#এ_দেখা_শেষ_না_হোক #পর্ব - ( ০৪ )
#writer_sumaiya_akter_sathi
--
গাড়িতে বসে আইসক্রিম খাচ্ছে মাহিরা। এমন সময় প্ৰত্যয়ের ঘুম ভেঙ্গে যায়। প্ৰত্যয় উঠে দেখে মাহিরা তার পাশে বসে আইসক্রিম খাচ্ছে। আশে পাশে তাকিয়ে কাউকে দেখতে পেলো না প্ৰত্যয়। মাহিরার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। মাহিরার কোলের উপর অনেক গুলো আইসক্রিম। সে খুব মনোযোগ দিয়ে একটার পর একটা আইসক্রিম খেয়ে যাচ্ছে। প্ৰত্যয় ঢোক গিলে বলল, আপু। তুমি কি একাই সব আইসক্রিম খেয়ে ফেলবে নাকি? আমাকেও কিছু দেও ।
মাহিরা ঘার ঘুড়িয়ে তাকায় প্ৰত্যয়ের দিকে। ভ্ৰু কুচকে বলে, তুই এখনো ছোটো। আইসক্রিম খেলে তোর দাতঁ এই বয়সেই পরে যাবে। প্ৰত্যয় অভিমানী গলায় বলল, তুমি সবসময়ই শুধু আমাকে ছোটো বলো আপু। আমি এখন অনেক বড় হয়েছি। একটা আইসক্রিম দাওনা আপু? মাহিরা এবার তার কোল থেকে আইসক্রিম এর প্যাকেট গুলো প্ৰত্যয় এর দিকে বাড়িয়ে়ে বলে, নে খা। এগুলো সব তোর। সবগুলো ফিনিশ করবি। প্ৰত্যয় খুশি হয়ে আইসক্রিম খেতে খেতে বলে, সত্যিই এগুলো সব আমার আপু? মাহিরা বলে,হ্যা সব তোর। এখন বেশি কথা না বলে চুপচাপ খা। নাহলে সব আবার নিয়ে যাবো। প্ৰত্যয় আর কিছু না বলে আইসক্রিম খাওয়ায় মনোযোগ দেয়।
আছিয়া বেগম ড্ৰয়িং রুমে বসে আছেন। পরী তার পাশে বসা। চার ভাই মিলে কিছু একটা আলোচনা করছে। আছিয়া বেগম এবার বিরক্ত হয়ে বলে, তোমরা আর কতোক্ষন ধরে আলোচনা করবে? বাহিরে যে একজন দাড়িয়ে আছে। তার খেয়াল নেই তোমাদের? তাকে কি আনতে যেতে হবে না? আছিয়া বেগম এর কথা শুনে চারো ভাই আলোচনা থামিয়ে দিলো। শাজাহান শিকদার বললো হ্যা মা সেটা নিয়েই কথা বলছিলাম আমরা। আছিয়া বেগম বলেন, আর কোনো কথা নয় চলো এবার। এই বলে তিনি চার ছেলে ও পরীকে নিয়ে দরজার দিকে পা বাড়ালেন।
গাড়ি থেকে একটু দূরে দাড়িয়ে ফোনে কথা বলেছিলো মোশাররফ হোসেন। বিজনেসের কাজে ইতালি থেকে কল এসেছে তার। তাই কল না ধরে পারলেন না তিনি। কথা শেষে কল কেটে দিলেন মোশাররফ হোসেন। গাড়ির কাছে যাওয়ার জন্য পিছন ঘুরলে থমকে যান তিনি।পরী বেগম দাড়িয়ে আছে তার সামনে। মোশাররফ হোসেন খেয়াল করে দেখলেন পরীর চোখ মুখ ফোলা। তিনি বুঝলেন পরী কেঁদেছে। মোশাররফ হোসেন দু কদম এগিয়ে পরীর সামনে এসে দাড়ালেন। পরীর হাত ধরে জিজ্ঞেস করলেন, কি হয়েছে পরী? ঠিক আছো তুমি?
পরী কোনো উত্তর করলো না। সে তাকিয়ে আছে শুধু তার স্বামীর দিকে। এই মনুষটা তাকে কতো ভালোবাসে। পরী কিছু বলার আগেই এই মানুষটা তার সব কিছু বুঝে যায়। এই মানুষটার ভালোবাসা মাপা পরীর পক্ষে কখনোই সম্ভব ছিলো না। এই মানুষটার ভালোবাসা এতোটা গভীর যে পরী তার সব কিছু ছেড়ে এই মানুষটার হাত ধরে চলে গিয়েছিলো। পরী জানতো তার ভাইরা কখনো তাদের প্ৰেম মেনে নিবো না। তাই তো এই মানুষকে ভালোবেসে সে বাড়ি ছেড়েছিলো পচিঁশ বছর আগে। এই পচিঁশ বছরে এই মানুষটার ভালোবাসা একফোটাও কমেনি। বরং দিন কে দিন ভালোবাসা আরো বেড়েছে।
পরীর চোখে অজান্তেই পানি চলে আসলো।মোশাররফ হোসেন পরীর চোখে পানি দেখে। হাত দিয়ে চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে,
- কাদঁছো কেনো পরী? আমি তো আছি তোমার পাশে। একদম ভেঙ্গে পরবে না। আমি আছি তোমার পাশে সবসময় আর সারাজীবন থাকবো। চলো পরী।
মোশাররফ হোসেন পরীর হাত ধরে গাড়ির দিকে হাটা ধরে। এমন সময় পেছন থেকে কারো কন্ঠস্বর ভেসে আসে , দাড়াও। মোশাররফ হোসেনের পা থেমে যায়। পেছন ঘুরে তাকালে দেখতে পায় আছিয়া বেগম দাড়িয়ে আছে। আছিয়া বেগমের পিছে দাড়িয়ে আছে শাজাহান শিকদার, আনোয়ার শিকদার, জয়নায় শিকদার ও আরমান শিকদার।
সবাইকে একসাথে দেখে মোশাররফ হোসেন কিছুটা ভরকে যায়। সে একবার পরীর দিকে তাকাচ্ছে তো একবার আছিয়া বেগমের দিকে। আছিয়া বেগম উচ্চ স্বরে বলেন, আমার মেয়েকে আবারো আমার কাছ থেকে আলাদা করতে চাইছো? সাহস তো কম না তোমার।
মোশাররফ হোসেন শুকনো ঢোক গিললেন। এই রে,তার শাশুড়ি তো তার উপর ক্ষেপে যাচ্ছে। সে এখন কি করবে? মোশাররফ হোসেন আছিয়া বেগম এর পিছনে থাকা পরীর চার ভাইয়ের দিকে নজর দিলেন। মোশাররফ হোসেন সবাইকেই চিনেন। কিন্তু সবাই একসাথে কেনো এসেছে তিনি বুঝলেন না ? তাকে কি এরা সবাই মারবে নাকি? যে মার পচিঁশ বছর আগে খাওয়ার কথা ছিলো। সে মার হয়তো আজ খেতে হবে তাকে। মোশারফ হোসেন ভেবেই নিয়েছে আজ তার বউয়ের এই চার ভাইদের হাতে মার খেতে হবে। মার খাওয়ার মতোই তো কাজ করেছিলো সে। যাক ব্যাপার না। এখন মার খেলেও শান্তি। পরী এখন তার বউ। আর সেও এখন দুই বাচ্চার বাপ। মারলেও পরীকে তার কাছ থেকে কেউ আলাদা করতে পারবে না।পরক্ষনে আবার ভাবলো, আচ্ছা এই চার ভাই যদি একসাথে তাকে মারতে আসে। তাহলে কি সে পেরে উঠবে এই চার ভাইয়ের সাথে?সে না আলু ভৰ্তা হয়ে যাবে এই চার ভাইয়ের মাঝে?
মোশারফ হোসেন কে হেবলার মতো তাকিয়ে থাকতে দেখে আছিয়া বেগম বলেন, কি হলো কথা বলছো না কেনো? আছিয়া বেগম এর কথা শুনে টনক নড়ে মোশারফ হোসেনের। সে আমতা আমতা করে বলে, না মানে.. পরী তো এখন আমার বউ। আছিয়া বেগমের কাঠখাট জবাব দেন, তো ? পরী তো এখনো আমার মেয়ে। ওকে আমি আর দিবো না।
মোশারফ হোসেন হতভম্ব হয়ে চেয়ে আছেন তার শাশুড়ির দিকে। একবার অসহায় চোখে পরীর দিকে তাকায় সে । তার শাশুড়ি মা কি বললো এটা? পরীকে নাকি দিবে না। পরীকে ছাড়া সে কিভাবে থাকবে?পচিঁশ বছরের সংসার তাদের।এই পচিঁশ বছরে সে পরীকে ছাড়া একদিনও থাকেনি। এখন সে কি করবে? কিভাবে সে পরীকে নিজের সাথে রাখবে? সে তো পরীকে ছাড়া কিছুই ভাবতে পারে না। তার এখন খুব কান্না পাচ্ছে।এখন কি সে কান্না করে শাশুড়ির কাছে পরীকে চাইবে? মনে মনে নিজেকে নিজেই কয়টা গালি দিলো। কেনো সে পরীকে নিয়ে আসতে গেলো এ বাড়িতে? না আসলে তো আজ এইভাবে ফেসে যেতো না । পরীকেও তার থেকে কেউ আলাদা করতে পারতো না।
পরী মুচকি মুচকি হাসছে। মোশাররফ হোসেন কে তার দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে স্বাভাবিক হয়ে বলে, মা আমাদের মেনে নিয়েছে।
মোশাররফ হোসেন চোখ বড়ো বড়ো করে বলে উঠলো, কিহহ..! জোড়ে বলায় উপস্থিত সবাই হতভম্ব হয়ে চেয়ে আছে মোশাররফ হোসেন আর পরীর দিকে। পরী ছোটো করে বলে, কিহ না জ্বি। মোশাররফ হোসেন যেনো এখনো বিশ্বাস করতে পারছেন না কিছু। তাকালো সামনে আছিয়া বেগম এর দিকে। এতো সহজে এরা সব মেনে নিলো ? কিভাবে কি? আবার ভাবলো এতো সহজ কোথায়? পচিঁশ বছর কি কম সময়?
মোশাররফ হোসেন কে দাড়িয়ে থাকতে দেখে আছিয়া বেগম বলে উঠলো, এভাবে দাড়িয়েই থাকবে? নাকি সালাম টালামও করবে শাশুড়িকে? মোশাররফ হোসেন তাড়াতাড়ি এসে সালাম করলো আছিয়া বেগমকে। বলা তো যায় না কখন আবার মন বদলে যায়। তখন যদি আবার পরীকে রেখে দেয়? মোশাররফ হোসেন শাশুড়িকে সালাম করে শাজাহান শিকদার কে সালাম করতে গেলে শাজাহান শিকদার মোশাররফ হোসেনের হাত ধরে ফেলে। মোশারফ হোসেনের দিকে তাকিয়ে বলে, আমি কি তোমার শাশুড়ি?
মোশাররফ হোসেন দুই দিকে মাথা নাড়িয়ে না জানায়। শাজাহান শিকদার বলে ওঠে, তাহলে আমাকে সালাম করছো কেনো? মোশাররফ হোসেন এবার বলে, আপনি তো পরীর বড় ভাই। তাই..।মোশাররফ হোসেন আরো কিছু বলতে যাবে তার আগেই শাজাহান শিকদার বললেন, পরীর ভাই তোমার কি? মোশাররফ হোসেন অবাক চোখে তাকালো শাজাহান শিকদারের দিকে। আমতা আমতা করে বলল, আমারও ভাই ।
শাজাহান শিকদার এবার বললেন, তাহলে ভাই হয়ে ভাইকে সালাম করছো কেনো? ভাইয়ের স্থান তো বুকে। এই বলে মোশাররফ হোসেন কে জড়িয়ে ধরলেন শাজাহান শিকদার। মোশাররফ হোসেনের মনে হলো সে কোনো সপ্নের জগতে আছে। একে একে চারো ভাই মোশাররফ হোসেনের সাথে এসে কোলাকুলি করলো। মোশারফ হোসেন কখনো ভাবেনি এরা তাকে এভাবে আপন করে নিবে।
পরী বেগম দূর থেকে এ দৃশ্য দেখে চোখের পানি আটকাতে পারলেন না। শাড়ির আচল দিয়ে চোখের পানি মুছে নিলেন তিনি । আছিয়া বেগম এগিয়ে এসে বলে, আমার নাতনিরা কোথায়? মোশাররফ হোসেন হেসে বলে, গাড়িতে আছে। আছিয়া বেগম এগিয়ে গেলো গাড়ির দিকে। তার পিছে পিছে সবাই আসছে।
মাহিরা চকলেট খাচ্ছে গাড়িতে বসে বসে। সাথে কিছুটা বিরক্তও লাগছে তার। আর কতোক্ষন এইভাবে গাড়িতে বসে থাকবে? বাহিরে নেমে একটু হাটা চলা করলে হয়তো ভালো লাগতো মাহিরার। কিন্তু তার বাবা বারবার বলে গিয়েছে গাড়ি থেকে বের না হতে। এমনিতেই সে বাংলাদেশের কিছু চিনেনা। তার উপর অপরিচিত জায়গা তাই মাহিরাও বের হলো না গাড়ি থেকে।প্ৰত্যয় আইসক্রিম খাচ্ছে তার পাশে বসে বসে।
মাহিরা মনে মনে ভাবে ছেলেটা এতো খাদক কেনো? সব আইসক্রিম গুলো খেয়ে শেষ করে ফেলেছে। পরক্ষনে মনে মনে বিরবির করে আরে এটা তো আমারই ভাই। মাহিরা গাড়ির জানালা দিয়ে বাহিরে তাকিয়ে তার বাবা কে খুজতে লাগলো। এমন সময় একজন বয়স্ক মলিহা এসে দাড়ালেন গাড়ির জানালার পাশে। বয়স্ক মহিলাটি তার দিকে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। মহিলাটির গায়ের রং ফৰ্সা। বুড়ো হলেও দেখতে যে একসময় বেশ সুন্দরী ছিলো মাহিরা সেটা বুঝলো। মাহিরা প্ৰথমে কিছুটা ভয় পেলেও বয়স্ক মহিলার উদ্দেশ্য জিজ্ঞেস করে, কিছু বলবেন?
বয়স্ক মহিলাটি মাহিরার দিকে তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ। তারপর বললো, নাম কি তোমার? মাহিরা কিছুটা বিব্ৰতবোদ করলো। জানা নেই, কওয়া নেই এক অচেনা মানুষ তার নাম জিজ্ঞেস করছে? মাহিরার কি তার নাম বলা ঠিক হবে? পরক্ষনে ভাবলো নাম বলাই যায় মহিলা মানুষ। পুরুষ মানুষ হলে নাহয় বলতো না। মাহিরা বয়স্ক মহিলার দিকে চেয়ে বলে, জ্বী আমার নাম মাহিরা।
আছিয়া বেগম মাহিরাকে ভালো ভাবে পরখ করে দেখলেন। মেয়েটা অনেক সুন্দর। একদম পরীর মতো দেখতে। আছিয়া বেগম মাহিরার দিকে চেয়ে বললেন, তুমি তো একদম তোমার মায়ের মতো দেখতে হয়েছো। মাহিরা অবাক চোখে তাকিয়ে বলে, আপনি কিভাবে আমার আম্মুকে চিনেন? আছিয়া বেগম হেসে বলে, নিজের মেয়েকে নিজেই চিনবো না?
মাহিরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই মোশাররফ হোসেন উপস্থিত হয় সেখানে। মাহিরার উদ্দেশ্য বললেন, আম্মু ভাইকে নিয়ে গাড়ি থেকে বের হও। মাহিরা মোশাররফ হোসেন কে দেখে সাহস পেলো। প্ৰত্যয় কে নিয়ে গাড়ি থেকে বের হয় সে।
গাড়ি থেকে বের হয়ে মাহিরা দেখে তার মা দাড়িয়ে আছে সেই বয়স্ক মহিলাটির সাথে। মাহিরা কিছুটা ভ্ৰু কুচকালো। পত্যয়ও কিছু বুজলো না তারা কোথায় এসেছে। আছিয়া বেগম প্রত্যয়কে জিজ্ঞেস করলেন, তোমার নাম কি নানুভাই?
প্রত্যয় হাসি মুখে বলে, আমার নাম সানজিদ ইসলাম প্রত্যয়। সবাই প্রত্যয় বলে ডাকে। মাহিরা এবার তার বাবার দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো, আব্বু আম্মুর পাশে যে দাড়িয়ে আছেন উনি কে?
মোশাররফ হোসেন হেসে জবাব দেন, উনি তোমাদের নানু হয়। সালাম দেও নানুকে। প্ৰত্যয় মাহিরা দুইজনই অবাক চোখে চেয়ে আছে আছিয়া বেগমের দিকে। তারপর দুইজনই একত্ৰে সালাম দেয় আছিয়া বেগম কে। আছিয়া বেগম হেসে সালামের জবাব দিলেন। শাজাহান শিকদার এগিয়ে আসলো মাহিরাদের দিকে। মাহিরা এতক্ষণ খেয়াল না করলেও এখন সে খেয়াল করলো আছিয়া বেগম এর পিছনে চারজন মানুষ দাড়িয়ে আছে। মাহিরা দেখলো একজন তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। মাহিরা অবুঝের মতো তার বাবার দিকে চাইলো। মোশাররফ হোসেন বুঝতে পারলেন মাহিরা কি জানতে চায়। মাহিরা কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই মোশাররফ হোসেন বরলেন, ওনারা চারজন তোমাদের মামা হয়। সালাম দাও মামাকে । মাহিরা পত্যয় সালাম দিলো সবাইকে।শাজাহান শিকদার সালামের উওর দিয়ে বলে, আমি তোমাদের বড়ো মামা। আজ থেকে আমাকে মামা বলে ডাকবে। ঠিক আছে। মাহিরা প্ৰত্যয় অবুঝের মতো মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়।শাজাহান শিকদার এক এক করে বাকি তিন ভাইয়ের সাথেও পরিচয় কবিয়ে দিলেন। মাহিরার মনে হলো সে কোনো ঘোড়ের মধ্যে আছে। সব তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।
আছিয়া বেগম এবার বলল,অনেক পরিচয় পৰ্ব হয়েছে। এখন চলো সবাই। ভেতরে যাওয়া যাক।ভেতরে সবাই অপেক্ষা করছে। আছিয়া বেগম পরীর হাত ধরে গেট পেড়িয়ে ভেতরের দিকে পা বাড়ালেন। তার পিছে পিছে চার ভাইও গেলেন। মোশাররফ হোসেন নিজেও মাহিরা আর প্ৰত্যয় কে নিয়ে গেট পেড়িয়ে যেতে লাগলেন ভেতরের দিকে। মাহিরা গেট পেরিয়ে চোখ ঘুড়িয়ে ঘুড়িয়ে শুধু সাদা বাড়িটা দেখছে। বাড়ির চারোপাশ ইটের বাউন্ডেরি। বড়ো গেট থাকায় এতোক্ষণ মাহিরা বাড়িটা ভালোভাবে দেখতে পারেনি। কিন্তু এখন সে স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে রাজকীয় বাড়িটাকে। বাড়িতে দেখতে বেশ সুন্দর লাগলো মাহিরার কাছে। যে বাড়িটা বানিয়েছে তার রুটির খুব প্রশংসা করলো মাহিরা।
মেইন গেট পেড়িয়ে সবাই বাড়ির দরজার সামনে এসে দাড়ালেন। এমন সময় তাদের মাথায় ফুলের বৃষ্টি পরতে শুরু করে। সাথে একসাথে কিছু কন্ঠস্বর ভেসে আসে, ওয়েলকাম টু আওয়ার হাউস। মাহিরা অবাক হয়ে উপরে তাকায়। কয়েকটা ছেলে মেয়ে দাড়িয়ে আছে উপরে খোলা বেলকনিতে। সবার হাতে ফুলের পাপড়ি। সেগুলো উপর থেকে ছিটিয়ে দিচ্ছে তারা। আছিয়া বেগম এবার উচ্চ স্বরে বলে ওঠলেন,ওরে তোরা থাম এবার। ফুল দিয়ে তো একদম গোসল করিয়ে দিলো। বেলকনিতে দাড়িয়ে থাকা মুসকান, অভি, আদি আর নুপুর একসাথে চিল্লিয়ে বলে ওঠে, সরি দাদি।
মাহিরা অবাক হয়ে চেয়ে আছে। আশে পাশে চেয়ে দেখলো সবাই ইতিমধ্যে ফুল দিয়ে গোসল করে ফেলেছে। প্ৰত্যয় নাক ছিটকে বলে, ইশশ আপু। দেখো তো আমাকে একদম ফুল দিয়ে গোসল করিয়ে দিয়েছে। প্ৰত্যয় এর কথা শুনে মাহিরা ফিক করে হেসে দেয় । আছিয়া বেগম প্রত্যয় কে দেখে বলে, সরি নানুভাই। ওই বাদর গুলো তোমাকে ফুল দিয়ে গোসল করিয়ে দিলো। প্ৰত্যয় আছিয়া বেগমের দিকে চেয়ে হাসি মুখে বলল, ইটস ওকে নানু। মাহিরা প্ৰত্যয় এর গা থেকে ফুলের পাপড়ি গুলো ঝেড়ে দেয়। মাহিরার গায়েও ফুলের পাপড়ি পড়েছে অনেকগুলো সেগুলোও ঝেড়ে নিলো মাহিরা। তারপর একে একে বাড়ির ভেতরে প্ৰবেশ করলো সবাই।
শাজাহান শিকদার আগে থেকে বাড়ির ভেতরে এসে বলেন, কইগো মালিহা। কোথায় তুমি? তাড়াতাড়ি এসো এদিকে। মালিহা বেগম রান্না ঘর থেকে মিষ্টির বাটি হাতে নিয়ে বের হলেন। বললেন, এইতো এসে গেছি। শাজাহান শিকদার হেসে বলেন যাও ওদের মিষ্টি মুখ করাও। মালিহা বেগম এগিয়ে গেলো দরজার দিকে। প্ৰথমে মোশাররফ হোসেন কে তরপর পরীকে, মাহিরা, প্ৰত্যয় একে একে সকলকে মিষ্টি মুখ করালেন মালিহা বেগম। সবাই কে নিয়ে ড্ৰয়িং রুমে বসিয়ে দিলেন তিনি। তারপর রান্নাঘরে চলে গেলেন নাস্তা আনতে।
মাহিরা অবাক হয়ে চেয়ে আছে। এতো এতো খাবার তার সামনে। মাহিরা খেয়েছে কিছু। কিন্তু এতো খাবার কি খাওয়া যায় নাকি? আরেক দিকে প্ৰত্যয় তার পাশে বসে একের পর এক খেয়েই যাচ্ছে। মাহিরা বিরক্ত হলো প্ৰত্যয়ের উপর। আশে পাশে তাকিয়ে দেখলো মাহিরা। তার বাবা তার মামাদের সাথে কথা বলছে। আর তার মা তার নানু আর মামিদের সাথে বসে গল্প করছে। মাহিরার দেখে মনে হলো, এই বাড়িটা বাহির থেকে যতটা না সুন্দর। ভেতর থেকে তার চেয়ে হাজারগুন বেশি সুন্দর।
মাহিরার ভাবনার মাঝেই হঠাৎ একটা হাত ভেসে আসলো মাহিরার দিকে। হায়..! আমি মুসকান। মাহিরা তাকিয়ে দেখলো সামনে থাকা মেয়েটির দিকে। মেয়েটি তারই বয়সি হবে। মেয়েটি হাত বাড়িয়ে আছে তার দিকে। মাহিরা মুচকি হেসে মেয়েটির সাথে হেনসেক করে বলল, হ্যালো। আমি মাহিরা।পাশ থেকে আরো একটি মেয়ের হাত বেড়িয়ে আসে। আমি হলাম নুপুর। মাহিরা হেসে নুপুরের সাথে হাত মিলিয়ে বলে, আর আমি হলাম মাহিরা। পরপর আদি এসে বলে, আমার নাম আদি আর ওর নাম..। বলতে পারলো না আদি। তার আগেই আদিকে থামিয়ে দিয়ে অভি বলে ওঠে, এই আমার নাম আমি বলবো। আমার নাম অভি। মাহিরা হেসে দিলো অভির এমন কান্ড দেখে।
পিছন থেকে আরো একটা কন্ঠস্বর ভেসে আসলো।আর আমার নাম প্ৰত্যয়। সবাই ঘার ঘুড়িয়ে তাকালো প্ৰত্যয়ের দিকে। প্ৰত্যয় মুখ ফুলিয়ে বসে আছে। মুখ ফুলিয়ে বলল, সবাই দেখছি আমি ছোটো বলে আমাকে কেউ পাত্তাই দিচ্ছে না। সবাই প্রত্যয় এর কথা শুনে হেসে ফেললো। পরপর একে একে প্ৰত্যয় এর কাছে এসে পরিচিত হলো।
______
আয়ান ল্যাপটপে অফিসের কিছু কাজ করছে। অনেকক্ষণ যাবত সে ল্যাপটপের সামনে বসে আছে। হাতের কাজ শেষ কর আয়ান চেয়ার থেকে উঠে দাড়ার। হাত ঘড়ির দেখে নেয় কটা বাজে। ঘড়ির কাটা তখন বিকাল পাচঁটার ঘরে। আয়ান কাবাট থেকে একটা ব্লাক শাৰ্ট বের করে গায়ে জড়িয়ে নেয়। টেবিলের উপর থেকে ফোন আর মানিব্যাগ নিয়ে পকেটে রাখে। তারপর শাৰ্টের হাতা কুনুই পৰ্যন্ত ফোল্ট করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
মুসকান মাহিরাকে নিয়ে ছাদে এসেছে। মাহিরা ছাদে উঠে বেশ অবাক হলো। পুড়ো ছাদে হরেক রকমের ফুল ও ফলের গাছ। মাহিরা অবাক হয়ে মুসকান কে জিজ্ঞেস করল, তোমাদের বাড়িতে এতো গাছ কে লাগিয়েছে? মুসকান হেসে বলে, কে আর লাগাবে? আমার ভাই লাগিয়েছে। আমার ভাই তো গাছ প্রেমি। যখন যেখানে যায় সুযোগ পেলেই গাছ কিনে নিয়ে আসে। মাহিরা হেসে বলে, ছেলেরাও গাছ প্রেমি হয়? মুসকান বলল, হ্যা। অবশ্যই হয়। মাহিরা আর কিছু বললো না । মুসকান ঘুড়ে ঘুড়ে মাহিরাকে পুড়ো ছাদ দেখাচ্ছে। মাহিরাও খুশি মনে সবটা দেখছে।
মুসকান হঠাৎ একটা গোলাপ ফুল গাছ থেকে গোলাপ ছিড়ে মাহিরার কানে গুজে দেয়। তারপর মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, তুমি অনেক সুন্দর মাহিরা। মাশাআল্লাহ। মাহিরা অবাক চোখে চেয়ে থাকে মুসকানের দিকে। মেয়ে হয়েও মেয়েকে সুন্দর বলছে এই মেয়ে? পরপর মাহিরা নিজেও একটা ফুল ছিড়ে মুসকানের কানে গুজে দিয়ে বলে, আর তুমি মায়াবতী। মুসকান ফিক করে হেসে ফেললো। বলল, আমি মায়াবতী কেনো? মাহিরা মুচকি হেসে বলে, কারন তোমার চেহারায় একটা মায়া মায়া ভাব আছে। মুসকান মাহিরার কথা শুনে আবারো হেসে ফেললো। মাহিরা এবার বলল, তোমাদের বাড়িটা কিন্তু অনেক সুন্দর মুসকান। মুসকান মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলল, হ্যা আমার ভাইয়া অনেক শখ করে বাড়ির সব কাজ করিয়েছে। বেশিদিন হয়নি । এই ধরো এক বছর হবে হয়তো। তাই তো এখনো নতুনের মতো আছে। ভাইয়া নিজে দাড়িয়ে থেকে একটা একটা করে বাড়ির সব কাজ করিয়েছেন। আগে এতোটা সুন্দর ছিলো না যদিও। মাহিরা আনমনে বলে উঠলো, তোমার ভাইয়ের রুচি খুব ভালো। বলতেই হবে। মুসকান হেসে বলে, তা ঠিক বলেছো।
আয়ান সিড়ি বেড়ে নিচে নেমে আসলো। ড্ৰয়িং রুমে আছিয়া বেগম সহ তার বাপ চাচাদের সকলকে বসে থাকতে দেখলো। আয়ান তার বাবার সাথে একটা অচেনা লোককে বসে কথা বলতে দেখে। আছিয়া বেগমের পাশেও একজন অচেনা মহিলাকে বসে থাকতে দেখেলো। আয়ান চিনলো না কাউকেই। পরক্ষনে ভাবলো সামনে নাবিলার বিয়ে। তাই হয়তো কোনো মেহমান এসেছে বাড়িতে। আয়ান ড্ৰয়িং রুমের পাশ কাটিয়ে দরজার দিকে হেঁটে যাওয়ারজন্য পা বাড়ালে শাজাহান শিকদারের ডাক পরে।
আরিয়ান এদিকে এসো। আয়ানের পা থেকে যায়। এ বাড়িতে তার বাবা ছাড়া এ নামে তাকে কেউ ডাকে না। আয়ান উল্টো ঘুরে তার বাবার পাশে এসে দাড়ায়। বলে, কিছু বলবে বাবা? শাজাহান শিকদার সামনে বসা পরীর দিকে ইশারায় দেখিয়ে বলে, চিনো ওকে? আয়ান সামনে বসা পরী বেগমের দিকে একবার চেয়ে বলল, না। আমি কিভাবে চিনবো?
পরী বেগম ছলছল চোখে চেয়ে আছে আয়ানের দিকে। শাজাহান শিকদার আয়ানের দিকে চেয়ে বলেন, উনি তোমাদের ফুপ্পি হয়। আয়ান জোড়ে বলে ওঠে, হোয়াট? শাজাহান শিকদার দীৰ্ঘ শ্বাস ফেলে বলেন, হ্যা এটাই সত্যি। ও তোমাদের আপন ফুপ্পি। আমাদের চার ভাইয়ের একমাত্ৰ বোন। এতো বছর ওর সাথে আমাদের কোনো যোগাযোগ ছিলো না। তাই তোমরা কেউ ওকে চিনবে না এটাই স্বাভাবিক।
আয়ান কিছু বলতে যাবে তার আগে পরী বেগম আয়ানের হাত ধরে বলল, বাবা আয়ান । আয়ান এবার পরী বেগমের দিকে তাকায়। আয়ানের কাছে মনে হলো মহিলাটি বেশ সুন্দরী। আয়ান কিছু বলল না। পরী বেগম আবারো বলে ওঠে, মালিহা দেখো আমাদের সেই ছোট্ট আয়ান আজ কতো বড়ো হয়ে গিয়েছে।
মালিহা বেগম এর দিকে চেয়ে আবারো বললেন, তোমার মনে আছে মালিহা আয়ান ছোটোবেলায় কতো দুষ্টো ছিলো ? তুমি যখন ওকে বকা দিতে বা মারতে তখন আয়ান দৌড়ে এসে আমার পিছনে লুকোতো। আর বলতো ফুপ্পি আমাকে বাচাও, আমাকে বাচাও। তুমি মারলে তোমার হাতে খেতে চাইতো না। আমি খাইয়ে দিলে তারপর খেতো। মালিহা বেগম এবার হেসে বলেন, হ্যা মনে আছে পরী। জানো পরী তুমি যখন চলে গিয়েছিলে তখন ও তোমাকে দেখতে না পেয়ে অনেক কান্না করেছিলো। শুধু বলতো ফুপ্পিকে এনে দাও। ওর বাবা ধমক দিলে তারপর কান্না থামাতো।
আয়ায় চেয়ে দেখলো পরী বেগমের চোখে পানি।হাতের দিকে চেয়ে দেখলো পরী বেগম এখনো তার হাত ধরে রেখেছে। চোখের পানি মুছে পরী বেগম আবারো আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল, তুই আমাকে সত্যিই চিনতে পারিস নি আয়ান? আমি তোর ফুপ্পি। মনে নেই আমার কথা?
আয়ান পরী বেগমের কথায় কিছু বলল না। সে শুধু তাকিয়ে থাকলো পরী বেগমের দিকে। আয়ান ভাবছে, এই মানুষটার পিছনে সে ছোট বেলায় লুকিয়ে থাকতো? মার খাওয়ার ভয়ে? এই মানুষটার হাতে সে ভাত খেয়েছে? আবার কান্নাও করেছে এই মানুষটা চলে যাওয়ায়? আয়ান পরী বেগমের দিকে তাকিয়ে সহসাই বলে ওঠে, আমার কিছু মনে নেই। পরী বেগম আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল, তুই তো তখন ছোটো। তিন বছর বয়স তোর। মনে থাকবে না এটাই তো স্বাভাবিক। অর্নবের বয়স তখন দুই বছর। তোদের দুইজনকে আমি খুব আদর করতাম। একবার ফুপ্পি বলে ডাকবি আয়ান ?
আয়ান পরী বেগমের দিকে চেয়ে আনমনে বলে উঠলো, ফুপ্পি। আয়ানের মুখে ফুপ্পি ডাক শুনে পরী বেগম খুশি হয়ে আয়ানকে জড়িয়ে ধরলেন। আয়ান অবাক হলো। একটা ফুপ্পি ডাক শুনে কি কেউ এতো বেশি খুশি হতে পারে? আয়ানকে জড়িয়ে ধরে পরী বেগম বলে উঠলো, পচিঁশ বছর পর তোর মুখে ফুপ্পি ডাক শুনলাম বাপ। আয়ান কিছুই বললো না। তার এখনো সবটা ঘোলাটে লাগছে। সব মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে তার। পরী বেগম আয়ানকে ছেড়ে দিলেন।
শাজাহান শিকদার মোশাররফ হোসেন কে দেখিয়ে বলেন, আরিয়ান ইনি তোমার ফুফা হন। পরীর হাজবেন্ড। নাম মোশারফ হোসেন। আয়ান ছোট করে মোশারফ হোসেন কে সালাম দেয়। মোশারফ হোসেন সালামের উত্তর দিয়ে বলে, আমাদের সাথে এসে বসো আয়ান। একসাথে নাস্তা করি। আয়ান মোশাররফ হোসেনের দিকে চেয়ে মৃদু হেসে বলল, না ফুফা। বসতে পারবো না। আমাকে যেতে হবে। একটা ইম্পর্টেন্ট কাজ আছে । মোশারফ হোসেন হেসে বললেন, ঠিক আছে। পরে কথা হবে তোমার সাথে। আয়ান শাজাহান শিকদারের থেকে বিদায় নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যায়।
মাহিরা আর মুসকান ছাদ থেকে ফিরে এসেছে অনেকক্ষণ হলো। এসে শাওয়ার নিয়েছে মাহিরা।এখন সবাই মিলে মুসকানের রুমে বসে গল্প করছে। মাহিরা তার ইতালির সব ঘটনা বলছে ওদের। সবাই মনোযোগ দিয়ে শুনছে মাহিরার কথা। এমন সময় রুমে প্ৰবেশ করর নাবিলা। নাবিলাকে দেখে মুসকান বলে ওঠে, আরে নাবিলা আপু। কই ছিলে তুমি ? বাড়িতে তো অনেক কিছু ঘটে গিয়েছে। আমাদের ফুপ্পি এসেছে জানো? আর তুমি এখন আসলে? নাও পরিচয় হও। এই হলো মাহিরা। আমাদের একমাত্ৰ ফুপ্পির একমাত্ৰ মেয়ে।
নাবিলা বাড়িতে ছিলোনা। বিয়ের কেনাকাটা করতে গিয়েছিলো সে। প্ৰতিদিন টুকটাক কেনাকাটা চলছেই তার। নাবিলা সন্ধ্যার পর বাড়ি এসে আছিয়া বেগমের কাছে শুনেছে সবকিছু।নাবিলা হেসে বলে, হ্যা শুনলাম তো দাদির কাছে সবকিছু। ফুপ্পির সাথেও দেখা করে এসেছি। নাবিলা এসে মাহিরার পাশে বসে। মাহিরাকে খুটিয়ে খুটিয়ে দেখে বলে, মাশাআল্লাহ। তুমি তো দেখি একদম ফুপ্পির মতোই সুন্দরী। একদম পুতুল দেখতে তুমি। মাশাআল্লাহ কারো নজর না লাগুক।
নাবিলার কথা শুনে মাহিরা হেসে বলে, তুমিও অনেক সুন্দর আপু। নাবিলা নিঃশব্দে হাসে। মুসকান আর নুপুর এবার একসাথে বলে ওঠে আর আমরা? নাবিলা ওদের দিকে তাকিয়ে ওদের ক্ষেপানোর জন্য বলে, তোদের কথা আর কি বলবো? তোরা তো সারাজীবন পেত্নীই রয়ে গেলি।মুসকান আর নুপুরের চোখ বড়ো বড়ো করে একসাথে বলে ওঠে, কিহহ..? নাবিলা আর মাহিরা ওদের কান্ড দেখে হেসে ফেললো। মাহিরা হেসে বলে, আরে তোমরা মন খারাপ করো না। আপু মজা করছিলো তোমাদের সাথে। মুসকান আর নুপুর এতোক্ষণে সস্তির নিশ্বাস ফেলে। নাবিলা এবার বলে, চলো সবাই নিচে চলো। খেতে ডাকছে তোমাদের।
আয়ানের বাইক এসে থামে একটা বড় মাঠের কাছে। এখানেই পিকনিকের আয়োজন করা হয়েছে। আয়ান বাইক থেকে নামার আগেই সেখানে রাফসান উপস্থিত হয়। রাফসান আয়ান কে দেখে বলে, কিরে তোর এতোক্ষণ লাগলো কেনো আসতে? সেই কখন থেকে ওয়েট করছি তোর জন্য। আয়ান কাউকে কৈফিয়ত দিতে পছন্দ করে না। তাই ছোটো করে বলল,কাজ ছিলো।বাইক থেকে নেমে আয়ান সামনের দিকে হাটা শুরু করে। রাফসানও আয়ানের পিছু পিছু যেতে যেতে বলে, কি কাজ ছিলো শুনি। তুই সন্ধ্যায় আসার কথা বলে রাত নয়টায় আসলি কেনো?
আয়ান কিছু না বলে একটা চেয়ার টেনে বসে। রাফসানও আয়ানের পাশে এসে বসেলো। আয়ান আশে পাশে তাকিয়ে দেখলো জায়গাটা বেশ সুন্দর করেই সাজানো হয়েছে। পুরো মাঠে চেয়ার টেবিল দেওয়া হয়েছে। একপাশে রান্নার কাজ চলছে। সব চেয়ার টেবিলের উপর গোল ছাউনি দেওয়া হয়েছে। বাড়ির ছাদে যে গোল ছাউনি দেওয়া হয়, দেখতে কিছুটা ওরকমই। রাফসান আয়ানের থেকে কোনো জবাব না আবারো বলল, কি হলো বল কোথায় ছিলি এতক্ষণ? আয়ান এবার রেগে রাফসানের দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
- ওকে খুজে না পেলে আই সয়্যার রাফসান,আমি তোকে জিন্ধা দাফন করবো।
রাফসান কিছুটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো আয়ানের দিকে। কি বলছে এই ছেলে? রাফসান কিছু না বুঝে বলল, কাকে খুঁজছিস তুই? আয়ান রাফসানের দিকে চেয়ে গম্ভীর গলায় বলে, নাথিং। রাফসান আয়ানের কথা কিছুই বুঝলো না।
এমন সময় ওদের পাশে এসে বসলো, শুভ আর মেহেদী। আয়ানের সামনে চেয়ার পেতে গোল করে বসলো তারা। মেহেদী বলল, কিরে আয়ান তোর তো কোনো খবরই নাই। বিয়ে সাদি করে ফেললি নাকি। শুভ পাশ থেকে বলে উঠে, আরে না আয়ান বিয়ে করলে তো অবশ্যই আমরা দাওয়াত পেতাম। রাইট আয়ান? আয়ান ওদের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে ওঠে, আমি বিয়ে করলে কাক পক্ষিও টের পাবে না। রাফসান আয়ানের মুখ থেকে এমন কথা শুনে আরো বেশি অবাক হলো।
রাত দশটা। শিকদার বাড়ির সকলে ডাইনিং টেবিলে বসে আছে। মোশাররফ হোসেন বসেছেন আছিয়া বেগম আর শাজাহান শিকদারের মাঝখানে। বসেছেন না তাকে বসানো হয়েছে। তার বিপরিত পাশে বসেছে পরী, মাহিরা প্ৰত্যয়। টেবিল ভৰ্তি এতো এতো খাবার দেখে মাহিরা অবাক হয়ে গেলো। তার মনে হচ্ছে সে কোনো ছোটোখাটো বুফেতে চলে এসেছে। মোশাররফ হোসেনের একই অবস্থা। তার মনে হচ্ছে সে নতুন জামাই। তার শাশুড়ি ইতিমধ্যে তার প্লেট ভৰ্তি কর ফেলেছে খাবার দিয়ে। মোশাররফ হোসেন কিছু বলতেও পারছেন না। যদি শাশুরি রাগ করেন? তাহলে তো তারই বিপদ। তাই মোশাররফ হোসেন কিছু না বলে যতটুকু পারছেন খাচ্ছেন । অন্য দিকে প্ৰত্যয় একটার পর একটা খেয়েই যাচ্ছে। এদিকে মাহিরা খেতে পারছে না কিছুই। এতো খাবার তার সামনে। তাই সে কনফিউজড। মালিহা বেগম খাবার তুলে দিচ্ছেন পরীর প্লেটে। পরী যদিও এখন খেতে চায়নি। সে বাকিদের সাথে পরে খেতে চেয়েছিলো।শাজাহান শিকদার আর মালিহা বেগম জোর করে পরীকে খেতে বসিয়েছেন।
প্ৰত্যয় আরাম করে খাচ্ছে। খাওয়া হলে তার আর কোনো কথা নেই। প্রত্যয় মাহিরার দিকে তাকিয়ে দেখে মাহিরা বসে আছে। প্ৰত্যয় বলে ওঠে, আপু খাও খাও। খাবারগুলো অনেক বেশি মজা হয়েছে। মাহিরা চোখ গরম করে তাকায় প্ৰত্যয়ের দিকে। প্ৰত্যয় মাথা নিচু করে আবারো খাওয়ায় মনোযোগ দেয়। মালিহা বেগম প্ৰত্যয়ের কথা শুনে মুচকি হাসে। তিনি প্ৰত্যয়ের প্লেটে আরো একটা রোস্ট উঠিয়ে দেন। প্ৰত্যয় দুইটা রোস্ট অলরেডি খেয়ে ফেলেছে। আরো একটা রোস্ট প্লেটে দেখে খুশি হয়ে মালিহা বেগমকে বলল, থ্যাংক ইউ মামুনি। রোস্ট টা আসলেই অনেক বেশি মজা হয়েছে। আর আমি কিন্তু এখন থেকে তোমাকে মামুনি বলেই ডাকবো। মালিহা বেগম খুশি হয়ে বলেন, ঠিক আছে বাবা। যেটা তোমার ভালো লাগে সেটাই ডেকো তুমি।
মুসকান মাহিরার পাশে খেতে বসেছে। মাহিরাকে চুপচাপ বসে থাকতে দেখে মুসকান বলল, খাচ্ছো না কেনো মাহিরা? মাহিরা মুসকানের দিকে তাকিয়ে অসহায় গলায় বলে, এতো খাবার সামনে দেখে অলরেডি পেট ভরে গেছে আমার। এতো খাবার রান্না করার কি খুব বেশি প্ৰয়োজন ছিলো মুসকান? মুসকান হাসলো মাহিরার এমন কথা শুনে। হেসে মাহিরাকে বলল, তোমরা তো রাতে এসেছো তাই এই কয়টা আইটেম রান্না করেছে। যদি দুপুরে আসতে তাহলে দেখতে পেতে মা আর কাকীমনিরা মিলে এই বাড়িটাকে একটা ফাইভ'স্টার বুফে বানিয়ে ফেলছে। মাহিরা চোখ বড়ো বড়ো করে বলে ওঠে, কিহ..! মুসকান মাহিরাকে দেখে হেসে পেলে। বলে, হ্যা এখন চুপচাপ খাও। নাহলে তোমার প্লেটে যা খাবার দেখছো সেগুলো বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে যাবে। মুসকানের কথা শুনে মাহিরা চুপচাপ খাওয়ায় মনোযোগ দেয়।
পিকনিকের খাওয়া দাওয়া শেষ হলে সবাই একসাথে বসে আছে। রাত তখন বারোটা। সব স্কুল কলেজ ভার্সিটির ফ্রেন্ডরা মিলে পিকনিক করছে। সবাই গল্প করছে যে যার মতো। আয়ান আর রাফসান একসাথে বসে সিগারেট ফুঁকছে। হঠাৎ তাদের পাশে বসা শুভ বলে ওঠে, আয়ান একটা গান শোনা আামাদের। অনেকদিন হলো তোর গান শুনি না। তোর তো গানের গলা সেই। পাশ থেকে মেহেদী বলে, হ্যা দোস্ত। অনেক দিন হলো আয়ানের গান শুনি না আমরা। পিকনিকে এসে যদি আয়ানের গানই না শুনি। তাহলে আমাদের পিকনিকে আসার সার্থকতাটা কোথায় রইল বল? সবাই একসাথে বলে ওঠে, ঠিক। ঠিক।
আয়ান তার হাতে থাকা সিগারেট টানতে টানতে বলে, তোরা কি পিকনিক করতে এসেছিস? নাকি আমার গান শুনে সার্থক হতে? শুভ আর মেহেদী একসাথে বলে ওঠে , দুইটাই। আয়ান আর কিছু বলল না। শুভ রাফসানের দিকে গিটার বাড়িয়ে দিয়ে চোখে ইশারা করলো আয়ানকে দিতে। রাফসান গিটার হাতে নিয়ে বলল, দোস্ত একটা গানই তো। গা না প্লিজ। আয়ান রাফসানের দিকে তাকিয়ে বলে, ঠিক আছে। তোদের পিকনিকের সার্থকতা পূরন করে দিচ্ছি। আফটার অল আজ আমার মুড ভালো। এই বলে রাফসানের কাছ থেকে গিটার নিয়ে গান ধরে আয়ান।
.................................................................
এত দিন ভাবছি কবে তোমার দেখা পাই
ছিলটাও zero percent বেকার জীবনটায়
এত দিন ভাবছি কবে তোমার দেখা পাই..
ছিলটাও zero percent বেকার জীবনটায়
ছিল না ঝিংচাকাচাক suit-বুট আর tie
তোমার এই touch লেগে আজ হয়েছি Hi-Fi
My love, you are my love
দিওয়ানা, তোমার প্রেমে এনেছি গোলাপ..
It's a hundred percent love, love-love-love-love
It's a hundred percent love, love-love-love-love
এবার সবাই একসাথে গেয়ে উঠলো..
It's a hundred percent love, love-love-love-love
It's a hundred percent love, love-love-love-love
চলবে..