ফন্ট সাইজ:
থিম:
এসো নীপবনে হারাই দু'জনে

২২তম পর্ব

লেখক: মিথিলা জামান নিভা

#এসো_নীপবনে_হারাই_দুজনে

পর্ব: ২২

টুনিকে ছানা সহ বাড়িতে আনা হয়েছে তিনদিন হয়। বাড়িতে যেনো উৎসব লেগেছে। নেওয়াজ, রূপা বা দীপা কেউ ওদের একবিন্দু বুঝতে দিচ্ছে না যে রসু ওদের বাড়ির কেউ না, কোনো রক্তের সম্পর্ক নেই ওদের সাথে। বরং তারা আরো বেশি ঝলমল করছে খুশিতে। নেওয়াজ তো ছানাকে ছাড়া আর কিছুই বোঝে না। ভোরবেলায় ঘুম ভেঙেই ছানাকে দেখবে, আবার রাতে ঘুমাতে যাওয়ার সময় ওকে দেখেই ঘুমাতে যাবে। শেষ বয়সে এসে নেওয়াজ ছোট্ট আরেক সঙ্গী পেলো যেনো।

দীপাও কলেজ থেকে ফিরেই ছানাকে কোলে নিয়ে বসে, বাকি সব কাজ পরে। এমন ব্যাপার যে টুনিই ওকে খাওয়ানোর সময় ছাড়া কাছে পায়না। এতে অবশ্য টুনি ভালোই আছে। তার মধ্যে এখনো মাতৃসুলভ আচরণ আসেনি। কিশোরীদের মতোই কলকল করছে সর্বদা। যদিও তার শরীর এখনো ভীষণ দূর্বল। ডাক্তার বলেছে সারাদিন বিশ্রামে থাকতে। রূপা তাকে মুখে তুলে খাইয়ে দেয় প্রতি বেলায়।

"আর খাবো না বড় আপা। আমার পেট ভর্তি হয়ে গেছে। মনে হচ্ছে ছানা এখনো আমার পেটে।"

রূপা কিছুটা বিরক্ত হয়ে বললো,"অদ্ভুত কথা বলো না তো টুনি। বেশি করে না খেলে শক্তি পাবে কীভাবে? মা হয়েছো, এখন তোমার অনেক দায়িত্ব ভুলে যেও না।"

টুনি রূপার দিকে তাকিয়ে মুখ টিপে হাসে।

"আবার হাসছো কেনো?"

"আচ্ছা বড় আপা, আমার মেয়ের নামটা আপনার কেমন লাগে? ছানা, টুনটুনির ছানা।"

রূপা ঠান্ডা গলায় বললো,"ভালো।"

"আপনি কি জানেন এই নামটা কে রাখছে?"

রূপা উত্তর দেয়না, যদিও সে জানে।

"বড় আপা একটা কথা জিজ্ঞেস করি?"

"করো।"

"জাওয়াদ ভাইজান কবে আসবে? আমার বাচ্চাটারে কবে দেখবে উনি? উনার পরীক্ষা কি শেষ হয় নাই?"

রূপা নিজেকে সামলে বললো,"আমি কীভাবে জানবো কবে আসবে? আমাকে জিজ্ঞাসা করছো কেনো?"

"আপনি জানেন না?"

রূপা একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে। প্লেটের ভাতগুলো নাড়াচাড়া করে আপনমনে। টুনি চুপ করে বসে তাকিয়ে থাকে তার দিকে।

"না জানিনা টুনি। আমি উনার এমন কেউ নই যে উনার ব্যক্তিগত সব খবর রাখবো। সে অধিকার আমার নেই।"

"হয়তো সেই অধিকার আপনার ছিলো, কিন্তু আপনি অবহেলা করেছেন।"

রূপা ঝট করে টুনির দিকে তাকায়। টুনি নির্লিপ্ত মুখে বসে আছে। তাকে দেখে মোটেই এখন বাচ্চাসুলভ লাগছে না। মনে হচ্ছে পরিণত একজন নারী, যে তার সামনে বসা নারীটির ভিতর পড়তে পারছে।

"টুনি তুমি বিশ্রাম নাও, আমি আসছি।"

রূপা উঠতে গেলেই টুনি তার আঁচল টেনে ধরে। রূপা ভ্রু কুঁচকে তাকায় সেদিকে।

"আপনি রাগ করলেন আপা আমার কথায়?"

"না রাগ করিনি। আমার একটু কাজ আছে।"

"যদি বেয়াদবি না নেন ছোট মুখে একটা বড় কথা বলি?"

রূপা একটা লম্বা শ্বাস ফেলে বললো,"বলো।"

টুনি মাথা নিচু করে বললো,"মূর্খসূর্খ মানুষ আমি। আপনাদের মতো শিক্ষিত নই। আপনার থেকে অনেকটা ছোটই হবো বয়সে। কিন্তু বড় আপা, আমি অনেক কিছু দেখছি এই ছোট্ট জীবনে। চার বইনের সংসার, বাপে সামান্য কাঠমিস্ত্রী। একজনের ইনকামে এতোগুলো মানুষের পেট চলতো। তবুও আব্বা আমাদের মানুষের বাড়ি কাজ করতে দেয়নি। আমাদের কষ্ট দেখতে পারতেন না। নিজের হাজারটা কষ্ট হইলেও আমাদের ভালো রাখার চেষ্টা করেছেন। বিয়ে ঠিক করলেন আব্বা, ছেলে সরকারি অফিসের পিওন। রোজগার খারাপ না। আব্বা ভাবলেন আমি ভালো থাকবো। কিন্তু আমি তো ততদিনে আপনাদের রসু পাগলাটারে মন দিয়ে দিছি। আমি যে তারে ভালোবাসছি আপা। একজনরে ভালোবাইসা আরেকজনের সাথে সংসার করলে কি ভালো থাকা যায়, কন তো?"

রূপা হতবাক হয়ে টুনির দিকে তাকিয়ে থাকে। এই মেয়েটাকে বরাবরই বাচ্চা স্বভাবের লেগেছে। কারণ নেই, অকারণ নেই শুধু হাসে। দীপা তো বলতো ওর মাথায় সমস্যা, নাহলে এতো কীভাবে হাসে? সেই একরত্তি মেয়েটা আজ কি ভারী ভারী কথা বলছে। তার শেষ কথাটায় রূপার বুকে ঝড় উঠে যায়।

"আব্বা, মায়ের কথা, বইনগুলোর কথা কিচ্ছু ভাবলাম না। নিজের সুখের জন্য স্বার্থপর হয়ে গেলাম বড় আপা। জানিনা ভুল করলাম নাকি ঠিক। কিন্তু আমার ওই সময় মনে হইছিলো পৃথিবীর আর কোনো মানুষের কাছে আমি ওই শান্তি পাবো না যতটা আমি উনার কাছে পাবো। পালায় আসলাম বাড়ি থেকে। আব্বা রাগ করলেন, আমারে নাকি ত্যাজ্য করে দিবেন হ্যানত্যান। আমি আব্বার উপর রাগ করতে পারিনাই। আমার ছানাও যদি এই কাজ করে, আমি আব্বার মতোই একই কাজ করবো। কিন্তু বড় আপা আমি আর কি করতাম কন? আব্বা কোনোদিন রসুরে মাইনা নিতো না তখন। রসুরে আপনারা বাড়ির ছেলের মতো দেখেন ঠিক আছে, কিন্তু বাইরের সবার কাছে তো সে এ বাড়ির কাজের লোক। আর কাজের লোকের বউ তো কাজের লোকই হবে, তাইনা? যে মানুষটা নিজে সারাজীবন কষ্ট করলেও আমাদের মানুষের বাড়ি কাজ করতে দেয়নি, সে মানুষটা কেন চাইবে তার মেয়েটা বিয়ের পর কাজের লোক হোক?"

