ফন্ট সাইজ:
থিম:
The Black Player

২য় পর্ব

লেখক: Miju.Sheikh

#The Black Player

 #Miju.Sheikh
 #পর্ব_সংখ্যা_২

মেহরিনের চোখ তখনও করিডোরের শেষ প্রান্তে স্থির। সাদা পোশাক পরা নারীটা সেখানে দাঁড়িয়ে আছে। মুখটা এখনো ছায়ার আড়ালে। শুধু তার লম্বা চুলগুলো সামনের দিকে ঝুলে আছে, আর বাতাস না থাকা সত্ত্বেও চুলগুলো ধীরে ধীরে দুলছে। মেহরিনের বুকের ভেতরটা কেমন যেন হিম হয়ে গেল। কয়েক মুহূর্ত আগেও সে নিজেকে সাহসী মনে করছিল। কিন্তু এখন তার মনে হচ্ছে, এই বাড়িতে পা রাখাটাই হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে বড় ভুল।
আরিশ তার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল। তার শরীর দিয়ে মেহরিনকে আড়াল করে রেখেছে।
"আমার পেছনে থাকো।"
মেহরিন নিচু গলায় বলল,
"ওটা কে?"
আরিশ উত্তর দিল না।
"আমি জিজ্ঞেস করছি, ওটা কে?"
"আমি জানি না।"
মেহরিন অবিশ্বাসের চোখে তার দিকে তাকাল।
"আপনি জানেন না?"
"এই বাড়িতে সবকিছু আমি জানি না, মেহরিন।"
"কিন্তু আপনি বলেছিলেন—এই বাড়িতে কী হয়, সেটা আপনি জানেন।"
আরিশ ধীরে ধীরে তার দিকে তাকাল।
"আমি বলেছিলাম, আমি অনেক কিছু জানি। সবকিছু নয়।"
ঠিক তখনই করিডোরের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা নারীটা এক পা এগিয়ে এল।
ঠক।
তার পায়ের শব্দ পুরো বাড়িতে প্রতিধ্বনিত হলো।
মেহরিন অনিচ্ছায় আরিশের হাত আঁকড়ে ধরল।
আরিশ নিচে তাকিয়ে তার হাতের দিকে তাকাল। তারপর কোনো কথা না বলে মেহরিনকে আরও নিজের কাছে টেনে নিল।
নারীটা দ্বিতীয় পা বাড়াল।
ঠক।
তারপর তৃতীয়।
ঠক।
মেহরিনের নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছিল।
"আরিশ..."
"চুপ।"
"ও আমাদের দিকে আসছে।"
"আমি দেখছি।"
আরিশের গলায় অদ্ভুত একটা স্থিরতা। যেন ভয় পাওয়ার মতো কোনো পরিস্থিতিই তার জীবনে নতুন নয়।
নারীটা আরও কাছে আসতেই হঠাৎ পুরো বাড়ির আলো নিভে গেল।
অন্ধকার।
মেহরিন চিৎকার করে উঠতে যাচ্ছিল, কিন্তু আরিশ দ্রুত তার মুখের সামনে হাত রেখে দিল।
"শব্দ করো না।"
কয়েক সেকেন্ড শুধু নিস্তব্ধতা।
তারপর অন্ধকারের ভেতর খুব কাছে থেকে একটা মেয়েলি হাসির শব্দ শোনা গেল।
হিহিহি...
মেহরিনের শরীর কেঁপে উঠল।
আরিশের হাত তখনও তার মুখের ওপর।
হঠাৎ কোথাও একটা দরজা বন্ধ হওয়ার শব্দ হলো।
ধাম!
এরপরই আলো জ্বলে উঠল।
মেহরিন চোখ মেলে তাকাল।
করিডোর ফাঁকা।
সাদা পোশাকের নারীটা নেই।
আরিশও কয়েক সেকেন্ড নড়ল না।
তারপর মেহরিনের মুখ থেকে হাত সরিয়ে নিল।
"চলো।"
"কোথায়?"
"তোমার ঘরে।"
"আমি এখানে থাকতে চাই না।"
"আজ রাতে তুমি এখান থেকে বের হতে পারবে না।"
মেহরিন চমকে তাকাল।
"কেন?"
আরিশ কোনো উত্তর দিল না। শুধু সামনের দরজার দিকে তাকাল।
মেহরিনও তাকিয়ে দেখল—বাড়ির বিশাল দরজাটা বন্ধ।
সে ছুটে গিয়ে হাতল টানল।
দরজা খুলল না।
আরেকবার চেষ্টা করল।
না।
"এটা খুলছে না!"
আরিশ শান্ত গলায় বলল,
"খুলবে না।"
মেহরিন ঘুরে দাঁড়াল।
"আপনি জানতেন?"
"হ্যাঁ।"
"তাহলে আমাকে এখানে নিয়ে এলেন কেন?"
"আমি তোমাকে এখানে নিয়ে আসিনি।"
"তাহলে?"
আরিশের চোখ অন্ধকার হয়ে গেল।
"তুমি নিজেই এসেছ।"
মেহরিন কিছুক্ষণ চুপ করে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
"আপনি কি আমাকে আটকে রেখেছেন?"
আরিশ তার দিকে তাকাল।
"আমি চাইলে তোমাকে আটকে রাখার জন্য দরজার প্রয়োজন হতো না।"
কথাটা শুনে মেহরিনের বুকের ভেতর অস্বস্তি আরও বেড়ে গেল।
"আপনি আসলে কে?"
আরিশ কোনো উত্তর দিল না।
সে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে গেল।
মেহরিন বাধ্য হয়ে তার পেছনে হাঁটতে লাগল।
সিঁড়ির প্রতিটা ধাপ যেন অস্বাভাবিক দীর্ঘ মনে হচ্ছিল। দেওয়ালে পুরোনো ছবিগুলো ঝুলছে। বেশিরভাগ ছবির মানুষদের মুখ সময়ের সঙ্গে ঝাপসা হয়ে গেছে। কিন্তু একটা ছবির সামনে এসে মেহরিন হঠাৎ থেমে গেল।
ছবিতে তিনজন মানুষ।
একজন পুরুষ।
একজন নারী।
আর তাদের পাশে ছোট্ট একটা মেয়ে।
মেয়েটার মুখ দেখে মেহরিনের বুক ধক করে উঠল।
সে ছবিটার কাছে এগিয়ে গেল।
"এটা..."
আরিশ থেমে গেল।
মেহরিন কাঁপা আঙুলে ছবিটার দিকে দেখাল।
"এটা আমি।"
আরিশ কিছু বলল না।
"এটা আমি, তাই না?"
"হ্যাঁ।"
মেহরিনের মাথা ঝিমঝিম করতে লাগল।
"কিন্তু এই ছবিটা এখানে কেন?"
"কারণ ছবিটা এই বাড়িতেই তোলা হয়েছিল।"
"কবে?"
"তুমি পাঁচ বছর বয়সে।"
মেহরিন চোখ বন্ধ করল।
তার ছোটবেলার স্মৃতি খুব কম। বাবা-মায়ের সঙ্গে কিছু ছবি, কিছু অস্পষ্ট মুহূর্ত—এর বেশি কিছু মনে নেই।
"আমি তো কখনো এখানে আসিনি।"
আরিশ ধীরে বলল,
"তুমি এসেছিলে।"
"কখন?"
"যেদিন তোমার মা মারা যায়।"
মেহরিন হঠাৎ তার দিকে তাকাল।
"আমার মা এখানে মারা গিয়েছিল?"
আরিশ এবার চুপ।
মেহরিন ছবিটা দেওয়াল থেকে খুলে নিল।
ছবির পেছনে কিছু একটা লেখা ছিল।
সে আলোয় নিয়ে তাকাল।
কালো কালিতে লেখা—
"খেলা শুরু হওয়ার আগেই প্রথম চাল দেওয়া হয়েছিল।"
মেহরিনের হাত কাঁপতে লাগল।
"এটা কে লিখেছে?"
আরিশ বলল,
"তোমার মা।"
মেহরিন যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছিল না।
"আপনি কীভাবে জানলেন?"
আরিশ এবার তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল,
"কারণ আমি তাকে শেষবার দেখেছিলাম।"
"আপনি ছিলেন?"
"হ্যাঁ।"
"যেদিন আমার মা মারা যায়?"
"হ্যাঁ।"
"তাহলে আপনি তাকে মরতে দেখেছেন?"
আরিশের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
"না।"
"তাহলে?"
কিছুক্ষণ নীরব থেকে আরিশ বলল,
"আমি তাকে শেষবার জীবিত দেখেছিলাম।"
মেহরিনের চোখে পানি চলে এল।
"আপনি আমাকে এত বছর ধরে এসব বলেননি কেন?"
"কারণ তোমাকে বলা মানেই তোমাকে এই খেলায় টেনে আনা।"
"আমি তো এখন খেলায় ঢুকেই গেছি।"
আরিশ কিছু বলল না।
মেহরিন তার সামনে এসে দাঁড়াল।
"আমার মায়ের কী হয়েছিল?"
"তুমি সত্যিই জানতে চাও?"
"হ্যাঁ।"
"তাহলে একটা কথা মনে রেখো। সত্যি জানার পর তুমি আমাকে আর বিশ্বাস করতে পারবে না।"
মেহরিনের চোখে অদ্ভুত এক জেদ ফুটে উঠল।
"আমি এখনো আপনাকে বিশ্বাস করি না।"
আরিশের ঠোঁটে ক্ষীণ হাসি ফুটল।
"সেটাই ভালো।"
কথাটা বলে সে ঘুরে দাঁড়াল।
মেহরিন তার হাত ধরে ফেলল।
"থামুন।"
আরিশ থেমে গেল।
মেহরিন তার হাত ছাড়ল না।
"আপনি আমাকে এড়িয়ে যাচ্ছেন।"
"হ্যাঁ।"
"কেন?"
আরিশ ধীরে ধীরে তার দিকে ফিরে তাকাল।
তার চোখের দৃষ্টি এবার আগের চেয়ে অনেক গভীর।
"কারণ তোমার কাছে দাঁড়ালে আমার কিছু নিয়ম ভেঙে যেতে থাকে।"
মেহরিন চুপ করে রইল।
আরিশ তার হাতের দিকে তাকাল। মেহরিন তখনও তার হাত ধরে আছে।
"আমার হাত ছাড়ো।"
"আপনি আগে বলুন, কোন নিয়ম?"
আরিশ মৃদু হেসে বলল,
"যে মেয়েটাকে আমার কাছ থেকে দূরে থাকার কথা, তার কাছেই বারবার ফিরে যাওয়া যাবে না।"
মেহরিনের বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো।
"আপনি আমাকে দূরে রাখতে চান?"
"চাই।"
"কিন্তু রাখছেন না।"
আরিশ কয়েক সেকেন্ড তার দিকে তাকিয়ে রইল।
"কারণ আমি সবসময় যা চাই, তা করতে পারি না।"
ঘরের বাতাস যেন ভারী হয়ে গেল।
দুজনের মধ্যে দূরত্ব খুব কম। মেহরিন তার চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে বুঝতে পারল—এই মানুষটার মধ্যে ভয়ংকর কিছু আছে। কিন্তু সেই ভয়ের সঙ্গেই এমন এক আকর্ষণ মিশে আছে, যেটাকে সে নিজের কাছেই স্বীকার করতে চাইছে না।
আরিশ ধীরে ধীরে তার হাত ছাড়িয়ে নিল।
"তোমার ঘর ওপরে।"
"আপনি?"
"আমি নিচে থাকব।"
"কেন?"
"কারণ আজ রাতে তোমাকে একা রাখা নিরাপদ নয়।"
মেহরিন অবাক হয়ে বলল,
"আপনি কি আমাকে পাহারা দেবেন?"
"প্রয়োজন হলে।"
"আর যদি বিপদটা আপনিই হন?"
আরিশ থেমে গেল।
তারপর খুব ধীরে বলল,
"তাহলে তোমার সবচেয়ে বড় ভুল হবে আমাকে বিশ্বাস করা।"
মেহরিন কিছু বলার আগেই আরিশ সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল।
মেহরিন তাকিয়ে রইল।
এই মানুষটাকে বোঝা অসম্ভব।
সে ধীরে ধীরে নিজের ঘরের দিকে এগিয়ে গেল।
দরজাটা আধখোলা ছিল।
মেহরিন দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই থমকে দাঁড়াল।
ঘরের মাঝখানে একটা দাবার বোর্ড রাখা।
বোর্ডের ওপর কালো ও সাদা ঘুঁটিগুলো সাজানো।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার—
সব সাদা ঘুঁটি উল্টে পড়ে আছে।
শুধু একটা কালো রাজা দাঁড়িয়ে আছে।
তার সামনে রাখা একটা ছোট্ট কাগজ।
মেহরিন কাগজটা তুলে নিল।
তাতে লেখা—
"প্রথম চাল: তোমাকে বাড়িতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে।"
মেহরিনের বুক ধড়ফড় করতে লাগল।
তারপর নিচে আরও একটা লাইন।
"দ্বিতীয় চালের জন্য অপেক্ষা করো। তোমার ঘরের দরজা কেউ খুলবে না—কারণ দরজা খুলবে তুমি নিজেই।"
মেহরিন দ্রুত দরজার দিকে তাকাল।
দরজা তখনো খোলা।
হঠাৎ—
ঠাস!
দরজাটা নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে গেল।
মেহরিন ছুটে গিয়ে হাতল ধরল।
লক করা।
"কে?"
কোনো উত্তর নেই।
সে আবার টান দিল।
দরজা খুলল না।
ঠিক তখনই বিছানার নিচ থেকে খুব ক্ষীণ একটা শব্দ এল।
খসখস...
মেহরিন স্থির হয়ে গেল।
আবার শব্দ।
খসখস...
তারপর একটা ফিসফিস কণ্ঠ—
"মেহরিন..."
সে ধীরে ধীরে নিচে তাকাল।
বিছানার নিচে অন্ধকার।
কেউ নেই।
কিন্তু একটা জিনিস দেখা যাচ্ছে।
একটা পুরোনো কালো বাক্স।
মেহরিন হাঁটু গেড়ে বসে বাক্সটা টেনে বের করল।
বাক্সের ওপর খোদাই করা—
M
তার হাত কাঁপতে লাগল।
সে বাক্স খুলল।
ভেতরে একটা পুরোনো ডায়েরি।
ডায়েরির প্রথম পাতায় লেখা—
"যদি মেহরিন কখনো এই ডায়েরি খুঁজে পায়, তাহলে বুঝবে—আরিশ তাকে সত্যিটা বলেনি।"
মেহরিনের চোখ স্থির হয়ে গেল।
"আরিশ..."
তারপর সে পরের পাতাটা খুলল।
সেখানে মাত্র একটি বাক্য—
"আরিশ আমার মেয়েকে ভালোবাসে না। সে তাকে ব্যবহার করছে।"
মেহরিনের বুকের ভেতরটা হঠাৎ শূন্য হয়ে গেল।
কয়েক মিনিট আগেও যে মানুষটার চোখে সে অদ্ভুত আকর্ষণ দেখেছিল, যে মানুষটা তাকে এই বাড়ির বিপদ থেকে রক্ষা করার কথা বলেছিল—তার সম্পর্কেই তার মৃত মা এমন কথা লিখে গেছেন।
মেহরিন ডায়েরিটা শক্ত করে ধরে রইল।
তারপর হঠাৎ দরজার ওপাশ থেকে আরিশের কণ্ঠ ভেসে এল।
"মেহরিন?"
সে উত্তর দিল না।
কয়েক সেকেন্ড পর আরিশ আবার বলল,
"দরজা খোলো।"
মেহরিন ডায়েরির দিকে তাকাল।
তারপর দরজার দিকে।
"কেন?"
ওপাশে নীরবতা।
তারপর আরিশের কণ্ঠ আরও নিচু হয়ে এল।
"কারণ তোমার হাতে যে ডায়েরিটা আছে, সেটা তোমার মায়ের নয়।"
মেহরিনের শরীর শিউরে উঠল।
"তাহলে কার?"
দরজার ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এল না।
শুধু কয়েক সেকেন্ড পর আরিশ বলল,
"যে মানুষটা এটা লিখেছে... সে এখনো বেঁচে আছে।"
মেহরিনের হাত থেকে ডায়েরিটা প্রায় পড়ে যাচ্ছিল।
আর ঠিক তখনই—
ঘরের আয়নায় তার নিজের প্রতিবিম্বের পাশে আরেকটা প্রতিবিম্ব দেখা গেল।
একজন নারী।
সাদা পোশাক।
লম্বা চুল।
মেহরিন ধীরে ধীরে আয়নার দিকে তাকাল।
নারীটা তার ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে।
কিন্তু ঘরের ভেতর—
কেউ নেই।
আয়নার নারীটা ঠোঁট নাড়ল।
"আরিশকে বিশ্বাস কোরো না..."
তারপর আলো নিভে গেল।
চলবে......

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন