ফন্ট সাইজ:
থিম:
আমার শুধু তোকে লাগবে

৮ম পর্ব

লেখক: রুদ্র রায়

🚫ডার্ক রোমান্স🚫

#আমার_শুধু_তোকেই_লাগবে

লেখা: #রুদ্র_রায়_রূপায়ন

পর্ব সংখ্যা - ০৮

.

⚠️গল্প কপি করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ⚠️

চৌধুরী ম্যানশন থেকে চিত্রাদের বাড়ি আসার আজ নিয়ে ১৩-দিন হলো ।

এই ১৩-দিনে শাওনের সাথে চিত্রার ফোনে কোনো যোগাযোগ হয়নি । শুধু ভার্সিটিতে গেলে দেখা হতো আর না গেলে নাই ।

আজকে শুক্রবার । ভার্সিটি বন্ধ । তাই চিত্রা বেশ বেলা পর্যন্ত ঘুমায় । সে ঘুম থেকে উঠতে উঠতে প্রায় ১০টা বেজে যায়। ঘুম থেকে উঠার পর চিত্রা ফ্রেশ হয়ে নিচে নেমে আসে। আমজাদ আহমেদ তখন সোফায় বসে খবরের কাগজ পড়তেছেন। আর কবির তার পাশের সোফায় বসে ল্যাপটপে কিছু একটা করতেছে ৷

চিত্রা গিয়ে আমজাদ আহমেদের পাশে বসে। আর তার মাথাটা আমজাদ আহমেদের কাঁধে এলিয়ে দেয়। আমজাদ আহমেদ খবরের কাগজ সরিয়ে মেয়ের দিকে তাকায় । মিষ্টি গলায় জিজ্ঞেস করে,

-ঘুম ভালো হয়েছে আম্মু? ”

চিত্রা আমজাদ আহমেদের একহাত আঁকড়ে ধরে উত্তর দেয়,

-হে আব্বু । ”

ময়নামতি রান্নাঘর থেকে এক কাপ কফি নিয়ে আসে চিত্রার উদ্দেশ্যে এগিয়ে দিয়ে আবারও রান্নাঘরে চলে যায় ।

আমজাদ আহমেদ চিত্রার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলে উঠে,

-তোমার সাথে কথা ছিল আম্মু! এখনি বলবো নাকি কিছু সময় পরে বলবো ? ”

চিত্রা মাথা তুলে তার বাবার দিকে তাকায়। বেশ আগ্রহ নিয়ে বলে উঠে,

-এখনি বলো আব্বু ! আমি শুনার জন্য একেবারে প্রস্তুত। ”

আমজাদ চৌধুরী হেঁসে দেন। একপলক কবিরের দিকে তাকিয়ে বলে উঠেন,

-তোমার ভাইয়ার জন্য আমরা একটা মেয়ে ঠিক করেছি । মেয়েটা মোটামুটি আমাদের সবারই পচ্ছন্দের । এখন শুধু তুমি মত পোষণ করলেই হয়ে যাবে । তোমার ভাইয়া এবং আমরাও তোমার সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় আছি। সেরকম হলে আমরা আজ বা কালকের মধ্যেই মেয়েটার বাসায় গিয়ে পাকা কথা বলে আসবো ।”

চিত্রা আমজাদ আহমেদের কথায় ভীষণ অবাক হয় । তার ভাইয়ের বিয়ে! তারা তার জন্য মেয়ে ঠিক করে ফেলেছে । সে মত পোষণ করলেই পাকা কথা বলবে! এসব ভাবতেই তার মন খুশিতে নেচে উঠে । তার ভাইয়ের বিয়ে। তাদের বাসায় একজন নতুন সদস্য আসবে । এসব ভাবতেই চিত্রার যেন খুশিতে কোনো অন্থ নেই। চিত্রা একবার আমজাদ আহমেদ তো একবার কবিরের দিকে তাকিয়ে অবাক গলায় বলে উঠে,

-ভাইয়ার বিয়ে ! তুমি সত্যি বলছো আব্বু ? ”

আমজাদ আহমেদ মিষ্টি একটা হাঁসি দিয়ে পুনরায় বলে উঠে,

-হে আম্মু । মেয়ে দেখতে ভীষণ মিষ্টি । তুমিও চেনো তাকে! ”

এবারে চিত্রা যেন আগের তুলনায় আরও বেশি পরিমাণে অবাক হয় । সে আমজাদ আহমেদের উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ে,

-মেয়েকে আমি চিনি ? কিন্তু কিভাবে? কে সে আব্বু ?”

জাহানারা বেগম রান্নাঘর থেকে এসে শাড়ির আঁচল দিয়ে কপালের ঘাম গুলো মুছে নেয়। সোফায় বসতে বসতে চিত্রার উদ্দেশ্যে বলে উঠে,

-মেয়েটা হলো শাওনের মামাতো বোন মিথি। সেদিন যে ইনায়ার জন্মদিনে আসলো দেখেছিস তো! ”

চিত্রার চোখে মুখে একঝাঁক খুশির ঝলক বয়ে যায়। সে মিথিকে খুব ভালো করেই চিনে। খুবই ভালো, শান্তশিষ্ট আর মিষ্টি একটা মেয়ে। মিথির ছোট বোন মাহিকে চিত্রার যতটা না অপচ্ছন্দ, মিথিকে ঠিক তার ততটাই পচ্ছন্দ । আর মিথি মোটেও মাহির মতো নাহ । মিথি একেবারে অন্যরকম। খুবই মিশুক, শান্তশিষ্ট আর ভালো একটা মেয়ে । মাঝে মাঝে চিত্রা ওদেরকে দেখলে ভাবতো- এরা দুইজন একই মায়ের পেটের বোন হয়েও এদের ব্যবহারে কেন এতোটা অ-মিল।

সেদিন ইনায়ার জন্মদিনেও মিথি চিত্রাকে কতটাই না স্নেহ করলো, কি সুন্দর করে কত সময় গল্প করলো। কিন্তু মাহি ! তার কথা আর না বলাই ভালো।

জাহানারা বেগমের কথায় চিত্রা উচ্ছাস নিয়ে কিছুটা জোরে বলে উঠলো,

-মিথি আপু! মিথি আপুর সাথে ভাইয়ার বিয়ে হবে? ”

জাহানারা বেগম বলে উঠেন,

-বিয়ে হবে কি না, সেটা তো তাদের বাসায় গিয়ে দেখাশুনা করে, কথা বলেই বুঝা যাবে। ”

চিত্রা এবার দৌঁড়ে তার ভাইয়ের কাছে গিয়ে গলা জড়িয়ে ধরে বলে উঠে,

-ভাইয়া তোমার তাহলে এবার বিয়ে হচ্ছে! বাসায় নতুন ভাবি আসবে । উফফ ভাবতেই যে আমার কি মজা হচ্ছে ! ”

চিত্রার কথায় কবির নিরবে হেঁসে দেয় । আমজাদ আহমেদ কবিরের উদ্দেশ্যে আবারও প্রশ্ন ছুঁড়ে,

-বাবা তোমার এতে কোনো অমত নেই তো নাহ? থাকলে বলো, আমরা আর কথা এগোবো নাহ। ”

কবির ল্যাপটপ থেকে মুখ তুলে আমজাদ আহমেদের উদ্দেশ্যে আশ্বাসের সুরে জবাব দেয়,

-আব্বু আমার এতে কোন অমত নেই ৷ তোমাদের যেহেতু সবারই পচ্ছন্দ হয়েছে তাই আমার এতে অপচ্ছন্দ করার কোনো প্রশ্নই আসে নাহ। সবচেয়ে বড় কথা হলো, আমার বোনের পচ্ছন্দ হইছে, তারমানে নিসন্দেহে সে ভালো মেয়ে । ”

কবিরের কথায় আমজাদ আহমেদ আর জাহানারা বেগম ভরসা পায়। তাদের মুখে হাঁসি ফুঁটে।

চিত্রা আবারও খুশিতে গদগদ হয়ে বলে উঠে,

-মিথি আপু সত্যি অনেক ভালো মেয়ে ভাইয়া । ভীষণ মিষ্টি, আর আমাকে তো অনেক আদর করে । ”

কবির ল্যাপটপের দিকে চোখ রেখেই মুচকি হাঁসে । আমজাদ আহমেদ পকেট থেকে ফোন বের করতে করতে সবার উদ্দেশ্য বলে উঠে,

-আমি তাহলে একবার আনোয়ার হোসেনকে ফোন দিয়ে দেখি । উনি কি বলে। ”

আমজাদ আহমেদ আনোয়ার হোসেন কে ফোন দেয়। ফোন দিয়ে কিছুক্ষন তারা কথা বলে।

এরপরে ফোন কেটে হাঁসি মুখে জানায় তারা আজকেই তাদেরকে যেতে বললো।

তবে এই বিয়ের বিষয়ে অবশ্য আমজাদ আহমেদ আর আনোয়ার হোসেনের মধ্যে আরও আগেই কথা হয়েছিল। তাই আনোয়ার হোসেন বিষয়টা সমন্ধে আরও আগে থেকেই অবগত ছিলেন ।

জাহানারা বেগম তার ভাই ইকবাল চৌধুরীকে ফোন দিয়ে বিষয়টা জানান। তিনিও সম্মতি প্রদান করেন । ইকবাল চৌধুরী এখনও দেশের বাইরে থেকে আসেননি । তাই তিনি এবার শাহনাজ চৌধুরী আর শাওনের সাথে কথা বলেন। পরিশেষে জানান- তাদেরকেও তাদের সাথে যেতে হবে ৷ শাহনাজ চৌধুরী না বলার কোনো সুযোগই পাননি। কেননা অপর দিক থেকে তার ভাই আনোয়ার হোসেন ফোন দিয়ে করা গলায় জানিয়ে দিয়েছেন, তাদেরকে আসতেই হবে। কোনো অজুহাত চলবে নাহ । আর এমনিতেই ইকবাল চৌধুরী বাসায় না থাকাতে অনেক আফসোস প্রকাশ করেছেন।

.

তখন বাজে প্রায় দেড়’টা !

চিত্রা’রা মিথিদের বাড়ি যাওয়ার জন্য রেডি হচ্ছে ।

চিত্রা আজকে একটা মিষ্টি কালারের গাউন পরেছে। যার কোমরের উপরের অংশটা একেবারে বডির সাথে এঁটে-সেটে সেট করা, আর কোমরের নিচের ঘেড়টা পরিমানের তুলনায় অনেক বেশি বড় । একেবারে গর্জিয়াস একটা জামা । বেশ মানিয়েছে জামাটাতে তাকে ।

চিত্রা আজকে মুখে হালকা মেকাপ করেছে, চোখে হালকা কাজল আর ঠোঁটে লিপস্টিকও দিয়েছে। চুলগুলো সুন্দর গোল আর টাইটাই করে মাথার উপরের দিকে খোঁপা বাঁধানো ৷ খোঁপার বা-পাশে একসাথে তিনটা লাল টকটকে গোলাপ গুঁজে রেখেছে । আর কানের দু'পাশ দিয়ে কিছু বক আকারে চুল ছেড়ে রেখেছে । উন্মুক্ত ধবধবে সাদা গলায় একটা ফুল আকৃতির লকেট যুক্ত মালা পড়েছে। সেইসাথে একই ডিজাইনের দু-কানে দু'টো ছোটো এয়ারিং ! যার মধ্যে বসানো ডায়মন্ড খচিত পাথরের দানা গুলো চকচক করতেছে । সবকিছু মিলিয়ে পরীর থেকে কোনো অংশে কম সুন্দরী লাগতেছে না তাকে ।

আর এদিকে কবির- ইন করা সাদা শার্টের উপরে কালো কোট আর টাই পরেছে, সাথে কালো রঙের প্যান্ট । পায়ের সু গুলোও উপরের ড্রেসাপের সাথে একেবারে মেচিং করা। হাতে একটা সিলভার আর গোল্ডেন কালারের মিশ্রণে ঘড়ি পরেছে । চুল গুলো সুন্দর করে উপরের দিকে সেট করা ৷ ব্যাস এতোটুকুতেই হিরোর থেকে কোনো অংশে কম লাগতেছে নাহ কবিরকে । তবে কবিরের মধ্যে সবচেয়ে বেশি নজর কারতেছে যেই জিনিসটা, সেটা হলো- তার নাকের ডগার কালচে তিল’টা । না চাইতেও সবার দৃষ্টি ওই একটা জায়গায় গিয়ে আঁটকাতে বাধ্য ।

জাহানারা বেগম, আমজাদ আহমেদ, কবির আর চিত্রা- তিনজনই মিথিদের বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পরে ৷ কিন্তু ময়নামতি যায় নাহ । তারা সবাই ময়নামতিকে অনকে করে যাওয়ার কথা বললেও সে কোনো মতেই রাজি হয় নাহ। ময়নামতি জানায়- সে একেবারে বিয়ের দিনই যাবে ।’

ময়নামতি মেয়েটা বড্ড নাছোড়বান্দা । যেখানে না বলে তো না-ই । কোনো ভাবেই সেই না কে হে করানো যায় নাহ । তাই চিত্রারাও হাল ছেড়ে দিয়ে নিজেদের উদ্দেশ্য পাড়ি জমায় ।

শাহনাজ চৌধুরী কিছুক্ষণ আগেই ফোন দিয়ে জানিয়ে দেয়, তারা একেবারে আনোয়ার হোসেনের বাড়িতে চলে যাবে । ওখানেই তাদের দেখা হবে ।

.

ঢাকা শহরের যানজট পেরিয়ে, আনোয়ার হোসেনদের বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে চিত্রাদের বেলা চার’টা বেজে যায়। আনোয়ার হোসেনের বাড়িটা ঢাকা শহর থেকে বেশ ক্ষানিকটা দূরে গ্রাম্য এলাকায় ।

আনোয়ার হোসেন পেশায় একজন প্রফেসর। তার দুই মেয়ে, স্ত্রী আর সে নিয়েই তাদের ছোট্ট সংসার । আনোয়ার হোসেনের ভাই বোন বলতে সে আর শাহনাজ চৌধুরী- তারা দু'জনই ।

আনোয়ার হোসেনদের বাড়িটা একতলা ছাঁদযুক্ত ! তবে বেশ পরিপাটি আর গোছানো ।

চিত্রারা সকলে আনোয়ার হোসেনদের বাড়ির ভিতরে প্রবেশ করলে, আনোয়ার হোসেন বেশ বিনয়ের সাথে সালাম জানিয়ে তাদের আপ্যায়ন করে । আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী রাবিয়া বেগম তড়িঘড়ি করে এসে হাঁসিমুখে তাদের সালাম জানায় এবং ভালো মন্দ জিজ্ঞেস করে ।

শাহনাজ চৌধুরী আর কবির কিছুক্ষণ আগেই চলে এসেছে । ইনায়া আসেনি । তার শরীরটা বলে ভালো লাগতেছিল নাহ! তাই সে আজ শুক্রবারের দিনটা, পুরোটা সময় রেস্ট নিয়ে, আর ঘুমিয়ে কাঁটিয়ে দিতে চায় । শাহনাজ চৌধুরীও আর জোর করেনি । কারণ তিনিও লক্ষ্য করেন তার মেয়েটা প্রতিদিন শুধু কলেজ, কোর্চিং, পড়াশোনা এসবের মধ্যেই পড়ে থাকেন ।

শাহনাজ চৌধুরী এবার কিছুটা এগিয়ে এসে জাহানারা বেগম আর চিত্রার হাত থেকে নিয়ে আসা কিছু ফলমূল আর মিষ্টিপাতি গুলো নিয়ে রান্নাঘরের দিকে চলে যায় ।

