#আমায়_দিও_একটুখানি_ছুঁয়ে 🌺
#পর্ব_৩২
#মিমি_মুসকান ( লেখনিতে )
নিহাম দরজা খুলে লব্ধদৃষ্টিতে দেখছে তুহিনকে। অথচ তুহিন নজর নামিয়ে রেখেছে। তার কোলের মাঝে থাকা বিড়ালছানা চেঁচিয়ে যাচ্ছে। নিহাম অবাক কণ্ঠে বলে উঠলো, “এই বিড়াল বাচ্চাকে কোত্থেকে আনলি?"
“ওর নাম কিট্টু। দেখি সরে দাঁড়া।"
নিহাম সরে দাঁড়াতেই তুহিন ঘরে ঢুকল। নিহাম বলে উঠলো, “তুই বিড়াল পালিস কবে থেকে?"
ঘরে ঢুকতেই কিট্টু কোল থেকে লাফিয়ে নিচে নামল। তুহিন সামনে ফিরে বলল, “আমি না, অন্তু পালে!"
নিহাম ভ্রু উঁচিয়ে বলল, “ওহ। তো এখানে আনলি কেন?"
বলেই দুজন ফিরল নিচের দিকে। পুরো মেঝেতে কাঁদা লেগে আছে। কিট্টু হেঁটে হেঁটে পুরো ঘর নোংরা করছে। তুহিন ঢোক গিলে বলল, পরিষ্কার করতে। না মানে, দাঁড়া আমি এগুলো পরিষ্কার করে দিচ্ছি।”
নিহাম কপাল চাপড়ে বলে উঠলো, "থাক দরকার নেই। তুই বরং ওকে পরিষ্কার করা। আমি এগুলো করছি। রান্নাঘরে গরম পানিও বসাতে হবে।”
"গরম পানি কেন লাগবে?”
"নাহলে গোসল করাবি কেমনে?”
"কলের নিচে ছেড়ে দিলে হবে না।”
নিহাম চোখ মুখ কুঁচকে বলল, পাগল হয়েছিস? ঠান্ডা পানিতে ও ম*রে যাবে।
তুহিন ছোট্ট করে বলল, ও জানতাম না। অন্তু গোসল করায় তো সবসময়।
"দেখেই বোঝা যাচ্ছে।” বলেই নিহাম রান্নাঘরে চলে গেল। তুহিন গিয়ে ধরে রাখল কিট্টুকে। কারণ ও যত হাঁটবে ততো ঘর নোংরা করবে।
কিট্টু গরম পানিতে গোসল করানো শেষে একটা তোয়ালে দিয়ে মুছিয়ে পেঁচিয়ে রাখা হয়েছে। সে গুটিসুটি মে*রে নিহামের কোলে বসে আছে। তুহিন জামাকাপড় ছেড়ে নিহামের দেওয়া জামাকাপড় পরেছে। কিট্টুকে গোসল করাতে যেয়ে সে নিজেও গোসল করে ফিরেছে। বিছানায় বসে নিজের হাত দেখছে সে। নিহাম বলল, “আঁচড় দিয়েছে।"
“হ্যাঁ, দেখ কতোখানি দিয়েছে। শয়*তান একটা!"
বলেই কান টেনে দিল কিট্টুর। তুহিন মিনমিনিয়ে বলল, “একদম মালিকের মতো!"
নিহাম মুখ টিপে হেসে বলল, “তোর পেটে এবার বিড়ালের বাচ্চা হবে!"
“কি?"
“হ্যাঁ ছোট্ট বেলায় মা বলতো বিড়াল আঁচড় দিলে পেটে বাচ্চা হয়। শুনিস নি।"
“না আমার তো মা ছিলো না, তাই এসব কথাও শুনিনি।"
নিহামের মুখটা মলিন হয়ে গেল। তুহিন উঠে রান্নাঘরে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে। খাবারের কিছু আছে কি না দেখছে। নিহাম কিট্টুকে রেখে তার পিছন পিছন এসে বলল, "আন্টির সঙ্গে দেখা করতে যাস না।”
তুহিন কিছুক্ষণ তার মুখের দিকে তাকিয়ে থেকে জবাব দিল, হুঁ যাই তো।
"শেষবার কবে গেছিলি বল তো?”
তুহিন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে জবাব দিল, ৬ মাস আগে।
"এরপর আর গেলি না!”
"না ইচ্ছে করে না।”
"কেমন আছে?”
"ভালোই আছে। মামারা আদর যত্ন করে। একমাত্র ছোট্ট বোন তো। বুঝলি আদর যত্নের অভাব কারো হয় না।”
"ফোন করিস না?"
তুহিন জবাব দেবার আগেই তার ফোনটা বেজে উঠলো। নিহাম এগিয়ে এসে দেখল ফোনের স্ক্রিনে মায়ের নামটা ভেসে উঠছে। নিহাম বলে উঠলো, “আন্টি ফোন করেছে। ধর এসে।"
তুহিন এলো না। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল ফোনটার দিকে। নিহাম অবাক হয়ে দেখছে। বাজতে বাজতে ফোনটা বন্ধ হয়ে গেল। আর বেজে উঠল না। ওপাশ থেকে আর কোনো কল এলো না। তুহিন গাল বাঁকিয়ে হেসে আবারো রান্নাঘরে চলে গেল। নিহাম দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে ফোনটা বিছানার উপর রেখে দিল।
________
তাহিয়া ছুটতে ছুটতে গলির মুখ থেকে বেরিয়ে এলো। আশপাশ হন্যে হয়ে দেখছে। কোথায় রিয়াজ? ছোটাছুটির এক পর্যায়ে দূরে একজনকে দেখতে পেয়েই ছুটে গেল সে। সেখানে গিয়ে হাঁপাতে লাগল। রোহান কিয়ৎকাল ফ্যাল ফ্যাল করে তাহিয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “আপনি?”
তাহিয়া ঘনঘন শ্বাস নিচ্ছে। রোহান ক্রাচে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে জলন্ত সিগারেট। তাহিয়া হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “রিয়াজ কোথায়?"
“ও তো ওইদিকে গেল। কিন্তু হয়েছে কি? আপনাকে এমন অস্থির কেন দেখাচ্ছে?"
তাহিয়া পিছনের দিকে ইশারা করে বলল, “ও–ওখানে অরিত্র…
হাতের সিগারেট ফেলে দিল রোহান। উত্তেজিত হয়ে ক্রাচে দুটো ধরে বলল, “অরিত্র! কি হয়েছে ওর?"
“ওরা ওকে মে*রে ফেলবে। তুমি রিয়াজ কে ডাকো। কোথায় রিয়াজ?"
বলতে বলতে কণ্ঠস্বর ভারী হয়ে উঠল তার। রোহান হতবাক হয়ে তাকিয়ে আছে তাহিয়ার দিকে। তার কথাবার্তা কিছুই বুঝতে পারছে না সে।
রোহানের এক পায়ে প্লাস্টার করা। তাই হাঁটা চলা করতে ক্রাচের সাহায্য নিচ্ছে সে। যতো জোরে পারছে ততো জোরেই হাঁটার চেষ্টা করছে। তার অস্থিরতা দেখে তাহিয়াও তার সঙ্গে সঙ্গে হাঁটছে। তার ভ*য় হচ্ছে যদি বেচারা পড়ে যায়। রিয়াজ ছুটে পেরিয়ে গেছে আরো আগেই। কিন্তু গলির মুখে এসে কাউকেই দেখতে পেলো না সে। একটু কাছে আসতেই দেখল অরিত্রের দে*হ পথের ধারে প*ড়ে আছে। তাহিয়া আঁ*তকে উঠল। পাথরের মূর্তির মতো নিস্তব্ধ হয়ে গেল সে। অথচ রোহান বসে পড়ল। রিয়াজ একনাগাড়ে ডেকে যেতে লাগল। রোহান ও চেঁচিয়ে যাচ্ছে। রোহান বলে উঠলো, “রিয়াজ যা কিছু একটা নিয়ে আয়। ওকে হাসপাতালে নিতে হবে!"
রিয়াজ উঠে দাঁড়াল। তাহিয়া ধপাস করে বসে পড়ল তার পাশে। তার বিশ্বাস হচ্ছে না। ছেলেটা তার জন্য এতো বড় বিপদে পড়ল। সে তার হাত আঁকড়ে নাম ধরে ডাকতে লাগল। তখনি ভেজা স্যাঁতস্যাঁতে কিছু একটার আভাস পেল। হাত উল্টে র*ক্ত থেকেই তার পুরো শরীর কাঁপতে লাগল। সে চেঁচিয়ে উঠলো মূহুর্তে। কাঁদতে কাঁদতে ডেকে উঠল, “অরিত্র! এই অরিত্র! কথা বলো। অরিত্র, শুনতে পাচ্ছ। আমি বলছি, তাহিয়া। অরিত্র চোখ খুলো না!"
তাহিয়ার অস্থি*রতা রিয়াজ আর রোহানকে থমকে দিল খানিকক্ষণের জন্য। তাহিয়া ঠোঁট কামড়ে কাঁদতে শুরু করল। অমনি অরিত্র চোখ মেলে তাকাল। রিয়াজ আর রোহান দু'জনেই চোখ বড় বড় করে নিল। অরিত্র বলে উঠলো, “এই সুন্দরী কাঁদছ নাকি তুমি?"
অরিত্রের কণ্ঠস্বর শোনামাত্র তাহিয়ার কান্না থেমে গেল। সে হতবুদ্ধির মতো চেয়ে রইল তার মুখের দিকে। ল্যাম্পপোস্টের আলোয় অরিত্রের মুখখানি দেখা যাচ্ছিল স্পষ্ট। সে এক পাটি দাঁত বের করে হেসে বলল, “এতো সুন্দর করে ডাকছিলে আমায়। ভালো লাগছিলো শুনতে। তোমার মুখে আমার নামটা তো দারুণ লাগে!"
ডাগর ডাগর চোখগুলো স্থির রেখে অবাক কণ্ঠে তাহিয়া বলল, “তোমার কিছু হয়নি? তুমি ঠিক আছো!"
"এমা, এই তো আমার জন্য কাঁদছিলে! বেঁচে আছি দেখে খুশি হওনি। তুমি যেভাবে ডাকছিলে আমি তো ম*রে গিয়েও বেঁচে উঠতাম ম্যাডাম!”
তরতর করে কাঁপছে তাহিয়ার ঠোঁট। হাতটা মুঠো করে নিল। ইচ্ছে করছে ক*ষিয়ে ছেলেটাকে চড় মা*রতে। হারাম*জাদা! কিন্তু তাহিয়াকে এতো কষ্ট করতে হলো না। তার আগেই রিয়াজ আর রোহান ঝাঁপিয়ে পড়ল। অরিত্র আধ*মরা না হলেও ওদের মা*রে ঠিকই আধম*রা হলো। কিন্তু র*ক্ত! হ্যাঁ তাহিয়ার হাতে এখনো র*ক্ত লেগে আছে তো। ওদের দুজনের হাত থেকে তাকে ছাড়িয়ে বলল, “র*ক্ত এলো কোত্থেকে?"
অরিত্র হেসে বলল, ওহ এটা। ওই ছেলেটা ছুরি দিয়ে ঘাই মেরে*ছিল। বেশি লাগেনি, একটু লাগতেই র*ক্ত বেরিয়ে গেল। আমিও এমন ভাব করলাম অনেক লেগেছে। সাথে সাথে অজ্ঞান হবার অভিনয় করে প*ড়ে গেলাম। ওরা সত্যি ভেবে পালি*য়েছে!”
অরিত্রের কথাবার্তা শুনে তাহিয়া কিৎকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে তার মুখের দিকে ফিরে চাইল। অরিত্র তখনো হাসছে। রোহান তার পিঠে কি*ল মে*রে বলল, শা লা। ভাবটা কি করলি? আর এটা কি একটু লেগেছে নাকি?
রিয়াজ ও তাল মিলিয়ে বলল, তাই তো। একটু লাগলে কি র*ক্ত বের হয় নাকি? আর কারা মা*রতে চেয়েছিল তোকে? কে ওরা? এলাকার কোনো ছেলেপেলে?”
অরিত্র তাহিয়ার দিকে ফিরে তাকাল। তাহিয়া চোখের জল মুছে অন্যদিকে ফিরে তাকিয়ে আছে। অরিত্র বলল, "বলছি সব। এখন এখান থেকে চল।”
তাহিয়া ছোট করে বলল, "হ্যাঁ ডাক্তারের কাছে যাওয়া উচিত।”
অরিত্র বলে উঠলো, "আপনি যা হুকুম করবেন ম্যাডাম!”
তাহিয়া চোখ মুখ কুঁচকে নিল। অরিত্র হেসে বলল, রিয়াজ ধর আমায়। পায়ে একটু লেগেছে।
রিয়াজ মুখের উপর না করে দিয়ে মুখ ফিরিয়ে হাঁটা শুরু করল। রোহান নিজেও ক্রাচ নিয়ে একটু একটু করে হাঁটতে লাগল। অরিত্র তাদের ভাবভঙ্গি কিছু বুঝতে পারল না। একমাত্র তাহিয়া তার বাহু আঁকড়ে ধরে বলল, “চলো আমি ধরছি।"
সুযোগ পেয়ে অরিত্র তার কাঁধে হাত রেখে নিল। তাহিয়া চোখ ঘুরিয়ে তাকাতেই অরিত্র মিনমিনিয়ে বলল, হাঁটতে সুবিধা হবে। চলো চলো ডাক্তারের কাছে যাই।”
তাহিয়া ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো, "ডাক্তার তোমার পা ঠিক করে দিলে আমি আবারো তোমার পা ভাঙ*বো মনে রেখো।”
“এটা যদি তোমাকে বাঁচানোর গিফট হয় আমি সাদরে গ্রহণ করব ম্যাডাম!"
তাহিয়া চোখ মুখ শক্ত করে নিল। অরিত্র মিটিমিটি হাসছিলো। অন্যদিকে রিয়াজ আর রোহান দু'জনেই আড়চোখে ফিরে ফিরে তাকাচ্ছিল তাদের দিকে!
#চলবে…