#রক্তমুকুট
#jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব - ২
আলীর মশকরায় মেহরাব বেজায় বিরক্ত হচ্ছে। পাঠাগারে বসে এসব কে করে। বিরক্তি নিয়ে তাকালো মেহরাব।
“মামা যাও তো। পরে এসো”
আলী আরও গা ঘেঁষে বসলো মেহরাব এর। কাঁধে হাত রেখে বলল
“শোন না বাপ। তোর কি তাকে ভালো লেগেছে?”
মেহরাব এর মনোযোগ বই এ। পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে বলল
“নারীদের প্রতি আগ্রহ কম, তার ওপর আমি তো তাকে দেখিই নি। ভালো লাগার প্রশ্ন আসে কোথা থেকে?”
“কিন্তু তোর লক্ষণ আমার ভালো ঠেকছে না রে মামা। আরে আমি তোর তোর বন্ধুর ম….”
“ওয়াসেম”
সম্রাট হারুন ওয়াসেম এর গমগমে কন্ঠ পেয়ে দুটোই লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালো। মেহরাব বই রেখে এগিয়ে গেল বাবার দিকে
“হ্যা আব্বু, বলো”
হারুন ওয়াসেম বিচক্ষণ মানুষ। তারই রাজ্যের কেউ যে এই ডাকাতির সাথে সরাসরি যুক্ত তা তার বুঝতে বাকি নেই। এজন্য কোনো প্রতিনিধি না পাঠিয়ে সরাসরি নিজের ছেলে আর শ্যালক কে পাঠাচ্ছে। মুচকি হেসে ছেলের বলিষ্ঠ দুই বাহু ধরে বলল
“কাল সাহাবাদে যেতে হবে বেটা। আমাদের অঙ্গরাজ্যে ডাকাতি হচ্ছে, ওরা যুবতী নারী শিশু অপহরণ করছে। গতকালও কয়েকজন যুবতী কে নিয়ে আসছিলো। সাহাবাদ এর রক্ষীরা তাদের আটকায়। তবুও একজন কে নিয়ে এসেছে। আমি চাই তুমি বিষয়টা দেখো। প্রজাদের সাথে কথা বলে তাদের আশ্বস্ত করো। সম্রাট এখনো বেঁচে আছে, তাদের জানমালের কোনো ক্ষতি হতে দেওয়া যাবে না”
মেহরাব এর রক্ত টগবগ করে ওঠে ডাকাত দের বর্ণনা শুনে। বাবার হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে বলে
“তুমি চিন্তা করো না আব্বু, ভোর হতেই আমি রওনা হব। ওই ডাকাতদল কে আমি তোমার পায়ের কাছে এনে ফেলবো কথা দিলাম।”
সম্রাট নিজের ছেলের হাতে চুমু খেল। বাহবা দিয়ে কাঁধ চাপড়ে চলে গেল সেখান থেকে। মেহরাব গোসল করবে। গায়ের গেঞ্জিটা খুলতে খুলতে বলল
“তৈরি হয়ে নাও বুঝলে, এক ঢিলে দুই পাখি মারবো কাল”
আলী এগিয়ে আসলো
“সে কি করে?”
“প্রথমত যার জন্য যাচ্ছি সেটা করব। আর সোনালি চুলের মানুষ না পরি কি প্রাণী ওটা? ওটাকে আচ্ছা করে শিক্ষা দেব”
চওড়া কাধ টাতে গেঞ্জি ঝুলিয়ে মেহরাব চলে গেল স্নানাগারে। গরম দুধ নিয়ে ছেলের কক্ষে ঢুকলেন আয়েশা বেগম। ঘরে নেই মেহরাব। দুধের পাত্র টেবিলে রাখতেই স্নানাগার থেকে গা মুছতে মুছতে বেরোলো মেহরাব। পড়নে বিলেতি ট্রাউজার। অর্ধভেজা শরীরেই মা কে আহ্লাদ করে জড়িয়ে ধরলো। আয়েশা পুত্রের ছেলেমানুষী দেখে বলল
“এই তুই বড় হবি না কখনো হ্যা? মেহু ছাড় ভিজে যাচ্ছি তো আমি।”
ছাড়লো না মেহরাব উল্টো আষ্টেপৃষ্টে ধরে ঘুরতে লাগলো কক্ষের মধ্যে। রগচটা এই মেজাজি পুরুষ টা মায়ের কাছে নিতান্তই বাচ্চা। আয়েশা বেগম তোয়ালে দিয়ে চুল ভালো করে মুছে দিতে দিতে বিলাপ করলো
“এই ভর সন্ধ্যে বেলা গোসল না করলে কি হতো তোর? অসুখ বাধাবি? নে দুধ টা খেয়ে নে"
নাক সিটকায় মেহরাব।
“আম্মা আমি কি বাচ্চা আছি? যে রোজ রোজ দুধ নিয়ে আসো?”
“হ্যা ভন্ডামির বেলায় তুমি বাচ্চা, এ বেলায় তুমি বিশাল বড় হয়ে গেছো। কান মলে দেওয়ার আগে খেয়ে নে”
বিরক্তি নিয়ে দুধ টুকু ঢকঢক করে গিলল মেহরাব। মুখ বিকৃত করলো সাথে সাথে। আয়েশা পানি এগিয়ে দিতেই খেয়ে নিলো। বিছানায় টানটান হয়ে শুয়ে মায়ের কোলে মাথা রাখলো। আয়েশা ছেলের চুলে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বলে
“হ্যা রে শোন না। তোর আব্বু তো আমার কথা কানেও নিচ্ছে না। সেই কবে থেকে বলছি মেয়ে দেখতে, তোর আব্বুর সেই এক কথা। ছেলে বড় হয়েছে ওকে ওর বিষয়ে ভাবতে দাও। বলি আমার কি নাতি-নাতনীর শখ করে না?”
মেহরাব বুঝে গেছে মা কি বলবে এখন। তার আশঙ্কা সত্যি প্রমাণ করে দিয়ে আয়েশা বলতে লাগলো
“শোন না, আমি ঘটক লাগিয়ে পাঁচটা মেয়ের সন্ধান পেয়েছি। একেবারে আমাদের যোগ্য বউ হবে বুঝলি তো। সবার ছবিও আঁকিয়ে এনেছি হুমমম। তুই দেখবি?”
মেহরাব হঠাৎ অন্যমনষ্ক হয়ে পড়লো। উঠে বসলো সাথে সাথে।
“আম্মা শোনো না। প্রতীক এর মারা যাওয়ার তো ৩ বছর হয়ে গেল। এবার জাহিদা কে আমাদের অন্যত্র বিবাহ দেওয়া উচিত। বেচারি হয়তো মুখ ফুটে বলতে পারে না। কিন্তু স্বামী মারা গেছে বিয়ের দুই মাস পরে। ওর তো এখন যৌবন বয়স। আমাদের তো বিষয়টা ভাবা উচিত”
আয়েশা হাফ ছেড়ে বলল
“সে কি আমি বলিনি তাকে? সে বিয়ে করবে না। বাকি জীবনটুকু প্রতীকের স্মৃতি নিয়ে এই মহলেই কাটিয়ে দেবে।”
“এমন টা হয় না আম্মা।”
প্রতীক মেহরাব এর সৎ ভাই। বিবাহের দীর্ঘ দিন অতিক্রম হওয়ার পরেও যখন আয়েশার কোনো সন্তান হচ্ছিল না। তখন সম্রাট হারুন কে তার বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করায়। কিন্তু দ্বিতীয় বিয়ের বছর না ঘুরতেই মেহরাব আসে আয়েশার গর্ভে। মেহরাব এর বয়স যখন তিন বছর তখন সম্রাটের দ্বিতীয় স্ত্রী মদিনার সন্তান গর্ভে আসে। কিন্তু প্রসব কালে মারা যায় মদিনা। সন্তানকে আয়েশা বেগম ই বড় করেছেন। মেহরাব আর প্রতীক কে কখনও আলাদা চোখে দেখেন নি এই ভদ্রমহিলা। প্রতীক এর বয়স যখন ২৩ বছর। তখন প্রেম সূত্রে তাদের মন্ত্রীর মেয়ে জাহিদা কে বিয়ে করে সে। বিয়ের দুই মাস পরেই বহিরাগত শত্রুর আক্রমনে প্রাণ যায় প্রতীকের।
জাহিদার বাবার উদ্দেশ্য ছিল মেয়েকে রাজ বাড়ীর বউ করা। চেষ্টা করতো মেহরাব কে ফাসানোর। কিন্তু মেহরাব শক্ত ধাচের কিনা। সুবিধা করতে পারেনি। পটালো প্রতীক কে। প্রতীক মারা যাওয়ার পর তার নজর ফের মেহরাব এর দিকে। এজন্য অন্যত্র বিবাহ করতে নারাজ সে।
দীর্ঘক্ষণ মাথায় মায়ের হাতের স্পর্শ পেয়ে ঘুমিয়ে পড়ে মেহরাব। আয়েশা গায়ে কাথা টেনে দিয়ে দরজা বন্ধ করে চলে যায়। মাঝরাতে ঘুম ভাঙলে আবার গিয়ে ডাকবে হয়তো আম্মা খাবার দাও। ঘুমন্ত ছেলের কপালে চুমু খেয়ে আয়েশা বেড়িয়ে গেলো। মারাত্মক সুপুরুষ এই যুবকটি এখনো তার মায়ের আদরের বাচ্চাটিই রয়ে গেছে। ছোট বাচ্চার ও এত খেয়াল রাখা হয় না বোধহয়, যতটা আয়েশা মেহরাব এর রাখে। ছেলের খাওয়া, ঘুম, গেসল সব কিছুতে সে নাজুক। অথচ যুবরাজ অসীম সাহসী, ধূর্ত শিকারী। মায়ের কাছে এসে বিড়াল ছানা টি হয়ে থাকে। কক্ষ থেকে বেরোতেই সিড়ির পাশে এক ঝলক পরিচিত আচল খানা দেখতে পায়।
“এই রাতের বেলা জাহিদা মেহরাব এর ঘরের সামনে কী করছিল?”
****
সম্রাটপুত্রের আগমনী বার্তায় সাহাবাদ মহল তাদের স্বাগত জানানোর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করছে। অতিথি শালার সাজসজ্জা দেখার মত। টহল দ্বিগুন করা হয়েছে আরও। জান্নাত হেঁশেলে নিজের হাতের সবচেয়ে সুস্বাদু মিষ্টি কাঁচাগোল্লা বানাচ্ছে। সাহারা হেঁশেলের চারিপাশে চরকি পাক খাচ্ছে কখন সুযোগ পাবে লুটে নেবে এত্ত গুলা। আপার হাতে কাচা গোল্লা যেন অমৃত। ওর ভাবগতিক বুঝে জান্নাত বলল।
“এত ঘুর ঘুর করে লাভ নেই সারা। তোর ছানার জিনিস খাওয়া নিষেধ। গত মাসেই সেরে উঠলি ভুলে গেছিস?”
সাহারা চোখ ছোট করে বলল
“আমি মোটেও কাচাগোল্লা খাওয়ার জন্য ঘুরছি না। অতটাও ছোঁচা না আমি হুহহ”
নূপুরের ঝনঝন শব্দ তুলে স্থান ত্যাগ করলো সাহারা। রাত প্রায় দ্বিতীয় প্রহর চলে। জান্নাত দুই পাত্রে দুধ নিয়ে প্রথমে সাহারার ঘরে গেল। মেয়েটা বড় দুধলোভী। কোনো প্রশ্ন ছাড়াই ঢকঢক করে খেয়ে নিলো। তারপর গেল শাখার ঘরে। কিন্তু শাখা ঘরে নেই। জান্নাতের ভ্রু জোড়া কুঞ্চিত হলো। এত রাতে কোথায় গেল শাখা? দুধের গ্লাস টা পালঙ্কের পাশের টেবিলে রেখে মহল জুড়ে খুঁজলো। কোথাও নেই। এখন মনি মা কে বললে তো ফের মহল মাথায় তুলবে। বাইরে বেরিয়ে প্রহরীদের কাছে জিজ্ঞেস করলো। কেউ দেখেনি। অবশেষে একজন বলল সে গোরস্তান এর দিকে যেতে দেখেছে।
জান্নাত দ্রুত কবরস্থানের দিকে গেল। হাতে একটা হারিকেন। প্রবেশদ্বার পেরিয়ে ভিতরে যেতেই দেখলো শাখা একটা কবরের ওপর হামাগুড়ি দিয়ে কাদছে। কবরের ফলকে লেখা
(নেওয়াজে আবিদ)
জান্নাতের বুকের ভিতরটা মোচর দিয়ে উঠলো। মনে মনে ভাবলো শাখা কি কিছু নিয়ে কষ্ট পেয়েছে যে ওর বাবার কথা মনে পড়ছে? ভাবতে ভাবতে জান্নাতের চোখের পানিও বাধ মানলো না। তার ঔরসজাত সন্তান শাখা হলেও, আবিদের প্রথম সন্তান ছিল জান্নাত। জান্নাত আর আবিদের ছিল আত্মার ভাব। বড় টান ছিলো দুজনের। নিজের সন্তানের মত স্নেহ পেয়েছে জান্নাত আবিদের থেকে। বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেড়িয়ে এলো। ডেকে বিভ্রান্ত করতে চাইলো না শাখা কে। কাঁদুক, মনের সব দুঃখ ঢেলে কাঁদুক। কাঁদলে হালকা লাগে, যারা কাদতে পারে না তারা ভেতরে ভেতরে গুমড়ে মরে। গুমড়ে মরার চেয়ে কেঁদে ভাসানো অনেক ভালো। জান্নাত চোখ মুছে হারিকেন হাতে হাঁটা ধরলো মহলের দিকে।
****
রাত্রির শেষ প্রহর। একটু পরেই সূর্য উঠবে। আস্তাবলের দুটো তেজী ঘোড়া নিয়ে বেড়িয়ে পড়লো মামা-ভাগনে। দুজনের পড়নে কাবুলি পোষাক মাথা মুখ সহ বাঁধা সাদা কালো চারকোণা নকশার কাপড়ে। কেবল তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া দৃশ্যমান। পিঠে তূনীয় কোমড়ে তরবারী কোষ। মায়ের থেকে বিদায় নিয়ে বেড়িয়ে পড়েছে। প্রথমেই কাটাগিরির জঙ্গল। এই জঙ্গল এর বিকল্প পথ আমিরাবাদ এর ঘাট । তবে ঘাট ঘুরে গেলে দুদিন সময় লাগবে। তবুও মানুষ ঘাট হয়েই যায় কারণ এই জঙ্গল ডাকাতির জন্য জন সাধারণের কাছে আতঙ্কের কারণ। বহু বণিক এ পথে উধাও হয়ে গেছে। তারাতাড়ি পৌঁছাবে বলে এই জঙ্গল ধরেই রওনা হলো দুজন। পথিমধ্যে তেমন কোনো কিছু চোখে পড়লো না। আলী ভয়ে ভয়ে গেলেও মেহরাব এর আনারি চোখ চারিদিকে সন্দিহান কিছু খুজছে। কিছু না কিছু তো চোখে পড়াই উচিত।
আলী ঘোড়া ছুটিয়ে হাপিয়ে যাচ্ছে মেহরাব এর সাথে। আচমকা মেহরাব গতি কমালো। আলী চেঁচিয়ে বলল
“এই এই, তুই কি যেচে পড়ে মরতে চাচ্ছিস? একে তো এখান দিয়ে নিয়ে এলি, ঘোড়ার গতি কমালি কেন? যদি ডাকাত টাকাত আক্রমণ করে বসে।”
মেহরাব চারিদিকে তাকাচ্ছে। আলী ভয়ে ভয়ে বিরক্ত নিয়ে বলল
“এই তুই খুঁজছিস কি বল তো?”
“ডাকাত”
আলীর পিলে চমকে উঠলো। এ ছেলে বলে কি
“অ্যাহহ ডাকাত রা কি তোর জন্য এই জঙ্গলের মধ্যে সয়ম্বর সভা বসিয়েছে রে? ওরে বাপ আমার, তারাতাড়ি চল। তোকে অপ্সরা খুঁজে দিব অপ্সরা”
মেহরাব বিরক্ত হলো
“আহ তুমি থামবে?”
“হ্যা একবার ডাকাত দের পাল্লায় পড়ি। আজীবন এর জন্য থামিয়ে দেবে। কচু কাটা করে রেখে দেবে আমাদের।”
“আমারই সাম্রাজ্য থেকে আমাকে কচু কাটা করবে এমন বাপের ব্যাটা জন্ম নেয়নি মামা। তুমি চুপচাপ আমাকে অনুসরণ করো”
আলী মেহরাব এর পাশ ঘেষেই যাচ্ছে। হঠাৎ সামনে আসলো একজন অচেনা পুরুষ। মেহরাব ঘোড়া থামালো। লোকটার চোখ পড়লো মেহরাব এর তীক্ষ্ণ ধারালো চোখ জোড়ায়। লোকটার পরণে কালো রঙের ধুতি পাজামা। তাও হাটু ওবদি সেটা। হাতা ছাড়া ফতুয়া। দুই বাহুতে বাজুবন্দ। হাতে অনেক গুলো আংটি। মাথায় লাল ওড়না পাকিয়ে পাগড়ীর মত করা। মেহরাব এর সামনে এসে বলল
“সালাম হুজুর। আই এনা জঙ্গলে থাকিও। ওই ছামনে যাইবার লাই আচি। সাহায্য করিনু বাবু?”
আলী মুখ বাকিয়ে বলে
“এ কানা, কোন দেশি ভাষা বলছিস বে? লাউ কোথায় পেলি?”
মেহরাব বিরক্তি নিয়ে তাকাতেই আলী বলে
“আমাকে রাগ দেখাচ্ছেস কেন? দেখছিস না কি সব বলছে”
“ও সামনে যাবে তাই সাহায্য চাইছে”
আলীরাজ তাকাতেই লোকটা দাত কেলিয়ে হাসলো। তা দেখে মুখ বাকিয়ে বলল
“অ্যাহহহ মামা বাড়ি আবদার। যা হেঁটে যা”
“উঠে আসুন”
মেহরাব এর অনুমতি পেয়ে লোকটা খুশি হয়ে ঘোড়ার পিঠে চেপো বসলো। মেহরাব যেতে যেতে জিজ্ঞেস করলো
“কোন দিকে যাবেন?”
“এই ছামনে যাই বা দিক লা।”
“আপনি এই জঙ্গলে কও করছেন এত ভোরে?”
“আই তো কাঠুরে আছি বাবু। কাঠ কাটি।”
আলী খেয়াল করলো লোকটা যেদিকে নিয়ে যাচ্ছে জঙ্গল আরও গভীর হচ্ছে। মেহরাব কে বলল
“মেহু, বুঝিস কিন্তু হ্যা। বিপদ টিপদ কিন্তু বলে কয়ে আসে না। তোর না হয় বাপের ভিটে এই জঙ্গল। কিন্তু আমার তো না। আমায় যদি মেরে টেরে দেয়? ইয়া রব, আমি বিবাহ করিনি। এক খানা বিবাহের বড় শখ আমার মাবুদ। আমাকে বনমানুষ আর চিল এর থেকে বাঁচাও”
আলীর এসব উদ্ভট কথা শুনে মেহরাব এর পিছনে বসা লোকটা বলল
“হুজুর, আপনার শিষ্য কি পাগল আছে?”
আলী চেতে ওঠে লোকটার কথা শোনে
“এই এই হনুমান, পাগল বলছিস কাকে? তুই পাগল, তোর বাপ পাগল, তোর চৌদ্দ গোষ্ঠী পাগল। আর শিষ্য কাকে বলছিস? বাপ হই বে ওর বাপ। খালি ওর মাকে এখনও খুঁজে পাইনি, পেলেই বিয়ে করে নেব”
লোকটা খিলখিল করে হেসে উঠলো। আচমকা মেহরাব নিজের তলোয়ার দিয়ে পিছন দিকে আঘাত করে লোকটা শির’চ্ছেদ করে ফেলল। আতঙ্কে চকমে উঠলো আলী
“এএএ..এই তুই কি করলি বাপ? মারলি কেন একে?”
মেহরাব ঘোড়া থেকে এক লাফে নেমে মশক থেকে পানি ঢেলে তলোয়ার ধুয়ে নিলো। ফের তরবারি কোষে তলোয়ার রেখে ঘোড়া ছোটালো। আলীর বুক কাপছে এখনও আতঙ্কে। মেহরাব ফিচেল হেসে বলল
“নিশ্চয়ই খবর পেয়েছে আগে থেকেই। একবার মহলে ফিরি, ওখানেই লুকিয়ে আছে বিবিসন।”
আলী ভরকে গিয়ে বলল
“মা..মানে? ও ডাকাত ছিল?”
“হ্যা”
“বললেই হলো? ওটা ডাকাত ছিল তুই বুঝলি কি করে? আর বুঝলিই যখন ঘোড়ায় তুললি কেন?”
মেহরাব বাকা হেসে বলে
“ছোট বেলায় দাদুর কাছে গল্প শুনেছিলাম ডাকাত দের কেমন দেখতে হয়। কখনো শুনেছিস কাঠুরের পায়ে অত মোটা সোনার বালা থাকে? ওগুলো ডাকাতরা পরে। হাতে জোড়া তলোয়ার এর নকশা। আর হাতের আংটি গুলো। সব মিলে গেছে দাদুর বর্ণনার সাথে। তার থেকে বড় কথা ও আমাদের জঙ্গলের ভিতরের দিকে দিয়ে যাচ্ছিলো।”
“এতকিছু বুঝেও তুই ওকে ঘোড়ায় চাপালি?”
“হা হা। ও আমাদের মারলে তখনই মেরে দিতে পারতো। বা আক্রমন করতে পারতো। কিন্তু তা না করে ও আমাদের ওদের ডেরায় নিয়ে যেতে চাইছিলো। হয়তো উদ্দেশ্য ছিল আমাদের বন্দি করে সম্রাটের থেকে মোটা অঙ্কের মুক্তিপণ দাবি করা।”
বহু পথ পেরিয়ে তারা পৌঁছালো সাহাবাদ প্রাসাদে। এই প্রথমবার মেহরাব প্রাসাদে এলো। সাহাবাদে বহুবার এসেছে। তবে জমিদার প্রাসাদ দেখা হয়নি। তারা পৌছানোর সাথে সাথেই একের পর এক মুঠো মুঠো ফুলের পাপড়ি উড়ে এসে গায়ে লাগলো। প্রাঙ্গণে ঘোড়া রেখে তারা এগিয়ে গেলো মহলের ভিতরের দিকে। সুনেহেরা এগিয়ে এসে তাদের স্বাগত জানালো। অতিথি শালায় তাদের আরামের ব্যাবস্থা করা হলো। হাত-মুখ ধুয়ে খাবার খেয়ে তারপর বেরোবে প্রজাদের কাছে বিস্তারিত শুনতে। সাহারাকে স্পষ্ট নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে যাতে সারাদিনে কক্ষ থেকে না বেরোয়। দাসীরা গোটা টেবিল সাজিয়েছে খাবারে। মেহরাব আর আলীরাজ বসলো। সুনেহেরা নিজে দাঁড়িয়ে থেকে তাদের আপ্যায়ণ করাচ্ছে। মেহরাব এক মনে খেলেও আলীর চোখ চারিদিকে খুঁজছে এ মহলের মেয়েদের। মেহরাবের কানে কানে বলল
“কি ব্যাপার বলতো। আমরা আসবো জেনে কি মহলের সব মেয়েদের খোপে ধরে রেখেছে? এসবের মানে কি মামা? আমরা কি চরিত্রহীন?”
“হ্যা”
মেহরাব এর উত্তর শুনে চট করে সোজা হয় আলী। খাওয়া দাওয়া শেষ সেসময় কাচের পাত্রে করে কাঁচাগোল্লা নিয়ে সেখানে হাজির হলো জান্নাত। কালো সালোয়ার কামিজ পরিহিত। ওড়না হিজাবের মত করে পরেছে। শুধু মুখ এবং হাতের কব্জি টুকু দৃশ্যমান। সুনেহেরার দিকে তাকাতেই সুনেহেরা ইশারা দিলো তাকেই অতিথিদের পাতে দিতে। শেষ পাতের মিষ্টি দাসীরা দিলে ভালো দেখায় না। জান্নাত মিষ্টি দিতে এগিয়ে আসতেই আলী কনুই দিয়ে গোঁতা মারল মেহরাব কে। মেহরাব বিরক্তি নিয়ে তাকাতেই ইশারা দিলো জান্নাতের দিকে। তার দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকানোর সাথে সাথে চোখাচোখি হলো জান্নাত আর মেহরাব এর। জান্নাত চোখ নামিয়ে নিলো সাথে সাথে। মেহরাব এর চোখ জোড়া থমকে গেল রমনীর অপরুপ মুখ খানায়।
এমন রুপ সে এর আগে দেখেনি তো। কেমন একটা মায়াবী আর লক্ষী লক্ষী ভাব আছে চেহারায়। জ্বল জ্বল করছে গয়ের রঙ। পাতে মিষ্টি দিয়েছে তা খেয়ালই হলো না তার। এমন রমনী দেখলে কে ই বা চোখ ফেরাতে পারে। মেহরাব এর গমন চাহনি তে জান্নাত এর অস্বস্তি লাগা শুরু হলো। বাটিটা রেখে চলে গেলো হেঁশেল এর দিকে। তার চাল চলন কত শান্ত। একজন যোগ্য স্ত্রী হবার গুণ রাখে মেয়েটা। মেহরাব গলা খাঁকারি দিতেই ভ্রম ভাঙলো মেহরাব এর
“উহুম উহুম। মিষ্টি টা খা বাপ। বাড়ি গিয়ে আপাকে আমি বুঝিয়ে বলব সমস্যা নেই। তোর কিছু ভাবতে হবে না”
মেহরাব চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে সাথে সাথে দুটো কাঁচাগোল্লা পুড়ে দিলো আলীরাজের মুখে।
চলমান….
কেমন লাগলো পাখিরা? অবশ্যই জানিও কেমন 🥰। পরবর্তী পর্ব পেতে পেইজে ফলো দিয়ে রাখো। আর বাইজিদ মেহের থাকবে কিনা আমি এখনও ভাবছি। আগের গল্পের চরিত্র গুলো এই গল্পে আনলে তা পানসে লাগতে পারে। এমনি তেই এই গল্পে আরও বহু চরিত্র আছে। যাই হোক, কেমন হলো জানিও 🥰