রূপা বাম হাত টুনির হাতের উপর রাখে। সদা হাস্যোজ্জ্বল মেয়েটার চোখের কোণে পানি জমেছে। রূপা টুনির চোখের পানিটুকু মুছে দেয় নিজের আঁচল দিয়ে।

"বড় আপা ভালোবাসার কাছে দুনিয়ার কোনো আইন খাটে না। দুনিয়ার কোনো আদালত ভালোবাসার বিচার করতে পারে না। দুইজন যদি দুইজনরে সত্যিকারের ভালোবাসেন তাইলে আল্লাহ পাক ব্যতীত দুনিয়ার কেউ তাদের মধ্যে ভাঙন ধরাতে পারেনা, পারা উচিত না। এইডা আমি বিশ্বাস করি আপা। দরকার নাই আর কোনো কারণের। কে পাপী, কে নিষ্পাপ সে তো এক আল্লাহই জানেন। দুই কান্ধের দুই ফেরেশতা অনবরত রিপোর্ট করতেছে তা আল্লাহর কাছে। কিন্তু নিজেদের মধ্যে সেই কারণরে দাঁড় করিয়ে কেন এতো কষ্ট পাচ্ছেন আপনারা? একটাই জীবন বড় আপা। এই দুনিয়ায় আমরা আর কোনোদিন ফিরে আসতে পারবো না। অপূর্ণতা নিয়েই দুনিয়া ছাড়বেন?"

রূপা বিস্ফারিত চোখে টুনির দিকে তাকিয়ে থাকে। কি অদ্ভুত! মেয়েটা আজ এতো সুন্দর, গুছিয়ে কথা বলছে কীভাবে? ওর একটা কথাও তো ফেলে দেওয়ার মতো নয়, বরং কলিজা কাঁপিয়ে দেওয়ার মতো। রসু অসম্ভব ভাগ্যবান এই অসাধারণ রমনীটিকে স্ত্রী হিসেবে পেয়ে, জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়ে।

"বড় আপা আপনি রাগ করেন নাই তো? যদি রাগ করেন আমার দুই গালে দু'টো চড় মারেন। তা-ও মুখ গম্ভীর করে রাখবেন না। আপনার মুখ গম্ভীর দেখলে আমার খুব কষ্ট হয়।"

রূপা মৃদু হেসে বললো,"আর তুমি এরকম ভারী ভারী কথা বললে আমার যে খুব কষ্ট হয়? মনে হয় তুমি আমাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছো। বাচ্চা টুনিটাই আমাদের সবচেয়ে বেশি আপন। ছানা বড় হবে কিন্তু ছানার মায়ের বড় হওয়া চলবে না।"

টুনি মুখ টিপে হেসে রূপাকে জড়িয়ে ধরে। রূপা বুকের কাছে থাকা টুনির মাথায় আলতো করে হাত বুলায়। দাঁতে দাঁত চেপে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করে।

মনে মনে বলে,'টুনি তোমার ভাইজান যদি আর একটাবার আমার সামনে আসে, আমি আমার ভালোবাসার দাবি নিয়ে নিশ্চয়ই উপস্থিত হবো তার সামনে। তাকে আঁচলে বেঁধে ফেলবো আজীবনের জন্য। কিন্তু সে যে ভয়ানক রাগ করে আছে আমার উপর। প্রতিশোধ নিচ্ছে। কবে ফিরবে উনি টুনি? আমার যে উনাকে ছাড়া আর কিচ্ছু ভালো লাগছে না।'

উত্তর দিকে একটা লম্বা টানা বারান্দা জাওয়াদদের বাড়িতে। আজকালকার বাড়িগুলোর মতো চিকন বারান্দা না, বেশ প্রশস্ত। একটা স্টিলের দোলনাও আছে সেখানে। দেওয়ালে এক পা গুটিয়ে দাঁড়িয়ে আছে জাওয়াদ। তার দৃষ্টি গ্রিলের বাইরে, রাস্তায়। রাস্তায় এক পাগল শ্রেণীর লোক গান করছে। জাওয়াদ মনোযোগ দিয়ে তাকে দেখছে।

"কাছের মানুষ দূরে থুইয়া, মরি আমি ধড়ফড়াইয়া রে।

দারুণ জ্বালা দিবানিশি, অন্তরে অন্তরে।

আমার মনের নোঙর পইড়া রইছে,

হায়রে, সারেং বাড়ির ঘরে।"

পাগল হলেও লোকটার গানের গলা চমৎকার। ঘোর লেগে যায় জাওয়াদের সেই গান শুনে।

"কি রে ভাই? তুই এখানে? আমি তোকে সারাবাড়ি খুঁজে বেড়াচ্ছি।"

জাওয়াদ সম্বিত ফিরে পেয়ে ঘুরে তাকায় একবার। দুলু চিন্তিত মুখে তাকিয়ে তার দিকে।

"খুঁজছো কেনো আমাকে? কোনো দরকার?"

