#এ_দেখা_শেষ_না_হোক #পর্ব - (৪৮)
#writer_sumaiya_akter_sathi
--
আয়ান দাঁড়িয়ে আছে তুহিনের কবরের পাশে। মাহিরা একনাগাড়ে কেঁদেই যাচ্ছে তুহিনের কবরের পাশে বসে। তুহিনকে তার বোনের পাশে কবর দেওয়া হয়েছে। জানাজা শেষে আয়ান মাহিরাকে তুহিনের কবরের কাছে নিয়ে এসেছে।
মাহিরা বসে বসে অঝোরে কাঁদছে। তার বিশ্বাসই হচ্ছে না তুহিন আর নেই। সে ভাগ্য করে তুহিনের মতো একজন ভাই পেয়েছিলো। যে তাকে সবসময় প্রটেক্ট করেছে। নিজে না খেয়ে তাকে খাইয়েছে। তার জন্য রেজওয়ানের কাছে কতো গালি কতো মার খেয়েছে। কিন্তু তারপরও কখনো তাকে প্রটেক্ট করা অফ করেনি। উল্টো তাকে বাঁচাতে আজ নিজের প্রানটা দিয়ে দিয়েছে। আল্লাহ যে তার তুহিন ভাইকে এতো তাড়াতাড়ি উঠিয়ে নিবে মাহিরা সেটা কখনো কল্পনাও করেনি। এইতো সেদিনই তুহিন খুশি মনে মাহিরাকে বলেছিলে তুহিনের কবরটা যেনো তার বোনের পায়ের কাছে হয়। আর আজ সত্যিই তুহিনকে কবর দেওয়া হলো।
মাহিরা কান্নায় ভেঙ্গে পরে। আয়ান তাকিয়ে থাকে মাহিরার দিকে। সকালে উঠে মাহিরা যখন শুনেছে তুহিন মারা গিয়েছে। তখন থেকে মেয়েটা কেঁদে যাচ্ছে। কেঁদে কেঁদে হসপিটালের বসেই বায়না ধরে সে তুহিনের কবরের কাছে যাবে। আয়ান মাহিরার এতো কান্না দেখে নিয়ে এসেছে তুহিনের কবরের কাছে। কিন্তু এই মেয়ে এখানে এসে এতো বেশি কান্না করছে তা আগে জানলে আয়ান এই মেয়ে কখনোই এখানে নিয়ে আসতো না।
আয়ান কিছু না বলে মাহিরার হাত ধরে বলে, মাহি চল। মাহিরা আয়ানের হাত ঝাড়া মেরে ফেলে দিয়ে তুহিনের কবরের কিছুটা মাটি হাতে তুলে নিয়ে আয়ানের দিকে তাকিয়ে কেঁদে কেঁদে বলে,
- এটা আমার ভাইয়ের কবরের মাটি।
আয়ান কিছু না বলে তাকিয়ে থাকে মাহিরার দিকে। পরপর মাহিরাকে টেনে উঠায় নিচ থেকে। মাহিরা কেঁদেই যাচ্ছে। আয়ান কিছু না বলে মাহিরার চোখের পানি মুছে দিয়ে বলে, ডক্টর তোকে বেড রেস্ট নিতে বলেছে মাহি। এতো কাঁদলে তোর শরীর আরো বেশি খারাপ করবে।বলেই আয়ান মাহিরার হাত ধরে হাটা দিলে মাহিরা ঝাড়া মেরে আয়ানের হাত ফেলে দেয়। বলে, আমার কিছু শর্ত আছে। আয়ান ভ্রু কুঁচকে তাকায় মাহিরার দিকে। বলে, কিসের শর্ত?
মাহিরা বলে, আপনি কথা দিন আমি যখন বলবো যখন চাইবো তখনই আপনি আমাকে তুহিন ভাইয়ার কবরের কাছে নিয়ে আসবেন। আয়ান মাহিরার দিকে তাকিয়ে দীর্ঘ শ্বাস ফেলে বলে, নিয়ে আসবো। মাহিরা নাক টেনে আবারো বলে, উনি কিন্তু আমার ভাই হয়। আয়ান ছোট করে বলে, ওকে। মাহিরা আবারো বলে, আপনি কিন্তু অন্য কিছু ভাববেন না। আয়ান আবারো বললো, ভাববো না।
মাহিরা আর কিছু না বলে তুহিনের কবরের দিকে তাকায়। তুহিন মৃত ভাবতেই মাহিরা আবারো ঝড়ঝড় করে কেঁদে দেয়। আয়ান দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মাহিরাকে টেনে নিজের সাথে জড়িয়ে নেয়। মাহিরা আয়ানকে জড়িয়ে ধরে আরো জোরে জোরে কেঁদে উঠে। কাঁদতে কাঁদতে বলে, তুহিন ভাইয়া কেনো এমনটা করলো খাড়ুস লোক? উনি আমাকে বাঁচাতে নিজের প্রাণ টা কেনো দিলো?
এই একই প্রশ্নের উত্তর আয়ানের কাছেও নেই। সে এই প্রশ্নের উত্তরে মাহিরাকে কিছুই বলতে পারলো না।মাহিরাকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে মাহিরার চোখের পানি মুছে দিতে দিতে বললো, এতো কাঁদছিস কেন মাহি? মাহিরা কেঁদে কেঁদে আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে, ভাইয়ের জন্য কাঁদবো না? আয়ান আর কিছু বললো না। মাহিরা আবারো বলে ওঠে, তুহিন ভাইয়া আমার জন্য অনেক কিছু করেছে। আয়ান ছোট করে বলে, জানি আমি। মাহিরা আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে, আমি তো উনার জন্য কিছুই করতে পারলাম না।
বলেই মাহিরা আবারো কেঁদে দেয়। আয়ান বলে, কিছু করতে চাইলে নিজের ভাইয়ের জন্য দোয়া কর। যেনো।মাহিরা কিছু না বলে কেঁদেই যাচ্ছে। আয়ান তা দেখে বলে, এতো কাঁদলে কিন্তু তোকে আর কখনো এখানে আনবো না? মাহিরা এবার আয়ানের দিকে ভেজা চোখে তাকিয়ে বলে ওঠে, অসভ্য লোক আপনি না আনলে আমি একাই এখানে চলে আসবো। আয়ান আর কিছু না বলে মাহিরার চোখের পানি মুছে দিয়ে মাহিরার হাত ধরে হাঁটা দেয়। মাহিরা আর কিছু না বলে কেঁদে কেঁদে আয়ানের সাথে চলে যায়। কিন্তু যেতে যেতে সে বারবার পেছন ফিরে তুহিনের কবরের দিকে তাকায়।
______________
আয়ান, মাহিরা, অর্নব সবাই শিকদার বাড়িতে ফিরে এসেছে। মাহিরা তার রুমে খাটে হেলান দিয়ে বসে আছে।তার ডান হাতে ব্যান্ডজ। মাহিরার পাশে বসে আছে পরী বেগম ও মোশাররফ হোসেন। পরী বেগম কাল রাতে অর্নবের কাছে শুনেছিলেন মাহিরাকে খুজে পাওয়া গিয়েছে। তাই তিনি তখন সস্থির নিশ্বাস ফেলেছিলেন।কিন্তু মাহিরার হাতে যে গুলি লেগেছে সেটা অর্নব আয়ানের কথা মতো কাউকে বলতে পারেনি। তাই বাড়ির কেউ জানতো না মাহিরার হাতে গুলি লাগার বিষয় টা।
আজ মাহিরা বাড়ি ফেরার পর সবাই জেনেছে বিষয় টা। পরী বেগম কাদঁছেন মেয়ের হাতে ক্ষত দেখে। তার মেয়েটা কেনো একটু ভালো ভাবে বাঁচতে পারছে না তিনি জানেন না। শাজাহান শিকদার দাঁড়িয়ে আছেন মাহিরার রুমে। মাহিরার হাতে গুলি লেগেছে শুনে তিনি মাহিরার রুমে এসেছেন। আয়ান, অর্নব, মুসকান সবাই দাঁড়িয়ে আছে মাহিরার রুমের ভেতর।
শাজাহান শিকদার রেগে আছেন আয়ানের উপর। তার এই বেয়াদব ছেলের জন্য অর্নবের এনগেজমেন্ট টা কাল হতে পারেনি। এতো গুলো মানুষের সামনে তার নাক চোখ কাটা গিয়েছে। দুই পরিবার মিলে আবারো সিদ্ধান্ত নিয়েছে রাহার পরিক্ষার পর ডিরেক্ট তাদের বিয়ে দেওয়া হবে। আর কোনো এনগেজমেন্ট হবে না।
আয়ান দাঁড়িয়ে আছে শাজাহান শিকদারের পাশে।শাজাহান শিকদার রাগী গলায় আয়ানের দিকে তাকিয়ে বলেন, আর কতোদিন তোমার ভুলের জন্য বাড়ির মেয়ে কিডনাপ হবে আরিয়ান? আয়ান সহসা বলে, আর কখনো হবে না। সেই পথ সারাজীবনের জন্য বন্ধ করে দিয়েছি আমি। শাজাহান শিকদার তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ছেলের দিকে তাকিয়ে বলেন, কিসের পথ বন্ধ করেছো তুমি? আয়ান কিছু বলে না। শাজাহান শিকদার আবারো বলেন,
- রেজওয়ানের সাথে তোমার ইগজ্যাক্টলি কি নিয়ে ঝামেলা চলছে সত্যিটা আমাকে বলো আরিয়ার। আমি দেখছি কিছু করা যায় কিনা।
শাজাহান শিকদার এখনো জানেন না রেজওয়ানের সাথে আয়ানের কিসের এতো ঝমেলা। তিনি শুরু থেকে জানতেন আয়ান রেজওয়ানের সাথে খুব ভালো বিজনেস করছে। কিন্তু হঠাৎ কি এমন হলো যার জন্য রেজওয়ানের সাথে আয়ানের শত্রুতা তৈরি হয়েছে সেটা শাজাহান শিকদারেরও অজানা। আয়ানকে তিনি বারবার জিজ্ঞেস করার পরও আয়ান তাকে সেই বিষয়ে কিছুই বলেনি।
আয়ান শাজাহান শিকদারের কথার জবাব না দিয়ে বললো, তোমার কিছু দেখতে হবে না। আমি আমার টা দেখে নিতে পারবো। বলেই আয়ান আর কিছু না বলে চলে যায় মাহিরার রুম থেকে। পরি বেগম শাজাহান শিকদারের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠেন, ভাইজান আমার মনে হচ্ছে মাহিরাকে নিয়ে আমাদের ইতালি চলে যাওয়া উচিত। শাজাহান শিকদার পরীর কথায় বলেন, হঠাৎ এমন কথা কেন বলছিস পরী?
পরী বেগম বলেন, আমার মেয়েটা বাংলাদেশে শান্তি মতো বাঁচতে পারছে না ভাইজান। বাড়ির বাইরে একপা দিতে গেলে দশবার ভাবতে হচ্ছে। আমরা বরং ইতালি চলে যাই। এতে আমার মেয়েটা একটু শান্তি মতো বাঁচতে পারবে। শাজাহান শিকদার এবার পরীর দিকে তাকিয়ে বলেন, তুই চলে গেলে মা কষ্ট পাবে পরী। মা পঁচিশ বছর তোকে ছাড়া কাটিয়েছেন। আমি চাইনা মা আর কোনো কষ্ট পাক।
পরী বেগম বলেন, কিন্তু ভাইজান আমার মেয়েটা..। এতোটুকু বলতেই শাজাহান শিকদার বলে ওঠেন, টেনশন করিস না পরী। আমি দেখছি কি করা যায়। পরী বেগম আর কিছু বললেন না। তিনি না পারছেন বাংলাদেশে থাকতে আর না পারছেন তার মেয়েকে নিয়ে ইতালি চলে যেতে।
আয়ান তার রুমে এসে ফ্রেশ হয়ে বেরোতে না বেরুতেই তার ফোনটা বেজে ওঠে। আয়ান এসে বিছানা থেকে ফোন হাতে তুলে নিয়ে দেখে ফাহিমের কল। আয়ান কিছু না ভেবে ফোন রিসিভ করে ফাহিমকে বলে, সব ঠিক ঠাক? ওপাশ থেকে ফাহিম বলে, জ্বি স্যার। আপনি এসে একটু চেক করে গেলে ভালো হতো। আয়ান একহাতে ফোন কানে রেখে নিজের লাগেজ গোছাতে গোছাতে বলে, আমার হাতে সময় নেই ফাহিম। আমি এখন আসতে পারবো না।
ফাহিম ওপাশ থেকে বলে, কিন্তু স্যার..। এতোটুকু বলতেই আয়ান বলে ওঠে, খেয়াল রাখবি কোনো গন্ডগোল যেনো না হয়। এইবার কোনো গন্ডগোল হলে সবার আগে তোকে মেরে পুঁতে রাখবো ওই কবরে। ফাহিম মুখ কালো করে বলে, ওকে স্যার। কোনো গন্ডগোল হবে না। আয়ান নিজের জামা কাপড় লাগেজে ভরতে ভরতে বলে,
- সাতদিন পর এক টুকরো রুটি দিবি, তিনদিন পর এক ফোটা পানি। আর খেয়াল রাখবি রুটিটা যেনো পঁচা আর বাসি হয়। গট ইট?
আয়ানের কথায় ফাহিম চমকে উঠে। বলে, স্যার এটা কিভাবে সম্ভব? তাহলে তো..! ফাহিমের কথা শেষ করার আগেই আয়ান চিবিয়ে বলে ওঠে, আমার কথার বাইরে একটা কাজও করবি না ফাহিম। নাহলে তোর দশাও আমি ওমন করতে বাধ্য হবো। যেটা বলেছি চুপচাপ করবি। আমি ফিরে আসার আগে মরে গেলে কাল রাতে যে কবর খুঁড়ে রেখেছি? সেখানে দাফন করে দিবি। আর নিজের পানিশমেন্টের জন্য রেডি থাক। বাংলাদেশে ফিরে তোর পানিশমেন্ট টা দিচ্ছি আমি দারা।
ফাহিম আয়ানকে রেগে যেতে দেখে আর কিছু বললো না। কখা পাল্টে বললো, স্যার একটা কথা জিজ্ঞেস করি? আয়ান লাগিজের চেন আঁটকিয়ে বলে, তাড়াতাড়ি বল হাতে সময় নেই। ফাহিম বলে ওঠে, স্যার ম্যাম কি জানে আপনি যে কাল সকালের ফ্লাইটে আমেরিকার যাচ্ছেন? আয়ান সোফায় গিয়ে বসে গা এলিয়ে দেয়। ফাহিমকে বলে, না এখনো জানে না। ফাহিম বলে ওঠে, ম্যামকে বলবেন না আপনি যে কাল চলে যাচ্ছেন?
আয়ান বলে ওঠে, সকালে বলবো। এখন বললে কেঁদে কেঁটে ভাসাবে। ওর শরীর এমনিতেই দুর্বল এতো স্ট্রেস দেওয়া ঠিক হবে না। তাই যা বলার সকালে বলবো। তখন কাঁদলেও একটু কাঁদবে। ফাহিম বলে ওঠে, স্যার আপনি তো এটাই চেয়েছিলেন ম্যাম যেনো শুধু মাত্র আপনার জন্য কাঁদে। আয়ান কিছুক্ষণ ভেবে আবারো বলে, হ্যা চেয়েছি। কিন্তু এতো কাঁদবে সেটা চাইনি। ফাহিম আর কিছু বললো না। আয়ান আবারো বললো,
- তুই জানিস ফাহিম? আমি মারা গিয়েছি শুনে মাহি কতো কেঁদেছে? মরা কান্না জুড়ে দিয়েছে সেদিন। আল্লাহই জানে আমি সত্যি সত্যি মারা গেলে ওর কি হতো।
ফাহিম ওপাশ থেকে মুচকি হেসে বলে, স্যার ম্যাম হয়তো আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছে। আয়ান পায়ের উপর পা তুলে রাজা বাদশাদের মতো বসে বলে, হতে পারে। বাট এখনো মুখ ফুটে কিছু বলেনি। ফাহিম বলে ওঠে, আপনিও তো ম্যামকে কিছু বলেননি স্যার। আয়ান চোখ বন্ধ করে বলে ওঠে,
- আমার ভালোবাসা মাপার ক্ষমতা মাহি'র নেই। ও যতোবার আমার ভালোবাসা মাপতে যাবে ততবার আমার ভালোবাসার গভীরে তলিয়ে যাবে। তাই আমি চাই ও সারাজীবন আমার ভালোবাসার গভীরতা মেপে যাক। কখনো কোনো কুল খুঁজে না পাক।
ফাহিম এবার বলে ওঠে, স্যার আপনার আর ম্যামের কি সুন্দর একটা সংসার হবে না? আয়ান এবার জোর গলায় বলে ওঠে, আলবাত হবে। কেনো হবে না? ফাহিম বলে ওঠে, কিভাবে হবে স্যার? ম্যাম তো আপনাকে খুনি ভাবছে। আয়ান চোখ বন্ধ রেখে মুচকি হেসে বলে, ও আমাকে খুনি ভাবলে ওকে এই আমি নামক খুনির সাথেই সংসার করতে হবে। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত এই খুনির সাথেই ওর বেঁচে থাকতে হবে।
ফাহির আর কিছু বললো না। ফাহিমের নিজেরও জানা নেই সেদিন আসলে কি ঘটেছিলো। কিন্তু ফাহিমের অন্ধ বিশ্বাস আয়ান খুন করেনি। আর যাই হোক আয়ান কখনো খুন করতে পারেনা। সেটাও একজন নিরীহ নিরপরাধ মানুষকে? যে কোনো অপরাধ করেনি? প্রশ্নই উঠেনা। ফাহিম চোখ বন্ধ করে আয়ানকে বিশ্বাস করে। তার ধারনা আয়ান যা করে সবার ভালোর জন্যই করে। যদিও আয়ান একটু ত্যাড়া প্রকৃতির। বাট ফাহিমের কাছে আয়ানের সব কিছুই ভালো লাগে।
ফাহিমকে চুপ থাকতে দেখে আয়ান আবারো বলে ওঠে, ঢাকার সবচেয়ে বড় আর বিলাসবহুল কমিউনিটি সেন্টার বুক কর ফাহিম। ফাহিম বুঝলো না আয়ানের কথা। আয়ান হঠাৎ কমিউনিটি সেন্টার দিয়ে কি করবে ফাহিমের জানা নেই। ফাহিম বলে ওঠে, হঠাৎ কমেউনিটি সেন্টার বুক করতে বলছেন কেনো স্যার? আয়ান মুচকি হেসে আবারো বলে ওঠে,
- এইবার বাংলাদেশে ফিরে ধুমধাম করে বিয়ে করবো আমি। আর কোনো লুকোচুরি নয়। সবাই জানবে আয়ান শিকদার বিবাহিত।
ফাহিমের চোখে মুখে খুশির ঝিলিক ফুটে উঠে। সে বেশ খুশি হয় আয়ানের কথায়। বলে, স্যার তাহলে কি এইবার আমরা সবাই আপনার বিয়ে খাচ্ছি? আয়ান ফাহিমের কথায় ফোড়ন কেটে বলে, উহুম সবাই না। তুই বাদে বাকি সবাই। ফাহিম ভ্রু কুঁচকায়। বলে, কেনো স্যার? আমি বাদ যাবো কেনো? আয়ান বলে ওঠে, কারন এটা তোর পানিশমেন্ট। আল্লাহর কাছে শুকরিয়া আদায় কর এর থেকে বড় কোনো পানিশমেন্ট পাসনি। আমার বিয়েতে তোকে কোনো দাওয়াত দিবো না। বলেই আয়ান ফোন কেঁটে দেয়।
ফাহিম মুখ টা পরক্ষণে গোমড়া হয়ে যায়। সে মুখ গোমড়া করে বসে থাকে। তার স্যারের বিয়ে অথচ সে বিয়ের দাওয়াত পাবে না? কিন্তু ফাহিম মনে মনে বেশ খুশি হয়। তার স্যার এতো ঝড় ঝাঁপটা পেরিয়ে সবাই কে জানিয়ে বিয়ে করতে যাচ্ছে এটাই অনেক। সে না হয় দাওয়াত খেতে পারলো না তাতে কি? এতে মন খারাপ করার কি আছে? তার স্যার হ্যাপি থাকলে সেও হ্যাপি। বরং তার স্যার সবসময় হ্যাপি থাকলে তার গালে দুটো থাপ্পড় কম পড়বে।
আয়ান ফাহিমর ফোন কেঁটে দিয়ে নিজের রুম থেকে বেরিয়ে মাহিরার রুমের দিকে যাওয়ার জন্য পা বাড়ায়। এদিকে মাহিরা একা একা বসে আছে তার রুমে। আয়ান এখনো আসছে না কেনো সেটাই ভাবছে সে। তার অনেক কিছু জানার আছে ওই লোকের থেকে। মাহিরা বুঝলো না আয়ান নিজের রুমে গিয়ে ঘুমিয়ে পরলো কিনা। তার বেশ রাগ লাগে ওই লোকের উপর। মাহিরা আর কিছু না ভেবে বিছানা থেকে নেমে দরজার দিকে যেতে নিলে আয়ান মাহিরার রুমের দরজা খুলে ভেতরে ঢোকে।
মাহিরা আয়ানকে দেখে বলে ওঠে, কোথায় ছিলেন আপনি? এতোক্ষণ লাগে আসতে আপনার? আয়ান কিছু না বলে দরজা আটকে এগিয়ে যায় মাহিরার দিকে। মাহিরা রাগে ফুসঁছেে। আয়ান মাহিরার গালে এক হাত রেখে বলে, কেন? আমায় মিস করছিলে নাকি? মাহিরা ঝাড়া মেরে আয়ানের হাত ফেলে দিয়ে বলে ওঠে,
- আপনাকে মিস করবো এতো করুন দশাও হয়নি আমার।
আয়ান বাঁকা হাসলো। মাহিরা এবার বললো, আমার কিছু প্রশ্ন আছে সেগুলোর উওর দিন। আয়ান কিছু না বলে মাহিরার হাত ধরে বেডের দিকে যেতে চেয়ে বলে, আমার ঘুম পেয়েছে ঘুমাবো আমি। চলো।
বলেই আয়ান বেডের দিকে যেতে নিলে মাহিরা আবারো আয়ানের হাত ঝাড়া মেরে ফেলে দেয়। বলে, আপনি মিথিলা আপুকে খুন করেছেন কেনো? সেটার এন্সার দিন আগে। আয়ান ঘুরে তাকায় মাহিরার দিকে। একই প্রশ্ন বারবার শুনতে শুনতে সে বিরক্ত। সে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে মাহিরার দিকে। কিন্তু কিছু বলেনা। মাহিরা আয়ানের থেকে কোনো জবাব না পেয়ে আবারো বলে, কি হলো বলুন? একজন নিরীহ মানুষকে আপনি কেনো খুন করেছেন? কি দোষ ছিলো মিথিলা আপুর?
আয়ান এবারও কিছু না বলে হুট করে এসে মাহিরাকে জরিয়ে ধরে। মাহিরার গলায় মুখ গুজে দিয়ে বলে, তোকে খুব কাছে চাই মাহি। মাহিরা ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিতে চায় আয়ানকে নিজের থেকে। এই লোককে সে কি জিজ্ঞেস করেছে আর এই লোক কিসব বলছে? মাহিরা দু হাতে সজোরে ধাক্কা দিয়ে আয়ানকে সরিয়ে দিয়ে বলে, আমার থেকে দুরে থাকুন।
আয়ান কিছু না বলে মাহিরার কোমড় চাপ্টে তার কাছে নিয়ে আসে। বলে,
- আরেকবার দুরে থাকার কথা বললে এখনি তোর মাঝে তলিয়ে যাবো। অসুস্থ বলে যতটুকু ছাড় দিচ্ছি সেটুকুও দিবো না।
মাহিরা হতভম্ব হয়ে বলে, মানে? আয়ান বলে ওঠে, বারবার দুরে থাকার কথা বললে তোর এতো কাছে যাবো যে তুই আমাকে সামলাতেও পারবি না। ট্রাস্ট মি সানফ্লাওয়ার। মাহিরা এবার মোচড়া মুচড়ি করে বলে, অসভ্য লোক ছাড়ুন আমায়। আয়ান ছাড়লো না। মাহিরাকে সেভাবেই চাপ্টে দরে রাখলো। মাহিরা নিজেকে ছাড়াতে না পেরে বলে, ছাড়বেন আপনি? আয়ান বলে ওঠে, না ছাড়লে কি করবি?
মাহিরা বলে ওঠে, আমার প্রশ্নের উত্তর দিন? আপনি কেনো খুন করেছেন আমার সেটা জানা প্রয়োজন। আয়ান এবারও কিছু বললো না। চেয়ে থাকলো মাহিরার দিকে। মাহিরা আয়ানের থেকে কোনো জবাব না পেয়ে বলে ওঠে, আপনি কি কোনো ভাবে মিথিলা আপুকে ভালো..!
এতোটুকু বলতেই আয়ান সজোরে এক ধাক্কা দিয়ে মাহিরাকে নিজের থেকে সরিয়ে দেয়। মাহিরা পেছনে ছিটকে গিয়ে তার পড়ার চেয়ারের সাথে বারি খায়। আয়ান চোয়াল শক্ত করে বলে ওঠে,
- নিজের জবানে লাগাম দে মাহি। যেটা যানিস না সেটা নিয়ে কথা বলবি না। তোর জবান কাঁটতে আমার দু সেকেন্ডও সময় লাগবে না।
মাহিরা এবার ছলছল চোখে তাকায় আয়ানের দিকে।বলে, আমি জানতে চাই সত্যিটা। বলুন আপনি কেনো খুন করেছেন মিথিলা আপুকে? আয়ান মাহিরার দিকে এগিয়ে এসে চিবিয়ে বলে, আর একদিন মিথিলার নাম তোর মুখে শুনলে তোর মুখ আমি ভেঙ্গে দিবো মাহি। যা হয়েছে সব ভুলে যা। বলেই আয়ান আবারো মাহিরাকে টেনে নিজের সাথে জড়িয়ে মাহিরার গলায় আবারো মুখ গুজে দেয়।
মাহিরা এবার ঝড় ঝড় করে কেঁদে দেয়। কেঁদে কেঁদে বলে, আপনি কেন খুন করতে গেলেন? আমি কিভাবে একজন খুনির সাথে সংসার করবো? আয়ান বলে ওঠে, খুনি টা যখন মেনে নিয়েছিস স্বামী টাও মেনে নিয়ে সংসার করবি। মাহিরা কেঁদে কেঁদে বলে, প্লিজ বলুন আপনি কেনো খুন করেছেন? আমার দম বন্ধ লাগছে। আমি আমার প্রশ্নের উত্তর চাই। আয়ান এবার বলে ওঠে, তুই আমাকে বিশ্বাস করিস? মাহিরা বলে ওঠে, আপনার মতো খুনিকে কিভাবে বিশ্বাস করবো?
আয়ান কিছু না বলে মাহিরাকে ছেড়ে দেয়। মাহিরার ভেজা চোখের দিকে তাকিয়ে বলে, সময় হলে সব বলবো। চল এখন ঘুমাবো। সকালে তাড়াতাড়ি উঠতে হবে। মাহিরা জেদ ধরে বলে, না আমি এখন জানতে চাই। প্লিজ বলুন আমায়। আয়ান কিছু বললো না। মাহিরা নাক টেনে আবারো বললো, কি হলো বলুন? আয়ান কিছু না বলে মাহিরার গলার তিল কৃত যায়গায় একটা চুমু খায়। বলে,
- ইটস বিন আ লং টাইম সানফ্লাওয়ার। আই রিয়েলি নিড ইউ মাহি।
মাহিরার বিরক্ত লাগলো। এই লোক তার প্রশ্নের উত্তর দিচ্ছে না। মাহিরা বলে ওঠে, আমার ভালো লাগছে না। প্লিজ দুরে সরুন আমার থেকে। বলেই মাহিরা আয়ানকে নিজের থেকে সরিয়ে দেয়। আয়ান মাহিরার দিকে তাকিয়ে অসহায় গলায় বলে ওঠে,
- এমন করছিস কেন মাহি? তোকে তো ভালোই বাসতে চেয়েছি। কাছে আয় আমার?
বলেই আয়ান আবারো মাহিরারকে টেনে নিজের কাছে নিয়ে আসে। মাহিরা বলে ওঠে, আজকের পর থেকে আপনার আর আমার মাঝে কোনো সম্পর্ক নেই। না আপনি আমাকে চিনেন, আর না আমি আপনাকে চিনি। আমি আপনার মতো খুনির সাথে কখনো সংসার করবো না। আপনার মতো খুনি স্বামী হওয়ার অযোগ্য।
আয়ান কিছু না বলে কিছুক্ষণ চেয়ে থাকে মাহিরার দিকে। পরপর সে কোনো কথা ছাড়াই ঝড়ের বেগে ঝাপিয়ে পড়ে মাহিরার উপর। মাহিরাকে ধাক্কা দিয়ে দেয়ালের সাথে চেপে ধরে চিবিয়ে বলে ওঠে, এই খুনি নামক স্বামীর সাথেই তোর সংসার করতে হবে। তোর বাকি জীবন এই খুনির সাথেই কাটবে। খুনি মেনে নিতে পারলে স্বামী টাও মনে নিতে হবে। বলেই আয়ান মাহিরার গলায় উন্মাদের মতো মুখ ডুবিয়ে অসংখ্য চুমু দিতে থাকে। সে মাহিরাকে কোনো ছাড় দিচ্ছে না। মাহিরার বেশ জেদ লাগে এই লোকের উপর। দাঁত খিঁচে বলে,
- দেহ লোভী লোক একটা, ছাড়ুন আমায়।
মাহিরার কথা কানে আসতেই আয়ানের ঠোট জোরা থেমে যায়। আয়ান অবাক চোখে মুখ তুলে তাকায় মাহিরার দিকে। সে ঠিক শুনলো কিনা বুঝলো না। নিজের কানকে বিশ্বাস না করে মাহিরাকে আবারো জিজ্ঞেস করলো, কি বললি? মাহিরা এবার চিবিয়ে বলে ওঠে, দেহ লোভী বলেছি। আপনি শুধু মানুষকে ছুঁতে পারেন। খুন করতে পারেন। রক্ত ঝড়াতে পারেন। জোর জবরদস্তি করতে পারেন। আর কিছু পারেন না।
আয়ান অবাকের ন্যায় চেয়ে থাকে মাহিরার দিকে। প্রশ্ন করে, আমি তোকে ছাড়া আর কাকে ছুঁয়েছি? মাহিরা নিজের জেদ ধরে রেখে বলে ওঠে, কে জানে কতো মেয়েকে ছুয়েছেন আপনি। কতো মানুষের রক্ত জড়িয়েছেন। কতো নারীকে ছুয়ে খুন করে এসেছেন। তার সবই হয়তো আমার অজানা। আপনি হয়তো মিথিলা আপুকেও ছুঁয়ে..!
মাহিরার বাকি কথা শেষ হওয়ার আগেই মাহিরার গালে শক্ত এক থাপ্পড় পরে। মাহিরা থাপ্পড়ের গতি সামলাতে না পেরে ছিটকে নিচে পরে যায়। আয়ান মাহিরার দিকে তাকিয়ে হুংকার দিয়ে উঠে,
- জানোয়ারের বাচ্চা মিথিলা আমার মা লাগে মা। আজ থেকে মিথিলাকে আমার মা বলবি। শুনেছিস তুই? কানে গিয়েছে আমার কথা?
মাহিরা ফ্লোরে ছিটকে পরে কেঁদে দেয়। আয়ান এই প্রথম তার গায়ে হাত তুলেছে। আয়ান এবার সম্পুর্ন ঝুকে মাহিরার বাহু ধরে টেনে তার দিকে মুখ ঘুরিয়ে বলে ওঠে,
- বুক কাঁপেনি এই নোংরা কথা মুখে উচ্চারণ করতে?লজ্জা করলো না নিজের স্বামীকে অন্য মেয়ের সাথে জড়াতে?
মাহিরা ফ্লোরে বসে ফুপিয়ে কাঁদছে। তার চোখে বেড়ে অঝোরে পানি গড়িয়ে পরছে। সে তো কথার মাঝে ভুলে বলে ফেলেছিলো কথাটা। আয়ান আবারো চিবিয়ে বলে ওঠে,
- খোদার কসম মাহি। আজ আমার সত্যি মনে হচ্ছে তোকে বিয়ে করে আমি ভুল করেছি। তোর মতো মেয়েকে বিয়ে করাটা আমার লাইফের সবচেয়ে বড় ভুল ডিসিশন ছিলো।
মাহিরা আয়ানের কথা শুনে কেঁদে কেঁদে বলে ওঠে,
- ভুল যখন করেছেন ছেড়ে দিচ্ছেন না কেনো আমায়?
আয়ান চিবিয়ে বলে ওঠে,
- তোকে আমি ছেড়েই দিবো। তোর মতো মেয়ের সাথে সংসার করার আমারও কোনো ইচ্ছে নেই।
বলেই আয়ান মাহিরাকে ঝাড়া মেরে ফেলে দিয়ে হনহনিয়ে বেরিয়ে যায় মাহিরার রুম থেকে। মাহিরা ফ্লোরে বসে ফুপিয়ে কাঁদতে থাকে। আল্লাহ তাকে এ কোন পাপের শাস্তি দিচ্ছে সে জানেনা।
________________
আয়ান ছাদে রেলিংয়ের সামনে দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুঁকছে। তার মন চাচ্ছে ওই মেয়েকে এক্ষনি পিচ পিচ করে কেটে নদীতে ভাসিয়ে দিতে। ওই মেয়ের কলিজা কতো বড় সেটাই ছিড়ে দেখতে ইচ্ছে করছে তার। আয়ান আর কিছু না ভেবে তার পকেট থেকে ফোন বের করে কল করে।
ফাহিমের চোখ মাত্র লেগেছিলো। সে আয়ানের সাথে কথা বলে মাত্র ঘুমিয়ে ছিলো। কিন্তু হঠাৎ ফোন বাজায় তার কাঁচা ঘুমটা ভেঙ্গে গেলো। ফাহিম ঘুমের মাঝে ফোন হাতড়িয়ে ফোনের স্কিনের দিকে তাকায়। আয়ানের কল দেখে ফাহিম ফোন রিসিভ করে কানে ধরে। ফাহিম ফোন রিসিভ করতেই আয়ানের গম্ভীর গলায় বলা কন্ঠসর ভেসে আসে,
- অ্যালকোহল লাগবে..!
আয়ানের কথা শুনা মাত্র ফাহিম তড়িৎ বেগে তাড়াতাড়ি বিছানা থেকে উঠে বসে। জোরে বলে ওঠে, কিহ? আয়ান চিবিয়ে বলে ওঠে,
- পাঁচ মিনিটের ভেতরে অ্যালকোহল নিয়ে হাজির হবি আমার বাসায়। এড্রেস পাছাচ্ছি।
বলেই আয়ান সাথে সাথে ফোন কেটে দেয়। ফাহিম তব্দা খেয়ে যায়। আয়ানকে সে এর আগে কখনো এসব খেতে দেখেনি। না কখনো ছুঁয়ে দেখতে দেখেছে। আজ প্রথম আয়ান তার কাছে এমন কিছু চাইলো।
ঘন্টা খানেক পেরিয়ে গিয়েছে। ফাহিম দাঁড়িয়ে আছে আয়ানের বাড়ির দরজার সামনে। এই প্রথম ফাহিম আয়ানের বাড়িতে এসেছে। আয়ান কখনো তাকে নিজের বাড়ির এড্রেস দেয়নি। আর না কখনো ফাহিমকে তার বাড়িতে নিয়ে এসেছে। আয়ান তার ব্যক্তিগত জীবন পরিবার ও কাজ দুইটাই আলাদা রাখার চেষ্টা করে সবসময়।
ফাহিমের হাতে দুইটা ব্যাগ। ব্যাগ দুটো দেখে বোঝার উপায় নেই এই দুটো ব্যাগে যে অ্যালকোহল আছে। ফাহিম হাতে ব্যাগ দুটো নিয়ে দরজার কলিং বেলে চাপ দিতে নিলে তার আগেই মেইন দরজা খুলে যায়। দরজা খুলতেই ভেতর থেকে কোনো মেয়েলি কন্ঠস্বর ভেসে আসে, আসসালামু আলাইকুম।
ফাহিম ভ্রু কুঁচকে তাকায় সামনে। সে ভেবেছিলো আয়ান দরজা খুলবে। কিন্তু মেয়েলি কন্ঠস্বর ভেসে আসতেই ফাহিম বুঝলো আয়ান হয়তো এই মেয়েকে পাঠিয়েছে। কিন্তু কে এই মেয়ে? ফাহির জিরো লাইটের আবছা আলোয় ঠিক ভাবে দেখলো না মেয়েটির চেহারা। আওয়াজ শুনে এটাও বুঝলো এটা মাহিরা নয়। আবার মুসকানও নয়। কারন তাদের দুই জনকে ফাহিম আগে দেখেছে, কথাও হয়েছে। কিন্তু কে এই মেয়ে ?
ফাহিম আর কিছু না ভেবে সালামের জবাব দিলো, ওয়ালাইকুম আসসালাম। সালামের জবাব পেয়ে নুপুর দরজা থেকে সরে দাড়ায়। ফাহিমকে বলে, আয়ান ভাইয়া ছাদে আছে। আপনি ছাদে যান। বলেই নুপুর দরজা আঁটকে নিজের রুমের দিকে যেতে নিলে ফাহিম বলে ওঠে, শুনুন?
নুপুরের পা থেমে যায়। ফাহিম বলে ওঠে, আমি এই প্রথম এই বাড়িতে এসেছি। তাই এই বাড়ির কোনো কিছুই আমি চিনি না। আপনি কি আমাকে ছাদে যাওয়ার রাস্তা টা দেখিয়ে দিবেন? নুপুর আর কিছু না বলে বললো, ঠিক আছে। আমার সাথে আসুন। ফাহিম আর কিছু না বলে নুপুরের পিছু পিছু চলে যায়। সে এখনো মেয়েটির মুখ দেখেনি।
নুপুর রাত জেগে পড়ছিলো। তার কাল এক্সাম আছে। কতোদিন আর নকল করে পাস করা যায়? এখান কার যে শিক্ষা ব্যবস্থা এখানে নকল করার কোনো সুযোগ নেই। তাই নুপুর নিজের এক্সামের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। কিন্তু হঠাৎ আয়ানের কল আসলে তাকে এসে দরজা খুলে দিতে হয়। নুপুর জানেনা এই লোকটি কে বা কেনো এসেছে এই বাড়িতে। সে ভাবে লোকটা হয়তো আয়ানের বন্ধু হবে। সে নিজেও এখন পর্যন্ত লোকটির চেহারা দেখেনি।
নুপুর ফাহিমকে নিয়ে এসে ছাদের সিড়ির সামনে দাঁড়ায়। এখানে পর্যাপ্ত আলো থাকায় নুপুর ঘুড়ে তাকায় ফাহিমের দিকে। বলে, এটা ছাদে যাওয়ার সিঁড়ি। এখান থেকে উপরে গেলেই আপনি ভাইয়াকে পেয়ে যাবেন। ফাহিমের কানে কথা গুলো গেলো কিনা কে জানে। সে হা হয়ে কিছুক্ষণ চেয়ে রইল নুপুরের দিকে। মেয়েটা তার থেকে বয়সে অনেকটাই ছোট। কিন্তু গলার আওয়াজ শুনে ফাহিম বোঝেনি মেয়েটা এতো বেশি ছোট হবে।
ফাহিমকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে নুপুরের কিছুটা অসস্থি হলো। নুপুর আর কিছু না বলে চলে যেতে নিলে ফাহিম বলে ওঠে, আপনার নাম কি? নুপুর এক পা দিতে চেয়েও ভ্রু কুঁচকে তাকায় ফাহিমের দিকে। এই লোক তার নাম জানতে চাইছে কেনো নুপুর বুঝলো না। আয়ানের বন্ধু ভেবে ছোট করে বললো, জ্বি আমার নাম নুপুর।
ফাহিম বলে ওঠে, আপনাকে তো এর আগে কখনো দেখিনি। আপনি স্যারের কে হন? নুপুর কিছুটা ধীদ্বায় পরে যায়। সে বুঝলো না স্যার বলতে লোকটি কাকে বুঝিয়েছে। বললো, স্যার কে? ফাহিম বললো, আয়ান স্যারের কথা বলছি। আমি তার এসিস্ট্যান্ট ফাহিম। নুপুর এর আগেও ফাহিম নামটা শুনেছে। কিন্তু কখনো এই লোকটিকে দেখেনি। তাই নুপুর ছোট করে বললো, জ্বি আমি আয়ান ভাইয়ের চাচাতো বোন।
ফাহিম আর কিছু বললো না। আয়ানের সাথে এতোদিন থাকার পরও সে এই মেয়েকে আজ পর্যন্ত কখনো দেখেনি। নুপুর আর কিছু না বলে ছোট করে বললো, আসছি। বলেই নুপুর চলে যায়। ফাহিম চেয়ে থাকে নুপুরের যাওয়ার পানে। যতোক্ষণ নুপুর অন্ধকারে তলিয়ে না গিয়েছে ততক্ষণ সে চেয়ে ছিলো নুপুরের দিকে। এমন সময় ফাহিমের ফোনে একটা মেসেজ আসে। ফাহিম পকেট থেকে ফোন বের করে দেখলো আয়ানের মেসেজ। সে আর কিছু না ভেবে তাড়াতাড়ি সিড়ি বেয়ে উপরে ছাদে চলে গেলো।
ফাহিম সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে না উঠতেই আয়ান ছাদের দরজায় দাড়িয়ে ধমক দিয়ে উঠে, ইডিয়েট। এতোক্ষণ সময় লাগলো কেনো আসতে? বলেছি না পাঁচ মিনিটের ভেতরে আসতে? ফাহিম শুকনো ঢোক গিলে বলে, আসলে স্যার এগুলো ম্যানেজ করতে দেরি হয়ে গিয়েছে। বলেই সে আয়ানের দিকে ব্যাগ দুটো বাড়িয়ে দেয়। আয়ান আর কিছু না বলে ফাহিমের হাত থেকে ব্যাগ দুটো নিয়ে চলে গেলো ছাদে পাটি বেছানো যায়গায়।
ফাহিম অবাক চোখে চেয়ে থাকে আয়ানের দিকে। আয়ান আগে থেকেই সব কিছু রেডি করে রেখেছে। আয়ান কিছু না বলে পাটিতে গিয়ে বসে পরে। পরপর ফাহিমের আনা ব্যাগ দুটো থেকে দুটো অ্যালকোহলের বোতল বের করে পাশে রাখে। ফাহিম কিছু না বলে আয়ানের পাশে কিছুটা দূরত্ব বজায় রেখে বসে।
আয়ান দুই বোতল অ্যালকোহল দেখে ফাহিমকে ধমক দিয়ে ওঠে,
- দুই বোতল কেন? চারটা আনতে বলেছিলাম না?
ফাহিম আমতা আমতা করে। আয়ান চার বোতল অ্যালকোহল আনতে বললেও সে ইচ্ছে করেই কমিয়ে দুই বোতল এনেছে। ফাহিম আমতা আমতা করে বলে, আসলে স্যার এতো রাতে দুই বোতলই ম্যানেজ করতে পেরেছি।
আয়ান আর কিছু না বলে একটা অ্যালকোহলের বোতলের ছিপি খুলে গ্লাসে ঢালতে থাকে। পরপর কোনো কথা ছাড়াই চোখ বন্ধ করে এক পেগ মেরে দেয়। অ্যালকোহল গলা দিয়ে ঢুকতেই তার গলার সব কিছু জ্বলে যাচ্ছে। সে জীবনেও এসব খায়নি। আজকেই প্রথম খাচ্ছে। আগে কোনো পিকনিকে বা পার্টিতে গেলে তার বন্ধুরা এসব খেতো। সে কখনো ছুয়েও দেখতো না এসব। অনেক জোড়া জুড়ি করেও তাকে কেউ অ্যালকোহল খাওয়াতে পারেনি। অথচ আজ সে সইচ্ছায় তা খাচ্ছে।
আয়ান চোখ মুখ খিঁচে আবারো আরেক গ্লাস অ্যালকোহল তার হাতে থাকা গ্লাসে ডালে। আয়ানের অবস্থা দেখে ফাহিম বলে ওঠে, হঠাৎ আজ এসব খাচ্ছেন কেনো স্যার? আয়ান দ্বিতীয় গ্লাস অ্যালকোহল এক চুমুকে সবটা খেয়ে ফাহিমকে বলে ওঠে,
- মনে রং লাগছে তাই খাচ্ছি। তোর মনে রং লাগলে তুইও এক পেগ মার।
ফাহিম আর কিছু বললো না। সে এসব খায় না। আর না তার এসব খাওয়ার ইচ্ছে আছে। আয়ান একের পর এক গ্লাসে অ্যালকোহল ঢালছে আর গিলছে। কিভাবে গিলছে জানা নেই। ফাহিম বসে বসে আয়ানকে দেখছে। এই তো ঘন্টা দুইয়েক আগেই আয়ান তার সাথে কি সুন্দর হাসি মুখে কথা বললো। এখন আবার এসব ছাই পাশ কেনো খাচ্ছে ফাহিমের জানা নেই।
আকাশের অবস্থা গুমুঠে। একটু পরপর বিদুৎ চমকাচ্ছে। এদিকে আয়ানের এক বোতল অ্যালকোহল খাওয়া শেষ। আয়ানের মাথায় খানিক টা নেশা চড়লো। কিন্তু পুরো মাতাল হলো না। আয়ান কিছুটা ডুলতে ডুলতে আরো এক বোতল অ্যালকোহল হাতে তুলে নেয়। বোতলের মুখ খুলতে নিলে ফাহিম বলে ওঠে, স্যার বাদ দিন। আর খেতে হবে না এসব। চলুন আপনাকে আমি রুমে দিয়ে আসছি।
বলেই ফাহিম আয়ানের বাহু আকড়ে ধরলে আয়ান ঝাড়া মেরে ফাহিমকে দুরে সরিয়ে দেয়। রক্ত লাল চোখে ফাহিমের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,
- শুয়োরের বাচ্চা যা এখান থেকে। তোরা কেউ আমাকে বুঝিস না। আমাকে একটুও ভালোবাসিস না। তোরা সব কয়টায় স্বার্থপর। তোদের কাউকে প্রয়োজন নেই আমার। আমি একাই যথেষ্ট আমার জন্য।
বলেই আয়ান আরেক গ্লাস অ্যালকোহল ডগডগ করে গিলে নেয়। ফাহিম বুঝলো না আয়ান কেনো হঠাৎ এসব কথা বলছে। ফাহিম কিছুটা ধারনা করে বললো, স্যার ম্যামের সাথে কি আপনার কিছু হয়েছে? মাহিরার কথা শোনা মাত্র আয়ান তেলে বেগুনে জ্বলে উঠে। ডুলতে ডুলতে ফাহিমের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,
- ওই জানোয়ারের বাচ্চার নাম আমার সামনে আর কোনোদিন নিবিনা। ওই জানোয়ারের বাচ্চাটা আমার জীবন টা শেষ করে দিলো। আমাকে তিলে তিলে ধংস করে দিলো। ওই জানোয়ারের বাচ্চার সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই।
বলেই আয়ান তার হাতে থাকা অ্যালকোহলের বোতলটা মুখে পুরো ডগডগ করে অ্যালকহল গিলতে থাকে। তার গলা থেকে বুক সব জ্বলে যাচ্ছে। তারপরও সে থামছে না।
ফাহিম আয়ানের কথায় বুঝলো মাহিরার সাথে আয়ানের কোনো ঝামেলা হয়েছে। কিন্তু কি নিয়ে জামেলা হয়েছে সেটা আয়ানকে জিজ্ঞেস করার সাহস পেলো না। আয়ান অর্ধেক বোতল অ্যালকহল গিলে আবারো গ্লাসে ডালতে শুরু করে। তার ভেতর বাহির সব পুড়ছে। পুড়ে ছাড়খাড় হয়ে যাচ্ছে যা সে কাউকে দেখাতে পারছে না।
এদিকে হঠাৎ এক বজ্র পাতে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি পরতে শুরু করে। বৃষ্টির ফোটা গায়ে পরতেই ফাহিম আয়ানকে ধরে উঠাতে চেয়ে বলে, স্যার রুমে চলুন। বৃষ্টি শুরু হয়ে গিয়েছে। আয়ান আবারো ধাক্কা দিয়ে ফাহিমকে দুরে সরিয়ে দেয়। বলে,
- এখান থেকে যা ফাহিম। আমাকে একা থাকতে দে।
ফাহিম আর কিছু বললো না। এদিকে ঝুম বৃষ্টি শুরু হলে ফাহিম ছাদের এক কোনায় গিয়ে আশ্রয় নেয়। আয়ান আরেক গ্লাস অ্যালকোহল গিলে ছাদেই সটান হয়ে শুয়ে পরলো। বজ্রপাত সাথে ঝুম বৃষ্টি। দুটোর একটাও আয়ানকে গ্রাস করতে পাররো না। আয়ান বৃষ্টির মাঝে শুয়ে শুয়ে বোতল থেকে চুমুক দিয়ে আরো কিছুটা অ্যালকোহল খেলো। দুই বোতল অ্যালকহল খাওয়ার পরও তার মাথায় সম্পুর্ন নেশা হচ্ছে না।
এদিকে ফাহিম দুর থেকে দাঁড়িয়ে আয়ানকে বৃষ্টির মাঝে শুয়ে থাকতে দেখলো। আয়ান ইতোমধ্যে চুপে হয়ে গিয়েছে। তার উপের এভাবে শুয়ে শুয়ে বোতল থেকেই অ্যালকোহল খাচ্ছে। ফাহিম তা দেখে দুর থেকে চেচিয়ে বলে ওঠে, স্যার উঠে আসুন। প্রচন্ড বৃষ্টি হচ্ছে। ঝড় আসবে মনে হয়। এভাবে ছাদে থাকাটা ঠিক হবে না।
আয়ান লাস্ট এক চুমুক অ্যালকোহল খেয়ে খালি কাঁচের বোতল টা সজোড়ে কোথাও ছুড়ে মারে। কাচ ভাঙ্গার শব্দ ভেবে আসে কানে। ফাহিম আবারো বলে ওঠে, স্যার কেনো এভাবে বৃষ্টিতে ভিজছেন? উঠে আসুন প্লিজ। পাগলামি করবেন না। আয়ান বজ্রপাত হওয়া আকাশ, ভেঙ্গে আসা বৃষ্টির পানে তাকিয়ে একা একা কিছু লাইন গাইলো..
Rag rag woh samaya mere
Dil par woh chaaya mere
Mujh mein woh aise jaise jaa
Gire barsaat mai paani jaise
Koi kahaani jaise
Dil se ho dil tak jo bayaan
Aashiq dil tera purana hai yeh
Deewana deewana samjhe na, ho..
অর্থ..
"সে আমার প্রতিটা শিরায়-উপশিরায় মিশে গেছে"
"সে আমার ভেতরে এমনভাবে ছায়া হয়ে আছে"
"মনে হয়, সে-ই আমার ভেতরের প্রাণ"
"যেমন বৃষ্টির ফোঁটা পানিতে মিশে যায়"
"যেমন কোনো গল্প বয়ে চলে"
"যা এক হৃদয় থেকে আরেক হৃদয়ে পৌঁছে যায়"
"এই প্রেমিক মনটা বহুদিন ধরে শুধু তোর"
"এই পাগল মন কিছুই বুঝে না"..
চলবে..