ফন্ট সাইজ:
থিম:
এদেখা শেষ না হোক

৯ম পর্ব

লেখক: সুমাইয়া আক্তার সাথী

#এ_দেখা_শেষ_না_হোক #পর্ব - (০৯)

#writer_sumaiya_akter_sathi 
--
মাহিরা'রা রেস্টুরেন্টে থেকে বেরিয়ে একটা গোল্ডের দোকানে আসে। আয়ান তাদের এখানে নিয়ে এসেছে। আয়ান এসেই মুসকান আর মাহিরার উদ্দেশ্য বলে,  
- যেটা ভালো লাগে নিয়ে নে। নাবিলার বিয়ে উপলক্ষে দিচ্ছি।
মুসকান বেশ খুশি হয়। সে গোল্ড ডায়মন্ড সবকিছু দেখতে শুরু করে। মাহিরার কোনো হেল দোল নেই। মাহিরা মুসকানের দিকে তাকিয়ে দেখলো মুসকানের হাসি মুখটা। এই মেয়েও যে কতটা শপিং পাগল মাহিরা বুঝে গিয়েছে।
মাহিরাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আয়ান বিরক্ত হয়। এই মেয়েকে তার এক কথা বারবার বলতে হচ্ছে। আয়ান বলে ওঠে , 
- তুমি কি তোমার জন্য কিছু পছন্দ করবে? নাকি আমাকে দিয়ে পছন্দ করাতে চাইছো?
মাহিরা হতভম্ব হয়ে আয়ানের দিকে তাকায়। পরপর আয়ানকে বলে, আমার কিছু লাগবে না।
আয়ান মাহিরাকে ভালো ভাবে পরখ করে নেয়। এরপর হঠাৎই মাহিরার হাত ধরে বলে, এসো। 
মাহিরা অবাক হলো। আয়ান এই প্রথম মাহিরার হাত ধরেছে। মাহিরা কিছুই বুঝলো না এই লোক তার হাত ধরে তাকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে? মাহিরা বলে ওঠে, কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন আমাকে? আয়ান কোনো কথা না বলে হাঁটতে থাকে।  
মুসকান কিছু গোল্ডের জিনিস গলায় হাতে কানে পরে দেখছে। বেশ সুন্দর লাগছে তাকে। অর্নব মুসকানকে দেখছে। হা হয়ে চেয়ে আছে অর্নব। পরপর মুসকান কে বলে, বিশ্বাস কর তোকে একদমই ভালো লাগছে না। একদম ডাইনি ডাইনি লাগছে তাকে। এগুলো ছাড়াই তোকে বেশি ভালো লাগে বুঝেছিস? শুধু শুধু টাকা নষ্ট করিস। 
মুসকান আড়চোখে অর্নবের দিকে তাকায়। বলে, তোমার এতো জ্বলছে কেনো? টাকা কি তুমি দিবে নাকি? টাকা তো দিবে আমার ভাই। অর্নব মুচকি হেসে বলে, ও আচ্ছা। তা কই তোর ভাই?
মুসকান পিছন তাকিয়ে বলে, ওই তো আ..। থেমে যায় মুসকান। পিছনে তাকিয়ে দেখে আয়ান নেই। মুসকান অর্নবের দিকে তাকিয়ে বলে, কোথায় গেলো আমার ভাই? এখানেই তো ছিলো।
অর্নব বলে ওঠে, স্বর্গে। মুসকান বলে ওঠে, মানে? অর্নব বিরক্ত হয়ে বলে, এমন ভাব করছিস মনে হয় তোর ভাই আমাকে সব বলে কয়ে তারপর যায়। তোর ভাই কোথায় সেটা আমাকে কেনো জিজ্ঞেস করছিস? তোর ভাই কি আমাকে বলে কয়ে তারপর যায় নাকি? সে তো নিজের মন মতো সব করে। মুসকান অসহায় গলায় বলে, 
- তাহলে কি আমি কিছুই নিতে পারবো না অর্নব ভাই?
অর্নব মুসকানের অসহায় মুখ দেখে বলে, 
- নিবি না কেনো? একশো বার নিবি। হাজার বার নিবি। দরকার হয় দোকান সুদ্ধ উঠিয়ে নিবি। তারপরও নিবি। পছন্দ কর কোনটা কোনটা নিবি।
মুসকান অর্নবের কথায় খুশি হয়ে আবারো সব দেখতে শুরু করে। অর্নব আনমনে হাসে। এই মেয়ে যে এতো শপিং পাগল। আল্লাহই ভালো জানে কপালে কি আছে।
আয়ান মাহিরাকে নিয়ে অন্য একটা গোল্ডের দোকানে এসেছে। মাহিরা আশে পাশে তাকিয়ে দেখে এই দোকানটা আগের দোকানের থেকে অনেকটাই বড়ো। মাহিরা কিছু বুঝলো না আয়ান তাকে কেনো এখানে নিয়ে এসেছে।  
আয়ান কিছু ডায়মন্ড রিং আর গোল্ডের রিং দেখতে শুরু করে। মাহিরার হাত আয়ান এখনো ছাড়েনি। মাহিরা কিছুই বুঝছে না আয়ানের কর্মকান্ড। আসার সময় কয়েক বার বলেছে হাত ছাড়ার কথা। কিন্তু আয়ান হাত ছাড়েনি। আর না মাহিরাকে কোনো কিছুর উত্তর দিয়েছে। মাহিরার মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে সব। এই লোক এমন কেনো সে বুঝলো না।
আয়ান দুইটা রিং সিলেক্ট করে। একটা ডায়মন্ড রিং আরেকটা গোল্ডর রিং। আয়ান মাহিরাকে কিছু না বলে হঠাৎই ডায়মন্ডের রিং টা মাহিরার বা হাতে পরিয়ে দেয়। মাহিরা হকচকিয়ে যায়। কিছু বলতে যাবে তার আগেই আয়ান মাহিরার ডান হাত আরো একটা গোল্ডের রিং পরিয়ে দেয়। 
মাহিরা হতবাক। মাহিরা তার হাতের দিকে তাকিয়ে দেখে দু হাতের অনামিকা আঙ্গুলে দুটো আংটি ঝলঝল করছে। মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে অসহায় সুরে বলে,
- এটা কি করলেন?
আয়ান শান্ত গলায় বলে, কি করলাম? মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে কিছুটা রেগে বলে, 
- আপনি আংটি দিলেন কেনো?
আয়ান সহসাই বলে, আমার পছন্দ তাই। মাহিরা এবার রেগে যায়। বলে, আপনার পছন্দ তাতে আমার কি? আমাকে কেনো দিচ্ছেন? আয়ান বলে ওঠে, তুমি তো আমার পছন্দেই নিতে চাইছিলে। তাই আমার পছন্দ মতোই দিলাম।
মাহিরা আশ্চর্য হয়। বলে ওঠে, আমি কখন বললাম আমি আপনার পছন্দ মতো নিতে চাই? আয়ান বলে ওঠে, 
- তাহলে কি নিজের পছন্দ মতো নিতে চাইছো? ওকে নাও।
মাহিরা আড়চোখে আয়ানকে দেখে বলে, আমার কিছু লাগবেনা বললামই তো। আয়ান বলে ওঠে, দেখেছো? তুমি নিজেই চাইছো আমার পছন্দ মতো নিতে। তাই তো নিজে কিছু পছন্দ করোনি। জানি মুখ ফুটে বলতে পারছো না। বাট আমি বুঝে নিয়েছি সব।
মাহিরা হতবাক। এই লোকের কথার প্যাচ অনেক। সে আর কথা বাড়ালো না। শুধু বলল, আংটি দুটো খুলে ফিরিয়ে দিন। আয়ান রাগী চোখে তাকায় মাহিরার দিকে। মনে হচ্ছে মাহিরাকে এক্ষনি কাঁচা চিবিয়ে খাবে সে। আয়ান মাহিরার দিকে আরেকটু এগিয়ে এসে চোয়াল শক্ত করে চিবিয়ে চিবিয়ে বলে, 
- ডোন্ট এভার ডু দিস এগেইন। ইফ ইউ ডু? আই উইল কাট অফ ইউর হ্যান্ড। ইউ নো? মাই পানিশমেন্ট ইজ ভেরি স্ট্রিক। সো বি কেয়ারফুল।
মাহিরা চমকে উঠে আয়ানের এমন কথা শুনে। তার মনে পরে যায় আয়ানের সাথে প্রথম সেই রাতের কথা। আয়ান সেদিন তার গলায় কাচের গ্লাস ধুকিয়ে দিতে চেয়েছিলো। আজ আবার হাত কাটতে চাইছে? মাহিরা ভয়ে সিটিয়ে যায়। মাথা নিচু করে ফেলে সে। আয়ান সেটা দেখে মৃদু ঠোঁট বাঁকায়।
আয়ান বিল মিটিয়ে মুসকানদের কাছে আসে। মাহিরার হাত সে এখনও ধরে আছে। মাহিরা ভয়ে কিছু বলতেও পারছে না। আয়ান মুসকানদের কাছে আসলে দেখে কেউ নেই। আয়ান এবার মাহিরার হাত ধরে রেখে অন্য হাতে পকেট থেকে ফোন বের করে অর্নকে কল দেয়। আয়ান কোনো প্রশ্ন করার আগেই ওপাশ থেকে অর্নব বলে ওঠে, আমরা গাড়িতে। আয়ান ফোন কেটে দেয়।
আয়ান আবারো মাহিরার হাত ধরে সামনে এগিয়ে যেতে নিলে মাহিরা বলে ওঠে, হাতটা ছাড়ুন। আয়ান ঘুরে মাহিরার দিকে তাকায়। মাহিরা মাথা নিচু করে আছে। আয়ান আশে পাশে তাকিয়ে বলে ওঠে, নো। মাহিরা এবার আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে,  
- হাতটা ছাড়ুন প্লিজ। সবাই তাকিয়ে আছে। 
আয়ান এবার রেগে গম্ভীর গলায় বলে, 
- আমাকে কোলে নিতে বাধ্য করো না।
মাহিরা চোখ বড় বড় করে তাকায় আয়ানের দিকে।কি বলছে এই পাগল লোক? তাকে কোলে নিবে মানে? এই লোক কি আসলেই পাগল নাকি? মাহিরা ভাবনার মাঝেই আয়ান আবারো মাহিরার হাত ধরে হাটা শুরু করে দেয়।
আয়ান গাড়ির কাছে এসে ড্রাইবারের পাশের সিটের দরজা খুলে দেয়। অর্নব বসে বসে পপকন খাচ্ছিলো। হঠাৎ গাড়ির দরজা খুলে যাওয়ায় সে ভেবাচেকা খেয়ে যায়। অর্নব তাকিয়ে দেখে আয়ান দাঁড়িয়ে আছে সামনে। অর্নব কিছু বলার আগে আয়ানের গম্ভীর গলায় বলে ওঠে,
 - গাড়ি থেকে বের হ। 
অর্নব শান্তি মতো পপকন খাচ্ছিলো। সেটাও সয্য হলো না আয়ানের। অর্নব দীর্ঘশ্বাস ফেলে বের হয় গাড়ি থেকে। আর বের হয়ে যেটা দেখলো সেটার জন্য অর্নব মোটেও প্রস্তুত ছিলো না। আয়ানের হাতের দিকে তাকাতেই অর্নবের চোখ বড় বড় হয়ে যায়। আয়ান মাহিরার হাত ধরে আছে। এতোক্ষণ অর্নব সেটা খেয়াই করনি? সে আয়ানকে কিছু বলতে যাবে তার আগে আয়ান মাহিরাকে বলে, 
- গাড়িতে ওঠো।
মাহিরা নিজেও অবাক হয় আয়ানকে এমন কান্ডে। মাহিরা বলে, আমি সামনে বসবো না। পেছনে বসবো মুসকানের সাথে। আয়ান এবার রাগী চোখে তাকায় মাহিরার দিকে। ধমক দিয়ে বলে,
- তুমি নিজ ইচ্ছায় উঠবে? নাকি আমি উঠিয়ে দিবো?
মাহিরার চোখ বড় হয়ে যায়। সে জানে এই লোকের মাথায় তার সব ছিড়া। মাহিরা আর কিছু না বলে তাড়াতাড়ি গাড়িতে ওঠে বসে। 
অর্নব হা হয়ে চেয়ে আছে আয়ানের দিকে। কি হলো এটা? অর্নবের মাথার উপর দিয়ে গেলো সব। অর্নব আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে, এটা কি করলে ভাইয়া? আয়ান গম্ভীর গলায় বলে, কি করলাম? অর্নব বলে ওঠে, আমাকে উঠিয়ে দিলে কেনো? আয়ান এবার অর্নবের দিকে তাকিয়ে বলে, মাই উইশ। অর্নব আরো কিছু বলতে যাবে তার আগে আয়ান চলে যায়। 
মুসকান মনোযোগ দিয়ে পপকন খাচ্ছিলো। হঠাৎ মাহিরাকে সামনে বসতে দেখে বলে, আরে মাহিরা কোথায় ছিলে তুমি? এই নাও তোমার জন্য পপকন কিনে এনেছি। মুসকান মাহিরার দিকে একটন পপকনের বক্স এগিয়ে দেয়। মাহিরার জন্যও সে আগে থেকেই পপকন কিনে রেখেছিলো। মাহিরা হাত বাড়িয়ে মুসকানের থেকে পপকন নেয়।
আয়ান এসে ড্রাইভিং সিটে বসে। মুসকান ভাইকে তার সামনে ড্রাইভিং সিটে বসতে দেখে বলে, ভাইয়া অর্নব ভাই কোথায়? তখনই অর্নব গাড়ির দরজা খুলে মুসকানের পাশের সিটে এসে বসে। মুসকান কিছুটা ভ্রু কুচকায়। মনে মনে বিরবির করে, অর্নব ভাই তো কোনোদিন তার পাশে বসেনা। তাহলে আজ কি হলো? পরক্ষণে কিছু একটা ভেবে মুচকি হাসলো মুসকান।
অর্নব গাড়িতে বসে আয়ানকে তৃক্ষন্ন দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করছে। মাহিরা তার সামনে বসায় সে ভালোভাবে মাহিরাকে দেখতে পারছে না। নাহলে সে এতোক্ষণ মাহিরাকেও ভালোভাবে পর্যবেক্ষন করে নিতো। অর্নব এক মুঠো পপকন মুখে পুরে চিবিয়ে চিবিয়ে আয়ানকে পর্যবেক্ষণ করছে। 
মাহিরা পকপক হাতে নিয়ে বসে আছে। মাহিরা আড়চোখে আয়ানের দিকে তাকাচ্ছে। এই লোকের মতিগতি সে বোঝে না। আয়ানের হাব ভাব বোঝার চেষ্টা করছে সে। আয়ান শান্ত ভাবে গাড়ি চালাচ্ছে। মাহিরার দিকে তাকিয়ে দেখে মাহিরা নিশ্চুপে বসে আছে। আয়ান ভ্রু কুঁচকায়। মাহিরার দিকে তাকিয়ে বলে, খাচ্ছো না কেনো?
মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে,খাচ্ছি। কিন্তু আপনিও নিন। মাহিরা আয়ানের দিকে পকপক বাড়িয়ে দেয়। আয়ান শান্ত চোখে দেখে মাহিরাকে। মুসকান পাশ থেকে বলে ওঠে, আরে মাহিরা ভাইয়া এসব খায় না। কখনো খায়নি বুঝলে? তাই তো আমি ভাইয়ার জন্য আনিনি। তুমি খাও। 
সবাইকে অবাক করে দিয়ে আয়ান হাত বাড়িয়ে মাহিরার থেকে কিছুটা পপকন নিয়ে নিজের মুখে পুরে নেয়। তারপর আবারো গাড়ি চালানোয় মনোযোগ দেয় । 
আয়ানের এমন কান্ড দেখে উপস্থিত সকলে অবাক চোখে তাকিয়ে থাকে আয়ানের দিকে। অর্নব পপকন মুখে হা হয়ে চেয়ে আছে আয়ানের দিকে। মুসকানও অবাক চোখে চেয়ে আছে তার ভাইয়ের দিকে। মুসকান বলে বসে, ভাইয়া তুমি আবার কবে থেকে পপকট খাওয়া শুরু করলে?
আয়ান গাড়ি চালাতে চালাতে বলে ওঠে, আই ডোন্ট নো। অর্নব এবার তার হাতে থাকা পপকন টা বাড়িয়ে দেয় আয়ানের দিকে। বলে, ভাইয়া তাহলে আমার থেকেও কিছুটা পপকন খাও। নাহলে কিন্তু মাহিরার ভাগে পপকন কম পরবে।
আয়ান গম্ভীর গলায় বলে ওঠে, থাপ্পড় খেতে না চাইলে চুপচাপ বসে থাক। অর্নব আয়ানের এমন কথা শুনে ফিক করে হেসে দেয়। মুসকান ভ্রু কুঁচকায়। অর্নব পাগলের মতো হাসছে কেনো সে বুঝলো না। মাহিরাও কিছু না বুঝে আনমনে পপকন খায়।
______
আয়ান আর অর্নব, মাহিরা আর মুসকানকে বাড়ি পৌঁছে দিয়ে অফিসে চলে এসেছে। বিকেলে একটা মিটিং ছিলো তাদের। সেটাই দুজনে এসে এটেন্ট করেছে। আয়ান যদিও সবসময় তার বাবার অফিসে আসে না। কাজ পরলে তখনই তার আসা হয়। 
টানা দুই ঘন্টা মিটিং শেষে আয়ান চেয়ারে গা এলিয়ে দেয়। অর্নবেরও সেইম অবস্থা। অর্নব চেয়ারে বসে চোখ বন্ধ রেখে বলে, তুমি মাহিরাকে দিয়ে এতোগুলো কাগজ কেনো সাইন করালে ভাইয়া? কি আছে ওই কাগজে? আয়ান চোখ বুঝে বলে, সময় হলে সব জানতে পারবি। 
অর্নব মৃদু হেসে বলে, তুমি মাহিরাকে পছন্দ করো তাই না ভাইয়া? আয়ান কিছুই বললো না। অর্নব আয়ানের থেকে কোনো জবাব না পেয়ে আবারো বলে, তুমি জানো ভাইয়া? তোমার জন্য আজ আমাকে কতোগুলো মিথ্যা বলতে হয়েছে? আয়ান তখনো নিশ্চুপ। অর্নব আবারো বলতে থাকে, 
- আমি জানিনা তুমি কেনো এমনটা করলে। কিন্তু মাহিরার কাছে আমি আজকের পর থেকে সারাজীবন লায়ার হয়ে থাকবো। মাহিরাকে আমি আজ কতোশতো মিথ্যা বললাম। শুধুমাত্র তোমার জন্য। ফুচকার মিথ্যা গল্প বলে রাজি করিয়ে নিয়ে এসেছিলাম মেয়েটাকে। আর মেয়েটাও এতোটা সহজ সরল, যে ফুচকার লোভে পরে চলে আসলো আমার সাথে। মাহিরা যদি জানতো..।
- আর ইউ মেড? হাউ ডেয়ার ইউ?
আয়ানের রাগী গম্ভির গলায় থেমে যায় অর্নব। অর্নব তাকিয়ে দেখে আয়ান তার দিকে রাগী চোখে তাকিয়ে আছে। অর্নব বুঝলো না আয়ান হঠাৎ রেগে গেলো কেনো? অর্নব বলে ওঠে, কি হয়েছে ভাইয়া? আয়ান এবার অর্নবের সামনে এসে দাড়িয়ে চোয়াল শক্ত করে দাঁতে দাঁত পিসে হুংকার দিয়ে বলে, 
- তোকে আমার এখন জাস্ট কাঁচা চিবিয়ে খেতে ইচ্ছা করছে অর্নব। আগে কেন বললি না এটা? এন্সার মি? 
অর্নব অবুঝের মতো বলে, কি বলেনি আগে ভাইয়া? আয়ান আর কিছু না বলে চেয়ারে একটা লাথি মেরে গজগজ করতে করতে অফিস থেকে বেরিয়ে যায় । অর্নব হতভম্ব। সে আবার কি করলো? নিজেই তো কিছু জানেনা।
সন্ধ্যার মাহিরা আর মুসকান একসাথে রুমে বসে চা খাচ্ছে। এমন সময় নাবিলা হাতে করে কতো গুলো ফুচকা নিয়ে রুমে ঢুকে। নাবিলার হাতে ফুচকার প্যাকেট দেখে মাহিরা মুসকান দুইজনই অবাক হয়। নাবিলা এসে বিছানায় বসে। মাহিরা আর মুসকানের দিকে ফুচকা বাড়িয়ে দিয়ে বলে, সবার জন্য ফুচকা এনেছে আয়ান ভাই। এগুলো তোমাদের। 
মাহিরা মুসকান দুইজনই খুশি হয় ফুচকা দেখে। মাহিরা ঝটপট ফুচকার প্যাকেট গুলো খুলতে শুরু করে। প্যাকেটের ভেতরে ফুচকার সবকিছুই ছিলো। মাহিরা ফুচকা বের করে একের পর এক ফুচকা মুখে পুরতে থাকে। মুসকানেরও সেইম অবস্থা। নাবিলা পাশে বসে হা হয়ে চেয়ে থাকে ওদের দিকে। এই দুইটা এইভাবে খাচ্ছে কেনো সে বুঝলো না। 
মাহিরা ফুচকা পেয়ে মহা খুশি। অর্নব দুপুরে তাকে ফুচকার কথা বলে নিয়ে গিয়েছিল ঠিকই। কিন্তু তাকে ফুচকা খাওয়ায়নি। তাই বলে মাহিরার একটু মন খারাপ হয়েছিলো যদিও। সে একবার বলতে চেয়েছিলো ফুচকার কথা। কিন্তু তাদের মিটিং আছে শুনে আর কিছু বলেনি সে। বাট এখন এই সন্ধ্যা বেলায় সে ফুচকা খেতে পেয়ে মহা খুশি।
আয়ান রুমে এসে তার হাতে থাকা ফাইলটা সযত্নে লকারে তুলে রাখে। যেখানে মানুষ স্বর্ন অলংকার টাকা পয়সা স্বযত্নে তুলে রাখে। সেখানে আয়ান তার হাতে থাকা ফাইলটা রাখল। খুব যত্ন সহকারে ফাইলটা রেখে দিয়েছে সে। পরপর আয়ান ফ্রেশ হতে চলে গেলো। 
রাতের খাওয়া শেষে মাহিরা রুমে আসে। এসে দেখে তার বেড সাইড টেবিলের উপর গরম দুধ রাখা। মাহিরা প্রতিদিন রাতে গরম দুধ খেয়ে তারপর ঘুমায়। তার দুধ খেতে ভালো না লাগলেও পরী বেগমের কড়া আদেশে তাকে খেতে। মাহিরা দুধের গ্লাসটা হাতে নিয়ে এক চুমুকে সবটুকু দুধ ফিনিশ করে ফেলে। পরপর রুমের লাইট অফ করে জিরো লাইট জ্বালিয়ে শুয়ে পরে। 
রাত বারোটা। আয়ান তার রুমে পায়চারি করছে। কিছু একটা ভাবছে সে। আয়ানের কিছু একটা মনে পরতেই মুচকি হেসে রুম থেকে বেরিয়ে যায় সে। আয়ানের পাশের রুমটা মাহিরার। সেটা মাহিরা না জানলেও আয়ান খুব ভালো ভাবেই জানে।
আয়ান মাহিরার রুমের সামনে এসে থেমে যায়। দরজার নিচের দিকে চোখ রেখে দেখার চেষ্টা করে মাহিরার রুমের লাইট অফ কিনা। আয়ান সুক্ষ চোখ বলল লাইট অফ। আয়ান ঠোঁট বাকিয়ে আবারো নিজের রুমে চলে গেলো। 
রুমে এসে আয়ান সোজা তার বারান্দায় কাছে চলে এসেছে। ছাদের মতো বারান্দাতেও কোমরের উপর পর্যন্ত রেলিং। আয়ান কিছু না ভেবে হুট করে রেলিংয়ের উপর উঠে পরে। খুব সাবধানে রেলিং পেরিয়ে হাত দিয়ে পাশের বারান্দাটার রেলিং ধরে। আয়ান নিচে তাকিয়ে দেখলো একবার। এখান থেকে পরলে তার হাত পায়ের হাড্ডি কিছুই আর আস্ত থাকবে না। আয়ান খুব সতর্কতার সঙ্গে রেলিং পেরিয়ে পাশের বারান্দায় চলে যায়। 
পাশের বারান্দায় গিয়ে বারান্দার দরজা আস্তে করে ধাক্কা দেয় আয়ান। দেখার চেষ্টা করে বারান্দার দরজা খোলা কিনা। ভাগ্য ক্রমে দরজা খোলা ছিলো। আয়ান ভাবেনি সে দরজা খোলা পাবে। আয়ান ভেবেই এসেছে প্লান'এ কাজ না করলে প্লান'বি কাজে লাগবে সে। আগে থেকেই প্লান বি রেডি ছিলো তার কাছে।
আয়ান আস্তে দরজা ঠেলে রুমে ঢুকে পরে। ভেতরে ঢুকে বেডে চোখ পরতেই আয়ান থমকে যায়। মাহিরা ঘুমিয়ে আছে। জিরো লাইটের আলোয় সে হালকা ভাবেই দেখতে পেলো মাহিরাকে। এই ঘুমন্ত মেয়ের জন্য সে চোরের মতো রেলিং পেরিয়ে রুমের ভেতরে এসেছে? আচ্ছা এটা কি তার সাথে যায়? এই ঘুমন্ত মেয়ে কি কখনো জানতে পারবে এ কথা? 
আয়ান চাইলে মাহিরার রুমের দরজা দিয়েও ভেতরে আসতে পারতো। কারন আয়ানের কাছে এ বাড়ির সকল রুমের একস্ট্রা চাবি আছে। আয়ান প্লান বি হিসেবে সেটাই রেখেছিলো। কিন্তু বাড়ির মানুষ একটা ছেলেকে মাঝ রাতে কোনো মেয়ের রুমে যেতে দেখলে খারাপ ভাববে। এতে আয়ানের কিছু যায় না আসলেও সে মাহিরাকে নিয়ে টেনশনে ছিলো। সে ভেবে নিয়েছিলো তার প্ল্যান'এ কাজ না করলে প্ল্যান'বি এর মোতাবেগ সে মাহিরার রুমের দরজা খুলে তারপর ভেতরে ঢুকবে।
আয়ান মাহিরার রুমের লাইট অন করে। সে এবার মাহিরার ঘুমন্ত মুখখানা স্পষ্ট ভাবে দেখতে পায়। আয়ান থমকে যায় আবারো। সে একই ভাবে দাড়িয়ে থাকে। ঘুমন্ত মাহিরাকে দেখছে সে। তার দৃষ্টির কোনো নড়চড় নেই। সে শুধু এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে মাহিরার দিকে। এই দৃষ্টি যেনো জনম জনমের। তার এই দৃষ্টি না কাটুক। তার এই দেখা শেষ না হোক। 
সময় কেটে যায় অনেকটা। আয়ানের কোনো হেল দোল নেই। সে এখনো একই ভাবে দাড়িয়ে আছে। আয়ান নিজেও জানেনা কতটা সময় অতিবাহিত হয়ে গেছে। এই মেয়েকে দেখার তৃষ্ণা তার আজ কিছুতেই মিটছে না।
আয়ান এবার খেয়াল করে দেখল মাহিরা শুধু এসি ছেড়ে ঘুমিয়ে আছে। আয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে। পরপর হাত বাড়িয়ে ফ্যানের সুইচ টিপ দেয়। ফ্যান ঘোরার সঙ্গে সঙ্গে মাহিরার পুরো রুমে ছড়িয়ে পড়ে গোলাপের কতোশতো পাপড়ি। গোলাপের পাপড়িতে ছেয়ে যায় মাহিরার পুরো রুম। উপর থেকে উড়ে উড়ে পরতে থাকে গোলাপের পাপড়ি গুলো। কিছু গোলাপের পাপড়ি বিছানায় ঘুমন্ত মাহিরার উপর পরে। আয়ান শান্ত চোখে তাকিয়ে দেখে তা। পরপর আস্তে ধীরে এগিয়ে যায় মাহিরার বেডের দিকে।
আয়ান এসে মাহিরার পায়ের কাছে বসে। মাহিরাকে ভালো করে পরখ করে দেখছে সে। ঘুমন্ত মানুষকে দেখতে যে এতোটা সুন্দর লাগে সেটা সে মাহিরাকে এভাবে না দেখলে কখনোই বুঝতে না। একদম নিষ্পাপ বাচ্চাদের মতো ঘুমিয়ে আছে মাহিরা। মাহিরা ডান কাত হয়ে শোয়ায় তার গোলাপি ঠোঁটের নিচে কালো তিলটা চিকচিক করছে। আয়ান তা দেখে শুকনো ঢোক গিলে। 
কিছু গোলাপের পাপড়ি এসে মাহিরার শরীরে চুলে পরেছে। মাহিরার ঘুম নষ্ট করছে এরা। আয়ান মুচকি হেসে হাত বাড়িয়ে সেগুলো ফেলে দেয়। আয়ান খেয়াল করে দেখলো তার হাত মৃদু কাঁপছে। 
আয়ান বুঝলো না কেনো এমনটা হচ্ছে। তার ভেতরে কিছু একটা হচ্ছে। আয়ান সেটা টের পেলো। এই মেয়ের সংস্পর্শে আসলে তার এমন হয়। আয়ান উঠে দাড়ায়। রুমে লাইট অফ করে সে আবারো ফিরে আসে মাহিরার বেডের কাছে।হুট করে কিছু না ভেবে আয়ান মাহিরার গা ঘেঁষে শুয়ে পরে। কাত হয়ে শুয়ে মাহিরার ঘুমন্ত মুখ দেখতে থাকে সে। জিরো লাইটের আলোয় সে হালকা করে দেখতে পায় মাহিরাকে।
মাহিরা শীতে গুটিশুটি মেরে ঘুমিয়ে আছে। ফ্যান এসি দুটোই চলছে। মাহিরা ঘুমের মাঝে কিছুটা নড়েচড়ে উঠে। আয়ান শান্ত চোখে দেখছে মাহিরাকে। সে নিসঃন্দেহে জানে এ মেয়ের ঘুম আজ সকাল ছাড়া বাঙ্গবে না। হালকা ঘুমের ডোস পরেছে যে।
মাহিরার খুব শীত লাগছে । আয়ান মাহিরার গা ঘেঁষে থাকায় মাহিরা সামনের দিকে কিছুটা উষ্ণতা পায়। মাহিরা ঘুমের মাঝে উষ্ণতা পেয়ে সেদিকে এগিয়ে যায়। কোলবালিশ ভেবে আয়ানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। আয়ান আর মাহিরার প্রথম আলিঙ্গন।
আয়ান হতোবাক হয়। মাহিরা নিজ থেকে তাকে জড়িয়ে ধরেছে? এমন কিছু হবে আয়ান সপ্নেও কখনো ভাবেনি। সে তো শুধু চেয়েছিলো আজ সারারাত এই মেয়েকে মন ভরে দেখতে। 
মাহিরার মাথা ঠিক আয়ানের বুকে। মাহিরার হাত আয়ানের পিঠ আঁকড়ে ধরেছে। মাহিরার চুনোপুঁটি শরীর আয়ানের সুঠাম দেহের সাথে বিড়াল ছানার মতো লেপ্টে আছে। আয়ান মৃদু ঠোঁট বাকায়। এবার সে নিজ থেকে হাত বাড়িয়ে মাহিরাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে। মাহিরার কানের কাছে তার মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলে,
- "আওয়ার ফাস্ট নাইট মাই কুইন"।
চলবে..
[ আজকের পর্বটা একটু ছোটো বলে কি রাগ করলা? ]

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৯ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন