🚫ডার্ক রোমান্স🚫
#আমার_শুধু_তোকেই_লাগবে
লেখা: #রুদ্র_রায়_রূপায়ন
পর্ব সংখ্যা - ০৪
.
তখন প্রায় রাত সাড়ে ১২টা বাজে !
চিত্রা বিছানার মাঝ বরাবর খাটে হেলান দিয়ে বসে আছে । হাতে তার ফোন। ফোনের স্কিনে শাওন ভাইয়া দিয়ে সেভ করা নামটা জ্বলজ্বল করে ভাসতেছে।
চিত্রা প্রায় ঘন্টাখানেক ধরে শাওনকে ফোন দেওয়ার জন্য হাসফাস করতেছে । বারবার ফোন দিবে দিবে করেও আঁটকে যাচ্ছে । মনের মধ্যে কাজ করতেছে হাজারো জড়তা।
একবার ভাবতেছে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করবে- হাতের এখন কি অবস্থা, তো আরেকবার ভাবতেছে- মানুষটা কি এতো রাত পর্যন্ত জেগে আছে? এতোরাতে ফোন দিয়ে বিরক্ত করাটা কি ঠিক হবে ? আবার ফোন দিলে না জানি কি না কি ভাবে!’ নিজের মনেই নানান কিছু ভাবতে থাকে চিত্রা।
আরো বেশ কিছুটা সময় চিত্রা তার ভাবনার জগতেই মগ্ন থকে। একপর্যায়ে চিত্রা সকল ভাবনাকে একপাশে রেখে মনস্থির করে, একবার ফোন দিয়েই দেখবে । কি ভাবে ভাবুক আর কি হয় হোক।
কারণ মানুষটাকে একবার ফোন দিয়ে তার খবর নেওয়াটা চিত্রার একান্ত কর্তব্যের মধ্যে পড়ে। যত যাই হোক, মানুষটা তখন তার জন্যই ওভাবে মারামারি করে নিজের হাতের ওমন বেহাল দশা করেছে । তাই চিত্রার উচিত মানুষটাকে একবার অন্তত ফোন দিয়ে ভলো মন্দ জিজ্ঞেস করা।
চিত্রা লম্বা একটা শ্বাস নেয়। আর মনে একবুক সাহস জুগিয়ে স্কিনে ভাসা শাওনের নাম্বারে ডায়াল করে। দুবার রিং সম্পন্ন হতেই ওপাশ থেকে ফোন রিসিভ করে শাওন। আস্তে কিন্তু খানিকটা অভিযোগের সাথে বলে উঠে,
-প্রিয় বেগম ! এতোক্ষণে তাহলে আপনার ফোন দেওয়ার সময় হলো । ”
ফোন ধরার পর প্রথমেই এমন কথা শুনে চিত্রা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লো। একমুহূর্তের জন্য তার মাথায় এসে একটা কথাই বাড়ি খায়, মানুষটা কি তাহলে এতোক্ষণ না ঘুমিয়ে তার ফোনের অপেক্ষাতে ছিল। কিন্তু কেন? ’
চিত্রা সেদিকে আর তেমন গুরুত্ব দেয় নাহ। সে ফোনের দিয়ে তাকিয়ে, মৃদুস্বরে জানতে চায়-
-কেমন আছেন ভাইয়া?”
ফোনের অপরপাশে থাকা শাওন আধশোয়া অবস্থা থেকে উঠে খাটে হেলান দিয়ে একটু আয়েশ করে বসে। কন্ঠে খানিকটা অভিমান ঢেলে বলে,
-আর ভালো থাকা ! এদিকে দিন পেরিয়ে রাতও চলে যাচ্ছে তবুও মানুষেরা একটু খোঁজ খবর নিচ্ছে না। ”
শাওনের কথা আর কথা বলার ভঙ্গিতে চিত্রা বেশ অবাক হয়, সাথে চিন্তায় পরে যায়। সে ভাবতে লাগে, মানুষটা কি রাগ করলো নাকি? এভাবে আপনি সম্মোধন করে কথা বলতেছে কেন তার সাথে? কিছুই তো তার বোধগম্য হচ্ছে নাহ।
চিত্রার চুপ থাকা দেখে অপর পাশ থেকে শাওন আবারও বলে উঠে,
-এতোক্ষণ পরে ফোন দিলেন, তাও আবার চুপ করে থাকার জন্য ? ”
শাওনের কথায় চিত্রা একটু নড়ে বসে। জানতে চায়,
-আপনার হাতের এখন কি অবস্থা ভাইয়া? ঔষধ কি নিয়েছিলেন? হাতে কি এখন ব্যাথা আছে? ”
শাওন ভরাট গলায় বলে উঠে,
-এটা জানার জন্য ফোন দিছেন ? ”
চিত্রা নরম স্বরে উত্তর দেয়,
-হুমম! ”
শাওন কিছুক্ষণ থেমে বলে উঠে,
-ভার্সিটি থেকে আসার পথে ডক্টরকে দেখিয়ে ঔষধ আর মলম নিয়েছিলাম। এখন ব্যাথা তেমন নেই বললেই চলে। ”
চিত্রা নিরবে একটা স্বস্তির নিশ্বাস ছাড়ে। কিছুক্ষণ নিরবতা পালন করার পর বলে উঠে,
-আচ্ছা ভাইয়া, এখন তাহলে রেস্ট নিন। রাখলাম আমি… ” বলে চিত্রা কল কাটতে নিলেই শাওন স্বাভাবিক, কিন্তু গভীর স্বরে ডেকে উঠে,
-চিত্রা! ”
শাওন এভাবে হঠাৎ চিত্রার নাম ধরে ডাকায় চিত্রার বুকটা ধুক করে উঠে । শাওন সচরাচর চিত্রার নাম ধরে খুব কম ডাকে। বুঝ হওয়ার পর থেকে শাওনের কাছ থেকে সে বেগম ডাক শুনেই অভস্ত । শেষ কবে শাওন চিত্রার নাম ধরে ডেকেছিল, তা চিত্রার মনে পড়তেছে নাহ। যার কারণে আজকে হুট করে চিত্রার নাম ধরে ডাকায় চিত্রা কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে যায় । সে কোনো রকমে শাওনের কথার জবাব দেয়,
-হুমম ভাইয়া! ”
শাওন ভীষণ ঠান্ডা গলায় বলে,
-তুই কি ব্যস্ত আছিস? আমার সাথে কথা বলার মতো কি একটু সময় হবে তোর কাছে? ”
শাওনের বলা শেষের দিকের কথাটা কিছুটা অনুরোধের মতো শোনায় । শাওনের কথায় চিত্রার শরীর কিছুটা কেঁপে উঠে৷ সে ভাবনায় পড়ে যায়- মানুষটার কথা গুলো আজকে এমন শোনাচ্ছে কেন? কোনো কারণে কি উনার মন খারাপ? নাকি খুব বেশি অসুস্থ হয়ে পড়েছেন? আর এমন আবদারই বা করতেছে কেন? ” শাওন এমন আবদার এর আগে কখনো করেছে বলে চিত্রার মনে পরতেছে নাহ!
এরিমধ্যে আবারও ওপাশ থেকে শাওনের শীতল কণ্ঠস্বর ভেসে আসে,
- তখন ছেলেটাকে মেরে আমি কি কোনো ভুল করেছিলাম চিত্রা? আচ্ছা ছেলেটার জন্য তোর মনের মধ্যে কি কোনো ধরনের অনুভূতি আছে ? আমি কি তাকে মেরে নিজের অজান্তেই তোর কোনো ক্ষতি করে ফেলেছি?”
চিত্রা এবার ভীষণ অবাক হয় । সে বুঝে উঠতে পারে নাহ, শাওন এগুলো ঠিক কি বলতেছে! তার মাথা কি আদৌও ঠিক আছে? সে ছেলেটাকে মেরে কোনো ভুল করেছে কি না চিত্রা সেটা নিজেও জানে নাহ! তবে চিত্রার মনে ওই ফারহান নামের ছেলেটার জন্য কেন কোনো অনুভূতি থাকতে যাবে। যাকে কোনোদিন দেখেছে কি না তাই মনে করতে পারতেছে নাহ, তার জন্য আবার অনুভূতি! বিষয়টা চিত্রার কাছে হাস্যকর মনে হলো ।
তবে শাওনের জন্য যে চিত্রার মনের মধ্যে কোথাও একটা কিছু লুকিয়ে আছে, তা চিত্রা মাঝে মধ্যে বেশ বুঝতে পারে ।
এদিকে চিত্রার নীরবতা দেখে, শাওন আবারও বলে উঠে,
-জানিস ভার্সিটি থেকে আসার পর থেকে কেন জানি নাহ হঠাৎ করেই নিজেকে খুব অপরাধী মনে হওয়া শুরু করলো। বারবার মনে হচ্ছিলো আমি হয়তো কোনো বড় ভুল করে ফেললাম ।” কিছুটা থেমে- তবে বিশ্বাস কর, তখন তোকে যদি ওভাবে খারাপ ভাষায় গালি না দিতো, তাহলে আমি এতোটা রেগে কখনোই যেতাম নাহ। ওই জানোয়ারটা তোকে ওভাবে বলাতে আমার মাথায় পুরো র*ক্ত উঠে গেছিলো। আমি নিজেকে কোনো মতেই কন্ট্রোল করতে পারিনি। ” বলে একটা দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে শাওন। কিছুক্ষণ পর অপরাধী গলায় বলে উঠে- তুই আমাকে ক্ষমা করে দিস চিত্রা। আসলে আমি…. ”
শাওনের কথার মাঝ পথেই বলে উঠে চিত্রা,
-আপনি কোনো ভুল করেননি ভাইয়া। আপনি যা করেছেন একদম ঠিক করছেন । তাই আপনার ক্ষমা চাওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে নাহ। আর আপনি নিজেকে একদম অপরাধী ভাববেন নাহ। আপনি কোনো অপরাধ করেননি ভাইয়া ।” এতটুকু বলে একটা লম্বা শ্বাস নেয় চিত্রা। এবার একটু করুন স্বরে বলে উঠে,
-তখন যদি আপনি না আসতেন, জানি না আমার কি হতো । আপনাকে অনেক ধন্যবাদ ভাইয়া। ”
চিত্রার কথা শুনে শাওনের মনে হয় তার বুক থেকে একশ মন ওজন হালকা হয়ে গেলো। সে বুকভরে একটা প্রশান্তির শ্বাস নিল। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো একটা স্নিগ্ধ হাঁসির রেখা।
ভীষণ আদুরে গলায় বলে উঠলো,
-আমি বেঁচে থাকতে তোর কখনো কোনো কিছু হতে দিব না চিত্রা ৷ সবসময় তোর বিপদে ধাল হয়ে তোর সামনে দাঁড়াবো আমি । শুধু অনুরোধ, তুই কখনো আমাকে ভুল বুঝিস নাহ। নয়তো সত্যি একেবারে শেষ হয়ে যাবো আমি । ”
চিত্রা এবার খানিকটা ধমকের স্বরে বলে উঠে,
-এমন কথা একদম বলবেন না ভাইয়া। এসব কথা বলতে হয় নাহ। আপনার কিচ্ছু হবে নাহ। ”
চিত্রার কথা শুনে মুচকি হাঁসে শাওন।
-আচ্ছা বেগম, আর বলবো নাহ । ”
চিত্রা নিরবে হেঁসে দেয়, কিন্তু আর কোনো কিছু বলে নাহ। এদিকে শাওন এবার উপুর হয়ে একটা বালিশের উপর বুকের সমস্ত ভর ছেড়ে দিয়ে বিছানার কোনাকোনি হয়ে শুয়ে পড়ে। আর মৃদু স্বরে বলে উঠে,
-তা মেডাম এই অধমের খবর নেওয়ার জন্য ফোন দিলেন তাও আবার এতো দেরিতে ? ”
চিত্রাও খানিকটা নড়েচড়ে বসে বলে উঠে,
-আসলে ভাইয়া, তখন ভার্সিটি থেকে আসার পর ফ্রেশ হয়ে ঘুমিয়ে পরেছিলাম। আর ঘুম থেকে উঠতে প্রায় ৮টা বেজে গেছে। তারপরে রাতের খাবার খাওয়া শেষ করে মা আর ভাইয়ার সাথে কিছুক্ষণ কথা বলছিলাম । যার কারণে আপনাকে ফোন দিতে দেরি হয়ে গেছে । ”
শাওন উপুর হওয়া থেকে চিৎ হয়ে শুয়ে রুমের ছাঁদে দৃষ্টি রাখে। ফোন কানে ধরে । আর দুপাটি দাঁত বের করে হেঁসে বলে উঠে,
-যাক মহারানি আমার কথা রেখেছেন এটাই অনেক। ”
শাওনের সাথে সাথে হেঁসে উঠলো চিত্রাও। এরপরে তারা আরও কিছুক্ষণ তাদের কথোপকথন চলমান রেখে কল কেটে দেয় ।
.
দেখতে দেখতে ফ্রেব্রুয়ারি মাসটা যেন চোখের পলকেই চলে গেলো।
আজকে এপ্রিলের তিন তারিখ । ইনায়ার জন্মদিন । ইনায়া হলো চিত্রার বড় মামার মেয়ে।
চিত্রার বড়মামা-মামি বারবার চিত্রার বাবা-মা এবং তার ভাইকে সহ তাকে তাদের বাসায় যেতে বলেন। এদিকে ইনায়ার তো মনে হয় একশো বারের মতো চিত্রাকে ফোন করা শেষ।
চিত্রার দুই মামা।
বড়মামার নাম ইকবাল চৌধুরী এবং মামানি শাহানাজ চৌধুরী । ইকবাল চৌধুরীর এক ছেলে এক মেয়ে। আবরার শাওন চৌধুরী আর ইনায়া চৌধুরী । ইনায়া চিত্রার থেকে দেড় বছরের ছোট। আজ থেকে তার আঠারো বছর পূর্ণ হবে। সে ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পরে। আর এদিকে শাওন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে অনার্স শেষ করে মাস্টার্স করতেছে ।
অপরদিকে - চিত্রার ছোটমামার নাম ইরফান চৌধুরী এবং ছোট মামানি ফাহমিদা চৌধুরী । তাদেরও এক ছেলে এক মেয়ে। মেয়ের নাম জান্নাত চৌধুরী আর ছেলের নাম আয়াতুল চৌধুরী আয়াত । জান্নাত এবার নবম শ্রেণিতে পড়ে। আর আয়াত সবেমাত্র ক্লাস থ্রী’তে। শাওনের একমাত্র ভক্ত আয়াত । শাওন বলতে পাগল প্রায় এই ছেলে ।
ইকবাল চৌধুরী এবং ইরফান চৌধুরীর একমাত্র বোন জাহানারা বেগম হওয়ায়, বরাবরই তিনি ছিলেন বেশ আদরের । আর সেটা এখনো চলমান ।
.
বিকেলের দিকে চিত্রা কবির আর জাহানারা বেগম তাদের চার চাকার গাড়িতে করে শাওনদের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
রাস্তায় তেমন জ্যাম না থাকার কারণে মিরপুর থেকে গুলশানে আসতে খুব বেশি সময় লাগে নাহ তাদের ।
গুলশান-২ এর বুক চিড়ে আভিজাত্যের ছোঁয়া নিয়ে মাথা চাড়িয়ে দাড়িয়ে আছে শাওনদের সেই বিশালাকৃতির কংক্রিটের দোতলা অট্টালিকা।
চিত্রাদের গাড়িটা শাওনদের সেই অট্টালিকার গেটের সামনে আসতেই দু’জন কালো ড্রেস পড়া মানুষ তড়িঘড়ি করে দুই পাল্লার বড় আকৃতির গেটটা খুলে দিল।
গাড়ি বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করতে করতে জানালার ফাঁক দিয়ে চিত্রার চোখ পড়লো, গেটের সামনে মার্বেল পাথরে বড় করে খোদাই করা “চৌধুরী ম্যানশন” নামটার উপর।
“চৌধুরী ম্যানশন” আর “চৌধুরী গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ” শাওনদের গৌরব ৷
ইকবাল চৌধুরীর বাবা শাহাদাত চৌধুরী নিজ হাতে এই দু'টো জিনিসকে গড়ে তুলেছেন । যা এখন তার অনুপস্থিতিতে তার দুই ছেলে ইকবাল চৌধুরী এবং ইমরান চৌধুরী সামলায়।
দেশের প্রথম সারির পাঁচটি নামকরা কোম্পানির মধ্যে চৌধুরী গ্রুপ অফ ইন্ডাস্ট্রিজ একটা । দেশসহ বিদেশের মাটিতেও তাদের বেশ নাম ডাক।
চিত্রাদের গাড়িটা গেট পেরিয়ে বাড়ির সামনে এসে থামতেই গাড়ি থেকে নেমে পড়ে তারা। চিত্রার চোখ যায় বাড়ির একপাশে লাইন করে দাড়িয়ে থাকা চারটা দামি ব্রান্ডের নান্দনিক গাড়ির দিকে। তাদের পাশেই দাঁড়ানো আছে দু'টো বাইক। একটা Yamaha R15M আর অপরটা Royal Enfield Classic 350 মডেলের । বাইক দুটো শাওনের। চিত্রা এটা জানে।
চিত্রা চারিপাশে আরও একবার চোখ বুলিয়ে নেয়। বিশালাকৃতির বাড়িরটার একপাশে সারি সারি করে গাড়িগুলো পার্ক করা। আর একপাশে একটা মাঝারি আকারের সুইমিং পুল । সুইমিংপুলের এক সাইটে একটা গোল টেবিল আর বেতের চেয়ার গুলো সুন্দর করে সাজানো। বাড়ির দেওয়াল ঘেঁসে সুন্দর করে ফোটে আছে বিভিন্ন ধরনের ফুল।
চিত্রার মামার বাড়ি বরাবরই তার ভীষণ পচ্ছন্দের ৷ তবে এই বাড়িটাকে আসলে একটা রাজপ্রাসাদ বললে কোনো অংশে ভুল হবে নাহ।
চিত্রা জাহানারা বেগম আর কবির কে উদ্দেশ্য করে, তাদের পেছন পেছন গুনে গুনে পাঁচটা সিড়ি অতিক্রম করে বাড়ির ভেতরে প্রবেশ করে। বাড়ির বাইরের থেকে ভেতরটা যেন আরও বহুগুণে চোখ ধাঁধানো সৌন্দর্যে মন্ডিত। ধবধবে সাদা বাড়ির ভেতর জুড়ে আধুনিকতা আর আভিজাত্যের ছোঁয়ায় ভরপুর । দেয়ালের প্রতিটা কোণা থেকে শুরু করে যেদিকেই চোখ যায়, শুধু আভিজাত্য আর রুচিবোধের পরিচয় পাওয়া যায়। পুরো বাড়িটা কি সুন্দর পরিপাটি আর সাজানো গোছানো।
চিত্রারা ভেতরে প্রবেশ করা মাত্র ইনায়া জাহানারা বেগমকে সামাল দিয়ে দৌড়ে আসে তাকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠে,
-এতোক্ষণে তাহলে তোমাদের আসার সময় হলো আপু । জানো কখন থেকে তোমাদের আসার অপেক্ষাতে ছিলাম। ”
ইনায়ার কথা বলার ভঙ্গি দেখে হেঁসে ফেলে চিত্রা।
তার পিঠে হাত রেখে মুচকি হেঁসে বলে,
-এইতো এবার চলে এসেছি আমরা, আর অপেক্ষা করতে হবে নাহ! ”
এবার উপর থেকে সিড়ি বেয়ে একযোগে দৌড়ে নেমে আসে জান্নাত আর আয়াত । জান্নাত গিয়ে জরিয়ে ধরে চিত্রাকে। আর আয়াত তো একবারে একলাফে গিয়ে কবিরের কোলে উঠে বসে। ভীষণ খুশিতে বলে উঠে,
-ইয়েয়য়য়… ভাইরায়া চলে আসছে।”
তার কান্ডে উপস্থিত সবাই হেঁসে দেয়৷ কবির আয়াতকে কোলে নিলে আয়াত দু'হাতে তার গলা জড়িয়ে ধরে। কবির তার মামানিদের উদ্দেশ্যে সালাম দিয়ে ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করে ৷ এরপরে সোফায় বসতে বসতে আয়াতের উদ্দেশ্যে বলে উঠে,
-আয়াত, তুই তো কয়দিনে অনেক বড় হয়ে গেছিস ম্যান! এতো তারাতাড়ি এতো বড় হলি কি করে বল তো? কি খাচ্ছিস তুই? আমাকেও একটু বল, আমিও তোর মতো বড় হতে চাই! ”
কবিরের মজার ছলে বলা কথা শুনে তার মুখের দিকে তাকায় আয়াত । খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠে। আর কবিরের দুগালে দু'হাত রেখে আধোআধো স্বরে বলে উঠে,
-আমি প্রতিদিন হরলিক্স খাই, কমপ্লেন খাই, দুধ খাই আর ডিম খাই- তাই তারাতাড়ি বড় হয়ে যাচ্ছি। ”একটু থেমে ভাবুক দৃষ্টিতে কবিরের দিকে তাকিয়ে আবারও বলে,
- তুমি তো এমনিতেই অনেক বড় ভাইয়া। তোমার আর বড় হতে লাগবে না তে ।”
কবির হেঁসে দেয়। একটু অবাক হওয়ার ভান করে বলে উঠে,
-ওহ হে ঠিকি তো! আমি তো এমনিতেই বড় হয়ে গেছি। আমার তো মনেই ছিল নাহ। ”
কবিরের কথায় আবারও খিলখিলিয়ে হেঁসে উঠে আয়াত।
অপরদিকে জাহানারা বেগম- শাহনাজ চৌধুরী আর ফাহমিদা চৌধুরীর সাথে ভালো মন্দ কথা বলতে শুরু করে দেয় । কথার মাঝে আমজাদ আহমেদ আসেনি কেন জানতে চাইলে, জাহানারা বেগম জানান, অফিসের কাজে নাকি খুব ব্যস্ত। তাই আসতে পারবেন না ।
ইকবাল চৌধুরী আর ইরফান চৌধুরী এখনো অফিসেই আছেন।
চিত্রা চারিপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নেয় । দেখে তার মা আর মামানিরা ইতিমধ্যে সোফার মধ্যে বসে গল্পের আসড় জমিয়ে ফেলেছেন। আর একদিকে আয়াত আর কবির হাঁসি আর খুনশুটিতে মত্ত ।
এদিকে চিত্রার চোখ মনে মনে একজনকে খুঁজতে থাকে কিন্তু পায় নাহ ৷ যার কারণে কিছুটা হতাশ হলেও, সেটা প্রকাশ করে নাহ ।
এদিকে ইনায়া তার জন্মদিনের জামা চিত্রাকে দেখানোর জন্য একপ্রকার টানতে টানতে সিঁড়ি বেয়ে তার রুমের দিকে নিয়ে যেতে শুরু করে । ইয়ানার রুমের পাশেই ছাঁদে যাওয়ার সিঁড়ি। চিত্রা সিঁড়ি বেয়ে ইয়ানার রুমের দিকে অগ্রসর হতেই তার চোখ আঁটকে যায় ছাঁদের সিঁড়ির দিকে । একটা এ্যাশ কালার থ্রি-কোয়াটার পেন আর সাদা রঙের হাতা ছাড়া স্লিভলেস টি-শার্ট পরে নিচে নামছে শাওন। শাওনের জিম করা ফুলা ফুলা অ্যাবস আর লোমযুক্ত লম্বা পা-দুটো হাঁটু পর্যন্ত একেবারে উন্মুক্ত । কপাল আর নাক জুড়ে বিন্দু বিন্দু ঘামের আস্তরণ । শরীরে পরে থাকা সাদা রঙের টি-শার্টটাও বুক বরাবর ঘামে ভিজে শরীরের সাথে লেপ্টে আছে । ছাঁদে জিম ঘর হওয়ায় চিত্রার মনে পরে, মনে হয় জিম করা শেষ করে নিচে নামছেন ।
শাওনের চুল আর দাঁড়ি গুলো সেই বরাবরের মতোই সাজানো গোছানো । সবকিছু মিলিয়ে শাওনকে অসম্ভব সুন্দর দেখাচ্ছে । একেবারে পুরো হট একটা লুক।
শাওন কে এভাবে দেখে চিত্রার শরীর কেঁপে উঠে । বুক ধুকপুক করতে শুরু করে।
সে একদৃষ্টিতে শাওনের দিকে তাকিয়ে থাকে । এভাবে শাওনকে অনেকদিন পর দেখলো আজ।
শাওনও ছাঁদ থেকে নিচে নামার সময় হঠাৎ চিত্রাকে দেখে কিছুটা থমকে যায়। মুহূর্তেই তার ঠোঁটের কোণে হাঁসি ফুটে উটে। মনের মধ্যে হাজারো ভালো লাগারা ডানা ঝাপটানো শুরু করে। সে চিত্রার দিকে তাকিয়েই নীরবে ধীর পায়ে সিঁড়ি ডিঙিয়ে নিচে নামতে থাকে।
হঠাৎ ইনায়ার হেঁচকা টানে চিত্রার হুশ ফিরে । সে চোখ নামিয়ে নেয়। ইনায়ার সাথে তার রুমে প্রবেশ করে। আর তাদের পেছন পেছন জান্নাতও আসে। এরপরে ইনায়া তার জন্মদিনের জন্য কেনা প্রত্যেকটা জিনিস চিত্রাকে দেখানো শুরু করে।
.
রাত তখন ১০টা বেজে ৩০মিনিট!
সকলের উপস্থিতিতে বেশ হই হুল্লোড় করে ইনায়ার জন্মদিনের কেক কাটা হয়।
জন্মদিন উপলক্ষে বেশ সুন্দর করেই সাজানো হয়েছে বাড়িটা। যদিও জন্মদিনে তেমন কাউকে বলা হয়নি। কিন্তু তবুও আয়োজনের কোনো কমতি রাখেননি ইকবাল খান। একমাত্র মেয়ের ১৮তম জন্মদিন বলে কথা।
এখানে আমন্ত্রিত মানুষ বলতে শুধু চিত্রাদের পরিবার আর ইনায়ার মামি ও তার দুই মেয়ে, মিথি আর মাহি এসেছেন । মিথি শাওনের সমবয়সী আর মাহি ইনায়ার থেকে দুই বছরের বড় । তারা রাতের দিকে এসেছেন।
জান্নাতের মামার বাড়ির লোকজনদের আসার জন্য বলা হলেও তারা কোনো কারণ বসত আসতে পারেনি।
জন্মদিনের অনুষ্ঠান শেষে তারা সকলে খাওয়ার জন্য বসে । ডাইনিং টেবিলটা বেশ বড়সড় হওয়ায় সকলের জায়গা অনায়াসে হয়ে যায় । খেতে বসার সময় চিত্রা খুব ভালো করেই লক্ষ করে মাহি নামের মেয়েটা কেমন যেন একটু গায়ে পড়া স্বভাবের ।
চিত্রা শাওন পাশের খালি চেয়ারটাতে বসতে উদ্যত হতেই সে যেন একপ্রকার হামলে পড়ে শাওনের পাশের চেয়ারটাতে গিয়ে বসলো। তবে এতে শাওন চরম বিরক্ত হলো সাথে রেগেও গেলো কিছুটা । কিন্তু সে কিছু প্রকাশ করলো না। রেগে যাওয়ায় তার কপাল বরাবর একটা মিহি রগ কিছুটা ফুলে উঠলো।
চিত্রা কেক কাটার সময়ও লক্ষ্য করেছিল, মাহি নামের মেয়েটা সবসময়ই শাওনের কাছে চিপকে চাপকে থাকতেছিল। শাওনকে কেক খাওয়াতে গিয়েও কেমন যেন শাওনের উপর হামলে পরতেছিল, আর কতই না ঢং । বিষয়টা কেন জানি না, চিত্রার মোটেও পচ্ছন্দ হয় নাহ । তার মন খারাপ হয়। বুকের কোথাও সে একটা অজানা ব্যাথা অনুভব করে। কিন্তু সেটাকে সে সেভাবে পাত্তা দেয়না ।
চিত্রা ছোট বেলা থেকেই মামার বাসায় আসলে, শাওনের পাশের চেয়ারটাতে বসেই খাবার খায়। এক কথায় সে মামার বাড়ি আসলে শাওনের পাশের চেয়ারটা তার জন্য বরাদ্দ থাকতো ।
আজকে হঠাৎ তার ব্যতিক্রম হওয়ায়, না চাইতেও তার মন কিছুটা খারাপ হয়ে যায়। কিন্তু কিছু প্রকাশ করে না সে । নিরবে গিয়ে জান্নাত আর আয়াতের মাঝখানের চেয়ারটাতে বসে।
সাদা পোশাক পরিহিত দুটো মানুষ তাদের উদ্দেশ্যে খাবার পরিবেশন করা শুরু করে ।
বেশ গল্প গুজব, হাঁসি মজার মধ্যেই তারা সকলে খাওয়া শেষ করে।
তবে সবাই কথা বললেও- শাওন একটা কথাও তার মুখ দিয়ে বের করে নাহ। সে খেতে বসার কিছুক্ষণ পরেই অল্প খেয়ে উঠে নিজের রুমে চলে যায় ।
খাওয়া শেষে বড়রা সকলে আবারও কিছুক্ষণ গল্পের আসর জমায়। আর ছোটরা যে যার মতো কেউ ফোন নিয়ে ব্যাস্ত তো আবার কেউ মজার মজার গল্প আর হাঁসিতে ।
রাত প্রায় অনেক হওয়ায় সকলে এবার যে যার মতো ঘুমাতে চলে যায়।
.
ইনায়ার বিছানার একপাশে শুয়ে আছে চিত্রা আর একপাশে ইনায়া। ইনায়া ইতোমধ্যে ঘুমিয়ে পড়েছে। তখন ওভাবে নাচানাচি করায় মেয়েটা বেশ ক্লান্ত হয়ে গেছে । যার কারণে বিছানায় শোয়া মাত্র রাজ্যের ঘুম এসে ভর করে তার চোখে।
আর এদিকে চিত্রা বিছানার এক কোনায় শুয়ে নানান ভাবনায় মত্ত ।
আজকে সে আসার পর থেকে একবারও তার সাথে কথা বলেনি শাওন।
এতে চিত্রার মন খারাপ না হলেও, চিত্রার মন খারাপ হয় মাহির কথা মাথায় আসলে। মেয়েটা ওমন কেন?
চিত্রা যখন হাজারটা ভাবনায় মত্ত, ঠিক তখনি তার ফোন মেসেজের শব্দে বেজে উঠে ।
চিত্রা বালিশের পাশ থেকে ফোন হাতে নিয়ে দেখে শাওনের হোয়াটসঅ্যাপ নাম্বার থেকে আসা মেসেজ । যাতে গুটি গুটি অক্ষরে লেখা- “ প্রিয় বেগম, জানি আপনি এখনো ঘুমাননি ! তাই এই অধম আপনাকে জলদি’ই ছাঁদে আসার অনুরোধ জানাচ্ছে ! ”
মেসেজটার দিকে চিত্রা কিছুক্ষণ বোকার মতো একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে । আর ভাবতে থাকে এতো রাতে ছাঁদে যেতে বলার কারন কি।
বেশ কিছুক্ষণ যাবে কি যাবে না এই নিয়ে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগে চিত্রা। এরিমধ্যে মোবাইলে আরেকটি মেসেজ আসে- “ আপনার অপেক্ষাতে আছি প্রিয় বেগম ! আশা করি নিরাশ করবেন নাহ। ”
কিছুটা সময় পর চিত্রা এবার বিছানা থেকে উঠে দাঁড়ায়। ওড়নাটা ঠিকভাবে গায়ে জড়িয়ে নিয়ে ছাঁদের উদ্দেশ্যে রওনা হয়।
ছাঁদের দরজার সামনে আসতেই তার পা-জোড়া থেমে যায় । পুরো ছাঁদ জুড়ে অন্ধকার । ছাদের এক কোনায় শুধু একটা হলুদ রঙের ট্রিম লাইটের আলো ছাড়া আর কোথাও কোনো আলো নেই। তবে সেই লাইটের আলো শুধু সেই জায়গাতেই সীমাবদ্ধ ।
চিত্রা ভয় ভয় পা নিয়ে কিছুটা সামনে এগোতেই, অন্ধকারময় ছাঁদের বুক চিরে উদিয়মান হয় শাওন।
চিত্রাকে দেখা মাত্রই কোনো বাক্য বিনিময় ছাড়াই নিজের প্রশস্ত বুকে খুব শক্ত করে জরিয়ে ধরে তাকে….
.
চলবে…
⚠️গল্প কপি করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ⚠️
🚫🚫 গল্পটা শুধু প্রাপ্তবয়স্ক আর মুক্তমানদের জন্য উন্মুক্ত । গল্পে ধীরে ধীরে রোমান্টিকতার বিষয়টা একটু বেশি আর গভীর হবে । তাই যাদের এসব পচ্ছন্দ নয়, তারা দয়াকরে এড়িয়ে চলবেন। 🚫🚫