#এ_দেখা_শেষ_না_হোক #পর্ব - (১৬)
#writer_sumaiya_akter_sathi
--
মাহিরা ছাদে এসেছে। ছাদে এসে মাহিরা দেখে চারপাশ আলোয় ঝিকিমিকি করছে। অনেক সুন্দর করে সাজানো হয়েছে বাড়ির ছাদটা। মাহিরা ছাদ সাজানোর পর ছাদে আর আসেনি। মাত্রই এসেছে সে। মাহিরাকে দেখা মাত্র মুসকান মাহিরার কাছে এসে বলে, আরে মাহিরা। কোথায় ছিলে তুমি? তোমাকে খুঁজছি আমি সেই বিকেল থেকে। আপুর হলুদে আসোনি কেনো? মাহিরা কি বলবে ভেবে পাচ্ছে না। মুসকানকে কি সে বলবে তার ভাই যে মাহিরাকে আঁটকে রেখেছিলো? মুসকান কি বিশ্বাস করবে তার কথা?
মাহিরা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে, অনেক ট্রায়াড লাগছিলো মুসকান। তাই একটু ঘুমিয়ে পরেছিলাম।
মুসকান আর কিছু না বলে মাহিরার হাত ধরে নিয়ে যায় নাবিলা যেখানে মেহেদী দিচ্ছে সেখানে। নাবিলা বসে আছে গাঢ় সবুজ রঙের শাড়ি পরে। নাবিলার দুই হাতে দু'জন মেহেদী আর্টিস্ট মেহেদী পরিয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে আরো দুজন মেহেদী অটিস্টিক বাড়ির মেয়েদের মেহেদী পরিয়ে দিচ্ছে। মুসকান আর মাহিরা এসে বসলো সবার সাথে।
অর্নব আর ইশান পাশাপাশি বসে আছে। দুজনে সমবয়সী হওয়ায় তাদের ভেতর বেশ ভালো জ্বমেছে। মাহিরা এসে বসলে ইশান জিজ্ঞেস করে, কিরে মাহিরা কই ছিলি তুই? মাহিরা হেসে ইশানকে বলে, আমি তো রুমে ছিলাম ইশান ভাই। অর্নব পাশ থেকে মুচকি হেসে মাহিরাকে জিজ্ঞেস করে, তোমার শরীর ঠিক আছে মাহিরা? মাহিরা সহসা জবাব দেয়, হ্যা ভাইয়া কেনো? অর্নব মিটিমিটি হেসে বলে , না এমনি জিজ্ঞেস করলাম। মাহিরা আর কিছু বললো না।
আয়ান মাহিরার পিছু পিছু ছাদে এসেছে। অর্নব আয়ানকে দূর থেকে দেখে চেচিয়ে বলে, ভাইয়া এদিকে আসো। পরিচিত হও আমাদের নতুন মেহমানদের সাথে। আয়ান এসে অর্নবের পাশে দাঁড়াতেই অর্নব বলে ওঠ, ভাইয়া এটা মাহিরার চাচাতো ভাই ইশান। আর ইশান এটা আমার বড় ভাই আয়ান। ইশান দাঁড়িয়ে আয়ানের দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলে, নাইস টু মিট ইউ মি.আয়ান। আয়ান মুচকি হেসে ইশানের সাথে হেন্ডসেক করে বলে, সেইম টু ইউ মি.ইশান। ইশান আয়ানের হাত ছেড়ে দিয়ে আবারো তার জায়গায় বসে পরে। আয়ান একটা চেয়ার টেনে মাহিরার মুখোমুখি সামনে বসে।
মাহিরা মুসকানের সাথে বসে আছে। হাতে মেহেদি পরছে নুপুর আর কেয়া। মাহিরাকে দেখে কেয়ার গা জ্বলে যাচ্ছে। এই মাহিরা মেয়েটাকে সে একদমই সয্য করতে পারছে না। মাহিরাকে দেখবে না বলে সে সবার সাথে সাজেনি। মাহিরা ছিলো বলে সে তার রুমে বসে সেজেছে। কেয়া মাহিরাকে দেখে মেহেদী আর্টিস্টকে তাড়া দিয়ে বলে, আপু আমাকে তাড়াতাড়ি মেহেদি পরিয়ে দিন তো। কিছু মানুষ কে দেখে আমার গা জ্বলে যাচ্ছে। মেহেদী আর্টিস্টি কেয়ার কথা মতো তাড়াতাড়ি মেহেদি পরিয়ে দিতে থাকে।
এদিকে মাহিরা আর মুসকান অপেক্ষা করছে কখন কেয়া আর নুপুরের মেহেদী দেওয়া শেষ হলে তারা হাতে মেহেদী দিবে। ইশিতা তার ছেলেকে ঘুম পারিয়ে ছাদে এসেছে। ইশিতা এসে মাহিরার পাশে বসে মাহিরাকে বলে, একি মাহিরা তুই না শাড়ি খুলে ফেলেছিস কেনো? ইশিতা কথাটা জোড়ে বলায় উপস্থিত সবাই মাহিরার দিকে কৌতুহল দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে।
মাহিরা কি বলবে বুজতে পারছে না। সে এবার তার সামনে বসা কিছুটা দুরে আয়ানের দিকে তাকায়। দেখে আয়ান তার দিকেই তাকিয়ে বাঁকা হাসছে। মাহিরার খুব রাগ হয় আয়ানের উপর। এই লোকের জন্য তার সবাইকে বানিয়ে বানিয়ে মিথ্যা বলতে হচ্ছে। মাহিরা আয়ানের থেকে চোখ সরিয়ে ইশিতাকে বলে, আসলে আপু শাড়ি পরে হাঁটতে পারছিলাম না। তাই খুলে ফেলেছি।
উপস্থিত সকলের মনের কৌতুহল দূর হয়। আয়ান মাহিরার কথা শুনে মৃদু ঠোঁট বাকায়। আর কেউ না দেখলেও অর্নব সেটা দেখে ফেলে। সে উঠে এসে আয়ানের পাশে বসে। আয়ান এখোনো তাকিয়ে আছে মাহিরার দিকে। অর্নব আয়ানের দৃষ্টি অনুসরণ করে সামনে তাকায়। দেখতে পায় মাহিরা আর মুসকান বসে আছে। অর্নব মুসকানদের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,
- কন্ট্রোলেস হওয়ার কারন তবে এটা ছিলো ভাইয়া?
আয়ান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় অর্নবের দিকে। অর্নব কখন এসেছে আয়ানের জানা নেই। সে তো চেয়ে ছিলো তার অপুরুপ সুন্দর নারীটির দিকে। আয়ান আবারো মাহিরার দিকে চোখ দিয়ে বলে, থাপ্পড় খেতে না চাইলে এখান থেকে যা।
অর্নব মুচকি হাসে। সে তাকিয়ে আছে মাহিরার পাশে বসা মুসকানের দিকে। মুসকান আজ গাঢ় সবুজ রঙের শাড়ি পরেছে। মুসকানকে দেখতে বেশ সুন্দর লাগছে। ফর্সা গায়ে শাড়িটা বেশ মানিয়েছে মুসকানকে। মুসকানকে এর আগেও অর্নব শাড়িতে দেখেছে। কিন্তু কখনো এরকমটা মনে হয়নি। অর্নব মুসকানকে পরখ করে আনমনে বলে ওঠে, শাড়িতেই নারী। তাই না ভাইয়া? আয়ান কিছুই বললো না। সে নিস্তব্ধ ভঙ্গিকে তাকিয়ে থাকলো মাহিরাকে দিকে।
মাহিরা আর মুসকান মাত্রই মেহেদী দিতে বসেছে। কেয়া আর নুপুরের মেহেদী দেওয়া শেষ। কেয়া তাড়াতাড়ি মেহেদি দিয়ে আগেই ওঠে গিয়েছে। সে ছাদে মাহিরাকে একদমই সয্য করতে পারছে না।কেয়া ভাবছে কিভাবে মাহিরাকে ছাদ থেকে তাড়ানো যায়। কেয়ার মাথায় কিছু আসতেই কেয়া বাঁকা হাসে। এই মেয়েকে ছাদ থেকে তাড়ানোর ফন্দি এঁটে ফেলেছে সে।
মাহিরা মাত্র বসেছিলো মেহেদী দিতে। মাহিরা মেহেদী আর্টিস্টকে বলেছে তাকে যেনো সিম্পল মেহেদী ডিজাইন করে দেয়। মাহিরার বেশি গরজিয়াছ ডিজাইন একদমই পছন্দ না। মেহেদী আর্টিস্ট মাহিরার কথামতো যখনই মাহিরার হাতে মেহেদী পরাতে যাবে তখনই কেয়া হাজির হয়। সে মাহিরাকে জালানোর জন্য শুনিয়ে শুনিয়ে মেহেদী আর্টিস্টকে বলে, আপু আমার মেহেদীর মাঝখানে আমার ভালোবাসার মানুষের নাম লিখে দিন তো।
মাহিরা ভ্রু কুঁচকে তাকায় কেয়ার দিকে। মেহেদী আর্টিস্ট মেয়েটা কেয়ার হাত দেখে বলে, আপু আপনি তো বেশি গরজিয়াছ ভাবে মেহেদী ডিজাইন করে দিতে বলেছিলেন। আমি তো সেভাবেই আপনাকে মেহেদী দিয়ে দিয়েছি। আপনার হাতে তো নাম লেখার মতো কোনো জায়গা নেই আপু। কেয়া মেহেদী আর্টিস্টের কথা শুনে বিরক্ত হয়ে বলে, গরজিয়াছ বলেছি বলে কি আমার হাতে নাম লিখার মতো জায়গা রাখবেন না? এখন আমি আমার ভালোবাসার মানুষের নাম কিভাবে লিখবো আমার হাতে?
মাহিরা কেয়ার মুখে এমন কথা শুনে কিছুটা অবাক হয়। মেহেদী আর্টিস্ট এবার কেয়াকে বলে, আপু আপনি চাইলে আমি শুধু আপনার হাতে একটা লেটার লিখে দিতে পারবো। এছাড়া আপনার হাতে পুরো নাম লেখার মতো কোনো যায়গা নেই। কেয়া মেহেদী আর্টিস্টের কথা শুনে খুশি হয়। মেহেদী অটিস্টকে বলে, ঠিক আছে আপু তাতেই হবে। আপনি আমার হাতে তাড়াতাড়ি আমার ভালোবাসার মানুষের নামের প্রথম অক্ষর লিখে দিন।
মেহেদী আর্টিস্ট এবার মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, আপু আপনি একটু বসুন। আমি ওনার হাতে একটা লেটার লিখে আপনাকে মেহেদী পরিয়ে দিচ্ছি। বেশি সময় লাগবে না। মাহিরা কিছুই বললো না। সে চুপচাপ বসে রইলো শুধু। মেয়েটি এবার কেয়াকে জিজ্ঞেস করে, আপু আপনার হাতে কোন লেটারটা লিখবো?
কেয়া মাহিরার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হেসে মেহেদী আর্টিস্টকে বলে, আপু আমার ভালোবাসার মানুষের দুইটা নাম বুঝলেন? তার দুটো নামই "এ" দিয়ে শুরু হয়। তাই আপনি শুধু আমার হাতে "এ" লেটারটি লিখে দিন। মাহিরা চমকে উঠে কেয়ার মুখে এমন কথা শুনে। মাহিরা ভাবতে থাকে আয়ানের নামও তো দুইটা। তার দুইটা নামই "এ" দিয়ে শুরু হয়। মাহিরা এবার চোখ বড় বড় করে তাকায় কেয়ার দিকে। দেখতে পায় কেয়ার বাঁকা হাসি। কেয়া মাহিরাকে জ্বালানোর জন্য আবারো মেহেদী আর্টিস্টকে বলে, একটা সিক্রেট কি জানেন আপু? আমার ভালোবাসার মানুষ কিন্তু এই বাড়িতেই আছে।
মাহিরার বুকের ভেতরটা কেমন ছেঁত করে উঠে। সে টের পায় তার বুকের ভেতটা কিছু মোচড় দিয়ে ওঠেছে। কেয়ার মুখে এমন কথা শুনে মাহিরার কেমন জানি লাগছে। মাহিরা কেয়ার হাতের দিকে তাকায়। দেখতে পায় মেহেদী আর্টিস্ট কেয়ার হাতে "এ" লেটার লিখে দিচ্ছে। এটা দেখা মাত্র মাহিরার মনে তোলপাড় শুরু হয়। মাহিরা আর এক সেকেন্ডেও বসে না থেকে উঠে দাঁড়ায়। কাউকে কিছু না বলেই মাহিরা চলে যায় ছাদ থেকে।
মুসকান কিছুটা দুরে বসে মেহেদী দিচ্ছিলো। সে শুনতে পায়নি কেয়ার বলা কথাগুলো। মাহিরাকে উঠে যেতে দেখে মুসকান পেছন থেকে ডেকে বলে, আরে মাহিরা কোথায় যাচ্ছো? মেহেদী দিবে না?
আয়ান মাহিরার থেকে খানিকটা দুরে বসে ফোনে কিছু করছিলো। মুসকানের কথা শুনে আয়ান চোখ তুলে তাকায় মাহিরার দিকে। দেখতে পায় মাহিরা হনহনিয়ে ছাদ থেকে চলে যাচ্ছে। আয়ান তা দেখে ভ্রু কুঁচকায়। এই মেয়ের হটাৎ চলে গেলো কেনো আয়ান বুঝলো না।
কেয়া মাহিরাকে ছাদ থেকে চলে যেতে দেখে খুশি হয়। সে তো এটাই চাচ্ছিলো। এই মেয়ে যেনো ছাদ থেকে চলে যায়। আয়ান মাহিরাকে এভাবে চলে যেতে দেখে বুঝলো কিছু একটা হয়েছে। নাহলে এই মেয়ে মেহেদী না দিয়ে এভাবে চলে যেতো না। আয়ান বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। সে নিজের এবার মাহিরার পিছু পিছু ছাদ থেকে চলে যায়। আয়ানকে ছাদ থেকে চলে যেতে দেখা কেয়ার হাসি মুখটা আবারো কালো হয়ে যায়।
মাহিরা নিজের রুমে এসে দরজা আটকে দেয়। সে হয়তো কোনো ঘোরে আছে। তার কেনো জানি খুব বেশি খারাপ লাগছে। তার চোখে সামনে শুধু ভেসে উঠছে কেয়ার হাতে লেখা "এ" লেটার টা। আচ্ছা ওটা কি কেয়া আয়ানের নামের লেটার লিখেছে? পরক্ষণে মাহিরা ভাবে না। আয়ান তো এমন না। সে দেখেছে আয়ান তো কেয়াকে সয্যই করতে পারেনা। ভালোবাসা তো অনেক দুরের কথা। তখনই আবার মাহিরার কানে বাজতে থাকে কেয়ার বলা কথাগুলো।
কেয়ার ভালোবাসার মানুষের দুইটা নাম। দুইটা নামই "এ" দিয়ে শুরু হয়। কেয়ার ভালোবাসার মানুষ এই বাড়িতেই আছে। কিন্তু এই বাড়িতে তো আয়ান ছাড়া আর কারো দুইটা নাম "এ" দিয়ে শুরু হয় না। মাহিরার বুকের ভেতরটা আবারো মোচড় দিয়ে উঠলো। মাহিরা বালিশে মুখ গুজে উবুড় হয়ে শুয়ে পরেলো।
আয়ান মাহিরার পিছু পিছু মাহিরার দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। দরজায় হালকা নক করে বলে, হোয়াট হেপেন্ট মাহি? মাহিরার কোনো সাড়া শব্দ নেই। আয়ান আবারো বলে, ওপেন দ্যা ডোর মাহি। মাহিরা রুম থেকে এবারো কোনো সাড়া শব্দ এলো না। আয়ানের রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। সে জানে মাহিরা ইচ্ছা করে দরজা খুলছে না। মাহিরা তেড়ামি করছে ভাবতেই আয়ানের মাথায় আগুন ওঠে যায়। আয়ান এবার হুংকার দিয়ে উঠে,
- আমি ভেতরে ঢুকতে পারলে তোকে ওখানেই পুতে ফেলবো মাহি। ওপেন দ্যা ডোর..।
বলেই আয়ান রুমের দরজায় সজোড়ে এক লাঠি মারে। বাড়ির মুরব্বিরা সবাই নিচে আর ছোটোরা সবাই ছাদে মেহেদী অনুষ্ঠানে। তাই কেউ দেখতে পেলো না আয়ানের এমন পাগলামি। কেউ শুনতে পেলো না আয়ানের হুংকার। মাহিরার এখনো দরজা খুলছে না দেখে আয়ানের রাগে গা জ্বলে যাচ্ছে। আয়ান আর কিছু না বলে হনহনিয়ে চলে যায় তার রুমের দিকে।
এক মিনিটের মাথায় আয়ান ফিরে আসে। আয়ান মাহিরার রুমের চাবি দিয়ে মাহিরার রুমের লক খোলে। রাগে তার গা জলে যাচ্ছে। আজ সে মাহিরাকে কি করবে সে নিজেও জানেনা। আয়ান মাহিরার রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢুকা মাত্রই থমকে যায়।
মাহিরার পুরো রুম অন্ধকারে ছেয়ে আছে। আয়ান জানে মাহিরা অন্ধকার ভয় পায়। যে মেয়ে ভয়ে রাতে জিরো লাইট জালিয়ে ঘুমায় সে মেয়ে কেনো তার রুম এভাবে অন্ধকার করে রেখেছে? আয়ান ভেবে পায়না কিছু। কেনো হঠাৎ মাহিরা এমন করলো আয়ান জানেনা। আয়ান মাহিরার রুমের লাইট জালায়।
লাইট জালাতেই আয়ান আরেক দফা থমকে যায়। আয়ান বিছানার দিকে তাকাতেই দেখে মাহিরা উবুড় হয়ে বালিশে মুখ গুজে শুয়ে আছে। মাহিরার পিঠ ভর্তি চুল গুলো এলোমেলো হয়ে পরে আছে। আয়ান কিছুই বুঝলো না কি হয়েছে মাহিরার। সে আর এক সেকেন্ডেও না দাড়িয়ে ছুটে যায় মাহিরার বিছানার কাছে। মাহিরার পায়ের কাছে বসে আলতো হাতে মাহিরার কাধ ছুয়ে ডেকে ওঠে, মাহি..?
আয়ান ছোয়া মাত্র মাহিরা ঝড়ের বেগে আয়ানের বুকে এসে ঝাপিয়ে পরে। আয়ান কিছুই বুঝে উঠতে পারছে না এই মেয়ের কি হয়েছে। যে মেয়ে ভুলেও তার ধারে কাছে ঘেষে না। সে মেয়ে নিজ ইচ্ছায় তাকে জড়িয়ে ধরেছে? মাহিরা আয়ানকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে। আয়ানের বুক কাপছে মাহিরার ফোপানো কান্নায়। আয়ান বুঝলো না মাহিরার কান্নার রহস্য কি? কেনোই বা মাহিরা এভাবে কাদঁছে?
আয়ান এবার মাহিরার মাথায় এক হাত রেখে শান্ত গলায় বলে, ডোন্ট ক্রাই মাহি। মাহিরা থামলো না। আয়ানের কথায় মাহিরার কান্না যেনো আরো বেশি বেড়ে যায়। সে কেঁদে কেঁদে আয়ানের পাঞ্জাবি ভিজাচ্ছে। আয়ানের রাগ হয় এই মেয়ের উপর। এই মেয়ের কান্নায় যে আয়ানের বুকে ঝড় বয়ে যাচ্ছে। সেটা কি এই মেয়ে টের পাচ্ছে না? আয়ান মাহিরার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলে,
- স্টোপ ক্রাইং মাহি..।
মাহিরা এবারো শুনলো না আয়ানের কথা। সে একনাগাড়ে কেঁদেই যাচ্ছে। আয়ান এবার গম্ভীর গলায় শান্ত হুমকি দেয়, আর একফোঁটা চোখের পানি পরলে আমি কিন্তু তোমাকে পানিশমেন্ট দিবো মাহি। মাহিরা আয়ানের কথা না শুনে কেঁদেই যাচ্ছে। মাহিরা এখনো কান্না থামাচ্ছে না দেখে আয়ান মাহিরাকে টান মেরে নিজের থেকে ছাড়িয়ে নেয়। এক সেকেন্ডেও সময় নষ্ট না করে কোনো কথা ছাড়াই মাহিরার কাঁপতে থাকা ঠোঁট জোরা আঁকড়ে ধরে।
মাহিরার চোখ দিয়ে এখনো পানি পরছে। সে বোবা মানুষদের মতো শব্দ করতে থাকে। হাত দিয়ে ঠেলেঠুলে আয়ানকে তার থেকে সরাতে চায়। কিন্তু সে আয়ানের সাথে পেরে উঠে না। মাহিরা নিজেকে ছাড়াতেও পারছে না আয়ানের থেকে। কিছুক্ষণ যেতেই আয়ান মাহিরাকে ছেড়ে দেয়। মাহিরা জোরে জোরে শ্বাস নেয়। রেগে আয়ানের দিকে তেড়ে গিয়ে বলে,
- অসভ্য লোক। আমাকে আবারো কিস করেছে কেনো? তখন কিস করে শান্তি হয়নি? বেহায়া লোক একটা। আমি আপনার নামে মামলা ঠুকে দিবো। বজ্জাত লোক। বেরিয়ে যান আমার রুম থেকে।
আয়ান মাহিরার কথা গুলে শুনে মনে মনে হাসে। এই মেয়ে কি বলছে সে নিজেও জানেনা। মাহিরার কান্না থেমে গিয়েছে দেখে আয়ান বলে ওঠে,
- আমার কথা না শোনার জন্য এটা তোমার পানিশমেন্ট মাহি।
মাহিরা বলে ওঠে,
- আপনি পানিশমেন্ট ছাড়া আর কিছু দিতে পারেন না তাই না?
আয়ান মাহিরার কথায় দুষ্টু হেসে বলে,
- আর কি চাই তোমার? বলো সব এক্ষনি দিয়ে দিচ্ছি।
মাহিরা আর কিছু বললো না এই অসভ্য লোককে। বিরবির করলো, আস্ত একটা খাটাশ। আয়ান তা শুনে মৃদু ঠোঁট বাকায়। মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, ছাদ থেকে চলে আসলে কেনো? মাহিরা বলল, এমনি। আয়ান এবার শান্ত গলায় বলে, ছাদে চলো মেহেদী দিবে। মেহেদীর কথা শুনেই মাহিরার আবারো কেয়ার হাতে লেখা "এ" লেটারের কথা মনে পরে যায়।
মুহূর্তেই মাহিরার মুখটা মলিন হয়ে যায়। আয়ান তা দেখে বলে ওঠে, হোয়াট হেপেন্ট মাহি? কেউ কিছু বলেছে তোমায়? মাহিরা দুপাশে মাথা নাড়ায়। বলে, না আমি মেহেদী দিবো না। আপনি চলে যান।আয়ান ভ্রু কুঁচকায়। বলে, মেহেদী দিবেনা কেনো? আর্টিস্ট পছন্দ হয়নি? নতুন আর্টিস্ট নিয়ে আসবো? মাহিরা বলে ওঠে, না..পছন্দ হয়েছে। কিন্তু আমি এখন মেহেদী দিবো না। ঘুমাবো, আমার খুব ঘুম পেয়েছে।
আয়ান এবার তার হাতে থাকা ঘড়ির দিকে তাকায়। ঘড়ির কাঁটা রাত আটটার ঘরে। আয়ানের রাগে চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। এই মেয়ে একটু আগে ঘুম থেকে উঠেছে। এখন এই মেয়ে কিছুতেই ঘুমাতে পারে না। মাহিরা মিথ্যা বলছে ভাবতেই আয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। আয়ান রেগে দাঁত চিবিয়ে বলে,
- লাস্ট বার জিঙ্গেস করছি মাহি। কি হয়েছে সত্যিটা বল।
মাহিরা এবার হুট করে আয়ানকে প্রশ্ন করে বসে,
- আপনি কি কেয়াকে ভালোবাসেন?
মাহিরার মুখে এমন কথা শুনে আয়ানের আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করে। আয়ান হুংকার দিয়ে ওঠে,
- ইডিয়েট এখানে কেয়া আসলো কোথথেকে?
মাহিরা বলে ওঠে, আমি কিছু জানিনা। আপনি বলুন। আয়ান চোয়ান শক্ত করে বলে, না। মাহিরা এবার আয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,
- তাহলে আপনি কাকে ভালোবাসেন?
মাহিরা এমন কথায় ধুপ করে আয়ানের সমস্ত রাগ নিভে যায়। তার মনের ভেতর বয়ে যায় এক অজানা স্রোতের নদী। আয়ান এবার মাহিরার চোখে চোখ রেখে শীতল কণ্ঠে বলে,
- আই ডোন্ট নো মাহি..।
মাহিরার এবার রাগ হয় এই লোকের উপর। আয়ান কেয়াকে ভালো না বাসলে কেয়া কেনো বললো আয়ান তার ভালোবাসার মানুষ? আবার আয়ানের নামের লেটারও লিখেছে নিজের হাতে। শুধু শুধু তো আর লেখেনি? কিছু আছে তাদের ভেতরে তাই তো লিখেছে। মাহিরা এবার রেগে হুংকার দিয়ে ওঠে,
- অসভ্য লোক। আমাকে মিথ্যা বলছেন কেনো? আপনার সাথে কেয়ার কিছু না থাকলে কেয়া কেনো আপনার নাম ওর হাতে লিখতে যাবে? কেয়া কি আপনার মতো পাগল? যে শুধু শুধু আপনার নাম ওর হাতে লিখবে?
আয়ান হা হয়ে চেয়ে থাকে মাহিরার দিকে। মাহিরা কখনো তার সাথে এভাবে হুংকার দিয়ে কথা বলেনি। মাহিরার কথা শুনে আয়ানের শীতল মুখটা আবারো শক্ত হয়ে যায়। তার মন চাচ্ছে কেয়াকে এক্ষনি মেহেদীর ভেতর চুবিয়ে মারতে। আয়ান আর কিছু না বলে উঠে দাঁড়ায়। কোনো কথা ছাড়াই বের হয়ে যায় মাহিরার রুম থেকে।
মুসকান মেহেদী আর্টিস্টের কাছে থেকে দু'হাত ভরে মেহেদী পরেছে। মেহেদী পরা শেষে মুসকান ছাদের চারোপাশে চোখ ঘুরিয়ে কাউকে খুঁজে। ছাদের এক কোনায় অর্নবকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মুসকান খুশি হয়ে সেদিকে ছুটে যায়। অর্নবের কাছে গিয়ে তার দু'হাত অর্নবের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
- অর্নব ভাই..? হাতে মেহেদি দিয়েছি। দেখো তো ডিজাইন ঠিক আছে কিনা?
অর্নব একঝলক মুসকানের দিকে তাকিয়ে পরপর মুসকানের হাতের দিকে তাকায়। মুসকানের হাতের দিকে তাকিয়েই প্রথমেই চোখে পরে "এ" লিখা লেটারের দিকে। মুসকানের হাতে "এ" লিখা দেখে অর্নবের বুকটা ধুক করে উঠে। সে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে মুসকানের হাতের দিকে। পরপর চোখ সরিয়ে মুসকানের দিকে তাকিয়ে বলে, হ্যা ডিজিটাল ঠিক আছে। এখন যা।
মুসকান আবারো তার হাত দেখিয়ে বলে, ভালো করে দেখো না অর্নব ভাই। আমার মনে হচ্ছে মেহেদী আর্টিস্ট আমাকে সুন্দর করে মেহেদী পরিয়ে দেয়নি। অর্নব বুঝতে পারলো মুসকান ঘুড়ে ফিরে তাকে হাতের "এ" লেটারটা দেখাতে চাচ্ছে। অর্নব মনে মনে হাসলো। সে তো আগেই দেখে ফেলেছে সেটা। অর্নব মুসকানকে কিছু বুঝতে না দিয়ে বলে,
- মেহেদী অর্টিস্ট সুন্দর করেই তোকে মেহেদী পরিয়ে দিয়েছে। তোর চোখ সুন্দর না তাই তুই সৌন্দর্যটা দেখতে পাচ্ছিস না। আগে গিয়ে নিজের চোখ সুন্দর কর, যা।
অর্নবের মুখে এমন কথা শুনে মুসকানের খুব রাগ হলো। তার হাতটা তো অর্নব ভাই ঠিকমতো দেখলোই না। মুসকান এবার রেগে গিয়ে অর্নবকে বলে, আমার চোখ যথেষ্ট সুন্দর আছে অর্নব ভাই। তোমার চোখ সুন্দর না। তাই তো তুমি কিছু দেখতে পাও না। আগে গিয়ে নিজের চোখ ঠিক করো, যাও। বলেই মুসকান হনহনিয়ে চলে যায়। অর্নব তা দেখে মিটিমিটি হাসে।
আয়ান ছাদে এসে অনিক কে ডেকে নিয়ে আসে। অনিক সেদিনের পর থেকে মাহিরার আশেপাশেও ঘেষেনি। আয়ানের ডাকে অনিক কিছুটা ভয়ে আছে। সে কি করেছে সে নিজেও জানেনা। অনিক ভয়ে ভয়ে আয়ানের সামনে এসে দাড়ায়। আয়ান যে মাথা ভাঙ্গা অনিক সেটা ভালো করেই জানে। তাকে হোস্টেলে পাঠানের পেছনে আয়ানের হাত আছে। নাহলে এতো বড় বাড়ির ছেলে কেনো হোস্টেলে থাকতে যাবে?
অনিক আয়ানের সামনে এসে বলে, আমি কিছু করিনি বিশ্বাস করো ভাইয়া। আয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকায় অনিকের দিকে। বলে, আমি কখন বললাম তুই কিছু করেছিস? আয়ানের কথায় অনিক কিছুটা অবাক হয়ে বলে, তাহলে আমাকে ডেকে আনলে যে? আয়ান এবার গম্ভীর গলায় বলে,
- কেয়াকে নিয়ে নিচে আয়। ফাস্ট..।
বলেই আয়ান হনহনিয়ে চলে যায় ছাদ থেকে। অনিক তব্দা খেয়ে চেয়ে থাকে আয়ানের যাওয়ার পানে। কেয়া নুপুরের সাথে বসে ছিলো। এমন সময় অনিক এসে হাজির হয়। কেয়াকে বলে,
- কেয়া আয়ান ভাই তোকে ডাকছে।
আয়ানের কথা শোনা মাত্র কেয়ার চোখ মুখে খুশির ঝিলিক দেখা যায়। তার আয়ান ভাই তাকে ডাকছে? কেয়া খুশি হয়ে বলে, সত্যি অনিক ভাই? আয়ান ভাই আমাকে ডাকছে? অনিক মুখ কালো করে বলে,হ্যা। কেয়া ছাদের ছাদের আশেপাশে চোখ ঘুড়িয়ে বলে, কোথায় আয়ান ভাই। অনিক মুখ গোমড়া করে বলে, ভাইয়া নিচে। তাড়াতাড়ি তোকে যেতে বলেছে। কেয়া খুশি হয়ে অনিকের পিছু পিছু চলে যায়।
________
- বস..?
কালো অন্ধকারে ছাদে খাটের ওপর শুয়ে আকাশের পানে তাকিয়ে আছে মানুষটি। তুহিনের কথা কানে আসতেই মানুষটি তুহিনের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, খবর কি? তুহিন খাটের পাশে এসে বলে,
- বস আরিয়ান আয়ান শিকদারের বাড়িতে আজ বিয়ের অনুষ্ঠান হচ্ছে। আমরা কি হামলা করবো ?
মানুষটি আকাশের পানে তাকিয়ে বিদ্ঘুটে এক হাসি দেয়। তুহিনকে বলে,
- বিয়েটা কি আয়ানের?
তুহিন মুখ কালো করে বলে,
- না বস। তার চাচাতো বোনের বিয়ে।
খাটে বসা মানুষটির মুখ মুহূর্তেই কালো হয়ে যায়। মানুষটি তুহিনের দিকে তাকিয়ে হুংকার দিয়ে বলে,
- কুত্তারবাচ্চা, তাহলে হামলা করে কি লাভ?
তুহিন মাথা নিচু করে অপরাধীর নেয় বলে,
- সরি বস..।
অনিক কেয়াকে নিয়ে নিচে এসেছে। চারপাশে চোখ ঘুড়িয়ে সে আয়ানকে খুঁজতে থাকে। আয়ানকে দেখা যাচ্ছে না কোথাও। কেয়া আশেপাশে তাকিয়ে খুঁজছে আয়ানকে। দেখতে না পেয়ে কেয়া অনিকের দিকে তাকিয়ে বলে, কোথায় আয়ান ভাই? অনিক নিজেও চারোপাশে চোখ বুলিয়ে বলে, আমিও তো দেখছি না। কেয়া এবার রেগে অনিককে বলে, তুমি কি আমাকে মিথ্যা কথা বলছো অনিক ভাই? অনিক কেয়ার কথা শুনে বলে ওঠে, আমি কেনো তোকে মিথ্যা বলতে যাবো কেয়া? আয়ান ভাই নিজে আমাকে বলেছে তোকে যেনো নিচে নিয়ে আসি।
কেয়া আবারো রেগে অনিক কে কিছু বলতে যাবে তার আগেই আয়ান সেখানে হাজির হয়। কেয়া আয়ানকে দেখে খুশি হয়ে বলে, আয়ান ভাই? আমাকে তুমি ডেকেছো? আয়ান কেয়াকে কিছু না বলে কেয়ার পাশে থাকা অনিকের হাতে পাঁচটা মেহেদী ধরিয়ে দেয়। অনিক বুঝলো না আয়ান হঠাৎ তার হাতে মেহেদি দিলো কেনো? আয়ান এবার অনিকের দিকে একটা কেঁচি বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
- সবকয়টা মেহেদী কেঁটে কেয়ার হাতে লাগানো শুরু কর। সময় পাঁচ মিনিট। এর এক সেকেন্ড দেরি হলে তোর জন্য পানিশমেন্ট রেডি আছে।
আয়ানের মুখে এমন কথা শুনে কেয়া আর অনিক দুজনের চমকে উঠে তাকায় আয়ানের দিকে।কেয়া অসহায় গলায় বলে ওঠে, আয়ান ভাই? আমি কি করেছি? আমার হাতে মেহেদী কেনো লাগাতে চাইছো তুমি? আয়ান কেয়ার কথার কোনো জবাব দিলো না। অনিকের দিকে তাকিয়ে বলল,
- যতো দেরি করবি তোর পানিশমেন্টের বোঝা তত ভারি হতে থাকবে। এন্ড আমার পানিশমেন্ট যে কতোটা ভয়ংকর হতে পারে?সেটা হয়তো তোকে নতুন করে বুঝিয়ে বলতে হবে না?
আয়ানের এমন কথা শুনে অনিক ঝড়ের বেগে আয়ানের থেকে কেঁচিটা নিয়ে নেয়। কেঁচি হাতে নিয়ে অনিক একটার পর একটা মেহেদী কাটতে শুরু করে। কেয়া তা দেখে ঝড়ঝড় করে কেঁদে দেয়। আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, আয়ান ভাই প্লিজ তুমি এমন টা করো না। আমার হাতটা নষ্ট হয়ে যাবে। প্লিজ আয়ান ভাই। আমার হাতটা তুমি নষ্ট করো না।
আয়ানের থেকে কোনো জবাব পাওয়া গেলো না।অনিক মেহেদী গুলো কেঁটে কেয়াকে বলে, হাত দে কেয়া। কেয়া তার হাত দুটো পেঁছনে লুকিয়ে রেখেছে। সে অনিককে তার হাতে মেহেদি লাগাতে দিবেনা। কেয়া অনিকের দিকে তাকিয়ে কেঁদে কেঁদে বলে, অনিক ভাই তুমিও আমার সাথে এমনটা করছো? অনিক দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে, আমার হাতে সময় নেই কেয়া। হাত দে। কেয়া অনিকের দিকে তাকিয়ে কেঁদে কেঁদে বলে, অনিক ভাই তুমি অত্যন্ত এমন টা করো না। প্লিজ অনিক ভাই। আমার হাত টা নষ্ট হয়ে যাবে।
আয়ান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সব নাটক দেখছে। আয়ানের ইচ্ছে করছে অনিককে কষিয়ে এক থাপ্পড় দিতে। আয়ান এবার গম্ভীর গলায় বলে ওঠে, তিন মিনিট..। অনিক তা শুনে চমকে উঠে তাকায় আয়ানের দিকে। অনিক তাড়াতাড়ি কেয়ার হাত দুটো টেনে সামনে নিয়ে আসে। কেয়া কেঁদে কেঁদে তার হাত টানতে টানতে বলে, প্লিজ অনিক ভাই তুমি এমনটা করোনা। অনিক কেয়ার হাত সামনে এনে দেখে কেয়ার হাতে মেহেদি দিয়ে "এ" লেখা। অনিক এবার বুঝতে পারে আয়ান কেনো কেয়ার সাথে এমনটা করছে।
অনিক কেয়াকে আগে থেকেই পছন্দ করতো। কিন্তু সে জানতো কেয়া আয়ানকে পছন্দ করে। তাই সে আর কেয়ার দিকে আগায়নি। কোথায় আয়ান আর কোথায় সে? তার তো কোনো যোগ্যতাই নেই কেয়াকে ভালোবাসার। কেয়া কেনোই বা আয়ানকে ছেড়ে তাকে পছন্দ করতে যাবে? অনিকের ভাবনার মাঝে আবারো কারো গম্ভীর কন্ঠস্বর ভেসে আসে।
- দুই মিনিট।
অনিক আর সময় নষ্ট না করে ঝড়ের বেগে কেয়ার হাতে মেহেদী মাখতে শুধু করে। কেয়া অঝোরে কাদঁতে থাকে। কেঁদে কেঁদে আয়ানকে বলতে থাকে, আয়ান ভাই আমি তোমার পায়ে পড়ি। প্লিজ তুমি অনিক ভাইকে থামাও। আমার হাত টা এভাবে নষ্ট করো না। প্লিজ আয়ান ভাই। আমি মানুষেকে মুখ দেখাতে পারবো না।আয়ানের কাছ থেকে এবারও কোনো জবাব এলো না। কেয়া অঝোরে কেঁদে যাচ্ছে।
দুই মিনিট পর অনিক কেয়ার হাত ছেড়ে দেয়। পাঁচটা মেহেদীর সম্পূর্ণ টা অনিক কেয়ার দু হাতে মেখে দিয়েছে। অনিকের মেহেদী দেওয়া শেষ হতেই আয়ান বলে ওঠে,
- গুড..। তোর হোস্টেলে থাকা এখন থেকে কেন্সেল।
অনিক একথা শোনা মাত্র খুশি হয়ে আয়ানের দিকে তাকায়। আয়ানকে বলে, সত্যি বলছো ভাইয়া? আয়ান গম্ভীর গলায় বলে, হ্যা। কিন্ত এখন তোকে এখান দুই ঘন্টা দাঁড়িয়ে থাকতে হবে। অনিক বলে ওঠে, কেনো ভাইয়া? আয়ান গম্ভীর গলায় বলে,
- তুই এখানে দাড়িয়ে থেকে কেয়াকে পাহাড়া দিবি। কেয়া যদি দুই ঘন্টার এক সেকেন্ড আগেও হাত ধুয়ে ফেলে? তাহলে তোকে সারাজীবনের জন্য হোস্টেলে পাঠানোর ব্যবস্থা করবো আমি।
আয়ানের কথায় অনিকের হাসি মুখটা আবারো কালো হয়ে যায়। অনিক আয়ানের দিকে তাকিয়ে আর কিছু বলার সাহস পায় না। আয়ান যেতে যেতে আবারো বলে,
- আমার সাথে চালাকি করার চেষ্টা করিস না। আদারওয়াইজ দুইটাকেই এমন পানিশমেন্ট দিবো? যে বিয়ে বাড়িতে মুখ দেখানোর মতোও যায়গা পাবি না।
কথাটা বলেই আয়ান হনহনিয়ে চলে যায়। অনিক তাকিয়ে থাকে আয়ানের যাওয়ার পানে। কেয়া অঝোরে কেঁদেই যাচ্ছে। অনিক এবার কেয়ার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, তুই কেনো আয়ান ভাইয়ের নাম নিজের হাতে লিখতে গেলি? কেয়া তার হাতের দিকে তাকিয়ে আরো জোরে জোরে কেঁদে উঠে। কি বিশ্রি অবস্থা তার হাতের। কেয়া কেঁদে কেঁদে অনিককে বলে,
- আমি আয়ান ভাইকে ভালোবাসি।
কেয়ার মুখ থেকে ভালোবাসি কথাটা শুনে অনিকের বুকের ভেতরটা কেমন জানি করে উঠল। পছন্দের মানুষের মুখে অন্য কারো জন্য ভালোবাসার কথাটা শুনলে ঠিক কেমন অনুভূতি হয় অনিকের জানা নেই। অনিক এবার কেয়াকে বলে, তুই তো জানিস আয়ান ভাই কেমন। তারপর কেনো তার নাম নিজের হাতে লিখতে গেলি? কেয়া কেঁদে কেঁদে বলে, আমি তো শুধু "এ" লিখেছি। পুরো নাম তো আর লিখিনি। অনিক এবার কিছুটা হেসে বলে,
- শুধু "এ" লিখেছিস তাতেই এই হাল করলো? পুরো নাম লেখার দুঃসাহস দেখালে কি করতো ভেবে দেখেছিস?
কেয়া কিছু না বলে কেঁদেই যাচ্ছে। অনিক আবারো বলে, নেক্সট টাইম আর এমন দুঃসাহস দেখাস না কেয়া। কেয়া এবার কেঁদে কেঁদে অনিক কে বলে, অনিক ভাই? আমি প্লিজ এখন হাতটা ধুয়ে ফেলি? অনিক ফটাফট বলে ওঠে, মাথা খারাপ নাকি? আমি কতোদিন পর বাড়িতে থাকার সুযোগ পেয়েছি। এটা হাতছাড়া করা যাবেনা। তুই চুপচাপ এখানে দাঁড়িয়ে থাক। কেয়া আরো জোরে জোরে কাঁদছে। অনিক তা দেখে বলে, তুই এখন হাত ধুয়ে ফেললে তোর সাথে সাথে আয়ান ভাই আমাকেও মেহেদীতে চুবিয়ে মারবে। দুই ঘন্টা পর গিয়ে হাত ধুয়ে ফেলিস। এখন এখানে দাঁড়িয়ে থাক।
কেয়া কেঁদে কেঁদে বলে, অনিক ভাই এটা ইনস্ট্যান্ট মেহেদী। দুই ঘন্টা হাতে রাখলে আমার হাত দেখতে একদম বিশ্রি লাগবে। আমি এই হাত নিয়ে বিয়ে বাড়িতে কিভাবে ঘুরবো? অনিক বলে ওঠে, কিছু করার নেই। ভুল করেছিস তাই শাস্তি পাচ্ছিস। এখানে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাক। এখন তো শুধু হাত দেখাতে পারবি না কাউকে। এমন যেনো না হয় বিয়ে বাড়িতে তোর মুখও দেখাতে পারছিস না কাউকে। কেয়া আর কিছু বললো না। নিঃশব্দে কাঁদলো শুধু।
মাহিরা তার রুমে পায়চারি করছে। আয়ান কোনো কথা ছাড়াই তখন বেরিয়ে গিয়েছে কেনো সেটাই ভাবছে সে। আয়ানের সাথে সে উচু টোনে কথা বলে ফেলেছে। তার নিজেরই এখন নিজের উপর রাগ লাগছে। ওই লোক তো এমনিতেই পাগল, মাথা ভাঙ্গা। ওই লোক এখন মাহিরার সাথে কি করবে কে জানে? মাহিরা রুম থেকে বেরোতেও পারছে না। আয়ান রুম বাইরে থেকে লক করে দিয়ে গিয়েছে। মাহিরা যে পালাবে তারও কোনো সুযোগ নেই। মাহিরার টেনশনে নিজের কাছে নিজেরই এখন পাগল পাগল লাগছে।
হঠাৎ রুমের দরজা খোলার শব্দে মাহিরা তাকায় দরজার দিকে। আয়ান এসেছে। আয়ানকে দেখা মাত্রই মাহিরার চোখ বড় বড় হয়ে যায়। আয়ান তার সাথে কি করবে সেটাই ভাবছে মাহিরা। আয়ান কিছু না বলে মাহিরার সামনে এসে দাঁড়ায়। কোনো কথা ছাড়াই মাহিরাকে হাত ধরে বিছানায় বসিয়ে দেয়। মাহিরাও কিছুই বললো না। এমনিতেই সে ভুল করেছে। তার উপরে এখন কিছু বললে এই লোক যদি রেগে যায়?
আয়ান মাহিরাকে বিছানায় বসিয়ে সে নিজেও মাহিরার পাশে বসে। মাহিরার দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে, হাত দে। মাহিরা কোনো কথা ছাড়াই তার ডান হাত বাড়িয়ে দেয়। আয়ান মাহিরা ডান হাত দেখে ধমক দিয়ে বলে,
- ইডিয়েট, বাম হাত দে..।
হঠাৎ ধমকে মাহিরা কিছুটা কেঁপে ওঠে। এই লোকের সমস্যা কি মাহিরা বোঝা না। ডান হাত দিলে বলবে বাম হাত দে। আবার বাম হাত হাত দিলে বলবে ডান হাত দে। মাহিরা এবার তার বাম হাত এগিয়ে দেয়। আয়ান মাহিরার হাত ধরে তার পকেট থেকে ফোন বের করে। মাহিরা তা দেখে ভ্রু কুঁচকায়। এই লোক তার হাত ধরে ফোন বের করেছে কেনো মাহিরা বুঝলো না।
আয়ান কানে ব্লুটুথ গুজে কিছুক্ষণ যাবত ফোনে কিছু করছে। সে মাহিরার হাত এখনো ছাড়েনি। আয়ান মাহিরার হাত ধরেই বসে আছে। মাহিরা আর চুপ থাকতে পারলো না। মাহিরা এবার বলে ওঠে, কি করছেন আপনি? আয়ান ফোন থেকে চোখ সরিয়ে মাহিরার দিকে তাকায়। পরপর মাহিরাকে কিছু না বলে সে তার পাঞ্জাবির পকেট থেকে দুটো অর্গানিক মেহেদী বের করে। মাহিরা তা দেখে হা হয়ে চেয়ে থাকে আয়ানের দিকে। এই লোকের পকেটে মেহেদী থাকে? মাহিরা বলে ওঠে,
- আপনি কি মেহেদী চুরি করেছেন?
আয়ানের মেজাজ খারাপ হয়। সে মাহিরাকে ধমক দিয়ে বলে,
- ইডিয়েট। আমাকে দেখে কি তোর চোর মনে হয়?
মাহিরা দু পাশে মাথা নাড়িয়ে বলে,
- না, কিন্তু আপনি মেহেদী পকেটে নিয়ে ঘুরছেন কেনো?
আয়ান মেহেদী আর্টিস্টের কাছ থেকে তখন পাঁচটা ইনস্ট্যান্ট মেহেদী আর দুটো অর্গানিক মেহেদী এনেছিলো। পাঁচটা মেহেদী সে কেয়ার হাতে লাগিয়ে দিয়েছে। আর দুটো মেহেদী তার পকেটেই ছিলো। আয়ান মাহিরাকে কিছু না বলে একটা মেহেদী হাতে নিয়ে মাহিরার হাতে পরিয়ে দিতে থাকে। মাহিরা তা দেখে চেঁচিয়ে ওঠে,
- আল্লাহ গো..। আপনি আমার হাতে মেহেদী পরিয়ে দিচ্ছেন কেনো?
মাহিরা নড়ছে দেখে আয়ানের রাগ লাগে। আয়ান ধমক দিয়ে বলে,
- ইডিয়েট, এক থাপ্পড়ে তোর সব দাঁত ফেলে দিবো। চুপচাপ বোস এখানে।
মাহিরা আয়ানের ধমক খেয়ে আর নড়লো না। শুধু বিরবির করলো, এই লোকের আমার এতো সুন্দর নামটা কাটাছেঁড়া করে শান্তি হয়নি। এখন আবার এসেছে মেহেদী দিয়ে আমার হাতটা কাটাছেঁড়া করতে। আল্লাহ বাঁচাও..। মাহিরার কথা শুনে আয়ান মুচকি হাসে। মাহিরার দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হেসে বলে,
- তোকে এখনো অনেক কাটাছেঁড়া করা বাকি আছে মাহি..।
মাহিরা আয়ানের মুখে এমন কথা শুনে চোখ বড় বড় করে তাকায় আয়ানের দিকে। এই লোক আসল একটা খাটাশ। মাহিরা আর কিছু বললো না এই অসভ্য লোককে। মাহিরাকে চুপ হয়ে যেতে দেখে আয়ান মনে মনে হাসে। সে তো এটাই চাচ্ছিলো। আয়ান আর কিছু না বলে মাহিরার হাতে মেহেদি পরিয়ে দিতে থাকে।
চলবে..