দুলু ধীর পায়ে হেঁটে জাওয়াদের সামনে দাঁড়ায়। জাওয়াদের পিঠে কোমল স্পর্শ করে।

"কি হয়েছে তোর ভাই?"

"এক কথা বার বার জিজ্ঞেস করছো কেনো আপা? বলছি তো কিছু হয়নি।"

"বাবা তো সুস্থই হয়ে গেছে অনেকটা। তবুও এতো কি যে ভাবছিস।"

জাওয়াদ উত্তর দেয়না। পাগলটা চলে গেছে। তবে জাওয়াদের আরো কিছুক্ষণ তার গান শুনতে ইচ্ছা করছিলো।

"জাওয়াদ।"

"হু।"

"অনেকদিন হলো ছুটি নিয়েছিস। কমপ্লেক্সে তুই ছাড়া অসুবিধা হচ্ছে না?"

"না হচ্ছে না।"

দুলু কি বলবে ভেবে পায়না। ভাইটা তার চুপচাপ বরাবরই। কিন্তু দুলুর সাথে তার রাজ্যের কথা। বোনের কাছে এসে যেনো ও প্রাণ ফিরে পেতো। কতশত গল্প যে করতো দুই ভাইবোন মিলে। বাবার গাড়ির শব্দ শুনে দুইজন দুইদিকে ছুটে পালাতো। দুলু নিজের ঘরে আর জাওয়াদ পড়ার টেবিলে। কিন্তু এবার যেনো জাওয়াদ দুলুর সাথেও দূরত্ব বজায় রাখছে। নিজেকে অসম্ভব গুটিয়ে রেখেছে নিজের মধ্যে। বাবার অসুস্থতা একটা কারণ হতেই পারে কিন্তু সে তো এখন অনেকটাই সুস্থ। ডাক্তার হাসপাতালেও ভর্তি হতে জোর করেনি। বলেছে বাড়িতে একটু যত্নে থাকলেই হবে। তাহলে জাওয়াদ এমন গম্ভীর কেনো? রূপার সাথে কিছু হয়েছে? দুলু বুঝতে পারে না কীভাবে এ কথা তুলবে সে।

"আপা।"

দুলু উদগ্রীব হয়ে বললো,"হু বল।"

"আমি না থাকায় ওখানে কোনো অসুবিধা হচ্ছে না আপা। কারণ তারা নতুন ডাক্তার নিয়োগ করেছে হয়তো ইতোমধ্যে।"

দুলু অবাক হয়ে বললো,"তার মানে?"

জাওয়াদ কিছুক্ষণ থেমে ক্ষীণ গলায় বললো,"চাকরিটা আমি ছেড়ে দিয়েছি আপা।"

দুলু অবিশ্বাস্য চোখে জাওয়াদের দিকে তাকায়। মাত্রই মৌখিক পরীক্ষা দিলো, ফলাফল আসতেও দেরি আছে। এরই মধ্যে জাওয়াদ চাকরি ছেড়ে দিলো? এমন তো হওয়ার কথা না। যদিও জাওয়াদের চাকরি চুক্তিভিত্তিক ছিলো। দেড় বছরের মতো। কিন্তু ওখান থেকেই ওকে অনুরোধ করা হয় যতদিন না সরকারি ভাবে নিয়োগ পেয়ে কোথাও না যায় ততদিন যেনো জাওয়াদ ওখানেই থাকে। চুক্তিভিত্তিক চাকরিটা তো স্থায়ী করতে চেয়েছিলো। জাওয়াদের তো জায়গাটাও অনেক পছন্দের। ওখানকার সবাই জাওয়াদ বলতে অজ্ঞান। তাহলে ও এই কাজ কেনো করলো?

"জাওয়াদ...."

"ঢাকায় যেদিন আসি, সেদিন সকালেই আমি রিজাইন লেটার জমা করে এসেছি। তাই এখন আমি আর ওখানকার ডাক্তার নই। আমি না থাকায় কোনো অসুবিধা হচ্ছে না কারো।"

দুলুর মনে অনেক প্রশ্ন জমা হয়। কিন্তু এখনই শোনার সময় নয়। জাওয়াদ খুব ঠান্ডা মাথার ছেলে। সে যখন এই কাজ করেছে নিশ্চয়ই এর পিছনে কোনো কারণ আছে।

"তাহলে এখন কি করবি ভাবছিস? বাবা মনে হয় না এখন আর তোকে বিদেশ পাঠানোর জন্য জোরাজোরি করবে। কয়দিনের অসুস্থতাতেই সে বুঝেছে ছেলেকে তার পাশে প্রয়োজন। সবাই আশা করছি এবারই বিসিএসে টিকে যা, কিন্তু যদি কোনো কারণে না হয়? ঢাকাতেই কোথাও অ্যাপ্লাই করবি ভাবছিস?"

জাওয়াদ দুই হাত দিয়ে মাথার চুলগুলো মাথার পিছনে সরিয়ে হালকা চেপে ধরে।

"এখনো জানিনা আপা কি করবো। আমাকে এক কাপ চা বানিয়ে দেবে? না না থাক, কফিই দাও।"

দুলু ঈষৎ হেসে তাকায় ভাইয়ের দিকে৷ ছেলেটা ভিতর ভিতর পুড়ছে, সে উত্তপ্ত হয়ে আছে। দুলু ঠিক বুঝতে পারছে দু'জনের মাঝে মনোমালিন্য চলছে। তাই বলে ছেলেটা চাকরিই ছেড়ে দিবে?

"আচ্ছা আনছি, একটু অপেক্ষা কর।"

"আমার জন্যও এক মগ আনিস দুলু, কফি খেতে ইচ্ছা করছে।"

দুই ভাইবোন অবাক হয়ে তাকায় বারান্দার দরজার দিকে। মোরশেদ দাঁড়িয়ে সেখানে। অপ্রস্তুত হয়ে যায় দুইজন। বাবার সাথে তাদের সম্পর্ক মোটেই সহজ, স্বাভাবিক নয়। দুইজনের ইতস্তততা দেখে মোরশেদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে।

"এক্ষুনি আনছি বাবা। আপনি ঘরে যেয়ে বসুন নাহয়।"

মোরশেদ জাওয়াদের দিকে তাকিয়ে বললো,"নাহ এখানেই দিয়ে যা। জাওয়াদও এখানেই আছে।"

দুলু দুইজনের দিকে তাকিয়ে বেরিয়ে যায় বারান্দা থেকে।

মোরশেদ জাওয়াদের দিকে এগিয়ে আসে।

"জাওয়াদ।"

"বলুন।"

"তুমি কি দুশ্চিন্তা করছো কিছু নিয়ে?"

"কই না তো।"

জাওয়াদ মাথা নিচু করে রাখে। বাবার সাথে মধুর স্মৃতি বলতে বিশেষ কিছু নেই। শুধু মনে পড়ে খুব ছোটবেলায় বাবা ব্যবসার কাজে বাইরে কোথাও গেলে ওর জন্য খেলনা আনতো। এখন হঠাৎ কেনো যে ওই স্মৃতি গুলো মনের কোণায় উঁকি দিচ্ছে। বাবার করা সব দুর্ব্যবহার যেনো কর্পূরের মতো উবে যাচ্ছে মানস্পট থেকে, আশ্চর্য!

"দুশ্চিন্তা করো না। আমি তোমার উপর আর কোনো জোরজবরদস্তি করবো না। দেশে থাকতে চেয়েছিলে, দেশেই থাকবে। এবারে যদি বিসিএসে না-ও হয়, সামনের বারের জন্য প্রস্তুতি নাও বাড়িতে বসে। সর্বোপরি নিজের মন যা চায় তাই করো।"

জাওয়াদ চোখ তুলে বাবাকে দেখে। ঢোক চাপে আলগোছে। বাবার তেজী কণ্ঠ শুনেই অভ্যস্ত সে। এভাবে হালকা গলায় তাকে কথা বলতে দেখে অন্যরকম লাগছে।

"উচ্চমাধ্যমিকের আগে কক্সবাজার ঘুরতে যেতে চেয়েছিলে। আমি যেতে দিইনি। চাইলে এখন যেতে পারো। তোমার মা, তোমার আপা, মিহাদ সবাইকে নিয়ে ঘুরে এসো। ভালোই লাগবে আশা করি।"

জাওয়াদ বুঝতে পারে না কি বলবে। বাবার প্রতি এতোদিনের পোষা রাগ ধোঁয়ার মতো উড়ে যাচ্ছে। জোর করেও সেই রাগ সে ধরে রাখতে পারছে না। এতো আদর দিয়ে কথা বলছে কেনো সে?

"আপনার শরীর ভালো আছে তো? এসব কেনো বলছেন?"

"আমি ঠিক আছি। আমাকে নিয়ে ভেবো না, তোমরা ঘুরে এসো।"

জাওয়াদ চাপা গলায় বললো,"এখন না, সময় হোক আপনাকে জানাবো।"

মোরশেদ মাথা নাড়ে।

বেশ কিছুক্ষণ দুইজন চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে। দুইজনই চাচ্ছে অপরজন কিছু বলুক। এতোদিনের ক্রোশ ক্রোশ দূরত্ব কিছুটা হলেও কমুক। কিন্তু কোন এক অজানা বাঁধায় কেউ কিচ্ছু বলতে পারছে না। দুলুও ইচ্ছা করেই কফি নিয়ে আসছে না। সে চাচ্ছে বাবা-ছেলে কিছুক্ষণ নিজেদের মধ্যে একান্তে কথা বলুক।

হঠাৎ পিঠে বাবার আলতো স্পর্শ পেয়ে জাওয়াদ পুরোপুরি ভেঙে যায়। এতোদিনের সব অভিমান ভুলে সে বাবার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো,"বাবা...."

মোরশেদ জোর করে কণ্ঠ গম্ভীর করে।

"যা যা পছন্দ তা-ই করো জাওয়াদ। যদি কাউকে পছন্দ হয় তা-ও আমাকে জানাতে পারো। সে-ও যদি রাজি থাকে তবে আমি নিজে তাকে তোমার জন্য এ বাড়িতে নিয়ে আসবো।"

জাওয়াদ হতভম্ব হয়ে যায়। কিছু বলতে পারে না। সে বুঝতে পারে ঠিক মা'ই এই কথা বাবার কানে উঠিয়েছে।

"শুনলাম দুলু ফরহাদের কাছে চলে যাবে দুবাইতে পুরোপুরি। বাড়িটা আরো নিস্তেজ হয়ে পড়বে। প্রাণহীন বাড়িটাতে প্রাণের সঞ্চার হোক আবার। শুধু একটাই কথা বলবো, যাকে আনবে তাকে কষ্ট দিবে না। আমি জানি তুমি তা দিবে না, কারণ তুমি তোমার বাবার মতো নও। তুমি দায়িত্ব সামলাতে জানো তবে ভালোবাসা বর্জন করে নয়। আমার মতো ভুল তুমি করবে না জানি। তুমি একজন ভালো স্বামী হবে, সেই সাথে একজন ভালো বাবাও হবে।"

মোরশেদ এটুকু বলেই চলে যায়। জাওয়াদ এখনো ওভাবেই হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। বাবাকে খুব বলতে ইচ্ছা করে,'আমি পূর্বের সব ভুলে গেলাম বাবা। আপনিও একজন ভালো বাবা, খুব ভালো বাবা।'

কিন্তু সে বলতে পারে না। বোধহয় একদিন বলবে। কিন্তু তা কবে?

(চলবে.....)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন