#আমায়_দিও_একটুখানি_ছুঁয়ে 💝
#পর্ব_45
#মিমি_মুসকান ( লেখনিতে )
মির্জা বাড়ির পরিবেশ থমথমে। সকাল সকাল বসার ঘরে সভা বসেছে। সেখানে নূরজাহান বেগম থেকে শুরু করে সকলে উপস্থিত। শামীমা মির্জার লজ্জায় মাথা কেটে যাচ্ছে। নাসরিন তার পাশেই বসে আছে। চাপা স্বরে বলল, “মেয়ে ছেলেমানুষ। এখনো বয়স হয়নি তাই বুঝতে পারিনি। বকাঝকা কমিয়ে করো।"
তার এই সান্ত্বনার বাণী শামীমা মির্জার কাছে কোনোভাবেই সান্ত্বনা বলে মনে হলো না। মনে হলো উপহাস। তিনি তাকে উপহাস করছেন। চোখে আঙুল দিয়ে দেখাচ্ছে, কি মেয়ে জন্ম দিলে? জন্ম দিলেই কি হয়ে যায়? ঠিকমতো মেয়েকে শিক্ষা দিতে পারোনি। লাগাম ছাড়া মেয়ে তোমার! ছিঃ ছিঃ ছিঃ! অবিবাহিত একটা মেয়ে এভাবে একটা ছেলের সঙ্গে রাত কাটালো! ছেলে আর কেউ নেই তারই আবার মামাতো বোন। রাগ তো হবেই!
সিঁড়ি বেয়ে তুহিন নামছে বেপরোয়াভাবে। গায়ে শার্টের বোতাম লাগিয়ে এদিক ফিরল। পুরো জনসভা। বাড়ির কাজের লোকগুলো বাদে বাকি সবাই এসেছে এখানে। পিছনে গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে চলছে অন্তু। তার পরনে এখনো তুহিন ভাইয়ের শার্ট। পরনে জিন্স। গায়ে চাদর জড়ানো। তুহিন সিঁড়ি বেয়ে নেমে থেমে গেল অন্তুর জন্য। সে এগিয়ে আসতেই তার হাত ধরে নিল। একসঙ্গে এগিয়ে আসছে তারা। তুহিনের এই আস্প/র্ধা দেখে নূরজাহান বেগম হিতা/হিত জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়লেন। তিনি উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ওখানেই দাঁড়াও।”
অন্তু সঙ্গে সঙ্গে থেমে গেল। কিন্তু তুহিন থামল না। সে অন্তুর হাত ধরেই সামনে এগিয়ে চলল। অন্তুর চোখে মুখে ভী/ত। সে হাতটা ধরে থামানোর চেষ্টা করছে কিন্তু পারছে না। তুহিন এসে বসে পড়ল সামনের সোফাতে। ঠকঠক করে এক গ্লাস পানি খেয়ে নিল। নূরজাহান বেগম চমকে উঠলেন। ভ্রু জোড়া কুন্চিত করে গম্ভীর কণ্ঠে বলে উঠলেন, “তোমাকে দেখে আমি অবাক হয়ে যাচ্ছি তুহিন।"
“অবাক হবার কিছু নেই তো। এটা তো হবারই ছিল। আমরা দু'জন দু'জনকে ভালোবাসি। এতে খারাপ কি?"
শামিমা বেগম চোখ রাঙি/য়ে অন্তুর দিকে তাকালেন। অন্তু চোখ নামিয়ে নিল সঙ্গে। ভ/য়ে তার সর্বাঙ্গ কাঁপছে। শামিমা মির্জা উঠে দাঁড়ালেন। অন্তু/র কাছে দাঁড়িয়ে শুধালেন, “এটা কি পরে আছো?"
অন্তু চমকে উঠল। মাথা নিচু করে দেখল তুহিন ভাইয়ের শার্ট। ইশ,মাথাতেই ছিলো না তার। ছোটাছুটি করে চলে এসেছে। সে কিছু বলার আগেই চট করে একটা থা/প্পর পড়ল তার গা/লে। অন্তু ধপ করে মেঝেতে প/ড়ে গেল। শামীমা মির্জা তবুও ক্ষা ন্ত হলেন না। তিনি তেড়ে গেলেন তার দিকে। হু/ঙ্কার দিয়ে বলে উঠলেন, “এই শিক্ষা দিয়েছি আমি তোমায়? এই শিক্ষা! আমার পেটের সন্তান হতে পারো না তুমি। যাদের আচার ব্যবহারে বাজা/রের মেয়ের ছাপ উঠে যায় সে কিছুতেই আমার মেয়ে হতে পারে না। তোমায় আজ আমি মে/রে ফেলব। মে/রে ফেলব তোমায়!"
এগিয়ে তার কাছে যাবার আগেই তুহিন এসে তার হাত ধরে আটকে দাঁড়াল। অন্তু ভয়ে নীল হয়ে গেছে। একদম নিস্তব্ধ! টু শব্দ অবধি করতে পারছে না। এমনকি কান্নাও আসছে না তার। যন্ত্রণা/য় এতোটাই পাথর হয়ে গেছে সে। মা কি বলল তাকে!
তুহিন চেঁচিয়ে বলে উঠল, “আমার বউয়ের গায়ে হাত তোলার আপনি কে?"
“বউ!"
সকলে হতভম্ব হয়ে গেল। তুহিন আর অন্তু যে বিয়ে করে ফেলেছে এটা কারো মাথাতেই আসেনি। ফিরোজ আর হামিদ ভাই ছুটে এলেন অন্তুর কাছে। তারা হাত ধরে অন্তুকে উঠাল। তুহিন আর শামীমা মুখোমুখি। নিজের হাত ছাড়িয়ে নিয়ে তিনি বলে উঠলেন, "তোমার কি যোগ্যতা আছে আমার মেয়েকে বিয়ে করার? আমি মানি না এই বিয়ে।”
আপনি না মানলে কি বিয়েটা মিথ্যে হয়ে যাবে। আর যোগ্যতার কথা বলছেন?
বলেই হেসে উঠলো। শামীমা মির্জা চোখ মুখ রাঙি/য়ে বললেন, “তুমি মশকরা করছো আমার সঙ্গে তুহিন? হাসছো কেন? কোন কারণে? ভাইজান! ভাইজান আপনি তুহিনকে কিছু বলবেন না?"
জামাল উদ্দিন সাহেব গম্ভীরতা ভেঙে বললেন, “তুমি বিয়ে করেছো অন্তুকে?"
“হ্যাঁ করেছি।
"কবে?
“গতরাতে।"
জামাল উদ্দিন সাহেব মুখ ফিরিয়ে অন্তুকে দেখছে। তিনি অন্তুকে কাছে ডাকলেন। অন্তু মামার সামনে আসতে আসতেই আবেগে আপ্লুত হয়ে উঠল। দু'চোখ বেয়ে তার জল গড়িয়ে পড়ল। হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো সে। ছোট মামা আর মেঝো মামার মন অস্থির হয়ে উঠল। তারা উঠে দাঁড়ালেন। জামাল উদ্দিন সাহেব অন্তুর হাত ধরে বলল, "চুপ করো। কথা বলব তোমার সাথে।”
অন্তু চুপ করতে পারিনি। উল্টো মামার পায়ের কাছে বসে পড়ল। শামীমা বেগম আবারো হুং/কার দিয়ে উঠলেন। বললেন, "কান্না বন্ধ কর অন্তু। ফ্যাচ ফ্যাচ একদম কাঁদবে না। এসব ঢং আর ভালো লাগে না আমার।”
হনহন করে চলে গেলেন অন্যদিকে। অন্তু কান্না থামাল। মামা শান্ত গলায় বললেন, "তোমার আর তুহিনের বিয়ে হয়েছে। এটা সত্যি?”
অন্তু মাথা দুলাল। মামা আবারো জিজ্ঞেস করলেন, "তুহিন জো/র করেছে তোমায়? ভ/য় দেখিয়েছে? অন্তু সত্যিটা বলো আমায়।"
তুহিন আশ্চর্য হয়ে গেল বাবার কথা শুনে। অন্তু নাক টেনে অশ্রুসিক্ত নয়নে ফিরে তাকাল মামার দিকে। চাপা স্বরে বলল, “না মামা। আমি নিজের ইচ্ছায় বিয়ে করেছি তাকে।"
শামীমা মির্জা আবারো হুং/কার দিয়ে বলে উঠলেন, “আমি তোমার জি/ভ টেনে ছিঁ/ড়ে ফেলব অন্তু। এতো সাহস তুমি কোথায় পেয়েছো? যাকে তাকে বিয়ে কেন করবে তুমি? আমি কি ম/রে গেছি।”
নূরজাহান বেগম বলে উঠলেন, "এই সব এই ছেলেটার জন্য। ওর জন্যই এতো কিছু হয়েছে। ও ইচ্ছে করে এমনটা করেছে।"
তুহিন কিঞ্চিত হাসল। নূরজাহান বেগম হতভম্ব হয়ে বললেন, "আবার হাসছে দেখো। তোমার কি বিন্দুমাত্র লজ্জা শরম নেই।”
"লজ্জা শরম কেন থাকবে? আমি বিয়ে করেছি অন্তুকে। এখন ওর সঙ্গে সংসার পাতবো। সারাজীবন থাকবো।”
"আমি থাকতে এটা হতে দিব না। তোমাদের এই বিয়ে আমি মানি না।"
“আপনি মেনে নিন আমি সেটা চাই ও না। অাপনার মেয়ে নেওয়া বা না নেওয়াতে আমার কোনোকিছু যায় আসে না।”
নূরজাহান রা/গে কাঁপ/ছেন। শামীমা মির্জা বলে উঠলেন, "মা! মা আমি আপনাকে বলেছিলাম ওকে পুলি/শে দিতে। বলেছিলাম অন্তু আর রায়হানের বিয়েটা না হওয়া পর্যন্ত ও পুলিশের কাছে থাকুক। এরপর সব ঠিক হয়ে গেলে তুহিনকে বের করিয়ে আনা যেত না। আপনি আমার কথা শুনলেন না মা। ও নামেই শুধু মির্জা বংশের। কিন্তু মির্জার রক্ত ওর শরীরে নেই। শরীরে থাকলে কি আর এতোবড় ঘৃ/ণ্য কাজ করতে পারত। মা দেখুন, ও এখনো হাসছে! আপনি? আপনি কিছু করবেন না!”
নূরজাহান বেগম বসে পড়লেন আবারো। এই বয়সে এতো ভার শরীরে আর নিতে পারছেন না তিনি। হাঁ/পিয়ে উঠেছেন। এরই মধ্যে অন্তু অবাকের সুরে বলে উঠলো, "আমার আর রায়হান ভাইয়ের বিয়ে মানে? আমি কখন বললাম আমি রায়হান ভাইকে বিয়ে করতে চাই?”
অন্তু হতভম্ব হয়ে সকলের দিকে তাকাল। রায়হান ভাইয়ের দিকে তাকাতেই সে চোখ সরিয়ে নিল। মেঝো মামা ছোট মামা অবধি তার চোখে দেখল না। অন্তু হতভম্ব হয়ে তুহিন ভাইয়ের দিকে ফিরল। এতো তাড়াহুড়ো করে বিয়ের কারণ তবে এতোক্ষণেই বুঝতে পারল সে। অন্তু আশ্চর্যান্বিত স্বরে বলল, "আপনারা! আপনারা সবাই জানতেন এই ব্যাপারে? মামা! মামা তুমিও জানতে। কিন্তু আমাকে একবার বললে না।
"তোমায় কেন বলতে হবে অন্তু?”
গম্ভীর স্বরে শামীমা মির্জা বলে উঠলেন।
"বলতে হবে না। তোমরা আমার বিয়ে ঠিক করছো আর আমায় বলবে না।”
"এসব সিদ্ধান্ত নেবার ক্ষ/মতা তোমার নেই অন্তু।”
"নেই মানে? আমি তো কখনো বলিনি আমি রায়হান ভাইকে বিয়ে করতে চাই।”
"তোমার থেকে আমরা কখনো জানতেও চাইনি। আর চাইবো না।”
"চাইবে না মানে? কেন চাইবে না। জীবনটা আমার তোমরা সিদ্ধান্ত নেবার কে? আমায় না জানিয়ে আমার বিয়ে তোমরা ঠিক করো কিভাবে? মামা! মামা তোমরাও? এই তোমাদের ভালোবাসা। এই ভালোবাসো তোমরা আমায়। আমি কি তাহলে এতো কাল তোমাদের কাছে পুতুল হয়ে ছিলাম।”
"অন্তু চুপ করো!”
অন্তু মায়ের চোখের দিকে তাকিয়ে রইল। শামীমা মির্জা তাজ্জ/ব বনে গেলেন। বিয়ের একদিনও হয়নি এখনি তার মেয়ে তার সঙ্গে মুখে মুখে ত//র্ক করছে। তার চোখে চোখ তুলে কথা বলছে। অন্তু মামার হাত ছেড়ে দিয়ে তুহিনের পাশে এসে দাঁড়াল। ছোট মামা বললেন, "ব্যাপারটা এরকম নয় অন্তু। আমরা তোমাকে অনেক ভালোবাসি বলেই দূরে কোথাও যেতে দিতে চাইনি। ভেবেছিলাম রায়হানের সঙ্গে বিয়ে হলে তুমি এইখানেই থাকবে। আমাদের চোখের সামনে।তাই…
“তাহলে এখানে সমস্যা কোথায় মামা। তুহিন ভাই কি মির্জা পরিবারের কেউ নয়। বড় মামার ছেলে সে। আমি তাকে বিয়ে করে কি ভু/ল করেছি। তোমাদের চোখের আড়াল হয়ে গেছি। বল আমায়!"
শামীমা চোখ রা/ঙিয়ে বলল, “অনেক হয়েছে অন্তু। এবার চুপ করো। এতো মুখে মুখে কথা বলার সাহ/স কোথায় পেয়েছো তুমি? হ্যাঁ!"
চেঁচিয়ে উঠলেন তিনি। অন্তু তুহিনের হাত ধরে তার পিছনে লুকিয়ে পড়ল। মিনমিন স্বরে বলল, "তুহিন ভাই চলুন এখান থেকে। আপনি থাকব না এখানে।”
মিনমিন স্বরে বললেও সবাই সে কথা শুনতে পেলো। শামীমা আবারো তে/ড়ে এসে বলল, "থাকবে না মানে? কোথায় যাবে তুমি? কি ভেবেছো এই ছেলেটার সঙ্গে আমি তোমাকে ছেড়ে দিব। কখনো না! বি/ষ খা/ইয়ে মে/রে ফেলব তবুও তুহিনের সঙ্গে তোমাকে ছাড়ব না। তুমি এখানে আসো। কিসব বিয়ে করেছো না, সমস্যা নেই। তা/লাক করিয়ে দেব তোমার। এই বিয়ে সংসার করতে হবে না তোমার। আমি বলে দিচ্ছি,তুহিনের সঙ্গে তুমি সংসার করবে না!”
বলেই অন্তুর হাত ধরে টানতে লাগল সে। অন্তু আ/তঙ্কিত হয়ে ফিরে তাকাল তুহিনের দিকে। মনে পড়ে গেল গতরাতের কথা। গতরাতে সেই একই কথা তুহিন ভাই বলেছিল তাকে। সে বলেছিল, অন্তু, বিয়ে করেছি মানেই আমাদের কেউ আলাদা করে ফেলতে পারবে তা একদম না। এরপরেও সবাই আরো তোড়/জোড় করে আমার আলাদা করতে চাইবে। দেখিস নি, কিভাবে আমার মা আর বাবাকে সবাই আলাদা করে দিল।"
অন্তুর এখন মনে হচ্ছে তুহিন ভাই সঠিক বলেছিলো। তিনি শুরু থেকেই সঠিক পথে ছিলেন। জানতেন কখন কি হবে? কি করতে হবে? সবকিছু! সবকিছু জানতেন তিনি। না অন্তু ভুল করেনি। তুহিন ভাইকে বিয়ে করে সে ভুল করেনি। বিশ্বাসের শিকড় যেন আরো মজবুত হলো। শামীমা অন্তুর হাত ধরে টানছে। অন্তু অন্যহাতে তুহিনের বাহু আঁকড়ে দাঁড়িয়ে আছে। একটা হই/চই পড়ে গেল। সেই হইচই থেমে গেল তুহিনের কাছে। সে শামীমা হাত ধরে তাকে টেনে সরিয়ে বলল, "থামুন আপনি। অনেক হয়েছে। আমার স্ত্রীর গায়ে হাত তো/লার সা/হস কিভাবে পান আপনি!”
শামীমা রা/গে ফুঁসছে। তার চোখ মুখ সমস্ত কিছু লালচে হয়ে উঠেছে। তিনি বললেন, "এসব! এসব তোমার কারণে হয়েছে। সব অ/শান্তির মূল তুমি। তোমাকে আমি!
হাত উঠালেন তিনি। তৎক্ষণাৎ জামাল উদ্দিন মির্জা দাঁড়িয়ে পড়লেন। শামীমার নাম উচ্চারণ করতেই শামীমা থেমে গেল। পুরো বসার ঘর থমথমে এক পরিবেশের সৃষ্টি হলো। সচরাচর জামাল সাহেব বাড়িতে চেঁচিয়ে কথা বলেন না। মায়ের সামনে তো একদমই না। কিন্তু এই প্রথম বার, এই প্রথমবার তিনি চেঁ/চিয়ে উঠলেন। জোর গলায় বলে উঠলেন, "এসব চেঁচা/মেচি থামাও। শান্ত হয়ে ওখানে বসো। এর একটা সমাধান আমরা বের করব।”
শামীমা নিজেকে সামলে নিলেন। সেখান থেকে সেরে এসে বললেন, "কি সমাধান বের করবেন আপনি?"
“আর কি সমাধান থাকতে পারে। ওরা দুজন যখন দু'জনকে চায় তাহলে আমাদের কি সম/স্যা হতে পারে। আর তুহিন তো আমার ছেলে, আমার নিজের ছেলেকে নিয়ে বিশ্বাস আমার আছে। যখন ওরা দুজন দুজনকে পেয়ে সুখী হতে চায় তাহলে তাই হবে। এটাই আমার মত, এই নিয়ে আর কেউ কোনো কথা বলবে না!"
তুহিন বাকরু/দ্ধ হয়ে পড়ল। সে বাক/রুদ্ধ হয়ে চেয়ে রইল বাবার দিকে। এই প্রথম বাবা তার হয়ে কথা বলছে তাও সকলের সামনে। বিশেষ করে তার দাদির সামনে। তুহিন সকল জো/র দিয়ে অন্তুর হাতটা শক্ত করে ধরে নিল। তার মনের অনুভূতি সে কাউকে বোঝাতে পারছে না।
নাসরিন বেগম ও বুঝি অভিভূত হলেন। এই যে গলার তেজ, কথা বলার জোর। এসব কেন আগে করেনি লোকটা। তাহলে তো এতো কিছু এতো দূর অবধি আসতেই পারত না।
ছোট মামাও তাল মিলিয়ে বললেন, "ভাইজানের সঙ্গে আমারও একমত। আমরা তো অন্তুর ভালোই চায়। ও যদি তুহিনকে নিয়ে ভালো থাকে তাহলে আমরাও খুশি।”
মেঝো মামাও সহমত হলেন। বললেন, "ভুল আমাদেরই ছিল। বিয়ে ঠিক করার আগে অন্তুকে জিজ্ঞেস করা উচিত ছিল। ওর তো নিজের ইচ্ছে থাকতে পারে। ভাবী ( নাসরিন বেগমকে উদ্দেশ্য করে ) আপনি আমাদের মাফ করুন। যেই কথা আমরা আপনাকে দিয়েছিলাম তা রাখতে পারলাম না। ওরা আমাদের সন্তান। তাদের সুখের উপর আমরা তো কথা বলতে পারি না।
নাসরিন বেগম হাসার চেষ্টা করলেন। বললেন, "না না। ওরা যদি সুখী হয় তাহলে আমাদের আপত্তি কোথায়। আমার কোনো রা/গ নেই ভাই। যা হয়েছে মঙ্গলের জন্য হয়েছে।
সবাই ঘুরে গেল। সবাই নূরজাহান বেগমের সামনের ঘুরে গেল। তিনি আশ্চর্য হয়ে তুহিনের দিকে তাকিয়ে রইলেন। এই ছেলেটা তাকে দেখিয়ে দিল, এখন আর তার কথার উপর সব চলবে না। তার অন্যা/য় আবদার এখন আর কেউ মেনে নিবে না। তিন ছেলে তাকে না জানিয়েই সিদ্ধান্ত জানিয়ে দিল। তিনি হতবা/ক হয়ে পড়লেন। বড় মামা শামীমার কাছে এগিয়ে এসে তার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন, "বোন। এসব নিয়ে আমরা পরে কথা বলব। আমি সব শুনবো তোর কথা। তুই তোর ভাইকে বিশ্বাস করিস তো।”
ভাইয়ের উপর বিশ্বাস শামীমা বেগমের ছিলো। সে চোখের জল ফেলে মাথা নাড়ল। ব্যাপারটা একটা সুন্দর সমাধা হওয়ায় হামিদ,ফিরোজ, জাবের আর নূর সকলের খুশি। তারা চারজন একসঙ্গে এসে অন্তুর কান্না থামাল। শুরু থেকেই তারা অন্তুর পক্ষে ছিল এই কারণেই এখানে কোনো কথা বলেনি।
________
ঘরেতে ফিরে এলো তারা। তুহিন অন্তুর গালে হাত রেখে বলল, "ব্যা/থা করছে খুব? দেখি একটু…
অন্তু কান্না থামানোর চেষ্টা করছে খুব। কিন্তু পারছে না। তুহিন তার গালের সঙ্গে নিজের গাল ঠেকিয়ে নিল। গালে অসংখ্য চুমু খেল। মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “সরি, আমার জন্যই সবটা হলো। আর হবে না!"
অন্তু কেঁ/দে উঠল আচমকা। তুহিন তাকে সামলানোর চেষ্টা করছে। ব্যর্থ হয়ে বলল, “খুব কি ব্যাথা করছে অন্তু। একটু বরফ নিয়ে আসব।"
তার শার্টের সামনের বোতামগুলো খামচে ধরল অন্তু। কান্না থামিয়ে বলল, "আপনি ঠিক ছিলেন। শুরু থেকেই ঠিক ছিলেন। আমি আপনাকে অবিশ্বাস করতে যাচ্ছিলাম। ক্ষমা করুন আমায়। আর কখনো এমন করব না। সবসময় আপনাকে বিশ্বাস করব!”
তুহিনের মুচকি হেসে বলল, "পাগলি। আমি কি রে/গে আছি কেন। এইজন্য কাঁদছিলি তুই? হুঁশ থাম এবার। দেখি, দেখি না। বিয়ের প্রথম দিন সকাল সকাল বউয়ের মুখে কান্না দেখার জন্য বসে আছি নাকি। একটু হেসে দেখা তো।
"যান তো পারব না।
“পারবি না কেন? আমার জন্য নয় তো আর কার জন্য করবি? দেখি না একটু। দেখি দেখি..
বলেই চট করে চুমু খেলো তার ঠোঁটে। অন্তু ইচ্ছেমত তার বুকে কিল ঘু/সি দিতে লাগল। এমনি সময় দরজায় টোকা পড়ল। অন্তু দ্রুত সরে গেল। তুহিন দরজার কাছে এগিয়ে গেল। অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে দেখে খানিকটা আশ্চর্য হলো সে।
মির্জার বাড়ির বিরাট ছাদে দাঁড়িয়ে তারা দুজন। তুহিন পকেট থেকে সিগারেট বের করে মুখে দিল। একটু সংশয় নিয়েই এগিয়ে দিল রায়হানের দিকে। রায়হান সিগারেট খায় কি না সে জানে না। সত্যি বলতে রায়হান সম্পর্কে কিছুই সে জানে না। জানতেও চায় না।
রায়হান প্যাকেট থেকে একটা সিগারেট নিল। অনায়াসে সিগারেট ধরিয়ে মুখেও দিল। মনে হচ্ছে অনেকদিন ধরেই খাওয়ার অভ্যাস আছে। তুহিন সিগারেটের ধোঁয়া শূন্য ছেড়ে দিয়ে বলল, “কিছু বলবে তুমি?"
রায়হান তার দিকে ফিরে তাকাল। হেসে বলল, “তুমি ঠিক কাজ করেছো!"
“হুঁ?"
“হুম। অন্তুকে আমি কখনো বিয়ে করতে চাইনি। ওকে সবসময় নিজের বোনের মতোই দেখে এসেছি।"
“তার মনে এই বিয়েতে তোমার মত ছিলো না বলছো?"
“কেউ তো আমার মত জানতেই চায়নি। তবে মত ছিলো আবার ছিলোও না। তোমার মতো আমার জীবনে ভালোবাসার মতো কেউ নেই। তাই অন্তুকে বিয়ে করলেও আমার ক্ষতি হতো না, আর না করেও হলো না।"
“ওহ্। তবে আমায় কেন বলছো?"
“কারণ অন্তুর বিরাট ক্ষতি হয়ে যেত। তুমি হয়তো জানো না আমার মা এই বিয়েতে রাজি হয়েছেন কেবলমাত্র প্রতি/শোধের নে/শায়। অন্তুকে বিয়ে করে বাড়ি নিয়ে গেলে তিনি অন্তুর উপর অনেক মানসি/ক অত্যা/চার করতেন। অন্তুর কষ্ট এই বাড়ির কেউ দেখতে পায় না। তাকে কষ্ট দিলে তখন বাড়ির সবাই কষ্ট পেত। বেশি কষ্ট পেতো আমার বাবা। এই কারণে তিনি বিয়েতে মত দিয়েছেন।”
"আর তুমিও সবটা মেনে নিয়েছ।”
"কি যায় আসে এতে? মির্জা বাড়ির রক্তেই আছে এসব।”
"তোমার মা তোমাকে এসব বলেছো।
“তাকে আমি চিনি। কিছু বলতে হয় না।
"এসব জেনেও তুমি বিয়েতে রাজি ছিলেন?”
একটু রাগ নিয়েই কথাটা বলল তুহিন। রায়হান হেসে দুঠোটর মাঝে সিগারেট নিয়ে বলল, "হ্যাঁ, কারণ আমি জানতাম এই বিয়েটা হবে না। শুরু থেকেই জানি তুমি বিয়েটা হবে না। যাই হোক, কনগ্রাচুলেশন। ভালো থেকো!”
অতঃপর আধ খাওয়া সিগারেট নিচে ফেলে দিয়ে রায়হান হেঁটে ছাদ থেকে নেমে গেল। তুহিন সেখানেই নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। এ জগতে মানুষের কতো মুখোস থাকে। দূর থেকে সত্যিই কোনো মানুষকে চেনা যায় না। এরা সাপের খোলসের মতো নিজেদের বদলায়। তাদের চারদিকে কেবল রহস্য আর রহস্য!
______
রাতে খাবার টেবিলে সবার সাথে খেতে বসে তুহিন একটা বোম ফাটালো। শামীমা মির্জা খাওয়া ছেড়ে তার মুখের দিকে বিস্ফোরিত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থেকে বলল, “তুমি যৌতু/ক চাইছো?"
তুহিন মুরগির রানে এক কামড় বসিয়ে বলল, “যৌ/তুক কোথায় ফুফু, এটা তো এই বাড়ির নিয়ম। আপনিই তো আমার মা কে বলতেন, বিয়ের সময় আপনার সঙ্গে ১০ ভরি স্বপ্ন, একটা গাড়ি পাঠিয়েছে। দুটো গরু কেটে বরপক্ষকে খাইয়েছে। এখন আমার তো বরপক্ষ আর নেই কিন্তু বাকিসব তো আমি পেতেই পারি। তাই না দাদি!"
নূরজাহান বেগম ক্রু/দ্ধ দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে আছে। অন্তুকে বিয়ে করার আসল কারণ তিনি এখন বুঝতে পারছেন। তুহিন অন্তুর নাম করেই তাদের জব্দ করতে চাইছে। এদিকে অন্তুর কোনো হেলদোল নেই। সে নিশ্চিত মনে খাওয়া দাওয়া করছে। মাঝে মাঝে কান খাড়া করে কথাও শুনছে। তুহিন ভাই যা চায় তা দিয়ে দিলেই তো হয়। ওরা তো আর কম বড়লোক নয়। এভাবেও তুহিন ভাইকে অন্ধের মতো বিশ্বাস করা শুরু করেছে সে।
শামীমা মির্জার খাবারের রুচি চলে গেছে। সে তার ভাইজানের দিকে তাকিয়ে আছে। জামাল সাহেব দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলে বলল, "তাহলে তোমার কি চাই তুহিন? আমায় বলো। অন্তুর মামা হিসেবে সেই দায় আমি নিবো।”
ছোট মামা বললেন, শুধু তুমি কেন? ওর সব মামারা নিবে। আমাদের বাড়িতে ও একটাই তো মেয়ে। আমাদের মেয়ে কি ফকির বংশের নাকি? মির্জা বাড়ির মেয়ে ও। কি চাই তুহিনের তা জিজ্ঞেস করো না!”
তুহিন গাল টিপে হেসে বলল, "মির্জা বাড়ি!”
সবাই হতভম্ব হয়ে ফিরে তাকাল তুহিনের দিকে। তুহিন হাসতে হাসতে বলল, না না। তোমাদের গ্রামের এই বাড়ি আমার চাই না। শহরের বাড়িটা চাই। ঢাকার মির্জাবাড়ি। ওটা আমার নামে করে দাও। এছাড়া আর কি চাইবো। আজকাল তো মানুষ না চাইলেই বেশি দেয়!"
বলেই আবারো সে খাওয়ায় মনোযোগ দিলো। তুহিনের কথা শুনে হামিদ, জাবের আর অন্তু মুখ টিপে হাসল। মামা বলে উঠলেন, “ঠিক আছে আমি কালই দলিল করে দিচ্ছি।”
মেঝো মামা ও বললেন, "আমি তোমাকে একটা গাড়ি কিনে দিব।"
তুহিন যেচে বলল, “একটু বড় গাড়ি কিনে দিবেন চাচা। ফ্যামিলি ট্রিপে যেন যেতে পারি।"
শামিমা দাঁতে দাঁত চে/পে বলল, নির্লজ্জের মতো কথা বলতে তোমার লজ্জা করছে না।"
“শুরুতেই তো নির্লজ্জ বললেন! তাহলে লজ্জা থাকবে কি করে? বাই দ্যা ওয়ে, আপনাকে আমি ফুফু ডাকব নাকি শাশুড়ি মা। যদিও কোনোদিক থেকেই আপনাকে মানাতে পারছি না…
শামিমা মির্জা রে/গে টেবিল ছেড়েই উঠে গেলেন। তুহিন হেসে তার দাদির দিকে তাকাল। নূরজাহান বেগম দিনে দিনে বুড়ো হয়ে যাচ্ছেন। তার এই শেষ বয়সে তুহিন তার চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিচ্ছে তার ভুলগুলো। আরো দেখাবে। সামনে আরো আছে। শেষ বয়সে এই বুড়িকে অপরা*ধীর কাঠগোড়ায় না দাঁড় করালে সে শান্তি পাবে না মোটেও!
তুহিন অন্তুকে নিয়ে ঢাকায় ফিরে এসেছে। তারা দু'জন একাই এসেছে। ঢাকার মির্জা বাড়িতে কিছুই বদলে যায়নি। সবকিছুই আছে আগের মতো। শুধুমাত্র অন্তুর ঘরটা বদলে গেছে। তুহিন অন্তুর ঘরে শিফট করে গেছে। মতি মিয়াকে দিয়ে ও ঘরের সব জিনিসপত্র এই ঘরে নিয়ে আসা হয়েছে। এতোটুকুই। তাদের বিয়েতে সত্যি সত্যি যে মানুষটি খুশি, যে মানুষটি একবারও অবাক হয়নি। বিব্রত হয়নি। বরঞ্চ হেসে তাদের দোয়া করেছেন তিনি হলেন রহিমা খালা। শুধু তাই নয়, তাদের আসার খুশিতে তিনি নিজের বাজার করে রান্না করে তাদের খাইয়েছে। এসব এলাহী কারবার দেখে তুহিন মোটেও খুশি নয়। কিন্তু রহিমা খালার এক কথা। তার এই জীবনে কেউ নেই। এই পরিবারই তার পরিবার। তিনি করবেন না তো কে করবে?
এইসব কথা শোনার উপর তুহিন আর মুখের উপর কিছু করতে পারেনি। রক্তের মানুষের কৃত্রিম ভালোবাসা সে দেখেছে। তাদের মাঝে এই অকৃ'ত্রিম ভালোবাসা তাকে অভিভূ'ত করল।
বিকেলের দিকে তুহিন ঘরে ঢুকে উঠল অন্তু বিছানার উপর থম মেরে বসে আছে। তুহিনের উপস্থিতি সে টের পায়নি। তুহিন দরজায় নক করল। অন্তু থড়মড় করে লাফিয়ে উঠল। গায়ে ওড়না জড়িয়ে পিছন ফিরে তাকাল সে। তুহিন ভাইকে দেখে কিঞ্চিত হেসে উঠল। তুহিন হাতের প্যাকেটটা ড্রয়ারের উপর রেখে বলল, “কি ভাবছিলি?"
অন্তু মাথা নাড়িয়ে বলল, “কিছু না।"
“এদিকে আয়।"
অন্তু এগিয়ে গেল তার কাছে। চোখে চশমা। কোঁকড়া চুলগুলো এলোমেলো হয়ে আছে মাথার মধ্যে। কপালের কাছের চুলগুলো তুহিন কানের পিছনে গুঁজে দিয়ে বলল, "কি হয়েছে?”
অন্তু আগের মতোই মাথা দুলিয়ে বলল, "কিছু না!”
কিন্তু সত্যিই কিছু একটা হয়েছে। অন্তু সেই কথা লুকিয়ে রাখতে চাইছে। তুহিন জোর করল। বলল, "তৈরি হয়ে নে। আমরা বেরুবো।”
"কোথায় যাবো?”
"গেলেই দেখতে পাবি। তাড়াতাড়ি হুম।”
বলেই প্যাকেটা হাতে ধরে দিয়ে সে বেরিয়ে গেল। অন্তু প্যাকেট হাতড়ে একটা শাড়ি পেলো। জর্জেটের লাল রঙের শাড়ি। মৃদু হাসি তার গাল জোরে। বিয়ের পর এই প্রথম তার স্বামী তার জন্য উপহার এনেছে। এটা তার কাছে বিশাল ব্যাপার।
সুন্দর করে শাড়িটা পরে নিল অন্তু। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়ে নিচ্ছে। তুহিন ঘরের মধ্যে ঢুকে হতভম্ব হয়ে তার দিকে ফিরে তাকাল।অন্তু মহা উৎসাহে তার দিকে ফিরে আছে। তুহিন ভাইয়ের মুখে প্রশংসা শোনার জন্য মুখিয়ে আছে। কিন্তু অন্তুকে হতাশ করে দিয়ে তুহিন তাড়াহুড়ো দেখিয়ে বলল, "তৈরি? দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমাদের বেরুতে হবে।”
অন্তু হাসার চেষ্টা করল মাথা নাড়ল। তুহিন হাতটা বাড়িয়ে দিতেই তার হাত ধরে নিচে নেমে এলো সে। তুহিন গাড়ি বের করেছে। নতুন গাড়ি। মেঝো চাচা উপহার হিসেবে যেটা দিয়েছিলেন সেটাই। গাড়িতে উঠে বসল তারা। তুহিন গাড়ি চালাচ্ছে। একহাতে গাড়ির হ্যান্ডেল অন্যহাতে অন্তুর হাতটা। তুহিন সামনের দিকে চেয়ে থেকে একাই বলে যাচ্ছে, “বিজনেস করব ভাবছি অন্তু। চাকরি বাকরি আমার দ্বারা হবে না। বুঝলি তো? নিহাম আমি আর সামির মিলে একটা বিজনেস দেবো ভাবছি। তুই কি বলিস?"
অন্তু ম'গ্ন হয়ে তার কথা শুনছে। তুহিন জবাব না পেয়ে এদিক ফিরতেই দেখল টানা টানা চোখ জোড়া ফ্যাল ফ্যাল তাকে দেখছে। শুকনো ঢোক গিলে সে সামনে মনস্থির করল। অন্তু হাতটা শক্ত করে ধরে বলল, "জবাব দিচ্ছিস না কেন?"
“হুঁ, ভালোই হয়। কিন্তু মামার এতো বড় ব্যবসা ছেড়ে আপনি নিজে ব্যবসা শুরু করবেন। এটা ভালো হবে কি?"
“কেন হবে না। তোর মামা নিজের ব্যবসা নিজে দিয়েছে। আমি আমারটা দিব। তুই কি ভাবছিস, আমি এখনই ভাবছি আর এখনই দিব। না! তা না অন্তু। তুই জানিস না, আমি এর আগেও বহুবার নিজের বিজনেস দেবার ট্রাই করেছি। ছোট ছোট অনেক বিজনেস। সবগুলোই তোর মামা ইচ্ছে করে ভু'ণ্ডু"ল করে দিয়েছে। তিনি চান আমি তার ব্যবসা দেখি। কিন্তু সেখানে আমার আপত্তি চ'রম। আমি নিজের নাম করতে চাই।”
“সবসময় বাধা দিয়ে থাকলে এবারও তো দিবে।"
“না দিবে না। এবার তুই আছিস না। তাই দিবে না। এবার আমার জীবনটা তো আর একা নয় অন্তু, তোর জীবন ও জড়িয়ে আছে। তাই আর তোর মামা এমনটা করবে না। তুই ভাবিস তোর মামা খুব মহৎ তাই না।”
"বড় মামা তো ভালোই। খারাপ কোথায় দেখলেন।”
তুহিন উপহাস করে বলল, "তোর মামা মামা হিসেবেই ভালো, বাবা হিসেবেও তার যেমনি কোনো অবদান নেই তেমনি স্বামী হিসেবেও নেই।”
অন্তু চুপ করে গেল। ঢোক গিলে বলল, "আপনার মনে হচ্ছে আপনি আমায় ব্যবহার করছেন!”
"করছি বৈকি। শুরু থেকেই জানতাম এমনটা হবে। আমার পাশে তুই না থাকলে তোর পুরো পরিবার আমায় হা'য়েনা'র মতো ছিঁ'ড়ে খাবে। বিশ্বাস করছিস না? এই ধর কাল যদি তুই বলিস আমার সঙ্গে তুই থাকতে চাস না দেখবি তার পরদিনই তোর নানি আমার নামে একশ টা মামলা করে আমায় জেলে ঢুকিয়ে দিবে। বাকিটা জীবন ওই জেলের ভাত খেয়েই থাকব। তুই শুধু আমার বউ না, একটা বড় রি'স্ক ও বটে। এই রি'স্ক জেনেও আমি তোকে ভালোবেসেছি, নিজের করে নিয়েছি।"
“বেশি বেশি কথা বলেন আপনি?"
“বেশি কথা বলি? কেন তোর বাবাকে দেখিস নি। কি আছে আর উনার কাছে? তোর মায়ের সঙ্গে ডির্ভোসের পর তার হাতে আর কিছু নেই। বাড়িটা বিক্রির পর অর্ধেকের বেশি টাকা তোর মা কে দিয়েছেন। বাকি টাকা নিয়ে তিনি দেশান্তরে গেছেন। বুড়ো বয়সে কি করবেন কিছু জানা নেই তবে যতদিন বাঁচবেন নিজের মতো করে বাঁচবেন। তার ভাবনা ঠিক। কিন্তু তোর মা মামা নানি যা করেছে তা কি ঠিক? আমি কি ভুল কিছু বলেছি অন্তু? এগুলো কি মিথ্যে? তুই কি জানিস না কিছু।”
অন্তু কথা না বাড়িয়ে গাড়ির জানাল খুলে দিয়ে ঘন ঘন শ্বাস প্রশ্বাস নিতে লাগল।
_________
অন্তুর দম এবার পুরোপুরি বন্ধ হয়ে আসছে। খোলা ঘরের ভেতর বসে আছে সে তবুও তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠছে। কি অস্ব'স্তি মনের ভেতর।
তুহিন ভাই পাশেই বসে আছে তার। সে তার হাতটা আঁকড়ে ধরল। কমবয়সী একটা মেয়ে ঘরে ঢুকল। মেয়েটার নাম বোধহয় ইরা। তুহিন ভাই অনেকবার তাকে ইরা নামেই ডেকেছে। তুহিন ভাই ফের বলল, “মামী কোথায়?"
“আসছে।"
বলতে বলতে এক ভদ্রমহিলা ঘরে ঢুকলেন চা নাস্তা নিয়ে। টেবিলের উপর রেখে বললেন, “প্রথমবার নতুন বউ নিয়ে এসেছো। আসার আগে একবার ফোন করবে না তুহিন।"
তুহিন হাসার চেষ্টা করে বলল, “চা মিষ্টি খাওয়ায় অবস্থায় কি আছি মামী। আপনি শুধু শুধু এসব করছেন। ব্যস্ত হবেন না বসুন।"
মামী চিন্তিত মুখে সামনে বসে বললেন, “তোমার মা কাল থেকে ঘরের দরজা খুলেনি। বন্ধ করে বসে আছে।"
ইরা ফট করে বলল, “তোমার বিয়ের খবর শোনার পর থেকেই দরজা বন্ধ করে বসে আছে। বাবাকে বলেছেন তিনি এই বিয়ে মানেন না।"
মামী চোখ রাঙিয়ে ইয়ার দিকে তাকাল। ভ*য়ে অন্তুর মন ছ'টফ'ট করছে। মামী বললেন, “তুমি একবার গিয়ে দেখো না। তোমার মামা কে কল করেছি এই এলো বলে।"
তুহিন অন্তুর দিকে একবার ফিরে বলল, “বসো আমি আসছি।"
অতঃপর উঠে চলে গেল। মামী অন্তুকে চা সাধল। অন্তু চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বসে আছে। চা খাচ্ছে না। ইরা মেয়েটা বোধহয় তার উপর ভীষণ বি'র'ক্ত। যতবার আসছে ততোবারই চোখ মুখ কুঁচকে তাকাচ্ছে।
তুহিনের পিছু পিছু ইরা বেড়িয়ে গেল। মামী তাকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করছেন। অন্তু ধীরে ধীরে জবাব দিচ্ছে। মানুষটিকে তার খারাপ মনে হলো না। এরই মধ্যে আরেক ভদ্রলোক এলেন। অন্তু বুঝতে পারলেন তিনিই মামা।
অন্তু উঠে দাঁড়াল। সালাম জানাল। মামা খুশি হয়ে ফিরে তাকালেন। তার হাতের দই মিষ্টি মামীর হাতে তুলে বললেন, "নাও নাও। সবাইকে মিষ্টি দাও। তা মা দাঁড়িয়ে কেন বসো। রাতে কিন্তু খেয়ে যেতে হবে। আমি না খাইয়ে ছাড়ছি না।"
অন্তু হাসার চেষ্টা করল। তুহিন বসার ঘরে ঢুকে বলল, “না মামা, দরকার নেই এসবের। আমরা চলে যাচ্ছি।"
“মামী বললেন, "চলে যাচ্ছ মানে? এই তো এলে।”
“অনেকক্ষণ এসেছি মামী। ঘণ্টা খানেক পেরিয়ে গেছে।”
“আয়শা দরজা খুলেনি।"
“না মা বলেছেন দরজা খুলবেন না। আমার মুখ তিনি দেখতে চাননা। তাই চলে যাচ্ছি। অন্তু চলে আয়।"
“রা'গারা'গী করো না তুহিন, শান্ত হও। তুমি তো আপার অবস্থা জানো।"
পেছন থেকে ইরা বলল, “তুমি তো সব জানো। তোমার ওই শ*য়*তা*ন ফুফুর মেয়েকে কেন বিয়ে করেছো? ফুফু বলেছেন, এই বিয়ে তিনি মানবেন না। তুমি যতদিন না অন্তুকে তালাক দিচ্ছ তিনি তোমার সঙ্গে কথা বলবেন না। তোমার মুখ ও দেখবেন না!"
মামী তৎক্ষণাৎ ইরাকে ধ'ম'ক দিয়ে চুপ করতে বললেন। অন্তুর নিশ্চুপ ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল। তার কাছে মনে হলো তার পুরো শরীর দুলছে।
________
তারা ফিরে যাচ্ছে বাড়িতে। তুহিন গাড়ি ড্রাইভ করছে। অন্তুর অ'স'হ্য লাগছে। সে গাড়ির এসি বাড়িয়ে দিল। তাতেও হলো না। গাড়ির জানালা খুলে দিল। হাঁসফাঁস করতে লাগল। তুহিন চাপা স্বরে বলল, "এতো অ'সহ্য লাগলে শাড়িটাও খুলে ফেল।”
চোখ মুখ শক্ত করে তুহিন ভাইয়ের দিকে ফিরে তাকাল অন্তু। শক্ত কণ্ঠে বলে উঠলো, "সেটাই ইচ্ছে করছে আমার এখন।”
"এতো রে'গে যাচ্ছিস কেন?”
"রা'গ'ব না। আপনি কি কিছু বুঝতে পারছেন না।”
"কোন ব্যাপারে?”
"কোন ব্যাপারে মানে? আপনি কি চোখে কিছু দেখতে পান না? আমি তো স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। আপনার মা চান আপনি আমাকে তালাক দিয়ে ওই ইরা মেয়েটাকে বিয়ে করুন। ইরার এই ব্যাপারে শতভাগ আগ্রহ আছে। তার চোখ মুখ দেখেই আমি বলে দিতে পারি।"
“ব্যাপারটা এতো দূর চলে গেছে।"
“হাসছেন? হাসবেন না। একদম হাসবেন না। আমার মাথায় র*ক্ত উঠে গেছে। আপনি আমায় বলুন তো, আপনি কি সত্যি সত্যিই আমাকে তালাক দেবার কথা চিন্তা করছেন?"
তুহিন জবাব দিলো না, ফিরেও তাকাল না। কেবল সামনে তাকিয়ে মুচকি হাসল। অন্তুর চোখে জল এলো। সে কেঁদে উঠে বলল, “মা ঠিক বলেছিলো। একদম ঠিক বলেছিলো মা।"
“তাই নাকি? তা কি বলেছিলো আমার ফুফু তোকে?”
“মা বলেছিলো আপনি আমাকে ভালোবাসেন না। বিয়ের কিছুদিন পরই ছেড়ে দিবেন আমায়। আর এটাই হতে চলছে।"
“ওহ। আর কিছু বলেনি।"
অন্তু ঘুরে বসল তার দিকে। ফিরে বলল, “বলেছে না। বলেছে আপনি ইচ্ছে করে কাবিন কম করেছেন। নাহলে ৫ লাখ টাকা কাবিন কে করে আজকালকার বিয়েতে।"
“ওহ এরপর…
“বলেছে এতো জলদি বা'চ্চা না নিতে। আপনার সাথে থেকে ভালো করে আপনাকে দেখেশুনে এরপর বা'চ্চা'র কথা ভাবতে। নাহলে পরে আমাকে অনেক আফসোস করতে হবে।"
তুহিন হেসে ফিরে তাকাল অন্তুর দিকে। ধীরে গাড়িটার ব্রেক কষল। রাগে হাপাচ্ছে অন্তু। তুহিন বলল, “তুই এসব নিয়ে তখন চিন্তা করছিলি তাই না।"
অন্তু গাল বেয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়ল। সে উল্টোপথে চোখ মুছে বলল,
“মায়ের কোনোকথা আমি বিশ্বাস করতে চাইনি। কিন্তু এখন, এখন আপনার হাবভাব দেখে মনে হচ্ছে। না, আপনি বলুন তো আমার উপর থেকে কি আপনি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছেন। এতো জলদি, এই দুই সপ্তাহে। শাড়ি পরে যখন আপনার সামনে দাঁড়ালাম আপনি একবারও তো আমার প্রশংসা করলেন না। একবারও তো মুখ ফুটে বললেন না, আমাকে সুন্দর লাগছে। কি হলো কথা বলছেন না কেন? আপনি এখন সত্যি সত্যিই আমাকে তালাক দিয়ে ওই ইরাকে বিয়ে করবেন তাই না। তাহলে আমাকে বিয়ে কেন করলেন, মির্জা বাড়ির জন্য। এই মির্জা বাড়ির নিজের নামে করার জন্য?”
তুহিন আশ্চর্য কণ্ঠে বলল, "এই কথাটাও ফুপু তোকে বলেছে।"
অন্তু মুখ ঘুরিয়ে নিল। তুহিন ফের বলল, “না। ফুপু না। দাদী বলেছে তাই না।”
অন্তু ঢোক গিলে বলল, "মি*থ্যে বলেছে?”
তুহিন হেসে বলল, বিয়ে করতে না করতেই তারা তোর কানে বিষ ঢালা শুরু করেছে। তুই বুঝতে পারছিস এসব অন্তু?"
“না পারছি না। আমি কিছু বুঝতে পারছি না। আমার অ'সহ্য লাগছে, অ'স্থি'র লাগছে। ভেতরে ভেতরে আমি ক*ষ্ট পাচ্ছি। আপনি কি? আপনি কি দেখতে পাচ্ছেন না আমায়…
“চুপ চুপ, অন্তু। ধীরে। উ'ত্তেজি'ত হয়ে পড়িস না। চুপ।"
বলেই অন্তুকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে নিল তুহিন। অন্তু বাঁধা দিলো না। সে যেন এটাই চাইছিলো। তুহিন ভাই তাকে জড়িয়ে ধরুক। একটু ভালোবাসুক। একটু আদর করুক। আশপাশ শুনশান নিরব জায়গা। অন্তু তুহিনের বুকের মধ্যে লুকিয়ে আছে। তুহিন গাড়ির অডিও সিস্টেম থেকে একটা গান বাজাল তখন,
"আমায় ছেড়ে কোথায় যাবে তুমি
বলবে কে আর এমন করে ভালোবাসি।
আমায় দিও একটুখানি ছুঁয়ে
আমায় দিও একটুখানি মন
এই জনমের জ'ন্ম মৃ*ত্যু জানে
তুমি ছাড়া শূন্য এ জীবন….
গানের প্রতিটা লাইন, প্রতিটা শব্দ যেন তুহিনের মনের অনুভূ'তি গুলোকে সংঙ্গায়িত করে জানান দিচ্ছিল। তার মন বলে দিচ্ছে, তুমি ছাড়া আমার আর কেউ নেই, কোনো আশ্রয় নেই। তুমি আমায় ছেড়ে চলে যাবার আগেই আমার মৃ*ত্যু নিশ্চিত। আমার শূন্য জীবন শূন্য হয়ে রইবে তবু তোমার স্থান কেউ পূরণ করতে পারবে। এই সামর্থ্য কারো নেই।
অন্তু ঝিমিয়ে পড়ল। তার ছ'টফ"ট হৃদয় শান্ত হলো। তুহিন তার হাতটা চেপে ধরল। অন্তুর মনে পড়ে গেল, বাসা থেকে বের হওয়া থেকে এই অবধি তুহিন তার হাত ছাড়েনি। এমনকি গাড়ির মধ্যে কথা কা'টাকা'টির সময় তুহিন অন্তুর হাতটা ধরতে চেয়েছিল। কিন্তু অন্তু ধরতে দেয়নি। সে লজ্জিত হলো সামান্য।
অন্তু তার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “ভালো লাগছে?"
“হুঁ!"
তুহিন দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেলল। বলল, অন্তু। আমার জীবনে তোর বিশেষ রকমের এক অবদান আছে জানিস।
“কি?"
“তোকে ছাড়া আমি ছিলাম ছন্নছাড়া। উদাসীন। তুই আসার পর আমার জীবন পূর্ণ হয়ে উঠল। আমি সব ফিরে পেলাম। আমার সুখ, শান্তি, ভালোবাসা সব তোর দখিলে। তুই আছিস তো সব আছে। তুই নেই আর কিছুই নেই। ভাবতে পারছিস, তুই ছাড়া মূহূর্তেই আমার জীবন নরক হয়ে উঠবে। তাহলে তোকে ছেড়ে, আমার শান্তি ছেড়ে সেই ন*র*কে আমি যাব কেন বল তো?"
“তার মানে আপনি আমায় ছেড়ে দিবেন না।"
“ছাড়াছাড়ির প্রসঙ্গ আসছে কেন?"
“আপনার মা..
"মায়ের জন্য আমি আছি। তোর চি'ন্তা করতে হবে না। প্রতিটি মা’ই তার সন্তানের প্রতি দু*র্ব*ল। দেখবি আমার মা তোকে মেনে নিবে, আর খুশি মনেই মেনে নিবে। একটু সময় লাগবে তবে সব হবে। পরিস্থিতি বুঝিস তো। মা ফুফুকে স'হ্য করতে পারেন না। মায়ের মানসিক অবস্থা মোটেও ঠিক নেই। তিনি উল্টাপাল্টা কথা বলবে স্বাভাবিক তোর এসবে কান দিলে হবে? এই যেমন ধর, তোর এতোক্ষণ আবোল তাবোল বকবকানিতে আমি কান দিয়েছি। দেইনি তো।”
অন্তু ঠোঁট কা'মড়ে মুখ লুকিয়ে ফেলল। তুহিন হেসে উঠে বলল, "ফুফু আর দাদী ঠিক হবে না। নারীজাত তো! এদের ঠিক হতে বহু সময় লাগবে। বাব্বাহ, কি কি বলেছে তোকে। সবগুলো কথাই সত্যি হয়ে যেতে পারত!”
অন্তু চোখ মুখ কুঁচকে ফিরে তাকাল তুহিনের দিকে। তুহিন তার কপালে চুমু খেয়ে বলল, "ভালোবাসা সহজ অন্তু, কিন্তু বিশ্বাস করা সহজ নয়। আমি আজ তোকে ভালোবেসে বিয়ে করিনি কাল ছেড়ে দেবার জন্য। ছেড়ে দেবার কথা আমি ভাবতেও পারি না। তুই আমার র*ক্তে মিশে গেছিস। বুঝলি তো? ছাড়ব কেন তোকে? যাকে তাকে ভালোবাসা যায়, কিন্তু চোখ বন্ধ করে বিশ্বাস করা যায় না, ভরসা করা যায় না। তুই আমায় বিশ্বাস না করলে, ভরসা না করলে আমার কি হবে অন্তু?"
“আমি বিশ্বাস করি তো আপনাকে..
"জানি আমি। কিন্তু সেই বিশ্বাস যে ঠুকনো না হয়ে যায় অন্তু। পরিস্থিতি সময় সব বুঝতে হয়। সবকিছুর একই সঙ্গে একটা পজেটিভ আরেকটা নেগেটিভ দিক থাকে। তোকে দুটোই খুঁজে নিতে হবে। এই যেমন দেখ, তোকে যখন লাল শাড়ি পরা দেখলাম আমার বুকের মধ্যে অসহ্য য*ন্ত্র*ণা শুরু হয়ে গেল। মনে হলো আসমান থেকে সাক্ষাৎ হুর এসে পরেছে আমার ঘরে। ইচ্ছে করল কাছে এসে তোকে একটু আদর করি,একটু চুমু খাই। কিন্তু… কিন্তু তার দু মিনিট আগেই ফোনে মামার সঙ্গে কথা বলে জানলাম মা খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে দরজা বন্ধ করে বসে আছে। এখন তুই বল, আমার অনুভূতির অবস্থা কি হলো? আমি একই সঙ্গে দুই অনুভূতির সঙ্গে লড়াই করছি। মায়ের কথা শুনে আমার মন ছটফট করে উঠল। মনে হলো এখুনি মায়ের কাছে ছুটে যাই। আবার তোকে দেখেও ভালোবাসার স্রোতে গা ভাসাতে ইচ্ছে করল। কি করব বুঝতে পারিনি। তাই রিয়েক্ট করাই ছেড়ে দিলাম। ভাবলাম অনুভূতি চেপে রাখি। তুই তো আর পালিয়ে যাচ্ছিস না। ভুল কিছু বলেছি অন্তু…
অন্তু শব্দ করে নিঃশ্বাস ফেলল। এতো বিস্তারিত চিন্তাভাবনা তো তার ছিলো না। একগুঁয়ে মন নিয়েই সে বসে ছিল। তুহিন অন্তুর মুখপানে তাকিয়ে চোখে চোখ রেখে বলল, “তোকে ছাড়া কি আমার জন্য এতোই সহজ বলে মনে হয় তোর…
লজ্জায় অন্তু চোখ নামিয়ে ফেলল। সে তার বুকে মাথাটা রেখে চোখ বন্ধ করে নিল। তাকে ওই অবস্থায় বুকে জড়িয়ে রেখে তুহিন গাড়ি ড্রাইভ করতে শুরু করল। হঠাৎ ফিসফিসিয়ে বলল, “তবে ফুফু একটা কথা কি বলেছে?"
“কোন কথা?"
“বাচ্চার কথা। এখন একটা বাচ্চা এলেই মায়ের মন বদলে যাবে। অনাগত নাতি নাতনির জন্য তিনি ছুটে চলে আসবেন আমার কাছে। তোর মা ও কু'ট'নামি করা বন্ধ করবে।
"ধ্যাত। শুধু বাজে কথা।
“না সত্যি বলছি। এখন একমাত্র আমার বাচ্চাই পারে সবটা ঠিক করতে।
লজ্জায় অন্তু র*ক্তি*ম হয়ে উঠল। তুহিন ভাই ইদানিং খুব লাগাম ছাড়া হয়ে উঠেছে।
_______
আজ অন্তু দাঁড়িয়ে দরজার বাইরে। ভেতরে বাবা বসে। তার সামনে গিয়ে দাঁড়াতে ভীষণ ক*ষ্ট হচ্ছে অন্তুর। সে যেন এক অ*পরা*ধী। অ*পরা*ধীর বেশেই আজ হাজির হবে বাবার কাছে।
ভেতর থেকে আজিজ কবীর বললেন, "বাইরে দাঁড়িয়ে কেন অন্তু? আসো ভেতরে আসো।”
অন্তু পর্দার সামনে এসে দাঁড়াল। আজ সে শাড়ি পরেছে। বিয়ের পর থেকেই সে রোজ শাড়ি পরে। তুহিন ভাই বলেছেন শাড়িতে তাকে চমৎকার লাগে। এরপর থেকেই শাড়িই যেন সব।
আজ পরেছে সুতি রঙের নীল একটা শাড়ি। আজিজ কবীর কিছুক্ষণ তার দিকে ফিরে তাকিয়ে বলল, "অন্তু নাকি! শাড়িতে একদম তোর মায়ের মতো লাগছিলি। আয় এদিকে আয়।”
অন্তু এগিয়ে গেল। বাবার পাশে তাকে বসালেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। অন্তু বাবাকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠল। বাবা বললেন, "ছিঃ ছিঃ। কান্নার কি আছে? এতো গুলো দিন পর কি তোর কান্না দেখতে এসেছি অন্তু?”
"বাবা, সবাই বলে আমি ভু'ল করেছি। তুমি বলো? তোমারও কি তাই মনে হয়।”
বাবা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ফেললেন। বললেন, "ঠিক ভুল নিয়ে বিয়ের সিদ্ধান্ত হয় না অন্তু। তোমার মা কে বিয়ে করার পর আমি কখনো ভাবিনি একসময় আমার তাকে ছেড়ে দিতে হবে। নিজের কর্পোরেট জীবন ছেড়ে এরকম ভবঘুরের মতো ঘুরে বেড়াব। বলো ভেবেছি কখনো?"
“কিন্তু তুমি তো ঘোরাঘুরি করতে ভালোবাসো বাবা।"
“বাসি তো। আমি তো এখন ঘুরেই ভালো আছি। কিন্তু অন্তু, আমি কি তোমাদের সঙ্গে থেকে খারাপ ছিলাম। সবসময় তো খারাপ ছিলাম না বলো। একসময় তো ভালোই ছিলাম তাই না।"
অন্তু মাথা দুলিয়ে বলল, “তুমি রে'গে আছো আমার উপর।"
“আমায় না জানিয়ে বিয়ে করলে রা'গ করতাম খুব।”
অন্তু সন্দেহের চোখে ফিরে তাকাল। আজিজ অন্তুর চোখের চশমা খুলে পরিষ্কার করে দিয়ে বলল, "তোমার বিয়ের আগেরদিন তুহিন আমায় ফোন করেছিলো। সে আমাকে সব জানিয়েছে। তোমাকে বিয়ে করতে চাও। তুমিও নাকি তাকে ভালোবাসো। এখন সে আমার মত চাইছে। এই বিয়েতে আমি যেন তোমার হয়ে মত দিই।”
অন্তু চোখে চশমা পরে বাবার দিকে তাকাল। বাবা হাসছেন। অন্তু বলল, "তুমি কি বললে বাবা?”
"আমি? আমি বললাম আমার অন্তু যা চায় তাই হবে। সে তোমাকে পেয়ে খুশি হলে, আমিও খুশি।"
বাবা তাকে জড়িয়ে ধরে বললেন, “তুহিন ছেলেটা মন্দ নয়, তাই না বলো।"
অন্তু আর আজিজ হেসে উঠল একসঙ্গে।
বিকেলে গাড়ি আর বাইকের হর্ণের শব্দ শোনা গেল। অন্তু বেলকনিতে এসে দাঁড়াল। গাড়ি থেকে নামল রোহান, দর্শনা, আরমান, রিয়াজ আর সামির। বিয়ের পর দর্শনা কে দেখতে আরো সুন্দর লাগে। আগে সবসময় ছেলেদের মতোই পোশাক আশাক পরত। ইদানীং সে শাড়ি পরে। কি মিষ্টি লাগে দেখতে।
পেছনে বাইক করে অরিত্র আর তাহিয়া নেমে পড়ল। অন্তু ছোট ছোট চোখ করে দেখছে। এদের মধ্যে নির্ঘাত কিছু চলছে। পাশেই চোখ পড়ল নিহাম আর অদিতির উপর। ওরা একসঙ্গে এক বাইকে! অন্তুর চোখ কপালে। নিহাম তাহলে কাজ করেই ফেলেছে। সেদিনের ঘটনা মনে পড়লে এখনো হাসি পায় তার। নিহাম ভাই অদিতিকে ভালোবাসে। এই অদিতিকে কিভাবে রাজি করানো যায় এই নিয়ে অন্তু আর সে কতো ফন্দি এঁটেছে। ফাইনালি তারা একসঙ্গে। পরের বাইক থেকে বর্ষনা আর ত্রিয়ানা নামল। ত্রিয়ানা বাইকের হেলমেট খুলে এদিক ফিরল। অন্তু হাত নাড়ল। মুচকি হাসল সে। পেছনেই আরো একটা গাড়ি ঢুকল। ওটা তুহিন ভাইয়ের গাড়ি। তিনি গাড়ি পার্ক করে নামলেন। তার হাতে একটা গোলাপের তোড়া। শার্টের হাতা ফোল্ট করে সবার সঙ্গে কথা বলে আড়চোখে ফিরে তাকাল এদিকে। চোখ টিপ মারল তাকে দেখে। ল'জ্জা পেয়ে অন্তু ছুটে পালাল বেলকনি ছেড়ে। তুহিন ভাই সবসময় এমন করে, কি ভাববে সকলে!
#চলবে…