(১৫)
মাঝখানে কেটেছে একদিন। সকাল আটটা বাজে। আজ ভার্সিটিতে নবীনবরন অনুষ্ঠান। সোনিয়া, রিমা আর তিশা সাজুগুজু নিয়ে ব্যস্ত। তারা আজ শাড়ী পড়বে। এদিকে সুখ বসে আছে নিরামিষ হয়ে। তার কোনোদিকেই হেলদোল নেই। রেডি হচ্ছি তো হচ্ছি। এই এখান থেকে বসে ওখানে যাচ্ছে। আবার ওখান থেকে বসে এখানে আসছে। মুল কথা সে আজকে যেতেই চাইছে না ভার্সিটিতে। কিন্তু তার বান্ধবীরা নাছোড়বান্দা। সুখের যেতে তো হবেই তাও শাড়ী পড়ে। মেয়েটা পড়েছে আচ্ছা গ্যাঁড়াকলে। সুখ নিজের রুমে বসে আছে নিরলস ভঙ্গিতে। এমন সময় সোনিয়া এলো। সে আকাশী রংয়ের একটা শাড়ী পড়েছে। তার হাতে কালো রংয়ের শাড়ী। সোনিয়া এসেই সুখকে টেনে বিছানা থেকে ওঠালো। পেটিকোট আর ব্লাউজ হাতে দিয়ে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে গেল ওয়াশরুমের সামনে। সুখ তখনও ঘার ত্যাড়ামি করছে। সে যাবে না মানে যাবে না। কিন্তু সোনিয়ার শক্তির সাথে সে পেরে উঠলো না। এমনিতেই সে একা সোনিয়ার সাথে পারছে না তারমধ্যেই আবার হাজির হলো রিমা আর তিশা। ওরা দুজনও সোনিয়ার সাথে একজোট হয়ে সুখকে ঠেলে ওয়াশরুমে পাঠালো। সুখ বেচারি হেরে গিয়ে গেল ওয়াশরুমে।
সেই বছর তিনেক আগে পড়েছিলো শাড়ী। তারপর আর পড়া হয়নি। সমস্যা মুলত এখানে না। সমস্যা হলো ভার্সিটিতে ঋত্বিক আছে। সেবার শাড়ী নিয়ে যে কান্ড হয়েছিলো তাতে সুখের তো শাড়ী পড়ে ঋত্বিকের সামনে যেতেই অস্বস্তি হবে। এখন কি আর করার? বান্ধবীদের কথা রাখতে তাকে শাড়ী পড়তে হবে। সুখ ওয়াশরুম থেকে পেটিকোট আর ব্লাউজ পড়ে বের হলো। সাথে সাথেই ওরা তিনজন সুখকে শাড়ী পড়ানোর কাজে লেগে পড়লো। অনেকক্ষণ সময় নিয়ে, একদম নিখুঁতভাবে সুখকে শাড়ী পড়ালো ওরা। হালকা সাজিয়ে ও দিলো। এমনিতেই মেয়েটাকে দারুন লাগে দেখতে। কোন কৃত্রিম প্রসাধনীর দরকার পড়ে না। তবুও যুগের সাথে অথবা শাড়ীর সাথে তাল মিলিয়ে ওরা সুখকে সাজিয়ে দিলো। সোনিয়া ও হালকা পাতলা মেকাপ করেছে। কিন্তু সেজেছে রিমা আর তিশা। ওরা দুজনও যথেষ্ট সুন্দরী। আর সাজুগুজু করে বেশ সুন্দর লাগছে। সোনিয়ারা সবাই চুল বাঁধলেও সুখ চুল বাঁধলো না। লম্বা কোমড় সমান চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে শুধুমাত্র বেলীফুলের একটা গাজরা পরলো। সুখের সাজা শেষ হলে, সোনিয়া ওর সামনে এসে চোখের কোন থেকে কাজল নিয়ে ফোঁটা দিয়ে বলল,
"মাশাল্লাহ। কারো নজর না লাগুক।"
-------
ভার্সিটিতে পৌঁছাতেই সুখের অস্বস্তির মাত্রা বেড়ে যায়। এই দুই বছরে ঘরকুনো থেকেছে সে। বাইরে তো তেমন বেরই হয়নি। আর আজ নাকি ভার্সিটির প্রোগ্রামে সে শাড়ী পড়ে এসেছে। ভাবা যায়?! সুখেরা স্টেজের কাছে পোঁছাতেই কে কোথায় বসবে, এ নিয়ে বাঁধলো বিপত্তি। সুখ বসবে পিছনে। আর তিশা বসবে সামনে। এই নিয়ে দুজন কিছুক্ষণ ঝামেলা করলো৷ শেষে সিদ্ধান্ত হলো, সুখকে নিয়ে সোনিয়া বসবে পিছনের দিকে। আর তিশাকে নিয়ে রিমা বসবে সামনে। ওরা আলাদা হয়ে গেল। চারজন দুইদিকে ফিরে হাঁটা ধরলো। অনুষ্ঠান তখনও শুরু হয়নি। সোনিয়া আর সুখ হাঁটছে। হঠাৎ সোনিয়ার চোখ গেল, কিছুটা দুরে কৃষ্ণচুড়া গাছের নিচে বসা একজন শ্যামবর্ণের যুবকের দিকে। সিগারেট ফুঁকছে সে৷ সোনিয়ার বুকের মাঝে হুট করেই ধুপধাপ শব্দ হতে শুরু করলো। সে দ্রুত চোখ সরিয়ে নিলো। কিন্তু শেষ রক্ষা আর হলো না। শৈল দেখে ফেললো সোনিয়া কে। সাথে সাথেই চকিতে উঠলো সে। চমকে গেল খানিকটা। হয়তো সোনিয়াকে এখানে আশা করেনি ও। সামনেই ওর কিছু বন্ধুরা বসা। সেখানের একজনের নাম আশিক। আশিক শৈল কে বলল,
"মামা ক্রাশ তো খেয়েছি। যাকে বলে লাভ এ্যাট ফার্স্ট সাইড। "
শৈল তড়িঘড়ি করে বলল,
"যাই বলিস আর তাই বলিস নীল শাড়ী কিন্তু আমার।"
আশিক খানিকটা হেঁসে বলল,
"উহুম ও না৷ পাশেরটা। মানে কালো শাড়ী।"
-----
সুখরা একদম পিছে গিয়ে বসেছে। দুজনে গল্প করছে। সামনের দিকে খেয়ালই নেই ওদের। অনুষ্ঠান ইতিমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। ঋত্বিক স্টেজে টিচার্সদের আসনে বসে আছে৷ কিন্তু তার এলোমেলো দৃষ্টি সামনের দিকে। কাউকে দেখার তৃষ্ণা বুকে। এমনিতেই গতকালকে একটুও কথা হয়নি তার সাথে। আর যদি দেখা না হয় ঋত্বিক হয়তো হার্টফেল করবে। হঠাৎ তার চোখ গেল পিছনের সারিতে বসে থাকা সুখের দিকে।
ঋত্বিক প্রথম দফায় হকচকিয়ে উঠলেও মুহুর্তেই থমকে গেল সে। তার হার্টবিট মিস দিলো বোধহয়। কালো শাড়ী? এতো সুন্দর? আমি কি সত্যি দেখছি? নিজ মনে এসব ভাবলো ঋত্বিক। তার কি করা উচিৎ এখন সে বুঝতে পারছে না। তার ইচ্ছে তো করছে, এখনই গিয়ে সুখকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিতে। কিন্তু তার আর সম্ভব হলো না। নিজ মনের ইচ্ছে মনের মাঝেই কবর দিতে হলো ঋত্বিকের।
সুখ কথা বলতে বলতে হুট করে তাকালো স্টেজে। অমনি চোখাচোখি হলো দু'জনের৷ সুখ দ্রুত চোখ সরিয়ে নিলো। কিন্তু ঋত্বিক একাধারে চেয়েই থাকলো। হঠাৎ তার কপাল কুঁচকে গেল। সুখের কাছে কয়েকটি মেয়ে এসেছে। ঋত্বিক মনে মনে বলল,
"এরা এসেছে কেন? কি চাই আমার বউটার কাছ থেকে?"
কয়েকটি মেয়ে সুখের কাছে এসে দাঁড়ালো। তাদের হাতে একটি গোলাপ, কয়েকটি চকলেট,ও একখানা চিঠি।
"আপু একটু কথা বলা যাবে?"
সুখ তখন আনমনে ছিলো । ও খেয়াল করেনি মেয়ে গুলোকে।
"জ্বি বলুন।"
মেয়েটা হাত দিয়ে দুরে কৃষ্ণচূড়া গাছের নিচে বসা আশিককে দেখিয়ে বলল,
"ওই যে দেখছো না কালো টিশার্ট? উনি তোমাদের সিনিয়র। এইগুলো তোমাকে দিয়েছে।"
সুখ কপাল কুঁচকে বলল,
"আমাকে দিয়েছে কেন?"
ঋত্বিক ওদের দিকেই তাকানো ছিলো। মেয়েগুলোর ইশারা অনুসারে সেও তাকালো মাঠের দিকে। সে এক কর্নারে বসা ছিলো তাই দেখতে পেল আশিক নামক ছেলেটাকে। মেয়েটার হাতে থাকা চকলেট ও নজর এড়ালো না ঋত্বিকের। যা বোঝার সে বুঝে নিলো। মুহুর্তেই চোয়াল ঝুলে এলো তার। রাগে মাথা গরম হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এখান থেকে ওঠা ও যাবে না। সে দাঁতে দাঁত চেপে, তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল সুখের দিকে। চোখ দিয়েই গিলে খাবে আজ সুখকে।
চলবে?
গল্প : #তুমি_ছিলে_আমারই
®️ #অহনা_রহমান