#মন_আড়ালে (কাজিন রিলেটেড)
#পর্ব-৭
তানজিলা আনিম
মেহু খাচ্ছে কম নাড়ছে বেশি। রেস্তোরাঁর রুফটপে বসেছে ওরা। পাশের টেবিলে দুটো ছেলে মেয়ে একজন আরেকজনকে খাইয়ে দিচ্ছে।ওই দৃশ্যটুকুই ঘুরে ফিরে দেখছে মেহু।
আরও একবার পাশ ফিরে তাকাতেই আনমনা মেহুর হাত ফসকে পড়ে গেলো হাতের চামচ টা।ওদিক থেকে চোখ সড়িয়ে, মেহু বোকা বোকা চাউনি দিয়ে টুপ করে নিচু হলো।চামচটা নিয়ে উঠতে নিতেই সেই বিকেলের মতো আরও একবার টেবিলের সাথে ঠুকে গেলো ওর মাথাটা।
কাব্য দীর্ঘশ্বাস ফেললো।চাপা স্বরে ধমকে বললো," মন দিয়ে খা, নয়তো এক্ষুনি ছাদ থেকে নিচে ফেলে দেবো।"
মেহু সত্যিই এবার কয়েক চামচ খেলো।তবে ওইটুকুই।একটু পরেই বলে উঠলো, " আর খাবোনা।"
নীলা হেসে ফেলে বললো," মেহু হয়তো এখানেও ছোট মামির হাতে খেতে চাইছে।বাসায় থাকলে নিজের হাতে ও খায়না বললেই চলে।"
মেহু ঠোঁট উল্টে তাকালো।নীলার কথা সত্য।বাসায় মায়ের হাতেই খায়।তবে এখন না খেতে পারার কারণ অন্য।পাশের কাপল টাকে দেখে অদ্ভুত একটা চিন্তা এসেছে ওর মাথায়।আর নিজের চিন্তাটা নিজের কাছেই হাস্যকর লাগছে।কাব্য ভাই জীবনেও তাকে খাইয়ে দেবেনা।কথা যে বলেছে সেটাই তার ভাগ্য।
দিব্য নীলাকে খোঁচা দিয়ে বললো ," আগে ভাবতাম তোর ব্রেন নেই।এখন দেখি চোখও নেই।"
নীলা ভেংচি কেটে উঠে দাঁড়ালো, বললো," ওয়াশরুমে যাচ্ছি।"
দিব্য বসে থাকলোনা।পিছু পিছু গিয়ে দাঁড়িয়ে থাকলো লেডিস রুম থেকে একটু দূরে।
মেহুর মনমরা মুখের দিকে একঝলক দেখে কাব্য উঠে গেলো।বিল পে করে এসে বসলো ওর পাশে।আচমকা আঙুল তুলে মেহুর ঠোঁটের কোণে লেগে থাকা খাবারের অংশ টুকু মুছে দিলো।
মেহু বিস্মিত হতেও ভুলে গেলো।সময় নিয়ে ড্যাবড্যাব করে তাকালো।এই আতর্কিক একটুখানি ছোঁয়াতেই যে ওর গাল দুটো গরম হয়ে উঠেছে তা বুঝতে পেরে মিইয়ে গেলো।
কাব্য ভাবলেশহীন বললো," অন্যের প্রাইভেসি নষ্ট করে হাঁ করে তাকিয়ে ছিলি ওদিকে।তোর বড় বাবা ভদ্রতা শেখায়নি?"
মেহু জবাব দিলোনা।কাব্যের কথা শুনেও নি বোধহয়!লজ্জা,খুশির মিশেলে ওর মনে তখন প্রজাপতি উড়ছে।
নীলা,দিব্য ফিরে আসলো বেজার মুখে।আবার কিছু নিয়ে ঝগড়া লেগেছে দুটোর।এরমধ্যেই কাব্য উঠে দাঁড়ালো।মেহুকে আরেকদফা চমকে দিয়ে ওর হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে হাঁটতে লাগলো।মেহুর পুরো স্বপ্নের মতো লাগলো বিষয়টা।সকালে হাতে বেশ অনেকটা চাপ লেগেছিল।আগে বুঝতে না পারলেও এখন নাড়াতে নিলেই ব্যাথা লাগছে।তারওপর বোকার মতো বড় ঝোলানো ব্যাগ নিয়ে এসেছে।তাই ব্যাগটা সামলাতে সত্যিই হিমশিম খেতে হতো তাকে।তবুও মুখ ফুটে ভয়ে কাউকে বলেনি।
কাঠখোট্টা কাব্য তার পৌরুষদীপ্ত বজায় রেখে ব্যাগ নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে।মেহু আবেশে ডুবে সেই দৃশ্য উপভোগ করলো কিছুক্ষণ।তারপর জ্বলজ্বলে চোখ নিয়ে কাব্যের পেছন পেছন ছুটলো ।কাব্য পিছু না ফিরেই কপট রাগ দেখিয়ে বললো," নিজের ওজনের চেয়ে বেশি ওজনের একটা ব্যাগ নিয়ে চলে এসেছিস,গবেট।"
পরপর আদেশ ছুড়লো," ভাবনিনা ফ্রিতে হেল্প করছি।বাসায় ফিরেই কফি কিভাবে বানাতে হয় শিখে নিবি।এরপর থেকে চাইলে যেনো না শুনতে না হয়। "
____________
ওখান থেকে কাব্য ওদের শপিংয়ে নিয়ে এলো।মলে পৌঁছে নীলা আর আশেপাশে তাকালোনা।নিজের পছন্দ মতো সেকশনে গিয়ে হামলে পড়লো জামা খোঁজায়।সেকেন্ড ফ্লোরে গেইমিং জোন।দিব্য শোঁ করে ঢুকে পড়লো সেখানে।
মেহু ঘুরেঘুরে এটা ওটা দেখলেও ওর চোখ খুঁজছে অন্য কিছু।নির্দিষ্ট দোকানটা দেখেই পা বাড়ালো সেদিকে।কাব্য একটা কফি হাতে নিয়ে বসেছে রেস্টিং জোনে।মেহুর ছোট্ট, চঞ্চল পা দুটো যেদিকে যাচ্ছে কাব্যের নিগূঢ় চোখের চাউনিও ছুটছে সেদিকেই!
_________
কাউন্টারে অনেকগুলো ড্রেস রেখে আবারও অনেক্ষণ লাগিয়ে একটা ড্রেস পছন্দ করলো নীলা।তবে ছোট হওয়ায় আগের গুলো নিয়েই বেরিয়ে আসছিলো।।হঠাৎ নিজের নাম শুনে ফিরে তাকালো।দেখলো, ক্যান্টিনে দিব্যর সাথে বসে আড্ডা দেয়া ছেলেদের একজন কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।খুবই পরিচিতের মতোন রাফি বলে উঠলো," ভালো আছো, নীলা?"
দিব্যর বন্ধুদের অনেককেই কেবল মুখ চেনা চেনে নীলা।কারোর সাথে কথা হয়নি কখনো।তাছাড়া দিব্য নিজেই ওকে দূরে রাখে ওদের থেকে। হালকা হেসে মাথা নাড়লো," জি ভালো।"
উলটো প্রশ্ন করলোনা রাফিকে।কথা না বাড়িয়ে, আলগোছে চলে যেতে চাইছে সে।তবে রাফি খুব আগ্রহ নিয়ে বললো," শপিং শেষ ? "
এবারেও ছোট্ট উত্তর দিলো নীলা," জি।"
বলে এগিয়ে গেলো।পেছন পেছন গেলো রাফিও। হুট করে নীলার হাতটা টেনে ধরে বললো," কেনো যেনো মনে হচ্ছে, নীল রংটা তোমার সাথে খুব মানাবে। "
নীল রঙা একটা জামা দেখিয়ে বললো," এটা তোমার পছন্দ হয় কিনা দেখোতো!"
অপ্রস্তুত নীলা নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নেয়ার আগেই রাফির মুখ বরাবর আঘাত করে বসলো দিব্য।আচমকা আক্রমন সামলে নিতে সময় লাগলো রাফির।ওদের হাতটা ছুটিয়ে নিয়ে দিব্য রাফির কলার আঁকড়ে ধরে বললো," বলেছিলাম না দূরে থাকতে?"
পাল্টা কোনো আক্রমণ এলোনা রাফির থেকে।বরং নাক থেকে রক্ত মুছে নিয়ে হাত দুটো উপরে তুলে স্যারেন্ডার করার ভঙ্গি করে বললো," ভুল হয়ে গেছে বস,স্যরি।"
রাগে ফুঁসছে দিব্য।রাফিকে উপেক্ষা করে পেছন ঘুরে তাকালো নীলার দিকে।নীলা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো।আচমকা দিব্য এগিয়ে এসে চেপে ধরলো ওর গাল, " এতোক্ষণ লাগে দুটো জামা নিতে? দিনদুনিয়া ভুলে এখানে দাঁড়িয়ে তামাশা করছিস?"
- তুমি আমাকে বকছো কেনো?
গলা চড়িয়ে বলে উঠলো নীলা।দিব্য যেমন হঠাৎ ধরেছিলো তেমনি ওকে ছেড়ে দিয়ে বললো," ভুল হয়েছে।যা,নীল জামা গায়ে জড়িয়ে দেখ পছন্দ হয় কি না।"
তারপর নীলাকে রেখেই বড় বড় কদম ফেলে চলে গেলো।নীলা চুপ করে দেখলো।নিজেও বেরিয়ে এলো।দূরে কাব্যকে দেখলেও এগোলোনা।দিব্যকে খুঁজতে উল্টো দিকের সিঁড়ির পথ ধরলো।
_________
সাদা, ছোট্ট, গোলুমলু প্রানীটাকে জাপটে ধরে হাসছে মেহু।একটা খরগোশ নিজের কাছে রাখার অনেক দিনের শখ ছিলো তার।মায়ের ভয়ে এতোদিন পারেনি।আজ নিয়ে নিয়েছে।কাব্য ভাই দিয়েছে শুনলে কিছু বলবেনা আর।
কাব্য চুপ করে দেখলো মেহুর হাসিহাসি মুখটা।হাতের ব্যাথায় একটু আগেও চোখমুখ কুঁচকে ফেলছিলো।এখন সেসবের রেশ নেই।
দিব্যকে ফোনে না পেয়ে বেরিয়ে এলো মল থেকে।নীলাও ফোন ধরছেনা।সারাদিন রোদের উত্তাপে টেকা যায়নি।এখন হুট করে আকাশে মেঘ করেছে।আলোর ঝলকানির সাথে গুড়গুড় করে মেঘ ডাকছে।খরগোশ টার সাথে খেলতে খেলতে মেহু কখন রাস্তার কিনারে চলে গিয়েছে খেয়ালও করেনি।কাব্য টেনে নিজের পাশে আনলো ওকে।বললো," চুপ করে দাঁড়া।"
মেহু খরগোশটার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো," এর নাম কি দেয়া যায়,কাব্য ভাই?"
কাব্য আসেপাশে তাকালো।ওদের কাউকে চোখে পড়ছেনা।রাস্তায় চোখ রেখেই জবাব দিলো,
-জানিনা।
মেহুও তৎক্ষনাৎ কোনো নাম ভেবে পেলোনা।কি নামে যে ডাকবে একে!
আচমকা এলমেলো বাতাসে মিশে ধুলোয় ডুবে গেলো চারপাশ।সাথে টুপটুপ করে পানির ফোঁটা পড়তে শুরু করেছে।।কাব্য দ্রুত ওকে নিয়ে এগিয়ে গেলো। গাড়িতে উঠে বসতেই জোরে বাজ পড়লো কোথাও।সঙ্গে সঙ্গে লোডশেডিং হয়ে আঁধার নামলো চারপাশে।কেঁপে উঠলো মেহুর ছোট্ট দেহটাও।
কাব্য আড় চোখে দেখলো মেহুর ভীত মুখটা। জড়সড় হয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে।বৃষ্টির ফোটা ছোট থকে আকারে বড় হচ্ছে ধীরে ধীরে।মেঘের জোরালো গর্জনের সাথে সাথে প্রতিবারই কেঁপে উঠছে মেহু।চোখ খিঁচে নিচ্ছে।
আলতো ভেজা শরীর,বাইরে ঝড়ো আবহ গাড়ির ভেতরটা উষ্ণ করে তুললো।মেহুর মাতাল করা নিজস্ব সুবাসটা নাকে যেতেই অসহ্য বোধ হলো কাব্যের।শুষ্ক ঢোক গিলে হাত বাড়িয়ে বন্ধ করে দিলো জ্বলে থাকা একমাত্র আলোটাও।
এদিকে বজ্রপাত বেড়েই চলেছে।আতঙ্কে, জামা খাবলে ধরে গুটিসুটি মেরে বসে রইলো মেহু।কতবার কাতর চোখদুটো তুলে দেখলো পাশে বসা নির্লিপ্ত মানুষটাকে।একবার তার দিকে ফিরেও তাকাচ্ছেনা।একটু সাহস দিয়ে দুটো কথা বলছেনা।মেহু ফোন হাতে নিয়ে কল করার চেষ্টা করলো শাফায়াতকে।বড় বাবার কণ্ঠটা শুনলে একটু ভয় কমবে সেই আশায়।নেটওয়ার্ক দূর্বল হওয়ায় কল ঢুকলোইনা।
ফোনের স্ক্রিনে 'বড় বাবা' শব্দটা নজরে পড়তেই মুখ ঘুরিয়ে নিলো কাব্য।মেহুর হাত ধরবে বলে এগোনো হাতটা ফিরিয়ে আনলো আগের জায়গায়।তীক্ষ্ণ জেদ জায়গা করে নিলো আগের নরম অনুভূতির স্থলে।অথচ সে খুব করে চাইছিলো, এই মুহূর্তে শুধু ওকেই আশ্রয় স্থল বানিয়ে নিক মেহু!
কাছে কোথাও কান ফাটানো শব্দে বাজ পড়তেই এবার আর থাকতে পারলোনা মেহু।আঁতকে উঠে ফুঁপিয়ে উঠলো।কোলের অবলা প্রাণটাকে আঁকড়ে ধরে ফোঁপাতে ফোঁপাতেই টলমলে, অভিমানী চোখ দুটো মেলে চাইলো কাব্যের দিকে। ভাবলো," আমাকে একটু নিজের সাথে আগলে নিচ্ছেন না কেনো, কাব্য ভাই?আমার ভীষণ ভয় করছে।"
অন্যদিকে বুক চিঁড়ে আসা দীর্ঘশ্বাস টুকু গিলে ফেলে অস্ফুটে আওড়ালো কাব্য ,"একটাবার সব পিছুটান ভুলে নিজেকে আমার হাতের বাঁধনে আটকে ফেলে দেখ,শতো বাধা সত্ত্বেও ওই বাঁধন থেকে এ জীবনে আমি তোকে ছুটতে দেবোনা!"
চলবে,,