#এ_দেখা_শেষ_না_হোক #পর্ব - (১০)
#writer_sumaiya_akter_sathi
--
সকাল আটটা। মাহিরার ঘুম ভেঙ্গে যায়। মাহিরা পিটপিট করে চোখ মেলে তাকায়। চোখে এখনো তার ঘুমের রেশ কাটেনি। মাহিরা হাত বাড়িয়ে তার ফোন খুজঁতে থাকে। তখনই তার চোখ আটকে যায় তার হাতে। আয়ানের দেওয়া আংটি দুটো হাতে ঝলঝল করছে। সে তাকিয়ে দেখছে আংটি দুটো।
বাসায় আসার পর সবাই যখন আংটি দুটো দেখেছিলো তখন মুসকান খুশি হয়ে বলেছিলো আয়ান ভাই আমাকে আর মাহিরাকে কিনে দিয়েছে বিয়ে উপলক্ষে। তখন আর কেউ কিছু বলেনি। সবাই প্রসংশা করেছে আংটি দুটোর।
আংটি দুটো আসলেই অনেক সুন্দর। সবসময় হাতে পরে থাকার মতো। বেশি বড়োও না। আবার একদম ছোটোও না। মাহিরা খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে ভালো করে দেখে আংটি দুটো। আংটি দুটো মাহিরার বেশ পছন্দ হয়েছে। যদিও সে বলেছিলো ফিরিয়ে দিতে বাট আয়ান সেটা করেনি। উল্টো তাকে হাত কাটার হুমকি দিয়েছে।
মাহিরা মুচকি হেসে বিছানা থেকে ওঠে দাঁড়ায়। ফ্লোরে চোখ পরা মাত্রই মাহিরার পা থমকে যায়। মাহিরার হাসি মুখটা আতংকিত হয়ে ওঠে। চোখ বড় বড় হয়ে যায় মাহিরার। মাহিরা চমকে উঠে তার পুরো রুম দেখে।
মাহিরার পুরো রুম জুড়ে গোলাপের পাপড়ি ছড়ানো। ফ্লোরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে গোলাপের শত-শত পাপড়ি। মাহিরা হতবাক। মাহিরা এবার চোখ ঘুড়িয়ে বিছানায় তাকায়। দেখে সেখানেও গোলাপের পাপড়ি পরে আছে। মাহিরা আরো বেশি চমকে উঠে। ঘুমের ঘোরে মাহিরা এতোক্ষণ তা খেয়াল করেনি।
মাহিরা বেডের ওপাশে তাকালে দেখে তার কোলবালিশ নিচে পরে আছে। মাহিরা কিছুই বুঝে ওঠতে পারছে না। এতো ফুলের পাপড়ি তার রুমে কি করে আসলো? এতো এতো গোলাপের পাপড়িগুলো কে ছিটিয়েছে তার রুমে?
মাহিরা আর সময় নষ্ট না করে বেরিয়ে যায় তার রুম থেকে। গন্তব্য তার মুসকানের রুম। মাহিরা মুসকানকে রুমে না পেয়ে ছাদে এসেছে। মাহিরা জানে মুসকান সকালে ছাদে যায়। মাহিরা ছাদে এসে দেখলো মুসকান আরামছে বসে পায়ের উপর পা তুলে চা খাচ্ছে।
মাহিরা এসে মুসকানের পাশে বসে। মুসকান মাহিরাকে দেখে জিজ্ঞেস করে, আরে মাহিরা কখন উঠলে? চা খাবে? মুসকান মাহিরার দিকে একটা চায়ের ফ্লাক্স এগিয়ে দিয়ে বলে,এই নাও ফ্লাক্স ভর্তি চা আছে এখানে। খাও তুমি। মুসকান মাহিরার দিকে চায়ের ফ্লাক্স এগিয়ে দিলে মাহিরা বলে, আমি চা খাবো না মুসকান। আমার তোমার সাথে কিছু কথা আছে।
মুসকান চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলে, হ্যা বলো। কি কথা? মাহিরা কিছুটা উশখুশ করে বলে, আসলে মুসকান আমি যখন ঘুম থেকে ওঠি। তখন দেখি আমার পুরো রুমে জুরে গোলাপের পাপড়ি ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। আমি বুঝতে পারছি না এতো ফুলের পাপড়ি আমার রুমে কি করে আসলো? রাতে ঘুমোনোর সময়ও সব কিছু ঠিক ছিলো। কাউকে ভয়ে কিছু বলতেও পারতেছি না। তাই সবার আগে তোমার কাছে এসেছি।
মাহিরার কথা শুনে মুসকান ফিক করে হেসে দেয়। মাহিরা অসহায় চোখে তাকিয়ে থাকে মুসকানের দিকে। মুসকান হাসতে হাসতে বলে, তুমি কি কোনো সপ্ন টপ্ন দেখছো মাহিরা? তোমার রুমে গোলাপের পাপড়ি কি করে আসবে? মুসকান এবার ছাদের গোলাপ ফুলের গাছগুলোর দিকে ইশারা করে বলে, ঐ যে দেখো মাহিরা আমাদের ছাদেও কি সুন্দর গোলাপ ফুল ফুটে আছে। কিন্তু সেখান থেকে তো কোনো পাপড়ি মিসিং হয়নি। মাহিরা তাকায় গোলাপ গাছগুলোর দিকে। পরপর মুসকানের দিকে তাকিয়ে অসহায় গলায় বলে, আমি সত্যি বলছি মুসকান। বিশ্বাস করো আমার রুমে অনেক গুলো গোলাপের পাপড়ি পরে আছে।
মুসকান হেসে বলে, তাহলে হয়তো রাতে জ্বিন পরি এসে তোমার রুমে ফুলের পাপড়ি গুলো দিয়ে গিয়েছে। কি তাই তো ? মাহিরা বলে ওঠে, তুমি মজা করো না মুসকান। আমার সাথে এক্ষনি চলো তুমি। আমি তোমাকে দেখাচ্ছি।
মুসকান চায়ের কাপ রেখে হেসে বলে, হ্যা চলো চলো। আমিও দেখে আসি তোমার রুমে জ্বিন পরি আর কি কি দিয়ে গিয়েছে। মাহিরা মুসকানকে সাথে নিয়ে ছাদ থেকে চলে যায়।
আয়ান তার রুমে বসে ল্যাপটপে কাজ করছে। এমন সময় তার দরজায় কেউ নক করে। আয়ান ল্যাপটপে চোখ রেখেই বলে, ভেতরে আসুন। রহিমা বেগম ভেতরে আসেন। আয়ান না তাকিয়ে রহিমা বেগম কে জিজ্ঞেস করে, সবকিছু ক্লিয়ার? রহিম বেগম হেসে বলেন, হ স্যার। সব ক্লিয়ার কইরা তারপর আইছি।
আয়ান ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে রহিমা বেগমের দিকে তাকিয়ে বলে, গুড। এই নিন আপনার বকসিস। আয়ান রহিমা বেগমের দিকে একটা খাম এগিয়ে দেয়। রহিমা বেগম হেসে আয়ানের থেকে খামটা নিয়ে নেন। আয়ান আবারো নিজের কাজে মনোযোগ দেয়।
রহিমা বেগম আয়ানেন দেওয়া খামটা খুলে দেখেন ভেতরে পঞ্চাশ হাজার টাকার একটা বান্ডিল। টাকা গুলো দেখে রহিমা বেগমের চোখে মুখে খুশিতে ভরে উঠে। সে সারা মাস মানুষের বাসায় কাজ করেও এ টাকা পান না। আর আয়ান তাকে আজ একদিনে সেই টাকা দিয়ে দিয়েছে? তাও আবার এতো সহজ একটা কাজ করে? রহিমা বেগম খুশি হয়ে বলেন, এমন কাম হইলে আমারে আবার ডাইকেন। বলেই রহিমা বেগম চলে যান আয়ানের রুম থেকে।
মাহিরা ছাদ থেকে নেমে মুসকানকে নিয়ে তার রুমের সামনে এসেছে। মাহিরা মুসকানের দিকে তাকিয়ে বলে, আমার কথা তো তুমি বিশ্বাস করলে না মুসকান। এখন নিজেই ভেতরে গিয়ে দেখো রুমের কি অবস্থা।
মুসকান হেসে বলে, ঠিক আছে আমি গিয়েই দেখছি। মুসকান দরজা ঠেলে মাহিরার রুমের ভেতরে যায়। মাহিরাও মুসকানের পিছু পিছু যায়। মুসকান পুরো রুমে চোখ বুলিয়ে হা হয়ে চেয়ে থাকে রুমের দিকে। পরপর মাহিরাকে বলে, ও মাই গট। মাহিরা এটা কি দেখলাম আমি? তোমাকে তো জ্বিন পরি রুম ভর্তি করে স্বর্ন গহনা সব দিয়ে গিয়েছে।
মাহিরা হা হয়ে চেয়ে আছে তার রুমের দিকে।
মুসকান আবারো বলে, আল্লাহ গো মাহিরা তুমি এতো স্বর্ন গহনা দিয়ে কি করবে? এখান থেকে আমাকেও কিছু দিও কেমন? মাহিরা নিশ্চুপ। সে তার মুখের ভাষা হারিয়ে ফেলেছে।
মাহিরা তার পুরো রুমে চোখ ঘুড়িয়ে দেখে একটা গোলাপের পাপড়িও নেই । পুরো রুম ঝকঝকে পরিষ্কার। পুরো রুমে চোখ বুলিয়ে মাহিরা ধপাশ করে বিছানায় বসে পরে। কি হলো এটা? ফুল গুলো কোথায়?সে বুঝতে পারছে না কিছুই। মাহিরা ভাবছে হঠাৎ করে এতোগুলো ফুলের পাপড়ি কোথা থেকে আসলো তার রুমে? আবার হঠাৎ করেই সেগুলো নাই হয়ে গেলো কিভাবে? মাহিরার মাথায় কিচ্ছু ধুকছে না।
মুসকান আবারো হেসে হেসে বলে, মাহিরা তোমার রুম তো স্বর্নের ফার্নিচার দিয়ে ভর্তি হয়ে আছে। এই যে দেখো তুমি স্বর্নের খাটে বসে আছো। মুসকানের মসকড়া শুনে মাহিরা অসহায় গলায় বলে, আমি সত্যি বলছি মুসকান। এই রুমে অনেক ফুল ছিলো। মুসকান এবার মাহিরার পাশে বসে হাসতে হাসতে বলে, তোমার কাছে হয়তো এই রুমের সবকিছু ফুল মনে হচ্ছে। যেমন আমার কাছে এই রুমের সব কিছু স্বর্ন মনে হচ্ছে। ঠিক বলেছি না মাহিরা?
মাহিরা মুসকানের দিকে তাকিয়ে অসহায় গলায় বলে, মজা করো না মুসকান। আমি কেনো শুধু শুধু তোমাকে মিথ্যা বলতে যাবো বলো? মুসকান এবার কিছু একটা ভেবে বলে, হতে পারে তুমি সত্যি বলছো। কিন্তু সেই ফুলগুলো এখন কোথায় বলো আমাকে? মাহিরা অসহায় গলায় বলে, আমি জানিনা মুসকান।
মুসকান বলল, তুমি হয়তো রাতে কোনো সপ্ন দেখেছ মাহিরা। আর সকালে তোমার কাছে সেটা বাস্তব মনে হচ্ছে। টেনশন করো না। আমারও মাঝেমধ্যে এমন টা হয়। মাহিরা মুসকানকে আর কিছু বললো না। মাহিরাকে চুপ থাকতে দেখে মুসকান বলে, তুমি রেস্ট নাও মাহিরা। সব ঠিক হয়ে যাবে। টেনশন নিয়ো না। বলে মুসকান মাহিরার রুম থেকে চলে যায়।
মাহিরা এবার আরো বেশি টেনশনে পরে যায়। বুঝতে পারছে না কি করে ফুল গুলো গায়েব হয়ে গেলো? মাহিরা চোখ ঘুড়িয়ে বিছানায় তাকায়। হঠাৎই মাহিরা ভ্রু কুচকায়। বিছানা একদম পরিপাটি করে ঘোছানো। কিন্তু সে তো বিছানা ঘোছায়নি। অগোছালো রেখে চলে গিয়েছিলো। তাহলে কে ঘোছালো তার বিছানা?
মাহিরা কিছু না ভেবে বালিশগুলো উল্টে পাল্টে দেখা শুরু করে। মাহিরা তার মাথার বালিশটা সরাতেই হটাৎ একটা গোলাপের পাপড়ি দেখতে পায়। মাহিরা সেটা হাতে তুলে নেয়। সে বুঝতে পারে সে কোনো সপ্ন দেখেনি। যা দেখেছে একদম সত্যি দেখেছে।
মাহিরার চোখে মুখে খুশি ফুটে ওঠে। মাহিরা খুশি হয়ে বিছানা থেকে নেমে মুসকানের রুমের দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। পরক্ষণে মাহিরা থেমে যায়। একটা গোলাপের পাপড়ি দেখে কি মুসকান তাকে বিশ্বাস করবে? যে তার রুমে কতোশত গোলাপের পাপড়ি ছিলো? মাহিরার মনে হলো একটা পাপড়ি দেখে মুসকান তাকে কখনোই বিশ্বাস করবে না। মাহিরা মন খারাপ করে আবারো বিছানায় বসে পরে। তার হাতে থাকা পাপড়িটার দিকে তাকায় একবার। পরপর কিছু না ভেবে পাপড়িটা তার ডায়েরির ভাজে রেখে দেয়।
আয়ান তার ল্যাপটপে অফিসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে। কাজ করার ফাকে আয়ানের চোখ পরে তার গায়ে থাকা ব্লাক টি-শার্টের ওপর। এই টি-শার্ট পরে সে কাল রাতে মাহিরার রুমে গিয়েছিলো। আয়ান এক হাত দিয়ে টি-শার্টের বুকের কিছুটা অংশ টেনে নাকের কাছে ধরে। টি-শার্ট থেকে মাহিরার শরীরের গন্ধ পাচ্ছে সে। মাহিরা সারারাত তার বুকে ঘুমিয়েছিলো। তাই আয়ানের টি-শার্ট জুরে এখন শুধু মাহিরার গন্ধ। আয়ান টি-শার্ট নাকে ঘষে মাহিরার গন্ধ শুষে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
আয়ান ভোর হওয়ার আগেই চলে এসেছিলো মাহিরার রুম থেকে। মাহিরা তখনও আয়ানকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছিলো। মাহিরার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকিয়ে আয়ানের একটুও ছেড়ে আসতে ইচ্ছা করছিলো না। মন চাচ্ছিলো সারাজীবন মাহিরাকে এভাবে জড়িয়ে ধরে ঘুমাতে। বাধ্য হয়ে আয়ানকে তখন চলে আসতে হয়েছে। যেভাবে মাহিরার রুমে গিয়েছিলো। ঠিক সেভাবেই সে ফিরে এসেছে মাহিরার রুম থেকে।
আয়ান নাক দিয়ে মাহিরার গন্ধ শুষে ছেড়ে দেয় টি-শার্ট। আনমনে মুচকি হেসে আবারো কাজে মনোযোগ দেয়।
_______
বিকেলে মুসকান,মাহিরা, নুপুর সবাই ড্রয়িং রুমে বসে ছিলো। আছিয়া বেগমের সাথে গল্প করছে তারা। এমন সময় বাড়িতে অনিক আসে। অনিক এসেই আগে আছিয়া বেগম কে সালাম করেন। আছিয়া বেগম সালামের উত্তর দিয়ে তার রুমে চলে যান।
মুসকান অনিককে দেখে বলে, আরে অনিক ভাই। কেমন আছো তুমি? কতোদিন পর বাড়িতে আসলে। অনিক সোফায় বসে গা এলিয়ে দিয়ে মুসকানকে বলে, ভালো নাই রে মুসকান। দূরে থেকে কি আর ভালো থাকা যায়?
অনিক হোস্টেলে থাকে।সেখানে থেকেই পড়াশোনা করে সে। অনিক সোফায় বসে মুসকানকে বলে, এই মুসকান যা তো ভাইয়ের জন্য এক গ্লাস পানি নিয়ে আয়। মুসকান কিছু না বলে অনিকর জন্য এক গ্লাস পানি নিয়ে আসে। অনিক পানি খেয়ে মুসকানের পাশে বসা মাহিরার দিকে ভ্রু কুঁচকে তাকায়। অনিক মাহিরাকে চিনতে না পেরে বলে, এই মুসকান তোর পাশে বসা এই সুন্দরী মেয়েটা কে রে?
অনিকের এমন কথায় মাহিরা কিছুটা বিব্রত বোধ করে। মুসকান হেসে বলে, আরে অনিক ভাই এটা তো আমাদের ফুপ্পির মেয়ে মাহিরা। অনিক বলে ওঠে, ও রে বাবা। কি বলিস? ফুপ্পির মেয়ে দেখতে এতো সুন্দর? মুসকান হেসে বলে, হ্যা। আমাদের ফুপ্পিও কিন্তু দেখতে অনেক সুন্দর। অনিক এবার মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে,
- এই মেয়ে তুমি কোন চালের ভাত খাও? এতো ফর্সা কেনো তুমি? আমিকেও একটু বলো চালের নামটা। আমিও একটু সেই চালের ভাত খেয়ে তোমার মতো ফর্সা হই।
মাহিরা কি বলবে বুঝতে পারছে না। মাহিরা একটু উশখুশ করে বলে, আসলে ভাইয়া আমি তো..।
- অনিক..?
কারো গম্ভীর গলায় অনিক পিছন ফিরে তাকায়। দেখে আয়ান সটান হয়ে দাঁড়িয়ে আছে অনিকের পেছনে। অনিক আয়ানকে দেখে হেসে বলে, আরে আয়ান ভাই। কেমন আছো তুমি ? কখন আসলে?
আয়ান দরজায় দাড়িয়ে শুনেছে অনিক মাহিরাকে সুন্দর বলেছে। আয়ান ভালো মন্দ কিছু না বলে অনিক কে বলে, রুমে যা। অনিক হেসে বলে, মাত্রই তো আসলাম ভাইয়া। আরেকটু পরে যাই? আয়ান এবার চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
- ইফ ইউ স্টে হিয়ার ওয়ান মোর সেকেন্ড? ইউ উইল ফেস পানিশমেন্ট।
অনিক আর কিছু বললো না। সে খুব ভালো ভাবেই জানে আয়ান কেমন প্রকৃতির। আয়ানের পানিশমেন্টের সাথে অনিকের পূর্বের অভিজ্ঞতা আছে। অনিক এবার উঠে নিজের রুমের দিকে যেতে যেতে মাহিরার উদ্দেশ্য বলে, তোমার সাথে পরে কথা হবে মাহিরা। ফ্রেশ হয়ে আসছি আমি। বলেই অনিক তার রুমে চলে যায়।
আয়ান রাগে কটমট করছে। মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে দেখে আয়ানের চোখ লাল হয়ে আছে। মাহিরা বুঝলো না এই লোকের কি হলো হঠাৎ? আয়ান রেগে মুসকানের দিকে তাকিয়ে বলে, রুমে যা সব। একটাকেও যেনো ড্রয়িং রুমে না দেখি।
মুসকান, মাহিরা, নুপুর সবাই উঠে যে যার মতো চলে যায়। আয়ান রাগে গজগজ করতে করতে নিজের রুমের দিকে চলে যায়। ড্রয়িং রুমের এই দৃশ্য এতক্ষণ পিছনে দাড়িয়ে অর্নব দেখেলো। সে আর আয়ান একসাথেই এসেছে। অর্নব বুঝে গিয়েছে মাহিরার ক্ষেত্রে আয়ান কতোটা পসেসিভ।
আয়ান রুমে এসে হাতের কোর্টটা ছুড়ে মারে বিছানার উপর। তার খুব রাগ লাগছে মাহিরার উপর। পারছে না এক্ষনি মাহিরাকে চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে। এই মেয়ে এতো সুন্দর হওয়ার অপরাধে মন চাচ্ছে মাহিরাকে এনে ইচ্ছা মতো ধোলাই দিতে।
আয়ান নিজের মাথা কিছুতেই ঠান্ডা রাখতে পারছে না। কিছু না ভেবে আয়ান হনহনিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। লম্বা একটা শাওয়ার নিয়ে বের হয় আয়ান। মাথাটা এখন কিছুটা ঠান্ডা লাগছে। আয়ান তার রুমের দরজা খোলো দেখে দরজা আটকাতে যায়। তখনই তার চোখ পরে মাহিরার দিকে। মাহিরা তার রুমের দিকে আসছে।
আয়ানের দুই পাশের দুইটা রুম। একটা মাহিরার আর একটা মুসকানের। আয়ান মুচকি হেসে মাথায় একটা দুষ্টু বুদ্ধি আঁটে। আয়ান একটু দরজার আড়ালে দাড়ায়। মাহিরা মুসকানের রুমের দিকে যাওয়ার জন্য যখনই আয়ানের রুম ক্রস করতে যাবে। অমনি মাহিরা হেঁচকা টানে আয়ানের রুমে ঢুকে যায়।
মাহিরা ভেবাচেকা খেয়ে যায়। এটা কি হলো তার সাথে? আয়ান মাহিরাকে রুমে এনে মাহিরাকে তার দরজার সাথে চেপে ধরে। মাহিরা আশ্চর্য চোখে তাকায় আয়ানের দিকে। এই লোক এখানে কি করছে? আর তাকে কেনো এই লোক এই ভাবে টান দিয়েছে? মাহিরা এই লোকের মতিগতি কিছুই বুঝলো না।
আয়ান শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে মাহিরার দিকে।এই মেয়ের চোখ দুটো এতো সুন্দর কেনো? মাহিরা নিজেও তাকিয়ে আছে আয়ানের দিকে। লোকটার ভিজা চুল থেকে টপটপ করে পানি পরছে। ব্লাক শার্টের গলার কাছে তিনটা বোতাম খোলা। কিছুটা বুক দেখা যাচ্ছে । গলার এডামস আ্যাপেল দেখে মাহিরা শুকনো ঢোক গিলে। আয়ানের গাড় বেয়ে পানি গড়িয়ে পরছে বুকের দিকটায়।
মাহিরা বুঝলো এই লোক মাত্তই গোসল করেছে।কিন্তু মাথা মোছেনি কেনো? আয়ান মাহিরাকে তার দিকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে মৃদু ঠোঁট বাকায়। বলে, এভাবে তাকিয়ে থাকলে তোমার সর্বনাশ হবে।
মাহিরা লজ্জায় চোখ নামিয়ে নেয়। আয়ান আবারো ঠোঁট বাকায়। বলে, তুমি এতো সুন্দর কেনো? মাহিরা থতমত খেয়ে তাকায় আয়ানের দিকে। অনিকের বলা কথায় তার অসস্থি হলেও আয়েনের বলা কথায় তার একটুও অসস্থি হলো না। কেনো হলো না? তা তার নিজেরও অজানা।
মাহিরা কিছু না বলে বলল, আমাকে কেনো এভাবে টেনে এনেছেন? আয়ান শান্ত গলায় বলে, পানিশমেন্ট দিতে। মাহিরা চোখ বড় বড় করে তাকায় আয়ানের দিকে। আয়ান মাহিরার খুব কাছে থাকায় মাহিরার কেমন যেনো লাগছে। সে আয়ানকে বলে,
- দূরে সরুন।
- নো..।
আয়ানের কথায় মাহিরা অবাক চোখে তাকায় আয়ানের চোখের দিকে। কিছু একটা আছে এই চোখে। আয়ান নেশাক্ত চোখে মাহিরার ঠোঁটে তাকিয়ে বলে,
- তোমার ঠোঁটের তিলটা কি আসল?
মাহিরা ফটাফট জবাব দেয়,
- নকল হতে যাবে কোন দুঃখে?
আয়ান ঠোঁট বাকায়। বলে, তাহলে হয়তো ঠোঁটের নিচের তিলটা নকল? মাহিরা বলে ওঠে, না। আমার সবকিছু রিয়েল। আয়ান এবার দুষ্টু হাসে। বলে, তাহলে তো টেস্ট করে দেখতে হয় কতোটা রিয়েল? মাহিরা ভ্রু কুঁচকায়। বলে, কী টেস্ট করবেন ? আয়ান বলে ওঠে, তিল। মাহিরা অবাকের সুরে বলে,
- তিল কি খাওয়ার জিনিস যে টেস্ট করবেন?
আয়ান মনে মনে হাসে, এই মেয়ে কি বলছে সে নিজেও জানেনা। আয়ান বলে ,
- সব জিনিস খাওয়ার জন্য টেস্ট করতে হয় না। কিছু জিনিস টেস্টের জন্য খেতে হয়।
মাহিরা কিছুই বুঝলো না এই লোকের পেঁচানো কথা। মাহিরা বলে, আপনি প্লিজ দুরে সরুন। আয়ান মাহিরার আরেকটু কাছে এগিয়ে আসে। মাহিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এই লোক যে কতোটা ঘাড়ত্যাড়া সে বুঝে গিয়েছে এ কয়দিনে।
মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে, কি বলবেন তাড়াতাড়ি বলেন। আয়ান এবার গম্ভীর গলায় বলে, কিছু বলবো না। শুধু একটু পানিশমেন্ট দিবো। মাহিরা কিছুটা ভয় পায়। এই লোকের পানিশমেন্ট কি কি হতে পারে সে ভাবতে থাকে।মাহিরা কিছু ভেবে বলে, পানিশমেন্ট কেনো দিবেন? আমি কি করেছি? আয়ান মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে,
- তোমার অপরাধ তুমি অত্যাধিক সুন্দর।
মাহিরা আয়ানের চোখে তাকায়। আয়ান আবার বলে, অত্যধিক সুন্দর হওয়ার অপরাধে তোমাকে পানিশমেন্ট খেতে হবে। মাহিরা হতভম্ব হয়। তার গায়ের রং টা না হয় একটু বেশিই ফর্সা। তাই বলে কি এখন তাকে পানিশমেন্ট খেতে হবে? মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে মিনমিনিয়ে বলে,
- আমি তো নিজে নিজেকে বানাইনি। আল্লাহ বানিয়েছে আমাকে। আল্লাহ সুন্দর করে বানালে আমি কি করবো বলুন?
আয়ান কিছুই বললো না, শান্ত চোখে তাকিয়ে দেখলো মাহিরাকে। মাহিরা আয়ানেকে কিছু না বলতে দেখে আবার বলে, কি পানিশমেন্ট দিবেন আপনি? আমি তো আপনার ছোটো তাই না? তাই একটু কম করে পানিশমেন্ট দিবেন কেমন? আয়ান দুষ্টু হাসে। বলে,
- কম পানিশমেন্টে আমার পোষায় না। যা দেওয়ার বেশি বেশি দিবো।
মাহিরার চোখ বড় বড় করে তাকায় আয়ানের দিকে। তার খুব কান্না পাচ্ছে। সে বুঝলো এই লোক তাকে ভয়ংকর কোনো শাস্তি দিবে। মাহিরা মাথা নিচু করে ফেলে। তা দেখে আয়ান মৃদু ঠোঁট বাঁকায়। মাহিরা মাথা নিচু রেখেই বলে,
- আমি সুন্দর এখন এটারও আমার দোষ হয়ে গেলো? আমি তো আর নিজে থেকে সুন্দর হইনি। সুন্দর হওয়াটা কি এখন আমার অপরাধ ? এখন কি সুন্দর হওয়ার অপরাধে আমি সারাদিন গায়ে কালি মেখে থাকবো?
আয়ান সহসাই বলে ওঠে, হ্যা, এটাই করবে। মাহিরা চোখ বড় বড় করে বলে ওঠে, কিহ..? আয়ান মনে মনে হাসে। এই মেয়েকে জ্বালাতে তার ভালোই লাগে।
মাহিরা এবার কিছুটা রেগে বলে, কালি মেখে থাকবো মানে? মানুষ কি বলবে আমাকে ? আয়ান গম্ভীর গলায় বলে, মানুষের সামনে না গেলেই হয়। মাহিরা বলে ওঠে, ওমা? মানুষের সামনে না গেলে কি আমি সারাদিন ঘরে বসে থাকবো? আয়ান ফটাফট জবাব দেয়, হ্যা। মাহিরার এবার মন খারাপ করে অভিমানী গলায় বলে,
- আপনাদের বাড়িতে আসার পর থেকে আমি কোথাও ঘুরতে যেতে পারছি না। আমার দাদু বাড়ি হলে এতোদিনে আমি কতো জায়গায় ঘুড়তে যেতাম। আর এখানে সারাদিন আমাকে ঘরে বসে থাকতে হয়। আমার মন টিকেনা। এখন আবার আপনি বলছেন আমাকে সারাদিন ঘরে বসে থাকতে? আমি কি সারাদিন ঘর বন্ধি হয়ে থাকবো নাকি? এর থেকে তো আমার ইতালিই ভালো ছিলো। আব্বুকে বললেই ঘুরতে নিয়ে যেতো।
আয়ান মাহিরার অভিমানী কথা গুলো মন দিয়ে শুনলো। শান্ত গলায় বলল, কোথায় ঘুরতে যেতে চাও? মাহির সহসাই বলে, আমি তো বাংলাদেশের কিছুই চিনেনা। তাই সব জায়গায় ঘুরতে যেতে চাই। আয়ান মুচকি হাসে। বলে, ওকে। রুমে গিয়ে রেডি হও। আয়ান মাহিরার থেকে দূরে সরে দাঁড়ায়। মাহিরা ভ্রু কুঁচকে বলে, রেডি হবো কেনো। আয়ান বলে ওঠে, ঘুরতে যাবে না?
মাহিরা এবার খুশি হয়ে আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে, খাড়ুস লোক আপনি সত্যি আমাকে ঘুরতে নিয়ে যাবেন? আয়ান কিছু বললো না। শান্ত চোখে দেখলো মাহিরার হাসি মুখটা। এই মেয়ের হাসি তার ভিষণ প্রিয়। মাহিরা আবারো খুশি হয়ে বলে, ঠিক আছে। আমি রেডি হয়ে আসছি। তার আগে মুসকানকে বলে আসি। মুসকানকে সাথে নিয়ে ঘুরতে যাবো আমি৷ মাহিরা দরজা খুলে মুসকানের রুমের দিকে এক দৌড় দেয়। আয়ান শান্ত চোখে তাকিয়ে দেখে মাহিরার প্রত্যাখান। এই মেয়ের জন্য তার সব রুলস ভাঙ্গতে হচ্ছে।
মাহিরা মুসকানের রুমে এসে দেখে মুসকান বসে আছে। মাহিরা বলে, মুসকান তাড়াতাড়ি রেডি হও। মুসকান বুঝলো না মাহিরা তাকে হঠাৎ কেনো রেডি হতে বলছে। মুসকান বলে, রেডি হবো কেনো মাহিরা? মাহিরা হেসে বলে, তোমার ভাই বলেছে আমাদের ঘুরতে নিয়ে যাবে। মুসকান অবাকের সুরে বলে ওঠে, কোন ভাই?
মাহিরা ভ্রু কুঁচকায়। বলে, তোমার ভাই কয়টা। মুসকান সহসাই বলে, আপন ভাই তো একটাই। কিন্তু সে তো কোনোদিন আমাদের ঘুরতে নিয়ে যায়নি। ঈদে কতো করে বলি ভাইয়া একবার ঘুরতে নিয়ে যাও। কিন্তু ভাইয়া কখনো নিয়ে যায়নি। ভাইয়ার নাকি এসব ঘোরাঘুরি বিরক্ত লাগে। তাই সবসময় অর্নব ভাই আমাদের নিয়ে গিয়েছে।
মাহিরা বলে ওঠে , কিন্তু তোমার ভাই তো মাত্র আমাকে বলছে রেডি হতে। আরো বলেছে ঘুরতে যাবে। মুসকান বুঝলো না তার ভাই এমন কথা কেনো বললো। মুসকান বলে ওঠে, ভাইয়া যখন বলেছে তাহলে রেডি হও। মাহিরা রেডি হতে চলে যায়।
অর্নব রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়েছে। এমন সময় তার দরজায় কেউ নক করে। অর্নব দরজা খুলে দেখে মুসকান সেজে গুজে দাড়িয়ে আছে। অর্নব ভ্রু কুঁচকে বলে, তুই বাড়িতে এমন জোকারের মতো সেজে আছিস কোনো? মুসকান অর্নবের কথার কোনো উত্তর না দিয়ে উল্টা প্রশ্ন করে, একি অর্নব ভাই? তুমি এখনো রেডি হওনি কেনো? অর্নব আবারো ভ্রু কুুঁচকায়। বলে, আমি রেডি হবো কোন দুঃখে? আমাকে কি পাগলা কুত্তায় কামড়াইছে? যে তোর মতো বাড়িতেও সেজে গুজে বসে থাকবো।
মুসকান অর্নবের দিয়ে হা হয়ে চেয়ে বলে, তুমি ঘুরতে যাবেনা? অর্নব সহসাই বলে, আমি কখন বললাম তোদের ঘুরতে যাবো? মুসকান হেসে বলে, আয়ান ভাই বলেছে আমাদের ঘুরতে নিয়ে যাবে। তোমাকে বলেনি? অর্নব অবাক চোখে মুসকানের দিকে তাকিয়ে বলে, কিহ বলিস? ভাইয়া এ কথা বলেছে? মুসকান বলে, হ্যা। অর্নব আবারো বলে ওঠে, সত্যিই ভাইয়া তোকে এ কথা বলেছে? নাকি তুই মিথ্যা বলছিস? মুসকান বলে, ভাইয়া আমাকে বলেনি। মাহিরাকে বলেছে ঘুরতে নিয়ে যাবে। মাহিরা এসে আমাকে বলল রেডি হতে। অর্নব বুঝলো কিছু। সে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, ওহ তাহলে ঠিক আছে। মুসকান ভ্রু কুচকে বলে,কি ঠিক আছে? অর্নব বলে, কিছুনা। তুই রুমে যা।
মুসকান ঝটপট বলে, রুমে যাবো কেনো। ঘুড়তে যাবো না আমি? অর্নব কাটখাট জবাব দেয়, না যাবি না। মুসকান অবাক সুরে বলে, কেনো অর্নব ভাই? আমি তো ঘুরতে যেতে চাই। অর্নব বলে ওঠে,
- আমি বলেছি তাই যাবিনা। যদি আজ শুনেছি তুই ঘুরতে গিছেছিস? তাহলে তোর পা ভেঙ্গে আজকেই ঘরে বসিয়ে রাখবো তোকে।
মুসকান মাথা নিচু করে ফেলে। সে আর কিছু বলল না অর্নবকে। এমনিতেই এই লোক তাকে ভালোবাসে না। তার উপরে সে যদি এই লোকের অবাধ্য হয়। তাহলে তো এই লোক তাকে জীবনেও ভালোবাসবে না। যতটুকু আশা আছে সেটাও গলে জ্বল হয়ে যাবে। মুসকান আর কিছু না বলে নিজের রুমের দিকে চলে যায়।
অর্নব তা দেখে আনমনে হাসে। মুসকান যে বাধ্য মেয়ের মতো তার কথা মেনে নিয়েছে তা দেখে তার বেশ ভালো লেগেছে। অর্নব তার দরজা আটকে ভাবতে থাকে, যে ছেলে কোনোদিন কোনো মেয়ের দিকে চোখ তুলে তাকায়নি। কখনো কোনো মেয়ের সাথে পরিচিত হতে চায়নি। বরং মেয়েদের থেকে দশ হাত দূরে দূরে থেকেছে। কখনো নিজের ভাই বোনদের পর্যন্ত ঘুরতে নিয়ে যায়নি। আজ সেই ছেলে কিনা মাহিরাকে ঘুরতে নিয়ে যাওয়ার কথা বলেছে?
অর্নব বিশ্বাস করতে পারছে না। আয়ানের এই পরিবর্তন সে কিভাবে বিশ্বাস করবে? সে জানে আয়ান মাহিরাকে পছন্দ করে। কিন্তু তাই বলে কতোটা? যদিও নিজ মুখে আয়ান এখনো কিছু বলেনি। কিন্তু মাহিরার প্রতি আয়ানের প্রতিটা ব্যবহারে তা স্পষ্ট দেখছে অর্নব। তাই তো সে কৌশলে মুসকানকে বাড়িতে রেখে দিয়েছে। যেনো আয়ান শুধু মাহিরাকে নিয়ে ঘুরতে যেতে পারে। ভাই হয়ে তো এতোটুকু করাই যায়।
মাহিরা রেডি হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়ায়। নিজেকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে একবার দেখে নেয় সে। আজ সে আয়ানের দেওয়া ব্লাক ড্রেস পরেছে। সে আগে থেকেই ভেবে রেখেছিলো কোথাও ঘুরতে গেলে সে এই ব্লাক ড্রেসটা পরবে। সব কিছু ঠিকঠাক আছে দেখে মাহিরা তার রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
মাহিরা মুসকানের রুমে এসেছে। এসে দেখে মুসকান শুয়ে আছে। মাহিরা ভ্রু কুঁচকায়। বলে, একি মুসকান, তুমি এখনো রেডি হওনি কেনো? মুসকান মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, মাহিরা আমার খুব মাথা ব্যাথা করছে। আমি যেতে পারবো না। তোমরা যাও। মাহিরা মন খারাপ হয়ে যায়। বলে, তুমি না গেলে কি করে হয় মুসকান? আমি একা কিভাবে যাবো? আমি তো তোমাকে নিয়েই ঘুরতে যেতে চেয়েছি।
মাহিরা মন খারাপ করেছে বুঝতে পেরে মুসকান হেসে বলে, মন খারাপ করো না মাহিরা। আমরা আবার অন্যদিন একসাথে ঘুরতে যাবো কেমন? এখন যাও তুমি। বেশি দেরি হলে ভাইয়া আবার রাগ করবে।
মাহিরা মন খারাপ করে মুসকানের রুম থেকে চলে যায়। মুসকান দীর্ঘশ্বাস ফেলে। সে রুমে এসে সবকিছু চেঞ্জ করে ফেলেছে। অর্নবের কথা অমান্য করার ক্ষমতা তার নেই।ভালোবাসলে বুঝি মানুষ এমনই হয়?
মাহিরা আয়ানের রুমের পাশ দিয়ে যেতে নিলে শুনতে পায় আয়ান কারো সাথে ফোনে কথা বলছে। মাহিরা ভেবেছিলো আয়ান নিচে চলে গিয়েছে। কিন্তু আয়ান তো এখনো তার রুমে। মাহিরা কিছু না ভেবে আয়ানের দরজায় নক করে।
আয়ান ফোনে তার অ্যাসিস্ট্যান্টের সাথে কথা বলছিলো অফিসের কিছু গুরুত্বপূর্ণ মিটিয়ের ব্যাপারে। হঠাৎ দরজায় নক পরায় ফোন কানে রেখেই দরজা খুলতে যায় আয়ান। দরজা খুলে তাকাতেই আয়ান থমকে যায়। এক মুহূর্তের জন্য থমকে যায় আয়ানের পৃথিবী। কানে ফোন রেখে স্টেচুর মতো দাঁড়িয়ে থাকে আয়ান।
আয়ান এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাহিরার দিকে। মাহিরা তার দেওয়া ব্লাক ড্রেস পরে দাঁড়িয়ে আছে। মাহিরাকে দেখতে একদম ব্লাক ডায়মন্ড লাগছে। ফর্সা গায়ে কালো রং টা মাহিরাকে একটু বেশিই মানিয়েছে। আয়ানের মনে হচ্ছে এই রংটা শুধুমাত্র মাহিরার জন্যই তৈরি। এটা শুধুমাত্র মাহিরাকেই মানায়। আয়ান যখন এই ড্রেসটা কিনেছিলো তখন ভেবেছিলো এই ড্রেসে মাহিরাকে দেখতে সুন্দর লাগবে। কিন্তু মাহিরাকে যে দেখতে এতোটা সুন্দর লাগবে আয়ান সেটা কল্পনাও করেনি। আয়ান আনমনে বলে ওঠে, "মাই ব্লাক কুইন"।
মাহিরা মুসকানের ভাবনার মাঝে আছে। কি হলো মেয়েটার সে ভেবে পাচ্ছে না। মাহিরা আয়ানের কথাটা স্পষ্ট শুনলো না। আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল, কিছু বললেন?
আয়ান শব্দহীন। ফোনের উপাশ থেকে আয়ানের অ্যাসিস্ট্যান্ট চেঁচিয়ে যাচ্ছে, হ্যালো স্যার? স্যার আমরা কি মিটিং টা কনফার্ম করবো? আয়ান কিছু না বলে ফোন কেটে দেয়।
মাহিরা আয়ানকে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে বলে, যাবেন না? আয়ানের কানে মাহিরার কথা যায়নি। কি করে যাবে? আয়ান যে তার সামনে থাকা তার ব্লাক কুইনকে মুগ্ধ হয়ে দেখছে। এতো তাড়াতাড়ি কি ঘোর কাটবে তার? তার চোখ এখোনো মাহিরাতে আটকে আছে। তার চোখ আজ আবারো বলছে, "এ দেখা শেষ না হোক"।
আয়ানের হাব ভাব দেখে মাহিরার ঠিক মনে হলো না। সে আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল, আপনি কি ঠিক আছেন? আয়ান কিছুই বলল না। কি বলবে সে? এই মেয়েকে দেখে সে ঠিক নেই? মাহিরা আয়ানের থেকে কোনো জবাব না পেয়ে আবারো বলে, আপনার শরীর খারাপ থাকলে আমরা অন্যদিন ঘুরতে যাবো কেমন? মুসকানেরও মাথা ব্যাথা করছে। যাবে না বলল। আমরা নাহয় অন্য একদিন সবাই একসাথে ঘুরতে যাবো কেমন?
আয়ান তখনও নিশ্চুপ। সে শুধু এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাহিরার দিকে। মাহিরা আবারো বলে, আমি চলে যাচ্ছি। আপনি রেস্ট নিন। মাহিরা যাওয়ার জন্য পা বাড়াতে যাবে তার আগে আয়ানের গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে আসে, ওয়েট।
মাহিরা থেমে যায়। আয়ান বলে ওঠে, নিচে অপেক্ষা করো। আমি আসছি। মাহিরা কিছু বলতে যাবে তার আগে আয়ান মাহিরার মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দেয়। মাহিরা হতবাক হয় আয়ানের এমন আচরণে। বিড়বিড় করে, খাড়ুস লোক একটা।
আয়ান দরজা লাগিয়ে বিছানায় এসে বসে। এসি ছাড়া সত্যেও সে অনবরত ঘামছে। এই মেয়ে তাকে পাগল করে ছাড়ছে। আয়ান ওঠে গিয়ে এক গ্লাস পানি ঢকঢক করে খেয়ে নিলো। পরপর হাতে গাড়ির চাবি নিয়ে বের হয়ে গেলো রুম থেকে।
বিকালে ড্রয়িং রুম ফাকা থাকে। দুপুরে খেয়ে সবাই ঘুমায় এইসময়টাতে। মাহিরা নিচে নেমে দেখে অনিক সোফায় বসে গেম খেলছে। মাহিরা দরজার দিকে যাওয়া ধরলে অনিক পেছন থেকে বলে ওঠে, হেই সুন্দরী? কোথায় যাচ্ছো? মাহিরা বিরক্ত হয় অনিকের কথায়। এই ছেলে কিভাবেই যেনো কথা বলে। কই আয়ান আর অর্ণব তো এভাবে কথা বলে না। মাহিরা কিছু বলতে যাবে তার আগেই আয়ানের গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে আসে,
- সুন্দরী জাহান্নামে যাচ্ছে। সাথে যেতে চাস? চল তোকে জাহান্নাম থেকে ঘুরিয়ে আনি।
আয়ানের কথায় অনিকের মুখ চুপসে যায়। মাহিরার পিছনে যে আয়ান ছিলো সেটা অনিক খেয়ালই করেনি। অনিক বলে ওঠে, সরি ভাইয়া। আসলে আমি..। অনিক কে শেষ করতে না দিয়ে আয়ান চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাত চেপে বলে,
- মেয়েদের সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় সেটা তুই এখনো শিখতে পারিসনি। আর কখনো যদি দেখি তুই ওর সাথে কথা বলেছিস বা ওকে এইসব আলতু ফালতু নামে ডেকেছিস? তাহলে সোজা তোকে জাহান্নামের স্বাদ দেখিয়ে আনবো আমি।
কথাগুলো বলেই আয়ান হনহনিয়ে দরজার দিকে চলে যায়। মাহিরাও আয়ানের পিছু পিছু যায়। মাহিরা মনে খুশি হয় আয়ান অনিককে বকে দিয়েছে বলে। তার নিজের কাছেও অনিককে একটুও ভালো লাগে না। এদিকে অনিক হা হয়ে চেয়ে আছে দু'জনের যাওয়ার পানে।
আয়ান গাড়িতে ওঠে বসে। মাহিরা গাড়িতে ওঠতে নিলে আয়ান রাগী গম্ভীর গলায় বলে,
- পিছনে বসছো কেনো? সামনে কি তোমার খালা বসবে?
মাহিরা গাড়ির পিছনে বসতে চেয়েছিলো আয়ানের কথায় সে থেমে যায়। এই লোকের এখন মাথা গরম। তাই মাহিরা আর কথা না বাড়িয়ে গাড়ির সামনের সিটে ওঠে বসলো। আয়ান কিছু না বলে গাড়ি স্টার্ট দেয়। মাহিরা গাড়িতে ওঠে বলে, আমার কোনো খালা নেই। আয়ান বলে ওঠে, খালা না থাকলে এখন থেকে সামনে বসবে।
মাহিরা বলে ওঠে, কেনো? আয়ান বলে, বিকজ তোমার খালা নেই। আর এটা তোমার পানিশমেন্ট। মাহিরা আর কিছু বলল না এই লোককে। এই লোক তাকে শুধু পানিশমেন্ট দেওয়ার ধান্দায় থাকে। খাড়ুস লোক একটা। তার খালা নেই সেটাও কি তার দোষ নাকি? আয়ানও আর কিছু না বলে নিঃশব্দে গাড়ি চালায়।
চলবে..