ফন্ট সাইজ:
থিম:
মন আড়ালে

২৩তম পর্ব

লেখক: তানজিলা আনিম

#মন_আড়ালে 

#পর্ব_২৩
#তানজিলা_আনিম
দরজার কাছ থেকে সড়ে গিয়েছে সকলে।মেহুর কান্নার আওয়াজ শোনা যাচ্ছেনা আর।নিস্তব্ধ রুমে অনেকক্ষণ কোনো আওয়াজ নেই।বাইরে বিয়ের কাজ চলছে।
সময় নিয়ে শাফায়াত তার ভাবুক স্বত্তা থেকে বেরিয়ে এলেন।ভারি কদমে বাইরে এগোতে নিয়েও কি ভেবে থামলেন।পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলের দিকে ফিরলেন না।না ফিরেই ভঙ্গুর গলায় বলে উঠলেন," যাই করতে চাইছো তার ফলাফল ভালো হবেনা কখনোও।তাই শুধু বলবো,মেহেরের থেকে দূরে থাকো।"
- ও যদি নিজেই দূরে থাকতে না চায় তখন?
শাফায়াত নিশ্চুপ হয়ে রইলেন।
-আপনাদের মেয়েকে আপনারা তো সবচেয়ে ভালো বোঝেন।তো এটাও নিশ্চই বুঝবেন ও কি চায়!
শাফায়াতকে স্তব্ধ দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে কাব্য নিজেই রুম থেকে বেরিয়ে গেলো।
__________
বিয়ে থেকে কনে বিদায় সবকিছু সুষ্ঠু ভাবেই সম্পন্ন হয়ে গেছে।আস্তেধীরে লোকজনের সমাগমও কমে এসেছে।শাফায়াত চলে গিয়েছেন ঘন্টা কয়েক হয়ে গিয়েছে।সারাদিনের গমগমে পরিবেশ সন্ধ্যা হতেই একেবারে শান্ত হয়ে এলো।
মেহু কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছে।বিয়ের কিছুই তার দেখা হয়নি।ওয়াহিদ বাড়ির কারোরই তেমন উল্লাস করা হয়নি বিয়ের সময়টায়।একরকম নিস্তেজ ভাবেই কেটেছে।
মেহুর পাশে বসে আছে নীলা আর অবনী।নীলা ওর মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে।অবনী উঠে এসে শিহাবকে খুঁজলো।উঠোনে কয়েকজন বাড়ি পরিষ্কারের কাজ করছে।দূরে শিহাবকে ফোন হাতে বসে থাকতে দেখে অবনী এগিয়ে গেলো।পাশে দাঁড়াতেই শিহাব ফোন গুজে উঠে দাঁড়াল।অবনীর ভোঁতা মুখটা দেখে নিয়ে বললো," ভেতরে কি অবস্থা?"
- মেহুপু এখনো ঘুমাচ্ছে।সবারই মন খারাপ।আমারও।
শিহাব দীর্ঘশ্বাস ফেললো।কাব্যকেও অনেক্ক্ষণ দেখেনি আশেপাশে।অবনীকে বললো," চলো হেঁটে আসি।ভালো লাগবে।"
মৃদু হাসি ফুটলো অবনীর মুখে।বললো,"নীলা আপুকেও নিয়ে আসি?"
শিহাব মাথা দোলাতেই সে ছুটোলো ভেতরে।নীলাসহ ফিরতেই দেখলো শিহাব রাহাতের সাথে কথা বলছে।অবনী ওকে দেখেই বলে উঠলো, " রাহাত ভাইয়া আপনি সাথে চলুন প্লিজ।আমরা হাঁটতে যাচ্ছি।কাছেই নাকি কোথায় একটা মালাই চা ভালো পাওয়া যায়।আপনি চিনিয়ে দেবেন।"
রাহাত চোখ তুলে নীলাকে দেখলো একবার। বললো," ওটা কাছে না।বেশ অনেকটাই হাঁটতে হবে।"
শিহাব বললো,"হলে হোক।তুমি দেখিয়ে নিয়ে চলো। "
রাহাত শিহাব প্রথমে পাশাপাশি হাঁটলেও আলগোছে অবনী চলে গেলো শিহাবের পাশে।কথা বলতে বলতে ওরা এগিয়ে গেলো সামনে।পেছনে নীলা নিশ্চুপ হাঁটছে।রাহাত ইচ্ছে করেই হাঁটার গতি কমিয়েছে।চলছে নীলার পাশাপাশি!অনেকক্ষণ চুপ থাকার পর রাহাতই মুখ খুললো।ডেকে উঠলো," মিস নীলা!"
নীলার লজ্জা লাগছে শুরু থেকেই।দুদিনের দেখা সাক্ষাতে রাহাতকে তার ভালো মনে হয়েছে।বেশ শান্ত,ধীরস্বরে কথা বলে।এখানকার সকলের প্রিয় ডাক্তার সাহেবও।জড়তা সড়ছেনা।নিচু গলায় বলল," জি?"
- আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই।
স্পষ্ট, সাবলীলভাবে বলে উঠলো রাহাত।নীলা অবুঝের মতো চাইলো।কথাটা আদও সঠিক শুনেছে কিনা বোঝার জন্য অস্ফুটে বললো," কি বললেন?বুঝিনি।"
রাহাত থেমে দাঁড়ালো।সাথে থামলো নীলাও। রাহাত আবারও দৃঢ় গলায় বাক্যের পর বাক্য গুলো বলে উঠলো, " প্রথম দেখাতেই পছন্দ হয়ে গিয়েছিলো আপনাকে।আপনার চঞ্চল সত্তা টা আমাকে আপনার প্রেমে পড়তে বাধ্য করেছে।এক লহমায় ভেবে নিয়েছি আপনাকে জীবনসঙ্গী বানাবো আমার।এরপর ফ্যামিলিকে জানানোর জন্য যা দরকার সেসব খবর নিয়েছি।আপনার ছবিও দেখিয়েছি।সবাই রাজিও হয়ে গিয়েছে।এখন শুধু আপনার মর্জি টুকু জানতে চাই।বিয়ে করবেন আমাকে?"
ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে আছে নীলা।বলল," আপনার নাম রাহাত আহমেদ।কাব্য ভাইয়ার সঙ্গে পড়েছেন।এরপর আর কিছুই জানিনা আমি।"
- সেজন্যই তো নিজের দিকটা জানিয়ে দিলাম যেনো সময় নিয়ে, মন দিয়ে আমার সম্পর্কে জানতে পারেন।
নীলা কিছু বললোনা।রাহাত নিজেই বললো," বাবা-মার একমাত্র সন্তান আমি।বড় হয়েছি ঢাকায়।কাজের সূত্রে এখানে আছি। একাডেমিক কেরিয়ার.."
নীলা ওকে থামিয়ে দিয়ে বলে উঠলো," আপনি পাকিস্তানি ড্রামা দেখেন?আমি কিন্তু দেখি।আমি অনেক কথা বলতে পছন্দ করি।আপনিতো চুপচাপ।আমি খেতেও ভালোবাসি। মিষ্টি..। "
রাহাত পকেট থেকে সুন্দর ফিতায় বাঁধা অনেকগুলো চকোলেট বের করে দিয়ে বললো," মিষ্টি অনেক পছন্দ তোমার।আমি জানি!"
নীলা এবার সত্যি বেকুবের মতো হয়ে রইল। মাথা নামিয়ে নিলো নিজের ফাঁপা গাল লুকোতে।রাহাত প্যাকেটটা ওর হাতে দিয়ে বলল," আমি ড্রামা দেখিনা।কথা কম বলি তবে নীলার গলা নিঃসৃত কথা শোনার ধৈর্য্য আমার হবে। আমি চায়ে চিনি খাইনা।তুমিতো ভরে ভরে দুচামচ খাও।কখনও সখনও তোমার কাপ থেকে কয়েক চুমুক খেয়ে নিতে একটুও খারাপ লাগবেনা আমার।বিলিভ মি।"
_____________
মেহু ঘুম থেকে উঠে রুমে কাউকে পেলোনা।ঘুমঘুম চোখে ঘড়ি দেখে বুঝলো অনেক্ষণ পেরিয়ে গিয়েছে।বিয়ে দেখা হয়নি বলে মন খারাপ হলেও কাব্যের কথা মনে হতেই ওসব মিলিতে গেলো।চোখেমুখে পানি দিয়ে দ্রুত বেরিয়ে এলো বাইরে।কাব্যর খোঁজ করতেই একজন বললো," বিকেল থেকে দেখিনি।কোথাও গিয়েছে হয়তো।"
মেহু সেকথা শুনেও অনেকক্ষণ ভাবলো কিছু।তারপর ধীর পায়ে চললো বাড়ির পেছনের দিকটায়। পুকুড় পাড়ে বাঁধানো সিঁড়িতে সিগারেট হাতে বসে আছে কাব্য!
আলতো হাসি ফুটলো মেহুর ঠোঁটে। নিঃশব্দে এগিয়ে হেসে ফেলে বললো, "আমি জানতাম আপনি কোথাও যাননি আমাকে রেখে!"
কাব্য কিছু না বলে তাকালো।সিগারেট ফেলে দিলো।মেহু নিজেই এসে বসলো।হাসি মুখটায় মলিনতা ফুটিয়ে বললো," আপনি কি রাগ করেছেন কাব্য ভাই?আমি আসলে,, বড় বাবা।"
মেহু আমতা আমতা করলো।কাব্য তখনো বেঘোর চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে।মেহু ব্যাথায় কাঁদছিলো তখন অথচ এখন সেসবের লেশমাত্র নেই!সবটকু চিন্তা কাব্যের জন্য!ছোট্ট মেহু তার পাশে দাঁড়াতে শিখে গিয়েছে!
- এদিকে আয়
মেহু নখ দিয়ে আঙুল খুটছিলো।শীতল স্বরে থেমে তাকাতেই দেখলো কাব্য এক হাত বাড়িয়ে দিয়েছে ওর দিকে।মেহু কাছে এগোলো।কাব্য শুধু এটুকুর অপেক্ষাতেই ছিল বোধহয়।মেহুর আদুরে মুখটা দুহাতের মুঠোয় পুরে তুলে ধরলো নিজের সামনে।মেহু কাতর চোখে তাকিয়ে আছে।কাব্য ওর গালের কাছটায় আঙুল বোলাতে বোলাতে বললো,"এমন আর কখনও করবিনা।আমি আছিতো সব সামলে নিতে।এই ছোট্ট মাথায় এতো কিছুর ভার নিতে হবেনা,মনে থাকবে?"
- আমিতো..
- একটু পর আমি চলে যাবো।প্রথমে বাসায় ফিরবো তারপরই আবার শহরের বাইরে।জরুরি একটা মেডিকেল কেইস সামলাতে আমাদের টিম যাচ্ছে সেখানে।
মেহু দ্রুত প্রশ্ন ছুড়লো," কবে ফিরবেন কাব্য ভাই?"
- দ্রুত ফেরার চেষ্টা করবো।বাধ্য মেয়ে হয়ে থাকবি।
মেহু একপাশে মাথা নাড়লো।কাজে যাচ্ছেন তবুও মেহুর বুক ভার হয়ে এলো।চোখ টলমল হয়ে উঠতেই কাব্য শব্দ করে চুমু খেলো চোখে। পরপর ঠোঁট ছোঁয়ালো কপালে।কপালে কপাল ঠেকিয়ে রেখেই বললো," আর..
মেহু ব্যাকুল হয়ে শুধায়," আর কি কাব্য ভাই?"
- যেদিন তোকে আমার পাশে সত্যিকার অর্থে চাইবো সেদিন শুধু আমার হাতটা ছেড়ে দিসনা।পাশে থাকিস।ভরসা করে,বিশ্বাস নিয়ে।
গাল দিয়ে পানি গড়াচ্ছে মেহুর।কথার গভীরতা বুঝে এলোনা এতো।শুধু আরেকটু ঘেষে বসে দূরত্ব কমালো তার কাব্য ভাইয়ের সাথে।
________________
শিহাবরা যখন ফিরলো তখন আটটা পেরিয়ে গেছে।মেহুর জন্য আনা খাবারের পার্সেল নিয়ে অবনী দৌড়ে চলে গেলো ভেতরে।দিব্য বাড়ির সামনে মোড়ায় বসে গেইম খেলছিলো।চোখ তুলে তাকাতেই দেখলো রাহাতের পাশে ধীর কদমে প্রবেশ করছে নীলা।দেখেই চোখ সরু হয়ে এলো তার।শিহাব বললো," কোথায় ছিলি? বেরোনোর সময় তোকে পেলামনা।"
দিব্য একচোখ নীলাদের দিকে রেখেই বললো," আশেপাশেই ছিলাম।একটু জোরে ডাকতে পারলেনা?"
শিহাব বললো,"আরে রাগ করিসনা।ভাজাপোড়া যা খেয়েছি নিয়ে এসেছি।আয়।"
শিহাব ভেতরে যেতেই দিব্যর কাছাকাছি এসে দাঁড়ালো নীলা।পেছনে প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়িয়েছে রাহাত।নীলা চোখের পাপড়ি ঝাপটে লাজে নত হয়ে বিদায় নিলো রাহাতের থেকে,"আসছি।"
দিব্য চোখ ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখলো সবটা।নীলার বাচ্চার ভাবভঙ্গি একদমই ভালো লাগছে না ওর।সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় খপ করে নীলার হাত থেকে চকলেট নিতে চাইলো দিব্য।নীলা দিলোনা। সড়িয়ে নিয়ে বললো,"একদম কাড়াকাড়ি করবেনা বলে দিলাম।এগুলো স্পেশাল। সব আমার।"
দিব্য ঠাণ্ডা চাউনি দিয়ে নীলাকে পরখ করলো শুধু।কিছু বল্লোনা।নীলা আড়াল হতেই রাহাত এগিয়ে এসে কাঁধে হাত রাখলো দিব্যর।নীলার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে থেকে হাস্যোজ্জ্বল স্বরে আওড়ালো," চকলেটের জন্য মন খারাপ করোনা।দুদিন পরতো বিয়ের মিষ্টি দেয়া নেয়া হবেই।তখন আলাদা করে নাহয় তোমাকে চকলেট খাওয়াবো।"
দিব্য কঠিন মুখেও হাসি টেনে বললো," বিয়ে? মেয়ে পছন্দ হয়ে গিয়েছে নাকি ভাই?
নাম কি? বাড়ি কোথায় ?"
রাহাত এতো প্রশ্নের জবাবে মৃদু হাসলো। দিব্যর কাঁধে হাত দিয়ে আলতো চাপড় বসিয়ে বললো," তোমার বোনের খেয়াল রেখো। আসছি শালাবাবু!"
রাহাত চলে গেলেও দিব্য সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইলো।ছোট্ট শব্দটা তখনও কানের আশেপাশে বেজে চলেছে তার।অনেকটা সময় টু শব্দও বেরোলোনা মুখ থেকে।আচমকা হাত দিয়ে বুক চেপে ধরে বললো," আশেপাশে কে আছো?আমাকে ধরো প্লিজ।আমার বোধহয় হার্টএ্যটাক হয়ে যাচ্ছে।" 
#চলবে,,

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন