ফন্ট সাইজ:
থিম:
রক্তমুকুট

৩য় পর্ব

লেখক: জান্নাতুল ফেরদৌস

#রক্তমুকুট

#jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব- ৩

মিষ্টি মুখে দিয়েও যেন স্বাদ পেল না মেহরাব। তার চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে কালো পোশাকে আবৃত সেই শান্ত মুখটি। এমন কোমল, সংযত রূপ সে আগে দেখেনি। আলী কনুই দিয়ে গুঁতো মেরে বলল,

"কিরে? কাঁচাগোল্লা খাচ্ছিস নাকি কাঁচাগোল্লা দেওয়া মেয়েটাকেই গিলে ফেলবি?"

মেহরাব ভ্রু কুঁচকে তাকাল।

"অতিরিক্ত কথা বলো না মামা।"

আলী ঠোঁট চেপে হাসল।

"হ্যাঁ হ্যাঁ, বুঝেছি।"

খাওয়া শেষ করেই দু'জনে বেরিয়ে পড়ল সাহাবাদের বাজারের দিকে। সঙ্গে কয়েকজন রক্ষী থাকলেও তারা দূরে দূরেই থাকল। মেহরাব চেয়েছিল সাধারণ মানুষের মুখ থেকেই সব শুনতে।৷ বাজারের মাঝখানে কয়েকজন বৃদ্ধ এগিয়ে এসে সালাম করল।

"হুজুর, আল্লাহ আপনাকে ভালো রাখুন। আমাদের বাঁচান হুজুর।"

আলী আর মেহরাব মুখ চাওয়াচাওয়ি করলো। এরা চিনলো কী করে তাকে। হুট করে মেহরাব এর খেয়াল হলো তাদের ঘোড়ার জিনে লাগওয়া আমিরাবাদ এর পতাকার দিকে। তার কাঁধে হাত রেখে বলল,

"সব খুলে বলুন। কিছুই লুকাবেন না।"

বৃদ্ধ দীর্ঘশ্বাস ফেলল।

"রাত হলেই জঙ্গল দিক থেকে আসে ওরা। মুখ ঢাকা। কালো পোশাক। ঘরবাড়ি লুটে নিয়ে যায়। তরুণী মেয়েদের ধরে নিয়ে যায়। বাধা দিলে মানুষ মারে।"

আরেকজন বলল,

"হুজুর, ওদের যেন সব খবর আগে থেকেই জানা থাকে। কোন বাড়িতে টাকা আছে, কোথায় বিয়ে, কোথায় নতুন বউ এসেছে, কোন ঘরে যুবতী কন্যা আছক সব।"

মেহরাবের চোখ সরু হয়ে এল। অর্থাৎ তার ধারণা ই সঠিক। খবর ভিতর থেকেই যাচ্ছে। লোকগুলো একে অপরের মুখ চাওয়া-চাওয়ি করল।

আলী নিচু স্বরে বলল,

"আমি বলেছিলাম না, ভেতরের কেউ না থাকলে এত নিখুঁতভাবে সম্ভব না।"

মেহরাব মাথা নাড়ল। এরপর একের পর এক গ্রামের মানুষ এসে নিজেদের ক্ষতির কথা বলতে লাগল। কারও মেয়ে নিখোঁজ, কারও ভাই নিহত, কারও ব্যবসার সমস্ত পণ্য লুট হয়েছে। মেহরাব সব কথা মনোযোগ দিয়ে শুনল। সঙ্গে আনা মোটা খাতায় প্রতিটি ঘটনার তারিখ, স্থান, সময়, আক্রান্ত পরিবারের নাম, ডাকাতদের চলার পথ সব লিপিবদ্ধ করতে লাগল। প্রায় বিকেল গড়িয়ে এলো তাদের সবটা আদায় করতে।

"আমি কথা দিলাম। এই ডাকাতদলের শেষ দেখে তবেই ফিরব।"

প্রজারা একসাথে দোয়া করতে লাগল।

"আল্লাহ আপনাকে হেফাজত করুন যুবরাজ। যুবরাজ এর জয় হোক”

***

সন্ধ্যা নামতে শুরু করেছে। মেহরাব আর আলী আবার সাহাবাদ প্রাসাদে ফিরল। সুনেহেরা তাদের বিশ্রামের অনুরোধ করলেও মেহরাব বলল,

"আজই ফিরতে হবে। অনেক তথ্য পেয়েছি। আব্বুকে জানানো জরুরি।"

তার চোখ অন্য কাউকে খুঁজছিল। কোথাও আর সেই কালো পোশাকের মেয়েটিকে দেখা যায় না।

আলী সব বুঝেও না বোঝার ভান করে বলল,

"কাকে খুঁজছিস রে?"

"কাউকে না।"

"হ্যাঁ, সে তো আমি জানি বাপ। তুই কাওকে খুজগেই পারিস না"

মেহরাব কোনো উত্তর দিল না। বিদায়ের সময় ঘোড়া দুটো প্রাসাদের প্রধান ফটকের সামনে এনে দাঁড় করানো হলো। সুনেহেরা এগিয়ে এসে বলল

"আল্লাহ আপনাদের সহায় হোন। পথচলা নিরাপদ হোক যুবরাজ। এই পত্র খানা সম্রাট কেনদেবেন”

সুনেহেরার হাত থেকে মখমলের কাপড়ের চিঠি টা নিলো মেহরাব। দু'জনে ঘোড়ায় চড়ল। কোনো অদৃশ্য টানে মাথা তুলে তাকাল মেহরাব। প্রাসাদের দ্বিতীয় তলার দীর্ঘ বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে জান্নাত। কোষাক বদলে ছাই রঙা কামিজ পরেছে। তাতেও অসম্ভব সুন্দর লাগছে তাকে। মাথায় পরিপাটি করে টানা ওড়না। দু'হাত বারান্দার রেলিংয়ে রাখা। মুখে কোনো হাসি বা বিষণ্ণতা কিছুই নেই। আছে কেবল মায়া। কেমন মায়া মায়া চোখ জোড়া। মেহরাব আনমনেই বলে উঠলো

“মাশাল্লাহ”

হঠাৎ ই জান্নাত তাকালো মেহরাব এর দিকে। চোখাচোখি হলো দুজনের। সময় যেন থমকে গেল। মেহরাবের হাতের লাগাম আলগা হয়ে এল।

তীক্ষ্ণ দৃষ্টি স্থির হয়ে রইল সেই মুখের উপর। জান্নাতও চোখ সরায় না। দু'জনের মাঝখানে অনেকটা দূরত্ব, তবুও হাজারো না বলা কথা ভেসে যাচ্ছে চোখে চোখে। কে জানে জান্নাতের দৃষ্টিতে কি ছিল? মেহরাব তো ছিলো ঘোরের মধ্যে। আলী অনেক টা দূর গিয়ে ফিরে তাকিয়ে চিৎকার করল,

"মেহু! চলবি? নাকি সাহাবাদেই ঘরজামাই হয়ে থাকবি?"

চমকে উঠল মেহরাব। দৃষ্টি সরিয়ে নিলো বুকের ভেতর অদ্ভুত এক আলোড়ন হচ্ছে। আলীর ওপর বিরক্ত হলো। কোথায় কি বলতে হয় শিখলো না ছেলেটা। ঘোড়া ছুটিয়ে চলল আমিরাবাদের পথে।

কাটাগিরির জঙ্গলের পথের চেয়েও গভীর এক অচেনা পথে আজ প্রথম পা বাড়াল যুবরাজ মেহরাব। কারও প্রতি দুর্বল হওয়ার পরথ যে কত দুর্গম, কি কি পোহাতে হয় তা কি জানা আছে যুবরাজের? ফিরতি পথেও কাটাগিরির জঙ্গল অস্বাভাবিক পেরোতে হলে। আলী চারদিকে তাকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।

"আলহামদুলিল্লাহ! আজ আর কোনো ঝামেলা হলো না।"

মেহরাব চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিল।

"ঝামেলা না হওয়াটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় ঝামেলা, মামা।"

"মানে?"

"যাদের একজনকে আমি মেরেছি, তারা নিশ্চয়ই খবর পেয়ে গেছে। এখন এ পথ ফাঁকা রাখা কি তাদের জন্য সাজে?"

আলী ঢোক গিলল।

"তুই এভাবে বলিস না বাপ। বুকটা ধড়ফড় করে।"

মেহরাব শুধু মৃদু হাসল। লাগাম টেনে ঘোড়ার গতি বাড়িয়ে দিল।

“তারা নিশ্চিত শান্ত হয়ে কোথাও ঘাপটি মেরে বসে আছে আক্রমণ করবে বলে”

****

কাটাগিরির জঙ্গলের একেবারে গভীরে, বিশাল বটগাছ আর শ্যাওলা ধরা ধ্বংসস্তূপের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক প্রাচীন পরিত্যক্ত জমিদারবাড়ি। একসময় নিশ্চয়ই ঐশ্বর্যের প্রতীক ছিল বাড়িটি। এখন ভাঙা খিলান, ফাটল ধরা দেয়াল, আগাছায় ঢেকে যাওয়া উঠোন আর অর্ধভাঙা বারান্দা সব মিলিয়ে ভৌতিক এক আবহ। কিন্তু বাইরে থেকে পরিত্যক্ত মনে হলেও ভেতরের পরিবেশ রাজকীয়। অস্ত্রের ঝনঝন শব্দ। ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি। চারদিকে টহল দিচ্ছে কালো পোশাক পরা সশস্ত্র লোকজন। এই ধ্বংসপ্রায় প্রাসাদকেই নিজেদের ডেরায় পরিণত করেছে কাটাগিরির কুখ্যাত ডাকাতদল।

ঠিক তখনই হাঁপাতে হাঁপাতে তিনজন লোক ভেতরে ঢুকল। তাদের একজন কপালের ঘাম মুছতে মুছতে বলল,

"সর্দার... সর্বনাশ হয়ে গেছে!"

মহলের মাঝখানের বিশাল কাঠের চেয়ারে বসে থাকা লোকটি ধীরে ধীরে মুখ তুলল। যে-ই তাকে প্রথম দেখবে, ডাকাত সর্দার বলে বিশ্বাসই করতে পারবে না। লম্বা, বলিষ্ঠ দেহ। প্রশস্ত কাঁধ। শ্যামবর্ণ ত্বকে যেন রোদের ঝলক লেগে আছে। চোয়ালজুড়ে পরিপাটি ছাঁটা দাড়ি তার ব্যক্তিত্বকে আরও গম্ভীর করেছে। ঘন ভ্রুর নিচে বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ দুটি চোখ। যেন মানুষের বুক চিরে ভেতরের সত্যিটাও দেখে ফেলতে পারে। কাঁধ ছুঁয়ে নামা ঘন কালো চুল। পরা গাঢ় কালো পাগড়ি, কালো কুর্তা আর চামড়ার বর্ম। দুই হাতে মোটা রুপার বালা, কোমরে ঝোলানো দীর্ঘ এক তরবারি যার হাতলে খোদাই করা রক্তলাল পাথর।

এই মানুষটিই কাটাগিরির অপ্রতিরোধ্য ডাকাত সর্দার ফাইয়াজ আবরার।

সে গম্ভীর গলায় বলল,

"কী হয়েছে?"

লোকটি হাপাতে হাপাতে গলায় উত্তর দিল,

"রশিদ...রশিদ ফিরেনি।"

ফাইয়াজ আরাম করে বসলো।

"তারপর?"

“খুঁজতে গিয়েছিলাম সর্দার। জঙ্গলের মাঝখানে মাথা আলাদা করা অবস্থায় লাশ পড়ে ছিল।"

ফাইয়াজ ক্রোধে ধপ করে উঠে দাঁড়াল। তার বিশাল দেহের ছায়া মশালের আলোয় আরও ভয়ংকর লাগছিল।নিচু স্বরে জিজ্ঞেস করল

"কে করেছে?"

"দু'জন অচেনা অশ্বারোহী। রশিদ তাদের ডেরার দিকে আনছিল। কিন্তু তার আগেই..."

লোকটা বাকিটা বলতে পারল না। ফাইয়াজ হাত তুলে থামিয়ে দিল। তার ঠোঁটের কোণে শীতল হাসি ফুটে উঠল।

"তাহলে অবশেষে একজন যোগ্য প্রতিপক্ষ এলো।"

জানালার ভাঙা খিলান দিয়ে দূরের অন্ধকার জঙ্গলের দিকে তাকাল।

"খবর বের করো। তারা কারা। কোথা থেকে এসেছে।"

একজন ডাকাত সদস্য বলল,

"শুনেছি সাহাবাদে অতিথি হয়ে এসেছে আমিরাবাদের দুইজন।"

ফাইয়াজের চোখ সরু হয়ে গেল।

"আমিরাবাদ..."

তারপর গম্ভীর কণ্ঠে উচ্চারণ করল,

"যে আমার লোকের রক্ত ঝরিয়েছে, তার হিসাব আমি নেবই।"

তরবারি কোষ থেকে বের করে মশালের আলোয় উঁচু করে ধরল সে। ধারালো ফলায় আগুনের লেলিহান শিখা নেচে উঠল। আবরারের বজ্রকণ্ঠ ধ্বনিত হলো ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাসাদের প্রতিটি দেয়ালে

"আমি, ফাইয়াজ আবরার, শপথ করছি। সাহাবাদ কে শান্তিতে থাকতে দিব না। লুটে নেবো গোটা সাম্রাজ্যের সকল ধন। আমি হবো গোটা প্রদেশ এর সম্রাট। সব এসে আমার পায়ের কাছে পড়বে”

*****

আমিরাবাদে পৌঁছাতে পৌঁছাতে রাত নেমে এসেছে। দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে রাজপ্রাসাদের প্রধান ফটকে ঢুকতেই প্রহরীরা মাথা নত করে সালাম জানাল। ঘোড়া থেকে নেমে মেহরাব লাগামটা এক সৈনিকের হাতে তুলে দিয়ে বলল,

"ওদের ভালো করে পরিচর্যা করো। অনেকটা পথ এসেছে।"

কথা শেষ করেই নিজের কক্ষের দিকে চলে গেল সে। ধুলোবালি মাখা শরীর নিয়ে সরাসরি স্নানাগারে ঢুকে পড়ল। কিছুক্ষণ পর ভেজা চুলে, সাদা পাঞ্জাবি আর গাঢ় নীল পায়জামা পরে বেরিয়ে এলো। তার মনটা সাহাবাদ এই আটকে আছে। তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে চোখের সামনে ভেসে উঠল কালো ওড়নায় মোড়া শান্ত মুখ, নত চোখ, মিষ্টির বাটি হাতে সেই মিষ্টি মেয়ে।

বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা শেষ মুহূর্তের অপলক দৃষ্টি। অজান্তেই ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল মেহরাবের। নিজেই ফিসফিস করে বলল,

“আহহহ মায়াবতী”

“তর মুখে মু’তি”

আলীর কন্ঠে এমন অসভ্য কথা শুনে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো মেহরাব। বালুশ ছুড়ে মারার জন্য হাতে নিতেই দরজা ঠেলে কক্ষে ঢুকলেন আয়েশা বেগম। হাতের গ্লাসে গরম দুধ। ছেলেকে দেখেই মুখ ভার করলেন।

“আবার ভেজা চুল নিয়ে দাঁড়িয়ে আছিস? ক'বার বলেছি, আগে চুল মুছবি।”

আলী সোফায় গা এলিয়ে দিয়ে বলল

“রাত বিরেত গোসল করে কি বোঝাতে চাস? বিয়ের বয়স হয়ে গেছে? এখন বউ লাগবে তাই তো?”

মেহরাব চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে তারপর ব্যাঙ্গ করে বলল

“বল না, নিজের টা বলতে পারছিস না বলে আমারটা বলে বলে বোঝাতে চাচ্ছিস আসলে তোর বউ লাগবে”

আয়েশা বেগম দুজনের কথা শুনে লটকে যাবার জোগার। এগুলো মামা-ভাগনের কথা?

"এই তোরা কবে মানুষ হবি?"

“বউ হলে”

মেহরাব আঙুল তুলে বলল

“দেখেছো আম্মা দেখেছো? কথায় কথায় ওর বউ বউ করতে হয়”

আয়েশা ভাই এর দিকে তাকিয়ে বলল

“তো করবে না? বড় হয়েছে তো। বিয়ে তো দিতেই হবে। সে যাক গে। নে দুধটা খেয়ে নে”

মেহরাব জানে এর থেকে মুক্তি নেই। হাতে নিয়ে চুমুক দিল। আলী আয়েশি ভঙ্গিতে হাত পা মেলে বলল

“আমি তো বউ এর টাই খাবো”

সাথে সাথে বিশম খেলো মেহরাব। আয়েশার চোখ ছানাবড়া। আলী এক লাফে উঠে বসলো।

“এই না না না না। তোমরা যা ভাবছো তা না। আমি বউ এর হাতে খাব তাই বলেছি।”

আয়েশা বালিশ দিয়ে কয়েকটা বারি মারলো আলী কে। দৌড়ে বেড়িয়ে গেল ঘর থেকে। আয়েশা বেগম দ্রুত পানি এগিয়ে দিলেন ছেলেকে। পানি খেয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল মেহরাব।

মা পাশে বসে ভেজা চুল মুছিয়ে দিতে লাগলেন।

কিন্তু আজ ছেলের চোখ যেন রঙিণ রঙিন লাগছে আয়েশার। আয়েশা খেয়াল করলেন বিষয়টা।

“কী হয়েছে রে? এত চুপচাপ দেখাচ্ছে তোকে। কী ভাবছিস ওতো মনোযোগ দিয়ে?"

মেহরাব চমকে উঠল।

"কই না... কিছু না।"

“মিথ্যে কথা বলিস না। তোর পেটে আমি হইনি, আমার পেটে তুই হয়েছিস। তোর চোখ-মুখ অন্য কথা বলছে।"

মেহরাব হালকা হেসে বিষয়টা এড়িয়ে গেল।

এমন সময় আয়েশা বললেন,

"তুই বস, আমি খাবার নিয়ে আসি। আজ তোর পছন্দের কাবাব বানিয়েছি।"

মেহরাব মাথা নাড়ল। মা বেরিয়ে যেতেই দরজার বাইরে নূপুরের ক্ষীণ শব্দ ভেসে এল। ধীরে ধীরে দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকল জাহিদা। পরনে গোলাপি শাড়ি। ঠোঁটে কৃত্রিম হাসি। সে এগিয়ে এসে বিছানার একপাশে বসতে গেল।নমেহরাবের কণ্ঠ কঠিন হয়ে উঠল।

"দাঁড়াও"

জাহিদা থেমে গেল।

“তুমি এত রাতে এখানে কেন?"

“ভাবলাম সারাদিন বাইরে ছিলেন। একটু সময় দিই আপনাকে"

“আমার কক্ষে অনুমতি ছাড়া আর কক্ষণও প্রবেশ করবে না। মনে থাকবে?”

জাহিদার মুখের হাসি মিলিয়ে গেল।

"আমি তো শুধু…."

"শুনতে পাওনি কি বলেছি? তুমি আমার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী ছিলে। সম্পর্কে ভাসুর হই তোমার। এতটুকু মাথায় রেখে চলবে আর অকারণে আমার কক্ষে আসবে না।"

জাহিদার মুখ অপমানে থমথমে হয়ে উঠল। এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। দ্রুত বেরিয়ে গেল কক্ষ থেকে।

ঠিক তখনই আয়েশা বেগম খাবারের থালা নিয়ে ঢুকলেন।

“এইমাত্র জাহিদাকে বের হতে দেখলাম। কী হয়েছে রে? কিছু লাগলে আমাকে ডাকবি বাবা। ওকে ডাকিস না। যুবতী মেয়ে, তুই ও আইবুড়ো ছেলে। পাঁচজনে পাঁচরকম কথা বলবে। বুঝিস ই তো…”

মেহরাব চেতে উঠলো সাথে সাথে

“আম্মা আমার মস্তিষ্ক এতটাও বিকৃত নয় যে ওই মেয়েকে কোনো প্রয়োজনে ডাকবো। কারণে অকারণে ও নিজেই ঘুরঘুর করতে থাকে আমার ঘরের আশেপাশে।”

আয়েশা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। তিনি আর বিষয়টা বাড়ালেন না। ছেলের সামনে খাবার সাজিয়ে দিলেন। কিছুক্ষণ নীরবে খাওয়ার পর মেহরাব হঠাৎ বলল,

"আম্মা..."

"হুম?"

"তুমি না সবসময় বলতে, আমার জন্য মেয়ে খুঁজছ?"

আয়েশা বেগমের হাত থেমে গেল।

"হ্যাঁ। কেন?"

মেহরাব একটু ইতস্তত করে নিচের দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে বলল,

"একজনকে... ভালো লেগেছে।"

পরমুহূর্তেই আয়েশা বেগমের চোখ আনন্দে চিকচিক করে উঠল। তিনি দুই হাতে ছেলের মুখ ধরে বললেন,

“সত্যি বলছিস?"

মেহরাব লজ্জা পেয়ে মুখ ঘুরিয়ে নিলো।

"হুম।"

"কে? কোন রাজ্যের মেয়ে? নাম কী? কেমন দেখতে? কার মেয়ে?"

এক নিঃশ্বাসে এতগুলো প্রশ্ন করে ফেললেন তিনি। মেহরাব মুখ কালো করে বলল

"আম্মা... এত প্রশ্ন একসাথে?"

আয়েশা আর ধৈর্য রাখতে পারলেন না।

"আমি কালই তাকে দেখতে যাব। আমার হবু পুত্রবধূকে না দেখে আমি এক মুহূর্তও শান্তি পাব না।"

মেহরাব হেসে মাথা নাড়ল।

****

রাত অনেক গভীর। চারদিকে নিস্তব্ধতা নেমে এসেছে। প্রাসাদের প্রতিটি কক্ষে একে একে নিভে গেছে প্রদীপের আলো। টহলরত রক্ষীদের পদশব্দ ছাড়া আর কোনো শব্দ নেই। সেই সময় নিজের কক্ষের দরজা খুলল সাহারা। চারদিকে একবার সতর্ক দৃষ্টিতে তাকাল সে। সবাই ঘুমিয়ে। ঠোঁটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল।

"আজ তোদের কেউ আমায় আটকাতে পারবে না।"

আলমারির ভেতর থেকে কালো রঙের পাতলা চাদর বের করে কাঁধে জড়িয়ে নিল। কোমরে ছোট্ট একটি ছুরি গুঁজে নিল সতর্কতার জন্য। তারপর নিঃশব্দে অলিন্দ পেরিয়ে মহলের পেছনের দিকে চলে এল। সাহারা জানে, সামনের ফটক দিয়ে বের হওয়া অসম্ভব। পেছনের পুরোনো প্রাচীরের এক কোণ বহুদিনের ভাঙা। সেই পথ দিয়েই বহুবার পালিয়েছে সে।

এক লাফে নিচু দেয়ালে উঠে আরেক লাফে ওপারে নেমে পড়ল। পায়ের শব্দটুকুও হলো না।

মুক্ত বাতাসে বুক ভরে শ্বাস নিল সাহারা। উফফ সারাটা দিন কক্ষে বন্দি ছিলো। আরেকটু হলে মরেই যেত।

মাথার ওপর পূর্ণিমার গোল চাঁদ। চারদিকে রূপালি জ্যোৎস্নার বন্যা। চাদরটা মাথা থেকে সরিয়ে দিতেই ছড়িয়ে পড়ল তার দীর্ঘ সোনালি চুল। চাঁদের আলো যেন সেই চুলে আটকে গিয়ে সোনার তারের মতো ঝলমল করতে লাগল। তার গায়ের রং এতটাই ফর্সা যে জ্যোৎস্নার সঙ্গে আলাদা করে বোঝাই কঠিন। সুশ্রী মুখাবয়ব টিকালো নাক। হরিণীর মতো বড় বড় চোখ। আর সুঠাম, ছিপছিপে গড়ন। যেন কোনো শিল্পী নিখুঁত যত্নে গড়ে তুলেছে তাকে।

যে জায়গার নাম শুনে সাহাবাদের মানুষ সন্ধ্যার পর দরজা বন্ধ করে দেয়, ঠিক সেই জায়গাতেই আজ একা যাচ্ছে সে।বউত্তরের সেই বহু বছরের পরিত্যক্ত প্রাসাদ। লোকমুখে যার নামবভূতুড়ে প্রাসাদ। কেউ বলে সেখানে রাতের বেলা আলো জ্বলে আজও। কে একজন বিজ্ঞানী দের দিয়ে মানুষ কাটা ছেড়া করাতো, সেসব মানুষের কান্নাও নাকি শোনা যায়।

আবার অনেকে বলে, সাদা পোশাক পরা ছায়ামূর্তি ঘুরে বেড়ায় ভাঙা বারান্দায়। এসব গল্প শুনেই সাহারার কৌতূহল আরও বেড়েছে। সেখানে হয়তো কোনো না কোনো সত্য লুকিয়ে আছে। জ্যোৎস্নায় ভেজা সরু পথ ধরে এগিয়ে চলল সে। তার খালি পায়ের ছাপ নরম ঘাসের ওপর পড়ছে। রাতের শীতল বাতাসে সোনালি চুল উড়ে এসে বারবার মুখ ঢেকে দিচ্ছে। দূরে পেঁচার ডাক ভেসে এল। তারপর কোথাও শুকনো ডাল ভাঙার শব্দ। থমকে দাঁড়াল সাহারা। বুকের ভেতর ধুকপুকানি একটু বেড়ে গেল। সামনে তাকাতেই প্রাসাদটা দেখা গেল। ফাটল ধরা উঁচু মিনারগুলো জ্যোৎস্নার আলোয় আরও রহস্যময় দেখাচ্ছে।

লতাপাতায় ঢেকে গেছে অধিকাংশ দেয়াল।

ভাঙা জানালাগুলো দূর থেকে যেন শত শত কালো চোখ মেলে তাকিয়ে আছে। অজান্তেই সাহারার গলা শুকিয়ে এল। নিজেকেই আস্তে করে বলল,

"ভয় পেলে চলবে না সারা। এতদূর যখন এসেছিস দেখে তবেই ফিরবি।"

নিজের সাহসটুকু জড়ো করে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল সে। প্রাসাদের সামনে পৌঁছে দেখল, মরিচা ধরা বিশাল লোহার ফটক আধখোলা। হালকা বাতাস লাগতেই সেটা কঁকিয়ে উঠল ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে। রাতের নীরবতায় অস্বাভাবিক রকম স্পষ্ট শোনাল শব্দটা । সাহারা গভীর ভাবে শ্বাস নিল। তারপর দুই হাতে ঠেলে আরও একটু ফাঁক করে ভেতরে ঢুকে পড়ল।

ফটক পেরিয়ে সে এখন দাঁড়িয়ে আছে সেই রহস্যময়, বহু বছরের পরিত্যক্ত প্রাসাদের ভেতরে। চারদিকে জঙ্গল হয়ে যাওয়া বাগান।

ভাঙা মার্বেলের পথ। শুকিয়ে যাওয়া ফোয়ারা। কানে ভেসে আসে বাঁশির সুর। মনের ভিতর কুটকুট করে সাহারার

“এত রাতে এই পরিত্যক্ত প্রাসাদে বাঁশি কে বাজায়?”

সুর অনুসরণ করে এগিয়ে যেতে থাকে সে। এদিক ওদিক করে অনেকটা পথ গিয়ে দেখে সামনের পাহারের শেষ মাথায় শূন্যে পা ঝুলিয়ে বসে বাঁশি বাজাচ্ছে একজন বর্ম পরিহিত লোক।

পাখিরা তোমরা রেসপন্স করছো না কিন্তু 🥹

কেমন হলো সবাই জানিও। গেস করো তো এরপর কি হতে পারে। নতুন পাঠক রা ফলো দিয়ে রাখুন পেইজ টা। ভালোবাসা সবাইকে 🥰

#নূর_এ_সাহাবাদ

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন