উপন্যাসের নাম : মায়ার শেষ প্রহর
লেখিকা : জান্নাতুল মাওয়া
#কপি করা নিষিদ্ধ
আমার তো অতো ও বয়স হয়নি আম্মু, তাহলে কেনো এতো উতলা হচ্ছো? আমি শুধু এইচএসসি পরীক্ষা টা দিতে চাচ্ছি তার পর না হয়..
চুপ থাকো যা করছি তোমার ভালোর জন্য করছি, আমাদের কী তোমার বিশ্বাস হয় না? তোমার বাবা মা হয়ে আমারা কী তোমার খারাপ চাইবো ? ছেলে ভালাে পরিবার ভালাে,তার থেকে বড় কথা তোমাকে তাদের খুব পছন্দ হয়েছে আর তোমার বাবার দিকটা দেখো একবার,, তোমাকে বিদায় দিতে পারলে আমাদের মাথার থেকে একটা বোঝা নামবে বুঝো না তুমি ? আর কিছু শুনবো না আমি,
এই জায়গায় তোমার বিয়ে হবে, শেষ কথা বলে গেলাম আমি।
নাছিমা বেগন তরতর করে উঠে চলে গেলেন,
মেহরিমা একই জায়গায় বসে চোখের পানি মুখের পানি এক করতে শুরু করলো!
তখুনি ওর দাদু এলেন আদুরে নাতনিকে কাদঁতে দেখে নিজের চোখের পানি ও আর আটকাতে পারলেন না জমেলা খাতুন নাতনীর পাশে বসে তারও চোখ থেকে কয়েক ফোটা পানি পরলো, দাদি কে সামনে পেয়ে আবারো ডুকরে কাদেঁ উঠলো মেহরিমা,,
মিনিট দুয়েক নৈশব্দ রইলো...
অতঃপর নিরবতা ভেঙ্গে জমেলা খাতুন বলতে আরম্ভ করেন,,
যখন আমার বিয়ে ঠিক হয় তখন আমার বয়স ছিল মাত্র ১৩। আব্বা কখনোই আমাকে জিজ্ঞেস করে এই কাজ করতেন না,কিংবা তখন তা করা হতো না, তিনি আমার বিয়ে ঠিক করেন,, তোমার দাদা মানে আমার খালাতো ভাইয়ের সাথে,, তখন ভাইজানকে আমি ভয় পেতাম চোখ তুলে কোনদিন খালাতো ভাই, বোন কিংবা কোন বড় ভাই বোনের দিকেই তাকাইনি পর্যন্ত। যে মানুষটার সঙ্গে দুটু কথা হয়নি জানি না সে কেমন, তার সঙ্গে আমার বিয়ে ঠিক হয় আর বিয়ে করব না বলার মতন কোন সাহস কিংবা পিছুটান আমার কোনোটাই ছিল না। তাই চুপচাপ বিয়ের পিঁড়িতে বসে পড়লাম, আর জানো আমি ঠকিনি আমার আব্বা আম্মা আমার জন্য এই সিদ্ধান্ত নিয়েছেন আমি খুব খুশি আছি,,,তারপর কিছুক্ষণ মৌন রইলেন জমেলা খাতুন ,,,
কান্না বন্ধ করে দাদির দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে মেহেরিমা হয়তো বোঝার চেষ্টায় আছে তার দাদু আসলে কি বোঝাতে বা বলতে চাইছেন,,
সেই নীরবতা ভেঙে আবারো জমেলা খাতুন বলতে শুরু করলেন ,, বিয়ের পর প্রথম প্রথম তোমার দাদাকে অনেক ভয় পেতাম, কিচ্ছুটি বলার সাহস পর্যন্ত পেতাম না, কিন্তু সে ভয় তোমার দাদা আমার কাছ থেকে দূর করছে , আমরা যে ভয় পাই ভুল ভয় পাই, বাবা-মা আমাদের কখনো খারাপ চাইবো না, তবে ভাগ্যের দরকার ও হয়, আমাদের মধ্যে ভয় থাকবে , মানুষ হলে ভয় থাকবেই, কিন্তু নিজের ভাগ্যের উপর ভরসা রাখো, দেখবে ভালো কিছু হবে।
আর কিছু বলার প্রয়োজন মনে করলেন না জমেলা খাতুন, উঠে চলে গেলেন।
আর মেহেরিমা দাদুর যাওয়ার পানে চেয়ে রইল, হয়তো তারও আর কিছু বোঝার মতো নেই , সে বুঝেছে খুব করে বুঝেছে,,
সে ভাগ্যের উপর বিশ্বাস রেখেছে। নিশ্চয়ই উপরওয়ালা যা করবেন ভালোর জন্যই করবেন,,,
কিন্তু?
মনে যে ভয় সেটা দাদু জানে না, জানলে দাদু এমনটা বলতো? আমাকে এ কথাগুলো বলত নাকি অন্য কিছু বলতো??
তখনই ওর রুমের থেকে ডাক পড়ে,,
ডাকটা অবশ্য ওর বোন ফাহিমা দিয়েছে,
ফাহিমা মেহেরিমার বড় বোন গত বছর কোরবানি ঈদে ফাহিমার বিয়ে হয়েছে স্বামী একজন আর্মি অফিসার , নাম সাইফ শাহেদ, বোনকে দেখে আবারও কিছুটা আশ্বস্ত হলো রমনী,
ফাহিমা আপুর তো এরেঞ্জ ম্যারেজ তবে সে যে বড্ড সুখে আছে। তার চোখ মুখের গ্লো শরীরের গঠন দেখেই বোঝা যায় , সে বড্ড সুখে আছে,
আমার সাথে নিশ্চয়ই ভালো কিছু হবে,,
আবারও রুম থেকে ডাক আসে ফাহিমার এবার আর বসে রইলো না মেহেরিমা এক ছোটে বোনের কাছে গেলো,,,,,
কিরে আপু কি হয়েছে এমন ভাবে ডাকছিস কেন??
কি বলল রে আম্মু???
আর কি বলবে তোর মা জীবনেও আমার কথা শুনবে ? শুধু শুধুই আমার কথাগুলোর অপচয় হলো,
ফিক করে হেসে ফেলল ফাহিমা,,
বলল জানতিতো কেন শুধু শুধু কথাগুলোর অপচয় করলি??
বাদ দে তো ভালো লাগছে না আমার এই সমস্ত কথা শুনতে, এই আপু তুই কি ওই লোকটার ছবি দেখেছিস?
ফাহিমা একটু টিটকারি নিয়েই বলল কোন লোকটার কথা বলছিস হুমমম?
তরতর করে মেহেরিমার রাগ উঠে গেল, আপু তুই তো জানিস আমি কার কথা বলছি "অবশ্যই যার সাথে আমার বিয়ের কথা চলছে তার কথাই বলবো আর কার কথা বলবো শুনি ??
হ্যাঁ তাও কথাই লোকটাকে,,উমমম লোক না দুলাভাই,, দুলাভাইকে আমি দেখেছি বেশ সুদর্শন ,,
আপু সুদর্শন হোক বা যেমন , তুই তো জানিস আমার কি নিয়ে এত ভয়,
ফাহিমা এবার একটু সিরিয়াস হলো,
বোনের হাত ধরে টেনে এনে নিজের পাশে বসালো, মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বলল চিন্তা করিস না পাগলি ওমন কিছুই হবে না আর উনি নিশ্চয় তোর থেকে পারমিশন নেবেন তখন তোর যা বলার তাই বলবি একদম ঘাবড়াবি না,, আর শুন লোকটাকে যতটা সুদর্শন দেখছি আমার মনে হয় লোকটা ততটাই ভদ্র হবে.
মেহেরিমা মাথা তুলে তাকালো বোনের দিকে চোখের কোনে কিছুটা জল জমেছে মেয়েটা সেটা চোখের মাঝেই শুষে নিয়ে বোনকে ঝাপটে জড়িয়ে ধরল,,
অতঃপর কান্না মিশ্রিত কন্ঠে বলল আমি পারবো না আপু আমি পারবো না,
বোনকে নিজের বুকে লুকিয়ে এইবার ফাহিমাও কেঁদে ফেললো,,
দুইদিন পর,
বাড়িতে উৎসব উৎসব আমেজ,, আজ ও বাড়ি থেকে মানুষ আসবে, ছেলে এখনো দেশের বাইরে ব্যবসার কাজে দুবাই আছে, ফিরতে আরো দু- মাস সময় লাগবে ,, যেহেতু মেয়ের পরিবার এবং ছেলের পরিবার দুপক্ষের পছন্দ হয়ে গেছে,,
তাই মেয়েকে তারা আংটি পরিয়ে রেখে যেতে চান।
দুমাস পর ছেলে এলে একেবারে বিয়ে দিয়ে মেয়েকে বাড়িতে তুলবেন।।
সেই সুবাদে দুই পরিবারের লোকজন একসাথে হয়ে আজ এনগেজমেন্ট করিয়ে যাবেন এবং বিয়ের দিন তারিখ ঠিক করে যাবেন,
ফাহিমা মেহেরিমা কে সাজিয়ে দিচ্ছে, তখনই ছাবিহা দৌড়ে ঘরে এসে জানালো ছেলের পরিবার চলে এসেছেন, ছাবিহা মেহেরিমার ফুফাতো বোন,,, ছোট ফুপুর দুই মেয়ে এক ছেলে ছাবিহা মেহেরিমা সম বয়সি হওয়ায় তারা অত্যন্ত ক্লোজ ফ্রেন্ড এর মতোই ,,
ছাবিহার কথা শুনে মেহেরিমার বুক ধুকপুক শুরু হয়,
ফাহিমা বললো,
আমি বরং যাই মায়ের কাছে ছাবিহা তুই মেহেরিমার কাছেই থাক,,
বলেই ফাহিমা চলে গেলো,,
মেহেরিমা তুই খুশি তো???
মেহেরিমা মুচকি হেসে বললো,, খুশি কেনো হবো না শুনি??? পাগল তুই?
ছাবিহা আর কিছু বললো না,
ওইদিকে সবাই এসে বসেছে ড্রইংরুমে,
কুশুল বিনিময়ের পর, হালকা নাস্তা শেষে ডাক পরলো মেহেরিমার,
যাওয়ার সময় হয়ে এসেছে সেই কথা শুনেই মুখের রক্ত শুকিয়ে গেছে রমনীর,, ফাহিমা আর ছাবিহা ওকে নিয়ে যেতে এসেছে,
রুম থেকে ড্রইং রুমে যেতে সর্বোচ্চ ২০-৩০ সেকেন্ড লাগে তবে আজ মেহেরিমার কাছে মনে হচ্ছে ৩০-৪০ মিনিট লেগে যাচ্ছে যেতে,,
ওকে বসানো হলো সবার মাঝে ছেলের মায়ের পাশে
সবাইকে সালাম দিয়ে বসলো মেহেরিমা অতঃপর শুরু হলো আংটি পরানোর কার্যক্রম, ছেলের মা মেহেরিমাকে একটি স্বর্নের আংটি পরিয়ে দেন,,
সবাই আলহামদুলিল্লাহ বললো, ছেলের মা মিসেস জাকিয়া সুলতানা ওর হাতে দশ হাজার টাকা গুজে দিয়ে বললো,
নাও কিছু খেও কেমন,
অতঃপর মেহেরিমাকে ভেতরে আনা হলো,