ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমায় দিও একটু খানি ছুয়ে

৩৪তম পর্ব

লেখক: মিমি মুসকান

#আমায়_দিও_একটুখানি_ছুঁয়ে 🌺

#পর্ব_৩৪
#মিমি_মুসকান ( লেখনিতে )
নীল আকাশ, পাখিরা উড়ছে খোলা আকাশে। তুহিন একবার মাথা তুলে তাকাল। স্বচ্ছ পরিষ্কার আকাশ, সূর্যের তাপ গায়ে লাগছে না। আলস্য দুপুর! ভার্সিটি ছুটি হয়ে গেছে কিছুক্ষণ আগেই। মানুষজন নেই বললেই চলে। অথচ তুহিন অপেক্ষা করছে কারো জন্য। ঘড়ির কাঁটার দিকে অপলক ভাবে তাকিয়ে থেকে সামনে তাকাল। হাঁটার শব্দ ভেসে আসছে। তার হৃদয়ের কম্পন বলে দিচ্ছে সে আসছে। 
অতঃপর তাকে দেখা গেল।‌ আকাশী রঙের শাড়ির আঁচল দেখা যাচ্ছে, দেখা যাচ্ছে তার শাড়ির কুচি। সময় যেতে যেতে সে কাছে এগিয়ে এলো। তার খোলা কাঁকড়া চুলগুলো ছেড়ে দিয়েছে বোধহয়। পরিশ্রান্ত চোখ মুখ। অবশ্যই অনেক জটিলতা পোহাতে হয়েছে। প্রথমবার প্রেজেন্টেশন ছিল বলেই আরো বেশ অস্থির হয়ে ছিল সে। ভালোই হয়েছে বোধহয়। তার চোখ মুখ উজ্জ্বল প্রতিচ্ছবি বলে দিচ্ছে সবকিছু। তুহিন সবটাই যেন পড়ে ফেলতে পারে। 
তুহিন থমকে ছিল কিছুক্ষণ। তার হৃদয়ের হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাচ্ছিল তাকে দেখে। এটা প্রথমবার নয়, এর আগেও দেখেছিল তাকে। যতবার শাড়ি পরে থাকতে দেখে ততোবারই বুকে ব্যাথা শুরু হয়ে যায়। মনে করিয়ে দেয় এটাই প্রথমবার! প্রথমবার পড়ে পড়ার অনুভূতি। তুহিন সহ্য করতে পারল না। চোখ নামিয়ে নিয়ে ঘনঘন শ্বাস ফেলতে লাগল। আবার চোখ মেলে তাকিয়ে দেখল তার পানে। অমনি তার চোখ মুখ কুঁচকে গেল। রোহান হতচ্ছাড়া এখনো তার পিছু পিছু ঘুরছে। শা লা পিছন ছাড়ার নামই নিচ্ছে না। 
রোহান , অরিত্র পিছনেই ছিল। তাদের সঙ্গে পা মিলিয়ে আসছে অন্তু, বর্ষণা আর অদিতি।‌ অন্তু চোখ মেলে তাকাতেই ফাঁকা ক্যাম্পাসে একমাত্র তুহিন ভাইকে তার নজর কাড়ল। চমকে উঠল। তুহিন ভাই এখনো এখানে দাঁড়িয়ে। তার জন্য নাকি? রোহান কথায় কথায় বলছিলো, 
“বাস তো চলেই গেল। এসো তোমায় পৌঁছে দেই।" 
হ্যাঁ আজ গাড়ি আনা হয়নি তার। এসেছিলো রিক্সায় চড়ে। সেসব কথা বহু আগেই রোহান কে বলা হয়েছে। কিন্তু রোহানের কথাগুলো যেন অন্তুর কানে পৌঁছাল না। অথচ সে কাছে দাঁড়িয়ে আছে তার। তুহিন ভাই এগিয়ে আসছে দেখেই অন্তু মাথা নামিয়ে ফেলল। রোহান এদিক ফিরতেই তুহিন আচমকা এসে অন্তুর হাত টেনে ধরল। রোহান তৎক্ষণাৎ তার বাহু ধরে বলল, “অন্তু তো আমাদের সঙ্গে যাবে?" 
তুহিন ভ্রু কুঁচকে ফিরলে অন্তুর দিকে। অন্তু আমতা আমতা করে রোহানকে বলল, “না মানে আমি তুহিন ভাইয়ের সঙ্গেই যাব।" 
রোহান উপায়ান্তর না পেয়ে বাহু ছেড়ে দিল। সে এতোদিন ভাবত অন্তু বুঝি তুহিনকে পছন্দ করে না। অথচ আজ বুঝল অন্তুর মনে এখনো তুহিনের জন্য দুর্বলতা রয়েছে। কিন্তু সেটা কি রকম? ভালোবাসা নাকি অন্যকিছু! 
অন্তু তার হাত ধরে নেমে এলো। তুহিন স্পষ্ট শব্দে তাদের দুজনকে বলল, “বাকি দুজনকে সাবধানে ছেড়ে দিও। অন্তুর কথা তোমাদের না ভাবলেও চলবে। সেজন্য আমি আছি!" 
তীব্র কণ্ঠে বলা কথাগুলো রোহানের কানে বাজল। সে হাসল। অন্তু লজ্জা পেল। তুহিন ভাই কি সবার সামনে অধিকার বোধ দেখাচ্ছে। ফিরে চাইতেই তুহিন ভাইয়ের চোখ রাঙানি তাকে আর চেয়ে থাকতে দিল না। আবারো চোখ নামিয়ে ফেলল সে। তুহিন ভাইয়ের শক্ত হাত জোড়া তার তুলতুলে নরম হাতটা নিজের অধীনে টেনে বাইকে এনে বসাল।‌ অতঃপর হাওয়ার বেগে বাইক ছুটল গন্তব্যের দিকে। 
রাস্তার জ্যামের কারণে বাসায় ফিরতে ফিরতে প্রায় সন্ধ্যা হয়ে গেল। এতো ধকল কাটিয়ে বাড়ি ফিরবার পর ঘরে ঢুকেই অন্তু বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে পড়ল। কতোক্ষণ এভাবে শুয়ে ছিল জানা নেই। খালা এসে তার ঘুম ভাঙাল। মামা এসেছেন, তাকে খুঁজছে। বাড়িতে আসার পরই মামা তাকে খুঁজে বেড়ান। আদর করে বলেন, মা আমার কোথায়? ইশ কি আদর! তুহিন ভাই দেখলেই নাক কুচকায়। শুয়ে শুয়ে তুহিন ভাইয়ের কথাই ভাবছিলো সে। অতঃপর উঠে দাঁড়াল। ক্লান্তি ভাব কাটিয়ে উঠেছে প্রায়। গ্লাসে রাখা পানি গুলো এক চুমুকে শেষ করল। বিছানার কাছে রাখা ল্যাম্পশেড জ্বলছে কেবল। একটু আধার একটু আলো, ভালোই লাগছে তার কাছে। সে উঠে দরজা বন্ধ করল। আয়নার সামনে এসে দাঁড়াল। পুরোপুরি তাকে দেখা না গেলেও আবছা আবছা দেখা যাচ্ছে। প্রথমে আলতো হাতে মাথার চুল আঁচড়ে নিল। ফ্যানের বাতাসে চুলগুলো এলোমেলো হয়ে যাচ্ছিল দেখে মাথা তুলে একবার ফ্যানের দিকে চেয়ে বিরক্তি প্রকাশ করল। মাথায় খোঁপা বেঁধে ধীরে ধীরে শাড়ি খুলতে লাগল। রহিমা খালা শাড়ি পরিয়ে দিয়েছিল তাকে। সেই ভাজে ভাজে শাড়ি খুলতে লাগল সে। শাড়ি খুলে রাখল বিছানার দিকে। খুব যত্ন করে পরেছিল।‌ কোমরের উন্মুক্ত যে অংশ শাড়ি দিয়ে ঢাকা ছিল তা এখন দেখা যাচ্ছে। মসৃণ পিচ্ছল আকর্ষণীয় কোমর। অন্তুর মনে হলো তার দমবন্ধ হয়ে আসছে। বাথরুমের আলো জ্বালিয়ে ব্লাউজের প্রথম হুক খুলে আয়নার দিকে ফিরতেই চমকে উঠল সে। আয়নাতে স্পষ্টভাবে দেখা যাচ্ছে পিছনের প্রতিবিম্ব। সে আঁত*কে উঠল। ফিরে তাকাল পিছনের দিকে। তুহিন ভাইকে দেখে ভ*য়ে নিশ্চুপ হয়ে গেল। অতঃপর দিকবিদিক ভুলে ছুটে গেল দরজার কাছে। কিন্তু শেষ রক্ষা করতে পারল না। তার দরজা খোলার পূর্বেই পেছন থেকে তুহিন এসে তার হাতটা আঁকড়ে ধরল। অন্তু ভ*য় পেয়ে গেল। অসম্ভব রকমের ভ*য়! ভ*য়ে তার চোখ মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল। সে দরজার সাথে ঠেসে দাঁড়িয়ে রইল। তুহিন ভাইয়ের শক্ত হাতটা তখন তার বাহু ছুঁয়ে ছিল শক্ত করে। সেটা ধীরে ধীরে এসে পৌঁছাল কোমরের কাছে। অন্তু শ্বাসরোধ করে দাঁড়িয়ে আছে। তার বুক কাঁপছে দুরু*দুরু। মন ছ*টফট করছে। অথচ তুহিন ভাই খুব শান্ত। তার সকল মনোযোগ যেন অন্তুকে নিয়ে। বেপরোয়াভাবে তার থিতুনিতে হাত রেখে চোখে চোখ মিলিয়ে বললেন, “শাড়িতে তোকে চমৎকার লাগে অন্তু‌ আবার শাড়ি ছাড়াও… মুচকি হেসে.. মন্দ নয়!” 
অন্তু কম্পিত স্বরে বলে উঠলো, "আপনি এখানে ছিলেন।”
"হুম শুরু থেকেই ছিলাম। তোকে দেখছিলাম। গত দু ঘণ্টা ধরে এখানেই বসে ছিলাম তোর জন্য!” 
"দু ঘণ্টা কেন?” 
তুহিন জবাব না দিয়ে কোমরে রাখা হাতটা ধীরে ধীরে পিছনে নিয়ে এক ঝাটকায় তাকে কাছে টেনে আনল। আড়চোখে তার ব্লাউজের দিকে ফিসফিসিয়ে বলল, "এটা আটকে দে অন্তু! আমার ধৈর্য্যের পরীক্ষা নিস না।” 
অন্তু হকচকিয়ে উঠল। হাত দিয়ে আড়াল করে রাখল তার বক্ষদেশ। চঞ্চল চোখজোড়া এদিক ওদিক ছোটাছুটি করছে। লজ্জায় সে চোখ তুলে তাকাতে পারছে না। অথচ তুহিন তখনো দেখে ক্লান্তিহীন ভাবে, মুগ্ধ চোখে।‌ মোহে যেন একদম ডুবে গেছে সে।‌ নিজেকে আটকানোর সবচেষ্টা করেও বৃথা হলো সে। এগিয়ে গিয়ে চুমু খেল ঠিক তার ঘাড়ের নিচে। অন্তু ঠোঁট কামড়ে চোখ বন্ধ করে আঁকড়ে ধরল তাকে। দুই হাতে তার গলা জড়িয়ে ধরল। লজ্জায় তার চোখ সর্বাঙ্গ লাল হয়ে উঠেছে। তুহিন তার কোমর জড়িয়ে ধরে আছে।‌ একে অপরকে আলিঙ্গন করে রইল বেশ অনেকক্ষণ। যেন সবকিছুর উর্ধ্বে তারা দুজন।
কেবল দুজনকে বেছে নিয়েছে। তুহিন তাকে ছাড়িয়ে তার মুখস্রীর দিকে ফিরে তাকাল। দুই হাতে তার গাল আঁকড়ে ধরে তার চোখের দিকে ফিরে তাকাল সে।‌ আজ অন্তু চশমা পরেনি।‌ পরেছিল লেন্স। এজন্য তার চোখদুটো বেশ সুন্দর লাগছিলো। এরইমধ্যে গাড় কাজল তার টানা টানা চোখগুলোকে করে তুলেছিলো আরো আকর্ষণীয়। তুহিনের ঠোঁট জোড়া কাঁপছে। সে ফিসফিসিয়ে বলে উঠলো, “তাহলে তোর জবাবে আমি কি ধরে নিব অন্তু?" 
অন্তুর চোখে অশ্রু টলমল। তার গড়িয়ে মূহুর্তে। সে চোখ নামিয়ে বলে উঠলো, “আমি আরো আগেই তো জবাব দিয়ে দিয়েছি। আপনি কিসের খোঁজ করছেন আমার কাছে?" 
তুহিন হতভম্ব হয়ে পড়ল। সে তার কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। অন্তু লজ্জায় রক্তিম হয়ে উঠল ঠিক কৃষ্ণচূড়ার মতো। তুহিন উন্মাদ হয়ে উঠল। সে তার গালে গলায় চুমু খেয়ে বলল, “আমায় ক্ষমা করে দে অন্তু। আমি সত্যি ভু*ল করেছিলাম। তখন আমার সিদ্ধান্ত ভুল ছিল কিন্তু বিশ্বাস কর আমি এখন আর পিছু পা হবো না। আমি আর তোর হাত ছেড়ে দিব না। আমি এখন আর কাউকে ভয় পাই না। তুই কেবল কথা দে তুই শুধু আমার, সবসময় থাকবি আমার সঙ্গে। যা কিছু হয়ে যাক না কেন তুই আমার হাত ছাড়বি না। তোর মা বললেও না। কথা দে আমায়!" 
জবাবের আশায় অপেক্ষা করছে তুহিন। সে জানত অন্তুর এতো ক্ষ”মতা নেই। শামীমা মির্জার কথার উপরে কথা বলার অধিকার তার নেই। শামীমা মির্জার গণ্ডি" র ভেতর থেকে তাকে বের করিয়ে আনা অসাধ্য ছাড়া আর কিছুই না। তবুও ভালোবাসার কারণে, আবেগের বশে অন্তু মাথা নেড়ে সম্মতি দিল কিন্তু তুহিন জানত সত্যিটা। অন্তুকে অন্তুর চাইতেও চিনত সে। তাই তো দ্বিতীয় কোনো প্রশ্ন না করে আবারো তাকে জড়িয়ে ধরল কোনো দ্বিধা ছাড়াই। বহু বছরের অপেক্ষা তার। অন্তুর সবে কৈশরে পা রেখেছিল তখনই সে ভালোবেসে মন দিয়েছিল তাকে। কিন্তু তার ভালোবাসা আর মন ভাঙন হয় সেই একদিনেই। কিন্তু তুহিন সেসব ভাবনা আমলে নিল না। কারণ সে জানত, সে আর অন্তু একসঙ্গে থাকলে তাদের আলাদা করার সত্যি আর কারোর ছিলো না। কেউ পারত না তাদের আলাদা করতে! 
শরীরের ঘ্রাণ নিতে নিতে কখন যে উন্মাদনায় ভেসে গেল কেউ বুঝতে পারল না। ওদিকে জামাল মির্জা অন্তুকে দেখতে না পেয়ে দরজায় এসে কড়া নাড়লেন। তখনি ঘাবড়ে উঠল দুজন। অন্তু তখন তুহিন ভাইয়ের বাহুতে ঠিক দরজার এপাশে। সে ভ*য়ে ভ*য়ে ফিরে তাকাল তুহিন ভাইয়ের দিকে। তুহিন ভাই মাথা নাড়ল। সান্ত্বনা দিল। চোখ দিয়ে আশ্বাস দিয়ে অন্তুর মনে ভরসা জোগাল। জামাল সাহেব আরো কিছুক্ষণ দরজা ধাক্কিয়ে চলে গেলেন। দুজন আড়ি পেতে জুতোর আওয়াজ শুনতে পেলো। তুহিন দরজা একটু খুলে উঁকি দিল। এদিক ফিরে চাইতেই অন্তু মুখ টিপে হাসল। তুহিন হেসে তার গালে হাত বুলিয়ে বলল, “যা গোসল সেরে আয়। তোর মামা আবার এলো বলে। আমি গেলাম!" 
নীল রঙের শার্টটা সে যে চিমটে ধরেছিল তা ছেড়ে দিতে ভ*য় করছিলো। তুহিন ভাই এগিয়ে এসে তার কপালে চুমু খেলেন। অতঃপর দরজা খুলে বেরিয়ে নিজের ঘরে ঢুকলেন!
#চলবে….

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন