা কথা বললে এমন চ*ড় মারব না!
অন্তু চুপসে আশপাশ তাকাল। মানুষজনে ভর্তি চারদিক। তুহিন দাঁতে দাঁত চেপে রইল। রাগে হিসহিস করছে।
তুহিন বাইক চালাচ্ছে। তার পিছনে বসা অন্তিকা। রা*গে তুহিনের মাথা ফেটে যাচ্ছে। সে বিড়বিড় করে বলে যাচ্ছে, “হ্যাঁ। তোর দেখতে আসাই লাগল। কেন দেখতে এলি? তুই দেখতে এলে ও কি সুস্থ হয়ে যাবে? তুই কি ডাক্তার? নাকি কবিরাজ? ডিগবাজি দেখাতে এসেছিস? হুহ নাটক দেখলে বাঁচি না।”
অন্তুর ভ*য় করছে। তুহিন ভাইয়ের কথা শুনে নয় তার রা*গ দেখে। তিনি যে রে*গে বাইক চালিয়ে যাচ্ছেন কিছু একটা হলে তখন। বলতে না বলতেই আচানাক তুহিন বাইকের গতি বাড়িয়ে দিল। অন্তিকা ভয়ে দুই হাতে তাকে জড়িয়ে ধরল পিছন থেকে। ভীত কণ্ঠে বলে উঠল, “আমি আর কখনো এমন করব না তুহিন ভাই। আপনি শান্ত হন। এভাবে বাইক চালাবেন না। সত্যি বলছি আর কখনো করব না।"
তুহিন বুঝি শান্ত হতে পারল। শীতল পাতলা হাত দুটো পেছন থেকে এগিয়ে তাকে জড়িয়ে ধরেছে। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আছে তার বুকের কাছে। এর সঙ্গে অন্তিকার মিষ্টি কণ্ঠস্বর। তুহিনের মাথায় রা*গ থাকে আর কতোক্ষণ। কিছুক্ষণের মধ্যেই তুহিনের রা*গ গলে জল হলো। সে বাইকের গতি কমিয়ে নিল। অন্তিকা সামলে উঠল। মনে হলো এই বারের মতো বেঁচে গেছে সে।
কিছুদিন পর,
ইদানিং অন্তুর যতসব ভুলকাজ হয় তার সবকিছুই হয় তুহিন ভাইয়ের সামনে। তখন লজ্জায় আর শরমে তার মাটিতে মিশে যেতে ইচ্ছে করে। আজকের সকালের কথাই ধরা যাক না। অন্তিকার ঘরের সামনে দাঁড়িয়ে থাকলে চোখ পড়ে সামনে বরাবর আয়নায় দিকে। তার বাম পাশেই বাধরুমের দরজা। সবেমাত্র গোসল সেরে সে বাথরুম থেকে বেরুতে গেছে। আজ অনেক সময় নিয়ে গোসল সেরেছে। অনেক জামা কাপড় জমে ছিল। সেগুলো সব ধুয়েছে। তখন দরজার ফাঁক দিয়ে পা এসে জমা হয়েছে দরজার সামনে। অতঃপর যেই না দরজা পা বাড়াল অমনি পিছলে ধপাস করে পড়ে গেল। পড়ে গিয়ে ব্যাথা পেয়েছে ভীষণ। ভাবল চিৎকার করে কাঁদবে। কিন্তু ঘাড় ঘুরিয়ে যেই দরজার দিকে তাকাল, সেই তুহিন ভাইকে দেখে স্তব্ধ হয়ে গেল। তার চিৎকার আর শোনা গেলো না। সে বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ল।
তুহিন ভাই ও যথেষ্ট অবাক। এমন কিছু তাকে দেখতে হবে তিনি ভাবেননি। ছুটে গিয়ে ধরবে কি না ভাবছে। দু প্রান্ত দেখে দুজন দুজনকে দেখছে। ফ্যালফ্যাল করে দেখছে একজন অপরজনকে । তুহিন ঠোঁট চেপে ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়ল। তার দরজা বন্ধের শব্দে দুই হাতে মুখ চেপে অন্তু মেঝেতে শুয়ে। লজ্জায় আর শরমে তার মাথা কাটা যাচ্ছে। এই মুখ নিয়ে কিভাবে সে যাবে তুহিন ভাইয়ের সামনে। মুখ বুঝে সে পড়ে রইল মেঝেতে!
#চলবে….