আজকের সাভারের সকালটা অন্যরকম। সাভারের মানুষজন নিজেদের কাজে ব্যস্ত। মহিলারা নিজেদের কাজে এদিক ওদিক ছুটাছুটি করছে তো পুরুষেরা নিজেদের কাজে বেরিয়ে পড়ছে।
মাহফুজ রহমানের নিজস্ব একটা কাপড়ের দোকান আছে। তিনি সকাল দশটায় বের হয় আবার রাত দশটায় ফিরে আসেন। তিনি এই ব্যবসা দাঁড় করিয়েছেন ছয় বছর হয়েছে।এই ব্যবসার মাধ্যমে তিনি তাদের বাড়িটা একতলা বিল্ডিং করেছে । বাড়িটা তেমন বড় নয় , আবার এত ছোট ও নয় । তাদের বাড়িতে ড্রয়িং রুম সহ মোট ছয়টা রুম আছে একটাতে মেঘলা থাকে, একটাতে মাহির, আরেকটাতে মেহেরুন নাহার ও মাহফুজ রহমান থাকেন ।আর দুইটা তারা মেহমানদের জন্য রেখেছে। তাদের বাড়ির চারপাশে দেওয়াল দিয়ে ঘিরে দেওয়া।দেওয়ালের পাশে বড় বড় সুপারি গাছ , নারকেল গাছ লাগানো।অন্য পাশে একটা সুন্দর ফুলের বাগান। বাগানটা মেঘলা নিজের হাতে তৈরি করেছে। বাগানের একপাশে মেঘলা একটা দোলনা রেখেছে।সে সবসময় বাগান আর দোলনার এখানে সময় কাটায়।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
ঘড়িতে তখন দশটার কাছাকাছি। মাহফুজ রহমান দোকানে জন্য বের হবে । তিনি ডাইনিং টেবিলে বসে নাস্তা করছে পাশে বসা মাহির ও মেঘলা। মেহেরুন নাহার তখন রান্না ঘরে রান্না করছে। মাহফুজ রহমান খেতে খেতে জিজ্ঞেস করলেন,
__পড়াশোনার কি অবস্থা?
মেঘলা বলল,
__সব বিষয় ঠিক আছে শুধু গণিত ছাড়া। গণিতে সমস্যা হয় ।
__একটা কোচিংয়ে পড়তে পারো।
__আচ্ছা ,বাবা ।
মাহফুজ রহমান এবার মাহিরের দিকে তাকালেন। মাহির এবার ক্লাস এইটে পড়ে। বয়স চৌদ্দ বছর। তিনি মাহিরকে জিজ্ঞেস করলেন।
__তোমার কি অবস্থা? সামনে তো পরীক্ষা।
__হ্যাঁ, বাবা।আমি পড়াশোনা ভালোভাবে করি।
__আচ্ছা, ভালোভাবে মন দিয়ে পড়াশোনা কর দুইজন।ঠিক আছে আমি আসি। মেহেরুন আমি গেলাম।
দূর থেকে মেহেরুন নাহার সম্মতি জানিয়ে বলল,
__আচ্ছা আসুন।
মাহফুজ রহমান চলে গেলেন। তিনি যাওয়ার পর মাহির নিজের রুমে চলে গেল। মেঘলা রান্না ঘরে তার মায়ের কাছে গেল।
__মা,
__হুম, বল।
__কি করছো।
__রানা করছি ।দেখতেছোচ না।
__হুম দেখছি ,দাও আমি তোমায় সাহায্য করি ।
__কোনো দরকার নেই। তুই যা এখান থেকে।
__মেঘলা তারপরও গেল না। মায়ের সাথে কাজ করতে লাগলো ।
এইভাবে তাদের পারিবারিক ভাবে দিন কাটে।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
অন্যদিকে ঢাকা শহরের যে যার নিজের কাজে ব্যস্ত থাকে। তাঁরা সকালে অফিসে বের হয়,রাতে ফিরে আসে। তাদের রান্না-বান্না কাজের লোক এসে করে দিয়ে যায়।
কিন্তু চৌধুরী বাড়িতে সবসময় রান্না করে সামিয়া চৌধুরী। তার হাতের রান্না ছাড়া কাজের লোকের হাতের রান্না তাদের ভালো লাগে না। তিনি শুধু রান্না করেন।বাকি কাজ কাজের লোক করে দেয়।
চৌধুরী ভিলাটা একটু বেশি বড়। তাদের বাড়িটা দুই তলা বিশিষ্ট।নিচে বড় একটা ড্রয়িং রুম, এক পাশে রান্নাঘর, আরেক পাশে গেস্ট রুম। আর একপাশে বড় একটা বেডরুম যেটাতে সামিয়া চৌধুরী ও ফারহান চৌধুরী থাকে।
উপরে যাওয়ার জন্য এক পাশে সিঁড়ি দেওয়া আছে ।সিঁড়ি বেয়ে উপরে গেলে সেখানে চারটা রুম একটা অদ্রিজের আরেকটা আয়রার।
তাদের বাড়ির বাইরের চারপাশে দেওয়াল দিয়ে ঘিরে দেওয়া। তাদের একপাশে ফুলের বাগান আরেক পাশে ফলের বাগান বাগানের একপাশে টেবিল চেয়ার রাখা আছে।
এরই মাঝে অদ্রিজ কে সিঁড়ি বেয়ে নামতে দেখা গেল।সে নিচে এসে ডাইনিং টেবিলে বসলো। টেবিলে আগে থেকে বসা ফারহান চৌধুরী, আইরা আর সামিয়া চৌধুরী।
সামিয়া চৌধুরী অদ্রিজকে ব্রেকফাস্ট এগিয়ে দিলেন। অদ্রিজ খেতে শুরু করল । খাওয়া শেষ পর্যায়ে তাকে তার বাবা বললেন,
__অদ্রিজ আজকে একটু তাড়াতাড়ি ফিরিস।
__কেন, বাবা ।
ফারহান চৌধুরী বললেন,
__আজকে মেঘলাদের বাড়িতে যাব ।দেখা করতে ।
অদ্রিজ মাথা নেড়ে বলল,
__আচ্ছা,বাবা তাড়াতাড়ি ফেরার চেষ্টা করবো।
ফারহান চৌধুরী সন্তুষ্টির হাসি দিয়ে মাথা নাড়ায়।
খাওয়া শেষে অদ্রিজ বেরিয়ে গেল। আর সামিয়া চৌধুরী মেঘলার পরিবারকে ফোন দিয়ে বললেন তারা আজকে আসছে।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
এদিকে চৌধুরী বাড়ি থেকে এই খবর আসার সাথে সাথে মেহেরুন নাহার স্বামীকে ফোন দিয়ে সব বললেন।
তারপর তিনি ঘর গোছানোর জন্য লেগে পড়লেন। তিনি আস্তে আস্তে সব তৈরি করতে লাগলেন।
বিকেলে দিকে মাহফুজ রহমান বাড়িতে ফিরলেন। আসার সময় তিনি ফল , মিষ্টি নিয়ে এলেন।
এরই মাঝে মেহেরুন নাহার মেয়ের কাছে একটা নীল রঙের শাড়ি, আর গহনা নিয়ে হাজির হলেন।সেটা দিয়ে আজকে পড়ার জন্য বলে চলে গেলেন।
এদিকে মেঘলা শাড়িটার দিকে তাকিয়ে রইল।তার খুব লজ্জা লাগছে।এই প্রথম কোনো ছেলের সামনে এইভাবে গিয়ে বসবে ।তাও বিয়ের কথা বলার জন্য।এতে তো লজ্জা লাগবে ।হয়তো সব মেয়েদের এই রকম লজ্জা লাগে।
মেঘলা আর কিছু না ভেবে তৈরি হতে লাগলো।
~~~~~~
অদ্রিজ বাড়িতে ফিরে দেখে তার পরিবার সবাই রেডি হয়ে বসে আছে।তাই সে সবার সাথে কথা বলে তাড়াতাড়ি তৈরি হতে গেল।
কিছুক্ষণ পর রেড়ি হয়ে নিচে নেমে আসলো।
তারপর তারা রওনা দিল মেঘলাদের বাড়ির উদ্দেশ্যেই ।
এক ঘন্টা পর তারা মেঘলাদের বাড়ির সামনে উপস্থিত হলো ।গাড়ি থেকে নামতেই আয়রার খুশি দেখে কে।সে চারদিকে চোখ বুলিয়ে বাড়ির চারপাশটা দেখলো । অন্যেরা ও গাড়ি থেকে নেমে প্রথমে বাড়ি ও বাড়ির চারপাশে তাকাল । তাদের চাহনি দেখে বুঝা যাচ্ছে তাঁরা বাড়ি ও চারপাশ দেখে কত মুদ্ধ হয়েছে।
এদিকে মাহির, মেহেরুন নাহার ও মাহফুজ রহমান অদ্রিজদের ভিতরে নিয়ে গেল । তাদের কে সোফায় বসতে দিয়ে মাহফুজ সাহেব ও বসলেন সোফায়।
এইদিকে মেহেরুন নাহার রান্না ঘরে গিয়ে নাস্তা এনে রাখলেন টেবিলে।
তারপর তিনি সামিয়া চৌধুরীর উদ্দেশ্য বললেন,
__অনেক দিন পর দুই বান্ধবীর দেখা হলো ।
মেহেরুন নাহারের সাথে তাল মিলিয়ে সামিয়া ও বললেন,
__হ্যাঁ আমাদের তো সহজে দেখা ও হয় না । অনেক বছর পর দেখা হলো।
তারপর সামিয়া চৌধুরী মাহফুজ সাহেব কে বললেন,
__ভালো আছেন ভাইয়া।
মাহফুজ রহমান ও বললেন,
__হ্যাঁ, ভালো আছি, আপনি কেমন আছেন।আর ফারহান ভাই আপনি কেমন আছেন?
__আমরাও ভালো আছি।
এতক্ষন ধরে অদ্রিজ, আয়রা আর মাহির সবার কথা শুনছিল ।এরই মাঝে মাহফুজ রহমান অদ্রিজ আর আয়রা কে জিজ্ঞেস করলেন,
__কেমন আছো ,বাবারা।
__ আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি, আপনি কেমন আছেন আংকেল।
__আল্লাহর রহমতে আমরাও ভালো আছি ।
অনেক্ষণ কথা বলার পর সামিয়া চৌধুরী মেহেরুন নাহারকে বললেন,
__অনেক্ষণ তো কথা হলো মেহেরুন, এবার তোর মেয়ে কে নিয়ে আয়।
সাথে সাথে মাহফুজ রহমান মেহেরুন কে বললেন,
__যাও মেহেরুন,মেয়েকে নিয়ে আসো।
মেহেরুন নাহার মেয়ের ঘরে গিয়ে দেখলেন। মেঘলা রেড়ি হয়ে বসে আছে।
তিনি মেয়ের দিকে এগিয়ে গেলেন, আর বললেন,
__আজকে তো আমার মেয়েকে অনেক সুন্দর লাগছে।কারো নজর না লাগুক।
এটা শুনে মেঘলা তো লজ্জায় মায়ের দিকে তাকায়ে বলল,
__মা , তুমি আমাকে লজ্জা দিচ্ছো।
মেহেরুন নাহার মেয়ের কথা হেসে ফেললেন।এটা দেখে মেঘলা আবার লজ্জা পেল।
তারপর মেয়ের মাথায় ঘোমটা দিয়ে নিচে ড্রয়িং রুমে নিয়ে আসলেন।এনে তিনি মেঘলা কে তার বাবা পাশে বসিয়ে দিলেন।
মেঘলা অস্বস্তিতে উপরের দিকে চোখ তুলে তাকাল না।
অদ্রিজ একবার তাকাল মেঘলার দিকে , তখন মেঘলা ও কি মনে করে তাকালো। সাথে সাথে দুইজন চোখাচোখি হয়ে গেল তারপর দুজনে অস্বস্তিতে চোখ নামিয়ে নিল।
কিন্তু সে কয়েক সেকেন্ডের নিরবতা যেন দুজনের মনে অদ্ভুত একটা চাপ রেখে গেল।
মাহফুজ সাহেব হেসে বলল,
__তোমরা চাইলে একটু কথা বলতে পারো।
মেঘলার বুকের ভেতর ধুকপুক শুরু হয়ে গেল।
অদ্রিজ শান্ত গলায় বলল,
__চলুন।
মেঘলা ধীরে উঠে দাঁড়ালো।
দুজন বারান্দা দিকে এগিয়ে গেল।
কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না।
শেষ পর্যন্ত অদ্রিজই বলল,
__আপনি কি খুব অস্বস্তি বোধ করছেন।
মেঘলা চমকে তাকাল।
__না..মানে... একটু।
অদ্রিজের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটল।
__স্বাভাবিক।
মেঘলা সাহস করে জিজ্ঞেস করল,
__আপনি সব সময় এত চুপচাপ থাকেন?
__সব সময় না।
__তাহলে?
__যখন প্রয়োজন হয় তখন কথা বলি।
মেঘলা মনে মনে বলল,"এত গম্ভীর!"
তারপর অদ্রিজ জিজ্ঞেস করল,
__আপনি কিসে পড়ছেন?
__কলেজে,ফার্স্ট ইয়ারে পড়ি।
__কোন বিষয়টা সবচেয়ে ভালো লাগে?
মেঘলা একটু থেমে বলল,
__গণিত ছাড়া সব।
অদ্রিজ প্রথমবার একটু জোরে হেসে ফেলল।
__আপনি হাসতেও পারেন?
অদ্রিজ ভ্রু তুলে বলল,
__কেন, আমাকে দেখে মনে হয় না?
মেঘলা এবার নিজের অজান্তেই হেসে ফেলল।
অদ্রিজ বলল,
__আমি গণিত পড়ায়।
মেঘলা সঙ্গে সঙ্গে মুখ কুঁচকে ফেলল।
__জানি।
__আর আপনি গণিত ভয় পান?
মেঘলা অবাক হয়ে তাকাল।
__আপনি জানলেন কিভাবে?
__আপনার মুখ দেখে বোঝা যাচ্ছে।
মেঘলা লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেলল।
অদ্রিজ মৃদু স্বরে বলল,
__ভয় পাওয়ার কিছুই নেই। সব অংক কঠিন হয় না।
মেঘলা মনে মনে বলল,
"আপনার কাছে হয়তো কঠিন না"
কিন্তু মুখে কিছু বলল না।
দুজনের প্রথম কথোপকথন খুব ছোট ছিল।
তবুও সেই ছোট কথাগুলোর মাঝে যেন অচেনা দুজন মানুষের মধ্যে পরিচয় প্রথম দরজা খুলে গেল।
আর দূরে থাকলে আয়রা মুচকি হেসে সব কিছু দেখছিল। তারপর সে চলে গেল সবার কাছে।
এদিকে অদ্রিজ আর মেঘলা তাদের কথা শেষ করে সবার কাছে চলে আসে।
তারপর সবাই কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে যায়। এভাবেই অনেক্ষণ কাটার পর অদ্রিজরা নিজেদের বাড়ির দিকে রওনা হয়।
চলবে.....