ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমায় দিও একটু খানি ছুয়ে

৪৪তম পর্ব

লেখক: মিমি মুসকান

#আমায়_দিও_একটুখানি_ছুঁয়ে 🌺

#পর্ব_৪৩
#মিমি_মুসকান ( লেখনিতে )
ঘড়ির কাঁটায় রাত বারোটা ছুঁই ছুঁই। অন্তু নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বেরুলো। হাতে জুতো জোড়া, খালি পা। পরনে কালো রঙের হুডি আর কালো রঙের ট্রাউজার। ঠান্ডা মেঝেতে পা রাখতেই শীতে পুরো শরীর শিরশির করে উঠলো। গায়ের সমস্ত লোম দাঁড়িয়ে গেল তার। শুকনো ঢোক গিলে পা বাড়াল। চুপি চুপি হাঁটতে হাঁটতে এসে পৌঁছাল সদর দরজার দিকে। এখান দিয়ে বেরুবে। অসম্ভব! দরজা খুললেই কেউ না কেউ জেগে যাবে শব্দে। তাহলে এখন? এখন কি করবে সে?
পিছন থেকে কিছু একটার শব্দ শুনে চমকে উঠল। দ্রুত পিছন ফিরে বলল, কে কে? 
আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো ফিরোজ ভাই। তিনি কাছে এসে অন্তুর হাত চেপে ফিসফিস কণ্ঠে বললেন, “আমার সাথে আয়!" 
অতঃপর তাকে নিয়ে বাড়ির পিছন গেইট দিয়ে বেরুলো তারা। পুরোটা সময় অন্তুর কাছে ভ্রমের মতো কাটল। তার মনে হলো এই সে স্বপ্ন দেখছে। এটা তার কল্পনা! 
কিন্তু না! বাইরের ঠান্ডা হাওয়া শরীরে ঢুকতেই আঁতকে উঠল সে। হুঁশ ফিরে এলো তার। কানে ভম ভম শব্দ হচ্ছে। সবকিছু কিছুটা অস্পষ্ট মনে হলো। হঠাৎ কি ভেবে সামনে তাকাতেই একটা অবয়ব দেখতে পেলো। কে ওটা? পিটপিট করে চেয়ে রইল খানিকক্ষণ। তুহিন ভাই! বুঝতে পেরে মূহূর্তেই ছুটে গেল তার কাছে। হুমড়ি খেয়ে পড়ল তার বুকের উপর। শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। ভাঙ্গা গলায় বলতে লাগল, “আপনি! আপনি এসেছেন! কিভাবে পারলেন আমায় ছেড়ে চলে যেতে। একা ফেলে চলে গেলেন। এই ভালোবাসা আপনার?" 
তুহিন অন্তুর কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনলেও তার দৃষ্টি সামনের দিকে। ফিরোজ চোখ দিয়ে আশ্বাস দিয়ে বেরিয়ে গেল। ভাইবোনের মধ্যে ফিরোজের সঙ্গেই তার সম্পর্ক ভালো। অন্তর কান্নার শব্দ তার কানে আসছে। সে তাকে আগলে নিল। কনকনে শীতে ঠান্ডা হাওয়ায় তাদের শরীর কাঁপতে লাগল। তবুও এসব উপেক্ষা করে তুহিন বলল, “আমার ভালোবাসার প্রমাণ চাই তোর?" 
অন্তু কান্না থামিয়ে মুখ তুলে তাকাল। নাক টেনে বলল, “কি বললেন?" 
তুহিন জবাব দিলো না। হাত ধরে টেনে নিয়ে গেল সামনে। একটা গাড়ি আর চারটে বাইক দাঁড় করানো। নিহাম,রিয়াজ, অরিত্র, সামির আর আরমানকে দেখে বিমূঢ় হয়ে গেল অন্তু। নির্বাক সে! তুহিন অন্তুর হাত চেপে বলল, "বাইকে বস!” 
অন্তু ফিরে চাইল তার মুখ পানে। না, কথা বলে নষ্ট করার মতো সময় নেই। সে নিজেই অন্তুকে তাড়া নিল। বিনা বাক্যে অন্তু উঠে বসল তার বাইকে। শো শো করে বাইক চারটে বেরিয়ে গেল গন্তব্যে। সঙ্গে সাদা রঙের গাড়িটিও। 
বাইক এসে থামল কাজী অফিসের সামনে। এতো রাতেও কাজী অফিস খোলা দেখতে পেয়ে খানিকটা যেন অবাকই হলো অন্তু। বাইকের হেলমেট খুলে দাড়াতেই কাজী অফিসের ভেতর থেকে বেরিয়ে এলো রোহান। দুজনের চোখাচোখি হলো। এই সর্বপ্রথম রোহান চোখ নামিয়ে বলল, "এদিকে সব তৈরি!” 
তুহিন বাইকের হেলমেট খুলে রাখল। অন্তুর হাত ধরে বলল, "পাঁচ মিনিট, আমরা আসছি।” 
"কিসের তৈরির কথা বলছেন আপনারা? কি হচ্ছে এখানে?”
"বলছি আমার সঙ্গে আয়।” 
বলেই হাত ধরে টেনে অন্তু নিয়ে সামনে এলো। বিশাল বড় একটা গিট, তার পাশেই বাগান বিলাশ। মাথার উপরে লাল রঙের একটা বাল্ব জ্বলছে। তুহিন অন্তুর হাতটা ধরে সেখানে নিয়ে এলো। অন্তু কিছুই বুঝতে পারছে না। কিন্তু অনেক কিছুই যেন আন্দাজ করে ফেলতে পারছে না। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। 
তুহিন তার হাতটা আগলে ধরে নিল। ঘনঘন শ্বাস ফেলে গভীর স্বরে বলে উঠলো, “বিয়ে করবি আমায় অন্তু?" 
অন্তু শ্বাসরোধ করে দাঁড়িয়ে রইল। যেই ভয়টা পাচ্ছিলো সে। তুহিন অন্তুকে ঘাবড়ে যেতে দিল। আরেকটু নরম স্বরে বলে উঠলো, “দেখ বোঝার চেষ্টা কর। আমাদের কাছে এছাড়া আর কোনো উপায় নেই। দাদি জেনে গেছে তোর আমার সম্পর্কের কথা। এই কারণেই আমায় বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছে। তাই এখন যদি আমরা বিয়ে না করে ফেলি…
"আমরা করব তো বিয়ে। তুহিন ভাই… ( একটু থেমে দম নিয়ে পুনরায় আরম্ভ করল অন্তু ) আমি আপনাকেই বিয়ে করব তুহিন ভাই। আপনাকে ভালোবাসি আমি।” 
"ঠিক আছে। তো চল।
“না। 
"না কেন?” 
"না মানে.. মানে এভাবে না। আমরা বাড়ির সবাইকে মানাব। সবাইকে মানিয়ে আমরা বিয়ে করব। 
তুহিন হাতটা সরিয়ে নিল অন্তুর হাতের উপর থেকে। কাঠ কাঠ গলায় বলল, “কেউ কেউ মানবে না অন্তু। কেউ না।”
"মানবে! মামারা‌ আমার কথা শুনবে। আপনি একটু সবুর করুন। বিশ্বাস করুন আমায়, সবাই মানবে। আমি মানাবো তাদের….
ব্যাকুল হয়ে কথাগুলো বলতে লাগল অন্তু। তুহিন দুই হাত দিয়ে মাথার চুলগুলো পিছনে উল্টে দিয়ে বলল, "ওরা কেঊ মানবে অন্তু। তোর মামারা সবাই জানে। বাড়ির প্রত্যেকে জানে তোর আমার সম্পর্কের কথা। তারা সকলেই চায় আমরা আলাদা হয়ে যাই। তুই একথা সত্যি বিশ্বাস করিস তারা তোর জন্য আমায় মেনে নিবে? যদি তাই হতো, তাহলে ফিরোজ কি তোর জন্য বাড়ির দরজা খুলে দিত?” 
অন্তু কথাগুলো ফেলে একদম ফেলে দিতে পারল না। উত্তেজিত হয়ে তুহিন ভাইয়ের হাতটা ধরে বলল, "আমার কথাটা শুনুন..
“আমি তোকে একটা কথা বলি অন্তু। তুই আমায় বিশ্বাস কর। আমার সিদ্ধান্তে বিশ্বাস কর। আর এখুনি বিয়ে কর। যদি তা না করিস আর কখনো না। এখান থেকে সবকিছু শেষ করে চলে যা আমার জীবন থেকে। আমি তোকে আটকে রাখব না!" 
অন্তু নিশ্চুপ হয়ে গেল। ঠান্ডা বাতাস তার থমথমে শরীরকে আর কাঁপিয়ে দিতে পারল না। কম্পিত কণ্ঠস্বরে বলে উঠলো, “আমি ভুলে যাব আপনাকে। আপনি এই কথাটা বলতে পারলেন।" 
তুহিন চোখ মুখ শক্ত করে নিল। কোনোভাবেই সে অন্তুর কাছে আজ নরম হবে না। না! নরম হলে হারিয়ে ফেলবে অন্তুকে। একেবারের জন্য। ও বাড়িতে কি ভয়ানক ষড়যন্ত্র হচ্ছে তা অন্তু জানে না। এখন সেসব কথা বলেও সময় নষ্ট করবে না। এছাড়া সব সঠিক কথা সঠিক সময়েও বেঠিক হয়ে পড়ে। তুহিন সেই রিস্ক নিতে পারবে না। তার ভালোবাসার প্রতি বিশ্বাস তার হাতে। সে অন্তুর হাতটা নিজের মুঠোয় নিয়ে শক্ত গলায় বলে উঠলো, "তাহলে বিয়ে করছি আমরা?” 
অন্তু জবাব দিলো না। তুহিনের হাতে নেই। ফুরিয়ে যাচ্ছে। সে অন্তুর হাত ধরে সামনে এগিয়ে গেল। অন্তু এখনো তার জায়গায় ঠাঁয় দাঁড়িয়ে। সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে সে। কিন্তু কিসের এতো ভাবনা। সে তো তুহিন ভাইকে ভালোবাসে। এতো গুলো বছর ধরে ভালোবেসে যাচ্ছে। তাকে তো স্বামী রুপে বহুবছর আগেই মনে জায়গা দিয়ে ফেলেছে। তবে এতো কেন দ্বিধা তার! এভাবে বিয়ে করে ফেললে মামারা কষ্ট পাবেন, মা কষ্ট পাবেন। সবাইকে এভাবে কষ্ট দিয়ে বিয়ে করতে ভয় হচ্ছে তার। অন্যদিকে তুহিন ভাইকে হারিয়ে ফেলার ব্যাকুলতায় সে অস্থির হয়ে উঠল। 
তুহিন পিছন ফিরে তাকাল। অন্তুও তাকাল তার পানে। চোখাচোখি হলো তাদের। অন্তুর মনে পড়ে তার আর তুহিন ভাইয়ের একসঙ্গে কাটানোর মূহুর্তগুলো। তুহিন ভাইয়ের বাইকের পিছনে বসে তাকে ঝাপ্টে ধরে পুরো শহর ঘুরেছে সে। তাকে কাছে পাবার সে তীব্র আকাঙ্ক্ষা, তাকে মরিয়া করে তুলছে বারবার। অতঃপর মনের সাথে মস্তিষ্কের যুদ্ধে মস্তিষ্ক হার মেনে গেল। সে এগিয়ে এলো। হাসি ফুটল তুহিনের গালে। না, ভুল মানুষকে ভালোবাসেনি সে। সঠিক জনকেই বেছে নিয়েছে অর্ধাঙ্গিনী হিসেবে। 
নিহাম, সামির আর রোহান দাঁড়িয়ে কাজী অফিসের সামনে। তুহিন আর অন্তুকে হাত ধরে আসতে দেখে সামির বলে উঠলো, “যাক অন্তু অবশেষে রাজি হয়েছে।" 
নিহাম তাদের পানে ফিরে হেসে বলল, “অন্তু না মানলেও আজ এই বিয়ে হতো। তুহিন জোরজবরদস্তি করে হলেও আজই অন্তুকে বিয়ে করত।" 
তার কথা শুনে সামির আর রোহান অদ্ভুত ভঙ্গিতেই তার দিকে ফিরে তাকাল। নিহাম বলল, চল ভেতরে চল। অনেক কাজ বাকি! 
চেয়ারে বসে আছেন বয়স্ক এক লোক। লোকটার দাঁড়ি আর মাথার চুল সব পেকে সাদা হয়ে গেছে। চোখে ভারী একটা চশমা। তিনি খাতায় একনাগাড়ে কিছু লিখেই যাচ্ছে। মাঝে মাঝে হাতে কাগজ নিয়ে চোখ বুলিয়ে যাচ্ছে। অন্তু হাতের কাগজের দিকে নজর দিয়ে দেখল ওটা তার এনআইডি কার্ড। এছাড়া তার পাসপোর্ট সাইজের ছবিও আছে। তুহিন ভাই এসব কবে আনলেন? তিনি কি এসব আনতে ঢাকাও গেছিলেন নাকি? অন্তু ফিরে তাকাল তুহিন ভাইয়ের দিকে। তিনি মৃদু হেসে তার হাতটা শক্ত করে ধরে নিল। অতঃপর কাজী সাহেব নিকাহনামা এগিয়ে দিয়ে বললেন, সই করতে।
অন্তু কলম হাতে একটিবার ভাবতে চাইল। কিন্তু ভাবল না। যতই ভাববে ততোই ব্যাপারটা জটিল হয়ে পড়বে‌। কম জটিল না এসব। সে দ্রুতই সিগনেচার করে নিল। স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল তুহিন তার সঙ্গে বাকি সকলে। অতঃপর তুহিন নিজেই সই করে দিল নিকাহনামায়। অন্তু শুকনো ঢোক গিলে ফিরে তাকাল চারদিক। সবাই এখানে! এটা তো ভেবেই দেখেনি তাদের সকল বন্ধুবান্ধব এখানেই আছে। আরমান, সামির, নিহাম, অরিত্র, রিয়াজ এমনকি রোহান। বিস্ময়ে তার বুকটা ভারী হয়ে গেল। নিহাম তার দিকে ফিরে মুচকি হাসল। চোখে চোখ রেখে আশ্বাস দিল। যেন ভরসা দিয়ে বলছে, তুমি যা করেছে ঠিক করেছো। এই নিয়ে আর ভেবো না। 
অন্তু মাথা দুলাল। তার মন থেকে বোঝ উঠে গেল। 
বিয়ে শেষে ওরা গাড়িতে গিয়ে বসল। চারপাশে‌‌ তখন ঝিমিয়ে পড়েছে। নিঝুম রাত। গাড়ির ভেতরটাও আশ্চর্য রকম শান্ত। তুহিন পকেট থেকে একটা চেক বের করে অন্তুর হাতে ধরিয়ে দিল।“পাঁচ লাখ টাকা কাবিন হয়েছে” বলল সে।
“যা আমার সাধ্যের মধ্যে ছিল, তাই করেছি। এর মধ্যে উসুল পঞ্চাশ হাজার দিলাম। বাকিটাও দিয়ে দিব ধীরে, ঠিক আছে?” 
জিজ্ঞেস করল, প্রশ্ন করল অন্তুকে। তার আপত্তি আছে কি এতে? অন্তু চেকটার দিকে একবার তাকাল। মৃদু হাসল। কাবিন পাঁচ লাখ হলো কি এক লাখ এসব নিয়ে তার কোনো দাবি নেই। চেকের পাতা সামনের সিটে রেখে দিল। কোনো প্রশ্ন করল না। কোনো হিসাবও না। সে শুধু তুহিনের বাহুটা শক্ত করে চেপে ধরল, মাথা রাখল সেখানে।‌ এই সব বিষয়ে তার আগ্রহ নেই বিন্দুমাত্র। 
গাড়ি এখন পথ বেয়ে চলছে মির্জা বাড়ির রাস্তায়। পিছনে বাইকগুলো রাস্তা বদলে ফেলল। অন্তু জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে ফিরে তাকাল তুহিনের দিকে। তুহিন ওর দিকে ফিরে না চেয়েও সমস্ত কিছু বুঝে নিল। হেসে বলল, “ওরা এক হোটেলে উঠেছে। সেখানেই যাচ্ছে।" 
“আমাদের বিয়ের জন্য তারা ঢাকা থেকে এতো দূরে চলে এলো।" 
“তাও আমার একটা ডাকে।" 
বলেই মৃদু হেসে ফিরে তাকাল অন্তুর দিকে। অন্তু ও হাসল। এতোক্ষণ যে বোঝ হৃদয়ের উপর ছিল তা এখন আর নেই। তার মনে হচ্ছে না সে কোনো ভুল করেছে। যাকে ভালোবেসেছে, ঘর‌ বাঁধার স্বপ্ন দেখছে তাকেই অবশেষে বিয়ে করেছে। সবটাই যেন স্বপ্নের মতো হয়ে গেল। তুহিন তার হাতটা শক্ত করে ধরে চুমু খেয়ে বলল, “কনগ্রাচুলেশন মিসেস তুহিন মির্জা!" 
লজ্জায় অন্তু লাল হয়ে উঠল। তার পুরো শরীর রোমাঞ্চিত হয়ে উঠল। সে তো ভেবেই দেখেনি সে এখন মিসেস মির্জা। কি আশ্চর্যজনক রোমাঞ্চকর মুহূর্ত। তার পুরো শরীর ঝনঝন করে উঠল। তুহিন হেসে বলল, “আজ আপনি যেভাবে আমার উপর ভরসা রেখে হাতটা বাড়িয়ে দিয়েছেন, বিশ্বাস করুন এই অধম কখনো সেই হাতের অসম্মান করবে না। আপনি আমার অর্ধাঙ্গিনী! আমার হৃদয়ের, শরীরের, মনের, অনুভূতির সবকিছুর রাজত্ব এখন আপনার!” 
অন্তু ঠোঁট চেপে হাসি রোধ করল। লজ্জায় সে হাসতেও পারছে না। খুশিতে তার চোখে জল চলে এলো। গাড়ির জানালা খুলে দিয়ে বুকভরে শ্বাস নিল সেখানে। তুহিন একবার বলল অবশ্য, "জানালা বন্ধ করে দে। ঠান্ডা লাগবে।” 
কিন্তু অন্তু শুনল না। তার ভালো লাগছে। একটু অবাধ্য হলে আজ আর কিছু হবে না। 
বাড়ি ফিরতেই এক অজানা ভয় আঁকড়ে ধরল অন্তুকে। সে বুঝতে পারল সে কি করেছে? বাড়ির সবাই এসব জানলে কি হবে? তারা জানবে কিভাবে? অন্তু তো মোটেও পারবে না এসব মুখে বলতে। ভয়ে সেখানেই মরে ভুত হয়ে যাবে। নিশ্চিত তুহিন ভাই সবাইকে বলবে। সেটাই ভালো হবে। 
পেছনের দরজা দিয়ে আবারো তারা ঘরে ঢুকল। ফিরোজ ভাই দরজা খুলে দিলেন। যেন তাদের জন্যই জেগে ছিল সে। তুহিন তাকে জড়িয়ে ধরল। ফিরোজ মুচকি হেসে অন্তুকেও জড়িয়ে ধরল। তার কপালে চুমু খেয়ে বলল, "যা ঘুমোতে যা।” 
অন্তু মাথা নেড়ে ঘরের দিকে পা বাড়াল। তুহিন ভাই আর ফিরোজ ভাই তখনো বসার ঘরে দাঁড়িয়ে। ফিসফিস করে কথা বলছে তারা। অন্তু ঘরে ঢুকে ঘরের জানালা খুলে দাঁড়াল। মনে হচ্ছে তার দমবন্ধ হয়ে যাচ্ছে। তার কান্না পাচ্ছে, মনে হচ্ছে মা জানলে কতোটাই না কষ্ট পাবে। আর বাবা, বাবা শুনলেও তো রাগ করবে। তাকে খারাপ ভাববে! কিভাবে সে দাঁড়াবে বাবার সামনে। আর মামাদেরই বা কি বলবে। তারা যখন জিজ্ঞেস করবে, "অন্তু, তুমি আমাদের বিশ্বাস করেও একটিবার বলে দেখতে। কেন বললে না? তখন কি জবাব দিবে সে? 
তার মন ভার হয়ে উঠল। মুখ খুলে শ্বাস নিতে লাগল সে। যখন এসব ভাবনায় মগ্ন তখনি হঠাৎ দরজা বন্ধের শব্দে সে পিছন ফিরে তাকাল। তুহিন ভাই ঘরে এসেছেন। অন্তু মন আনচান করছে। সে দুই হাতে বাহু জড়িয়ে ধরল। তুহিন বলল, জানালা বন্ধ করে দে অন্তু। ঠান্ডা বাতাস ঘরে ঢুকছে।” 
"আপনি এখানে থাকবেন তুহিন ভাই?” 
"ভাই ভাই কি করছিস অন্তু? জামাই কখনো ভাই হয়। আর বিয়ের পর বর বউ কখনো আলাদা ঘুমায় শুনেছিস। আমি এখানে থাকব না তো কোথায় যাব।" 
অন্তু শুকনো ঢোক গিলে বলল, “যদি সবাই জেনে যায়।" 
তুহিন এগিয়ে এলো। বাতাসে পর্দা গুলো উড়ছে। জানালা বন্ধ করে বলল, “বিয়ে করেছি কি লুকিয়ে রাখতে?" 
“আমার ভয় করছে তুহিন ভাই। সবাই জানলে অনেক…
এরই মধ্যে আচমকা তুহিন গিয়ে অন্তুর গায়ের হুডি টেনে ধরল। অন্তু আঁতকে উঠে বলল, "কি করছেন তুহিন ভাই?” 
"এটা খোল।” 
"খুলব মানে?” 
"মানেটা বোঝা খুব কি কঠিন?” 
অন্তু নিস্তব্ধ হয়ে পড়ল। ঘনঘন শ্বাস নিয়ে তুহিন ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তিনি বেপোরোয়া ভাবে নিজের শার্ট খুলে বিছানায় ছুড়ে ফেললেন। অন্তু চমকে উঠল। জিহ্ব দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলল, "আ…আপনি…
অন্তু তোতলাচ্ছে। মনের কথা মুখে বলতে পারছে না। তুহিন স্পষ্ট গলায় বলে উঠলো, “তুই যা ভাবছিস তাই।" 
অন্তুর কান্না পেলো। ভয় লাগল। তার মনে হচ্ছে সময়টা ঠিক নয়। কিন্তু তুহিন ভাইকে আটকানোর কোনো উপায় নেই। তার হার মানতেই হবে। তবু নিজেকে শক্ত রেখে বলল, “যদি বলি না! আমার আরেকটু সময় চাই।" 
“আমি তোকে বহু সময় দিয়েছি অন্তু। আর না। তুই জানিস আমি চাইলে জোরজবরদস্তি করতে পারি। তুই আমায় আটকাতে পারবি না।" 
আচমকা কেঁদে উঠল অন্তু। তুহিন সঙ্গে সঙ্গে জড়িয়ে ধরল তাকে। তার উদাম বুকে অন্তু লেপ্টে রইল। তার শরীরে অদ্ভুত রকমের অনুভূতি হচ্ছে। তুহিন তার কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বলল, “তোর শরীরের উপর আমার অনেক লোভ এমনটা নয় অন্তু। এমন হলে আগেই অনেক কিছু করা ফেলা যেত। আমি শুধু সময়ের অপেক্ষা করেছি। ন্যায্য সময়! আজই সে সময়। নিয়ম মেনে তোকে বিয়ে করেছি। আজ তুই আমার।” 
অতঃপর তার দিকে ফিরে থিতুনিতে হাত রেখে বলল, "আর তোর উপর একমাত্র অধিকার আমার।” 
অন্তু কান্না থামিয়ে বিস্ময়ে তার দিকে ফিরে আছে। তুহিন এগিয়ে গিয়ে তার ঠান্ডা গাল অন্তুর গালের সঙ্গে ঠেকাল। সঙ্গে সঙ্গে অন্তুর পুরো শরীরে কাঁপুনি ধরে গেল। তুহিন তার গাল বেয়ে চুমু খেতে খেতে সাপের মতো এঁকেবেঁকে গলার কাছে এসে ঠেকল। ঘনঘন শ্বাস ফেলছে অন্তু। তুহিন ভাই টেনে তার হুডি খুলে ফেলল। অন্তু আর বাঁধা দিলো না তাকে। তুহিন ভাই আলগোছে তাকে কোলে তুলে নিল অন্তু তার গলা জড়িয়ে ধরল। সে ঘোরের মধ্যে চলে গেছে। বিছানায় তাকে বসিয়ে দেবার পরপরই তুহিন তার চোখের চশমাটা খুলে নিল। চশমা ছাড়া অন্তু দূরের জিনিস দেখতে পায় না। তবে কাছের জিনিস ভালোই দেখে। সেও দেখতে পাচ্ছে, একমাত্র আর একমাত্র তুহিন ভাইকে। তুহিন আদুরে ভঙ্গিতে অন্তুকে চুমু খাচ্ছে, তার ঠোঁটে, থিতুনিতে। পিঠের চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে তার নরম উষ্ণ ঠোঁটের ছোঁয়া দিল তার পুরো ঠোঁটে। অন্তু বরাবরই সাপের একিয়ে বেঁকিয়ে যাচ্ছে। তুহিন হেসে উঠল। ভয়ে অন্তুর মুখটা শুকিয়ে গেল। সে বালিশে মাথা রেখে শুকনো মুখে বলল, “হাসছেন কেন?" 
“তোর ভয় দেখে। এতো ভয় পাস না অন্তু। আজ আমি উন্মাদ হয়ে যায়নি।" 
বলেই ঝুঁকে গিয়ে আবারো চুমু খেল অন্তুর বক্ষদেশে। অন্তু খামচে ধরল তার উদাম পিঠে। নখের আঁচড় বসছে সেখানে একেরপর এক। তিনি উন্মাদ হয়ে যায়নি বটে তবে উন্মাদ করে তুলছে অন্তুকে। তার ছোট দেহকে, নরম মনকে। এই শীতের মধ্যেও ঘেমে উঠছে তার পুরো শরীর। 
________
বাইরে শীতের কারণে সূয্যিমামার কোনো দেখা নেই। কুয়াশা চারদিক ঢেকে গেছে। জানালার কাঁচ ভিজে উঠেছে। বিছানায় উল্টে হয়ে শুয়ে আছে তুহিন মির্জা। পিটপিট চোখের পাতা ফেলে দেখছে অন্তুকে। সে কাঁচুমাচু হয়ে ঘুমিয়ে আছে। ঘুমের মধ্যে তার ঠোঁটটা উল্টে আছে। তার গায়ের চাদর কোমর অবধি। তুহিন সেটা টেনে দিল অন্তুর গায়ে। নড়চড়ে উঠল অন্তু। হয়তো ঘুম ভেঙ্গে যাচ্ছে। তুহিন তার কাছে এগিয়ে গেল। গালে হাত বুলিয়ে ধীরে ধীরে বলল, 
“অন্তু..
চোখ বুজেই অন্তু জবাব দিল, "তুহিন ভাই…
তুহিন মুচকি হেসে বলল, "একরাত কাটানোর পর এখনো ভাই ডেকে যাচ্ছিস পাগলি।” 
অন্তু মোচরাতে লাগল। তুহিন এবার একটু সিরিয়াস হয়ে তাকে আগলে নিল। বলল, "কি হয়েছে?” 
"তুহিন ভাই..
“হুম। খারাপ লাগছে? শরীর ব্যাথা করছে অন্তু। বল আমায়, কষ্ট হচ্ছে তোর?" 
অন্তু ঘুমের ঘোরেই মাথা নেড়ে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বলল, “না, শীত করছে।" 
তুহিন তাকে আগলে নিল। একদম তার বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে পড়ল, খুব শীত করছে।” 
তার উদাম বুকে অন্তু লেপ্টে রইল। চোখ মেলে তাকাল তুহিনের দিকে। প্রথমে ঝাপসা ঝাপসা দেখল সবকিছু। অতঃপর স্পষ্ট হলো। হাত বাড়িয়ে তুহিনের গালে হাতটা রাখল সে। তুহিন সেই হাত জড়িয়ে ধরল। অন্তু বলল, "আপনি ঘুমাননি সারারাত?” 
"না‌ তো।”
"কেন?” 
"তোকে দেখছিলাম।”
"এতো দেখার কি আছে? এখন থেকে তো রোজই দেখবেন। তাই বলে কি সারারাত জেগে থাকবেন।” 
তুহিন বিছানা ছেড়ে উঠলো। নরম সুরে বলল, "আজকের রাতটা বিশেষ তো তাই।” 
অন্তু চাদর গায়ে টেনে উঠে বসল। তার ঘুম ঘুম চোখ, মুখ ফোলা। শব্দ করে শ্বাস নিয়ে বলল, "আজকের রাতে বিশেষ কি?”
"তুই জানিস না! যা তোকে বলব না।” 
বলেই নিচ থেকে নিজের সাদা রঙের শার্টটা হাতে তুলে নিল। অন্তুর কণ্ঠে অভিমান। সে বলল, 
"না জানলে বুঝি বলবেন না? কেন বলতে নেই কেন?" 
তুহিন হাসল। অন্তু আরো রেগে যাচ্ছে। তুহিন ভাই কি তাকে নিয়ে মজা নিচ্ছে। তুহিন তার শার্টটা অন্তুর গায়ের জড়িয়ে দিল। অন্তু চুপ হয়ে বসে আছে। তুহিন শার্টের সবগুলো বোতাম লাগিয়ে চট করে তার ঠোঁটে চুমু খেয়ে বলল,‌ “কেন জানিস না। আজকের রাতেই তো তুই আমার হলি। এখন সবাই জানবে অন্তু কেবল তুহিনের, কেবলমাত্র তুহিন মির্জার। এটা কি বিশেষ কিছু না।" 
লজ্জায় অন্তু মিটিমিটি হাসল। তুহিন উঠল আবারো। দরজার কাছে গিয়ে দরজার লক খুলে দিল। তবে দরজা ভেড়িয়ে রাখল। অতঃপর এসে চট করে অন্তুর কোলে শুয়ে পড়ল। বলল, “মাথা টিপে দে অন্তু। খুব মাথা ব্যাথা করছে।" 
অন্তু চোখে চশমা পড়ে নিল। তুহিন ভাইয়ের মাথায় তার নরম দুই হাত দিয়ে চুল টেনে দিল। আদুরে সোহাগ করে আমার চুমু খেল তার কপালে। তখনি অন্তু ডাকতে ডাকতে দরজা খুলে ঢুকে পড়লেন মেঝো মামী। অন্তু থমকে তাকাল তার দিকে। মেঝো মামী চমকে উঠে দাঁড়ালেন। 
বিছানায় অন্তু বসে আছে। তার কোলে মাথা রেখে উদাম শরীরে উল্টো হয়ে শুয়ে আছে একটা ছেলে। সে এদিক মুখ ফিরতেই মেঝো মামী আঁতকে উঠলেন। তার হাত থেকে চায়ের কাপ আর বিস্কুট মেঝেতে পড়ে গেল। গতরাতে কিছু না খেয়েই ঘুমিয়েছিল অন্তু। তাই সকালে তার জন্য চা আর বিস্কুট নিয়ে এসেছিল মামী। নাস্তা হতে এখনো অনেক দেরি। কিন্তু এখানে এসে এরকম কিছু দেখবেন এটা তার ভাবনাতেই ছিলো না। তিনি হতভম্ব! বাকরুদ্ধ! এ কি সর্বনেশে কাণ্ড। বিছানার চাদর, বালিশ এদিক ওদিক ছিটিয়ে আছে। মেঝেতে পড়ে আছে অন্তুর জামাকাপড়। এখানে কি হয়েছে তা আর বলার ভাষা রাখে না। সে এক মূহুর্ত না দাঁড়িয়ে ছুটে বেরিয়ে গেলেন। অন্তু ভয়ে নীলবর্ণ ধারণ করল। স্থির নয়নে ফিরে তাকাল তুহিন ভাইয়ের দিকে। কাঁপতে কাঁপতে বলল, “এখন কি হবে তুহিন ভাই?" 
তুহিন জবাব দিল না। গাল বাঁকিয়ে হেসে আবারো তার কোলে মাথা রাখল। 
#চলবে…

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন