#অপরিপক্ক
#পর্ব_২৩
#যাজিবা_জাবিন
#গ্রামীন_প্লটে_লেখা_সামাজিক_রোমান্টিক_গল্প
(⛔ কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ⛔ চাইলে শেয়ার দিয়ে পাশে থাকতে পারেন)
_____________________________
ধোঁয়া ওঠা গরম ভাতের সঙ্গে সরিষার তেল মাখানো জাম আলু ভর্তা—গ্রামের মানুষের সকালের নাশতার জন্য এর চেয়ে আর কী-ই বা বেশি লাগে! ঘরের বারান্দায় পিড়ি পেতে বসে মজা করে ভাত খাচ্ছিল হাসমত সওদাগর। তার পাশেই বসে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করছিল খবিরুন নেসা। ভাতের ধোঁয়া আর সরিষার তেলের ঝাঁঝ মিশে বারান্দাজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছিল এক ধরনের আপন ঘ্রাণ।
খাওয়া শেষ করেই মাঠে যাবেন হাসমত সওদাগর। জমিতে ধানের চারা লাগানো হয়েছে, সেগুলোর অবস্থা দেখতে হবে, ক্ষেতের কাজে নেওয়া চাষিরা ঠিকমতো কাজ করছে কি না, সেচের কোনো সমস্যা হলো কি না—সবকিছুই তাঁকে নিজের চোখে দেখে তদারকি করতে হয়।
এদিকে আসমানী গিয়েছিল সরকারি টিউবওয়েল থেকে পানি আনতে। এ তো আর সাধারণ কোনো গ্রাম নয়—চরের এলাকা। তার ওপর এমন প্রত্যন্ত গ্রাম, যেখানে প্রতিটি বাড়িতে টিউবওয়েল আনার সামর্থ্য নেই। পুরো গ্রামের জন্য সরকারি ব্যবস্থায় একটি মাত্র টিউবওয়েল। সেটিও আবার দুহাত দিয়ে লোহার হাতল টেনে টেনে চালাতে হয়। যতবার পানি দরকার, ততবারই সেই হাতল নামাতে হয়, আর টিউবওয়েলের মুখ দিয়ে ধীরে ধীরে উঠে আসে মাটির গভীরের ঠান্ডা পানি।
গোসল কিংবা ধোয়াধুয়ির কাজে অবশ্য কেউ টিউবওয়েলের পানি ব্যবহার করে না। সেসবের জন্য পুকুর কিংবা নদীর পানিই ভরসা। টিউবওয়েলের পানি যেন গ্রামের মানুষের কাছে সযত্নে রাখা সম্পদ—শুধু পান করা আর রান্নার কাজেই তার ব্যবহার।
আসমানীর দিনের কাজও তাই পানির হিসাব কষে শুরু হয়। আগের দিন সন্ধ্যায় টিউবওয়েল থেকে যে পানি এনে রাখা হয়, সকালে রান্নার কাজে প্রথমে সেটিই ব্যবহার করে সে। তারপর সকালে আবার নতুন করে পানি আনতে হয়। সেই পানি দিয়ে চলে দুপুরের রান্নাবান্না, খাওয়া-দাওয়া ও দিনের প্রয়োজনীয় কাজ। মাগরিবের আগেই আবার রাতের রান্না ও পরদিন সকালের জন্য দ্বিতীয়বার পানি তুলে আনতে হয় তাকে। রাতের সেই পানি থেকে যতটুকু অবশিষ্ট থাকে, পরদিন সকালে সেটুকুই কাজে লাগে।
এইভাবেই জল, মাটি আর মানুষের পরিশ্রমের সঙ্গে জড়িয়ে আছে চরের জীবন। এখানে এক কলস পানি মানে শুধু পানি নয়—তার সঙ্গে মিশে থাকে দীর্ঘ পথ পেরিয়ে আসা ক্লান্তি, দুহাতের পরিশ্রম আর একটি পরিবারের সারাদিনের হিসাব।
দুই-তিন দফায় পানি এনে রান্নাঘরের মাটির মটকাটা ভরে রাখল আসমানী। তারপর ঠান্ডা পানি সিলভারের জগে ঢেলে সেটাও এনে রাখল হাসমত সওদাগরের সামনে। তখনও পিড়িতে বসে ভাত খাচ্ছিলেন হাসমত সওদাগর।
আসমানী ততক্ষণে মনে মনে কথাগুলো গুছিয়ে নিয়েছে। বুকের ভেতর অনেকক্ষণ ধরে জমিয়ে রাখা কথাগুলো যেন সহজে মুখে আসতে চাইছিল না। তবু সাহস সঞ্চয় করে ধীরে ধীরে হাসমত সওদাগরের দিকে তাকাল সে।
কিছুক্ষণ ইতস্তত করে, নিচু স্বরে আসমানী বলল;
আসমানী:: জেডা একখান কতা আছিল।
হাসমত মাথে নিচু করে খাচ্ছিল ওইভাবেই বললো
হাসমত:: হু কও
আসমানী:: কইতাছিলা কি বু তো এহনো আইতাছে না আর আমারো রাইতে এইনো এলহা (একা) হুততে ডর লাগে তয়
হাসমত এবার ভাতের থালা থেকে চোখ উঠিয়ে তাকালো, তা দেখে আসমানী কথা থামিয়ে দিলো তার ভয় লাগছে
হাসমত:: তয় কি ?
কথাটি বলেই দু-ভ্রু কুঁচকে আসমানীর দিকে তাকাল হাসমত সওদাগর। আসমানী শুকনো ঢোক গিলে মাথা নিচু করে তাকিয়ে রইল নিজের কাদায় মাখা পা দুটির দিকে। মুখে কোনো কথা নেই, চোখেও চোখ রাখার সাহস নেই।
এই সময় খবিরুন নেসার গলা শোনা গেল-
খবিরুল::কী কইবার চাও, কও না কেন?
কয়েক দিন ধরেই স্বামীর আচরণে একটা পরিবর্তন লক্ষ করছেন খবিরুন নেসা। আসমানীর প্রতি আগের সেই স্নেহের দৃষ্টি আর নেই হাসমত সওদাগরের। আগে মেয়েটার সঙ্গে নরম গলায় কথা বলতেন, সামান্য ভুলত্রুটিতেও তেমন কিছু বলতেন না। অথচ ইদানীং তাঁর কথাবার্তায় কেমন যেন কঠিন সুর। সামান্য কিছুতেই বিরক্ত হয়ে ওঠেন, কণ্ঠে ঝরে পড়ে অকারণ রাগ।
খবিরুন নেসা তাই চাইছিলেন না, সকালের শুরুতেই হাসমত সওদাগরের মেজাজটা আরও খিটখিটে হয়ে উঠুক। সেই কারণেই কথাটা আর না বাড়িয়ে দ্রুত শেষ করে দিতে চাইছিলেন তিনি। কিন্তু আসমানীর নীরবতা যেন বারান্দার বাতাসটাকেও ভারী করে তুলেছিল।
আসমানী::বুজানের হোরবাইত (শশুর বাড়ী) যাই নাই কুনুদিন, মেলা যাইবার ইচ্ছা,দাদি যহন এহনো হেইনোই আছে আমি গিয়া হেরে লইয়া আই?
হাসমত:: না কুনু দরহার নাই,মায়া আইবার চাইলে হের নাতজামাই আছে তারে দিয়া যাইবার লাইগা আর তোমার যদি খুব ডর ধরে রাইতে, তয় হেই বারিত যাওগা তোমার বাপ মায়ের কাছে।
কড়া গলায়, কাট-কাট উত্তর দিল হাসমত সওদাগর। কথাটা বলেই আর কোনো দিকে না তাকিয়ে গামছা দিয়ে হাত মুছতে মুছতে সোজা বাড়ির বাইরের পথ ধরলেন তিনি।
স্বামীর কথায় অবাক হয়ে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে বসে রইল খবিরুন নেসা। আসমানীকে যে ওই বাড়িতে কেউই তেমন একটা জায়গা দিতে চায় না, সে কথা তো হাসমত সওদাগরও জানেন। তাহলে আজ এমন করে কথাটা বললেন কেন?
চিন্তিত মুখে আসমানীর দিকে তাকাল খবিরুন নেসা। মেয়েটা এতক্ষণ মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে ছিল। এবার হঠাৎ করেই তার চোখের পানি গড়িয়ে পড়ল গাল বেয়ে। ঠোঁট কাঁপতে লাগল নিঃশব্দে কেঁদে উঠল আসমানী।
খবিরুন নেসা কিছুই বুঝতে পারলেন না। কী হয়েছে তাদের দুজনের মধ্যে? কেনই বা হাসমত সওদাগর আসমানীর সঙ্গে এমন কঠিন ব্যবহার করলেন? প্রশ্নগুলো একের পর এক মনে উঁকি দিতে লাগল তাঁর। উদ্বিগ্ন চোখে তিনি তাকিয়ে রইলেন কাঁদতে থাকা মেয়েটার দিকে।
*************************
ঘষেটি:: কিগো আব্বা এমন কঠিন জর বান্ধাইছো কিবা? গাও ডা তো পুইড়া যাইতাছে,ঐ খালেদা খারাই আছোস কা, চালাইয়া যা তাগাড়ি (বড় বাটি) ভইরা পানি লইয়া আয় মাতাত
(মাথায়) ঢালুন লাগবো।
মিলনের ঘরেবাড়ির প্রায় সবাই উপস্থিত, শুধু বাদল মাস্টার নেই। কিছুক্ষণ আগেও মিলন আর রেবেকার মধ্যে যে কথোপকথন চলছিল, ঘষেটি বেগমের দ্বিতীয় দফায় মাটির চাকাটা কাঠের দরজায় ছুড়ে মারার শব্দে তারও ইতি টানতে হয়েছিল।
রেবেকা দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে আসতেই ঘষেটি বেগম তাকে নানা কথা জিজ্ঞেস করতে লাগলেন। কিন্তু রেবেকা সেসব প্রশ্নের কোনো উত্তর না দিয়ে শুধু মিলনের জ্বরের কথাটাই জানাল। কথাটা কানে যেতেই বাড়ির সবাই যেন একসঙ্গে ছুটে এলো মিলনের ঘরে।
জ্বরে ভালোভাবেই কাবু হয়ে পড়েছে মিলন। শরীরটা যেন আগুনের মতো পুড়ে যাচ্ছে। চোখ দুটো মেলে তাকানোর শক্তিটুকুও নেই বেচারার। কষ্টে একবার চোখের পাতা তুলতে গেলেও আবার তা নিস্তেজ হয়ে নেমে আসছে। মুখটা বিবর্ণ, ঠোঁট শুকিয়ে কাঠ; জ্বরের তাপে নিঃশ্বাসগুলোও যেন ভারী হয়ে উঠেছে।
মিলনের এমন অবস্থা দেখে ঘরের ভেতর মুহূর্তেই নেমে এলো উৎকণ্ঠার ছায়া। কারও মুখে আর আগের মতো স্বাভাবিক কথা নেই—সবার চোখেমুখে শুধু একটাই প্রশ্ন, জ্বর কখন আসলো।
ছেলের গায়ে হাত দিতেই খালেদা হায় হায় করে উঠল।
খালেদা::ওরে আল্লাহ ! এ যে গা পুড়াইয়া গেলো জ্বরে, আমার আব্বার কী হইল রে, ও আব্বা ও মিলন চোখ খোল আব্বা
ঘষেটি:: আহ্ থাম দেহি চিল্লাইছ না,পানি আন মাতাত ঢালি আর ওসুদ আনবার পাডা কাওরে।
খালেদা খাতুন এবার রেবেকার দিকে তাকিয়ে বিলাপের সুরে বলে-
খালেদা:: ও বৌউ রে বৌউ আমার পুতের গায় জর আইছে কিবায় রে?এত জর গায় আর তুই এহন কইছোস রে ! আরো সহালে কইলেনা কেন রে ! সহালে তোর হোউরে বারিত আছিল রে ,ও মাবুত মাবুত রে আমি এহন কি করতাম রে কি করতাম রে।
দুই হাতে মাথা চেপে ধরে খালেদা খাতুন কথা গুলো বলছিলো,তা দেখে ঘষেটি বেগম বিরক্ত সুরে বলে।
ঘষেটি:: ওরে ছিনাল ছিনাল রে, কি পেচালডাই শুরু করছোস পুরাই আমেনা বেগমের সুর টানবার লাগছোস দেহি!? একলগে একবারিত থাইহা
খবিশের বাতাস তো বালাই লাগে গায় ! একদম খানবিড়া(জবরদস্ত) ধাচের হোওরি হইতাছোস দেহি?!তোর পুতে কাইল রাইতে মেঘের ভিতরে ভিইজা বারিত আইছে যানছ না নাহি?!হের লাইগা জর আইছে। যেমনে বিলাপ পাইরা বৌরে ডাকতাছোস যেন সব দুষ বৌয়ের! এই তামশা বাদ থুইয়া পানি আন মা গি ।
এতক্ষণ ধরে নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা রেবেকা শাশুড়ির চিন্তিত কথাগুলো শুনে আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। হঠাৎ করেই অজানা এক ভয় তার বুকের ভেতর চেপে বসল। চোখের পাতা ভারী হয়ে এল, হঠাৎ স্মরণ হলো একটা বিষয়।
গত বছর জ্বরে ভুগেই তো পাশের বাড়ির আম্বিয়ার জামাই মারা গিয়েছিল। সেই থেকে বিধবা আম্বিয়া বাপের বাড়িতেই থাকে। মাঝেমধ্যে এই বাড়িতেও আসে। রেবেকার মনে পড়ল, রংহীন সাদা কাপড়ে মোড়া আম্বিয়ার সেই কঙ্কালসার দেহের কথা। শুকনো খড়িকাঠির মতো শরীর, রুক্ষ, বিবর্ণ ত্বক
হঠাৎ সামনে পড়লে আম্বিয়াকে ভূত মনে হয় রেবেকার।
সেই দৃশ্যটিই যেন মুহূর্তে চোখের সামনে ভেসে উঠল তার। আতঙ্কিত রেবেকা মিলনের জ্বরে কাবু মুখটার সঙ্গে আম্বিয়ার মৃত স্বামীর কথা মিলিয়ে গেল মনে।
ভাবনাটা মাথায় আসতেই বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল রেবেকার। আর নিজেকে ধরে রাখতে পারল না সে। দু-হাত দিয়ে মুখ ঢেকে শব্দ করে কাঁদতে শুরু করল।
ঘরের সবাই তখন মিলনকে ঘিরে উৎকণ্ঠায় দাঁড়িয়ে। রেবেকার কান্নায় তাদের দুশ্চিন্তার সঙ্গে যেন আরও এক স্তর ভয়ের ছায়া এসে মিশল।
উদ্বেগে ঘরের বাতাসটাও যেন ভারী হয়ে উঠল। বাদল মাস্টার এখন স্কুলে। ছেলের জন্য হাট থেকে জ্বরের ওষুধ আনাটা সহজ বেপার না, কিন্তু কাকে দিয়ে আনাবেন—সেই চিন্তায় পড়ে গেলেন খালেদা।
মাসুদও বাড়িতে নেই। আর কলি তো অন্তঃসত্ত্বা; তাকে এমন অবস্থায় বাইরে পাঠানোর কথাই ওঠে না। রেবেকাও এই বাড়ির বউ—তাকে এমন কাজে পাঠানোও যেন সহজ নয়।
খালেদা খাতুন আর দাঁড়িয়ে রইলেন না।বিলাপ করতে করতে ছুটে গেলেন পানি আনতে। সেই সঙ্গে জরিনারও খোঁজ করতে লাগলেন। এই মুহূর্তে জরিনা ছাড়া হাট থেকে ওষুধ আনানোর আর কোনো উপায় নেই।
রেবেকার গুনগুন করে কাঁদার শব্দ জ্বরে কাতর মিলনের কানে ঠিকই পৌঁছাচ্ছিল। কিন্তু চোখ মেলে তাকানোর কিংবা কথা বলার মতো শক্তিটুকুও তার শরীরে অবশিষ্ট নেই। এমনিতেই জ্বরে শরীর ভেঙে পড়েছে, তার ওপর গতকাল সকালে সে শেষবার খাবার খেয়েছিল, চব্বিশ ঘণ্টায় পেটে পড়েনি একমুঠো খাবার—শুধু পানি আর বিড়িতেই কাজ চালিয়ছে। তাই দুর্বলতা যেন আরও জেঁকে বসেছে শরীরে।
রেবেকার কান্না দেখে কলিও আর নিজেকে সামলে রাখতে পারল না। চোখের পানি মুছতে মুছতে সেও কেঁদে ফেলল।
কলি::ভাউজ, কাইন্দেন না। মিয়াভাই ঠিক হইয়া যাইবো।
কলির কথার সুর ধরেই ঘষেটি বেগমও সান্ত্বনা দেওয়ার চেষ্টা করলেন।
রেবেকা:: ব বড়মা হেরে কইন না চোখ মেলবার, আমার বহুত ডর লাগতাছে।
ঘষেটা::মিলন বউ, কাইন্দ না শান্ত থাহ। কিছু হইতো না।
কথাগুলো মুখে বললেও ঘষেটি বেগমের নিজের বুকের ভেতরটাও যে ভয়ে কাঁপছিল, তা তাঁর চোখেমুখের উৎকণ্ঠা দেখলেই বোঝা যাচ্ছিল। মিলনের জ্বরের তাপে পুড়ে যাওয়া মুখটার দিকে তাকিয়ে তিনিও মনে মনে অজানা আশঙ্কায় ডুবে যাচ্ছিলেন।
_______________
গ্রামে জ্বর মানেই একরকম আতঙ্ক। চিকিৎসার সুযোগ সুবিধার খুবই খারাপ ব্যবস্থা। হাতের কাছে ডাক্তার, হাসপাতাল কিংবা ওষুধের ব্যবস্থা কিছু না। তাই সামান্য জ্বরও ভয়ংকর রূপ নেয়। অনেক সময় কয়েক দিনের জ্বরেই মানুষ নিস্তেজ হয়ে পড়ে, আর চিকিৎসার অভাবে শেষ পর্যন্ত মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে।
বিশেষ করে বর্ষাকাল ও মশাবাহিত রোগের সময় গ্রামে ঘরে ঘরে জ্বর ছড়িয়ে পড়ে। কবিরাজের ঝাড়ফুঁক, গাছগাছড়ার ওষুধ কিংবা ঘরোয়া চিকিৎসাই হচ্ছে অনেকের শেষ ভরসা। তাই কোনো বাড়িতে কারও গায়ে তীব্র জ্বর উঠলে শুধু অসুখের চিন্তা নয়, আপনজনকে হারানোর ভয়ও ছায়ার মতো নেমে আসে।
____________
খালেদা খাতুন পানি নিয়ে এসে ঘষেটি বেগমের হাতে বড় পলিথিন আর মগটা ধরিয়ে দিয়ে আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালেন না। বাড়ির পেছনের চাষের মাঠের দিকেই ছুটলেন। রজিনা আর তার স্বামীও সেদিকের মাঠেই কাজে গেছে। পানি আনতে গিয়েই খোঁজ নিয়ে এসেছেন তিনি।
ঘষেটি বেগম মিলনের মাথার নিচ থেকে বালিশটা সরিয়ে নিলেন। তারপর মাথার নিচে পলিথিন বিছিয়ে মগে করে পানি তুলে মিলনের মাথায় ঢালতে শুরু করলেন। বালিশ সরাতে গিয়েই তাঁর চোখ পড়ল মাটিতে পেঁচিয়ে রাখা নতুন তোষকটার দিকে। তোষকটা মাটিতে নামানো কেন—প্রশ্নটা এক মুহূর্তের জন্য মনে উঁকি দিল। কিন্তু পরক্ষণেই মিলনের দিকে মনোযোগ ফেরালেন তিনি। তোষক মাটিতে কেন, সে কথা পরে জানা যাবে।
কয়েক মিনিট ধরে মিলনের মাথায় পানি ঢালা হচ্ছে। রেবেকা ঘষেটি বেগমের ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে মিলনের মুখের দিকে। তার ছোট্ট মনটা ব্যাকুল হয়ে অপেক্ষা করছে—এই বুঝি মিলন চোখ মেলে তাকাবে, এই বুঝি আগের মতো তাকে দেখে একটা কথা বলবে। কিন্তু মিলনের চোখ খুলছে না।
ছোট মানুষের মন বড় বেশি আবেগপ্রবণ হয়। সামান্য কষ্টেও তাদের বুক ভেঙে যায়, সামান্য আশাতেও চোখ জ্বলে ওঠে। রেবেকাও তার ব্যতিক্রম নয়।
ছোট্ট রেবেকার কান্না কিছুতেই থামছে না। একসময় ঘষেটি বেগমকে পাশ কাটিয়ে সে মিলনের মাথার কাছে চলে গেল। ঘরে আরো দুজন মানুষ উপস্থিত,সে কথা যেন একেবারেই খেয়াল করল না। মিলনের মুখের ওপর ঝুঁকে পড়ে নিজের ছোট্ট কোমল হাত দুটো দিয়ে আলতো করে আঁকড়ে ধরল জ্বরে লাল হয়ে ওঠা মিলনের গরম গাল।
কান্নায় ভেজা, কাঁপতে থাকা কণ্ঠে সে ডাকল;
রেবেকা:: এই এইযে হুনুইন না, এই দেহুইন এই যে আমি চোখ মেলুইন না, আমার ডর করতাছে দেহুইন না, কতবেইল (কিছুক্ষণ) আগেই তো কতো কতা কইলাইন এহন কইতাছুইন না কে ? এই উডুইন আমি কানতাছি আন্নে হুনতাছুইন না কে? আন্নে না উডলে আমি আরো কানবাম কিন্তু।
চলবে............