(১৬)
ঋত্বিক আর সুখ দাঁড়িয়ে আছে মুখোমুখি। ঋত্বিকের চোখমুখ শক্ত। বেটা খেঁপেছে খুব! অথচ সুখ দাঁড়িয়ে আছে একদম শান্ত হয়ে। নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে। অনেকক্ষণ ধরে শুধু নীরাবতায় চলছে দুজনের মাঝে। একটা সময় সুখ বিরক্ত হয়ে বলল,
"আমার ফ্রেন্ডরা স্টেজের কাছে বসে আছে। আমাকে যেতে হবে। কিছু বলার থাকলে বলুন।"
ঋত্বিক তখনও একদৃষ্টিতে কপাল কুঁচকে তাকিয়ে আছে। কিছুই বললো না সুখের কথার উত্তরে। এতে বিরক্ত হলো সুখ। এখানে এসেছে মিনিমাম দশ মিনিট। ঋত্বিকই ওকে ব্লাকমেইল করে এখানে আসতে বাধ্য করেছে। সে কি সুন্দর সোনিয়ার পাশে বসে অনুষ্ঠান উপভোগ করছিলো। কিন্তু একেক পর এক ম্যাসেজ দিয়ে সুখকে অতিষ্ঠ করে দিয়েছে ঋত্বিক। তার একটাই কথা,
" তিন নম্বর বিল্ডিংয়ের পাঁচ তলায় এসো। নাহলে আমি এসে সকলের সামনে থেকে নিয়ে আসবো।"
ঋত্বিককে দিয়ে বিশ্বাস নেই৷ সে যখন তখন যা কিছু করতে পারে। এজন্য সুখ ঋত্বিকের কথা শুনলো। ওর কথা মতো ওর বলা জায়গা তে গেল। আর যখন থেকে সুখ এখানে এসেছে তখন থেকেই চুপচাপ সুখকে দেখে যাচ্ছে।
"কিছু বলবেন? আমাকে এখানে ডেকেছেন কেন?"
সুখের কথা শুনে ঋত্বিক এবার নড়েচড়ে দাঁড়ালো। মাথাটা দুইদিকে নাড়িয়ে ঘাড় ফুটিয়ে নিলো, সিনেমার নায়কদের মতো। হুহ নায়ক নাকি? আস্ত একটা ভিলেন। মনে মনে বিরবিরালো সুখ। ঋত্বিক মাথার চুল গুলো দুহাত দিয়ে ঠিক করে নিয়ে বলল,
"ওই মেয়েগুলো কি বলছিলো তোমাকে?"
"সেকথা আপনাকে বলবো কেন?"
ঋত্বিক কিছু একটা ভেবে বলল,
"কারন আমি তোমার টিচার তাই। ওই মেয়েগুলো ভালো না। ওদের নামে ভার্সিটিতে নানারকম কথা শোনা যায়। এইজন্য আমার জানা প্রয়োজন ওরা তোমাকে কি বলছিলো।"
যেহেতু সুখ নতুন ভার্সিটিতে এসেছে তাই ওই মেয়েগুলোকে চিনে না সে। আর ঠিক এই কারনেই ঋত্বিকের বলা মিথ্যা কথা বিশ্বাস করে নিলো। সে বলল,
"ওরা একজনের প্রপোজাল নিয়ে এসেছিলো। কে যেন আমাকে পছন্দ করে তাই।"
ঋত্বিকের চোয়াল শক্ত হলো। সে যা ভেবেছিলো সেটাই ঠিক।
"তুমি কি বললে?"
সুখ সরল মনে বলল,
"আমার ফ্রেন্ড সোনিয়া ছিলো ওখানে। সোনিয়া মেয়েটার হাত থেকে চকলেট, চিঠি নিয়ে বলেছে, আমি ভেবে দেখবো।"
"তো এতে তোমার অভিমত কি?"
সুখের মাথায় চট করে একটা বুদ্ধি এলো এখন। সে এতক্ষণে এটুকু বুঝেছে যে, ঋত্বিক জেলাস। সে মনে মনে একটা ফন্দি এঁটে নিলো ঋত্বিককে জব্দ করার। সুখ বলল,
"আমার ফ্রেন্ড যেহেতু বলেছে ভেবে দেখবো, তার মানে আমি ভেবে দেখবো। যদি মনে হয় এক্সেপ্ট করা যায়, ছেলেটা ভালো, বউকে সম্মান করবে। বিয়ের পরও এক্স গার্লফ্রেন্ডের জন্য বউকে কষ্ট দেবে না তাহলে ভাবছি এক্সেপ্ট করে নিবো।"
ঋত্বিক রাগের খেই হারালো। আচমকা সে এক টানে সুখকে নিজের কাছে টেনে নিলো। এরপর ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে গেল দেয়ালের কাছে। সুখের পিঠ তখন দেয়ালে ঠেকে আছে। আর ঋত্বিক ওর একদম কাছে। ঋত্বিকের থেকে সুখ বেশ কিছুটা খাটো। একারনে ঋত্বিক একহাত দেয়ালে বেঁধে কিছুটা নিচু হলো। সুখের মুখের সামনে মুখ এনে বলল,
"রিয়েলি?"
সুখের তখন মরিমরি অবস্থা। এই অবস্থায় আর ১০ সেকেন্ড থাকলে সে ইহলোক ত্যাগ করবে। সুখে জোরে একটা ধাক্কা মারলো ঋত্বিক কে। সুখের সর্বশক্তি ব্যবহারে ধাক্কা এক চুল পরিমান সরাতে পারলো না ঋত্বিক কে। ওদিকে ঋত্বিকের তপ্ত শ্বাস তখণ সুখের মুখে লাগছে। এতে সুখের অস্বস্তির মাত্রা আরও বাড়লো। সে কোনমতে বলল,
"আমার কাছথেকে দুরে সরুন।"
"আচ্ছা সরবো। তার আগে বলো তুমি সত্যি এক্সেপ্ট করবে?"
সুখ ঋত্বিকের কথার জবাব না দিয়ে তেজ দেখিয়ে বলল,
"আপনি সরবেন নাকি আমি চিৎকার করবো?"
"করো? আমার বউয়ের কাছে আমি এসেছি। চিৎকার করো। দেখি কে কি বলে।"
সুখের রাগের মাত্রা তিরতির করে বেড়ে গেল। সে মৃদু চিৎকার করে বলল,
"যেই বিয়েকে বিয়ে মানেন না, যেই মেয়েকে বউ মানেন না সে আপনার বউ কিভাবে হয়? শুনুন মিস্টার ঋত্বিক কিয়ান, দুই বছর আগে ডিভোর্স না দিয়ে আমি বড় একটা ভুল করেছি। আশা করছি আপনি এমন কিছু করবেন না যাতে ফের আমার সেই ভুল শুধরাতে হয়।"
সুখের কথা কর্নকুহরে পৌঁছানো মাত্র ঋত্বিকের হাতের বাঁধন ঢিলা হলো। সে পিছিয়ে গেল কিছুটা। সে অবিশ্বাস্য চাহনিতে তাকালো সুখের দিকে। কেমন একটা কাতর কন্ঠে বলল,
"কি বললে?"
সুখ নির্দয় হলো। আজ তার দিন এসেছে আগের সবকিছুর বদলা নেওয়ার। সে বলল,
"বলেছি দুই বছর আগে আমি ছোট ছিলাম। তাই একটা ভুল করে ফেলেছিলাম। সেটা হলো আপনাকে ডিভোর্স না দেওয়া। আপনি এমন কিছু করবেন না যাতে আমাকে সেই ভুল শুধরে নিতে হয়। না না! আপনার যা খুশি করার আপনি করে নিন। আমি আমার ভুল গিলো শুধরে নেবো। খুব শীঘ্রই ডিভোর্স লেটার পেয়ে যাবেন।"
ঋত্বিকের মাথা ঘুরছে যেন। সে যাকে ভালোবাসে সেই সুখ আর এই সুখ এক নয়। কিছুতেই হতে পারে না। সেদিন ফোনে করা ব্যবহার আর এই ব্যবহার একদম একই। এটা কিছুতেই সুখ হতে পারে না। ঋত্বিক ফের বলল,
"সুখ কি বলছো এসব? তোমার মাথা ঠিক আছে তো?"
"আমার মাথা ঠিক আছে মিস্টার। আমাকে নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না। আর আপনি যে আমাকে ভয় দেখাচ্ছেন না ভার্সিটিতে সকলকে বলে দেবেন আপনি আমার কি হন? বলুন আপনি। সবাইকে বলুন। আমি ডিভোর্স পাঠিয়ে দেবো। এরপর সবাইকে আমার সত্য বলার সাথে সাথে এটাও বলিয়েন যে, আপনার সাথে আমার ডিভোর্স কেন হয়েছে?"
সুখের এমন ব্যবহার ঋত্বিকের মাথায় ঢুকছে না। মাথাটা পুরো গরম হয়ে গেছে। চোখদুটো লাল হয়ে আসছে। শরীর থেকে প্রতিনিয়ত ঘাম ঝড়ছে। ঋত্বিক নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু সে ব্যর্থ হচ্ছে। নিজেকে ঠিক রাখা সম্ভব হচ্ছে না তার পক্ষে। সুখ ঋত্বিকের অবস্থা দেখে ঘাবরে গেল। মনে মনে ভাবলো, সে গিয়ে একজন স্যার কে ডেকে আনবে। যেই ভাবা সেই কাজ। সুখ পরিত্যক্ত ক্লাসরুম থেকে বের হওয়ার জন্য পা বাড়ালো। কিন্তু এক পা ও সামনে এগোতে পারলো না। তার আগেই ঋত্বিক ওর হাত টেনে ধরলো। হ্যাঁচকা টানে মিশিয়ে নিলো বুকের সাথে। আকস্মিক ঘটনায় কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গেল সুখ। ও কিছু বলার আগেই শুনতে পেল ঋত্বিকের ভাঙা গলার স্বর,
"আমাকে একটা সুযোগ দেবে না সুখপাখি? আমি মানছি, আমি যা করেছি সেটা অন্যায়। তুমি আমাকে যা ইচ্ছে শাস্তি দাও। কিন্তু আমার হয়েই থাকো প্লিজ। আমি তোমাকে বড় ভালোবাসি সুখ। তোমাকে হারিয়ে বুঝেছি, সত্যি ভালোবাসা কাকে বলে। আমাকে একটা বার সুযোগ দাও।"
সুখের ভেতরে হুহু করে উঠলো। তার খুব কান্না পাচ্ছে। কিন্তু ঋত্বিকের সামনে কাঁদা যাবে না কিছুতেই। সে নিজেকে বহুকষ্টে ধাতস্থ করে বলল,
"আমাকে হারানোর পরে, যখন শুনলেন প্রিয়া আপনাকে ধোঁকা দিয়েছে, তখনই তো ভালো বাসলেন। তাই না? আপনার কি মনেহয় এটা কি আদৌও ভালোবাসা?"
"সুখ কি বলছো এসব? তুমি যখন ছিলে আমি তখনই তোমাকে ভালোবেসেছি। আজ বলছি আমি, শুধুমাত্র নিজের মিথ্যা দম্ভ আর অহংকারের জন্য নিজের অনুভূতি গুলোকে কখনো প্রশ্রয় দেইনি। যার জন্য ডিভোর্স দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু বিশ্বাস করো সুখ, আমি কখনোই আমাদের সম্পর্কের ইতি টানতাম না। কখনো না।"
সুখের আর সহ্য হচ্ছে না। এসব শুনে কি কেউ ঠিক থাকতে পারে? সুখে পারছে না। নিজের ভেতরে ঝড় বয়ে চলছে। কিন্তু সে সেসব পাত্তা দিতে চাইলো না। শক্ত কন্ঠে বলল,
"সেসব আমার কাছে নেহাৎই অতীত। আপনার কাছে আমার অনুরোধ, পুরোনো ক্ষত গুলো আবার তাজা করবেন না। ভুলে গেছি ভুলতে দিন।"
সুখ ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলো ঋত্বিক কে। সেখান আর না দাঁড়িয়ে সাথে সাথে প্রস্থান করলো সে। সে তো চলে গেল, পেছনে রেখে গেল একজন বিধ্বস্ত, স্তব্ধ, অনুতপ্ত হওয়া পুরুষকে। ঋত্বিক সুখের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে ফোঁস করে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। সেখানে আর এক মুহুর্ত ও না দাঁড়িয়ে ঋত্বিক ও চলে গেল বাড়ির উদ্দেশ্যে৷
অনুষ্ঠান এখনো শেষ হয়নি ভার্সিটিতে। এখন হবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। কিন্তু সুখের এসব সব অসহ্য লাগছে। সে সোনিয়ার কাছে ও আর গেল না। ঋত্বিকের কাছ থেকে এসে সোজা বেরিয়ে গেল ভার্সিটি থেকে। ঋত্বিকের অবস্থা ও তাই। আজমল স্যারকে এদিকটা সামলাতে বলে সেও ক্যাম্পাস ছাড়লো।
চলবে?
গল্প : #তুমি_ছিলে_আমারই
®️ #অহনা_রহমান