ফন্ট সাইজ:
থিম:
এ দেখা শেষ না হোক

১৭তম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া আক্তার সাথী

#এ_দেখা_শেষ_না_হোক #পর্ব - ( ১৭)

#writer_sumaiya_akter_sathi 
--
টানা চার ঘন্টা আয়ান বসে বসে মাহিরার হাতে মেহেদি পরিয়ে দিয়েছে। আয়ান এই ফাস্ট টাইম হাতে মেহেদী নিয়েছে। ছোট বেলায় আঁকা আঁকি তে আয়ান খুব ভালো ছিলো। যদিও বড় হওয়ার সাথে সাথে সেটা বিলিন হয়ে গিয়েছে। তারপরও সে ইউটিউবের ডিজাইন দেখে মাহিরার হাতে মেহেদী পরিয়ে দিয়েছে। আস্তে ধীরে মেহেদী পরানোর জন্য হাতের এক পাশে মেহেদী দিতে আয়ানের সময় লেগেছে এক ঘন্টা। সে চার ঘন্টা বসে বসে মাহিরার দু'হাতের এপাশ ওপাশ চারপাশে মেহেদী দিয়ে দিয়েছে।
আয়ান এর আগে কখনো কাউকে মেহেদী পরায়নি। না কখনো মেহেদী ছুয়েও দেখেছে। কিন্তু এই মেয়ের জন্য তার লাইফের সব রুলস এক এক করে ভাঙ্গতে হচ্ছে। আয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে মাহিরার দিকে তাকায়। মাহিরা খাটের সাথে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে আছে। আয়ান যখন মেহেদী দিচ্ছিলো তখন মাহিরা বসে বসে এক ঘন্টা বকবক করেছে। তারপর যখন দেখলো আয়ানের তার দু'হাতে মেহেদী না দিয়ে ছাড়বে না। তখন সে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে খাটে হেলান দিয়ে বসে ছিলো। কখন ঘুমিয়ে পরেছে সে নিজেও জানেনা।
আয়ান তাকিয়ে দেখলো মাহিরার ঘুমন্ত মুখখানা। আয়ানের মনে পরে যায় সন্ধ্যায় ঘটে যাওয়া ঘটনার কথা। আজ মাহিরা নিজ থেকে আয়ানকে ঝেরা করেছে। আয়ানের কাছে কৈফিয়ত চেয়েছে।আয়ানের কাছে ভালোবাসার কথা জানতে চেয়েছে। নিজের ইচ্ছায় সজ্ঞানে আয়ানকে জরিয়ে ধরেছে। কেয়ার হাতে আয়ানের নাম দেখে জেলাস ফিল করেছে। আবার কান্না করে বালিশও ভিজিয়েছে। 
আয়ানের এগুলো ভাবতের বুকের ভেতরটা কেমন প্রশান্তিতে ভরে উঠে। আয়ান মাহিরার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে মাহিরার হাতের দিকে তাকায়। দুইহাতের তালুতে আয়ান আগে থেকেই কিছুটা যায়গা খালি রেখে দিয়েছিলো। ভেবেছিলো সম্পূর্ন হাতে মেহেদী দেওয়া শেষে তারপর এই খালি জায়গায় হাতের তালুতে সে লেখালেখি করবে। 
আয়ান আবারো মেহেদী হাতে তুলে নেয়। মাহিরার এক হাত নিয়ে হাতের তালুতে মেহেদী দিয়ে তার নাম লিখে দেয় "আয়ান"। সে তার নামটা ইংরেজিতে লেখেনি বাংলায় লিখেছে। যেনো মাহিরার হাতে তার নাম পরতে কারো কোনো অসুবিধা না হয়। ছোট থেকে বড়ো সবাই যেনো এই নাম পরতে পারে।
আয়ান মাহিরার এক হাতে তার নাম লিখে মাহিরার অন্য হাতেও মেহেদী দিয়ে তার আরেকটা নাম লিখে দেয় "আরিয়ান"। মাহিরার দু'হাতে সে তার দুইটা নাম লিখে দিয়েছে। একটাতে লিখে দিয়েছে "আয়ান" অন্যটাতে লিখে দিয়েছে "আরিয়ান"। আয়ানের নাম লিখা শেষ হলে সে মাহিরার হাতের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে। মাহিরার হাতে তার মেহেদী দেয়া নামদুটো কেমন ঝলঝল করছে। মনে হচ্ছে এই নামদুটো শুধু মাহিরার হাতেই মানায়। আয়ান পকেট থেকে তার ফোন বের করে ফটাফট মাহিরার হাতের কতো গুলো ছবি তুলে নেয়। 
পরপর মাহিরার হাত দুটো বালিশের উপর সাবধানে রেখে দেয়। মাহিরার উল্টো পিঠে আগে মেহেদী দেওয়ার কারনে সেগুলো আগেই শুকিয়ে গিয়েছে। এখন শুধু তালুর মেহেদী শুকানো বাকি। আয়ান মাহিরার হাত দুটো বালিশের উপর রেখে মাহিরার দুপাশে আরো দুটো বালিশ দিয়ে দেয়। মাহিরা এখনো খায়নি। বিয়ে বাড়ি তাই কারো খেয়াল নেই সেদিকে। আয়ান এবার উঠে চলে যায় মাহিরার রুম থেকে।
আয়ান মাহিরার রুম থেকে বেরিয়ে নিজের রুমের দিকে যাচ্ছে। এমন সময় পেছন থেকে কেই ডেকে ওঠে, মি.আয়ান..? আয়ান ইশানের ডাক শুনে ঘুরে তাকায় ইশানের দিকে। মেহমান মানুষ হয়তো কিছু প্রয়োজন তাই আয়ান ইশানকে জিজ্ঞেস করে, কিছু বলবেন? ইশান হেসে আয়ানের দিকে এগিয়ে এসে বলে, জ্বী। মাহিরার রুম টা কোন দিকে? আমাকে একটু দেখিয়ে দিন তো। ইশান এতো রাতে মাহিরাকে খোজার বিষয় টা আয়ানের ভালো লাগলো না। আয়ান ইশানের দিকে তাকিয়ে বলে,
- হোয়াট ডু নিড মাহি..?
ইশান ভ্রু কুঁচকায়। আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে, 
- হু ইজ মাহি? 
আয়ান বলে ওঠে,
- ইওর কাজিন সিস্টার। 
ইশান কিছুটা অবাক হয়। আয়ান মাহিরাকে মাহি ডাকছে কেনো ইশান বুঝলো না। ইশান বলে ওঠে, 
- হার নেম ইজ মাহিরা, নট মাহি।
- অনলি মাহি ফর মি।
কথাটা বলেই আয়ান ইশানের দিকে তাকিয়ে এক বাঁকা হাসি দেয়। তা দেখে ইশান আরো বেশি অবাক হয়। ইশান আয়ানকে আর কিছু না বলে আবারো জিজ্ঞেস করে, মাহিরার রুম কোনদিকে? ইশান আবারো মাহিরার নাম নেওয়ায় আয়ানের মেজাজ খারাপ হয়। ইচ্ছে করে সিটিয়ে ইশানকে এক চড় লাগাতে। শুধু মাত্র গেস্ট বলে সে ইশানকে ছেড়ে দেয়। নাহলে মাহিরার রুম খোজার জন্য এক্ষনি সে ইশানকে দু'চারটা লাগিয়ে দিতো। আয়ানের রাগে চোয়াল শক্ত করে বলে, 
- শি ইজ স্লিপিং নাউ, ডোন্ট ডিস্টার্ব হার।
বলেই আয়ান চলে যেতে নিলে ইশান বলে ওঠে, মাহিরা তো রাতে এখনো খাইনি। না খেয়েই ঘুমিয়ে পরেছে? আয়ানের হাত মুষ্টিবদ্ধ হয়ে যায়। চোয়াল শক্ত করে দাড়িয়ে আছে আয়ান। সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণে করতে চাইছে। কিন্তু মাহিরার প্রতি ইশানের এতো খেয়াল আয়ান মেনে নিতে পারছে না। আয়ান চোয়াল শক্ত দাঁতে দাঁত চেপে বলে, 
- মাহি হাতে মেহেদি দিয়েছে। ও এখন খাবে না। আপনি এখান থেকে চলে যান।
ইশান হেসে বলে ওঠে, সমস্যা নেই মি.আয়ান। হাতে মেহেদি থাকলে আমি মাহিরাকে খাইয়ে দিবো। এর আগেও মাহিরার হাতে মেহেদী থাকায় আমি ওকে খাইয়ে দিয়েছি। আপনি শুধু মাহিরার রুমটা আমাকে দেখিয়ে দিন। ইশানের কথা আয়ানের গায়ে আগুনে ঘি ঢালার মতো কাজ করলো। আয়ান হুট করে এসে ইশানের কলার চেপে ধরে। চোয়াল শক্ত করে কিরবির করে বলে,
- ডোন্ট ক্রস ইওর লিমিট ইশান। আমি ভুলে যাবো তুই এ বাড়ির গেস্ট। 
বলেই আয়ান ঝাড়া মেরে ইশানের কলার ছেড়ে হনহনিয়ে তার রুমে চলে যায়। ইশান হা হয়ে চেয়ে থাকে আয়ানের যাওয়ার পানে। ইশান বুঝলো না এই লোকের সমস্যা কি? ইশান আর কিছু না বলে ঘুরে ফিরে মাহিরার রুম খুঁজতে থাকে। 
আয়ান তার রুমে অনবরত পায়চারি করছে। আয়ান মাহিরাকে মেহেদী দেওয়ার সময় মাহিরা ঘুমের মাজে নড়াচড়া করেছে। আয়ানের পাঞ্জাবিতে তখন কয়েক যায়গায় মেহেদী লেগে গিয়েছে। আয়ান তাই তার রুমে এসে পাঞ্জাবি চেঞ্জ করতে চেয়েছিলো। কিন্তু তার আগেই ইশানের সাথে তার দেখা হয়ে যায়। ইশানের কথা ভাবতেই আয়ান রাগে তার হাতের কাছে থাকা ফুলদানিটি সজোড়ে দেয়ালে ছুরে মারে। ফুলদানিটা সঙ্গে সঙ্গে ভেঙ্গে গুঁড়োগুড়ো হয়ে ফ্লোরে পরে রয়। আয়ান গজগজ করতে করতে তার রুম থেকে বেরিয়ে যায়। 
বাড়ির ছোটদের জন্য ছাদের একপাশে বুফে স্টাইলে খাবারের আয়োজন করা হয়েছে। আর মুরুব্বিদের জন্য নিচে খাবারের আয়োজন করা হলো। সবাই ছাদে বসে যে যার যার মতো খাবার নিয়ে খাচ্ছে। অর্নব চেয়ারে বসে আছে। সে এখনো খায়নি। কারো জন্য অপেক্ষা করছে সে। আয়ান ছাদে আসে। আয়ানকে দেখা মাত্র অর্নব ছুটে চলে যায় আয়ানের কাছে। 
আয়ান হাতে প্লেট নিয়ে খাবার তুলছে। অর্নব তা দেখে বলে ওঠে, যাক বাবা? আমি তোমার জন্য অপেক্ষা করছি আর তুমি এসেই নিজের জন্য খাবার নিতে শুরু করলে? আমাকে একবারও ডাকলে না? আয়ান খাবার নিতে নিতে বলে, এটা আমার না। 
অর্নব ভ্রু কুঁচকায়। বলে, তোমার না? তাহলে খাবার নিচ্ছো কার জন্য? আয়ানের খাবার নেওয়া শেষ। সে বেছে বেছে মাহিরার পছন্দ মতো খাবার নিয়েছে। আয়ান ঘুরে অর্নবের দিকে তাকিয়ে ছোট করে বলে, মাহি..। বলেই আয়ান খাবার হাতে নিয়ে ছাদ থেকে চলে যায়। অর্নব পেছন থেকে হা হয়ে চেয়ে থাকে আয়ানের দিকে। 
আয়ান মাহিরার রুমের লক খুলে ভেতরে ঢুকলো। সে যাওয়ার সময় মাহিরার রুম লক করে গিয়েছিলো। মাহিরা ঘুমাচ্ছে তাই যেনো কেউ ডিস্টার্ব না করে সেইজন্য আয়ান এমনটা করেছে। তাই তো ইশান আর মাহিরার রুম খুজে পায়নি।
আয়ান রুমে ঢুকে দেখতে পায় মাহিরা আগের মতোই ঘুমিয়ে আছে। দুপাশে বালিশের উপর মাহিরার হাত রাখা। আয়ান খাবার গুলো বেড সাইড টেবিলের উপর রেখে মাহিরার পাশে বসে। মাহিরার ঘুমন্ত মুখখানার দিকে তাকিয়ে থাকে কিছুক্ষণ। তার একটুও ইচ্ছে করছে না মাহিরাকে জাগাতে। তার মন চাচ্ছে এই মেয়েকে সে সারাজীবন এভাবে দেখুক। তার এ দেখা কখনো শেষ না হোক। 
আয়ান না পেরে মাহিরাকে ডেকে তুলে। মাহিরা পিটপিট করে চোখ মেলে তাকায়। চোখ খুলতেই মাহিরা তার সামনে আয়ানকে দেখতে পায়। মাহিরা বুঝতে পারে না আয়ান এখানে কেনো। মাহিরা ঘুমো ঘুমো চোখে আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, খাড়ুস লোক। আপনি এখানে কি করছেন? সদ্য ঘুম থেকে উঠা মাহিরার ভাঙ্গা ভাঙ্গা কন্ঠে বলা কথাটা আয়ানের ভেতরে ঝর তুলে দেয়। আয়ান কিছু না বলে শুধু তাকিয়ে থাকে মাহিরার দিকে। 
মাহিরা আয়ানের কাছ থেকে কোনো জবাব না পেয়ে কিছু মনে করার চেষ্টা করে। মাহিরার মনে পরে যায় আয়ান তার হাতে মেহেদী দিয়ে দিচ্ছিলো। আর সে খাটে হেলান দিয়ে বসে ছিলো। কখন ঘুমিয়ে পরেছে নিজেও জানেনা। মাহিরার সব কিছু মনে পরতেই সে তাড়াতাড়ি তার দু'হাতের দিকে তাকায়।
হাতের দিকে তাকাতেই মাহিরা চমকে উঠে। আয়ান তার দুই হাতে খুব সুন্দর করে মেহেদী দিয়ে দিয়েছে। মাহিরা ভেবেছিলো এই লোক তার হাত নষ্ট করে ফেলবে। কিন্তু এই লোক যে তাকে এতো সুন্দর করে মেহেদী দিয়ে দিবে মাহিরা সেটা কল্পনাও করেনি। মাহিরা ঘুম থেকে উঠে তার দুই হাত দেখে খুশি হয়ে যায়। আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, 
- খাড়ুস লোক? এই মেহেদী আপনি দিয়ে দিয়েছেন?
আয়ানের কাছ থেকে কোনো জবাব আসলো না।সে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকলো মাহিরার দিকে। 
মাহিরা খুশি হয়ে আবারো বলে ওঠে, খাড়ুস লোক আপনি এতো সুন্দর করে মেহেদীও দিতে পারেন? আয়ান মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, 
- তোমার ডিজাইন পছন্দ হয়েছে? 
মাহিরা খুশি হয়ে বলে, 
- খুব পছন্দ হয়েছে। যতোটা খারাপ ভেবেছিলাম ততোটাও খারাপ হয়নি। আপনি কি এর আগে কখনো কাউকে মেহেদী দিয়ে দিয়েছিলেন? 
আয়ান শান্ত গলায় বলল, 
- নো। ফাস্ট টাইম। 
মাহিরা অবাকের সুরে বলে, কি বলেন? ফাস্ট টাইমেই এতো সুন্দর করে মেহেদী দিয়ে দিয়েছেন? আয়ান কিছুই বললো না। মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে আবারো বলে ওঠে, ধন্যবাদ খাড়ুস লোক। আয়ান মুচকি হেসে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াতে নিলে হঠাৎই মাহিরা বলে ওঠে, ওয়েট.. ওয়েট। আয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকায় মাহিরা দিকে। মাহিরা তাকে হঠাৎ এমটা বললো কেনো আয়ান বুঝলো না। মাহিরা তার হাতের তালুর দেখে এক চিৎকার দেয়,
- আল্লাহ গো..। 
মাহিরার চিৎকার শুনে আয়ান ভেবাচেকা খেয়ে যায়। চিন্তাতুর কন্ঠে বলে, হোয়াট হেপেন্ট মাহি? মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে তার দুই হাতের তালু আয়ানকে দেখিয়ে বলে, এটা আপনি কি করলের খাড়ুস লোক? আয়ান মাহিরার হাত দেখে বলে, কি করলাম? মাহিরা এবার আয়ানের উপর রেগে গিয়ে বলে, 
- অসভ্য লোক। আপনি আমার হাতে নিজের নাম লিখেছেন কেনো? 
আয়ান এবার বুঝতে পারে মাহিরার চিৎকার দেওয়ার কারন। মাহিরা তখন সদ্য ঘুম থেকে উঠে ভালোভাবে খেয়াল করেনি তার হাতের তালুতে যে আয়ানের নাম লিখা। মাহিরা ভালোভাবে যখন সেটা খেয়াল করে, দেখতে পায় তার দুই হাতে আয়ানের দুটো নাম লিখা। তাও একদম বাংলায় সুস্পষ্ট। মাহিরা তখনই চিৎকার দিয়ে ওঠে। মাহিরা রাগে ফুঁসছে। মাহিরার রাগ দেখে আয়ান মনে মনে হাসে। এই মেয়েকে রাগলেও যে অনেক বেশি কিউট লাগে। আয়ান এবার মাহিরা দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করে, 
- তোমার হাতে মেহেদী দিয়ে দিয়েছে কে? 
মাহিরা রাগে কটমট করে বলে, 
- আপনি..। 
আয়ান এবার সহসা বলে, 
- যার হাতে মেহেদী দিয়েছো তার নাম তোমার হাতে থাকবে না? নাম না থাকলে মানুষ কিভাবে বুঝবে যে মেহেদীটা কে পরিয়ে দিয়েছে? 
মাহিরা হা হয়ে তাকিয়ে থাকে আয়ানের দিকে।বলে, 
- আপনি কি পাগল? কখনো কি শুনেছেন কোনো মেহেদী আর্টিস্টি কাউকে মেহেদী পরিয়ে নিজের নাম সেখানে লিখে? 
আয়ান বলে ওঠে,
- তুমি কি কখনো দেখোনি? বড় বড় আর্টিস্ট যখন নিজেদের ছবিগুলোর আর্ট করে তখন তার সেই সুন্দর ছবির নিচে নিজের নাম লিখে? কেনো লিখে জানো? কারন সে চায় মানুষ যেনো তার ছবিটি দেখেই বুঝতে পারে এই সুন্দর ছবিটি সে একেঁছে। 
মাহিরা আয়ানের দিকে রাগে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। এই লোক কিসব আবোল তাবোল বকছে? আয়ান মাহিরার দিকে তাকিয়ে আবারো বলে, তুমি হয়তো আমার কথা বোঝোনি। দাড়াও আমি তোমাকে আবারো বুঝিয়ে বলছি, শোনো মাহি। আয়ান আবারো বলতে শুরু করে,
- ধরো কোনো এক লেখক বা লেখিকা তার কোনো বই লিখলেন। তার সেই বইয়ের উপরে কিন্তু নিজের নাম লেখা থাকে। কেনো থাকে জানো? বিকজ মানুষ যেনো তার বইটা দেখেই বুঝতে পারে এই বইটা সে লিখেছে।
মাহিরা অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে আয়ানের দিকে। এই লোক কিসের সাথে কি মিলাচ্ছে? মাহিরা এবার বলে ওঠে, আপনার এই আজগুবি কথা আমার বোঝার দরকার নেই। আপনি আমার হাতটা একদম নষ্ট করে দিয়েছেন। মানুষ এখন এই হাত দেখে কি বলবে? আমি এই হাত মানুষকে কিভাবে দেখাবো? আয়ান এবার শান্ত গলায় বলে ওঠে,
- আমি চাই এই পৃথিবীর সকল মানুষ তোর হাতে আমার নাম দেখুক মাহি..।
মাহিরা ভ্রু কুঁচকে তাকায় আয়ানের দিকে। বলে ওঠে, 
- আমি চাই না। আমি এক্ষনি মেহেদীর রং গাঢ় হওয়ার আগে এই মেহেদী ধুয়ে ফেলবো। 
আয়ানের মাথায় রক্ত উঠে যায়। আয়ান দাঁতে দাত পিসে বলে, 
- ইডিয়েট, আমার চার ঘন্টার পরিশ্রম কে তুই চার মিনিটেই ধুয়ে ফেলতে চাইছিস?তোর সাহস তো কম না মাহি। শুধু একবার এই মেহেদী উঠিয়ে দেখ। তোর হাত যদি আমি নিজ হাতে না কাটছি? তাহলে আমার নামও আরিয়ান আয়ান শিকদার না। কম করে হলেও এই মেহেদী তোর হাতে চারদিন রাখবি।
মাহিরা হকচকিয়ে যায়। বলে ওঠে, 
- চারদিন কিভাবে মেহেদী হাতে রাখে মানুষ?
আয়ান চোয়াল শক্ত করে বলে, 
- একদম মুখে মুখে তর্ক করবি না মাহি। এক থাপ্পড়ে তোর দাঁত সব ফেলে দিবো। 
মাহিরা আর কিছু বলে না। বিরবির করে, খাড়ুস একটা। আয়ান আর কিছু না বলে বেড সাইড টেবিল থেকে খাবার নিয়ে মাহিরার পাশে বসে খাবার মাখাতে থাকে। মাহিরা তা দেখে বলে ওঠে, 
- আপনি আমার রুমে বসে খাচ্ছেন কেনো? নিজের রুমে গিয়ে খেতে পারেন না?
আয়ান কিছু না বলে খাবার মাখিয়ে মাহিরার মুখের সামনে এক লোকমা খাবার ধরে গম্ভীর গলায় বলে, হা কর। মাহিরা তব্দা খেয়ে যায়। এই লোক তাকে হঠাৎ খাইয়ে দিতে চাইছে কেনো মাহিরা বুঝলো না। মাহিরা হয়তো ভুল শুনেছে। তাই সে শিওর হওয়ার জন্য বলে ওঠে, কি বললেন? আয়ান ধমক দিয়ে বলে, ইডিয়েট। হা করতে বলেছি। হা কর। মাহিরা আরো কিছু বলতে যাবে তার আগে আয়ান বলে ওঠে, আর একটা কথা বললে থাপ্পড় খাবি। মাহিরা আর কিছু না বলে হা করে। আয়ান তার বাড়িয়ে দেওয়া লোকমা মাহিরার মুখে তুলে দেয়।
মাহিরা বুঝলো না এই খাড়ুস লোক হঠাৎ তাকে খাইয়ে দিচ্ছে কেনো? কিন্তু মাহিরা আয়ানকে আর কিছু বলার সাহস পেলো না। আয়ান মাহিরার মুখে একের পর এক লোকমা তুলে দিচ্ছে। মাহিরাও কোনো কথা ছাড়া নিঃশব্দে খেয়ে নিচ্ছে। আয়ান এবার মাহিরাকে খাইয়ে দিতে দিতে জিজ্ঞেস করে, তোর চাচাতো ভাই কবে তোকে খাইয়ে দিয়েছে? 
মাহিরা তার মুখের খাবার টুকু শেষ করে বলে, কে ইশান ভাই? মাহিরার মুখে ইশানের নাম শুনে আয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে যায়। আয়ান রেগে গিয়ে বলে, ইডিয়েট। তোর চাচাতো ভাই কয়টা? মাহিরা আয়ানকে রেগে যেতে দেখে ছোট করে বলে, একটা। আয়ান আবার বলে, ও কবে তোকে খাইয়ে দিয়েছে? মাহিরা বলতে থাকে, সে তো অনেক ছোটোবেলায় একবার ঈদে বাংলাদেশে এসেছিলাম। তখন হাতে মেহেদী থাকায় ইশান ভাই আমাকে ইশিতা আপুকে আর ইরাকে খাইয়ে দিয়েছে। 
আয়ান এবার হুংকার দিয়ে বলে, ইডিয়ট। তুই কোন সাহসে ওর হাতে খেতে গেলি? মাহিরা মিনমিনিয়ে বলে, আমি তো তখন ছোটো ছিলাম। আয়ান বলে ওঠে, তুই ছোটো থাক আর বড়ো থাক। তুই কেনো ওর হাতে খাবি? মাহিরা বলে, আম্মু তো খাইয়ে দিতে পারেনি। চাচির সাথে রান্না করছিলো। তাই তো ইশান ভাই কে বলেছে আমাদের তিন জন কে খাইয়ে দিতে। আয়ান এবার জোর খাটিয়ে বলে, 
- আর কখনো অন্য কারো হাতে খাবিনা। মনে থাকবে? 
মাহিরা উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। আয়ান আরেক লোকমা খাবার মাহিরার মুখের সামনে তুলে ধরে বলে, হা কর। মাহিরা আয়ানের বাড়িয়ে দেওয়া লোকমা নিঃশব্দে নিরদ্বিধায় খেয়ে নেয়। 
অর্নব ছাদ থেকে নিচে নেমে এসেছে। অর্নবের খুদা পেয়েছে। কিন্তু সে আয়ানকে কোথাও খুঁজে পাচ্ছে না। অর্নব ভেবেছিলো আয়ান হয়তো মাহিরাকে খাবার দিয়ে ছাদে চলে যাবে। কিন্তু আয়ান এখনো না আসায় অর্নব নিজেই ছাদ থেকে নিচে নেমে এসেছে। অর্নব আয়ানের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। দরজা বাইরে থেকে লক করা। অর্নব বুঝলো আয়ান ভেতরে নেই। অর্নব ভাবছে আয়ান কোথায় থাকতে পারে? পরক্ষণে তার মাথায় কিছু চলে আসলে সে মুচকি হেসে চলে যায় মাহিরার রুমের দিকে। 
মাহিরার খাচ্ছে। আয়ান সময় নিয়ে বসে বসে মাহিরাকে খাইয়ে দিচ্ছে। মাহিরার ইলিশ মাছ ভিষণ পছন্দ। তাই আয়ান মাহিরার পছন্দ মতো ইলিশ মাছের কাটা বেঁছে বেঁছে মাহিরাকে খাইয়ে দিচ্ছে।
অর্নব এসে মাহিরার রুমের সামনে দাড়ায়।মাহিরার রুমের দরজা খানিকটা খোলো থাকায় অর্নব ভেতরে উকি দেয়। দেখার চেষ্টা করে ভেতরে আয়ান আছে কিনা। অর্নব চোখ ঘুড়িয়ে বিছানায় তাকাতেই তার চোখ কপালে উঠে যায়। আয়ান মাহিরাকে খাইয়ে দিচ্ছে। অর্নবের তা বিশ্বাস হলো না। সে ভাবছে এটা আয়ান নাকি অন্য কেউ? অর্নব তাড়াতাড়ি তার হাত দিয়ে চোখ ডলে আবারো ভালো করে তাকায়। দেখে, না এটা আয়ানই। তার চোখ আয়ানকে চিনতে ভুল করবে না। 
অর্নব হেসে মাহিরার রুমে ঢুকে বলে ওঠে, হাউ রোমান্টিক ভাইয়া। অর্নবের কথা শুনে মাহিরা তব্দা খেয়ে চেয়ে থাকে অর্নবের দিকে। কিন্তু আয়ানের কোনো হেল দোল দেখা গেলো না। আয়ান মাছের কাটা বাঁছতে বাঁছতে অর্নবের দিকে না তাকিয়েই বলে, 
- পারমিশন ছাড়া রুমে ঢুকেছিস কেনো?
অর্নব মিটিমিটি হেসে বলে, রুমে না ঢুকলে কি আর এতো সুন্দর রোমান্টিক সিনটা দেখতে পারতাম? খুব মিছ করে ফেলতাম না? মাহিরা তার মুখের খাবার টুকু শেষ করে অর্নবের দিকে তাকিয়ে বলে, ভাইয়া আপনি যেমনটা ভাবছেন তেমন কিছু না। আসলে আমার..। মাহিরা সম্পূর্ণ কথা শেষ করার আগেই আয়ান মাহিরার মুখের সামনে এক লোকমা খাবার তুলে ধরে বলে, হা কর। মাহিরা আর কিছু বলতে পারলো না। সে আয়ানের কথা মতো হা করে আয়ানের বাড়িয়ে দেওয়া লোকমা মুখে তুলে নেয়।
অর্নব তা দেখে ফিক করে হেসে দেয়। অর্নবের হাসি দেখে মাহিরা হতভম্ব হয়। খাবার মুখে থাকায় সে অর্নবকে কিছু বলতেও পারছে না। অর্নব একটা চেয়ার টেনে আয়ানের পাশে এসে বসে। আয়ানকে বলে, আমাকেও একটু খাইয়ে দেও না ভাইয়া। আফটার অল আমি তোমার হাতে কোনোদিনও খাইনি।
আয়ান মাহিরার মুখে খাবার তুলে দিতে দিতে বলে, থাপ্পড় খেতে না চাইলে এখান থেকে যা। অর্নব আবারো ফিক করে হেসে দেয়। মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, দেখেছো মাহিরা? ভাইয়া শুধু তোমাকেই খাইয়ে দিচ্ছে। আমাকে খাইয়ে দিচ্ছে না। ভাইয়া আমাকে মোটেও ভালোবাসে না মাহিরা।
মাহিরা থতমত খেয়ে যায়। আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে, আপনি অর্নব ভাইকে খাইয়ে দিচ্ছেন না কেনো? আয়ান গম্ভীর গলায় বলে, ওর হাত আছে। ও নিজের টা নিজে গিয়ে খাক। মাহিরা এবার বলে ওঠে, আপনি আসলেই একটা খাড়ুস। 
অর্নব মাহিরার মুখে খাড়ুস কথাটা শুনে চমকে উঠে তাকায় মাহিরার দিকে। পরক্ষণে তাকায় আয়ানের দিকে। আয়ান কখন মাহিরাকে থাপ্পড় বসিয়ে দেয় সেটাই ভাবছে অর্নব। কিন্তু না, অর্নব কে অবাক করে দিয়ে আয়ান মাহিরাকে কিছুই বললো না। অর্নব আয়ানের দিকে তাকিয়ে দেখলো আয়ান একদম নিরব। মাহিরাকে কিছু না বলে সে মাহিরার দিকে আরেক লোকমা খাবার এগিয়ে দিচ্ছে। অর্নব সেটা দেখে আরো বেশি অবাক হয়। মাহিরা আয়ানকে খাড়ুস বলেছে আর আয়ান কিছুই বলল না? একটা টু শব্দও করলো না? হাউ ইট পসিবল? মাহিরার যায়গায় আজ অন্য কেউ থাকলেও কি আয়ান আজ এটাই করতো? অর্নবের মনে প্রশ্ন জেগে উঠে। 
অর্নব এবার ভালো করে তাকায় মাহিরার দিকে। মাহিরার হাতের দিকে নজর পরতেই অর্নব আরেক দফা চমকে উঠে। মাহিরার দুই হাতে মেহেদি দিয়ে আয়ানের দুটো নাম লেখা। অর্নব ভ্রু কুঁচকে তাকায় আয়ানের দিকে। সে অনিকের কাছে শুনেছে আয়ান কেয়ার সাথে কি কি করেছে। কেয়া তো শুধু একটা লেটার লিখেছিলো। আর এখানে তো মাহিরার হাতে আয়ানের পুরো নাম লেখা। তাও একটা না, দু দুটো নাম বাংলায় সুস্পষ্ট ভাবে লেখা।
অর্নব মাহিরার হাতের দিকে তাকিয়ে ভালো করে খেয়াল করে দেখে মুসকানের হাতের মেহেদী আর মাহিরার হাতের মেহেদী ডিজাইনের পেটান আলাদা। অর্নব কৌতুহল নিয়ে মাহিরাকে প্রশ্ন করে বসে, মাহিরা তোমাকে মেহেদী দিয়ে দিলো কে? তুমি তো ছাদ থেকে চলে এসেছিলে। পরে আর ছাদেও যাওনি। মাহিরার খাওয়া শেষ। আয়ান মাহিরাকে পানি খাইয়ে মুখ মুছে দিয়েছে। 
মাহিরার অর্নবকে কি বলবে সেটাই ভাবছে। এমনিতেই আয়ান তাকে খাইয়ে দিয়েছে বলে অর্নব অন্য কিছু মনে করছে। এখন যদি সে আবার বলে আয়ান তাকে মেহেদী পরিয়ে দিয়েছে। তাহলে তো অর্নব আরো বেশি কিছু ভেবে ফেলবে। মাহিরা তার হাতের দিকে তাকিয়ে দেখে তার দুই হাতের তালু দেখা যাচ্ছে। মাহিরা তাড়াতাড়ি তার হাত দুটো উল্টো করে ফেলে। অর্নবের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, 
- আসলে ভাইয়া মেহেদী আর্টিস্ট রুমে এসে মেহেদী দিয়ে গিয়েছে। 
কথাটা শোনা মাত্র আয়ান হুংকার দিয়ে ওঠে, 
- ইডিয়েট মিথ্যা বলছিস কেন? ওকে বল এই মেহেদী আমি তোকে দিয়ে দিয়েছি। আমার পরিশ্রমের ক্রেডিট তুই অন্য কাউকে দিস কোন সাহসে? এক থাপ্পড়ে তোর দাঁত সব ফেলে দিবো, বেয়াদব।
আয়ানের এমন কথা শুনে অর্নব আশ্চর্য চোখে তাকায় আয়ানের দিকে। পরক্ষণে ঝড়ের বেগে তাকায় মাহিরার হাতের দিকে। আয়ান যে এতো সুন্দর মেহেদী দিতে পারে সেটা তো অর্নব এতো গুলো বছরেও কখনো জানতে পারলো না। এদিকে মাহিরা মনে মনে বিরবির করে, আয় হায়। এই পাগল লোকটা সব বলে ফেললো অর্নব ভাইয়ের সামনে। এখন সে কিভাবে মুখ দেখাবে অর্নব ভাইকে? মাহিরা মাথা নিচু করে দুই জনকেই বলে, সরি..।
অর্নব তা শুনে হেসে ফেলে। চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে মাহিরাকে বলে, মাহিরা তুমি অনেক ভাগ্যবতী বুঝলে। মাহিরা অর্নবের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, কেনো ভাইয়া? অর্নব হেসে বলে, সেটা তো এখন বলতে পারছি না। তবে তুমি সেটা ভবিষ্যতে টের পাবে। আমি শিওর দিয়ে বলতে পারি, এই পৃথিবীর সকল মেয়ে একদিন তোমার উপর জেলাস ফিল করবে। কথাটা বলেই অর্নব মাহিরার রুম থেকে চলে যায়। মাহিরা বুঝলো না অর্নব কেনো বলেছে এই কথা? মাহিরা ভাবনায় পরে যায়। আয়ান এঁটো প্লেট হাতে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, 
- এখানে চুপচাপ ঘুমিয়ে পরবি। কেউ দরজা নক করলে একদম খুলবি না। আর আমি যাওয়ার পর যদি দেখেছি তুই মেহেদী উঠিয়েছিস? তাহলে সকালে উঠে সবার প্রথমেই তোর হাত দুটো কাটবো। তারপর সেগুলো বাধিয়ে তোর চোখের সামনেই ঝুলিয়ে রাখবো। তখন বসে বসে সারাজীবন নিজের কাঁটা হাত গুলো দেখিস।
মাহিরা চমকে উঠে তাকায় আয়ানের দিকে। আয়ারের মুখে এমন কথা শুনে সে ভয়ে হকচকিয়ে যায়। বড় বড় চোখ তুলে তাকায় আয়ানের দিকে। এই লোক কি আসলেই পাগল? আয়ান মাহিরার চোখে মুখে ভয় দেখে মনে মনে হাসে। পরপর মাহিরার রুমের লাইট অভ করে জিরো লাইট জ্বালিয়ে চলে যায় মাহিরার রুম থেকে। মাহিরা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে শুয়ে পরে।
অর্নব ছাদে বসে আছে। আয়ান এসে অর্নবের পাশে বসলো। ধমকের সুরে বলল, এখনো খাসনি কেনো? অর্নব তাকায় আয়ানের দিকে। মুচকি হেসে বলে, আমাদের তো খাইয়ে দেওয়ান মানুষ নেই। তাই আমরা খেতে পারিনা। আয়ান গম্ভীর গলায় বলে, বাজে বকা বন্ধ কর। অর্নব নিঃশব্দে হাসে। আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে, ইশশ ভাইয়া। আমিও যদি তোমার মতো হতে পারাতাম। আয়ান গম্ভীর গলায় বলে, খেতে যা। অর্নব আর কিছু না বলে উঠে চলে যায়। 
পাঁচ মিনিট যেতেই অর্নব খাবার হাতে ফিরে আসে। আয়ানের সামনে টেবিলে খাবার গুলো রেখে বলে, খাওয়া শুরু করো ভাইয়া। আয়ান ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায় অর্নবের দিকে। দেখে অর্নব তার জন্য খাবার নিয়ে এসেছে। আয়ান রেগে ধমক দিয়ে বলে, ইডিয়ট। আমি তোর জন্য খাবার আনতে বলেছি। আমার জন্য না।
অর্নব কিছু না বলে আবারো চলে যায়। নিজের জন্য খাবার নিয়ে আবারো ফিরে আসে আয়ানের কাছে। আয়ানের মুখোমুখি সামনে চেয়ার টেনে বসে বলে, এখন খাও। আয়ান আর কিছু না বলে খাওয়া শুরু করে। অর্নব খেতে খেতে আড়চোখে আয়ানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসে।
________
সকাল আটটা। মাহিরার দরজা কেউ অনবরত ধাক্কা দিচ্ছে। মাহিরা উঠে বসে। হঠাৎ ঘুম ভাঙ্গায় মাহিরার মাথাটা কেমন ঝিমঝিম করছে। মাহিরা বিছানা থেকে নেমে দরজা খুলতে যায়। দরজা খুলে সামনে তাকাতেই মাহিরা দেখলো কেয়া দাড়িয়ে আছে তার দরজার সামনে। কেয়াকে দেখে মাহিরা ভ্রু কুঁচকায়। এই মেয়ে এতো সকালে তার রুমের দরজা ধাক্কাচ্ছে কেনো মাহিরা বুঝলো না। কেয়া কিছু না বলে হুট করে মাহিরার রুমে ঢুকে পরে।
মাহিরা কেয়ার এমন কান্ড দেখে জিজ্ঞেস করে, কি হয়েছে কেয়া? কেয়া মাহিরার দিকে রাগী চোখ তাকিয়ে তার দু'হাত মাহিরার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে, আমার হাতের এই অবস্থা করে এখন আবার জিজ্ঞেস করছো কি হয়েছে? তোমার মতো অসভ্য মেয়ে আমি আর দুটো দেখেনি মাহিরা। মাহিরা কেয়ার হাতের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠে। মাহিরা কেয়ার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, এসব কি করে হলো কেয়া? কেয়া মুখ ভেঙ্গচি মেরে মাহিরাকে বলে, নেকা সেজো না মাহিরা। নিজে সব করে এখন নেকা সাজতে চাইছো?
মাহিরা বলে ওঠে, আমি কিছুই করিনি কেয়া। তুমি আমাকে ভুল বুঝেছো। কেয়া এবার রেগে যায় মাহিরার উপর। মাহিরার দিকে তেড়ে গিয়ে বলে, এই মেয়ে আমার সামনে একদম ভালোমানুষি দেখাবে না। তুমিই তো আয়ান ভাইকে পাঠিয়ে এসব করেছো। কি ভেবেছো আমি কিছুই জানি না? মাহিরা কেয়াকে বলে, শান্ত হও কেয়া। আমি বুঝতে পারছি তোমার মনের অবস্থা। কিন্তু বিশ্বাস করো আমি এমন কিছু করিনি।
কেয়া এবার বলে ওঠে, তোমার মতো নেকা মেয়ে আমি আর একটাও দেখেনি মাহিরা। বিদেশ থেকে এসেই শুরু করে দিলে? বিদেশে বসেও বুঝি এসব করতে? তোমার বাপ মা তোমাকে কোনো শিক্ষা দেয়নি তাইনা? মাহিরা এবার বলে ওঠে, ভদ্র ভাবে কথা বলো কেয়া। কেয়া আবারো বলতে শুরু করে, একটা কথা তুমি কান খুলে শুনে রাখো মাহিরা। যতো কিছুই করো না কেনো? আয়ান ভাইকে তুমি আমার কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না। আমার আয়ান ভাই শুধু আমারই থাকবে।
মাহিরার এবার খুব রাগ হলো কেয়ার উপর। এই মেয়ে তার চরিত্রে দাগ লাগানোর চেষ্টা করছে। তার বাপ মা তুলে কথা বলছে। মাহিরা বুঝলো এই মেয়েকে ভালো করে বুঝিয়ে লাভ নেই। মাহিরা এবার হুট করে কেয়ার সামনে তার হাত দুটো মেলে ধরে। কেয়া মাহিরার হাত দুটো দেখে চমকে ওঠে। মাহিরা এবার কেয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলে,
- দেখো তো কেয়া মেহেদীর ডিজাইনটা সুন্দর হয়েছে কিনা?
কেয়া মাহিরার হাতে আয়ানের সম্পূর্ণ নাম দেখে কটমট দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মাহিরার দিকে। মাহিরা কেয়ার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,
- এই মেহেদি তোমার আয়ান ভাই পরিয়ে দিয়েছে। সুন্দর হয়েছে না বলো?
কেয়ার গায়ে আগুন জ্বলে যাচ্ছে। আয়ানের সম্পূর্ণ নাম মাহিরার হাতে দেখে তার পুরো শরীর জ্বলছে। মাহিরা আবারো বলে,
- জানো কেয়া? তোমার আয়ান ভাই কাল রাতে চার ঘন্টা বসে বসে আমার হাতে এই মেহেদী পরিয়ে দিয়েছে। আর আমাকে বলেছে, আমি যেনো এই মেহেদী চার দিন আমার হাতে রাখি।
কেয়া রাগে অজগরের মতো ফুঁসছে। মাহিরা আবারে বলে ওঠে,
- কেয়া জানো? তোমার আয়ান ভাই কাল রাতে আমার সাথে কি করেছে?
কেয়া দাঁত চেপে কটমট করে বলে, কি করেছে? মাহিরা কেয়ার দিকে তাকিয়ে দেখলো কেয়ার অবস্থা। মাহিরা কেয়ার দিকে তাকিয়ে দুষ্টু হেসে বলে,
- থাক ওসব দুষ্টু কথা আর না বলি। ওসব ভাবতেই আমার খুব লজ্জা লাগছে বুঝলে?
বলেই মাহিরা লজ্জা পাওয়ার ভঙ্গিতে ওড়না দিয়ে তার মুখ ঢেকে ফেলে। কেয়া মাহিরার দিকে তাকিয়ে কিরবির করে বলে, আমি তোমাকে ছাড়বো না মাহিরা। মাহিরা এবার কেয়ার দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,
- যাক বাবা? তুমিও তো দেখছি একদম তোমার আয়ান ভাইয়ের মতো হয়েছো। তোমার আয়ান ভাইও আমাকে ধরলে আর ছাড়তে চায়না জানো?
কেয়া আর নিতে পারলো না মাহিরার এইসব কথাগুলো। কেয়া আর না পেরে ফোঁস ফোঁস করতে মাহিরার রুম থেকে বেরিয়ে যায়। কেয়া চলে যেতেই মাহিরা বিরবির করে, যেমন কুকুর তেমন মুগুর। ভালো করে বলতে চেয়েছি বোঝোনি। এখন বোঝো ঠেলা।
চলবে..

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন