#এসো_নীপবনে_হারাই_দুজনে
পর্ব: ৮
বৈশাখ আসতে পারলো না, চৈত্রতেই এমন বৃষ্টি। প্রকৃতির এমন হঠাৎ হঠাৎ খামখেয়ালি বোঝা দুষ্কর। কে-ই বা জানতো খটখটে রোদের মাঝে হঠাৎ এমন তুমুল বর্ষণ শুরু হয়ে যাবে? রূপা বাজারে গিয়েছিলো স্কুলের জন্য কিছু সামগ্রী কিনতে। ফেরার পথেই এমন জোরদার বৃষ্টি। এতোটাই যে কয়েক হাত দূরের জিনিসও দেখা যাচ্ছে না। সবাই ছুটে যাত্রী ছাউনিতে এসে আশ্রয় নেয়। এদিকের রাস্তাগুলোতে সাধারণত রিকশা বা ভ্যানই চলে। কদাচিত দু'একটা অটোরিকশা যায় বা না যায়।
কিন্তু এই বৃষ্টিতে রিকশা বা ভ্যানও চোখে পড়ছে না। রূপা ছাউনির মধ্যে দাঁড়িয়েই ছাতা মেলে। ছাতা এনেছিলো রোদ থেকে বাঁচতে, এখন বৃষ্টির জন্য কাজে লেগে যাচ্ছে!
কিন্তু এই ছাতায় কাজ হবে না। নিচু এলাকা, ইতোমধ্যেই গোড়ালি সমান পানি জমে গেছে রাস্তায়। ভয়াবহ সাইনাসের সমস্যা রূপার। একবার ব্যথা উঠলে তিন/চার দিনের মধ্যে যাওয়ার নাম করেনা। এই ভয়ে বৃষ্টিতে ভেজা হারাম তার জন্য। শাড়ির কিছু অংশ ভিজেও গেছে দৌড়ে ছাউনিতে আসার সময়। এরইমধ্যে দু'টো হাঁচি হয়ে গেলো তার। ভেজা শাড়ি কিছুক্ষণের মধ্যে না পাল্টালে কপালে দুর্ভোগ যে আছে তা বেশ বুঝতে পারছে সে। এদিকে বৃষ্টি কমার কোনো লক্ষণ আপাতত নেই। রূপা প্রমাদ গোণে। কি কুক্ষণেই না আজ বাড়ি থেকে বের হয়েছিলো সে। প্রতিদিন তেজী রোদে জনজীবন ত্যক্তবিরক্ত। আজই এমন অঝোর ধারা। কোনো মানে হয় এসবের?
আচমকাই একটা রিকশা এসে থামে রূপার একদম কাছে এসে। রিকশার পর্দা টানা মানেই ভিতরে লোক আছে। রূপাকে অবাক করে দিয়ে জাওয়াদ নামে রিকশা থেকে। রূপা হতবাক হয়ে যায় তাকে দেখে।
"এ কি আপনি?"
জাওয়াদ তাড়াতাড়ি করে ছাউনিতে এসে আশ্রয় নেয়। চুলের পানি ঝাড়তে থাকে।
"আমি এদিকেই একটা ভিজিটে গিয়েছিলাম। ফেরার পথে বৃষ্টি শুরু। বাইকের তেল শেষ, আবুকে তেল ভরতে দিয়ে রিকশাতেই গিয়েছিলাম।"
"তাহলে এখানে নামলেন কেনো? কমপ্লেক্স তো আরো কিছুটা দূরে।"
জাওয়াদ পূর্ণ দৃষ্টি মেলে রূপার দিকে তাকায়। রূপার কপালের দিকের কিছু চুল ভিজে লেপ্টে আছে কপাল, কান আর ঘাড়ের কিছু অংশ জুড়ে। এমতাবস্থায় তাকে একটা পদ্মফুলের মতো লাগছে। আচ্ছা সাদা পদ্মফুল কি হয়? বোধহয় হয়না, হলে তাকে একদম রূপার মতোই লাগতো।
"রিকশাটা নিয়ে আপনি চলে যান।"
রূপা আঁৎকে উঠে বললো,"আরে না না। কি বলছেন এসব? আমি কিছুক্ষণ অপেক্ষা করি। বৃষ্টি কমলে চলে যাবো। আপনি যান।"
জাওয়াদ রূপার হাত থেকে ছাতাটা নেয়, রূপা কিছু বলতেই পারেনা।
"এই ছাতাটা নিয়ে আমি যাচ্ছি, আপনি রিকশায় উঠুন।"
"আর আপনি এই পানির মধ্যে হেঁটে যাবেন? একসাথেই চলুন যাই, আপনাকে কমপ্লেক্সে নামিয়ে দিয়ে আমি বাড়ি ফিরে যাবো।"
মুখে বললো বটে রূপা এই কথা। কিন্তু শ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলো কথাটা বলে। ছোট মফস্বল শহর, এখানে মুখে মুখে কথা রটে যায়। কোনো সত্যমিথ্যার ভিত্তি যাচাই না করেই রটনা রটিয়ে দেয় মানুষ। এই ভারী বর্ষায় রিকশার পর্দা টেনে ডাক্তার সাহেব আর রূপকথা আপা ঘোরাঘুরি করছে এই দৃশ্য কেউ দেখলেই হয়েছে কাজ! এমনিতেই মাস্টারবাড়িতে ডাক্তার সাহেবের নিত্য যাওয়া-আসা। দুইয়ে দুইয়ে চার মিলিয়েই ছাড়বে এরা।
তাকে এ যাত্রায় রূপাকে চিন্তার হাত থেকে বাঁচিয়ে দেয় জাওয়াদই। হেসে ফেলে সে রূপার চিন্তিত মুখ দেখে।
"প্রয়োজন নেই মিস রূপা। আপনি রিকশায় চলে যান। এটুকুই তো পথ, আমি ছাতা নিয়ে চলে যেতে পারবো। আর এ বৃষ্টি সহজে কমার নয়।"
রূপা তবুও ইতস্তত করতে থাকে দাঁড়িয়ে। জাওয়াদ জোর করে রূপার হাত থেকে জিনিসগুলো রিকশায় তুলে দেয়। এরপর পর্দাটা ফাঁকা করে রূপার দিকে তাকায়।
"দাঁড়িয়ে থাকবেন এখনো?"
রূপা অস্বস্তি নিয়েই রিকশায় ওঠে। অপরাধবোধ হচ্ছে তার ভীষণ। কিন্তু ডাক্তার সাহেব তো নাছোড়বান্দা। কোনো কথাই শুনবে না সে রূপার।
রূপা রিকশায় বসতেই জাওয়াদ রিকশাওয়ালাকে ভাড়াটা দিয়ে দেয়। রূপা প্রতিবাদ জানায় কিন্তু জাওয়াদ তার কথায় পাত্তা দেয়না।
"উনাকে একদম উনার বাড়ির সামনে নামিয়ে দিয়ে আসবে।"
এই বলে জাওয়াদ রূপার দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে হাসে।
"সাবধানে যাবেন।"
রূপা লজ্জায় নুইয়ে যায়। ক্ষীন গলায় বললো,"আপনিও।"
রূপার রিকশা এগোয়। রূপা কৃতজ্ঞতাস্বরূপ হাসি দেয় হুডের পিছনে মুখ বাড়িয়ে।
"আপনার ছাতাটা কবে ফেরত দিবো?"
"আপনার ইচ্ছা।"
রূপা চলে যায়। জাওয়াদ ছাতা মাথায় হাঁটতে থাকে। কমপ্লেক্স এখান থেকে কিছুটা দূর, অসুবিধা হবে না তার বিশেষ।
দূর থেকে জাওয়াদকে প্যান্ট ভাজ করে, ছাতা মাথায় আসতে দেখে আবু ছুটে আসে দ্রুত।
"এ কি ডাক্তার সাব? আপনি ভিজে ভিজে আসলেন এতোটা? একটাও রিকশা পাননি?"
কমপ্লেক্সের বারান্দায় উঠে ছাতা বন্ধ করতে করতে জাওয়াদ হাসে।
"হাসবেন না তো ডাক্তার সাব। আপনি বেশি ভালো মানুষ। যেখানে ভিজিটে গেলেন তাদের কোনো আক্কেল নেই? কোন আক্কেলে আপনাকে এই বৃষ্টির মধ্যে যেতে দিলো? অন্তত একটা রিকশা তো ডেকে দিবে।"
"আবু ভাই আপনি শুধু শুধুই উনাদের দোষ দিচ্ছেন। আমি যখন ওখান থেকে বের হই তখন এতোটা বৃষ্টি ছিলো না। এরপরেও উনারা রিকশা ডেকে দিয়েছিলো তো।"
আবু হাঁ করে তাকায় জাওয়াদের দিকে।
"সেই রিকশা কই?"
জাওয়াদ উত্তর দেয়না আবুর প্রশ্নের। বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে খোলা গলায় বললো,"এমনভাবে বৃষ্টি দেখা হয়না অনেকদিন। আবু ভাই খুব খিচুড়ি খেতে মন চাচ্ছে এই বৃষ্টিতে। সুফিয়া আপাকে একবার অনুরোধ করা যায় নাকি?"
আবু দাঁত বের করে হেসে বললো,"অনুরোধ করতে হবে না। তার ভাই খেতে চাইছে শুনলে সে-ই যাবে নাচতে নাচতে রান্না করতে। আচ্ছা ডাক্তার সাব, কি মন্ত্র জানেন আপনি বলেন তো? আমারে একটু শিখায় দিবেন? না মানে এই কয় মাসে কীভাবে সবাইকে হাতে নিলেন বলেন তো?"
জাওয়াদ আবুর ঘাড়ে হাত রেখে বললো,"ভালোবাসার চেয়ে বড় মন্ত্র দুনিয়ায় আর নেই আবু ভাই। মানুষকে ভালোবাসলে তারাও বাসে। এটা আমি এখানে এসেই উপলব্ধি করেছি।"
আবু মাথা নিচু করে ফেলে। অথচ সে ভেবেছিলো এই সহজসরল মানুষটা বেশিদিন এখানে টিকতে পারবে না। কসাইয়ের মতো ডাক্তার হলে ঠিকই পারতো। কিন্তু সে ভুল ছিলো। ডাক্তার সাহেব যদি এখান থেকে কখনো চলেও যান, তাহলে সেদিন এ এলাকায় বেশিরভাগ মানুষ কাঁদবে, আজীবন তাকে মনে রাখবে একজন ভালো মানুষ হিসেবে। এক জীবনে টাকাই সব না, মানুষের এই ভালোবাসাটুকু পাওয়াও ভাগ্যের ব্যাপার। এ জিনিস টাকা দিয়ে কেনা যায়না, এ জিনিস অমূল্য।
বাড়িতে আসার পরেও রূপা বুঝতে পারেনি কি অপেক্ষা করছে সন্ধ্যায় তার জন্য। রসু এক কাপ গরম চা এনে দিয়েছিলো তাকে। গোসল সেরে ওটা খেয়েই রূপা ঘুমিয়ে পড়ে। দুপুরের খাবারও খায়নি সে। রসুই রান্নাবান্না করেছে। নেওয়াজ দুইবার ডেকে যায় রূপাকে, সে জানায় পরে খেয়ে নিবে। এখন যেনো তাকে কেউ বিরক্ত না করে, তার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। নেওয়াজও আর ডাকেনি এরপর তাকে। বিকেলে রূপার স্কুলের ক্লাস আজকের মতো দীপা নেয়। অল্প কিছুক্ষণ পড়িয়েই ছুটি দিয়ে দেওয়া হয়।
রূপার ঘুম ভাঙে সন্ধ্যার দিকে। বৃষ্টি কমে গেছে অনেক আগেই, রোদও উঠেছে দুপুরের দিকে। বৃষ্টির জন্য তেমন ঠান্ডা পরিবেশের সৃষ্টি হয়নি। তবুও রূপার মনে হয় সে যেনো শীতে কাঁপছে। শরীরে কাঁথা টেনে দিতেই দীপা অবাক হয়ে তাকায় তার দিকে। গরমে ঘামছে সে আর আপা কিনা কাঁথা গায়ে ঘুমাচ্ছে? তার ঠোঁটটাও কেমন লালচে হয়ে আছে। দীপা ভয়ে ভয়ে আপার কপালে হাত রাখতেই চমকে ওঠে। গা পুড়ে যাচ্ছে আপার। এতো জ্বর কখন এলো তার? রূপার সহসাই জ্বর হয়না আর হলে তা খুব ভোগায় তাকে। সহজে মুক্তি মেলে না।
দীপা থার্মোমিটার দিয়ে জ্বর মাপে রূপার। সর্বনাশ! ১০৩ উঠে গেছে? হাত পায়ের শক্তি হারিয়ে ফেলে যেনো দীপা।
রূপার ঘরে সবাই ভীড় জমিয়েছে। গম্ভীর মুখে রূপার মাথার কাছে বসে আছে নেওয়াজ। তার মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না। রূপা চুপচাপ হলেও সে এ বাড়ির প্রাণ। সে এভাবে অসুস্থ হয়ে শুয়ে থাকলে পুরো ঘরে আঁধার নামে। কারো মুখে হাসি থাকে না।
রসু আর টুনি মুখ অন্ধকার করে দাঁড়িয়ে আছে এক কোণায়। মনে হচ্ছে চতুর্থ বারের মতো রসুকে কাঁদতে দেখা যাবে।
দীপা রূপাকে কোনোরকমে কয়টা খাইয়ে দিয়েছে, ওষুধ দেওয়া লাগবে তো। জোর করে অল্প খেলেও রূপা বমি করে দিয়েছে। ওরা বুঝতে পারছে না কি করবে।
"দীপা।"
"বলুন দাদাজান।"
"ডাক্তারকে একটা খবর পাঠানো দরকার না? ও এসে দেখে যেতো রূপাকে।"
রূপা ফ্যাসফ্যাসে গলায় বললো,"প্রয়োজন নেই দাদাজান। ঠান্ডা লেগে জ্বর এসেছে, এরজন্য আবার ডাক্তার ডাকার দরকার কি? দু'চারদিন জ্বর আসবে যাবে, এরপর নিজেই চলে যাবে। নাপাতেই কাজ হবে। আজই তো প্রথম দিন।"
দীপা থামিয়ে দেয় রূপাকে তৎক্ষনাৎ।
"দাদাজান যখন বলেছেন একবার ডেকে নিই না উনাকে। ব্যস্ত থাকলে আসবে না। জোর করছি নাকি আমরা? সময় পেলে একটু এসে দেখে গেলে ক্ষতি কি? আমরা কি উনাকে ফিস দিবো না?"
রূপা ক্লান্ত চোখে দীপার দিকে তাকায়। এই মুহুর্তে দীপাকে কড়া করে একটা ধমক দিতে ইচ্ছা করছে তার। কিন্তু শরীরে সেই শক্তি পাচ্ছে না। প্রচন্ড হতাশ হয়ে সে দেখলো টুনি আবারও তার চিরচেনা রূপে ফিরে এসে মুখে আঁচল চেপে হাসছে। কিন্তু সাবধানে হাসছে, যাতে দাদাজানের নজরে না পড়ে। যদিও নেওয়াজের এসব কোনোদিকেই মনে নেই। তার এখন একমাত্র চিন্তা রূপা, তার বড় আদরের রূপকথা।
রূপার এই ঘরে প্রথমবারের মতো আসা হলো জাওয়াদের। এই ঘরটা আরো বেশি সুন্দর। কি দারুণ পরিপাটি করে গুছানো। দেখলেই শান্তি শান্তি লাগে, যেনো একটা আঁকা ছবি। কালচের কাঠের বিশাল এক পালঙ্ক, মাথার কাছে দক্ষিণের জানালা।
বিছানায় গলা পর্যন্ত চাদর টেনে শুয়ে আছে রূপা। পাশেই চেয়ার টেনে বসে তার নাড়ি স্পন্দন পরীক্ষা করছে জাওয়াদ ঘড়ি ধরে। যদিও সে ডাক্তার, আর রূপা রোগী। অস্বস্তি হওয়ার কথা না প্রথম স্পর্শে, তবুও হচ্ছে। রূপা কটমট চোখে দীপার দিকে তাকায়, যত নষ্টের মূল এই পাগলিটা। সুস্থ হলে ওকেই আগে শায়েস্তা করবে।
রূপার হাত ছেড়ে দিয়ে জাওয়াদ দীপার দিকে তাকায়।
"ওষুধ না খাওয়াতে পারলে জ্বর তো পড়বে না। দীপা তুমি খাবার নিয়ে এসে আগে খাইয়ে দাও উনাকে। এরপর ওষুধ।"
রূপা চিঁচিঁ করে বললো,"আমি এখন কিচ্ছু খাবো না। খেলে আবার বমি হবে।"
"হোক।"
জাওয়াদ বেশ গম্ভীর আজ। রূপা চোখ বড় বড় করে তাকায় তার দিকে। কেমন অচেনা লাগছে তাকে। সকালের ডাক্তার সাহেব আর রাতের ডাক্তার সাহেবের মধ্যে বিস্তর ফারাক।
দীপা ছুটে চলে যায় খাবার আনতে। রসুও যায় পিছন পিছন। বড় আপার প্রিয় ডিম ভাজি। যদি একটু খেতে পারে একটা ডিম ভেজে দিলে।
নেওয়াজ জাওয়াদের দিকে তাকিয়ে বললো,"খারাপ কিছু মনে করছো নাকি ডাক্তার?"
জাওয়াদ স্মিত হেসে বললো,"এখনো না স্যার। দুশ্চিন্তার কোনো কারণ নেই।"
নেওয়াজ ঘোলাটে চোখে রূপার দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বললো,"খারাপ কিছু না হলেই হয়।"
এরই মধ্যে বসার ঘরে ল্যান্ডলাইনের ফোনটা বেজে ওঠে। টুনি দাদাজানকে ধরে উঠায়।
"ডাক্তার তুমি একটু বসো। আমি দেখি কে ফোন করলো।"
টুনি দাদাজানকে নিয়ে চলে যায়। অস্বস্তিতে আরো গুটিসুটি মেরে যায় রূপা। সে বার বার মনকে বুঝ দিচ্ছে যে এখানে অস্বস্তির কিছুই নেই। জাওয়াদ একজন ডাক্তার, অন্য দিনে মাঝে মাঝে অতিথি হিসেবে এ বাড়িতে এলেও আজ সে শুধুমাত্র একজন ডাক্তার হিসেবেই এসেছে। এখানে অস্বস্তির কি আছে? তবুও তার কেমন যেনো লাগছে। জ্বরের চেয়েও ওই বিশ্রী অনুভূতিটা তাকে কাবু করছে বেশি।
জাওয়াদ স্টেথোস্কোপটা গলায় ঝুলাতে ঝুলাতে বললো,"এটুকুতেই জ্বর বাঁধিয়ে ফেললেন?"
রূপা খুব নিচু স্বরে বললো,"কেনো? আপনাকে খুব বিপদে ফেলে দিলাম নাকি তাতে?"
"বিপদ? আমার?"
"এইযে অসময়ে এখানে ছুটে আসতে হলো আপনাকে।"
জাওয়াদ নিঃশব্দে হেসে দেয়। সেদিকে একবার তাকিয়েই চোখ ফিরিয়ে নেয় রূপা। ডাক্তারের হাসি একদমই বাচ্চাসুলভ, নিষ্পাপ ও সুন্দর। পরক্ষণেই নিজের উপর ভয়ানক রাগ উঠে তার। এসব কি ভাবছে সে? জ্বরের সাথে সাথে মাথাটাও গেছে নাকি তার?
"জীবনে কিছু কিছু বিপদের প্রয়োজন আছে মিস রূপা। নাহলে বুঝবো কীভাবে সৃষ্টির সেরা জীব হিসেবে আমরা কতটা ভাগ্যবান?"
রূপা ভ্রু কুঁচকে তাকায় জাওয়াদের দিকে।
"তার মানে?"
"মানেটা নাহয় জ্বর সেরে যাওয়ার পরেই খুঁজে বের করবেন।"
রূপা চোখ সরিয়ে অন্য দিকে তাকায়। নাহ, এই ভদ্রলোক একটুও সহজ সরল না। ওরকম ভান ধরে থাকে। বোকা তো নয়-ই বরং একটু বেশি-ই চতুর।
রূপার জ্বর পড়ে রাত সাড়ে এগারোটার দিকে। খাওয়ার পর আবারও বমি করেছিলো সে। ওষুধ খাইয়ে জ্বর না কমা পর্যন্ত জাওয়াদ সেখানেই দাঁড়িয়ে ছিলো পুরোটা সময়। রসুর হাতে প্রেসক্রিপশন দিয়ে দীপাকে সব বুঝিয়ে দেয় সে। কোন ওষুধ কখন দিতে হবে, জ্বর বাড়াবাড়ি হলে কোনটা দিতে হবে ইত্যাদি।
ডাক্তারকে গেট পর্যন্ত এগিয়ে দিতে এসেছে নেওয়াজ। রসু গেছে রিকশা ডাকতে। নেওয়াজ জবুথবু হয়ে দাঁড়িয়ে।
"স্যার আপনি এতো দুশ্চিন্তা কেনো করছেন? জ্বর আসা তো মানবদেহের জন্য অতি স্বাভাবিক বিষয়। কাল বা পরশুর মধ্যেই জ্বর নেমে যাবে পুরোপুরি।"
"ওরা ছাড়া আমার কেউ নেই ডাক্তার। ওদের কিছু হলে আমার দুনিয়া আঁধারে ছেয়ে যায়।"
"বুঝতে পারছি স্যার। আপনি ছাড়াও তো উনাদের কেউ নেই। তাই খুব স্বাভাবিক আপনাকে ভেঙে পড়তে দেখলে উনারা ভীত হয়ে যান। অসুস্থতার সময় তাকে সাহস দিতে হবে, ভীত হতে দেওয়া যাবে না।"
নেওয়াজ পাঞ্জাবির কোণা দিয়ে চোখ মোছে।
জাওয়াদ নেওয়াজের কাঁধে আলতো করে হাত রেখে বললো,"আমি আছি তো স্যার। যে কোনো সমস্যায় আমাকে ডাকবেন। যত রাতই হোক আর যা-ই হোক। কখনো ইতস্তত করবেন না আমাকে জানাতে।"
নেওয়াজ জ্বলজ্বল চোখে তাকায় জাওয়াদের দিকে। 'আমি আছি তো' বাক্যটা ছোট হলেও এর ভার অনেক। এ বাক্য ভরসা দেয়, আশ্রয় দেয়। সবাই এ কথা বলতে পারে না।
রসু রিকশা নিয়ে চলে এসেছে।
জাওয়াদ রিকশায় ওঠার আগে নেওয়াজের দিকে তাকিয়ে আবার বললো,"আর দাঁড়িয়ে থাকবেন না, ঘরে যান। উনার কাছে যেয়ে বসুন।"
"তোমার ফিস...."
নেওয়াজের হাতের হলুদ খামটার দিকে তাকিয়ে ছোট্ট করে হাসে জাওয়াদ।
"রেখে দিন, পরে কোনো সময় নিবো।"
নেওয়াজ জোর করে, জাওয়াদ তাড়াতাড়ি করে উঠে পড়ে রিকশায়। যাওয়ার আগে রসুকে বলে যায় বড় আপার খেয়াল রাখতে। রসু মাথা নেড়ে সম্মতি জানায়।
তার রিকশা যতক্ষণ না দৃষ্টিসীমার বাইরে যায় ততক্ষণ সেদিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে নেওয়াজ। একটা তীব্র ইচ্ছা মনে বাসা বাঁধে তার। এ চাওয়া কি অন্যায় হয়ে যাবে? জুলুম হয়ে যাবে?
(চলবে....)