এবার চিত্রার চোখ পড়ে সোফার মধ্যে পায়ের উপর পা তুলে হেলান দিয়ে বসে থাকা শাওনের উপর । কালো ফর্মাল প্যান্টের সাথে টকটকে খয়েরী রঙের একটা শার্ট পরেছে । এই রংটাতে বেশ মানিয়েছ শাওনকে । বাঁ-হাতে সিলভার কালারের দামি ব্রান্ডেড ঘড়ি পরেছে । মাথাটা নিচু করে মোবাইলে মগ্ন থাকায় মাথার চুল গুলো কপাল আর চোখসহ নাকের অর্ধেক অংশ ঢেকে রেখেছে ।

চিত্রা’রা নিরবে গিয়ে সোফায় বসে পড়ে। শাওন মোবাইল থেকে চোখ সরিয়ে সবার দিকে হালকা তাঁকায়। আমজাদ আহমেদ আর জাহানারা বেগমকে সালাম জানিয়ে কবিরের সাথে কিছু কথা বলে। পরিশেষে তার চোখ গিয়ে আঁটকায় চিত্রার উপর । শাওনের মনে হচ্ছে সে কোনো পরীকে দেখতেছে । যে সাক্ষাৎ আসমান থেকে তার সামনে নেমে এসেছে । ইসস কি অপরূপ লাগতেছে মেয়েটাকে। সে কিছুতেই চোখ সরাতে পারতেছে নাহ ।

আনোয়ার হোসেনের বাড়িতে আত্নীয় বলতে মিথির এক খালা আর মামা এবং মামি, এই তিনজন এসেছেন ।

এরপরে হালকা নাস্তা খাওয়ার পর্ব শেষ হলে মাহি মিথিকে নিয়ে আসেন । মিথিকে একটা গোলাপি আর গোল্ডেন রঙের মিশ্রণে জামদানী শাড়ি পড়ানো হয়েছে । আর মুখের উপর ঘোমটা টেনে দেওয়া হয়েছে । কবির আর মিথিকে সামনা-সামনি বসানো হয় । মিথির মা রাবিয়া বেগম মেয়ের মুখ থেকে ঘোমটা’টা হালকা সরিয়ে দেয়, যাতে করে মিথির মুখটা দেখা যায়। মিথিকে চিত্রাদের পরিবার যদিও আগে থেকেই চিনে আর দেখেছে, তবুও আজকের বিষয়টা একটু ভিন্ন । মিথিকে আজকে শাড়িতে বেশ সুন্দর লাগতেছে । মিথি তার ডাগর-ডাগর চোখ জোড়া দিয়ে আঁড়চোখে একবার তাকায় কবিরের দিকে। কবির মিথির দিকে তাকিয়ে থাকার কারণে তাদের দুজনের চোখাচোখি হয়। মিথি লজ্জায় চোখ নামিয়ে নেয় ।

বেশ কিছুটা পর মাহি মিথিকে নিয়ে আবারও ঘরে চলে যায় । আর এদিকে বাড়ির গুরুজনেরা তখন নিজেদের মধ্যে কথা বলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ৷

কিছুক্ষণ পর মাহি রুম থেকে বেরিয়ে এসে শাওনের উদ্দেশ্যে একটু রসিয়ে রসিয়ে বলে উঠে,

-ভাইয়া আমাদের বাসা থেকে কিছুটা দূরে একটা মেলা লাগছে! চলুন না ঘুরে আসি।”

শাওন মাহির দিকে তাকিয়ে, চোখ নামিয়ে নিয়ে ডিরেক্ট না করে দেয় ৷ মাহির মনটা এতে কিছুটা খারাপ হয়ে যায় ৷ কিন্তু সে দমে যায় নাহ। সে আবারও ঢংগী সুরে বলে উঠে,

-চলুন না ভাইয়া। বেশি সময় লাগাবে নাহ তো। শুধু যাবো আর একটু ঘুরে চলে আসবো।”

শাওন এবার বিরক্ত হয় । বিরক্তিতে কিছু বলতে যাবে তার আগেই শাহনাজ চৌধুরী বলে উঠে,

-যা না শাওন। ঘুরে আয়। এমনিতেও তো কতদিন পরে মামার বাসায় আসলি। ঘুরে আয় ভালো লাগবে।” বলে চিত্রার দিকে একপলক তাকিয়ে আবারও বলে উঠে,

- সাথে চিত্রা মামুনিকেও নিয়ে যা । এখানে বসে না থেকে মেলা থেকে একটু ঘুরে আসুক । ”

চিত্রা আমজাদ আহমেদ আর জাহানারা বেগমের দিকে তাকায়। আমজাদ আহমেদ মুচকি হেঁসে বলে উঠেন,

-হে যাও সবাই ঘুরে আসো, ভালো লাগবে ।”বলে কবিরকে উদ্দেশ্য করে বলে,

-কবির তুমিও যাও ঘুরে আসো।”

সবাই যাচ্ছে দেখে ভিতরে ভিতরে মাহির খুব রাগ হয়। কারণ সে চেয়েছিল শাওন আর ও একাই শুধু যাবে। কিন্তু তার মনের ইচ্ছা যখন পূর্ণ হলো না তাই সে বলে উঠলো,

-সবাই যেহেতু যাচ্ছে তাহলে আপুকেও নিয়ে যাই?” বলে মুখে হাঁসি ফুটানোর ভান করে তার বাবার দিকে তাকায় । আনোয়ার হোসেন মিথিকে নিয়ে যাওয়ার সম্মতি দিলে, তারা মেলার উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে ৷

.

মিথিদের বাড়ি থেকে মেলা পর্যন্ত হেঁটে যেতে যেতে প্রায় ১০থেকে ১২মিনিটের মতো সময় লাগে। মেলাটা বেশ বড়সড় ভাবেই লেগেছে । চারিদিকে প্রচুর দোকানপাট আর মানুষের আনাগোনা। যা দেখে শাওন প্রচন্ড বিরক্ত প্রকাশ করে । সে ভাবতে লাগে চিত্রাকে নিয়ে । এতো এতো মানুষের সমাগমের মধ্যে চিত্রা কিভাবে মেলাতে ঘুরবে । কিভাবে মেলার ভিতরে যাবে।

এমনিতেই তো এতো ভাড়ি একটা ড্রেস পরে হেঁটে আসতে আসতে চিত্রার অবস্থা খারাপ । এখন আবার এতো মানুষের ভিড় । শাওন চাইলেও চিত্রাকে কোলে তুলে নিয়ে মেলাতে ঘুরতে পারবে নাহ। কারণ তাদের সাথে চিত্রার ভাই কবির আছে ।

মাহি বেশ উৎসাহ নিয়ে মেলার দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। আর তার পেছন পেছন নীরবে কবির আর মিথিও পাশাপাশি হাঁটতে থাকে । কেউ কোনো কথাই বলতেছে নাহ । শুধু নিরবে হাঁটতেছে ।

এদিকে চিত্রা পরেছে বিপাকে । সে এতো ভাড়ি ড্রেস পরে আসার জন্য নিজে-নিজেই নিজেকে হাজারটা গালি দিয়ে ফেলেছে অলরেডি । কারণ এই ড্রেসটা সামলাতে গিয়ে তাকে বহুত পেরেসানিতে পড়তে হচ্ছে ।

শাওন একবার সামনে তাঁকিয়ে মেলাটার দিকে চোখ বুলিয়ে নেয় । তারপর চিত্রার একহাত শক্ত করে ধরে হাঁটা শুরু করে । চিত্রাও একহাতে জামাটা উঁচিয়ে ধরে শাওনের পায়ের সাথে পা মেলায়।

মেলায় অনেক মানুষ থাকার কারণে হাঁটার সময় অনেকের সাথে চিত্রার শরীর বাড়ি খায় । কেউ কেউ তো মনে হচ্ছে ইচ্ছে করেই চিত্রার শরীরে ধাক্কা দিয়ে যাচ্ছে । আবার কেউ কেউ কেমন ড্যাবড্যাব করে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে । তা দেখে শাওনের ভীষণ রাগ হয় । সে প্রচন্ড বিরক্ত নিয়ে একবার আশেপাশে তাকায় । তারপর সে চিত্রাকে নিজের বুক বরাবর নিয়ে এসে, দু’হাত চিত্রার কোমড়ের দুপাশের সাইট দিয়ে সামনের দিকে সোজা করে ধরে । যাতে করে চিত্রার শরীরের সাথে কারো শরীর টাচ্ না হয় । কিছুটা সামনে থেকে মাহি শাওন আর চিত্রাকে এভাবে দেখে রাগে কটমট করতে থাকে । তাকে দেখে মনে হচ্ছে, সে বুঝি তার চোখ দিয়েই চিত্রাকে গিলে খাবে ৷

বেশ কিছুক্ষণ তারা মেলাটা ঘুরে ঘুরে দেখে। সাথে কিছু জিনিস পচ্ছন্দ হলে সেটাও নিয়ে নেয়। তবে মাহি অবশ্য অনেক কিছুই নিয়েছে । যার সব টাকা কবির নিজেই দিয়েছেন । মিথিকে কিছু নেওয়ার জন্য বললে সে কিছুই নেয় নাহ। আর এদিকে চিত্রা শুধু তার জামার সাথে মেচিং করে মিষ্টি কালারের একগুচ্ছ কাঁচের চুড়ি নিয়েছে । যা এখন তার হাতে পড়া আছে ।

মেলা থেকে বেড়িয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা হয় তারা । শাওনকে বেশ ক্লান্ত দেখায়। তার খয়েরী রঙের শার্টটা ঘামে ভিজে যাওয়ার কারণে কালো বর্ণ ধারণ করেছে । চোখে মুখে একঝাঁক ক্লান্তির ছাপ। পুরো মেলা জুড়ে তার চিত্রাকে প্রটেক্ট করতে করতেই অবস্থা খারাপ ৷ কত মানুষের ধাক্কা, কত মানুষের ভিড় তাকে অতিক্রম করতে হয়েছে, সেটা একমাত্র সেই জানে ।

শাওন এখন কিছুটা চিত্রার পিছনে ঢুলতে ঢুলতে হাঁটতেছে। ভাড়ি ড্রেস আর এতো সময় হাঁটার কারণে চিত্রার হাঁটার গতিও কমে গেছে।

মাহি, মিথি, আর কবির বেশ কিছুটা সামনে এগিয়ে গেছে । হাঁটার একপর্যায়ে হঠাৎ করে শাওন চিত্রার হাত টেনে ধরে তাকে আঁটকিয়ে দেয় ৷ আশপাশে কেউ নেই বললেই চলে । শাওন চিত্রাকে তার দিকে মুখ করে ঘুরিয়ে দাঁড় করায় । তারপর নিজে তার সামনে এক হাঁটু ভাজ করে পায়ের উপরে ভর করে বসে পড়ে । চিত্রা কিছুটা অবাক চোখে তাঁকায়। বুঝার চেষ্টা করে, আসলে ছেলেটা করতে চাচ্ছেটা কি ! শাওন পকেট থেকে একটা পায়েল বের করে। আর চিত্রার বা-পাটা নিজের ভাজ করা পায়ের উপর তুলে খুব যত্নে পায়েলটা পরিয়ে দেয়। বেশ কিছুক্ষণ নিরবে পায়ের দিকে তাকিয়ে থেকে, হঠাৎ করে মাথাটা নিচু করে পায়ের উপর নিজের ঠোঁট জোড়া ছোঁয়ায় । চিত্রার শরীরে একটা শিহরণ বয়ে যায়। সে এক দৃষ্টিতে শাওনের দিকে তাকিয়ে থাকে । আর ভাবতে থাকে- ছেলেটা পায়েল কখন কিনলো। সে তো প্রায় সবসময়ই তার পাশে ছায়ার মতো ছিল। তাহলে?’ চিত্রা এবার জিজ্ঞেস করে উঠে,

-এটা আপনি কখন কিনলেন ভাইয়া ?”

শাওন উঠে দাঁড়ায় ৷ আর চিত্রার এক হাত চেপে ধরে হাঁটা শুরু করে, সামনের দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,

-তুই যখন চুঁড়ি কিনতে ব্যস্ত ছিলি তখন কিনেছি।”

চিত্রা জামাটা উঁচিয়ে ধরে বা-পায়ের দিকে তাঁকায়। মুচকি হেঁসে বলে উঠে,

-এটা অনেক সুন্দর ভাইয়া ৷ ”

শাওন থেমে গিয়ে চিত্রার দিকে তাঁকায় । ঠোঁটের কোণে হাঁসি ফুটিয়ে বলে উঠে,

-তোর পচ্ছন্দ হইছে ? ”

চিত্রা আবারও নিজের পায়ে পড়া পায়েলটার দিকে তাকিয়ে বলে উঠে,

-খুব পচ্ছন্দ হয়েছে ৷”

শাওন একহাতে নিজের মাথার পেছনের চুলে হাত বুলিয়ে, অন্যদিকে মুখ ঘুরিয়ে হেঁসে দেয় ।

আর বলে উঠে,

-যাক তবে ! এই অধমের প্রথমবারের মতো কোন জিনিস কিনাটা সার্থক হলো ।”

চিত্রা শাওনের দিকে তাকিয়ে একটা মিষ্টি হাঁসি দেয়।

শাওন আবারও চিত্রার হাতে হাত চেঁপে হাঁটা শুরু করে । চিত্রার হাঁটার সাথে সাথে তার হাতে পড়া চুঁড়ি আর পায়ে পড়া পায়েলের ঝুমকার শব্দে এক অসাধারণ শব্দের সৃষ্টি হয় । যা শাওনের কাছে অতিব মধুর শব্দ বলে বোধ হয় ।

.

আনোয়ার হোসেনের বাসায় খাওয়া দাওয়ার পর্ব শেষ করে, সবার কাছে বিদায় নিয়ে বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়ে চিত্রা’রা।

তবে এরমধ্যে সবার সম্মতিতে একেবারে পাকা কথা বলে বিয়ের দিন তারিখ পর্যন্ত ঠিক করে ফেলেন তারা ।

সামনের মাসের পহেলা তারিখেই তাদের বিয়ের কাজ সম্পন্ন করা হবে ।

চিত্রা’রা বেরিয়ে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই শাওন আর শাহনাজ চৌধুরীও বাড়ির উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়েন।

.

কবির আর মিথির বিয়ের আর মাত্র ৯টা দিন বাকি। দুটো বাড়িতেই বিয়ের প্রস্তুতির জন্য বেশ তোড়জোড় শুরু হয়ে গেছে ৷

চিত্রাদের বাসায় বিয়ের শপিং করা, আত্মীয়দের নিমন্ত্রণ করা, কোথায় কিভাবে কি সাজানো হবে সেসব নিয়েই আলোচনা চলতেছে ৷

আমজাদ আহমেদ ছেলের বিয়েতে খুব বেশি মানুষকে নিমন্ত্রণ না করার সিদ্ধান্ত নেয় । শুধু খুব কাছের মানুষদেরই নিমন্ত্রণ করেন ।

অপরদিকে আনোয়ার হোসেনও- খুব ছোট পরিসরেই মেয়ের বিয়ের আয়োজন করবেন বলে জানিয়েছেন ।

দেখতে দেখতে বিয়ের দিন ঘনিয়ে আসতে শুরু করে, আর সাথে বিয়ের আয়োজনের তোড়জোড় । আর অবশেষে সেই দিনটা চলেই আসে।

.

আজকে কবির আহমেদ আর মিথিলা হোসেন মিথির গায়ে হলুদের অনুষ্ঠান…...

.

চলবে…

⚠️গল্প কপি করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ⚠️

🚫🚫 গল্পটা শুধু প্রাপ্তবয়স্ক আর মুক্তমানদের জন্য উন্মুক্ত । গল্পে ধীরে ধীরে রোমান্টিকতার বিষয়টা একটু বেশি আর গভীর হবে । তাই যাদের এসব পচ্ছন্দ নয়, তারা দয়াকরে এড়িয়ে চলবেন। 🚫🚫

“রি-চেইক দেওয়া হয়নি ! ভুল গুলো ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন । ”

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন