ফন্ট সাইজ:
থিম:
এ দেখা শেষ না হোক

১১তম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া আক্তার সাথী

#এ_দেখা_শেষ_না_হোক #পর্ব - (১১)

#writer_sumaiya_akter_sathi 
--
আয়ান মাহিরাকে নিয়ে খুব সুন্দর একটা যায়গায় ঘুরতে এসেছে। এখানে নেই কোনো মানুষের ভীর। নেই কোনো কোলাহল। চারপাশ শান্ত আর নিরব। দূর দূরান্তে কেউ নেই। মাহিরা নিজেও জানেনা আয়ান তাকে কোথায় নিয়ে এসেছে। কিন্তু সে এটা বুজেছে তারা বাসা থেকে অনেক দূরে কোথাও এসেছে। গাড়িতে বসে থাকতে থাকতে মাহিরার কোমড় একদম ব্যাথা হয়ে গিয়েছিলো। কিন্তু এখন এই সুন্দর যায়গায় এসে মাহিরার সব ব্যাথা হাওয়া হয়ে গেলো। 
মাহিরা সবুজ ঘাসের উপর বাচ্চাদের মতো লাফাচ্ছে। বাংলাদেশর মাটি যে তার কতোটা প্রিয় তার বহিঃপ্রকাশ করছে সে। নদীর পাশে বড় এক জায়গা জুড়ে সবুজ ঘাস। ঘাসের মাঝে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে হাজারো সারি সারি ডেইজি ফুল। মাহিরার যতোদূরে চোখ যায় সে শুধু ফুল আর ফুল দেখতে পায়। 
ফুলগুলো দেখতে কিছুটা সূর্যমুখি ফুলের বাচ্চা মনে হচ্ছে। মাহিরার বেশ ভালো লাগে এই ডেইজি ফুল গুলো। আকারে সূর্যমুখি ফুলের থেকে অনেকটাই ছোটো। মাহিরা তার নরম হাত দিয়ে ফুলগুলোকে ছুয়ে দেয়। মাহিরার হাতের নরম স্পর্শে বাতাসের মতো ফুলগুলো দুলে ওঠে। 
মাহিরা মনে মনে আয়ানের উপর খুব খুশি হয়। এই খাড়ুস লোক যে তাকে এতো সুন্দর একটা জায়গায় নিয়ে আসবে মাহিরা সেটা কল্পনাও করেনি। মাহিরা মনে হলো লোকটা মন্দ না। দেখতে খাড়ুস তবে মনটা ভিষন ভালো। এই যে তাকে কতো সুন্দর একটা যায়গায় ঘুরতে নিয়ে এসেছে।
মাহিরা একটা ডেইজি ফুল ছিরে তার কানে গুজে নেয়। বিকেলের হালকা মিষ্টি বাতাস ছুয়ে দিয়ে যাচ্ছে মাহিরার গাঁ। তার বেশ ভালো লাগছে এই জায়গায় এসে। খোলা নীল আকাশে দেখা যাচ্ছে মেঘেদের ছড়াছড়ি। মাহিরা দু'হাত তুলে ঘুরে বেড়াচ্ছে ফুল বাগানে।
আয়ান দূরে দাঁড়িয়ে দেখছে মাহিরার সব পাগলামি। এই মেয়ের এমন পাগলামি দেখে আয়ান আনমনে হাসলো। পরপর মাহিরার দিকে এগিয়ে যায় সে। মাহিরা তো মহা খুশি। সবুজ ঘাসের উপর হেঁটে খেলে বেড়াচ্ছে সে। আয়ান মাহিরার কাছাকাছি গিয়ে কিছু ডেইজি ফুল তুলতে থাকে। মাহিরা আয়ানকে দেখে অবাক সুরে বলে, কি করছেন? আয়ান শান্ত চোখে মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, ফুল তুলছি।
মাহিরা হেসে বলে, আমিও তুলে দেই? আয়ার কিছু বললো না। মাহিরা আয়ানের সাথে সাথে ফুল তুলতে থাকে। কিছুক্ষণের ভেতরে দুজনে একত্রে অনেক গুলো ফুল তুলে ফেলে। মাহিরা তার ফুল গুলো ওড়নায় নিয়ে হাটতে থাকে আয়ানের পিছু পিছু । 
আয়ান নদীর পাড়ে এসে বসে পরে। মাহিরা তা দেখে ভ্রু কুঁচকায়। সে ভেবেছিলো আয়ান হয়তো ফুলগুলো বাড়িতে নিয়ে যাবে। তাই তুলেছে। মাহিরা বলে ওঠে, এখানে বসলেন কেনো? ফুলগুলো বাড়িতে নিয়ে যাবেন না? আয়ান কিছু না বলে তার হাতের ফুল গুলো ঘাসের ওপরে রাখে। মাহিরাও তার ওড়নার ফুলগুলো রাখে আয়ানের ফুলের পাশে। আয়ান পকেট থেকে ফোন বের করে কিছু একটা করছে।
মাহিরা সেটা দেখে রাগ হলো। এই লোক কেমন জানি। সে বোঝে না এই লোককে। প্রশ্ন করলে কোনো উত্তর তো দেয়ই না। উল্টো চুপ মেরে বসে থাকে। এই লোকের যখন মর্জি হয় তখন কথা বলে। মাহিরার রাগ হলো আয়ানের উপর। মাহিরা আর না দাঁড়িয়ে গটগট পায়ে চলে গেলো ফুলের বাগানে।
আয়ান অনেকক্ষণ বসে বসে ফুলগুলো দিয়ে কিছু একটা বানালো। কাজ সফল হলে আয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে। এই মেয়ের জন্য তার কতো কিছুই না করতে হচ্ছে। আয়ান ফোন পকেটে রেখে চোখ ঘুড়িয়ে আশেপাশে মাহিরাকে খুঁজে। আয়ান আশেপাশে চোখ ঘুড়িয়ে মাহিরাকে কোথাও দেখতে না পেয়ে ভ্রু কুঁচকায়। এই মেয়ে আবার কোথায় গেলো? আয়ান দেখলো মাহিরা আশেপাশে কোথাও নেই। 
আয়ানের বুক টা হঠাৎই ধুক করে উঠে। আয়ান তাড়াতাড়ি ওঠে দাড়ায়। সে এতোক্ষণ বসে ছিলো তাই সে মাহিরাকে খেয়াল করেনি। আয়ান ঝড়ের বেগে ছুটে যায়। মাহিরাকে আশে পাশে খুঁজতে থাকে। তার বানানো ফুলের জিনিসগুলো ঘাসের উপরেই পরে থাকে। 
মাহিরা ঘুরে ফিরে ঘাসের উপর হেঁটে বেড়াচ্ছে। মনের খুশিতে সে ফুল বাগান ঘুরে দেখছে। মাহিরার মনে হলো এই ফুলের বাগানটা অনেক বেশি বড়। বলতে গেলে এখানে বিশ ত্রিশ টা বসত-বাড়ি অনায়াসে করা যেতো।
মাহিরা হেটে বেড়াচ্ছে। তার খুব ভালো লাগছে এইভাবে নদীর পাড়ে হাঁটতে। মাহিরা আনমনে হেসে বিরবির করল, ওই লোকটা খাড়ুস। কিন্তু মনটা তার ভীষণ ভালো। এই যে তাকে কতো সুন্দর প্রকৃতির মাঝে ঘুরতে নিয়ে এসেছে। সে তো ইতালিতে এগুলা দেখতেই পায় না। ইতালিতে থাকলে মাহিরা অনেক মিস করে বাংলাদেশকে। মিস করে তার মাতৃভূমিকে। মিস করে তার এই সুন্দর দেশটাকে।
মাহিরা নদীর পাড়ে হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর চলে এসেছে। যখনই মাহিরার সেটা বোধগম্য হয়। তখনই মাহিরা আশেপাশে তাকিয়ে আয়ানকে খুঁজে। আয়ানকে দেখা যাচ্ছে না কোথাও। এদিকে সন্ধ্যা নেমে আসবে কিছুক্ষণ পরেই। মাহিরা কিছুটা ভয় পাচ্ছে। সে কখন এতো দূরে চলে এসেছে সে নিজেও জানেনা। মাহিরা আর সামনে এগোনোর সাহস পেলো না। মাহিরা যে পথ দিয়ে এসেছিলো পিছন ঘুরে সেই পথ দিয়ে হাটা দেয়। তার খুব ভয় লাগচ্ছে এই অচেনা যায়গায় একা একা হাঁটতে। মাহিরা চোখ ঘুড়িয়ে আবারো চারপাশে আয়ানকে খুঁজলো। কিন্তু তার চোখ আয়ানকে খুঁজে পেলো না কোথাও।
আয়ান আশে পাশে সব জায়গায় মাহিরাকে হন্তদন্ত হয়ে খুঁজেছে। মাহিরা কোথাও নেই। আয়ানের বুকের ভেতরে হঠাৎই এক অজানা ভয় কাজ করে। এই মেয়ে বাংলাদেশের পথ ঘাট কিছুই চিনেনা। তার উপরে এই মেয়ে কোথাও হারিয়ে গেলে কিভাবে ফিরে আসবে? আয়ানের বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠলো। আয়ান হাঁটু গেড়ে বসে পরে। হঠাৎই আকাশের দিকে তাকিয়ে জোরে চিৎকার দিয়ে ওঠে, 
- মাহিইইই..।
আয়ানের চিৎকার ছড়িয়ে আকাশ বাতাশে। ছড়িয়ে পড়ে সমস্ত ফুল বাগানে। আয়ানের চিৎকার বাতাসের সাথে বারি খেয়ে আবারো তার কানেই ফিরে আসে। আয়ান এবার ওঠে দাড়ায়। সে আবারো পাগলের মতো ছুটতে থাকে আশে পাশে। সে কোথাও মাহিরাকে দেখতে পাচ্ছে না। আয়ানের এবার সত্যিই ভয় লাগছে। মাহিরাকে হারানোর ভয় তাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরেছে। আয়ান ছুটে চলে যায় নদীর পাড়ে।  
মাহিরা ভয়ে ভয়ে নদীর পাড় দিয়ে হাঁটছে। নিজের ভয়কে দূর করার জন্য সে ফুলদের গায়ে হাত বুলিয়ে হেঁটে চলছে। সে শুনেছে সন্ধ্যার আগে আশেপাশে নাকি ভুত ঘুরে বেড়ায়। মাহিরার সত্যিই খুব ভয় লাগছে। তার উচিত হয়নি একা একা এতোদূরে আসা। মাহিরা মনে মনে ভয় পাচ্ছে আয়ানকেও। 
এই লোক এমনিতেই মাথা ভাঙ্গা। আয়ান তাকে খুঁজে না পেলে কি করবে সেটাই ভাবছে মাহিরা। এমনিতেই যা রাগ ওই লোকের। কখন জানি তাকে আবার কঠিন পানিশমেন্ট দিয়ে বসে। এই লোক তো শুধু মানুষেকে পানিশমেন্ট দিতেই জানে। মাহিরা মুখ ভেঙ্গচায়। বিরবির করে, খাড়ুস লোক একটা। পরপর আয়ানের পানিশমেন্ট কি কি হতে পারে সেটাই ভাবতে থাকে সে।
মাহিরা আনমনে হাটছে। এমন সময় হঠাৎ এক লোক হুরমুড়িয়ে এসে মাহিরার উপর ঝাপিয়ে পরে। মাহিরা নিজের টাল সামলাতে না পেরে উস্টা খেয়ে পরে যায়। চিৎকার দিয়ে ওঠে, ওমা গো বলে। মাহিরা পরে গিয়ে কিছুই দেখতে পাচ্ছে না। কারো শক্ত দুটি হাত মাহিরাকে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে । 
মাহিরা ভেবেছিলো সে ঘাসের উপর পরে গিয়েছে। কিন্তু না, সে এই অচেনা লোকটার উপর পরেছে। মাহিরা লোকটির মুখ দেখতে পেলো না। লোকটি তাকে শক্ত করে চেপে ধরে রেখেছে। মাহিরা তার মাথা খাড়া করতে পারছে না। মাহিরা এবার চেঁচিয়ে বলে ওঠে, এই কে আপনি? আমাকে এভাবে চেপে ধরেছেন কেনো? লোকটির কোনো সারা শব্দ নেই। মাহিরা আবার চেঁচিয়ে বলে, ছাড়ুন আমাকে? মেয়ে মানুষ দেখলেই মাথা ঠিক থাকেনা তাই না ? অসভ্য লোক। বজ্জাত লোক। ছাড়ুন বলছি।
মাহিরা লোকটির থেকে আবারো কোনো সাড়া শব্দ পেলো না। মাহিরা যে ওঠে দেখবে লোকটিকে তারও কোনো ফুসরত নেই। লোকটা তার মাথা শক্ত করে চেপে ধরা রেখেছে। এতোটাই শক্ত যে মাহিরা নড়াচড়াও করতে পারছে না। নদীর পাড়ে ঘাসের উপর দুটি দেহ আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছে। 
মাহিরা আবার বলে ওঠে, শয়তান লোক। আমি আপনার নামে মামলা করব। আমার মামার কাছে বিচার দিবো আপনার নামে। আপনি তো চিনেন না আমার মামাকে। আমার মামা অনেক বড় মাপের মানুষ। আপনাকে একদম গুম করে ফেলবে সে। আমার মামাকে সবাই ভয় পায়। অসভ্য লোক আমাকে ছাড়ুন। ছাড়ুন বলছি। 
মাহিরা একটু নড়তে চেষ্টা করে। লোকটি তার হাতের বাঁধন আরো বেশি শক্ত করে। মাহিরা মোচড়ামুচড়ি করে আবার বলে ওঠে , বজ্জাত লোক। ছাড়ুন আমাকে। অসভ্য লোক। ছাড়ুন আমাকে। এবার লোকটির শান্ত গম্ভীর গলা শোনা যায়। 
- আমাকে একটু শান্তি দে মাহি। আমি পাগল হয়ে যাচ্ছি।
মাহিরা লোকটির কন্ঠস্বর চিনতে ভুল করলো না। মাহিরা বুঝতে পারলো এটা আয়ান। কিন্তু আয়ান তাকে মাহি বলে ডাকলো কেনো? আবার তাকে এভাবে ধরে রেখেছে কেনো? মাহিরা বুঝলো না আয়ানের কি হয়েছে। আয়ান মাহিরাকে আষ্টে পিষ্টে জড়িয়ে ধরে রেখেছে। যেনো ছেড়ে দিলেই মাহিরা হারিয়ে যাবে।
মাহিরার কেমন জানি লাগছে। সে আয়ানের এতো কাছাকাছি এর আগে কখনোই আসেনি। মাহিরা এবার বলে ওঠে, আপনি পাগল হলে ডাক্তার দেখান। আমাকে এভাবে ধরে রেখেছেন কেনো? আয়ান চোখ বুঝে দীর্ঘশ্বাস ফেলে। বলে, 
- ডাক্তার যদি সব ট্রিটমেন্ড করতে পারতো,তাহলে পৃথিবীর কোনো মানুষ আর পাগল হয়ে রাস্তায় রাস্তায় ঘুরে বেড়াতো না।
মাহিরা বুঝলো না আয়ানের পেঁচানো কথা। বলল, ছাড়ুন আমাকে। ব্যাথা পাচ্ছি আমি। এভাবে কেউ ধরে? আয়ান আরো শক্ত করে বুকের সাথে চেপে ধরেছে মাহিরাকে। চেপে ধরে বলে,
- ইউ নো? আমিও ব্যাথা পেয়েছি। ঠিক এইখানে।
আয়ান হাত দিয়ে মাহিরার মাথাটা তার বুকের বা পাশে চেপে ধরে রাখে। মাহিরা মনে হচ্ছে সে এক্ষনি আয়ানের বুকের ভেতর ঢুকে পরবে। মাহিরা ঠিকমতো শ্বাসও নিতে পারছে না। আয়ান তাকে এতোটাই জোড়ে চেপে ধরে রেখেছে।
মাহিরা কোনো রকম বলল, আমি সত্যিই অনেক ব্যাথা পাচ্ছি। ছাড়ুন প্লিজ। আয়ান এবার তার হাতের বাঁধন নরম করে। হালকা করে মাহিরাকে জড়িয়ে ধরে রাখে। মাহিরা একটু ছাড়া পেয়ে জোরে জোরে শ্বাস নেয়। 
মাহিরার গরম শ্বাস আয়ানের বুকে আঁচড়ে পরছে। আয়ান চোখ বন্ধ রেখেই মুচকি হাসে। একটু আগেই এই মেয়ের জন্য তার বুকে ঝড় বয়ে গিয়েছে। আর এখন এই মেয়েটাকে বুকে নিয়ে তার কেমন শান্তি শান্তি লাগছে। 
মাহিরা উঠার জন্য মোচড়ামুচড়ি করছে। আয়ানকে বলে, ছাড়ুন আমাকে। মানুষ জন দেখলে কি বলবে? আয়ান চোখ বন্ধ রেখে বলে, নো। মাহিরা বলে ওঠে, প্লিজ ছাড়ুন। কেউ দেখলে খারাপ ভাববে আমাদের। আয়ান গম্ভীর গলায় বলে ওঠে, এটা তোমার পানিশমেন্ট। 
মাহিরা অসহায় গলায় মিনমিনিয়ে বলে, সরি। আমার এতো দূরে একা একা আসা ঠিক হয়নি। আর কখনো এমনটা করবো না। আয়ান কিছুই বললো না। মাহিরা আয়ানের বুকে মাথা রেখে শুনতে পায় আয়ানের বুক অস্বাভাবিক ভাবে ওঠা নামা করছে। 
মাহিরা আবারো বলে, ছাড়ুন না। আমরা বাসায় যাবো তো। সন্ধ্যা হয়ে যাবে একটু পর। আয়ান এবার বলে ওঠে, নেভার। পানিশমেন্ট শেষ হোক তারপর। চুপচাপ শুয়ে থাকো। নাহলে থাপ্পড় খাবে। মাহিরা কি বলবে বুঝতে পারছে না। এই লোক যে তাকে এইভাবে পানিশমেন্ট দিবে মাহিরা সেটা কল্পনাও করেনি। মাহিরা আর কিছু না বলে চুপ করে থাকলো। চুপ না থাকলে এই লোক তাকে এর থেকেও বেশি পানিশমেন্ট দিবে।
মাহিরাকে নিশ্চুপ থাকতে দেখে আয়ান চোখ মেলে তাকায় মাহিরার দিকে। দেখে মাহিরা ঘাপটি মেরে তার বুকে শুয়ে আছে। আয়ানের মনে পরে যায় কাল রাতের কথা। কাল রাতেও মাহিরা ঠিক এইভাবে তার বুকে ঘুমিয়েছিলো। আয়ান আনমনে হাসে। মাহিরার দিকে তাকিয়ে ডেকে ওঠে, 
- মাহি..?
মাহিরা চোখ মেলে তাকায়। আয়ান তাকে দ্বিতীয় বারের মতো মাহি বলে ডাকছে। মাহিরা বলে ওঠে, কে মাহি? আমার নাম তো মাহিরা। ভুলে গেলেন আপনি?
আয়ান মাহিরার কথায় মুচকি হেসে বলে, সবার কাছে তুমি মাহিরা হলেও আমার কাছে তুমি একান্তই মাহি। মনে মনে বিরবির করে, আমার মাহি। 
মাহিরা বুঝলো না এই লোকের মাহি বলার কারন। মাহিরা বিরবির করল,খাড়ুস লোক একটা। আমার এতো সুন্দর নামটাকে কাঁটাছেড়া করে ঢোল বানিয়ে দিয়েছে। বজ্জাত লোক। আয়ান শুনতে পেলো না মাহিরার বিরবিরিয়ে বলা কথাগুলো।
মাহিরা বলে ওঠে, আমরা বাসায় যাবো কখন? একটু পরেই তো সন্ধ্যা হয়ে যাবে। আয়ান আবারো চোখ বুঝে ফেলে। বলে, বাসায় যাবো না আজ? মাহিরা চমকে ওঠে। বলে , ওমা। বাসায় না গেলে আমরা কোথায় থাকবো? আয়ান দুষ্টু হেসে বলে, এখানেই। মাহিরা জোরে বলে ওঠে , কিহ..? 
আয়ান মনে মনে হাসে। এই মেয়েকে জালাতে তার ভালোই লাগে। মাহিরা এবার কিছুটা রেগে গিয়ে বলে, এখানে কিভাবে থাকবো আমরা? বাড়ির মানুষ টেনশন করবে না? আয়ান আনমনে বলে ওঠে, ভাবছি এখানেই একটা বাড়ি বানিয়ে ফেলবো। মাহিরা ভ্রু কুঁচকে বলে, এখানে বাড়ি বানাবেন কেনো? আপনাদের তো সুন্দর একটা বাড়ি আছেই। কতো সুন্দর একটা বাড়ি আপনাদের। 
আয়ান চোখ মেলে মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, তোমার আমাদের বাড়ি পছন্দ হয়েছে? মাহিরা সহসাই বলে ওঠে, হ্যা। কতো সুন্দর একটা বাড়ি। পছন্দ হবেনা কেনো। আয়ান আর কিছু বললো না। মাহিরা এবার বলে, চলুন না বাসায়। আমার এখানে খুব ভয় করছে।
আয়ান মাহিরার মাথায় এক হাত রেখে বলে ওঠে, কিসের ভয়? আমি আছি না? মাহিরা বলে ওঠে, ভুতের ভয়। আমি নানুর কাছে শুনেছি।সন্ধ্যা হলেই নদীর আশেপাশে ভুত ঘুরে বেড়ায়। আয়ান এবার ধমক দিয়ে বলে, আর একটা বাজে কথা বললে তোমাকে এক্ষনি এই নদীতে পানিতে নামিয়ে চুবাবো। মাহিরা চুপসে যায়। এমনিতেই তার ভয় লাগছে। তার উপর এই লোক তাকে নদীতে নামিয়ে চুবাতে চাইছে? 
আয়ানের হাতের বাঁধন আগলা থাকায় মাহিরা তার সমস্ত শক্তি দিয়ে আয়ানকে ঠেলে উঠে দাড়ায়। মাহিরা উঠতেই আয়ানের মেজাজ চড়ে যায়। এই মেয়ে আর একটু থাকলে কি হতো? আয়ান নিজেও উঠে দাঁড়ায়। রেগে মাহিরাকে বলে, 
- ইডিয়েট। কোন সাহসে এতো দুরে একা একা এসেছো? তোমার সাহস তো কম না?এক থাপ্পড়ে তোমার দাঁত সব ফেলে দিবো।
মাহিরা ভেবাচেকা খেয়ে চায়। মাত্রই না এই লোক তাকে পানিশমেন্ট দিলো? এখন আবার বকছে কেনো? এই লোকের কি কথায় কথায় মুড সুইং হয় নাকি? মাহিরা নিজেও এবার কিছুটা রেগে গিয়ে বলে, মাত্রই না পানিশমেন্ট দিলেন? এখন আবার বকছেন কেনো? 
আয়ান বলে ওঠে, বিকজ তুমি একটা ইডিয়েট। বলেই আয়ান মাহিরার এক হাত ধরে হাটা শুরু করে দেয়। মাহিরা কিছুই বোঝে না এই লোককে। এই লোকের মাথায় সমস্যা আছে। যখন যা মনে চায় তাই করে। মাহিরা বিরবির করে,খাড়ুস একটা। 
মুসকান ছাদে এসেছে । সারা বিকালটা তার রুমেই কেটেছে। মাহিরাও নেই যে গল্প করবে। কিছুটা মন খারাপ নিয়েই ছাদে এসেছে মুসকান। মুসকান এসে বেঞ্চের উপর বসে। আকাশের পানে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। আকাশটা কালো হয়ে আসছে। সন্ধ্যা নেমে আসবে হয়তো। মুসকান মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থাকলো আকাশের পানে।
হঠাৎ কেউ একজন এসে মুসকানের পাশে বসে। মুসকানের থেকে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে বসেছে সে। মুসকান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় পাশে বসা মানুষটির দিকে। অর্নব বসে আছে। মুসকান তার চোখ সরিয়ে নেয়। অর্নব মুসকানের দিকে তাকিয়ে বলে, মন খারাপ? মুসকান কিছুটা তাছিল্য হেসে বলে, হলে? অর্নব আর কিছু বলতে পারে না।
কি বা বলবে সে? এই মেয়েটা যে তাকে ভালোবেসে কষ্ট পাচ্ছে অর্নব সেটা টের পায়। কিন্তু তার হাত বাঁধা। সে পারবে না মুসকানকে আপন করে নিতে। অর্নবকে চুপ থাকতে দেখে মুসকান বলে ওঠে, এখানে কেনো এসেছো অর্নব ভাই? অর্নব মুসকানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, কেন? তোর খারাপ লাগছে?
মুসকান আবারো তাছিল্য হাসে। বলে, আমার ভালো খারাপ কবে থেকে দেখতে শুরু করলে তুমি? অর্নব বলে ওঠে, আমাকে তুই ভুল বুঝিস না মুসকান। আমি তোকে..। অর্নব সম্পূর্ন কথা শেষ করার আগে মুসকান বলে ওঠে, থাক না অর্নব ভাই। আমাকে ভুল টাই বুঝতে দাও। আমি চাইনা সঠিক টা বুঝতে। পরপর মুসকান ওঠে চলে যায়। অর্নব চেয়ে থাকে মুসকানের যাওয়ার পানে। এই মেয়েকে সে কিভাবে বাঁধা দিবে ধংসের হাত থেকে বাঁচতে?
আয়ান মাহিরার হাত ধরে গাড়ির কাছে নিয়ে আসে। দরজা খুলে মাহিরাকে ভেতরে বসিয়ে দেয়। মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, গাড়ি থেকে নামবি না। বলেই আয়ান কোথাও চলে যায়। মাহিরা গাড়িতে ওঠে বসে। গাড়িতে সে একা। মাহিরা আবারো ভয় পায়। এই অচেনা যায়গায় আয়ান তাকে ফেলে রেখে কোথায় চলে গেলো? 
মাহিরা দেখতে পাচ্ছে চারোপাশ অন্ধকার হয়ে আসছে। মাহিরা বুঝলো না আয়ান কোথায়। সে ভাবলো নেমে আশেপাশে খুঁজে দেখবে আয়ানকে। মাহিরা যেইনা গাড়ির দরজা খুলতে যাবে ওমনি আয়ানের গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে আসে,
- স্টোপ।
মাহিরা থেমে যায়। পাশে তাকিয়ে দেখে আয়ান গাড়িতে এসে বসছে। মাহিরা অভিমানী গলায় বলে, কোথায় গিয়েছিলেন আপনি? আমাকে এভাবে একা রেখে যেতে পারলেন? আয়ান মাহিরার প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে বলে ওঠে,
- ক্লোজ ইউর আইজ মাহি।
মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকায়। বলে, চোখ বন্ধ করবো কেনো। আয়ান আবারো বলে, চোখ বন্ধ করো। মাহিরা আর কিছু বললো না। সে তার চোখ দুটো বন্ধ করে নিলো। আয়ান এবার তার হাতে থাকা ফুলের ক্রাউন টা মাহিরার মাথায় পরিয়ে দেয়। 
ফুলের ক্রাউন মাথায় দিয়ে মাহিরাকে তার কাছে সত্যিকারের কুইন মনে হলো। তার কুইন। আয়ান মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে দেখলো মাহিরাকে। মনে মনে বিরবির করল, মাশাল্লাহ। মাই রিয়েল কুইন। পরপর ফোন বের করে মাহিরার কিছু ছবি তুলে নেয়। ফোন রেখে মাহিরাকে বলে, 
- ওপেন ইউর আইজ।
মাহিরা চোখ খুলে। সে চোখ বন্ধ রেখে বুঝেছিলো আয়ান তার মাথায় কিছু একটা পরিয়ে দিয়েছে। মাহিরা চোখ খুলে গাড়ির মিররে তাকিয়ে চমকে উঠে। আয়ান তাকে ফুলের ক্রাউন পরিয়ে দিয়েছে। সে আর আয়ান যে ফুলগুলো তুলেছিলো সেগুলো দিয়ে আয়ান খুব সুন্দর একটা ফুলের ক্রাউন বানিয়েছে। সেই ক্রাউন টাই আয়ান মাহিরার মাথায় পরিয়ে দিয়েছে। 
মাহিরা আয়নায় দেখলো তাকে দেখতে খুব সুন্দর লাগছে। ফুলের ক্রাউন টা বেশ মানিয়েছে তার মাথায়। মাহিরা খুশি হয়ে আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে, খাড়ুস লোক এটা আপনি বানিয়েছেন? আয়ান কিছু বললো না। সে শান্ত চোখে তাকিয়ে দেখলো মাহিরাকে। মাহিরা আবারো বলে, এটা খুবই সুন্দর হয়েছে। এইজন্যই তখন ফুল তুলেছিলেন আপনি তাই না? আয়ান মুচকি হেসে বলে, হাত দাও। মাহিরা তার ডান হাত বাড়িয়ে দেয়। আয়ান শান্ত গলায় বলে, বাম হাত দাও। মাহিরা এবার তার বাম হাত বাড়িয়ে দেয়। আয়ান এবার তার হাতে থাকা একটি ডেইলি ফুলের রিং মাহিরার হাতে পরিয়ে দেয়। মাহিরা তা দেখে বলে ওঠে, আপনি ফুল দিয়ে রিংও বানিয়েছেন? আপনি এগুলো বানানো কোথা থেকে শিখলেন? আপনি না ছেলে মানুষ।
আয়ান এবার মুচকি হেসে গাড়ি স্টার্ট দিয়ে বলে, ইউটিউব থেকে। মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলে, আপনি ইউটিউব থেকে এসব শিখেন? আয়ান বলে ওঠে, প্রয়োজন হলে। মাহিরা আর কিছু বলল না। পরপর গাড়ির আয়নায় নিজেকে দেখে আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে, ধন্যবাদ খাড়ুস লোক। আয়ান ভ্রু কুঁচকে বলে, হোয়াই? মাহিরা বলে ওঠে, এইযে আপনি কতো সুন্দর একটা জায়গায় আমাকে ঘুরতে নিয়ে আসলেন। আবার কি সুন্দর একটা ফুলের ক্রাউন সাথে একটা ফুলের রিং বানিয়ে দিলেন। আপনি খাড়ুস তবে আপনার মনটা ভালো।
আয়ান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় মাহিরার দিকে। তার দেওয়া কালো ড্রেসের সাথে তার হাতে বানানো ফুলের ক্রাউন মাথায় দিয়ে মাহিরাকে আজ সত্যিই রানী লাগচ্ছে। তার রানী। আয়ান আনমনে মুচকি হাসে। মনে মনে বিরবির করে, তুমি সত্যিই একদিন রানী হবে।
আয়ান এবার মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, কি খাবে? মাহিরা ফটাফট জবাব দেয়, ফুচকা। আয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকায় মাহিরার দিকে। এই মেয়ে কি ফুচকা ছাড়া আর কিছু খেতে পারে না? আয়ান এবার গম্ভীর গলায় বলে ওঠে, ফুচকা ছাড়া কি খাবে সেটা বলো। মাহিরা এবার বলতে থাকে, 
- ওই যে ছোট্ট গোল পুরির ভেতরে আলু, ডাল দিয়ে তার উপরে তেতুলের টক ঢেলে যেটা খায় না?সেটা খেতে চাই।
আয়ান হতভম্ব হয় মাহিরার কথা শুনে। এই মেয়ে ডিরেক্টলি ইনডিরেক্টলি ঘুরিয়ে পেচিয়ে ফুচকা খাওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। আয়ান আর কিছু বলল না।নিঃশব্দে গাড়ি চালালো। মাহিরাও আর কিছু না বলে আয়নায় খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে নিজেকে দেখতে থাকে। 
মালিহা বেগম আয়ানকে রুমে না পেয়ে মুসকানের রুমে এসেছে। মুসকান বসে বসে বাদাম খাচ্ছে। মালিহা বেগম এসে মুসকানকে জিজ্ঞেস করেন, মুসকান তোর ভাই কোথায়? রুমে নেই কেনো? মুসকান বাদাম খেতে খেতে বলে, ভাইয়া তো বিকালে ঘুরতে গিয়েছে মা। এখনো ফিরেনি। মালিহা বেগম আশ্চর্য চোখে তাকান মুসকানের দিকে। সে ভুল শুনলো কিনা কে জানে? মালিহা বেগম আবারো মুসকানকে বলেন, আয়ান ঘুরতে গিয়েছে? কখন? কোথায় গিয়েছে ঘুরতে?
মুসকান সহসাই বলে, তোমার ছেলে কি কাউকে কিছু বলে যায় মা? মালিহা বেগম চিন্তিত হয়ে পরলেন। সত্যিই তো তার ছেলে কাউকে কিছু বলে কয়ে যায় না। কিন্তু যেই ছেলে ঘোড়াঘুড়ি পছন্দ করেনা বলে নিজের বোনকে কখনো ঘুরতে নিয়ে যায়নি। সেই ছেলে আজ হঠাৎই নিজ ইচ্ছায় ঘুরতে গিয়েছে? মালিহা বেগমের এটা বিশ্বাস করতে কষ্ট হলো। তিনি আর কিছু না বলে মুসকানের রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন।
আয়ান মাহিরাকে নিয়ে একটা রেস্টুরেন্টে এসেছে। মাহিরা আশেপাশে তাকিয়ে দেখছে। যায়গাটা নতুন মনে হলো মাহিরার কাছে। আয়ান মাহিরার দিকে একটা মেনু কার্ট বাড়িয়ে দিয়ে বলে, কি খাবে অর্ডার দাও। মাহিরার অলরেডি পেট ভরা। আয়ান তাকে আসার সময় ফুচকা খাইয়ে নিয়ে এসেছে। আয়ান বলেছিলো আগে কিছু ভারী খাবার খেয়ে তারপর ফুচকা খেতে। কিন্তু মাহিরা আয়ানের কথা শোনেনি। সে ফুচকা খেয়ে তারপর এসেছে।
মাহিরা মেনু কার্ড দেখে একটা ফ্রেঞ্চফ্রাই আর একটা কোল্ড ডিংক অর্ডায় দেয়। আয়ান ভ্রু কুঁচকায়। মুখে কিছু বলে না। এই মেয়ে যে পেট ভরে ফুচকা খেয়েছে আয়ানের বুঝতে আর বাকি রইল না। মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, আপনি কি খাবেন? আয়ান বলে ওঠে, কাচ্চি। মাহিরা আর কিছু বললো না। বুঝতে পারলো এই খাড়ুস লোকেক কাচ্চি পছন্দ। 
খাবার আসলে আয়ান খেতে শুরু করে। মাহিরা বসে বসে ফ্রেঞ্চফ্রাই খাচ্ছে। আর আড়চোখে বসে বসে আয়ানকে দেখছে। আয়ান নিজ মনে খাচ্ছে। আয়ান না তাকিয়েও বুঝতে পারে মাহিরা তার দিকেই তাকিয়ে আছে। আয়ান মাহিরার দিকে না তাকিয়েই বলে ওঠে,
- এভাবে তাকালে আমার খাবারে নজর পরবে। তুমি চাইলে নিজের জন্য কাচ্চি ওর্ডার দিতে পারো। 
মাহিরা ভেবাচেকা খেয়ে যায়। আয়ান কিভাবে বুঝলো সে আয়ানের দিকে তাকিয়ে আছে? মাহিরা আয়ানের থেকে চোখ সরিয়ে বলে, আমি কিছু খাবোনা। আমার পেট ভরা। আয়ান মনে মনে হাসে। আর কিছু না বলে খাওয়ায় মনোযোগ দেয়। 
অর্নব এখনো ছাদে বসে আছে। ছাদে পর্যাপ্ত লাইট থাকায় চারোপাশ আলোকিত। অর্নব ছাদে বেঞ্চে বসে সিগারেট ফুঁকছে। এমন সময় নাবিলার ডাক পরে। অর্নব ভাই? অর্নব পিছন ঘুরে তাকায়। নাবিলা তার দিকেই আসছে।
নাবিলা এসে অর্নবের মুখোমুখি সামনের বেঞ্চে বসে বলে, এখানে কি করছো তুমি? অর্নব সহসাই বলে, সিগারেট খাচ্ছি। নাবিলা বলে ওঠে, আমাকে একটু মার্কেটে নিয়ে যাবে চলো। অর্নব ভ্রু কুঁচকে বলে, কোন দুঃখে? নাবিলা বলে ওঠে, আমাকে টেইলরের কাছে যেতে হবে। একা তো আর যেতে পারবো না। অর্নব এবার বলে, মুসকানকে সাথে করে নিয়ে যেতে পারলে বলিস।
নাবিলা ভ্রু কুঁচকে বলে, কেনো কি হয়েছে মুসকানের? অর্নব অসহায় গলায় বলে, কি জানি? নাবিলা আবারো বলে, কি করেছো তুমি মুসকানের সাথে? অর্নব সিগারেটে টান দিয়ে বলে, কিছু করিনি। এটাই সমস্যা। নাবিলা বলে ওঠে, তুমি কেনো মুসকানকে এইভাবে কষ্ট দিচ্ছো ভাইয়া? মুসকান তো বুঝ হওয়ার পর থেকেই তোমাকে ভালোবেসে এসেছে। আর কতো কষ্ট দিবে মেয়েটাকে?
অর্নব আর কোনো উত্তর দিলো না। মনে মনে আওড়ালো, যদি পারতার তাহলে অনেক আগেই ওকে নিজের করে নিতাম। নাবিলা অর্নবকে চুপ থাকতে দেখে বলে, আমি মুসকানকে নিয়ে আসছি। তুমি নিচে চলো। অর্নব বলল, যা আমি আসছি। নাবিলা চলে যায়। অর্নব আরো একটা সিগারেট ধরায়। 
আয়ান মাহিরাকে নিয়ে বাড়ি এসেছে। মাহিরা বাড়ির দরজা দিয়ে ঢোকার সময় মালিহা বেগমের সাথে দেখা হয়। মালিহা বেগম জানতেন না মাহিরা বাড়িতে নেই। মাহিরাকে দেখে মালিহা বেগম হেসে জিজ্ঞেস করেন, কোথায় গিয়েছিলে মা? মাহিরা হেসে মালিহা বেগমকে বলে,মামুনি আমি তো..!
- ঘুরতে গিয়েছিলো।
মাহিরার কথা শেষ হওয়ার আগেই আয়ান পিছন থেকে বলে ওঠে। মালিহা বেগম ভ্রু কুঁচকে তাকালো মাহিরার পেছনে। দেখলো আয়ান দাঁড়িয়ে আছে। সে জানতো আয়ান ঘুরতে গিয়েছে। কিন্তু সাথে যে মাহিরাও গিয়েছে সেটা মালিহা বেগম জানতেন না। 
মালিহা বেগম কিছুটা অবাক হয়ে মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলেন, তোমাকে আয়ান ঘুরতে নিয়ে গিয়েছে? মাহিরা খুশি হয়ে বলে, জ্বি মামুনি। মালিহা বেগম আর কিছু বললেন না। চোখ ঘুড়িয়ে তাকালেন মাহিরার পেছনে থাকা আয়ানের দিকে। ছেলের হাব ভাব বোঝার চেষ্টা করছেন তিনি। আয়ান শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে তার মায়ের দিকে। মালিহা বেগম এবার মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলেন, তুমি রুমে যাও।
মাহিরা সিড়ি বেয়ে উপরে চলে যায়। আয়ান দাঁড়িয়ে থাকে তার মায়ের সামনে। মনে হচ্ছে আয়ান আসামি আর তার মা বিচারক। মালিহা বেগম এবার আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলেন, তুমি কবে থেকে ঘুরতে শুরু করলে আয়ান? আয়ান সহসা জবাব দেয়, আই ডোন্ট নো।
মালিহা বেগম ছেলের কাছ থেকে এমন জবাবে অভ্যস্ত। তিনি আবারো বললেন, তোমার বাবা আজ এই দৃশ্য দেখলে কি হতো? ভেবেছো একবারও? আয়ান এবার গম্ভীর গলায় বলে ওঠে, 
- আমি "আরিয়ান আয়ান শিকদার" কাউকে ভয় পাই না। আর না কাউকে কোনো কৈফিয়ত দেওয়ার প্রয়োজন মনে করি। আমার যেটা ভালো মনে হয় আমি সেটাই করি।
মালিহা বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। ছেলের কথা শুনে মনে হলো বাপ ছেলে দুইটাই এক। মালিহা বেগম আর কিছু না বলে আয়ানকে বলেন, রুমে যাও। আয়ান কিছু না বলে তার রুমের দিকে চলে যায়।
এদিকে মালিহা বেগম চিন্তিত হয়ে পরেন। তিনি বড়ো কোনো ঝড় আসার পূর্বাবাস পাচ্ছেন। মালিহা বেগম আর কিছু না ভেবে ছুটে চলে যান পরীর রুমে। আছিয়া বেগম কিছুটা অসুস্থ থাকায় পরী সবসময় আছিয়া বেগমের সাথে থাকেন। আছিয়া বেগম পরীকে চোখে হারায়।
পঁচিশ বছর পর মেয়েকে কাছে পেয়েছেন তিনি। চোখে হারাবেন না কেনো? পরী বেগমও তাই। মায়ের সাথে সারাদিন থাকেন তিনি। মাঝে মাঝে পরী তার মায়ের সাথেও ঘুমায়। এতে যদিও মোশাররফ হোসেন কিছুটা রাগ করেন। কারন তিনি কখনো পরীকে ছাড়া একা ঘুমাননি। কিন্তু পরীর খুশি দেখে তিনি আর কিছু বলেন না। পরীর খুশিই তার কাছে সবার আগে।
মোশাররফ হোসেন খুশি হন এ বাড়ির সকলে তাকে খুব আপন করে নিয়েছে তাই। পরীর চার ভাই সারাক্ষণ মোশাররফ হোসেন কে তাদের সঙ্গে রাখেন। মোশাররফ হোসেন কে নিজেদের ভাই মনে করেন। মোশাররফ হোসেন কে বলেন তারা এখন থেকে পাঁচ ভাই। মোশাররফ হোসেনও আপত্তি করেন না তাতে। সে তো এটাই চেয়েছিলো। সবাই যেনো তাকে মেনে নিয়ে এই পরিবারের একজন মনে করেন। মেনে তো ঠিকই নিয়েছে সবাই। কিন্তু মাঝখানে কেটে যায় পঁচিশ টা বছর।
মালিহা বেগম তার শাশুড়ীর রুমে যান। দেখলেন মা মেয়ে বসে গল্প করছে। পরী বেগম মালিহা বেগম কে দেখে বলল, কিছু বলবে ভাবী। মালিহা বেগম হেসে বলেন, না তেমন কিছু না। মোশাররফ ভাই কোথায় পরী। পরী বেগম হেসে বলেন, সে তো এখন আমার চার ভাইয়ের সাথে ঘাপটি জমিয়েছে। তার দেখা তো আমি নিজেই পাইনা ভাবী। মালিহা বেগম হাসলেন পরীর এমন কথা শুনে। তিনি পরীকে কিছু বলতে চেয়েও বলতে পারলেন না।
আয়ান সিঁড়ি বেড়ে উপরে ওঠে নিজের রুমের দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। এমন সময় অর্ণবের কাশি শুনে আয়ানের পা থেমে যায়। অর্ণব ছাদ থেকে নেমে এসেছে। সে কাশি দিয়ে আয়ানের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাইছে। আয়ান ঘাড় ঘুরিয়ে অর্ণবের দিকে তাকিয়ে বলে, কাশি দিচ্ছিস কেনো? সমস্যা কি? অর্ণব মিটিমিটি হেসে বলে,
- বলতে চাচ্ছিলাম না মানে তোমাদের আজকের ডেট টা কেমন হলো ভাইয়া?
আয়ান গম্ভীর গলায় বলে ওঠে , বাজে বকা বন্ধ কর। অর্ণব মুচকি হেসে বলে, সরম পাচ্ছো কেনো ভাইয়া? আমি তো তোমার মাত্র এক বছরের ছোটো। আমাকেও একটু বলো না কিভাবে কি করতে হয়। না মানে আমিও একটু শিখি কিভাবে কি ডেট ফেট করতে হয়। আয়ান এবার রেগে দাঁতে দাঁত পিসে বলে, আর একটাও ফালতু কথা বললে এক থাপ্পড়ে তোর দাঁত সব ফেলে দিবো।
অর্ণব মুচকি হাসলো। সে আর কিছু না বলে আয়ানের দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। অর্ণব বুঝে গিয়েছে আয়ান আর মাহিরার ভেতরে কিছু একটা হয়েছে। নাহলে আয়ান এভাবে রিয়েক্ট করতো না। আয়ান দেখলো অর্ণব তার দিকে তাকিয়ে মুচকি মুচকি হাসছে। আয়ানের গায়ে আগুন ধরে গেলো। আয়ান আর কিছু না বলে গটগট পায়ে তার রুমের দিকে চলে যেতে থাকে। আয়ানকে চলে যেতে দেখে অর্ণব সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যেতে যেতে গাইতে থাকে..
কৃষ্ণ করলে লিলা, আর আমরা করলে বিলা রে..
কৃষ্ণ করলে লিলা, আর আমরা করলে বিলা রে..
আয়ান উপর থেকে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে অর্ণবের দিকে। অর্ণব সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে যাচ্ছে আর একই গান বারবার গাইছে। আয়ানের মন চাচ্ছে এক্ষনি অর্ণবকে দু চারটা লাগিয়ে ওর গান গাওয়ার স্বাদ মিটিয়ে দিতে। আয়ান চোয়াল শক্ত করে হনহনিয়ে তার রুমের দিকে চলে যায়।
চলবে..

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন