🚫ডার্ক রোমান্স🚫
#আমার_শুধু_তোকেই_লাগবে
লেখা: #রুদ্র_রায়_রূপায়ন
পর্ব সংখ্যা - ২৮
.
⚠️গল্প কপি করা সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ⚠️
হাসপাতালের করিডোরে বসে আছে চিত্রার বাবা-মা, ভাই, ভাবি সহ চৌধুরী ম্যানশনের পুরো পরিবার । সবার চোখ-মুখ একঝাঁক চিন্তা আর মলিনতায় ভরপুর । কারো মুখে টু-পরিমাণ পর্যন্ত শব্দ নেই । বেশ থমথমে হয়ে আছে হাসপাতালের করিডোর ।
দুপুরের দিকে চিত্রার লেবার পেইন উঠলে তাকে তড়িঘড়ি করে হাসপাতালে নিয়ে আসা হয় । আর চিত্রার পেছন-পেছন চৌধুরী ম্যানশনের প্রতিটা সদস্যও আসে উপস্থিত হয় হাসপাতালে ।
আমজাদ আহমেদ আর জাহানারা বেগমকে ফোন করে বিষয়টা জানালে, তারা স্ব-পরিবারে দ্রুততার সাথে হাসপাতালে চলে আসে । আর আসার পর থেকেই চিন্তায় আর ভয়ে থমথমে হয়ে আছে সবার মুখ । কারো মুখে কোনো কথা নেই । একেবারে চুপচাপ সকলের মুখ । পুরো করিডোর জুড়ে গুমোট ধরা নিরবতা ।
এদিকে অপারেশন থিয়েটারের সামনে অস্থির পায়ে এপাশ-ওপাশ করে পায়চারি করতেছে শাওন । চোখে মুখে তার ভয় আর চিন্তার ছাপ স্পষ্ট । মুখ শুকিয়ে তার একেবারে পাংশুটে আকার ধারণ করেছে ।
ছেলেটা হাসপাতালে আসার পর থেকে একমুহূর্তের জন্যও স্থিরভাবে বসেনি । আসার পর থেকে শুধু কন্টিনিউয়াসলি পায়চারি করে যাচ্ছে সে । শরীরটাও পুরো ঘেমে একাকার । কপালে জমে থাকা ঘামের ফোঁটা গুলো দুইপাশে গাল বেয়ে গরিয়ে পরতেছে । হালকা ধূসর রঙের শার্টটা ঘামে ভিজে গিয়ে গাড় ধূসর বর্ণ ধারন করেছে । বুক বরাবর তিনটা বোতাম খোলা থাকার কারনে বুকের মধ্যে জমে থাকা ঘামের কণা গুলোও দৃশ্যমান । মাথার মধ্যে একগাদি এলোমেলো চুল ।
শাওন অপারেশন থিয়েটারের সামনে পায়চারি করতেছে আর হাতে পরে থাকা ঘড়িতে বারবার সময় দেখতেছে । তার চাল-চলন সবকিছুতেই বেশ উন্মাদনা । অস্থিরতা ।
দেওয়ালের পাশ ঘেষে থাকা চেয়ারে বসে থেকে কবির শাওনের উদ্দেশ্যে চতুর্থ বারের মতো হাক ছাড়ে,
-শাওন, এবার একটু চুপ করে বস না ভাই । এতো হাইপার হচ্ছিস কেন? বোনের কিচ্ছু হবে নাহ । সবকিছু ভালো হবে । তুই একদম চিন্তা করিস নাহ । একটু শান্ত হয়ে বস ! ”
বিনিময়ে শাওন কবিরের দিকে শীতল চাহনিতে তাকায় । কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলে নাহ । কারণ এমুহূর্তে তার মুখ দিয়ে কোনো কথাই বেরোচ্ছে নাহ । এ-পর্যন্ত শাওনকে তার বাবা-মা সহ, এখানে উপস্থিত সবাই তাকে একটু স্থিরভাবে বসতে বলছে । নিজেকে শান্ত রাখতে বলছে । চিন্তা করতে বারণ করেছে । সবকিছু ভালো হওয়ার আশ্বাস দিয়েছে । কিন্তু তাদের বলা কথা গুলো শাওনের মস্তিষ্কে পৌঁছালে তো !
এখানে উপস্থিত কারো কথাই শাওনের মস্তিষ্কে পৌঁছাতে পারেনি । পৌঁছালেও শাওনের মস্তিষ্ক সেটাকে নিজের মধ্যে ধারণ করে ধরে না রেখে, সাথে সাথেই ঝেড়ে ফেলে ।
কেননা- শাওনের মাথায় বর্তমানে শুধু চিত্রা ঘুরতেছে । তার একমাত্র ক'লিজা । শাওন এখন চিত্রার কথা ভাবতেই ব্যস্ত । তার মস্তিষ্কে এখন শুধুমাত্র চিত্রার বিচরণ ।
চিত্রাকে অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যাওয়ার পর থেকেই শাওনের অবস্থা একেবারে নাজেহাল । চিন্তায় আর ভয়ে শরীরে ঘাম ছুটে গেছে ৷ বারবার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে । অজানা কিছু ভয় মনের মধ্যে জন্ম নিচ্ছে । থেকে থেকে বুকটা হাহাকার করে উঠতেছে । শত চেষ্টা করেও সে স্থির থাকতে পারতেছে নাহ । নিজেকে শান্ত রাখতে পারতেছে নাহ । সে বারবার সৃষ্টিকর্তার নিকট দোয়া চাচ্ছে, যাতে সবকিছু ভালো হয় । সুন্দর হয় ।
হঠাৎ করে অপারেশন থিয়েটার রুমের দরজার উপরে জ্বলে থাকা লাল রঙের লাইটটা বন্ধ হয়ে যায় ৷ শাওনের বুক ধুক করে উঠে । সে দরজার সামনে স্থির হয়ে দাড়ায় । আমজাদ আহমেদ, জাহানারা বেগম, শাহনাজ চৌধুরী, ইকবাল চৌধুরী, কবির সহ সকলেই বসা থেকে উঠে দরজার সামনে আসে দাড়ায় । সকলের বুকের মধ্যেই ধুকপুকানির আওয়াজ । চোখে মুখে অস্থিরতা আর ভয় । সকলের দৃষ্টি অপারেশন থিয়েটার রুমের বন্ধ দরজার দিকে ।
সকলের অপেক্ষার দৃষ্টির অবসান ঘটিয়ে অপারেশন থিয়েটার রুমের দরজা খুলে, হাতে সাদা তোয়ালে’তে মোড়ানো ফুটফুটে একটা বাচ্চা নিয়ে বের হন নার্স । তিনি মুখে হাঁসির রেখা ফুটিয়ে সুমিষ্ট গলায় বলে উঠেন,
-বাচ্চার বাবা কে এদিকে আসুন ? ”
শাওন কাঁপা-কাঁপা পা জোড়া নিয়ে তড়িঘড়ি করে নার্সের সামনে এগিয়ে যায় ।
অস্থির গলায় কাঁপা-কাঁপা স্বরে বলে উঠে,
-আ..আ.আমি, আমি বাচ্চার বাবা ! ”
নার্স মহিলাটি বাচ্চাটিকে শাওনের কোলে দেন ৷ মুখের মধ্যে হাঁসিটুকু বজায় রেখে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে বলেন,
-আপনার মেয়ে হয়েছে । একেবারে ভীষণ ফুটফুটে একটা বাচ্চা । পুরো লক্ষ্মী প্রতিমার মতো । ”
উপস্থিত সকলের মুখে তৃপ্তির হাঁসি ফুটে । সকলে মহান সৃষ্টিকর্তার নিকট শুকরিয়া আদায় করেন ।
শাওন কাঁপা-কাঁপা হাতে বাচ্চাটাকে নিজের হাতে তুলে নেয় । পুরো শরীর জুড়ে কম্পন শুরু হয় তার ৷ বুকের মধ্যে দ্রুত গতিতে হার্টবিট চলা শুরু করে । অস্থির ! কি অস্থির তার শরীর ।
শাওন কিছুক্ষণ নিরব দৃষ্টিতে অপলক বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে । কাগজের মতো সাদা ধবধবে বাচ্চাটার মুখে টানা-টানা দুটো চোখ, হালকা উঁচু ছোট নাক, লাল টকটকে ঠোঁট ।
একটু পরপর বাচ্চাটার চোখের ঘন পাপড়ি-যুক্ত পাতা গুলো নড়ে উঠতেছে, আর পাতলা লাল টকটকে ঠোঁট জোড়া একটু পরপর নাড়াচ্ছে ৷ ই'সস কত্ত কিউট সেই দৃশ্য । কত্ত কিউট তার মুখশ্রী । মুহূর্তেই শাওনের হৃদয়ে মুগ্ধতা ছড়ায় ৷ তার দুই চোখের কোণা দিয়ে টপটপ করে কয়েক ফোঁটা উষ্ণ অশ্রু গড়িয়ে পরে । বুক কেঁপে উঠে । সে আলতো করে বাচ্চাটার কপালে ঠোঁট ছোঁয়ায় । বাচ্চাটাকে নিজের বুকের খুব কাছে জড়িয়ে নেয় । আর চোখ তুলে পূর্ণ দৃষ্টিতে তাকায় সামনে দাঁড়ানো নার্স মহিলাটির দিকে । ধরে আসা গলায় জিজ্ঞেস করে,
-আমার স্ত্রী ! আমার স্ত্রী কেমন আছে ? ”
নার্স মহিলাটি হিন্দু । হাতে সাখাপোলা আর কপালে লাল টকটকে সিঁদুরই তার প্রমাণ । আটশাট শরীরের বেশ সুন্দর চেহারা তার । বয়স হবে হয়তো ৩০-৩৫ ।
তিনি শাওনের দিকে তাকিয়ে মুচকি হাঁসেন । সুন্দর গলায় বলেন,
-বাচ্চার মা একেবারে সুস্থ আছে । ভয়ের কোনো কারণ নেই । একটু পরেই উনাকে কেবিনে সিফট করা হবে ৷ ”
শাওন বুক ভরে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস নেয় । তার বুকের ভিতরে দলা পাকা যন্ত্রণারা হালকা হয় । চিন্তারা দূর আকাশে পাড়ি জমায় । শরীরটা শান্ত হয় । মন স্থির হয় । ঠোঁটের কোণে হাঁসি ফুটে । প্রশান্তির হাঁসি ।
সে আবারও তার দুই হাতের ভাঁজে থাকা সদ্য জন্ম নেওয়া বাচ্চাটাকে চোখের সামনে ধরে ৷ খুশিতে হু-হু করে উঠে তার হৃদয় । চোখ দিয়ে অনবরত ঝড়তে থাকে খুশির কান্নারা ।
এবার একে একে এগিয়ে আসে জাহানারা বেগম, শাহনাজ চৌধুরী, ফাহমিদা চৌধুরী, মিথি সহ সবাই । সবাই অপলক চোখে ছোট্ট বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে থাকে । সবার চোখে মুখেই কি উপচে পড়া খুশি । একে-একে জাহানারা বেগম, শাহনাজ চৌধুরী, ফাহমিদা চোধুরী বেশ যত্নের সাথে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নেন ৷
আয়াত তো ছোট্ট বাচ্চাটাকে কোলে নেওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠে ।
এদিকে- ইকবাল চৌধুরী, ইরফান চৌধুরী আর আমজাদ আহমেদ নাতনী হওয়ার খুশিতে পুরো হাসপাতাল জুড়ে সবার মাঝে মিষ্টি বিতরণ শুরু করে দেয় । খুশিতে কারো যেন কোনো অন্থ নেই ।
.
কিছুক্ষণ পর চিত্রাকে কেবিনে সিফট করা হয় । কেবিনে শিফট করার প্রায় দুই ঘন্টা পর চিত্রার জ্ঞান ফিরে ৷ চিত্রার জ্ঞান ফিরলে উপস্থিত সবাই চিত্রাকে ঘিরে ধরে ।
জাহানারা বেগম গিয়ে চিত্রার পাশে বসেন । একহাত চিত্রার মাথায় রাখে স্নেহের সাথে চিত্রার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন । আর কন্ঠে মমতা মিশিয়ে বলে উঠেন,
-এখন কেমন লাগতেছে আম্মু ? ”
চিত্রা নিভু-নিভু চোখ জোড়া নিয়ে একবার সবার দিকে তাকিয়ে, জাহানারা বেগমের দিকে দৃষ্টি স্থির করে । তার গলা দিয়ে যেন কথারা বারবার আটকে যাচ্ছে । সে ধরে আসা গলায় মোলায়েম কন্ঠে বলে,
-ভালো লাগতেছে আম্মু । ”
জাহানারা বেগম মুচকি হাঁসেন । পরম আদরে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে থাকেন । চিত্রা চেখ ঘুরিয়ে আবারও আশপাশে তাকায় । কিছু একটা খুঁজার চেষ্টা করে । কিন্তু পায় না । সে ক্ষীণ স্বরে বলে,
-আম্মু আমার বাচ্চা ? আমার বাচ্চা কোথায় ? ”
উপস্থিত সকলের মুখে হাঁসি ফুটে । শাহনাজ চৌধুরী খুশিতে ভরা গলায় বলেন,
-তোমার মেয়ে হয়েছে আম্মু ৷ তোমার ঘর আলো করে তোমার মতোই সুন্দর ফুটফুটে একটা পরী এসেছে ৷ ”
চিত্রার চোখের কোণায় জল জমে । খুশিতে তার মন ভরে উঠে । সে আধো-আধো স্বরে বলে উঠে,
-কোথায় ! কোথায় আমার মেয়ে ? ”
চিত্রার সামনে থেকে সরে দাঁড়ায় ইনায়া, জান্নাত আর ফাহমিদা চৌধুরী ৷ চিত্রাকে ইশারা করে সামনে সোফায় বসে থাকা শাওনের দিকে তাকাতে বলে । চিত্রা সোফার মধ্যে বসে থাকা শাওনের দিকে তাকায় ।
শাওন তখন থেকে বাচ্চাটাকে কোলে নিয়ে এক দৃষ্টিতে তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে ৷ কোনো কথাবার্তা নেই, নড়াচড়া নেই । শুধু অপলকভাবে তাকিয়ে আছে । মনে হচ্ছে একেবারে স্তব্ধ হয়ে গেছে সে ।
শাওনের দিকে তাকিয়ে চিত্রার চোখ জোড়া থেকে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পরে । সে শুধু মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে শাওন আর তার কোলে থাকা বাচ্চাটার দিকে ।
কেবিন রুমের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে সেই সুন্দর গড়নের নার্সটি । মুখের মধ্যে তার অমায়িক হাঁসি । তিনি চিত্রার কাছে এগিয়ে যান ৷ শেষ হয়ে যাওয়া স্যালাইনের নলটা খুলে দেন । আর চিত্রার উদ্দেশ্য মিষ্টি করে জিজ্ঞেস করেন,
-এখন কেমন লাগতেছে তোমার ? ”
চিত্রা শাওনের দিক থেকে চোখ সরিয়ে নার্সটির দিকে তাকায় । মুখে হাঁসি ফুটানোর চেষ্টা করে মৃদু স্বরে বলে,
-জি, ভালো লাগতেছে । ”
নার্স মহিলাটি আবারও বলে উঠেন,
-ব্যাথা কেমন করতেছে ? খুব বেশি ? নাকি হালকা ? ”
চিত্রা নরম স্বরে বলে,
-একটু করে ব্যাথা করতেছে শুধু । ”
মহিলাটি চিত্রার পেশার চেক করতে করতে জানান,
-সমস্যা নেই একটু আধটু ব্যাথা করবেই । কিছুক্ষণ পরে ঠিক হয়ে যাবে । ”
নার্স মহিলাটি এবার রুমে উপস্থিত সবার দিকে তাকিয়ে বিনয়ের সাথে বলে উঠেন,
-বাচ্চাটাকে মায়ের বুকের দুধ খাওয়ানোর সময় হয়ে গেছে । আপনারা দয়াকরে একটু বাইরে যান । ”
নার্সের কথায় একে একে সবাই বাইরে বেরিয়ে যায় । জাহানারা বেগম আর শাহনাজ চৌধুরী চিত্রার মাথায় ভালোবাসার পরশ একে দিয়ে বাইরে বেরিয়ে যায় । তারা বাইরে বেরিয়ে গেলে কবির, জাহানারা বেগম আর শাহনাজ চৌধুরী ব্যতিত সবাইকে বাড়িতে পাঠিয়ে দেয় ৷ থাকে শুধু কবির, জাহানারা বেগম আর শাহনাজ চৌধুরী ।
কেবিন রুমে এখন শুধু চিত্রা, শাওন আর নার্স মহিলাটি । নার্স মহিলাটি শাওনের কাছে এগিয়ে যায় । আর ভরাট গলায় বলে,
-বাচ্চাটাকে আমার কোলে দিন । আপনি একটু দয়াকরে বাইরে যান । ”
শাওন এতোক্ষণ অপলকভাবে বাচ্চাটার দিকে তাকিয়ে ছিল । নার্সের কথাতে তার ঘোর কাটে । চোখ তুলে সামনে তাকায় । সামনে দাঁড়ানো ব্যক্তিটি তাকে কি বললো বুঝার চেষ্টা করে ।
কিন্তু পারে নাহ । কেননা সে এতোটাই অন্যমনস্ক হয়ে ছিল যে সামনের ব্যক্তিটি তাকে কি বললো, তার ব্রেণ সেটা ধারণ করে সক্ষম হয় না । তাই সে কিছুটা জিজ্ঞাসূক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে ।
পেছন থেকে চিত্রা মৃদু স্বরে বলে উঠে,
-উনি থাকুক । উনাকে থাকতে দিন । সমস্যা নেই । ”
মহিলাটি চিত্রার দিকে তাকিয়ে মুচকি হাঁসে । এরপর আর কিছু না বলে শাওনের কোল থেকে বাচ্চাটাকে নিজের কোলে নিয়ে চিত্রার কোলে দেয় । আর কিভাবে কি করতে হবে সবকিছু শিখিয়ে, বুঝিয়ে দিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে যায় ।
চিত্রা বেডের সাথে হেলান দিয়ে বসে । বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকায় । মুগ্ধতায় আর প্রশান্তিতে ভরে উঠে তার সর্ব-শরীর । চোখের কোণে চিকচিক করে নোনা জলেরা । ঠোঁটের কোণে ফুটে মিষ্টি হাঁসির রেখা ।
সে আলতো করে ছোট্ট বাচ্চাটার মুখটা এগিয়ে তার বু’কের মধ্যে রাখে । বাচ্চাটা তার ছোট্ট উষ্ণ পালতা লাল টকটকে ঠোঁট জোড়া দিয়ে চু'সে খেতে থাকে মাতৃত্বের প্রথম দু'ধ । তার খাওয়া দেখে মনে হচ্ছে দীর্ঘদিন ধরে প্রশিক্ষণ নিয়েই সে একেবারে পৃথিবীতে এসেছে । মনে হচ্ছে সে এসবে অনেক আগে থেকেই অভ্যস্ত । সৃষ্টিকর্তার কি মহান সৃষ্টি । সদ্য জন্ম নেওয়া ছোট্ট একটা বাচ্চাও তার ক্ষুধা নিবারণে ব্যস্ত হয়ে পড়ে ।
চিত্রা অপলক চাহনিতে সেদিকে তাকিয়ে থাকে ৷ তার মধ্যে মাতৃত্বের সকল অনুভূতি হু-হু করে জেগে উঠে ৷ সে অপলক দৃষ্টিতে বাচ্চাটার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে । তার মনের মধ্যে এক অন্যরকম ভালোলাগার অনুভূতি ছড়ায় । পুরো শরীরে শীতলতা বিরাজ করে । স্নিগ্ধতা ছড়ায় ।
শাওন ধীর পায়ে চিত্রার কাছে এগিয়ে আসে ৷ চেয়ার টেনে চিত্রার পাশে বসে । অসহায় চোখে চিত্রার দিকে তাকায় । চিত্রার এক হাত নিজের দুই হাতের মুঠোয় নিয়ে কপালে ঠেকায় । আর মাথাটা নিচু করে শব্দ করে কেঁদে উঠে ।
চিত্রা ভয়ার্তক চোখে শাওনের দিকে তাকায় ৷ হঠাৎ করে শাওনের কান্নার কারন চিত্রার বোধগম্য হয় নাহ । তার চোখেমুখে বিস্ময় খেলে যায় ।
সে আলতো স্বরে ডেকে উঠে,
-চৌধুরী সাহেব ! ”
শাওন সাড়া দেয় নাহ । চিত্রা আবারও ডেকে উঠে,
-চৌধুরী সাহেব ! কান্না করতেছেন কেন আপনি ? কি হয়েছে আপনার ? ”
শাওনের তরফ থেকে কোনো হেলদোল নেই । সে চিত্রার কথার কোনো জবাব না দিয়ে অঝোরে কান্না করতেই থাকে । চিত্রার মনে এবার ভয় জাগে । শাওনের কান্নার আওয়াজ তাকে কষ্ট দেয় । দূর্বল করে তোলে ।
চিত্রা এবার কন্ঠ কিছুটা খাদে নামিয়ে ক্ষীণ স্বরে বলে,
-মেয়ে হয়েছে বলে কি আপনি খুশি না চৌধুরী সাহেব ? ”
বিষ্ফেরিত চোখে মাথা তুলে চিত্রার দিকে তাকায় শাওন । কান্না করার কারণে মুহুর্তেই চোখ দুটো তার রক্তিম বর্ণ ধারন করেছে । শাওন চিত্রার দুই গালে হাত রেখে নিজের দিকে মুখ ঘুড়িয়ে নেয় ।
বিচলিত গালয় বলে উঠে,
-এটা তুই কেমন কথা বলতেছিস ক'লিজা ? এমন কথা তুই ভুলেও আর কখনো উচ্চারণ করিস নাহ । নয়তো সৃষ্টিকর্তার রুহ কেঁপে উঠবে । তিনি আমার প্রতি বেজার হবেন ৷
আর রইলো আমার খুশির কথা ! কেবল তো একটা মাত্র কন্যা সন্তান আমার ঘরে আসলো । এরকম আরও নিরানব্বইটা কন্যা সন্তানকে আমার ঘরে আনতে হবে তোকে । তার জন্য তুই এখন থেকেই প্রস্তুতি নেওয়া শুরু করে দে । তোর কোনো নিস্তার নেই চিত্রা । আমার ঘরে একশটা কন্যা সন্তান নিয়ে না আসা পর্যন্ত তোর কোনো নিস্তার নেই । ”
চিত্রার মুখে হাঁসি ফুটে । লজ্জায় মাথা নিচু করে নেয় সে ৷ শাওন মিষ্টি হেঁসে চিত্রার কপালে, গালে আর ঠোঁটে চু'মু খায় ।
শাওন এবার চিত্রার কোলে ধরে থাকা বাচ্চাটার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকায় ৷ আবারও তার চোখে মুখে খুশির ঝিলিক বয়ে যায় । চোখের কোণে তার অশ্রু কণারা ভিড় জমায় । সে একহাত চিত্রার ধরে থাকা বাচ্চাটার উপরে রাখে আরেক হাত চিত্রার গালে রাখে ।
ভীষণ মায়াময়ী আদুরে গলায় বলে উঠে,
-ক'লিজা, তোকে বলে বুঝাতে পারবো নাহ আমি আসলে ঠিক কতটা খুশি । প্রথম যখন আমার আর তোর অস্তিত্বের সমন্বয়ে তৈরি হওয়া ছোট্টো প্রাণটাকে কোলে নিলাম ! আমার পুরো দুনিয়া থমকে গেলো । পুরো শরীর কেঁপে উঠলো । মনের মধ্যে জেগে উঠলো কিছু নাম না জানা অনুভূতি । তারা আমায় ভীষণ ভাবে শান্তি দিলো, পুরো শরীর জুড়ে স্নিগ্ধতা ছড়ালো । আমার পুরো দুনিয়াটাকে সুখময় করে তুললো ।
বারবার মস্তিষ্কে এসে বাড়ি খেতে লাগলো; এ আমার বাচ্চা ! এ শাওন আর চিত্রার বাচ্চা । এ শাওন আর চিত্রার ভালোবাসার ফল । এ শাওন আর চিত্রার সমন্বয়ে তৈরি ছোট্টো একটা প্রাণফুল । শাওনের প্রাণফুল ।
চিত্রা তুই ভাবতে পারছিস; ও আমার মেয়ে চিত্রা । আমার মেয়ে । যে কিনা আর কিছুদিন পর আধো-আধো গলায় আমাকে বাবা বলে ডাকবে । আমার গলা জরিয়ে ধরবে । আমার কোলে কান্না করবে ৷ আমার কাছে বয়না ধরবে । আমাকে বাবা বাবা ডাকে মাতিয়ে তুলবে । ভাবতে পারছিস তুই ! কি সাংঘাতিক সেই অনুভূতি । ”
শাওন থামে । তার চোখ জোড়া দিয়ে টপটপ করে উষ্ণ জলের কণা গুলো গড়িয়ে পরে । কিন্তু মুখের মধ্যে তবুও সেই স্নিগ্ধ সুন্দর হাঁসিটা বিরাজমান ।
চিত্রা শীতল চোখে শাওনের দিকে তাকায় । তার চোখের মধ্যেও পানির কণারা চিকচিক করতে থাকে । চিত্রা হাত বাড়িয়ে একহাত শাওনের গালে রাখে । শাওন চিত্রার সেই হাতটা নিজের হাতের ভাঁজে নিয়ে গাড় করে চু’মু খায় ।
আর আবারও গভীর কিন্তু কোমল স্বরে বলে,
-বাবা হওয়ার অনুভূতি যে এতোটা আনন্দদায়ক, এতোটা সুন্দর, এতোটা মায়াময়, এতোটা স্নিগ্ধ, এতোটা সুখময় আর এতোটা শান্তিদায়ক তা আমার জানা ছিল না ক’লিজা ! আজকে আমার এই ছোট্টো পরীটাকে কোলে নিয়ে আমি জানলাম । তার সাথে হাজারো অনুভূতির সঙ্গে পরিচিত হলাম । বারবার মুগ্ধ হলাম । খুশিতে কেঁদে উঠলাম । ”
একটু থেমে হুট করে বলে উঠে,
-তোকে ধন্যবাদ ক’লিজা । আমার জীবনের শ্রেষ্ট একটা উপহার দেওয়ার জন্য তোকে অনেক অনেক ধন্যবাদ ৷ তুই আমার জীবনে আসার পর থেকে দুঃখ কি জিনিস আমি ভুলে গেছি । তুই আমার জীবনে আসার পর থেকে প্রতিটা দিন কেটেছে আমার সুখের গভীর সাগরে পাড়ি দিয়ে । শুধু সুখ আর সুখ । এমন সুখময় জীবন দেওয়ার জন্য তোকে অনেক অনেক ধন্যবাদ ক'লিজা । ”
চিত্রার মনের মধ্যে স্নিগ্ধতা ছড়ায় । ঠোঁটের কোণে পূর্ণতার হাঁসি ফুটে উঠে । মুগ্ধ হয় । শাওনের কথায় আর ভালোবাসায় সে বরাবরই মুগ্ধ হয় ।
শাওন একদৃষ্টিতে চিত্রার দিকে তাকিয়ে থাকে । যেই তাকানোর কোনো শেষ নেই ! শুরু নেই !
চিত্রা শাওনের দিকে তাকায় । আলতো স্বরে ডেকে উঠে,
-চৌধুরী সাহেব ! ”
শাওন চিত্রার দিকে তাকিয়ে থেকে গভীর স্বরে জবাব দেয়,
-হুমমম ! ”
শাওনের হুমম শব্দে চিত্রার বুক কেঁপে উঠে । সে শাওনের দিকে মায়ার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আবদারের স্বরে বলে,
-কাছে আসুন না ! আপনার বুকে মাথা রাখবো তো ।”
শাওন নীরবে হেঁসে দেয় । সে চিত্রার কোলে থাকা বাচ্চাটার কপালে আলতো করে চু'মু দিয়ে, চিত্রার পাশে বেডে হেলান দিয়ে বসে পড়ে । আর খুব যত্নের সাথে মা আর মেয়েকে নিজের বুকের সাথে জরিয়ে নেয় । আ’হহ কি শান্তি । কি সেই প্রশান্তি ।
শাওন চিত্রার চুলের ভাজে গাড় করে চু’মু খায় । প্রশান্তিতে সে চোখ জোড়া পরম আবেশে বন্ধ করে নেয় । চিত্রা এক হাতে মেয়েকে জরিয়ে নিয়ে একহাতে শাওনকে জরিয়ে ধরে ৷ মা মেয়ে দুজনেই ঠাই নেয় শাওনের বিস্তৃত বুকে । যেনো এটাই তাদের একমাত্র ঠাই । হে এটাই তাদের একমাত্র শান্তির ঠাঁই । এখানে শুধু শান্তি শান্তি আর শান্তি । শুধু শান্তি ।
.
চলবে…
❝ বাহ্হ রুদ্র বাহ্ ! এতো তারাতাড়ি এতো সুন্দর একটা পর্ব কিভাবে লিখলি তুই ? তুই তো ভাই জিনিয়াস রে !😁
যাইহোক- আজকের পর্ব ভাই আমার নিজেরই বহুত পচ্ছন্দ হইছে ৷ এই বাবা হওয়ার অনুভূতি গুলো কিন্তু সব লেখকের নিজের ।😌
লেখার সময় আমার বারবার মনে হচ্ছিলো বাবা শাওন না আমি হয়েছি 🫣। ই’সস কি সেই অনুভূতি ৷ লিখতেছিলাম আর পাগলের মতো হাঁসতেছিলাম শুধু । যদিও সব অনুভূতি গুলোকে সুন্দর করে সাজিয়ে গুছিয়ে লিখতে পারিনি ! কিন্তু সুন্দর লিখছি । হে ভাই সুন্দর লিখছি ।
আজকের পর্বটাকে কেউ খারাপ বলিস না ভাই ৷ নাহলে কষ্ট পাব । মেল্লা কষ্ট । তাই ভালো না লাগলেও ভালো বলিস । প্রশংসা করিস । প্রশংসা…😇 ❞