ফন্ট সাইজ:
থিম:
এসো নীপবনে হারাই দু'জনে

২৩তম পর্ব

লেখক: মিথিলা জামান নিভা

#এসো_নীপবনে_হারাই_দুজনে

পর্ব: ২৩

কমপ্লেক্সের সামনে দাঁড়িয়ে আছে রূপা অপ্রস্তুত চেহারায়। আজ তার শাড়ি বরাবরের মতো পরিপাটিও নয়, চুলগুলোও যথেষ্ট অগোছালো। ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুলের নখ কামড়াচ্ছে সে আনমনে।

আজ একুশ দিন হয় জাওয়াদ এখান থেকে চলে গেছে। কোনো খোঁজ নেই তার। এই একুশটা দিন রূপার কীভাবে গেছে শুধু সে-ই জানে। বাড়ির সবাই হয়তো বুঝতে পারছে কিন্তু আদতে রূপার হৃদয়ের ঝড় আদৌ কি কেউ টের পাচ্ছে?

আচ্ছা উনিও নাকি রূপাকে খুব ভালোবাসেন। উনারও কি এতোটা কষ্ট হচ্ছে? যদি হয়ে থাকে তাহলে কেনো ছুটে আসছেন না উনি একটাবার? শোধ নিচ্ছেন এভাবে? যদি তা-ই হয় তবে কবে শেষ হবে এই প্রতিশোধের পালা?

রূপা মূলত আবু শেখের কাছে এসেছিলো। যদি একটা খবর অন্তত পাওয়া যায়। আর কিছু না হোক সে কেমন আছে, শরীর ভালো আছে কিনা এটুকু তো জানাই যাবে তাইনা?

কিন্তু রূপার ইতস্তততা যায় না। বেশ কিছুক্ষণ ওভাবে দাঁড়িয়েই রূপা ভিতরে না ঢুকেই বাড়ির উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়।

"রূপকথা আপা আপনি এখানে?"

রূপা দাঁড়িয়ে যায়। আবু তাকে দেখে নিয়েছে। রূপা পিছন ঘুরে জোর করে একটু হাসে। আবু দ্রুত পায়ে ছুটে আসে তার দিকে।

"কি হয়েছে আপা? মাস্টারসাব ভালো আছেন? ডাক্তার লাগলে ফোন করে দিতেন একটা।"

রূপা তাড়াতাড়ি করে বললো,"না না দাদাজান ঠিক আছেন। ডাক্তার লাগবে না।"

"তাহলে কি বাড়ির আর কেউ..."

"সবাই ভালো আছে আবু ভাই। কেউ অসুস্থ না।"

এই বলে রূপা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকে। আবু ছোট্ট করে হেসে তাকায় তার দিকে।

"ডাক্তার সাবের খোঁজ করছেন আপা?"

রূপা অসহায় চোখে আবুর দিকে তাকায়। হয়তো মিথ্যা প্রতিবাদ করে না না বলতো, কিন্তু সেই প্রতিবাদের ভাষা এতোটাই ক্ষীণ হবে যে রূপা মুখ খোলেনা। ওভাবেই দাঁড়িয়ে থাকে।

আবু একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,"ডাক্তার সাব ভালো আছেন। ফলাফল নিয়ে একটু দুশ্চিন্তা করছেন আর কি। তবে..."

"তবে?"

"উনার বাবার শরীরটা ভালো না। উনি উনার বাবার কাছেই আছেন এখন।"

রূপা চিন্তিত কণ্ঠে বললো,"তাই? এখন কেমন আছেন উনি?"

"আগের থেকে বেশ ভালো। টুনির খবর জানতে ফোন দিয়েছিলেন। খুব খুশি হয়েছেন শুনে। মাস্টার সাব, রসু, দীপান্বিতা আপা সবার কথাই জিজ্ঞাসা করলেন।"

রূপা ম্লান হাসে। আবু ভাইয়ের কাছে ফোন করে টুনির খবর নিচ্ছেন। কেনো? রূপকথা ভিলায় কি টেলিফোন নেই? না তা করবে কেনো? ভুলে যদি আবার রূপা সেই ফোন তোলে? রূপার সাথে তো কথা বলবেন না উনি। সবার খোঁজ নিয়েছেন, শুধু রূপার খোঁজ নেননি। ভালোবাসেন নাকি উনি। ঘোড়ার ডিম বাসেন।

"রূপকথা আপা।"

"হু।"

"উনি আপনার কথাও জিজ্ঞাসা করেছেন।"

রূপা ঝট করে তাকায় আবুর দিকে। আবু হাসছে নিঃশব্দে।

"তাই নাকি?"

"হ্যা। আপনার নতুন স্কুলের খোঁজ নিলেন। আপনি কেমন আছেন জানতে চাইলেন।"

রূপা উত্তর দেয়না। রূপকথা ভিলার প্রতিটা মানুষ তাকে কি পরিমাণ ভালোবাসে, নিঃস্বার্থ ভালোবাসা যাকে বলে। তাদের খোঁজ কিনা বাইরের একজনের কাছ থেকে নিতে হবে? এতোটা পাষাণ তো তাকে আগে মনে হয়নি।

"আর কিছু বলবেন রূপকথা আপা?"

রূপা আস্তে আস্তে না-সূচক মাথা নাড়ে।

"আপা।"

"বলুন আবু ভাই।"

"উনার বাড়ির টেলিফোন নাম্বার কি আপনারে দিবো?"

রূপা জোর করে রাগ করার চেষ্টা করে।

"উনার টেলিফোন নাম্বার দিয়ে আমি কি করবো? আমি উনার সাথে কথা বলতে চাইনা। কোনো প্রয়োজন নেই।"

আবু মাথা নিচু করে হাসে কুটকুট করে। দুইজনের জিদ দেখতেও ভালো লাগছে। দুইজনই দুইজনরে ভীষণ ভালোবেসে ফেলেছে। কিন্তু কেউ আগে থেকে আত্মসমর্পণ করবে না। কিশোর-কিশোরীদের মতো অভিমান করছে আবার। ব্যাপারটা আবুর বেশ মনে ধরেছে।

"হাসছেন কেনো আবু ভাই? হাসবেন না।"

"আচ্ছা আপা হাসবো না। শুধু নাম্বারটা আপনারে লিখে দিচ্ছি।"

"অদ্ভুত! বললাম তো উনার নাম্বার লাগবে না।"

"জানি লাগবে না। তবুও রাখলেন আর কি। কখন আবার লেগে যায়, আবার ছুটে আসবেন নাকি আমার কাছে?"

রূপা কটমট করে তাকায় আবুর দিকে।

"কি বললেন আবু ভাই?"

"ও কিছু না। এক মিনিট দাঁড়ান।"

আবু ঝড়ের বেগে কমপ্লেক্সের ভিতরে ঢুকে যায়। রূপার মনটা আর্দ্র হয়ে যায়। জাওয়াদকে ফোন দিবে সে?

পরক্ষণেই আবার জিদ উঠে যায়। কেনো দিবে? কখনো না। জাওয়াদ দিয়েছে? রূপা কেনো দিতে যাবে?

আচ্ছা দিবেই না যখন তাহলে বেহায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে কেনো রূপা নাম্বারের জন্য? ছিহ! নিজেই নিজেকে প্রশ্ন করে আর ক্ষোভে অস্থির হয়ে যায়।

আবু বেশিক্ষণ দেরি করে না। মিনিট দুইয়ের মাথাতেই বেরিয়ে আসে। ছোট্ট একটা সাদা কাগজ এগিয়ে দেয় রূপার দিকে। রূপা চোখমুখ কুঁচকে তাকায় সেদিকে। হাতে নেয় না।

"আরে নিন তো আপা। আপনি ফোন না দেন, মাস্টারসাব তো দিতেই পারেন।"

রূপা উদাসীন ভাবে কাগজটা হাতে নেয়। যেনো তার ইচ্ছাই ছিলো না নেওয়ার, নেহাত আবু জোর করছে তাই নিয়েছে। আবু জোর করে হাসি আটকে রাখে। পাছে আবার রূপকথা আপার ধমক খেতে হয় যদি?

"আমি চলি আপা? আপনি সাবধানে যাবেন।"

আবু আর রূপাকে অপেক্ষা করাতে চাইলো না। সে বুঝতে পারছে তার রূপকথা আপার ধ্যানজ্ঞান এখন ওই এক টুকরো কাগজের মধ্যেই পড়ে আছে। মুখে যত যা-ই বলুক, ফোন সে করবেই। আর সেইটা আজকেই।

মেঝেতে এক পা ভাঁজ করে আরেক পা ছড়িয়ে দিয়ে বসে আছে জাওয়াদ। তার মাথার কাছে খাটে বসে হাফসা। ছেলের চুলে হাত বুলাচ্ছে আপনমনে। জাওয়াদের ঘুম এসে যায় মায়ের স্পর্শে।

"জাওয়াদ।"

"বলো মা।"

"রূপকথা ভিলার সবাই তোকে খুব পছন্দ করতো তাই না রে?"

জাওয়াদ কিছুটা চমকে গেলেও উপরে প্রকাশ করে না।

"সে তো ওই এলাকার সবাই-ই কমবেশি আমাকে পছন্দ করতো। হঠাৎ ওদের কথাই উঠছে কেনো?"

"অদ্ভুত ছেলে তো তুই। যারা তোকে এতো ভালোবাসা দিলো তাদের কাছ থেকে এভাবে পালিয়ে চলে এলি? তোর কি মনে পড়ে না ওদের কথা?"

জাওয়াদ উঠে দাঁড়ায়। হাফসা কিছু বুঝে উঠতে পারে না। তার শান্তশিষ্ট ছেলেটা আজকাল এমন হুটহাট রেগে যায় কেনো?

"দুলু আপা আর তুমি সমানে এই কথাগুলো বলে যাচ্ছো। কেনো মা? আমি কি বোঝা হয়ে গেলাম তোমাদের কাছে? আমি তো এখানে আসতে চাইনি। বললে আজকেই এখান থেকে চলে যাবো।"

হাফসা হতভম্ব হয়ে যায় ছেলের কথায়। সে-ও উঠে দাঁড়ায় সাথে সাথে।

"তুই এসব কি বলছিস বাবা? বোঝা হবি মানে? আর এটা তো তোরই বাড়ি। নিজের বাড়ি রেখে কোথায় যাবি তুই আবার?"

জাওয়াদ একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,"যদি তা-ই হয় তাহলে দয়া করে তোমরা কেউ আর ওখানকার কথা তুলো না। কেনো বুঝতে পারছো না যে আমি শুনতে চাচ্ছি না।"

জাওয়াদের কণ্ঠে উত্তাপ৷ হাফসা থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সে কি এমন বললো যে জাওয়াদ এমন রেগে গেলো? কেমন অপরিচিত লাগছে ছেলেটাকে।

জাওয়াদ ততক্ষণে ও ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে। নিজের ঘরে যেয়ে সশব্দে দরজা আটকে দেয়। দুলুই হাফসাকে বলেছিলো জাওয়াদের ভিতর থেকে কথা বের করতে। কি হয়েছে রূপার সাথে তার। সেই চেষ্টাই করছিলো হাফসা। কিন্তু হঠাৎ...

বসার ঘরে অশান্ত ভাবে বসে পা নাড়াচ্ছে রূপা। বেশ উত্তেজিত লাগছে তাকে। তার পাশেই টেলিফোন আর তার হাতে আবুর দেওয়া সেই ছোট্ট কাগজ। যাতে জ্বলজ্বল করছে একটা নাম্বার। রূপার অস্থির লাগছে। বেশ কয়েকবার রিসিভার তুলেছে সে। কিন্তু পরক্ষণেই আবার নামিয়ে রেখেছে। সে আর কিছু না, শুধু জাওয়াদের কণ্ঠটা শুনবে। এই পরিণত বয়সে এসে, ভীষণ ভাবে কারো কাছ থেকে প্রতারিত হওয়ার পরেও তাকে এসবে মানায় না। তবুও নিজের মনের উপর কি কারো নিয়ন্ত্রণ থাকে? মনে হচ্ছে ওই কণ্ঠটা না শুনতে পারলে মরেই যাবে সে তৃষ্ণায়। শুধুমাত্র একটাবার শুনেই সে রেখে দিবে। জাওয়াদ কি আর জানতে পারবে কে ফোন করেছিলো?

মন আর মস্তিষ্কের লড়াই চলে বেশ কিছুক্ষণ। বেশ কিছুক্ষণ পর মস্তিষ্ককে হারিয়ে মনই জয়ী হয়। বেশি কিছুই না, শুধুমাত্র একবার ওই নেশা ধরানো কণ্ঠটা, এরপরই খট করে ফোনটা রেখে দিবে সে।

শ্বাস আটকে বসে আছে রূপা। রিং বাজছে, হাতুড়িপেটা চলছে যেনো রূপার বুকে। ঠোঁট কামড়াতে থাকে একমনে।

"হ্যালো।"

ভারী একটা পুরুষালি কণ্ঠ। কিন্তু না, এ তো জাওয়াদের কণ্ঠ না। জাওয়াদের কণ্ঠ সে চিনে, খুব ভালো করেই চিনে। ইশ, এই ভুলটা কীভাবে করলো সে? ওটা তো জাওয়াদের বাড়ি, ওখানে তো শুধু জাওয়াদ একা থাকে না। তার বাড়ির লোকরাও থাকে। তারাও তো তুলতে পারে ফোনটা, কীভাবে ভুলে গেলো সে?

কথা না বলে ফোন রেখে দেওয়াটা অভদ্রতা। এটা রূপা কখনোই করেনা, আজও করবে না। ক্ষীণ গলায় রূপা সালাম দেয়।

ওপাশ থেকে সালামের উত্তর আসে।

"মোরশেদ আলম স্পিকিং, হু ইজ দেয়ার?"

রূপা ঢোক চেপে বললো,"ডাক্তার সাহেব আছেন? ইয়ে মানে ডাক্তার জাওয়াদ বিন আলম?"

মোরশেদের বেশ ভালো লাগে সহসাই। 'ডাক্তার সাহেব' সম্বোধনটা বেশ ভালোই লাগছে। ছেলের জন্য কিছুটা গর্বও হচ্ছে তার, হয়তো জীবনের প্রথমবারের মতো।

"আছে, ডেকে দিচ্ছি।"

রূপা দুশ্চিন্তায় কাঁপছিলো। উনি তো সম্ভবত জাওয়াদের বাবা। যদি একবার জিজ্ঞাসা করতো রূপার পরিচয়। ইশ কি না জানি ভাবতো।

রূপার শ্বাস পড়ে দ্রুত। এক্ষুনি হয়তো সেই কাঙ্ক্ষিত কণ্ঠস্বর শুনতে পাবে সে। এরপর কি হবে? কীভাবে সামলাবে সে নিজেকে?

খাটের উপর মিহাদের খেলনার স্তুপ। সেখানে বসেই খেলছে মিহাদ। তার পাশে হাতে মাথা ঠেকিয়ে আধশোয়া হয়ে বসে জাওয়াদ। আনমনে মিহাদকে দেখছে। মিহাদ মাঝে মাঝে দাঁত বের করে মামার দিকে তাকিয়ে হাসছে। জাওয়াদও মুচকি হাসছে তখন তার দিকে তাকিয়ে।

"জাওয়াদ।"

দরজায় বাবাকে দেখে জাওয়াদ উঠে বসে।

"তোমার ফোন এসেছে। যেয়ে কথা বলো।"

জাওয়াদ ভ্রু কুঁচকে তাকায় বাবার দিকে।

"আমার ফোন? কে করেছে?"

"আমি পরিচয় জানতে চাইনি। নিজের ফোন নিজেই দেখো।"

এই বলে মোরশেদ চলে যায়। বেশ বিস্মিত হয় জাওয়াদ। ছাত্রজীবনে কখনো এমন হয়নি। কোনো বন্ধু যদি ভুলক্রমে ফোন দিতো আর মোরশেদ তা ধরতো তাহলে হাজারটা প্রশ্ন করতো তাকে। মাঝে মাঝে তো জাওয়াদকে সেই ফোন দেওয়াও হতো না। জাওয়াদ ছোট্ট একটা হাসি দিয়ে খাট থেকে নামে। কিন্তু কে ফোন দিলো? আবু ভাই নাকি?

"হ্যালো...."

ব্যস! রূপার শরীর জমে যায়। আশ্চর্য! যে ছিলো তার খুব কাছের, চাইলেই যার কণ্ঠ শোনা যেতো। তার কথা একবার শোনার জন্যই এমন হাপিত্যেশ করে বসে আছে সে? এমন অস্থির লাগছে কেনো?

রূপা উত্তর দেয়না। কিন্তু সে তো চেয়েছিলো একটাবার শুনেই ফোন রেখে দিবে। তবুও অবাধ্য মন কেনো আজ এতো উতলা? ফোন তো সে রাখতে পারছে না।

"হ্যালো, কে?"

রূপার ভারী শ্বাস চলে। জাওয়াদ কিছুটা সন্দিহান মুখে তাকায় রিসিভারের দিকে।

"বলবেন তো কে?"

রূপা দুইবার নাক টানে। ইতোমধ্যে চোখে পানি এসেছে তার, নিজের অজান্তেই। জাওয়াদ সোজা হয়ে বসে। শান্ত ভাবে পা নাড়াতে থাকে।

ওপাশটা এখনো চুপচাপ। শুধু দ্রুত পড়া শ্বাসের শব্দ আর বার কয়েক নাক টানার শব্দ। এ বাদে আর কোনো সাড়া নেই।

জাওয়াদ একটা ছোট্ট শ্বাস ফেলে বললো,"আমি তো চাইনি আপনি কখনো কান্না করুন রূপা।"

রূপা ঈষৎ কেঁপে ওঠে। ধরা পড়ে যাওয়ায় অনুশোচনা হচ্ছে না মোটেই। কিন্তু অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে।

"আমি সবসময় আপনার মুখে হাসি দেখতে চেয়েছি। আপনার কান্না আমার কাছে তীব্র যন্ত্রণা স্বরূপ। আমার মনে হয় আপনি তা জানেন। জেনেও শুধু কাঁদার জন্যই ফোন দিয়েছেন? আমাকে ঠিক আর কতোটা যন্ত্রণা দিলে আপনি খুশি হবেন বলুন তো?"

রূপা এবারও উত্তর দেয়না। জাওয়াদ ম্লান হাসে।

"কাঁদছো কেনো রূপা? আমি ভালো আছি তো।"

রূপা লাজুক মুখে রিসিভারটা কান থেকে সরিয়ে মুখে হাত চেপে চোখ বন্ধ করে ফেলে। প্রথমবারের মতো জাওয়াদ তাকে 'তুমি' সম্বোধন করলো। সামান্য একটা কথা। তবুও কি যে প্রেম মিশে আছে কথাটায়। ফোনটা না দিলেই হতো। এবার তো তার অপেক্ষা আরো কষ্টকর হয়ে যাবে। রূপা তাড়াতাড়ি করে আবার রিসিভার কানে চাপে।

"তুমি ভাবছো আমি তোমার প্রতি প্রতিশোধ নিচ্ছি। তুমি যা যা করেছো তাই ফিরিয়ে দিচ্ছি তোমাকে। কিন্তু না রূপা। তোমার বোকা ডাক্তার প্রতিশোধ নিতে জানেনা। কারণ সে প্রেমে পড়েছে। আর একজন প্রেমিক কখনো তার প্রেয়সীর প্রতি প্রতিশোধপরায়ণ হয়না।"

রূপার চিত্তে আগুন লাগে। আর চুপ করে থাকতে পারে না। নীরবতা ভেঙে মুখ খোলে এখনকার মতো প্রথমবার।

"তবে চলে গেলেন কেনো এভাবে? কাউকে কিচ্ছু না বলে এভাবে চলে যাওয়ার মধ্যে কি মাহাত্ম্য আছে জাওয়াদ?"

এতোদিন পর সেই দীঘির মতো শান্ত কণ্ঠ। জাওয়াদের উত্তপ্ত বুকে বরফ শীতল পরশ জাগে।

"আমি মহৎ নই রূপা। আমি খুব সাধারণ একজন মানুষ। যে ভালোও বেসেছে সাধারণ ভাবে। অথচ দেখো অদৃষ্ট কি অদ্ভুত! আমার প্রথম প্রেম, প্রথম ভালোবাসার চোখে আমি একজন স্রেফ কাপুরুষ ব্যতীত আর কিছু না।"

"জাওয়াদ...."

"মিথ্যা বললাম কি কিছু, হু?"

রূপা দাঁতে দাঁত চেপে বললো,"আমাকে কিছু বলার সুযোগটা তো দিবেন।"

"আমি তো বরাবরই শুনতে চেয়েছিলাম। তুমি দূরে ঠেলে দিয়েছো।"

"আমি ভয় পেয়েছিলাম জাওয়াদ।"

জাওয়াদ ভারী গলায় বললো,"কিসের ভয়?"

"জানিনা আমি। কিচ্ছু জানিনা।"

জাওয়াদ রিসিভারটা আরেকটু ঠোঁটের কাছে এগিয়ে এনে চাপা গলায় বললো,"তাহলে কি জানো?"

রূপা কান্নাজড়িত গলায় বললো,"জানি যে আপনি ছাড়া আমি অসহায়। ফিরে আসুন, শুধু একটা বার ফিরে আসুন।"

"আচ্ছা? তাই?"

"হু তাই।"

"সরাসরি প্রেম নিবেদন?"

রূপা ধাতস্থ হয়। লজ্জায় গালে আবির জমে তার। ইশ! আবেগে পড়ে এতোক্ষণ কি বললো সে? ভাগ্যিস কেউ সামনে নেই। থাকলে কি বলতো? এই বয়সে এসে আদিখ্যেতা করছে? প্রেম মানেই কি তবে একটুখানি আদিখ্যেতা আর অনেক অনেক অনুভূতি।

জাওয়াদ তখন টেলিফোন সহ উঠিয়ে বড় জানালাটার পাশে দাঁড়ায়। তার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি। একটু খানি দুষ্টুমিতে ভরা।

"চুপ করে আছো যে?"

রূপা গাঢ় গলায় বললো,"আমি এখন ফোন রাখবো।"

"উহু তাতো হবে না। ফোন দিয়েছো তুমি। কিন্তু রাখার অনুমতি দিবো আমি। এর আগে রাখা চলবে না।"

রূপা সোফায় হেলান দিয়ে লাজুক হেসে বললো,"ইশ ঢং না? এতোদিন একটা খোঁজ না নিয়ে এখন খুব অনুমতিওয়ালা হয়েছেন। যদি মরে যেতাম? জানতেও তো পারতেন না।"

জাওয়াদ মুখ দিয়ে গরম একটা ভাপ বের করে বললো,"আপনি কি ঠিক করেছেন আজীবন আমাকে এভাবেই যন্ত্রণা দিয়ে যাবেন? একটু সুখ পাওয়ার অধিকার কি আমার নেই?"

রূপা মুখ ভেংচি কেটে বললো,"আপনি দিচ্ছেন না আমাকে? আপনিও কি আজীবন আমাকে এভাবে যন্ত্রণা দিয়ে যাবেন? একটু সুখ পাওয়ার অধিকার কি আমার নেই?"

জাওয়াদ আচমকাই ভারী গলায় বললো,"অবশ্যই আছে। সুখ পেতে হলে তো কাছে আসতে হয়। আর একটু অপেক্ষা। সহ্য করতে পারছেন না?"

রূপা সাথে সাথে হতভম্ব হয়ে যায়। শরীর যেনো অবশ হয়ে যায় সাথে সাথে। কি বললো উনি এটা?

"হু?"

"আমি ফোন রাখবো।"

"মিস রূপা, জাওয়াদ বোকা হতে পারে তবে ভীতু নয়। মিসেস জাওয়াদকেও তাই সাহসী হতে হবে। এতো অল্পে ভয় পেলে চলবে না।"

রূপা মাথা নিচু করে কুটকুট করে হাসে। না দেখতে পেয়েও অপর প্রান্ত থেকে তার আবির জমা গালের হাসি অনুভব করে। সেই একই প্রথম দিনের মতোই অভিভূত হয়ে যায় সে আবার।

"তবে কি ডাক্তার সাহেবের রাগ পড়লো?"

"অপরিচিতা তো জানেই তার ডাক্তার সাহেবের রাগ ভাঙাতে। আমার আর সাধ্য কি রাগ ধরে রাখার?"

রূপা বেশ আগ্রহ নিয়েই জিজ্ঞাসা করলো,"ফিরবেন কবে?"

"খুব অস্থির লাগছে?"

রূপা আবারও থমকে যায়। অপরিচিতা তো রূপা নয়, বরং এই লোকটাই। ভদ্রতার ধারই ধারতেছে না। তাহলে এতোদিন কি সব অভিনয় ছিলো? কিন্তু সত্য বলতে রূপা নিজেও উপভোগ করছে আজকের বিকেলটা। এতো সুন্দর কেনো আজকের সবকিছু? মনে হচ্ছে বুঝি জীবনের সবচেয়ে সুন্দর কোনো স্বপ্ন দেখছে সে। ভয়ও করছে, যদি এটা স্বপ্ন হয়? ঘুম ভেঙে যদি দেখে এসব কিছুই হয়নি? তবে যে ভীষণ কষ্ট পাবে সে।

"আর কিছুদিন অপেক্ষা করো। রূপকথা ভিলার রাজকন্যাটিকে জাওয়াদের হৃদয় মহলের রানী করে আনবো। প্রতিজ্ঞা করলাম। আর হ্যা, জাওয়াদ কখনো প্রতিজ্ঞাভঙ্গ করে না। জাওয়াদ কাপুরুষ নয় রূপা।"

রূপা নিঃশব্দে অশ্রু বিসর্জন করে। অদ্ভুত স্বভাব হয়েছে আজকাল, কারণে অকারণে চোখ প্লাবিত হয়। অথচ বদমাশটার কাছে থেকে ধোঁকা খেয়েও সে শক্ত ছিলো, কাঁদেনি এভাবে কখনো।

সারা বিকেল কথা হলো ওদের দু'জনের৷ ওদের মধ্যকার অদৃশ্য প্রাচীর ভেঙে চূর্ণবিচূর্ণ হলো। হ্যা, ওরা প্রেম করলো। ওদের সত্যিকার অর্থের প্রেমের সূচনা হলো। জাওয়াদ কথা দিলো খুব তাড়াতাড়ি সে ফিরবে রূপার কাছে। রূপা দিন গুণতে বসলো। যেনো সে বিকেলে ওরা কল্পনাতেই হারিয়ে গেলো বৃষ্টিভেজা দিনে, এক নীপবনে। যেখানে গাছভর্তি কদম। রূপার হাতে শোভা পাচ্ছে ডজন খানেক কদম। আর জাওয়াদের হাতে শোভা পাচ্ছে রূপার কোমল হাত। কারণ রূপার প্রিয় ফুল কদম আর জাওয়াদের প্রিয় ফুল রূপা, রূপকথা জাহান রূপা।

রাতের খাবার তৈরি করছে হাফসা একমনে। সকালের পর থেকে জাওয়াদের সাথে তার কথা হয়নি৷ জাওয়াদ কারো সাথেই আর কথা বলেনি যদিও। শুধু বিকেলে অনেকক্ষণ যাবৎ টেলিফোন হাতে নিয়েই জানালার পাশে দাঁড়িয়ে কার সাথে যেনো অনেক কথা বললো। ওরা কেউ ওকে আর বিরক্ত করেনি।

আচমকাই পিছন থেকে নিজের চুলের মধ্যে কারো নাক ডুবাতে দেখে কিছুটা চমকে ওঠে হাফসা। পরক্ষণেই মুচকি হাসে। এই কাজ জাওয়াদের। ছোট থেকেই ওর মন খুব ভালো হলে ও এই কাজটা করে। পিছন থেকে মায়ের কাঁধ জড়িয়ে মায়ের চুলে নাক ডুবিয়ে দেওয়া। কত্তগুলো দিন পর আবার। প্রশান্তি ভর করে হাফসার মনে। তার মানে ছেলের মন ভালো?

"মা, ও মা।"

হাফসা কপট রাগ করে বললো,"বলে ফেলো।"

"এদিকে তাকাও না।"

"কাজ আছে তো। দেখছো না রাতের খাবার বানাচ্ছি। কতো রাত হয়ে গেলো। বাবাকে ঠিক সময় খেতে দিতে হবে, তার ওষুধ আছে...."

জাওয়াদ মা'কে কথা শেষ করতে দেয়না। মা'কে জোর করে নিজের দিকে ফিরিয়ে মাথা নিচু করে মায়ের বুকে মাথা রাখে। হাফসা পরম যত্নে হাত বুলিয়ে দেয় ছেলের মাথায়।

"মা তুমি কি জানো তুমি পৃথিবীর সেরা মা?"

হাফসা ভ্রু নাচিয়ে বললো,"তা এই কথাটা কি বিকেলে যার সাথে ঘন্টার পর ঘন্টা কথা হলো সে বলে দিলো?"

জাওয়াদ মাথা তোলে। অসহায় মুখে তাকায় মায়ের দিকে। ইশ! মায়েদের কি সিক্স সেন্স আছে? কীভাবে সব বুঝে যায়? আশ্চর্য।

এমন তাগড়া ছেলেটার লজ্জায় রাঙা মুখটা দেখে পুলকিত হয় হাফসা। ছেলের চুল এলোমেলো করে দেয় বাম হাত দিয়ে। এমন ভাবে ধরা খেলে কথা মুখেই আটকে যায়।

"মা এমন কিছুই না। তুমি যা ভাবছো....."

দুলু কখন এসে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলো কে জানে। জাওয়াদের পিঠে কনুই ঠেকিয়ে মায়ের দিকে তাকায়।

"মা তুমি যা ভাবছো তা নয় ভুল। তাহলে আসলটা তোমার ছেলেকে বলতে বলো।"

জাওয়াদ ঘোঁৎ করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললো,"তুমিও চলে এসেছো। নাও ষোলো কলা পূর্ণ হলো।"

দুলু জাওয়াদের পিঠে দুম করে একটা কিল বসিয়ে দেয়। জাওয়াদ বিরস মুখে পিঠে হাত বুলায়।

"আরেকবার কিছু বলবি তো মেরে ভর্তা বানাবো। নিজে ঝামেলা পাকিয়ে এসেছিস। এদিকে আমরা দুশ্চিন্তায় শেষ। কি হলো আমার সরল সোজা ভাইটার। ভাজা মাছটা উলটে খেতে জানেনা যে। ওমা! শুধু ভাজা মাছ উলটে খেতে জানা? এ যে কাঁটা সুদ্ধ মাছ গিলে খাওয়া ছেলে।"

"আপা বেশি বেশি করছো। তুমি যে বিয়ের আগে ফরহাদ ভাইকে ক'টা প্রেমপত্র লিখেছো সে সব কিন্তু আমার জানা আছে। দিবো ফাঁস করে?"

দুলু দুই হাতে জাওয়াদের মুখে শক্ত করে চেপে ধরে। হাফসা হাসতে হাসতে নিজের কাজে মন দেয়।

রান্নাঘরের দরজায় উঁকি দেয় মোরশেদ। ধরা দেয়না। কারণ ধরা দিলেই ওদের হাসি থেমে যাবে। দুই ছেলেমেয়ে দুই দিকে চলে যাবে। অবশ্য মোরশেদ তো আজীবন এমনই থেকেছে। বাবাকে যমের মতো ভয় পেতো যেনো দুই ভাইবোন। জাওয়াদ একটু বেশি।

দুই ছেলেমেয়ের প্রাণ খোলা হাসি দেখে মোরশেদ। কি যে ভালো লাগে তার। মনে হয় আকাশ থেকে দু'টো জ্বলজ্বলে তারা টুপ করে তার ঘরে এসে ঢুকেছে। সে হয়তো জানে না তার ছেলেমেয়ে দু'টোও এখন চাচ্ছে তাদের হাসিঠাট্টায় তাদের বাবা এসে উপস্থিত হোক। সব ভুলে যেয়ে চারজনের পরিবারটা কারণে অকারণেই হেসে লুটোপুটি খাক। ছোট্ট একটা জীবন, যাক না এভাবেই, ক্ষতি কি?

(চলবে.....)

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন