ফন্ট সাইজ:
থিম:
এসো নীপবনে হারাই দু'জনে

৭ম পর্ব

লেখক: মিথিলা জামান নিভা

#এসো_নীপবনে_হারাই_দুজনে

পর্ব: ৭

হাতে চায়ের কাপ নিয়ে ঘরের চারপাশটা ঘুরে ঘুরে দেখছে দুলু। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ডাক্তারদের জন্য বরাদ্দ কোয়ার্টারের ঘর। খুব একটা উন্নত না, দেওয়ালের রঙ খসে প্লাস্টার বেরিয়ে আছে জায়গায় জায়গায়। একটা সরু খাট, পাশে একটা চেয়ার আর টেবিল। টেবিলে জাওয়াদের বইগুলো সাজিয়ে রাখা সুন্দর করে। দেওয়ালে একটা দেওয়াল ঘড়ি ঝুলছে আর তার পাশেই একটা পুরোনো ক্যালেন্ডার। একটা মোটামুটি ধরণের আলনায় জাওয়াদের কাপড়চোপড় গুলো রাখা, মোটামুটি গুছিয়েই।

এ ছাড়া ঘরে আর উল্লেখযোগ্য কিছু নেই। জাওয়াদ দূরে কোথাও ভিজিটে গেলে আবু শেখের কাছে ঘরের চাবি দিয়ে যায়। দুলু যখন ভাইকে খুঁজতে খুঁজতে এখানে আসে তখন প্রায় দুপুর। আবুকে পরিচয় দিতেই সে আনন্দে আটখানা হয়ে যায়। যদিও নিজের বাসায় নিয়ে যেতে চেয়েছিলো সে দুলুকে, কিন্তু দুলু ভাইয়ের ঘরে বসতে চায়। সে দেখতে চায় তাদের বাড়ির আদরের ছেলেটা, যাকে মায়ের খাইয়ে দিতে হতো, মা খাইয়ে না দিলে তার পেটই ভরতো না সে কীভাবে একা একা সংসার করছে। এটা কীভাবেই বা সম্ভব?

আবু তেলতেলে গলায় বললো,"চলেন না আপা, পাশেই আমার বাসা। আমার পরিবার আছে ওখানে। তাকে বলেছি আপনার জন্য সামান্য কিছু আয়োজন করতে। আপনি গেলে আমার পরিবার খুব খুশি হবে।"

দুলু হাসে আবুর কথায়।

"প্রয়োজন নেই। আমি এখানেই ভালো আছি। আমি শুধু আমার ভাই কোথায়, কীভাবে থাকে তা দেখতে এসেছি। আমার জন্য আপনাদের ব্যস্ত হতে হবে না।"

আবু মিনমিন করে বললো,"এতোগুলো দিনে ডাক্তার সাবরে বাড়ি যাইতেও দেখিনাই, বাড়ি থেকে কাউরে আসতেও দেখিনাই। এ নিয়ে উনারে কিছু জিজ্ঞাসা করলেই এড়িয়ে যায়। আমরা সবাই ভেবেই নিয়েছিলাম উনি বোধহয় অনাথ, এতীম। উনার চার কূলে কেউ নাই।"

দুলু মুচকি হেসে বললো,"তাই নাকি?"

আবু দুলুর সাজপোশাক দেখে বোঝে তাদের ডাক্তার সাবের আভিজাত্যপূর্ণ আচরণের কারণ। সে ভালো বংশের ছেলে, দুলুর মার্জিত চেহারায় তা স্পষ্ট।

"তা আপনাদের ডাক্তার সাব কখন ফিরবেন?"

"উনি সাধারণত এখন বাইরে ভিজিটে যান না, শুধু মাস্টার সাবের বাড়িতে যান উনারে দেখতে। কিন্তু আজকের ঘটনা ভিন্ন। রোগীর শরীর বেশি খারাপ হওয়ায় তাকে জোর করে নিয়ে গেলো রোগীর বাড়ির লোক, কিছুই করার ছিলো না। চলে আসার কথা এতোক্ষণে। আমি কি খবর পাঠাবো আপা?"

"না না প্রয়োজন নেই। ও ওর সময়মতোই আসুক।"

এই বলে দুলু আবারও চারদিক ভালো করে দেখে। ঘরের মধ্যকার অবস্থা তেমন উন্নত না হলেও চারপাশটা নীরব, অতিরিক্ত কোলাহল নেই। এমন একটা পরিবেশই তো ছেলেটা চেয়েছিলো পড়াশোনার জন্য। ভালোই আছে বোধহয় ও এখানে।

"আপা আপনার কিছু প্রয়োজন হলে আমারে বলতে পারেন।"

দুলু হেঁটে হেঁটে ঘরময় পায়চারি করে।

"আমি আসলে অবাক হচ্ছি ওর অবস্থা দেখে। যে ছেলেটা একা থাকতে চাইতো না, পরিবার ছাড়া ওর দিনই কাটতো না। ও কীভাবে পরিবার ছেড়ে এতো দূরে, একা পড়ে আছে?"

দুলু কথাটা শেষ করতেই আবু নিজের মাথায় হাত দেয়।

"এইটা একটা কথা বললেন আপা? ডাক্তার সাব একা? এই এলাকায় ডাক্তার সাবের ভক্ত গুণে শেষ করতে পারবেন না। সবাই ডাক্তার সাবরে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে। এতো মানুষের মধ্যেও উনি একা?"

দুলু মুখে হাসি টেনে রাখলেও চোখের কোণে তার পানি জমে। তার ছোট্ট ভাইটা আজ এতো মানুষের ভালোবাসা পাচ্ছে? মা দেখলে তো শুধু কাঁদতো খুশিতে। আর বাবাও নিশ্চয়ই ছেলের উপর আর রাগ করে থাকতে পারতো না। দুলু ঠিক করে এরপর যেদিন আসবে সেদিন মা'কে নিয়ে আসবে। আজ তো সে ঠিকানা জেনেই গেলো।

"আর তাছাড়াও, মাস্টারবাড়ির সবাই ডাক্তার সাবরে ভীষণ ভালোবাসে। ভালোমন্দ কিছু রান্না হলেই মাস্টার সাব ওদের কাজের লোক রসুরে দিয়ে পাঠায় দেয় ডাক্তার সাবের জন্য।"

দুলু ঘাড় ঘুরিয়ে আবুর দিকে তাকায় বেশ কৌতুহলী দৃষ্টিতে।

"এই মাস্টারবাড়ির ব্যাপারটা কি? পরপর দুইবার শুনলাম এ বাড়ির কথা আপনার মুখে।"

"আমাদের কলেজের শিক্ষক নেওয়াজ উদ্দিন মাস্টারের বাড়িরে আমরা মাস্টারবাড়ি বলি। উনার বয়স হয়েছে, মাঝে মাঝেই অসুস্থ হয়ে যায়। তখন আমাদের কমপ্লেক্স থেকে ডাক্তার পাঠানো হয়। এখন মেডিসিন বিভাগে আমাদের ডাক্তার সাব আছেন, উনিই যান। এরপর থেকেই সখ্যতা তৈরি হইছে ওই বাড়ির সাথে। উনার বড় নাতনী রূপকথা আপার সাথে ডাক্তার সাবের ভারী ভাব!"

দুলু আঁৎকে উঠে বললো,"ভারী ভাব?"

আবু দাঁত দিয়ে জিভ কাটে।

"না না আপা, এই ভাব সেই ভাব না। তারা ভালো বন্ধু।"

দুলু মিটমিট করে হেসে বললো,"ও আচ্ছা বন্ধু? যাক ভালো! সারাজীবন দু'টো ভালো বন্ধু বানাতে পারেনি বাবার ভয়ে। এখানে এসে সোজা মেয়ে বন্ধু? দারুণ উন্নতি যে! বাবা দেখলে নির্ঘাৎ অজ্ঞান হয়ে যেতেন।"

শেষ কথাগুলো বিড়বিড় করে বললো দুলু, আবুর কানে গেলো না।

"তা সেই মাস্টারবাড়ি কতোদূর এখান থেকে?"

"আছে একটু দূর, রিকশায় গেলে মিনিট বিশেক লাগবে।"

"আচ্ছা আচ্ছা!"

দুপুরের তেজী রোদ মাথায় নিয়ে নিজের ঘরে ঢোকার মুখে থমকে যায় জাওয়াদ। তার মেরুদণ্ড বেয়ে একটা শীতল স্রোত নেমে যায়। তার একমাত্র বড়বোন, তার দুলু আপা দরজার দিকে পিঠ দিয়ে বসে আছে। আবু বাড়ির দিকে গেছে, তাদের জন্য রান্নাবান্নার আয়োজন কতো দূর তা দেখতে।

"আপা..."

কম্পিত গলার ডাকে দুলু পিছন ঘুরে তাকায়। ভেবেছিলো ভাইয়ের উপর খুব রাগ দেখাবে, বকা দিবে। কিন্তু ওই এক ডাকেই দুলুর মনটা আর্দ্র হয়ে যায়। উঠে দাঁড়ায় সে বসা থেকে। ভাইবোনের মধ্যে নিঃশব্দে দৃষ্টি বিনিময় হয়। দুইজন দুইজনের দিকে হতবাক হয়ে তাকিয়ে থাকে।

আজ 'রূপকথা ভিলা' তে আরেক ঝামেলা চলছে। রূপার স্কুলটাকে বর্ধন করার কাজ চলছে সকাল থেকে। ওপাশের পুরো পাঁচিল পর্যন্ত বাড়ানো হচ্ছে স্কুলের ঘরটা। কাজের তদারকি করছে স্বয়ং নেওয়াজ উদ্দিন। চেয়ারে বসে মিস্ত্রিদের কাজের নির্দেশনা দিচ্ছে। ফাগুনের মাঝামাঝি আসতে না আসতে রোদের তেজে বাইরে বেশিক্ষণ থাকা যাচ্ছে না। রূপা বারবার করে দাদাজানকে ঘরে চলে যেতে বলেছে, কিন্তু নেওয়াজ নাতনীর কোনো কথা কানেই তুলছে না। রসুর কাজ একটু পর পর দাদাজানকে চা এনে দেওয়া।

"মাস্টার সাব, ও মাস্টার সাব।"

আবুর ডাকে নেওয়াজ গেটের দিকে তাকায়। আবু হাস্যোজ্জ্বল মুখে দাঁড়িয়ে। তবে আবু একা নয়। তার পাশে একজন বছর ত্রিশ-বত্রিশের বয়সী একজন নারী। সুন্দর, পরিপাটি করে শাড়ি পরা, মাথায় স্কার্ফ বাঁধা। দেখেই বোঝা যাচ্ছে অভিজাত পরিবারের। নেওয়াজ তাকে চিনতে পারেনা। এ এলাকার বলে মনেও হচ্ছে না।

রূপাও এগিয়ে আসে তাকে দেখে। কিছুদিন আগেই একটা এনজিও থেকে কয়েকজন এসেছিলো। তারা মূলত সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের নিয়ে কাজ করে। তারা এসে বলেছিলো তারা রূপার স্কুলের বাচ্চাদের জন্য কিছু ডোনেশন দিতে চায়। তাদের মধ্যে কেউ এলো কিনা কে জানে। কিন্তু আবু কেনো সাথে নিয়ে আসবে তাদের?

"মাস্টার সাব দেখেন কারে নিয়ে এসেছি। অতিথি এনেছি আপনার বাড়িতে।"

নেওয়াজ লাঠিতে ভর দিয়ে এগিয়ে যায়। দুলু হাসিমুখে তাকিয়ে আছে। এ বাড়ির পরিবেশ তার এতো পছন্দ হয়েছে তা আর বলার নয়। ঢাকায় তো এমন বাড়ি দেখার সৌভাগ্যই হয়না তাদের।

নেওয়াজ এগিয়ে গেলেই দুলু তাকে সালাম দেয়। নেওয়াজ সালামের উত্তর দিয়ে আবুর দিকে তাকায়।

"আবু উনি কে? উনাকে তো ঠিক চিনতে পারলাম না।"

"উনি আমাদের ডাক্তার সাবের বড় বোন, দুলু আপা। ঢাকা থেকে আসছেন মাস্টার সাব।"

নেওয়াজ উদ্দিনের হাসি প্রসারিত হয়। তাকে দেখেই বোঝা যায় জাওয়াদ তার কাছে আসলে কতোটা প্রিয় যে তার বোনকে দেখেই এতোটা খুশি সে।

"বলছো কি রে আবু? আমাদের ডাক্তারের বোন? উনাকে আনবে তা আগে বলবে না? ওরে রূপা কই গেলি? উনাকে ভিতরে নিয়ে যা।"

এটুকুতেই দুলু মুগ্ধ হয়ে যায়। গর্ব হয় নিজের ভাইটার উপর তার। এখানে আসার পথেও আবু কয়েকজনকে ডেকে ডেকে বলেছে, ইনি ডাক্তার সাবের বড় বোন দুলু আপা, ঢাকা থেকে আসছেন। তাদের চোখমুখে দুলুর প্রতি সম্মান, শ্রদ্ধা দুলু দেখেছে। বারবার চোখে পানি চলে আসছে তার।

রূপা সুন্দর করে হেসে দুলুর দিকে তাকায়।

"আসুন আপা, আমার সাথে ভিতরে আসুন।"

দুলু মুগ্ধ হয়ে রূপাকে দেখে। কি সুন্দর একটা মেয়ে। লম্বা একহারা গড়ন, গাত্রবর্ণ ফর্সা, চোখ নাকের গঠন চমৎকার। আবার কি সুন্দর করে শাড়ি পরে আছে। সাজসজ্জা তেমন নেই, শুধু চোখের নিচে একটু কাজল। তাতেই কি ভীষণ মোহনীয় লাগছে মেয়েটাকে।

"এতো ব্যস্ত হবেন না আমার জন্য। আমি আসলে আপনাদের একটু দেখতে এসেছিলাম। আবু ভাইয়ের কাছে আপনাদের অনেক প্রশংসা শুনলাম। আমার ভাইটা এখানে একা থাকে, আপনারা ওর পরিবারের মতোই ওকে আগলে রেখেছেন। তাই কৌতুহল হলো। শহরে তো এসব দেখাই যায়না। পাশের বাড়ির প্রতিবেশীও কোনো খোঁজ খবর রাখেনা। তাই আপনাদের দেখার লোভ সামলাতে পারলাম না। যদিও জাওয়াদ অনেক নিষেধ করছিলো। বললো উনাদের বিরক্ত করতে যেতে হবে না। কিন্তু ওর কথা শুনিনি আমি।"

নেওয়াজ হেসে বললো,"খুব ভালো করেছো এসে। আর আমাদের ডাক্তার আমাদের চোখের মণি। শুধু আমাদের না, এ এলাকার অনেকের কাছেই তা-ই। এই প্রথম তার বাড়ির কাউকে দেখলাম। আর একটু আপ্যায়ন করবো না? তুমি আমার নাতনীর সাথে ভিতরে যাও, আমি মিস্ত্রীদের বিদায় দিয়েই আসছি।"

এই বলে নেওয়াজ রূপার দিকে তাকায়। রূপা দুলুকে বাড়ির ভিতরে নিয়ে যায়।

বসার ঘরটা মুগ্ধ করে দুলুকে। কি শান্তি শান্তি একটা বাড়ি। থেকে যেতে ইচ্ছা করে। আর যেতে ইচ্ছা করে না ওই কোলাহল পূর্ণ শহরে।

রূপা এরইমধ্যে বেশ কিছু নাশতার আয়োজন করে ফেলেছে ঝটপট। এখন দুলুর সামনে বসে চায়ের কাপে টুংটাং শব্দ তুলছে।

দুলু মনোযোগ দিয়ে রূপাকে দেখে। এই মধ্য বিকেলেও বেশ রোদ। দুপুরের মতো তেজী না হলেও। সেই রোদের কিছু অংশ জানালা গলে রূপার মুখের একপাশে এসে পড়েছে। কি যে সুন্দর লাগছে তাকে। আচ্ছা এই মেয়েটা কি জাওয়াদের শুধুই বন্ধু? নাকি আর কোনো ব্যাপার চলছে তাদের মাঝে? তেমন কিছু হলে ভালোই হয়, কি মিষ্টি একটা মেয়ে। মায়েরও নিশ্চয়ই অনেক পছন্দ হবে।

"আপনার চা।"

সম্বিত ফিরে পেয়ে দুলু হেসে চায়ের কাপ হাতে নেয়। চায়ে চুমুক দিতেই মনটা ফুরফুরে হয়ে যায় তার।

"বাহ কি সুন্দর চা বানিয়েছেন আপনি।"

রূপাও নিজের জন্য এক কাপ নিয়ে বসে।

"ধন্যবাদ কিন্তু আপনি আমাকে তুমি করে বলতে পারেন, আমি আপনার অনেকটা ছোটই হবো।"

"এতো কষ্টের কিন্তু কোনো প্রয়োজন ছিলো না। আমি শুধু তোমাদের দেখতে এসেছিলাম।"

"তেমন কিছুই করতে পারিনি। অতিথিদের আপ্যায়ন করা আমাদের একটা নেশা বলতে পারেন। সেই তুলনায় এ আয়োজন সামান্য। আগে থেকে জানতে পারলে হয়তো আরো কিছু...."

"আমি আজই ঢাকায় ফিরে যাবো। এরচেয়ে বেশি কিছু হলে খাওয়ার সময়ই পেতাম না।"

খুব অল্প সময়ের মধ্যেই দুইজনের মধ্যে খুব খাতির হয়ে যায়। হেসে হেসে অনেকটা সময় আড্ডা দেয় তারা। দুলু বুঝতে পারে বাড়ির সম্পর্কে কাউকেই কিছু জানায়নি জাওয়াদ। জাওয়াদের পরিবারের কথা কেউ-ই কিছু জানেনা।

বিদায়ের সময়েও নেওয়াজ সহ সবার মন খারাপ দেখে দুলু অবাক হয়। এতো অল্প সময়ের মধ্যে কেউ অপরিচিত কাউকে এতোটা আপন করে নিতে পারে যে তার বিদায়ে এতো মন খারাপ হয়? দুলু তাদের কথা দেয় খুব তাড়াতাড়ি তাদের মা'কে নিয়ে আবার আসবে। এরপরই তাদের মন খারাপ একটু কমে।

বাস স্টান্ডে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে জাওয়াদ, সামনেই দুলু হেসে তাকিয়ে আছে তার দিকে। দুলু জানে তার ভাই এখন চোখের পানি আড়াল করছে তার থেকে।

"কি ভেবেছিলি? তুই পালিয়ে বেড়াবি আর আমরা তোকে খুঁজে পাবো না?"

জাওয়াদ উত্তর দেয়না, মাথাও তোলে না।

"চিন্তা করিস না। বাবাকে জানাবো না তোর এই আত্মগোপন করা ঠিকানার কথা। তবে তুই যদি চাস মা'কে নিয়ে আসবো।"

এতোক্ষণে জাওয়াদ মাথা তুলে তাকায় দুলুর দিকে। দুলু দেখে জাওয়াদের চোখ লাল হয়ে আছে।

"সত্যি মা আসবে এখানে? মা আমার উপর রেগে নেই?"

দুলু ভাইয়ের চুলের মধ্যে হাত রাখে। কি সুন্দর ঘন চুলগুলো। জাওয়াদ ছোট থাকতেই দুলু জাওয়াদের চুলগুলো খুব পছন্দ করতো। মাঝে মাঝে মজা করে ঝুটি বেঁধে দিতো।

"সন্তানের উপর মায়েদের রাগ হয়না। যা হয় তা হলো অভিমান। হ্যা মা তোর উপর অভিমান করে আছে, আমিও ছিলাম। আমি এখানে আসার আগে ভেবেছিলাম তোকে খুব করে বকবো আমি। কিন্তু পারলাম কই বল? তোকে দেখেই আমার সব রাগ পানি হয়ে গেছে। আমার বিশ্বাস মায়ের ক্ষেত্রেও তাই হবে। মা তো জানেই না আমি এখানে আসবো। জানলে নিশ্চয়ই আসতো। আমার পুচকুটাকে মায়ের কাছে রেখে নিজেই চলে এলাম।"

"এরপরের বার মা আর তোমার ছানাটিকে অবশ্যই আনবে আপা। ওকে খুব মনে পড়ে আমার।"

"আনবো আনবো। এখন আমাকে আগে যেতে দে তো। এমনিতেই কতো রাত হয়ে গেলো।"

"আজ থেকে গেলে হতো না আপা? আবু ভাইয়ের বাড়িতে তোমার থাকার ব্যবস্থা করে দিতাম।"

"আবার যেদিন আসবো সেদিন অবশ্যই থাকবো, অনেকদিনের জন্য। ওদিকে রূপকথা ভিলা এর বাসিন্দারাও জোর করেছে থাকতে। ওদের ওখানেও থাকবো পরেরবার।"

জাওয়াদ কিছু বলে না।

দুলুকে বাসে উঠিয়ে দিয়ে নিচে এসে দাঁড়িয়েছে জাওয়াদ। খুব কাঁদতে ইচ্ছা করছে তার। কিন্তু এখন তো সে বড় হয়ে গেছে। এখন কাঁদলে নাকি মানায় না। তাই অনেক কষ্টে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে সে।

জানালা দিয়ে উঁকি দেয় দুলু। জাওয়াদ পকেট থেকে বেশ কিছু টাকা বের করে জোর করে আপার হাত টেনে হাতের মধ্যে ঢুকিয়ে দেয়। দুলু অবাক হয়ে যায় জাওয়াদের এই কান্ডে।

"আমার উপার্জনের টাকা দিয়ে মা'কে, তোমাকে, পুচকুকে এখনো কিছু দিতে পারিনি আপা। এটা দিয়ে তুমি তোমাদের পছন্দমতো কিছু কিনে নিও।"

দুলু ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকায়। খুব যত্ন করে টাকাগুলো নিজের ব্যাগে ভরে ফেলে। এই টাকাগুলো তার কাছে অমূল্য।

"আর তোমার বাবাকেও কিছু কিনে দিও। কিন্তু তাকে বলো না যে ওটা আমি দিয়েছি। তাহলে নিবে না।"

"আমার বাবা তোর কি হয়?"

"উনি আমাকে বাবা বলে ডাকতে নিষেধ করেছে উনাকে। উনি যেদিন নিজে আমাকে ওই অধিকার আবার দিবেন, সেদিন অবশ্যই ডাকবো আপা। উনি যে আমারও বাবা। উনি আমার সাথে যত যা-ই করুক, আমি উনাকে আমার নিজের জীবনের চাইতেও অনেক বেশি ভালোবাসি।"

দুলু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,"তোদের এই বাবা-ছেলের লড়াইতে মা বেচারি কষ্ট পাচ্ছে। একদিকে স্বামী, অন্যদিকে ছেলে। কবে যে এ লড়াইয়ের শেষ হবে কে জানে।"

বাসের হর্ণ বেজে ওঠে। ড্রাইভার সিটে বসে পড়েছে। এক্ষুনি বাস ছেড়ে দিবে।

"ঘরে ফিরে যা জাওয়াদ। রাত করিস না। আর হ্যা, তোকে বলা হয়নি। আজ তোর উপর আমার খুব গর্ব হচ্ছে রে ভাই। সত্যি তুই কতো মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে আছিস। তুই ভাগ্যবান জাওয়াদ, অনেক বেশি ভাগ্যবান। নিজের খেয়াল রাখিস ভাই।"

"তুমিও সাবধানে যেও আপা।"

বাস ছেড়ে দেয়। দুলু হাত নাড়ে, জাওয়াদও হাত উঁচু করে। ঝাপসা চোখে জাওয়াদ তাকিয়ে থাকে বাসটার দিকে। যতক্ষণ না ওটা চোখের আড়াল হয় ততক্ষণ ওভাবেই তাকিয়ে থাকে সে।

(চলবে.....)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৭ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন