ফন্ট সাইজ:
থিম:
অদৃশ্য_মায়া

৫ম পর্ব

লেখক: নুসরাত জাহান আয়রা

#অদৃশ্য_মায়া

#নুসরাত_জাহান_আয়রা
#পর্ব_৫
“ওকে বিশ্বাস কোরো না।”
জানালার কাঁচে লেখা কথাগুলোর দিকে তাকিয়ে জিনিয়া বেশ কিছুক্ষণ নিশ্চুপ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। অন্ধকার ঘরের একমাত্র আলোটা তখন জানালা দিয়ে আসা চাঁদের ম্লান আলো। কাঁচের ওপর লেখা দুটো শব্দ যেন সেই আলোতেও স্পষ্ট হয়ে আছে। তার বুকের ভেতরটা অজানা আশঙ্কায় ভারী হয়ে উঠল।
কাকে বিশ্বাস করবে না?
ক্যাসিয়ানকে?
নাকি এই বাড়ির কাউকে?
জিনিয়া ধীরে ধীরে জানালা থেকে সরে এলো। কয়েক মুহূর্ত আগেও সে নিজেকে নিরাপদ মনে করার চেষ্টা করছিল। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে, এই বিশাল প্রাসাদের প্রতিটি দেয়ালের আড়ালে যেন কেউ তাকে লক্ষ্য করছে।
সে দরজার দিকে তাকাল। ক্যাসিয়ান বলেছিল, রাতে ঘর থেকে বের হতে না। অথচ তাকে ঘিরে একের পর এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে। জিনিয়ার মনে হলো, এভাবে চুপ করে থাকলে সে কখনোই কিছু জানতে পারবে না।
দরজার কাছে গিয়ে হাত বাড়াতেই থেমে গেল সে।
ক্যাসিয়ানের কথা মনে পড়ল।
“এই বাড়ির সব দরজা তোমার জন্য খোলা নয়।”
জিনিয়া হাত সরিয়ে নিল।
“না... এখন বের হওয়া ঠিক হবে না।”
নিজেকেই বোঝানোর চেষ্টা করল সে।
ঠিক তখনই ঘরের বাইরে থেকে কারও মৃদু হাসির শব্দ ভেসে এলো।
জিনিয়া চমকে উঠল।
কণ্ঠটা খুব ক্ষীণ, কিন্তু স্পষ্ট।
সে দরজার কাছে গিয়ে কান পাতল। বাইরে যেন দুজন মানুষ কথা বলছে।
“সে জেগে আছে?”
একজনের কণ্ঠ।
“হ্যাঁ।”
“ক্যাসিয়ান জানে?”
“জানলে এতক্ষণে তোমাকে এখানে দাঁড়াতে দিত না।”
জিনিয়ার বুক ধক করে উঠল।
তারা তার কথাই বলছে!
সে দরজা খুলবে কি না ভাবতে ভাবতেই বাইরে আবার কণ্ঠ শোনা গেল।
“মেয়েটাকে নিয়ে যাওয়ার আগে নিশ্চিত হতে হবে।”
“কী নিয়ে?”
“ওর মধ্যে সেই চিহ্ন আছে কি না।”
জিনিয়ার কপাল কুঁচকে গেল।
চিহ্ন?
কোন চিহ্নের কথা বলছে তারা?
এরপর আর কোনো কথা শোনা গেল না।
জিনিয়া দ্রুত দরজা থেকে সরে এসে বিছানার পাশে দাঁড়াল। কিছুক্ষণ পর দরজার নিচ দিয়ে একটা ছায়া দেখা গেল। কেউ যেন বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
জিনিয়া নিঃশ্বাস আটকে রাখল।
কিন্তু দরজা খুলল না।
কিছুক্ষণ পর ছায়াটাও সরে গেল।
জিনিয়া বিছানায় বসে পড়ল। তার মাথায় এখন শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরছে—এই বাড়িতে আসার পর থেকে কেন সবাই তার ব্যাপারে এত কিছু জানে?
আর “চিহ্ন” বলতে তারা কী বোঝাচ্ছে?
সে নিজের হাতের দিকে তাকাল। জঙ্গলে পালানোর সময় গাছের ডালে লেগে থাকা আঁচড়টা এখনো আছে। এর বাইরে শরীরে বিশেষ কিছু নেই।
তাহলে তারা কী খুঁজছে?
হঠাৎ দরজা খুলে গেল।
জিনিয়া চমকে উঠে দাঁড়াল।
ক্যাসিয়ান দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।
তার মুখ আগের চেয়ে অনেক বেশি গম্ভীর। কালো পোশাকের ওপর চাঁদের আলো এসে পড়েছে। লাল চোখ দুটো অন্ধকারেও স্পষ্ট।
জিনিয়া কিছু বলার আগেই ক্যাসিয়ান ঘরের ভেতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিল।
“কেউ তোমার সঙ্গে দেখা করতে এসেছিল?”
জিনিয়া অবাক হয়ে তাকাল।
“আপনি কীভাবে জানলেন?”
ক্যাসিয়ান তার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে বলল, “এসেছিল?”
জিনিয়া কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বলল, “দরজার বাইরে দুজন কথা বলছিল।”
ক্যাসিয়ানের মুখ শক্ত হয়ে গেল।
“তারা কী বলেছে?”
“আমার কথা বলছিল।”
“কী বলেছে?”
জিনিয়া এবার একটু সাহস করে বলল, “আপনি আগে বলুন, এই বাড়িতে আসলে কী হচ্ছে?”
ক্যাসিয়ান তার দিকে তাকিয়ে রইল।
জিনিয়া থামল না।
“সবাই আমার ব্যাপারে কিছু না কিছু জানে। কেউ বলছে আমাকে খুঁজতে মানুষ আসবে, কেউ বলছে আমার মধ্যে কোনো চিহ্ন আছে। অথচ আমি কিছুই জানি না। আপনি আমাকে জঙ্গল থেকে এখানে নিয়ে এলেন, তারপর থেকে একের পর এক অদ্ভুত ঘটনা ঘটছে। আমি কি অন্তত জানতে পারি কেন?”
ক্যাসিয়ান ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো।
“তুমি এখনো ভয় পাচ্ছ?”
“হ্যাঁ।”
“আমাকে?”
জিনিয়া কিছুক্ষণ তার চোখের দিকে তাকিয়ে থেকে বলল, “আপনাকে বুঝতে পারি না। তাই ভয়ও পাই।”
ক্যাসিয়ান থেমে গেল।
তারপর খুব শান্ত গলায় বলল, “আমাকে নিয়ে ভয় পাওয়ার যথেষ্ট কারণ আছে।”
জিনিয়ার বুক কেঁপে উঠল।
“আপনি কি মানুষ নন?”
প্রশ্নটা ঘরের বাতাসকে যেন হঠাৎ ভারী করে দিল।
ক্যাসিয়ান কয়েক সেকেন্ড কোনো উত্তর দিল না।
তারপর জিনিয়ার কাছাকাছি এসে দাঁড়াল।
“মানুষ সম্পর্কে তোমার ধারণা কী?”
জিনিয়া অবাক হয়ে বলল, “এটা কেমন প্রশ্ন?”
“তুমি যাদের বন্ধু ভেবেছিলে, তারা কি মানুষ ছিল?”
জিনিয়া চুপ হয়ে গেল।
ক্যাসিয়ান তার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “মানুষের মুখ দেখেই মানুষকে চেনা যায় না, জিনিয়া।”
“তাহলে আপনাকে কীভাবে চিনব?”
ক্যাসিয়ানের ঠোঁটে খুব হালকা হাসি ফুটল।
“চেষ্টা কোরো না।”
জিনিয়া বিরক্ত হয়ে বলল, “আপনি সবসময় রহস্য করে কথা বলেন।”
“কারণ সত্যিটা শুনলে তুমি হয়তো আমাকে আর এই চোখে দেখবে না।”
জিনিয়া তার লাল চোখের দিকে তাকাল।
“আপনার চোখ...”
ক্যাসিয়ান সঙ্গে সঙ্গে দৃষ্টি সরিয়ে নিল।
জিনিয়া এবার জানালার দিকে তাকিয়ে বলল, “ওখানে কেউ একটা লিখে গেছে।”
ক্যাসিয়ান স্থির হয়ে গেল।
“কী?”
জিনিয়া জানালার কাছে গিয়ে কাঁচের ওপর লেখা কথাগুলো দেখাল।
“ওকে বিশ্বাস কোরো না।”
ক্যাসিয়ান কয়েক মুহূর্ত লেখাটার দিকে তাকিয়ে রইল।
তার মুখ দেখে মনে হলো, কথাগুলো তার কাছে অপরিচিত নয়।
জিনিয়া সেটা লক্ষ্য করল।
“আপনি জানেন কে লিখেছে?”
ক্যাসিয়ান কোনো উত্তর দিল না।
“ক্যাসিয়ান?”
এই প্রথম জিনিয়া তার নামটা স্বাভাবিকভাবে উচ্চারণ করল।
ক্যাসিয়ান ধীরে তার দিকে তাকাল।
“এই বাড়িতে এমন কেউ আছে, যে তোমাকে আমার বিরুদ্ধে করতে চাইছে।”
“কে?”
“জানি না।”
“আপনি সত্যিই জানেন না?”
“জানলেও তোমাকে এখন বলতাম না।”
জিনিয়া বিরক্ত হয়ে বলল, “তাহলে আমি কাকে বিশ্বাস করব?”
ক্যাসিয়ান কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“কাউকে না।”
“আপনাকেও?”
“বিশেষ করে আমাকে।”
জিনিয়া থমকে গেল।
ক্যাসিয়ান এবার জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়াল। বাইরে চাঁদের আলোয় বিশাল জঙ্গলটা দেখা যাচ্ছে।
“আজ রাতে তুমি ঘুমাবে না।”
জিনিয়া অবাক হয়ে বলল, “কী?”
“আমি চাই তুমি সতর্ক থাকো।”
“কেন?”
ক্যাসিয়ান জানালার বাইরে তাকিয়ে খুব নিচু গলায় বলল,
“কারণ আজ রাতে এই বাড়িতে অতিথি আসবে।”
“কে?”
ক্যাসিয়ান এবার তার দিকে তাকাল।
“যারা তোমাকে জঙ্গলে তাড়া করেছিল, তাদের কেউ নয়।”
জিনিয়ার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“তাহলে?”
ক্যাসিয়ানের লাল চোখ দুটো অন্ধকারে জ্বলে উঠল।
“যারা তাদের থেকেও ভয়ংকর।”
জিনিয়ার গলা শুকিয়ে গেল।
ঠিক তখনই পুরো প্রাসাদের কোথাও একটা বিশাল ঘণ্টা বেজে উঠল।
ক্যাসিয়ান সঙ্গে সঙ্গে দরজার দিকে তাকাল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল,
“ওরা এসে গেছে।”
জিনিয়া ভয়ে ফিসফিস করে বলল,
“কারা?”
ক্যাসিয়ান দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল।
কিন্তু বের হওয়ার আগে একবার পেছনে তাকিয়ে বলল,
“যাই হোক না কেন, এই ঘর থেকে বের হবে না।”
দরজা বন্ধ হয়ে গেল।
জিনিয়া একা দাঁড়িয়ে রইল।
কিছুক্ষণ পর বাইরে থেকে অদ্ভুত এক গন্ধ ভেসে এলো।
লোহার মতো কাঁচা একটা গন্ধ।
তারপর করিডোরে একের পর এক ছায়া নড়তে দেখা গেল।
জিনিয়া দরজার কাছে গিয়ে কান পাতল।
কেউ একজন খুব নিচু গলায় বলছে,
“ক্যাসিয়ান কাইরান মেয়েটাকে লুকিয়ে রেখেছে।”
আরেকজন বলল,
“আজ রাতে তাকে নিয়ে যেতেই হবে।”
জিনিয়ার বুকের ভেতরটা হিম হয়ে গেল।
সে ধীরে ধীরে দরজা থেকে সরে এলো।
কিন্তু তখনই জানালার বাইরে কিছু একটা নড়ল।
জিনিয়া ভয়ে জানালার দিকে তাকাল।
চাঁদের আলোয় দেখা গেল—
একজন কালো পোশাকের মানুষ জানালার ঠিক বাইরে দাঁড়িয়ে আছে।
তার চোখ দুটোও লাল।
আর সে সরাসরি জিনিয়ার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসছে।
চলবে..... 🖤

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন