#এ_দেখা_শেষ_না_হোক #পর্ব - (০৮)
#writer_sumaiya_akter_sathi
--
মাহিরা ছাদ থেকে নেমে নিজের রুমে এসেছে। সে নিস্তব্ধ হয়ে তার বিছানার উপর বসে পরলো। তার কানে আয়ানের বলা গানটা এখনো বাজছে। মাহিরা বিরবির করল, এই খাড়ুস লোকের গলা এতো সুন্দর দিলো আল্লাহ। কিন্তু মানুষটাকে এমন খাড়ুস বানালো কেনো? আরেকটু ভালো বানালে কি হতো?
এমন সময় মাহিরার দরজায় টোকা পরে। মাহিরা উঠে দরজার দিকে চলে যায়। দরজা খুলে সামনে তাকাতেই দেখে আয়ান দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে কিছু একটা। মাহিরা মনে মনে বিরবির করে, হায়াত আছে খাড়ুস লোকের। এতো সকালে মরবে না।
আয়ান কিছু না বলে তার হাতে থাকা ব্যাগটা মাহিরার দিকে বাড়িয়ে দেয়। মাহিরা ভ্রু কুঁচকায়। বলে, কি এটা? আয়ান শান্ত গলায় বলে,
- খুলে দেখো।
মাহিরা ব্যাগটা হাতে নিয়ে খুলতে শুরু করে। ব্যাগের ভেতর শক্ত কিছু একটা। মাহিরা বের করে হাতে নিলে দেখে একটা আইফোন। লেটেস্ট মডেলের একটা আইফোন। মাহিরা ভ্রু কুঁচকায়। এই লোক তাকে আইফোন কেনো দিলো সে বুঝতে পারলো না।
মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে, এটা তো আইফোন। আমাকে কেনো দিচ্ছেন? আয়ান মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে,
- তোমার ফোন তো আমার কারনে পরে গিয়েছিলো ওইদিন। সেটা আবার হারিয়েও গিয়েছে। তাই আমাকে যেনো কোনো ব্লেম দিতে না পারো তার জন্য দিয়েছি।
মাহিরা ফোনটা ব্যাগের ভেতর রেখে দেয়। ব্যাগটা আয়ানের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলে,
- আপনাকে কোনো ব্লেম দিবো না। এটা নিয়ে যান।
আয়ান ভ্রু কুচকায়। বলে,
- ফোন পছন্দ হয়নি ?
মাহিরা বলল,
- আমি আইফোন চালাই না।
আয়ান শান্ত গলায় বলে, এখন থেকে চালাবে।
মাহিরা আবারো বলে, আপনি প্লিজ এটা নিয়ে যান। আয়ানের এবার রাগ হলো এই মেয়ের উপর। আয়ান রেগে বলে,
- কি ফোন পছন্দ তোমার? বলো এক্ষনি এনে দিচ্ছি।
মাহিরা হা হয়ে তাকায় আয়ানের দিকে। বলে, এতো রাতে ফোন কোথায় পাবেন আপনি? আয়ান আবারো রেগে বলে,
- জাহান্নামে পাবো। সেটা জেনে তোমার কি?যেটা জিজ্ঞেস করছি সেটার এন্সার দাও। ফাস্ট।
আয়ানকে রেগে যেতে দেখে মাহিরা একগাল হেসে বলে, না না সমস্যা নেই। ফোন টা রেখে দিচ্ছি আমি। মনে মনে বিরবির করল, মাথা ভাঙ্গা লোক একটা। রেগে গেলেই বিপদ। কখন আবার তেড়ে আসে বলা তো যায়না। আয়ান বলে ওঠে,
- পছন্দ না হলে রাখবে কেনো?
মাহিরা মিনমিনিয়ে বলে,ফোনটা আমার পছন্দ হয়েছে। কিন্তু..।
আয়ান বলে ওঠে , কিন্তু..?
মাহিরা বলে, আপনি আমাকে ফোন দিয়েছেন। এটা আম্মু আব্বু জানলে বকা দিবে। আয়ান এবার শান্ত গলায় বলে,
- ডোন্ড ওয়ারি। আমি সামলে নিবো।
মাহিরা আর কিছু না বলে দরজায় দাড়িয়ে থাকে। আয়ান শান্ত গলায় বলে, রুমে যাও। মাহিরা ভেতরে চলে যেতে নিলে আয়ান পেছন থেকে ডেকে বলে,
- শোনো।
মাহিরা ঘুরে তাকিয়ে বলে,
- জ্বি।
আয়ান কয়েক মূহুর্তের জন্য থমকে যায়। মাহিরার জ্বী কথাটা তার কলিজায় এসে বারি খাচ্ছে। মাহিরা আবারো বলে, কিছু বলবেন? আয়ান নিজেকে সামলে নিয়ে বলে, রুমে পানি আছে কিনা চেক করো? মাহিরা চেক করে বলে, হ্যা আছে। আয়ান আর কিছু না বলে চলে যায়। মাহিরা দরজা আটকে শুয়ে পরে।
আয়ান রুমে এসে পায়চারি করতে থাকে। তার ভেতরে কিছু একটা হচ্ছে। সে কিছুতেই শান্ত থাকতে পারছে না। আয়ান এবার তার পকেট থেকে মাহিরার ফোন টা বের করে। মাহিরার হাস্যজল মুখটার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে আনমনে মুচকি হাসে। বিরবির করে,এই মেয়েটা আমার ঘুম হারাম করে নিয়েছে।
____
রাতে দেরিতে ঘুমানোর কারনে মাহিরা সকালে তাড়াতাড়ি উঠতে পারে না। ঘুম থেকে ওঠে দেখে এগারোটা বাজে। মাহিরা ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে আসে। মালিহা বেগম মাহিরাকে দেখে বলে। ঘুম ঠিকমতো হয়েছে মা? মাহিরা হেসে বলে, হ্যা মামুনি। মালিহা বেগম বলেন, বসো মা। আমি তোমাকে খেতে দেই। মাহিরা চেয়ারে টেনে ডাইনিং টেবিলে বসে। বলে, মামুনি। আম্মু কোথায়? মালিহা বেগম মাহিরার প্লেটে খাবার তুলে দিতে দিতে বলেন, তোমার আম্মু একটু তোমার নানুর সাথে ডক্টরের কাছে গিয়েছে। মাহিরা জানতে চেয়ে বলে, কি হয়েছে নানুর? মালিহা বেগম বলেন, তেমন কিছু না। প্রেশারটা একটু বেড়েছে আরকি।
মাহিরা আর কিছু না বলে খাওয়ায় মনোযোগ দেয়।খাওয়ার ফাকে আশে পাশে চোখ ঘুড়িয়ে দেখে মাহিরা। তার কাছে এই বাড়িটা বেশ লাগে। মাহিরা চোখ ঘুড়িয়ে চারপাশ দেখতে নিলে হঠাৎ তার চোখ আটকে যায় সিঁড়িতে। মাহিরা চোখ বড় বড় করে তাকায় সিঁড়ির দিকে।
আয়ান সিঁড়ি বেড়ে নিচে নেমে আসছে। পরনে তার ব্লাক শার্ট। ব্লাক পেন্ট। ব্লাক শুজ। হাতে ব্রান্ডের ঘড়ি। এক হাতে গায়ের কোর্ট খুলে ভাজ করে রাখা। চুলের দিকে তাকাতেই মাহিরা চমকে উঠে।
মাহিরা দেখতে পায় আয়ানের চুলগুলো আর আগের মতো বড় বড় নেই। স্টাইলিশ করে কাটা। মাহিরা চোখ এবার আটকে যায় আয়ানের দাঁড়িতে। খোঁচা খোঁচা চাপ দাঁড়ি। কি সুন্দর চিকচিক করছে। মাহিরা শুকনো ঢোক গিলে।
মাহিরা সবে মাত্র এক টুকরো রুটি মুখে তুলে চিব্বাচ্ছিলো। রুটি মাহিরার মুখে থেমে গিয়েছে। সে হা হয়ে চেয়ে আছে আয়ানের দিকে। আয়ান সিঁড়ি বেড়ে নেমে সোজা ডাইনিং টেবিলে আসে। চেয়ারের উপর হাতের কোর্টটা রেখে মাহিরার মুখোমুখি সামনের চেয়ারে বসে। মাহিলা বেগমের উদ্দেশ্য বলে, মা খাবার দাও।
আয়ানের কথা কানে আসতেই মাহিরার ঘোর কাটে। মাহিরা আয়ানের থেকে চোখ সরিয়ে খাওয়ায় মনোযোগ দেয়। আয়ান এবার মাহিরার দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসে। মাহিরা তার মুখের খাবারটুকু গিলতে নিলে হঠাৎ গলায় আটকে যায়। মাহিরা কেশে উঠে। আয়ান দ্রুত এক গ্লাস পানি মাহিরার সামনে বাড়িয়ে দেয়। মাহিরা তাড়াতাড়ি পানির গ্লাসটা নিয়ে পানি খায়। আয়ান চিন্তাতুর কন্ঠে বলে, আর ইউ ওকে? মাহিরা মুখে কিছু না বলে উপর নিচ মাথা নাড়ায়। আয়ান তা দেখে মনে মনে হাসে। আয়ান আবারো তার চেয়ারে বসে।
মালিহা বেগম আয়ানের জন্য খাবার নিয়ে আসে। গরম ভাত সাথে গরুর মাংস। আয়ান খাওয়া শুরু করলে মাহিরা ভ্রু কুঁচকায়। আয়ানের দিকে তাকিয়ে বিরবির করে, সকাল সকাল এসব কে খায়? পাগল লোক।
আয়ান নিজ মনে খাচ্ছে। মাহিরা আড়চোখে দেখছে আয়ানকে। আয়ান খাওয়ার ফাঁকে একবারও চোখ তুলে তাকায়নি। মালিহা বেগম গ্লাসে পানি ঢেলে আয়ানকে বলেন, কোথাও যাবি বাবা? আয়ান মুখের খাবার টুকু শেষ করে বলল, হ্যা। মিটিং আছে। মালিহা বেগম আর কিছু না বলে রান্না ঘরের দিকে চলে যায়।
আয়ানের খাওয়া শেষ। আয়ান উঠতে নিলে মাহিরার প্লেটের দিকে তাকালে দেখতে পায় মাহিরা এখনো একটা রুটি সম্পুর্ণ খেতে পারেনি। আয়ান তা দেখে মৃদু ঠোঁট বাকায়। মনে মনে বিরবির করে, এই মেয়ে এতোদিন তাকে জ্বালিয়েছে। এখন সে জ্বালাচ্ছে এই মেয়েকে ।
আয়ান হাত ধুয়ে ফিরে এসে দেখে মাহিরার একই অবস্থা। আয়ান চেয়ারের উপর থেকে তা কোর্টাটা হাতে তুলে নেয়। মাহিরার উদ্দেশ্য বলে,
- বেশি চাপ নিয়ো না। প্রেশার বেড়ে যাবে।
মাহিরা থতমত খেয়ে যায়। সে চোখ তুলে তাকায় আয়ানের দিকে। আয়ান মৃদু ঠোঁট বাকিয়ে চলে যায়।
মুসকান অর্নবের রুমে গিয়েছিলো। অর্নবকে রুমে না পেয়ে চলে আসে সে। রুম থেকে বের হলে সে দেখতে পায় মাহিরাকে। মাহিরা আনমনে হাঁটছে। মুসকান এবার মাহিরার কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, কি হয়েছে মাহিরা? মাহিরা মুসকানকে দেখে নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে। বলে, কিছু না মুসকান। তুমি ওদিকে কোথায় গিয়েছিলে? মুসকান হেসে বলে, অর্নব ভাইয়ের রুমে গিয়েছিলাম। কিন্তু তাকে রুমে পায়নি। মাহিরা বলে, ও আচ্ছা। চলো আমরা ছাদে যাই। মুসকান সম্মতি জানালে দুজন ছাদে চলে যায়।
অর্নব একটা ক্যাফে তে বসে আছে। তার সামনে বসে আছেন রাশেদ সাহেব। আয়ান তাদের দুইজনকে এখানে ডেকে এনেছে। আয়ান কোথায় তারা কেউ জানেনা। অর্নব বসে বসে রাশেদ সাহেবকে ভালো করে পর্যবেক্ষন করছে। কোর্ট টাই পরা লোকটি মধ্যে বয়স্ক। বয়স চল্লিশ এর কাছাকাছি।
রাশেদ সাহেব নিঃশব্দে বসে আছেন। অর্নবের সাথে চোখাচোখি হলে দাঁত কেলিয়ে হাসেন শুধু। মনে হচ্ছে কোনো চুরি করে ধরা পরে গিয়েছে সে। অর্নব তৃক্ষন্ন দৃষ্টিতে রাশেদ সাহেব কে পর্যবেক্ষন করে বলে, আপনি এখানে কেনো এসেছেন?
রাশেদ সাহেব অনিচ্ছা শর্তেও এক গাল হেসে বলল, স্যার আসতে বলেছে। তাই এসেছি। অর্নব এবার ভ্রু কুঁচকায়। বলে,
- কাল রাতে কি আয়ান ভাই আপনার বাড়ি গিয়েছিলো?
রাশেদ সাহেব আমতা আমতা করে বলেন, জ্বি না। স্যার কেনো আমার বাড়ি যাবেন? অর্নব বুঝতে পারে এই লোক মিথ্যা বলছে। আয়ান তো আর শুধু শুধু মিষ্টি বিলানোর জন্য তার বাড়ির এড্রেস চায়নি? তাই না? অর্নব রাশেদ সাহেব কে আরো কিছু প্রশ্ন করতে যাবে তার আগেই সামনে তাকালে দেখে আয়ান আসছে।
মুসকান মাহিরাকে নিয়ে ছাদে এসেছে। মুসকান মাহিরাকে ঘুরে ফিরে সব ফলের গাছ দেখাচ্ছে। মাহিরা অবাক হয়ে দেখছে সেগুলো। ছাদে মোটামুটি সব ধরনেরই ফলের গাছ লাগিয়েছে আয়ান। মাহিরা ঘুরে ফিরে সেগুলো দেখছে। হঠাৎ মাহিরার চোখ আটকে যায় একটা ফল গাছের উপর। গাছ টা বেশি বড় না। কিন্তু ছোটো ছোটো ফল এসেছে গাছটায়। মাহিরার কাছে এই ফলটা একটু চেনা চেনা লাগে।
মাহিরা ভ্রু কুঁচকে মুসকানকে জিঙ্গেস করে, মুসকান এটা কি গাছ? মুসকান ফল গাছটি দেখে হেসে বলে, আরে মাহিরা। এটা তো চেরি ফলের গাছ। ভাইয়া জাপান থেকে নিয়ে এসেছিলো। এই বছরই প্রথম ফল দিয়েছে।
মাহিরা অবাক হয় বাংলাদেশেও চেরি ফল হয় সে জানতো না। মাহিরা আবারো বলে, এটা কি সত্যিই চেরি গাছ? মুসকান সহসাই বলে, হ্যা। দেখছো না ছোটো ছোটো কি সুন্দর ফল ধরে আছে? মাহিরা তাকিয়ে দেখে সত্যিই এটা চেরি ফল গাছ। ছোটো ছোটো চেরি ফল গাছে।
মাহিরার ফলের ভেতরে চেরি ফলটা খুব বেশি প্রিয়। মাহিরা এবার খুশি হয়ে বলে, মুসকান এই চেরিগুলো কবে পাকবে? মুসকান হেসে বলে, কবে পাকবে তা তো বলতে পারছি না মাহিরা। কেনো? তোমার কি চেরি ফল পছন্দ নাকি।
মাহিরা হেসে বলে, ভীষণ পছন্দ। মুসকান বলে, ঠিক আছে মাহিরা। চেরি ফল পাকলে সবার আগে তোমাকে টেষ্ট করাবো। মুসকানের কথায় মাহিরা আরো বেশি খুশি হয়। মুসকানকে সাইড থেকে জড়িয়ে ধরে বলে, তুমি অনেক ভালো মুসকান। মাহিরার কথা শুনে মুসকান হাসে।
আয়ান এসে রাশেদ সাহেবের মুখোমুখি চেয়ারে বসেছে। আয়ান এবার জিজ্ঞেস করে, সবকিছু রেডি? রাশেদ সাহেব একগাল হেসে বলেন, জ্বি স্যার। সব কিছু রেডি আছে।
অর্নব কিছুই বুঝলো না তারা কিসের কথা বলছে। অর্নব আয়ানকে জিজ্ঞেস করে, কি রেডি ভাইয়া? আয়ান অর্নবের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে, তোর পানিশমেন্ট। অর্নব হতভম্ব হয়। কাল রাতে আয়ান বলেছিলো ভাই বলে তাকে ছেড়ে দিবে না। পানিশমেন্ট তাকে ঠিকই পেতে হবে।
কিন্তু অর্নব এখনো জানেনা তার অপরাধ টা কি? আয়ান কেনোই বা তাকে পানিশমেন্ট দিচ্ছে? সে বুঝলো না কিছু। কি আর করার বড় ভাই পানিশমেন্ট দিচ্ছে মাথা পেতে নিতে হবে। অর্নব এবার আয়ানের দিকে চেয়ে বলে, আমি কি করেছি ভাইয়া? আয়ান শান্ত গম্ভীর গলায় বলে, কিছু করিসনি এখন করবি। অর্নব কিছুই বুঝলো না আয়ান তাকে কি করার কথা বলছে। তাকেই বা কি পানিশমেন্ট দিতে চলেছে আয়ান?
_____
মাহিরা ছাদ থেকে ঘুরে এসে মাত্রই শাওয়ার নিয়েছে। চুল গুলো মুছে বিছানায় বসে মাহিরা। বেড সাইট টেবিলে চোখ পরতেই মাহিরা থমকে যায়। কাল রাতে আয়ানের দেওয়া ফোনটা সে এখনো খোলেনি। মাহিরা বেড সাইড টেবিল থেকে ব্যাগটা হাতে নেয়। ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করে উল্টে পাল্টে দেখে সে। তারপর কিছু না ভেবেই ফোন আনপ্যাক করতে শুরু করে।
মাহিরা ফোন আনপ্যাক করে দেখে ফোনের কালার টা অফ-হোয়াইট কালারের। মাহিরা ভ্রু কুঁচকায়। বিরবির করে, এই খাড়ুস লোক সব কিছুতে এমন কালার সিলেক্ট করে কেনো? সে ভবে পায় না এই লোক এমন কেনো?
মাহিরা ফোনটা পাশে রেখে ব্যাগের ভেতর থেকে আরো কিছু জিনিস বের করে নেয়। সেখানে সিমকার্ড থেকে শুরু করে মোবাইলের প্রয়োজনীয় আরো কিছুই জিনিস ছিলো। মাহিরা কিছু না ভেবে সিমকার্ড টা তার ফোনে ঢুকিয়ে নেয়।
এমন সময় মাহিরার রুমের দরজায় কেউ নক দেয়। মাহিরা ফোনটা বিছানায় রেখে দরজা খুলেতে যায়। দরজা খুলে সামনে তাকাতেই দেখে অর্নব দাড়িয়ে আছে। অর্নবের চোখ মুখে বিস্ময়ের ছাপ স্পষ্ট। মাহিরা কিছু বলার আগেই অর্নব বলে ওঠে,
- তাড়াতাড়ি রেডি হও মাহিরা। আমরা ফুচকা খেতে যাবো।
মাহিরা ফুচকার কথা শুনা মাত্রই খুশি হয়ে যায়। সে তো তার দাদাবাড়ী থাকতে তার চাচাতো ভাই বোনের সাথে ফুচকা খেতে যেতো। ফুচকা মাহিরার দুর্বলতা। তাই ফুচকার কথা শুনলে মাহিরা ঠিক থাকতে পারেনা। মাহিরা খুশি হয়ে বলে, সত্যি বলছেন ভাইয়া। অর্নব এবার বলে, হ্যা তাড়াতাড়ি রেডি হও। মাহিরা খুশি হয়ে বলে, ঠিক আছে ভাইয়া। আমি মুসকান কে বলে আসি?
অর্নব মাহিরাকে থামিয়ে দিয়ে বলে, আমি মুসকানকে বলছি। তুমি গিয়ে রেডি হও। মাহিরা আর কিছু বলল না। সম্মতি জানিয়ে দরজা লাগাতে যাবে তখন অর্নব আবারো বলে, আমি নিচে অপেক্ষা করছি। তোমরা তাড়াতাড়ি এসো। মাহিরা বলে, ঠিক আছে ভাইয়া। অর্নব চলে যায়। মাহিরাও খুশি হয়ে রেডি হতে চলে যায়।
অর্নব মুসকানের রুমে আসে। মুসকানকে রুমে না পেয়ে অর্নব বিরক্ত হয়। এই মেয়ে আবার কোথায় গেলো কে যানে? এমনিতেই তার ভাই পানিশমেন্টের বোঝা মাথায় ধরিয়ে দিয়েছে। আর অন্যদিকে এই মেয়ে লাপাত্তা? অর্নব বিরক্ত হয়ে বের হয়ে যায় মুসকানের রুম থেকে।
অর্নব নিজের রুমে এসেছে গাড়ির চাবি নিতে। সে তাড়াহুড়াতে বাইক নিয়ে এসেছিলো। রুমে ঢুকতেই অর্নবের পা থমকে যায়। মুসকান তার রুমে। তার জামাকাপড় ভাজ করে আলমারিতে গুছিয়ে রাখছে মুসকান। অর্নব শান্ত চোখে মুসকানকে পরখ করে নেয় একবার। তারপর মুসকানের কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে, এখানে কি করছিস?
মুসকান অর্নবকে দেখে ভুত দেখার মতো চমকে উঠে। সে তো চুপিচুপি অর্নবের রুমে এসে এই কাজগুলো করতো। অর্নব যখন বাসায় থাকতো না তখন। কারন অর্নব এগুলো মোটেও পছন্দ করেনা। মুসকান ধরা পরে গিয়ে আমতা আমতা করে বলে,আসলে অর্নব ভাই তোমার জামাকাপড় গুলো ছাদে শুকানো ছিলো তো। তাই সেগুলো নিয়ে আসলাম আরকি।
অর্নব কথা বাড়াতে চাইলো না। তার হাতে সময় কম। সে জানে এই মেয়ে ইচ্ছে করেই তার কাজ গুলো করে। অর্নব এবার বলে, রুমে গিয়ে রেডি হ। মুসকান আর কোনো প্রশ্ন করার সাহস পেলো না। এমনিতেই সে ধরা পরে গিয়েছে। এখন বেশি প্রশ্ন করা যাবে না। মুসকান কোনো প্রশ্ন ছাড়াই রুম থেকে বেরিয়ে যায়। অর্নব গাড়ির চাবি নিয়ে নিজেও তার রুম থেকে বেরিয়ে যায়।
মাহিরা রুমে এসে বোরকা হিজাব বেঁধে নেয়। নিজেকে ভালো করে পরখ করে দেখে নেয় একবার। তারপর ফোন আর পার্স নিয়ে বের হয়ে যায় রুম থেকে। মাহিরা মুসকানের রুমে এসে দেখে মুসকান এখনো রেডি হচ্ছে। মাহিরা ভেবে পায়না এই মেয়ের এতো টাইম লাগে কেনো।
অর্নব গাড়িতে বসে আছে। একটু আগের ঘটনার কথা ভাবছে সে। আয়ান তাকে এ কেমন পানিশমেন্ট দিলো? তার মাথায় কিছুই ধুকছে না। সব তার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে। মুসকান আর মাহিরা আসলে অর্নব ওদের গাড়িতে বসতে বলে। মাহিরা মুসকান দুইজনই গাড়িতে ওঠে বসে। অর্নব গাড়ি স্ট্যার্ট দেয়।
মুসকান গাড়িতে ওঠে জিজ্ঞেস করে, কোথায় যাচ্ছি আমরা অর্নব ভাই? অর্নব কিছু বলার আগেই মাহিরা পাশ থেকে হাসি মুখে বলে ওঠে, ফুচকা খেতে নিয়ে যাচ্ছে ভাইয়া আমাদের। মুসকান আর কিছু বললো না।
রাশেদ সাহেব অনবরত ঘামছেন। তার সামনে থাকা পানির গ্লাস থেকে ঢকঢক করে এক গ্লাস পানি খেলেন তিনি। আয়ান তার সামনে বসে আছে গত এক ঘন্টা যাবত। আয়ানের কোনো হেল দোল নেই। সে ফোনে কিছু করছে। আয়ান সামনে বসা দেখে সে আরো বেশি ঘামছে।
রাশেদ সাহেব এবার কিছুটা সাহস নিয়ে আমতা আমতা করে আয়ানকে জিজ্ঞেস করে, আর কতক্ষন লাগবে স্যার? আয়ান তৃক্ষন্ন দৃষ্টিতে রাশেদ সাহেবের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলে,
- মরার শখ যতক্ষণ না মিটে।
পরক্ষণে রাশেদ সাহেবের মুখ চুপসে যায়। সে আর কিছু বলার সাহস পায় না।
অর্নবের গাড়ি এসে থামে একটা রেস্টুরেন্টের সামনে। অর্নব গাড়ি থেকে নেমে মাহিরা আর মুসকানকে বের হতে বলে। দুজন বের হয়ে দেখতে পায় তারা কোনো রেস্টুরেন্টে এসেছে।
মাহিরা অর্নবকে জিজ্ঞেস করে বসে, আমরা এখানে কেনো এসেছি ভাইয়া? আমরা না ফুচকা খেতে যাবো? অর্নব কিছুটা হেসে বলে, হ্যা যাবো মাহিরা। আমার কিছু কাজ আছে। আগে সেগুলো শেষ করে নেই। তারপর তোমাদের নিয়ে ফুচকা খেতে যাবো।
মাহিরা আর কিছু বললো না। অর্নব তাকে ফুচকা খেতে নিয়ে যাবে এটাই অনেক। মাহিরা আর মুসকান অর্নবের পিছু পিছু যেতে থাকে।
অর্নব মাহিরা আর মুসকানকে নিয়ে রেস্টুরেন্টের রুফটপে আসে। খুব সুন্দর ভাবেই বসার যায়গা করা আছে এখানে। মাহিরা আশে পাশে তাকিয়ে দেখলো কেউ নেই। মাহিরা কিছুটা অবাক হলো। এতো সুন্দর একটা রেস্টুরেন্টে। আর আশে পাশে কেউ নেই? পরক্ষণে ভাবলো হয়তো তাদের খাবার বা সার্ভিস ভালো না। তাই তো কেউ আসেনা এখানে।
যায়গাটা দেখতে আসলেই অনেক সুন্দর। অর্নব মাহিরা আর মুসকানকে একটা টেবিলে এনে বসিয়ে দেয়। অর্নবের কল আসলে সে চলে যায় কিছুটা দূরে। মাহিরা মুসকানের পাশে বসে বলে, দেখো মুসকান এই রেস্টুরেন্টটা কতো সুন্দর। কিন্তু আশেপাশে কোনো মানুষই নেই আমারা ছাড়া। মুসকান আশে পাশে তাকিয়ে দেখে পুরো রুফটপ খালি। মুসকান নিজেও বুঝলো না এর কারন কি? মুসকার বলে, হ্যা তাই তো দেখছি।
মুসকান মাহিরা কথা বলার ফাঁকেই সেখানে একজন ওয়েটার আসে। ওয়েটারের হাতে দুটো কোল্ড ডিংক। ওয়েটারটি মাহিরা আর মুসকানের সামনে কোল্ড ডিংক দুটো এগিয়ে দিলে মাহিরা বলে ওঠে,আমরা তো কিছু অর্ডার করিনি। এগুলো কেনো দিচ্ছেন? ওয়েটারটি হাসি মুখে বলে, স্যার অর্ডার দিয়েছে ম্যাম। মাহিরা আর কিছু বলল না। ভেবেছে হয়তো অর্নব অর্ডার দিয়েছে তাদের জন্য। ওয়েটারটি চলে গেলে মাহিরা আর মুসকান দুইজনই কোল্ড ডিংক খেতে থাকে।
অর্নব ফোনে কথা বলা শেষ করে মাহিরাদের কাছে আসে। দেখে দু'জনই কোল্ড ডিংক খাচ্ছে। অর্নব হেসে বলে, আরে বাহ। তোমরা তো অর্ডারও দিয়ে ফেলেছো। যাক ভালো করেছো। আমিই অর্ডার দিতাম। কিন্তু ফোন আসায় ব্যস্ত হয়ে পরেছিলাম।
মাহিরা মুসকান দু'জন অবাক হয়ে তাকায় অর্নবের দিকে। মুসকান অবাক হয়ে বলে, তুমি আমাদের জন্য কোল্ড ডিংক অর্ডার দাওনি? অর্নব সহসাই জবাব দেয়, না। আমি তো ফোনে কথা বলছিলাম।
মাহিরা এবার বলে ওঠে, তাহলে ওয়েটার যে বললো স্যার অর্ডার দিয়েছে? অর্নব নিজেও বুঝলো না ওয়েটারটি কেনো এরকম বললো? এমন সময় সেখানে উপস্থিত হয় রাশেদ সাহেব। মাহিরকে দেখে তিনি বলে ওঠেন,
- আসসালামু আলাইকুম ম্যাম।
একজন বাবার বয়সি লোক মাহিরাকে সালাম দিচ্ছে দেখে মাহিরা কিছুটা বিব্রত বোধ করে। মাহিরা সালামের উত্তর দিয়ে বলে, আপনাকে তো চিনলাম না। রাশেদ সাহেব কিছু বলার আগেই পাশ থেকে অর্নব বলে ওঠে, উনি দালাল। বিদেশে লোক পাঠান।
রাশেদ সাহেব চুপ হয়ে যায় অর্নবের কথায়। জানের ভয়ে আজ তাকে দালাল হতে হলো। অর্নব রাশেদ সাহেব কে বসতে বললে রাশেদ সাহেব অর্নবের পাশে বসে। মুসকান মাহিরা কেউ কিছু বুঝলো না অর্নব কেনো দালাল নিয়ে এসেছে?
মুসকান এবার রাশেদ সাহেব কে দেখে বলে, কিন্তু ওনাকে দেখে তো..না মানে উনার পোশাক দেখে তো ওনাকে উকিল উকিল লাগছে। উনি দালাল হলেন কিভাবে?
অর্নব এবার রাশেদ সাহেবের দিকে তাকায়। সে জানে রাশেদ সাহেব সোজা কোর্ট থেকে এসেছে। এসেছে নয়,আয়ান তাকে উঠিয়ে এনেছে। অর্নব রাশেদ সাহেবের থেকে চোখ সরিয়ে মুসকানের দিকে তাকিয়ে বলে,
- আসলে উনি ছোটো থেকে উকিল হতে চেয়েছিলো। কিন্তু পরিবারের চাপে দালাল হয়ে গিয়েছে। উনার পূর্ব পুরুষেরা সব দালাল ছিলো। বাপ দাদাদের নাম রক্ষার্থে তাকেও দালাল হতে হয়েছে। কিন্তু উনি তার মনের ইচ্ছাকেও প্রাধান্য দিয়েছেন। তাই তো দালাল হয়েও সবসময় উকিলের পোশাক পরে থাকেন। নিজের মনকে শান্তনা দেন আরকি।
অর্নবের কথা শুনে মুসকান আর মাহিরা হা হয়ে তাকিয়ে থাকে রাশেদ সাহেবের দিকে। রাশেদ সাহেব মুখ মলিন করে তাকিয়ে আছে অর্নবের দিকে। তার পূর্বপুরুষেরা যে দালাল ছিলো রাশেদ সাহেব সেটা মাত্রই জেনেছে অর্নবের থেকে।
অর্নব এবার মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, মাহিরা তুমি তো আমেরিকা যেতে চাও তাই না? মাহিরা সম্মতি জানিয়ে বলে, জ্বি ভাইয়া। অর্নব এবার বলে, কালকে রাতে তোমাকে বলছিলাম না আমার এক বন্ধু আমেরিকা থাকে? তাকে তোমার কথা বলেছি আমি। সে বলেছে তুমি খুব সহজেই আমেরিকা যেতে পারবে।
মাহিরা অর্নবের কথায় খুশি হয়ে বলে, সত্যি বলছেন ভাইয়া? অর্নব বলে, হ্যা। কিন্তু কিছু শর্ত আছে। তোমাকে কিছু কাগজ আর ডকুমেন্টেস সাইন করতে হবে। মাহিরা বলে ওঠে, কিরকম কাগজ আর ডকুমেন্টস ভাইয়া?
অর্নব এবার বলে, আমার বন্ধু রাশেদ সাহেবকে আমার কাছে পাঠিয়েছে। রাশেদ সাহেবের কাছে সকল কাগজ আর ডকুমেন্টস আছে। তোমাকে আমেরিকা যাওয়ার জন্য আগে আবেদন করতে হবে। তাই উনি এখন কিছু কাগজ দিবে তোমাকে তুমি সেগুলো সাইন করে দিবে। ঠিক আছে মাহিরা?
মাহিরার মুখ কিছুটা মলিন হয়। মিনমিনিয়ে বলে, আমি তো এতো তাড়াতাড়ি আমেরিকা যেতে চাইনি ভাইয়া। আমার আব্বু আম্মু তো এখনো কিছুই জানেনা।
অর্নব এবার বলে, টেনশন নেই মাহিরা। তুমি এখনই আমেরিকা যাচ্ছো না। তুমি এখন শুধু আবেদন টা করছো। এগুলো অনেক লং প্রসেসিংয়ের কাজ। অনেক সময় লাগবে। তাছাড়া তোমার ভিসা এখনো হয়নি। তাই ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তারা যদি তোমার আবেদন একসেপ্ট করে নেয় তখন তুমি আমেরিকা যেতে পারবে।
একসেপ্ট করার পর না হয় তুমি ফুপ্পিদের জানিও। আর তখন যদি তোমার মনে হয় যে তুমি আমেরিকা যাবেনা? তখন তুমি নাও যেতে পারো। সবকিছু তোমার উপর মাহিরা।
মাহিরা এবার অসহায় সুরে বলে ওঠে, না ভাইয়া। আমি আমেরিকা যেতে চাই। অর্নব বলে, ঠিক আছে। তাহলে তুমি রাশেদ সাহেবের দেওয়া কাগজ আর ডকুমেন্টস গুলোতে সাইন করে দাও। মাহিরা ছোটো করে বলে, ঠিক আছে।
রাশেদ সাহেব এবার তার হাতে থাকা ফাইল গুলো খুলতে থাকেন। এমন সময় সেখানে আয়ান উপস্থিত হয়। মাহিরা কিছুটা অবাক হয় আয়ানকে দেখে। মুসকান তার ভাইকে দেখে খুশি হয়ে বলে, আরে ভাইয়া তুমি এখানে? আয়ান মাহিরার মুখোমুখি সামনে চেয়ারে বসে বলে, কাজ ছিলো।মুসকান ভাবে হয়তো অর্নবের সাথে কোনো কাজে এসেছে তারা। অর্নব আড়চোখে আয়ানের দিকে তাকায়। এই আয়ানকে অর্নব চিনেতে পারছে না।
রাশেদ সাহেব ফাইল খুলে মাহিরার দিকে এগিয়ে দেন। মাহিরা দেখে ফাইলে বিশ পঁচিশ টার মতো কাগজ আর ডকুমেন্টস। এতো গুলো কাগজ কেনো সে বুঝলো না। মাহিরা ভ্রু কুচকে অর্নবের দিকে তাকিয়ে বলে, এতোগুলো কাগজ কেনো ভাইয়া?
অর্নব নিজেও অবাক হয় এতোগুলো কাগজ দেখে। সে জানতো না এই ফাইলে কি ছিলো। সে তো শুধু আয়ানের দেওয়া পানিশমেন্ট অনুযায়ী কাজ করছে। অর্নব এবার আয়ানের দিকে তাকায়। আয়ান ফোনে ব্যাস্ত। অর্নব দীর্ঘশ্বাস ফেলে, এই ঘাড়ত্যাড়া মানুষেকে কিছু বলে লাভ নেই।
মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, আমেরিকা অনেক স্ট্রিক রাষ্ট্র মাহিরা। তাই তোমাকে সব ফর্মালিটি পূরন করতে হবে। মাহিরা আর কিছু বললো না। সে আদৌও জানেই না কিভাবে আমেরিকা যেতে হয়। মাহিরা আমেরিকা যেতে পারবে এতেই সে খুশি। মাহিরা রাশেদ সাহেবের কাছে কলম চাইলে আয়ান তার পকেটে থেকে কলম বের করে দেয়। মাহিরা কিছুটা ভ্রু কুঁচকায় আয়ানের এমন কান্ডে। আয়ান কিছু না বলে সহসাই ফোনে মনোযোগ দেয়।
মাহিরা কলম নিয়ে একটার পর একটা কাগজ সাইন করতে থাকে। উপরের কাগজগুলোতে ইংরেজি লেখা দেখে মাহিরা আর পরলো না সেগুলো। রাশেদ সাহেব মাহিরাকে দেখিয়ে দেন কোথায় কোথায় তাকে সাইন করতে হবে। মাহিরা সেই অনুযায়ী সাইন করতে থাকে।
গুনে গুনে বাইশটা সাইন করেছে মাহিরা। এবার তার বেশ বিরক্ত লাগছে। মাহিরা কিছুটা বিরক্ত হয়ে অর্নবকে বলে, ভাইয়া হাত ব্যথ্যা করছে। বাকি সাইনগুলো কালকে করে দিবো। অর্নব কিছু বলার আগেই পাশ থেকে আয়ান গম্ভীর গলায় বলে ওঠে,
- ফিনিশ ইট।
মাহিরা চোখ ঘুড়িয়ে আয়ানের দিকে তাকায়। আয়ান রাগী চোখে তাকিয়ে আছে মাহিরার দিকে।মাহিরা বুঝলো না এই লোকের কি হলো হঠাৎ?মনে মনে বিরবির করে, খাড়ুস লোক একটা। তারপর আবারও সাইন করতে থাকে মাহিরা।
মুসকান অর্নবের পাশের চেয়ারে বসা ছিলো। মুসকান কিছুটা এগিয়ে অর্নবের কানের কাছে গিয়ে বলে,
- অর্নব ভাই? আমিও আমেরিকা যেতে চাই। আপনার বন্ধুকে বলুন না আমাকেও আমেরিকা পাঠানোর ব্যবস্থা করতে। ভালোই হবে বলুন? আমি আর মাহিরা একসাথে থাকতে পারবো।
অর্নব রাগী চোখে তাকায় মুসকানের দিকে। রেগে কটমট করে বলে,
- কানের নিচে এক থাপ্পড় দিবো। সারাজীবনের জন্য আমেরিকা যাওয়ার কথা ভুলে যাবি।
মুসকানের মুখ মলিন হয়ে যায়। সে আর কিছু বলতে পারে না অর্নবকে।
আয়ান শান্ত চোখে তাকিয়ে আছে মাহিরার দিকে। মাহিরা খুব মনোযোগ দিয়ে একের পর এক সাইন করে যাচ্ছে। মাহিরার দিকে তাকিয়ে আয়ানের হঠাৎ মনে হলো এটা তার জীবনের সবচেয়ে স্পেশাল দিন।
মাহিরা সব কাগজ আর ডকুমেন্টস সাইন করে দেয়। রাশেদ সাহেব কাগজগুলো নিয়ে ফাইলে রেখে দেন। ফাইলটা টেবিলের উপর রেখে আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলেন, আসছি স্যার। আয়ান কিছু বললো না। অর্নব পাশ থেকে রাশেদ সাহেব কে বলে, আপনি বরং আমাদের সাথে লাঞ্চটা করে যান। রাশেদ সাহেব হেসে বলেন, বেঁচে থাকলে অনেক লাঞ্চ করা যাবে। আসছি। মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, আসছি ম্যাম।
মাহিরা চেয়ে আছে রাশেদ সাহেবের দিকে। লোকটা তার বাবার বয়সি হয়েও তাকে এতোটা সম্মান দিচ্ছে কেনো সে বুঝলো না। রাশেদ সাহেব চলে যায়। ফাইলটা পরে থাকে টেবিলের উপর। মাহিরা তা দেখে বলে ওঠে, ওমা উনি তো ফাইলটাই নিলোনা।
অর্নব তাকিয়ে দেখে টেবিলের উপর ফাইল। অর্নব ভ্রু কুঁচকে তাকায় আয়ানের দিকে। আয়ানের কোনো হেল দোল নেই। ফোনের ভেতর ডুবে আছে সে। অর্নব এবার মাহিরাকে বলে, ভুলে নেয়নি হয়তো। আমি যাওয়ার সময় নিয়ে যাবো। টেনশন নেই।
পরপর মাহিরা আর মুসকানের দিকে মেনু কাট বাড়িয়ে দিয়ে বলে, তোমরা কি খাবে অর্ডার দাও। মাহিরা মুসকান মেনু কার্ট দেখতে থাকে। আয়ান হাত বাড়িয়ে ফাইলটা তার পাশের খালি চেয়ারে রাখে। অর্নব আড়চোখে তাকিয়ে আয়ানকে দেখে।
মাহিরা আর মুসকান কাচ্চি অর্ডার দিয়েছে। ওয়েটার খাবার দিয়ে গেলে সবাই খেতে শুরু করে। মাহিরা খুব মজা করে কাচ্চি খাচ্ছে। মাহিরার মনে হলো এই রেস্টুরেন্টের খাবার খুবই মজার। আর তাদের রান্নাও খুব ভালো। কিন্তু রেস্টুরেন্টে কেউ নেই কেনো মাহিরা সেটা এখনো বুঝলো না।
মাহিরা খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে আড়চোখে কয়কবার আয়ানের দিকে তাকায়। আয়ান কোনো দিকে না তাকিয়ে নিজ মনে খাচ্ছে। মাহিরা আয়ানকে পর্যবেক্ষণ করে দেখে। আয়ানের গায়ে সকালের সেই ব্লাক শার্ট। গায়ের কোর্ট খুলে পাশে রাখা। গলার কাছে শার্টের দুইটা বোতাম খোলা। শার্টের হাতা কুনুই পর্যন্ত ফোল্ড করা। এতোটুকুতেই আয়ানকে দেখতে বেশ সুদর্শন লাগছে। চুল দাঁড়ি কাটার পর থেকে মাহিরার কাছে আয়ানকে দেখতে অন্যরকম মনে হচ্ছে।
আয়ান খাওয়ার ফাকে পানি খাওয়ার জন্য হাত বাড়িয়ে গ্লাস নিতে গেলে দেখে মাহিরা তার দিকে তাকিয়ে আছে। আয়ান হঠাৎ চাওয়াতে মাহিরা ভেবাচেকা খেয়ে যায়। তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে নেয়। আয়ান মাহিরার এমন কান্ড দেখে ঠোঁট বাকায়। হাত বাড়িয়ে পানির গ্লাস নিয়ে পানি খায়।
চলবে..