পর্ব ৩
লেখিকা : নন্দিনী
সকালের আকাশটা আজ অদ্ভুত সুন্দর।
সাভারের শ্যামপুরের রহমান বাড়ির উঠোনে রোদের ঝিলিক পড়েছে। গাছের পাতাগুলো হালকা বাতাসে দুলছে। বাড়ির সবাই নিজেদের কাজে ব্যস্ত হলেও আজকের ব্যস্ততার মধ্যে অন্যরকম একটা আনন্দ মিশে আছে।
মেঘলা কে দেখতে আসার পর অনেকদিন কেটে গেছে। মেঘলা আর অদ্রিজ ওই দিন সম্মতি দিয়েছিল বিয়ে নিয়ে। তাদের এই বিয়েতে আপত্তি নেই।
~~~~~~~~~~~
তাই আজ দুই পরিবার বসবে একটা সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য। এখন দুই পরিবার আনুষ্ঠানিকভাবে সম্পর্কটা পাকা করতে চাই।
আর আজই ঠিক হবে_
বিয়েটা কবে ?
মেঘলাদের বাড়ির সামনের দিকে ছোট একটা উঠান। পাশে কয়েকটা টবের গাছ। সদর্য দিয়ে ঢুকতে ড্রয়িং রুম টা দেখা যায়। সেখানে অতিথিরা এসে বসে। দেয়ালে পরিবারের পুরনো কিছু ছবি, কাঠের শোকেসে সাজানো কিছু স্মৃতিচিহ্ন আর জানালার পাশে কয়েকটি টব_ সব মিলিয়ে বাড়ি এটা একটা আপন আপন অনুভূতি আছে।
আজ সেই বাড়িতে যেন একটু বেশি ব্যস্ততা।
কারণ আজ সন্ধ্যায় অতিথি আসবে ।
সাধারণ কোনো অতিথি নয়।
অদ্রিজের পরিবার।
~~~~~~~~~~~~~~~
সকাল থেকেই মেঘনার মা মেহেরুন নাহার বাড়িঘর গোছাতে ব্যস্ত। ড্রয়িং রুমের সোফার কুশন গুলো ঠিক করে রাখা হচ্ছে। টেবিলের ওপর নতুন ফুলদানিতে ফুল সাজানো হয়েছে। রান্নাঘরে চলছে নানা রকম আয়োজন। মেঘলা রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে মাকে দেখছিল।
__মা ,এত কিছু বানাচ্ছ কেন?
মেহেরুন নাহার কাজ করতে করতেই বললেন,
__অতিথি আসবে, কিছু তো আয়োজন করতেই হবে।
__কিন্তু এত কিছু?
__আজকের অতিথি একটু বিশেষ।
মেঘলা বুঝতে পারছিল, তার মা ইচ্ছে করে তাকে খেপাচ্ছে।
সে মুখ বাঁকিয়ে বলল,
__আমি কিন্তু ঘরে চলে যাব।
__কোন ঘরে?
__আমার ঘরে।
__যেতে পারিস, তবে ডাকলে আসতে হবে।
মেঘলা কিছু না বলে চলে গেল । নিজের ঘরে ঢুকেই দরজা বন্ধ করে বিছানায় বসে পড়লো।
তার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধুকপুক করছে ।
আজ অদ্রিজের পরিবার আসবে। বিয়ের কথা বলতে।
এই কথাটা ভাবলেই তার ভেতরে অদ্ভুত একটা অনুভুতি হচ্ছিল।
সেটা লজ্জা নাকি উদ্বেগ সে নিজেও বুঝতে পারছে না।
~~~~~~~~~~~~~~~
দুপুরের দিকে মেঘলার ফুফু,ফুপা ও তাদের দুই জমজ মেয়ে মেহরিমা ও মাহিয়া এসেছে।
মেহেরিমা ও মাহিয়া মেঘনার থেকে তিন বছরের ছোট। তারপর ও তাদের সাথে মেঘলার একদম বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক।
মেঘলা তাদের দেখে কিছুটা স্বস্তি পেল।
মেঘলার ফুফু মেহেরুন্নার রহমান ঘরে ঢুকেই বললেন,
__কীরে মেঘলা, এত চুপচাপ কেন?
মেঘলা হেসে বলল,
__কিছু না ফুফু।
ফুফু চোখ ছোট করে তাকালেন।
__কিছু না? আজ তোকে দেখে অনেক কিছু মনে হচ্ছে।
মেঘলা আবার ও ফুফুর কথায় লজ্জা পেল।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যায় নামার আগেই বাড়ির সামনে গাড়ি এসে থামল।
মাহির দৌড়ে জানালার কাছে গেল।
__মা! ওরা এসেছে।
মেঘলা নিজের ঘরে চুল আঁচড়াচ্ছিল। শব্দটা শুনে তার হাত থেমে গেল। কয়েক মুহূর্ত আয়নার দিকে তাকিয়ে রইল সে ।
তারপর তাড়াতাড়ি চিরুনিটি রেখে দিল।
বাইরে যাওয়ার কথা ভাবতেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন অস্থির হয়ে উঠল।
মেহেরিমা আর মাহিয়া এসে মেঘনার দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল,
__মেঘলা আপু ,চলো।
মেঘলা মাথা নেড়ে বলল,
__ তোমরা যাও ।
__তুই আসবি না?
__পরে যাব।
তারা হেসে চলে গেল।
মেঘলা কিছুক্ষণ একা দাঁড়িয়ে রইল।
তারপর ধীরে ধীরে ড্রয়িং রুমের দিকে এগিয়ে গেল।
দরজা দিয়ে ঢুকতেই প্রথমে তার চোখে পড়ল সামিয়া চৌধুরীকে। মেহেরুন নাহার আর সামিয়া চৌধুরী পাশাপাশি বসে গল্প করছেন।
তাদের দেখে মনে হচ্ছিল, তারা যেন কোন গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক আলোচনায় নয়, বরং বহুদিন পর দেখা হওয়া দুই বান্ধবীরা আড্ডায় বসেছেন।
সামিয়া মেঘলাকে দেখে হাত বাড়িয়ে বললেন,
__এসো মা।
মেঘলা ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে সবাইকে সালাম দিলো।
__কেমন আছো?
__ভালো ।
শব্দটা এত আস্তে বের হলো যে পাশে বসা আয়রা হাসি চেপে ফেললো।
মেঘলা সেটা দেখে আরো লজ্জা পেল।
অদ্রিজ তখন বাবার পাশে বসে ছিল।
মেঘলা একবার চোখ তুলে তাকাতে তার সঙ্গে চোখে চোখ পড়ে গেল।
এক সেকেন্ড।
তার বেশি না।
মেঘলা সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে মায়ের পাশে গিয়ে বসলো।
অদ্রিজও আর কিছু বলল না।
শুধু ঠোঁটের কোণে খুব হালকা একটা হাসি ফুটে উঠলো।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
চা নাস্তা আসতে শুরু করল।
মাহফুজ রহমানের ফারহান চৌধুরী নিজেদের মধ্যে নানা কথা বলছিলেন।
সামিয়া হঠাৎ মেহেরুন নাহার এর হাত ধরে বললেন,
__মনে আছে, আমরা কলেজে থাকতে কতবার বলতাম, আমাদের সন্তানদের নিয়ে একদিন কত গল্প করব?
মেহেরুন নাহার হেসে বললেন,
__তখন কি জানতাম, সত্যিই একদিন এভাবে বসতে হবে।
দুজনে হেসে ফেললেন।
মেঘলা চুপচাপ কথাগুলো শুনছিল। তার পাশে বসা আয়রা হঠাৎ ফিসফিস করে বলল,
__আপু, তুমি এত চুপ কেন?
মেঘলা তাকিয়ে শুধু বলল,
__চুপ কর।
আয়রা মুচকি হেসে বলল,
__আচ্ছা।
কথাবার্তা ধীরে ধীরে মূল প্রসঙ্গে চলে গেল। ফারহান বললেন,
__আমরা আগেরবার যে কথাটা বলেছিলাম, সেটা নিয়ে আমাদের পরিবারের সবার মতামত একই।
মাহফুজ মাথা নেড়ে বললেন,
__আমাদের সম্মতি আছে।
মেহেরুন নাহার মেঘলা দিকে তাকালেন।
মেঘলা বুঝতে পেরে আরো নিচু হয়ে বসল।
সামিয়া নরম গলায় বললেন,
__আমরা চাই সবকিছু সুন্দরভাবে হোক। দুই পরিবারের সম্পর্কটা যেন শুধু একটা আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক না হয়।
মেহেরুন নাহার বললেন,
__আমি ও সেটা চাই, মেয়েটা আমার খুব আদরের। ও যেন সবসময় নিজের মতো থাকতে পারে, এটাই আমার সবচেয়ে বড় কথা।
সামিয়া মেঘলার দিকে তাকিয়ে বললেন,
__ও নিজের মতো থাকবে।
মেঘলা প্রথমবার একটু সাহস করে সামিয়ার দিকে তাকাল। তার চোখে এমন এক ধরনের মেয়ে ছিল যে মেঘলার বুকের ভিতর অস্বস্তিটা একটু কমে গেল।
~~~~~~~~
কিছুক্ষণ পর মাহফুজ রহমান বললেন,
__তাহলে একটা তারিখ নিয়ে ভাবা যাক।
মেঘলা চুপ করে গেল।
ঘরের বড়রা ক্যালেন্ডার নিয়ে বসে গেলেন।
একটা তারিখ বলা হলো।
আরেকজন বললেন, সেটা সুবিধার হবে না।
আরেকটা তারিখ উঠল।
সামিয়া হিসাব করে বললেন,
এই তারিখটা আমাদের জন্য ভালো হবে।
মেহেরুন ক্যালেন্ডারের দিকে তাকালেন।
তারপর বললেন,
__১৮ তারিখ কেমন হয়।
ঘরে কয়েক মুহূর্ত নীরবতা।
ফারহান মাথা নেড়ে বললেন,
__আমার ঠিক আছে।
মাহফুজ রহমান বললেন,
__আমাদের ও আপত্তি নেই।
সামিয়া হাসলেন।
__তাহলে ১৮ তারিখেই থাক।
মেহেরুন নাহার মেঘলার দিকে তাকালেন।
__মা ?
মেঘলা আঙ্গুলগুলো তখন ওনার এক কোনা নিয়ে খেলছিল।
সে কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে খুব আস্তে বলল,
__জি..
মা বুঝলেন, এটাই তার সম্মতি।
এরপর সবার চোখ অদ্রিজের দিকে গেল।
অদ্রিজ শান্ত ভাবে বলল,
__আমারও কোন আপত্তি নেই।
কথাটা খুব সাধারণ ছিল ।
কিন্তু মেঘলা কানে সেটা কেমন যেন আলাদা করে বাজল।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~~
তারপর আবার গল্প শুরু হলো।
মাহির সাথে যার পাশে বসে নানান প্রশ্ন করতে লাগল।
আয়রা মেঘলার পাশে বসে ফিসফিস করে বলল,
__আপু, এখন থেকে কিন্তু আমি তোমাকে ছাড়বো না।
মেঘলা হেসে ফেলল।
__ কেন?
__এমনিই।
__তুই খুব দুষ্টু।
__তুমি তো আমাকে পছন্দ করো।
মেঘলা মাথা নেড়ে বলল,
__হুম।
তারপর দুজনে হেসে উঠল।
ড্রয়িং রুমের এক কোণে ফটো রাখ ভবিষ্যৎ নিয়ে পরিকল্পনা করছিলেন।
অন্যদিকে ছোটরা নিজেদের মতো গল্পে ব্যস্ত।
আর মাঝখানে বসে থাকা মেঘলা বারবার নিজের অজান্তে অনুভব করেছিল_
আজকে সন্ধ্যাটা আগের সন্ধ্যাগুলোর মতো নয়।
কিছু একটা বদলে গেছে।
~~~~~~~~~~~~~~~~~~
রাত একটু গাঢ় হলে অদ্রিজের পরিবার উঠতে প্রস্তুত হলো।
সামিয়া মেঘলাকে কাছে ডেকে বললেন,
__মা, ভালো থেকো।
মেঘলা মাথা নিচু করে বলল,
__জি ।
অদ্রিজ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।
মেঘলার সঙ্গে আবার একবার চোখে চোখ পড়ল।
এবারও মেঘলা আগে চোখ সরিয়ে নিল।
অদ্রিজ কিছু বলল না।
শুধু মাথা নেড়ে বিদায় নিল।
গাড়ি চলে যাওয়ার পর বাড়ির সামনে আবার নিরবতা নেমে এলো।
মেঘলা বারান্দায় দাঁড়িয়ে গাড়িটা চলে যাওয়ার দিকটা কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখলো।
তারপর নিজের ঘরে ফিরে এলো।
ফোনটা হাতে নিয়ে দেখল_
সিয়ের একটা মেসেজ।
"সব বলবি কিন্তু"
মেঘলার মুখেও অজান্তেই হাসি ফুটে উঠলো।
সে উত্তরে লিখল_
"হুম।সব বলব।"
তারপর জানালার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।
আকাশে তখন অল্প কিছু তারা।
মেঘলা জানতো না ভবিষ্যৎ কেমন হবে।
শুধু জানতো_
আজ তার জীবনে নতুন একটা তারিখ ঠিক হয়েছে
" ১৮তারিখ "
আর সেই তারিখকে ঘিরে ধীরে ধীরে বদলে যেতে শুরু করেছে তার চারপাশের পৃথিবী।
চলবে....