#হারিয়ে_বুঝেছি_কি_ছিলে_তুমি_আমার
#আইশা_নওমী
#পর্বঃ২৪+২৫
(কপিরাইট সম্পূর্ণ নিষেধ🗡️⚔️)
🍁🍁🍁🍁🍁🍁
*******
২৪.
সেইদিনের পর কেটে গেছে বেশ কিছুদিন আহান সুস্থ হওয়ার পর মিহিয়া ওদেরকে নিয়ে নিজের বাড়িতে এসেছে।আবরাহাম ওদেরকে নিজস্ব ফ্ল্যাটে নিয়ে যেতে চাইলেও পরে নিজের অভিমত পাল্টে নিয়েছে।
কারণ বাচ্চারা এখনো ছোট্ট, মিহিয়া ওদেরকে একা সামলাতে পারবেনা,তাছাড়াও পুরনো কিছু খারাপ স্মৃতি ও ব্যক্তিগত কিছু কারণে মিহিয়াও ওই ফ্ল্যাটে ফিরতে চাইছেনা।
ব্যাপারটা আবরাহাম বুঝে ওকে আর জোর করেনি ও ভেবেছে ওদের ওখানে থেকেই পুরানো ফ্ল্যাট টা বিক্রি করে নতুন একটা ফ্ল্যাট কিনে বউ বাচ্চাসহ ওখানে উঠবে।
ব্যাপারটা রিদিয়াকে জানতেই সে নাকোচ করে দেয় কারন রিদিয়া এতছোট্ট বাচ্চা সহ বোনকে কিছুতেই এক ছাড়তে রাজি নয়।তাই আবরাহাম ও বাধ্য হয়ে ওদের কথা মেনে নিয়েছে।
রাত তখন ৯ টা মিহিয়া তিনটা দোলনায় বাচ্চাদের শুইয়ে রেখে আপাদত আয়নায় সামনে দাড়িয়ে দাঁড়িয়ে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নিজের চেহারা দেখছে,আর বার বার দোলনায় থাকা তার হাঁসের ছানাদের দেখছে।
না মানে তার এত সুন্দর কিউট কিউট তিনটা বাচ্চা যে তার এইটুকুনি পেটের মধ্যে ছিলো তার এখনো বিশ্বাসী হচ্ছে না। মনে মনে আল্লাহকে অসংখ্য ধন্যবাদ দিলো তার তিনটা রসগোল্লা কে সহিসালামতে পৃথিবীতে আনার জন্য।
এবার আবারো,সে আয়নায় নিজের চেহারার দিকে তাকালো
সদ্য বাচ্চা ডেলিভারি হওয়ার দরুন তার চেহারা এখনো খানিকটা ফুলে আছে। হাত পায়েও পানি আছে হালকা। যার কারণে মিহিয়ার এখন নিজেকে ফোলাঢোল মনে হচ্ছে।
আগে তার চোহারা একদম পারফেক্ট ও সুন্দর ছিলো। নয় মোটা নয় চিকন।আর এখন একদম মোটু পাতলুর মোটু মোটু লাগছে।
ব্যাপারটা মনে হতেই বাচ্চাদের মতো ঠোঁট উল্টিয়ে কাঁদো কাঁদো ফেস নিয়ে আয়নায় নিজেকে আরো বেশি বেশি করে খুঁটিয়ে দেখতে।
আর দীর্ঘ ৩০ মিনিট ধরে মিহিয়ার এসব আজব আজব কান্ড কারখানা দেখছিলো আবরাহাম।
আরো ৩০ মিনিট আগেই সে বাড়িতে এসেছে।
এসেই দরজার সামনে নক করতেই দরজা খুলে যায় তবে মিহিয়া আয়নায় নিজেকে দেখতে এতটাই ব্যস্ত ছিলো যে, আবরাহামের দীর্ঘক্ষণের উপস্থিতি টের-রি পায়নি ।
আবরাহাম সেই থেকে দরজায় হেলান দিয়ে বউকে দেখেই যাচ্ছে।
, গায়ে ঘর্মাক্ত সাদা শার্ট তার উপর সাদা ডাক্তারি এপ্রোন জরানো, দুই কাঁধের মাঝে ঝুলছে সাদা স্টেথোস্কোপ, চেহারায় সারাদিনের ক্লান্তি থাকলেও বউয়ের অদ্ভুত কর্মকান্ড দেখে আপাদত সেটা আর নেই।
সারাদিনের গম্ভীর, রাগী, ক্লান্ত মুখটাতে এখন বিরাজ করছে রাজ্যের মুচকি হাসি,যা দেখে যেকোনো তরুনী প্রেমে পড়তে বাধ্য।এত সুন্দর প্রাণবর্ন্ত লাগছে তার হাসি।
আহ! মিহিয়া যদি তার ডাক্তার সাহেবের এমন হাসি দেখতো তাহলে নিশ্চিত ভাবে আরো একবার আব্রাহামের প্রেমে পড়তো।
তবে সেতো নিজের কাজ করতে এতটাই ব্যস্ত যে, তার কি এসব দেখার সময় আছে নাকি।
আবরাহাম এবার আর নিজেকে আটকে রাখতে পারলো নাহ সে বিছানায় নিজের ঘর্মাক্ত এপ্রোন ও স্টেথোস্কোপটা খুলে রাখলো ।
তারপর মিহিয়াকে পিছন থেকে জরিয়ে ধরে বললো,
~কি হয়েছে বউপাখি! তোমাকে এত চিন্তিত দেখাচ্ছে কেনো! এভরিথিং ইজ ওকে।
আবরাহামের কথায় মিহিয়া মুখটা কিছুটা মলিন করে সুধালো~
~আর ওকে।দেখেন নাহ আমি কি মটু হয়ে গেছি। এজন্যই বোধহয় আপনার এখন আর আমাকে ভালো লাগে না।তাইতো পরকীয়া করতে চান।
~ও তাহলে এই ব্যাপার এই কারনে ম্যাডাম এতক্ষণ ধরে, আয়নায় নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছিলো।,,
মনে মনে কথাগুলো ভেবে একটা মুচকি হাসি দিলো।
এবং মুখে বললো,
~আরে বেবি তুমি তখনকার কথা এখনও ধরে আছো। আরে সোনা তখন তো আমি মজা করে বলেছিলাম। আর আমার এতসুন্দর একটা বউ থাকতে আমি পরকীয়া কেন করতে যাবে।এই প্রমিস করছি সারাজীবনে কখনো আর এই শব্দ নিজের মুখে আনবো না।~,,
~তাই যেনো হয় আর কখনো আপনার মুখে এই শব্দ শুনলে আপনাকে খুন করে ফেলবো আমি! বুঝেছেন।,,
~হুম, বুঝেছি খুব ভালো করে বুঝেছি ওয়াইফি!
***********
২৫.
দেখতে দেখতে গেলো আরো দুইমাস। এই দু- মাসে বদলে গেছে অনেক কিছুই। ফাহাদ এখন মোটামুটি সুস্থ,।
রিদিয়ার সেবা-শুশ্রূষায় সে বর্তমানে অনেকটাই সুস্থ। যদিও রিদি তার সাথে প্রয়োজন ছাড়া একটা কথাও বলে না।
ইতোমধ্যে রিদিয়া ইউভানের সাথেও তার দেখা করিয়েছে।ইউভানও তার পাপাকে পেয়ে অনেক খুশি।
আর আরিফ ও আহানা, তাদের মধ্যেও একটা নতুন সম্পর্কের সূচনা হয়েছে সেটা হয়তো ভালোবাসার।
তবে এই দু-মাসে যাদের জীবনে বেশি পরিবর্তন এসেছে তারা হলো আবরাহাম-মিহিয়া।যাদের সকালের শুরু থেকে রাতের শেষ প্রহর কাটে তিনটা বাচ্চার ওয়া ওয়া শব্দে যদিও একসাথে তিনটাকে সামলানো খামখেয়ালি কথা নয়।
তবুও আবরাহাম মিহিয়া একসাথে মিলে নিজেদের তিনছানাকে ঠিক সামলে নিচ্ছে।
দিনে মিহিয়া বাচ্চাদের সামলালেও রাতে আবরাহাম তাকে ঘুমাতে দিয়ে নিজে বেবিদের খেয়াল রাখে।যেমন: ডায়পার চেঞ্জ, ঘুমের ব্যাঘাত ঘটলে রাতে তাদেরকে নিয়ে হাঁটাহাঁটি করা।
কিংবা খিদে পেলে মিহিয়াকে ডেকে তাদেরকে খাওয়ানো।যদিও মিহি প্রথমে তাকে এ-বিষয়ে এলাও করতে চায়নি। কারন সারাদিন ডাক্তারি, বিজনেস সামলে আবার রাতেও যদি বিশ্রাম নেওয়াটা জরুরি।
তবে এসব ব্যাপারে আবরাহাম সরাসরি তাকে বলে দিয়েছে,
~দেখো সন্তান যেহেতু আমাদের দুজনের তাই আমার মতে তুমি শুধু কেনো কষ্ট করবে।মা হিসেবে তুমি সারাদিন যথেষ্ট খেয়াল রাখছো।তোমারো তো বিশ্রামের প্রয়োজন।আর বাবা হিসেবে আমারও তো ওদের কিছু দায়িত্ব নেওয়া উচিত। তাই এখন থেকে রাতের ডিউটি আমার আর দিনের ডিউটি তোমার।তাই এখন কথা না বলে ঘুমিয়ে পড়ো।আর আমি লান্সে এখন থেকে তিনঘন্টা রোগী দেখা ওফ করে বিশ্রাম নেবো সো আমার ঘুম নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না ওয়াইফি, ঘুমিয়ে পড়ুন,সি ইউ সুইটড্রিম মাই লাভ।~
আবরাহামের কথায় মিহিয়ার সেদিন আবরাহামের প্রতি যেন সম্মানটা আরো বেড়ে গিয়েছে। মা হওয়ার পর কয়জন স্বামী তার স্ত্রীকে এমন কথা বলে যে
~তুমি ঘুমাও, আমি বাবু'দের দেখবো।
(তবে করা উচিত কারন একজন সন্তান জন্মদানে একজন মায়েরি বেশি সাফার করতে হয়।কারণ সে নারী।আর আমাদের সমাজে একজন নারীর মেইন কাজ হলো ঘর সামলানো,রানাবান্না করা,সন্তান জন্ম দেওয়া,তাদের লালন পালন করা। আর বেবি হওয়ার
সারারাত জেগে তার বাচ্চার খেয়ালো ওই মাকেই রাখতে হয়।আর স্বামী সারাদিন পরিশ্রম করে বিশ্রাম করে।যদিও সে পরিশ্রান্ত তাও বিশ্রাম করে। তবে একজন মায়ের-রো তো বিশ্রাম প্রয়োজন।বাবা হিসেবে আপনার-ও তো কিছু দায়িত্ব আছে।দিনশেষে নিজের স্ত্রীর প্রতি যত্নশীল হন।নারী যত্নের পাগল তাকে যত্ন করতে শিখুন।)
সেইদিনের পর থেকে আবরাহাম রাতে বাচ্চাদের দেখে রাখে।
মিহিয়ার পড়াশোনায় খানিকটা পিছিয়ে পড়েছে তাই ঠিক করেছে বেবিদের দেখাশোনা করার পাশাপাশি পড়াশোনাটাও এবার কন্টিনিউ করবে। এতে আবরাহাম পুরোপুরি তাকে সমর্থন করেছে।
সামনে মাস থেকে মিহিয়ার ইয়ার ফাইনাল এক্সাম তাই তাকে প্রতিদিনই ভার্সিটিতে গিয়ে ক্লাস করতে হচ্ছে। তবে প্রথম কয়েকদিন মিহিয়া বাচ্চাদের বাড়িতে রেখে ফর্মুলা মিল্ক করে দিয়ে গেলেও বাচ্চারা অভ্যস্ত না থাকায় বমি,পেটের সমস্যা সহ অনেক সমস্যা দেখা গিয়েছিলো তাই মিহিয়া তাদের ব্রেস্ট পাম্প এর সাহায্যে ফিডার রেখে যায়।তাতেও যেন বাচ্চাদের হয়না তাদের আশেপাশে সর্বদাই মাকে চাই। মায়ের শরীরের গন্ধ না পেলে তাদের যেনো চলেই না।এজন্য মিহিয়াকে মাঝে মাঝে বেবিদের নিজের সাথে নিয়ে ভার্সিটিতেও যায়। সাথে হয় মিহি না আবরাহামকে নিতে হয়।
আর ক্লাস করার ফাঁকে ফাঁকে ওদের কে খাবার খাওয়ায়।
আজকে শুক্রবার বিধায় মিহিয়া তাদের তিনছানাকে বড় বোলে বসিয়ে সুন্দর করে বেবি জনসন শ্যাম্পু ও বডিওয়াশ দিয়ে গোসল করাচ্ছিলো তবে তার দুষ্টু তিনছানার যেনো তা সহ্য হলো না।তার ইচ্ছামতো পানি নিয়ে খেলতে লাগলো যার ফলে মিহিয়ার তাদেরকে গোসল করাতে অনেক বেগ পোহাতে হচ্ছে। একসময় আর সহ্য করতে না পেরে বড়োসড়ো একটা চিৎকার দিয়ে আবরাহাম কে ডাক দিলো যা শুনে বেচারা আবরাহাম ঘুমিয়ে তাকা অবস্থায় শর্টস পড়ে খালি গায়ে দৌড়ে মিহিয়ার সামনে এসে বললো~
~ইয়েস বেবি... কোনো সমস্যা।
আবরাহামের কথায় মিহিয়া বাচ্চাদের সব রাগ তাদের পাপার উপর ঝাড়তে লাগলো।
আবরাহামের দিকে একবার রাগী দৃষ্টিতে তাকিয়ে। তারপর তিনটা বাচ্চার এক আঙ্গুল তুলে শাসানোর ভঙ্গিতে বলতে লাগলো~
~একটা বাচ্চা হলেও তাও না মানা যায়।তবে তিন তিনটাই এমন বিচ্ছু হলো কি করে।আচ্ছা তোরা সত্যি সত্যি আমার বেবিতো।মানে হাসপাতালে কারো সাথে চেঞ্জ হয়ে যাসনি তো।
মায়ের বকুনি শুনে তিনজনি একবার একবার করে বাবার করুন দিকে তাকাচ্ছে তো আরেকবার পানিতে হা-পা ছুঁড়ে পানিতে খেলছে।
পানি ছেটানো ফলে মিহিয়ার শরীর পুরোটা ভিজে গেছে। মিহিয়া এবার আবরাহামের দিকে বেবিদের তোয়ালেগুলো ছুঁড়ে মেরে বললো~
~দেখেছেন আপনার ডিএনের ফলাফল! কতোটা বাজে।
মিহিয়ার কথায় আবরাহাম এবার ভ্রুকুঁচকে অবুঝ ভঙ্গিতে বললো,
~কি হয়েছে জান!
~কি আবার দেখুন আপনার তিনটা ডিএনএ এর ব্যাড এফেক্ট।
~কি করেছে ওরা!
~দেখুন কীভাবে ভিজিয়ে দিয়েছে আমায়।
~এতেও তুমি আমাকে দোষ দিবে জান!
~তো সব দোষ তো আপনার-রই
~রাতে জেগে পাহারা দেন আপনি,ডায়পার থেকে সবকিছুই যদি আপনি করেন, এমন কি ডিএনএ টাও যেহেতু আপনার তাই সেহেতু দোষটাও আপনার।
~আর যেহেতু,সব দোষ আপনার, সেহেতু আপনার এই তিন-তিনটা আজরাইলকে আপনি সামলান ভাই! আমি আর পারছিনা,আল্লাহ আমাকে বাঁচাও এদের হাত থেকে আর আমি গেলাম টা-টা।,,
মিহিয়া আর কোনো কথা না বলে চলে গেলো।আর বেচারা আবরাহাম বউয়ের কথা সব মেনে নিয়ে বাচ্চাদের কাছে গিয়ে বিরবির করে বললো,
~এই যে,আব্বাজান, আম্মাজানরা যত দোষ করবেন আপনারা! আর তার দায়ভার এসে পড়বে আমার ডিএনএ-র উপর। যতদোষ বাবা ঘোষ।
এতটুকু বয়সেই এত অভিযোগ শুনতে হচ্ছে। না জানি বড় হলে আরো কতো অভিযোগ শুনতে হয় আল্লাহই ভালো জানে।~
চলবে,
(দীর্ঘ চারঘন্টা ধরে একাধারে গল্প লিখে চোখে আনদার দেখতাছি। তাই রিচেক করতে পারি নাই ক্ষমা করো বাবুইরা।
হ্যাপি রিডিং মাই পাখিরা💞💞💞)