ফন্ট সাইজ:
থিম:
মোহাব্বত কী দাস্তান

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: ইসরাত জাহান এশা
#মোহাব্বত__কী__দাস্তান__পার্ট_০৬
#ইসরাত___জাহান__এশা
-আজ ঘুম থেকে উঠতেই বেশ দেরি হয়ে গেল। চোখ মেলে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বুঝলাম, সকালের অনেকটাই গড়িয়ে গেছে। তাড়াহুড়ো করে বিছানা ছেড়ে বাইরে বেরোতেই দেখি, মাহনুর আর তার আব্বু দু'জনে মিলে হাসি-আনন্দে খেলায় মেতে আছে। বাবা-মেয়ের সেই নির্মল মুহূর্তটা দেখে অজান্তেই আমার ঠোঁটের কোণে এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
আমি দ্রুত ফ্রেশ হয়ে নাস্তা তৈরির উদ্দেশ্যে রান্নাঘরের দিকে গেলাম। কিন্তু রান্নাঘরে পা রাখতেই দেখি, পাস্তা আগেই রান্না করে সুন্দর করে ঢেকে রাখা হয়েছে। আর বুঝতে বাকি রইল না—এটা নিশ্চয়ই মাহনুরের আব্বুরই কাজ। বুকের ভেতর একরাশ মুগ্ধতা আর প্রশান্তি ছড়িয়ে পড়ল।
নাস্তা শেষ করেই দুপুরের রান্নার প্রস্তুতি নিতে শুরু করলাম। আজ আমাকে হসপিটালেও যেতে হবে, তাই বের হওয়ার আগে সব রান্না গুছিয়ে রেখে যেতে চাই।  
কিছুক্ষন পর মাহনুরের আব্বুর ঘাড়ে চেপে মাহনুর নামছে আর নানান ধরনের অবাস্তবিক কথা বলছে যেমন,  সূর্য ধরা যায় না কেনো?  সূর্যের রঙ নীল হয়না কেনো?  চাঁদ গোলাপি হয়না কেনো?  ওর প্রশ্ন শুনে আমার তো হাসি পাচ্ছিলোই সাথে মাহনুরের আব্বু দাম্ভিকতার সহিতে ভুজুংভাজুং বুঝিয়ে যাচ্ছে। চুলোয় তরকারি বসিয়ে মাহনুরের আব্বুর কাছে গিয়ে কপালে হাত রেখে দেখলাম জ্বর তেমন একটা নেই খুব কম।  আমার দেখাদেখি মাহনুরও তার বাবার কপালে হাত রেখে বললো, 
“ বাবা “
“ বলেন আম্মাজান। “
“তোমাল জল হছে? “
মাহনুরের আব্বু মাহনুরের  ছোট ছোট হাতে ঠোঁট ছুয়ে বললো, 
“ হ্যাঁ  আম্মাজান অল্প জ্বর। “
মাহনুর ওর বাবার গালে হাত রেখে কান্না ভিজা স্বরে বললো, 
“ কত্ত হচ্চে অনেত? “
“ না আম্মাজান আমি ঠিক আছি।  আমার আম্মাজান আমার সাথে আছে তাহলে কষ্ট হবে কী করে? “
মাহনুর ওর বাবার মাথা ধরে বললো, 
“ বাবা আমি তোমাল মাতা তিপে দেই।  তাইলে আল কত্ত হবে না তোমাল বাবা। “
মাহনুরকে টেনে মাহনুরের বাবার কোলে বসিয়ে বললো, 
“ না আম্মাজান আপনার কষ্ট হবে।  আসেন তো আপনি বাবার বুকে শুয়ে বাবার বুকটা একটু ঠান্ডা করুন। “
মাহনুর ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে বললো, 
“ কি হছে তোমাল বুতে। “
“ আপনি তো আমায় আর ঘুম অয়াড়িয়ে দেন না আম্মাজান।  তাই বুকে অনেক ব্যাথা। “
মাহনুর ওর আব্বুর দুই গাল ছোট ছোট হাতের আজলায় নিয়ে বললো, 
“ অনেত বিথা বাবা। “
“ হ্যাঁ  আম্মাজান খুব ব্যাথা। “
মাহনুর দাঁড়িয়ে ওর বাবার মাথা নিজের বুকে জড়িয়ে ধরে মাথায় চুমু দিয়ে বললো, 
“ বাবা আমি আদল দিয়ে দিছি আল বিথা হবে না বাবা।  আমিতো তোমাল আম্মাজান। “
মাহনুরের বাবা মেয়েকে জড়িয়ে ধরলো।  অবাক করার বিষয় হলো আর ওর চোখে  পানি। আমি কাছে যেতেই ওর আব্বু আমায় বললো, 
“ দেখো রিমঝিম আমার মেয়ে আমায় কতো ভালোবাসে।  আমি এক মায়ের দেখা হয় না কতটা বছর ধরে আর আল্লাহ পাক আমাদের ঘরে আরেক মা পাঠিয়েছেন।  আমরা কতটা লাকি তাই না রিমঝিম। “
মাহনুরের আব্বুর চোখে পানি দেখে মাহনুর ওর চোখের পানি মুছিয়ে বললো, 
“ বাবা কাদু কেনু? “
মাহনুরের আব্বু হেসে মেয়েকে আদর দিয়ে বললো, 
“আমার  আম্মাজানের  থেকে আদর পেয়ে আমার কান্না এসে পড়েছে মা। “
মাহনুর খিলখিল করে হেসে বললো, 
“ বাবা আমি তোমাল মা নাগি ? “
মাহনুরের আব্বু হেসে বললো, 
“ হ্যাঁ  আম্মাজান আপনি আমার মা লাগেন। “
মাহনুর কোমড়ে হাত রেখে  বললো, 
“ না বাবা আমি তোমাল আম্মাজান নাগি।  আমি তো আম্মুল মা নাগি। বুজেছো বাবা “
মাহনুরের বাবা হেসে বললো, 
“ হ্যাঁ  আম্মাজান আমি বুঝেছি। “
“ আমাল নক্কি বাবা। “
★
দুপুরের রোদ তখন ধীরে ধীরে নরম হতে শুরু করেছে। প্রয়োজনের তাগিদে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে পড়লাম আমি। আমার পেছনে রয়ে গেল আমার দুই প্রাণ—মাহনুর আর তার আব্বু। আমি দরজা পেরিয়ে চোখের আড়াল হতেই ঘরটাও যেন তাদের দু'জনের ছোট্ট রাজ্যে পরিণত হলো। মাহনুরের আব্বু নিজের হাতে মেয়েকে পরিপাটি করে সাজিয়ে দিল। আদরভরে চুলগুলো আঁচড়ে ছোট্ট একটি ক্লিপ লাগিয়ে দিল, পছন্দের জামাটি পরিয়ে দিয়ে বলল,
"চলেন  আম্মাজান  আজকে আমরা দু'জন একটু ঘুরে আসি।"
বাবার হাত শক্ত করে মুঠোয় নিয়ে খুশিতে আত্মহারা মাহনুর বেরিয়ে পড়ল। ফুটপাত ধরে পাশাপাশি হাঁটছে বাবা আর মেয়ে। ছোট্ট দুটি পা কখনো বাবার গতির সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাঁটছে, আবার কখনো প্রজাপতির মতো এদিক-ওদিক ছুটে যাচ্ছে। চারপাশের ব্যস্ত শহর, ছুটে চলা মানুষের ভিড়, যানবাহনের শব্দ—কিছুই যেন তাদের আপন জগতের আনন্দটুকুকে স্পর্শ করতে পারছে না। হাঁটতে হাঁটতে রাস্তার ধারে এক ফুচকার দোকানের সামনে এসে মাহনুর থমকে দাঁড়াল। গোল গোল চোখে তাকিয়ে ছোট্ট আঙুল তুলে মিষ্টি কণ্ঠে বলল,
"বাবা ... আমি পুচকা কাব।"
“ না আম্মাজান এগুলো পচা জিনিস খেতে হয় না। পরে পেটে অসুখ হবেতো আম্মাজান।  “
মাহনুর রাস্তার মাটিতে বসে বুকে হাত গুজে বললো, 
“ তুমি আমায় পুচকা কিনে দিবে নাতু বাবা। মাহনুর তুমাল চাতে আল কুথা বুলবে না আলি তুমাল চাতে। “
এই বলে মুখ ফুলিয়ে বসে থাকে।  মেয়ের আবদার শুনে মাহনুরের আব্বুর ঠোঁটে এক টুকরো প্রশান্তির হাসি ফুটে উঠল। বিন্দুমাত্র দেরি না করে সে দোকানের সামনে গিয়ে মেয়ের জন্য ফুচকা কিনল। ছোট্ট দুই হাতে ফুচকার বাটি ধরিয়ে রেখে মাহনুরের আব্বু একেকটি ফুচকা মুখে তুলে দিচ্ছে, আর প্রতিবারই তার মেয়ের  মুখভরা হাসি আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছে। টক, ঝাল আর মিষ্টির স্বাদে তার চোখ দুটো আনন্দে চিকচিক করছে। সেই দৃশ্য দেখে মাহনুরের আব্বু শুধু মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল। সন্তানের মুখের এক চিলতে হাসিই যেন তার সমস্ত ক্লান্তি, সমস্ত অবসাদ নিমিষেই দূর করে দিল। পৃথিবীর সবচেয়ে দামী সুখ হয়তো এমনই—নিজের সন্তানের হাসিমাখা মুখের দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে থাকার নামই বাবা হওয়ার পরম তৃপ্তি। 
মাহনুরের ফুসকা খাওয়া শেষ হলে মাহনুরের আব্বুর দিকে তাকিয়ে বললো, 
“ বাবা মাহনুরের জাল নেগেচে। একটা আইচকিম কিনে দিবা বাবা। “
মাহনুরের আব্বু হেসে মেয়েকে কোলে নিয়ে বললো, 
“ আচ্ছা আম্মাজান আসেন আপনাকে আইসক্রিম কিনে দেই। “
মাহনুরতো মহা খুশি। মাহনুরের আব্বুর গলা জড়িয়ে ধরে বললো, 
“ মাহনুর তার আব্বুকে কুব বালুবাসে। “
মাহনুরের আব্বুও হেসে বললো, 
“ মাহনুরের বাবাও তার আম্মাজানকে ভালোবাসে। “
অত:পর মাহনুরের আব্বু মাহনুরকে আইসক্রিম কিনে দিলে তা মাহনুর আয়েশ করে খেতে থাকে।  খাওয়ার মাঝেই মাহনুর তার বাবাকে বললো, 
“ বাবা জানো কী হছে? “
“ কী হয়েছে আম্মাজান। “
মাহনুর আইসক্রিম থেকে ক্রিম তার আঙুল দিয়ে খেতে খেতে বললো, 
“ একতা চেলে আমায় কুলে নিয়ে আদল দিচে। “
মাহনুরের বাবা অবাক হয়ে বললো, 
“ তাই নাকি আম্মাজান। “
মাহনুর বুঝলো তার বাবা তার কথা শুনছে তাই হাসি মুখে আবার বললো, 
“ হি বাবা।  আল জানু বাবা ওই চেলে আমায় বুলছে আমি নাকি চুইট বেবি। “
মাহনুরের আব্বু হেসে বললো, 
“ সেটা তো সবাই জানে আমার আম্মাজান সুইট বেবি। “
“ বাবা আমি আবাল ওই চেলের কাচে যামু। “
“ কেনো আম্মাজান?  আমার আম্মাজান কী আবার ওই ছেলের কোলে উঠবে? “
মাহনুর ওর বাবার ঘাড়ে মুখ গুজে রেখে বললো, 
“ বাবা এতুলো বলে না নজ্জা নজ্জা।  আমাল নজ্জা নাগে বাবা। “
মাহনুরের কথায় হো হো করে হেসে ফেললো মাহনুরের আব্বু। মেয়েকে আদর দিলো। মাহনুরও তার  বাবার হাসি দেখে ছোট প্রাণটির মন মুগ্ধকর হাসিতে মেতে উঠলো।  দুই বাপ বেটি আনন্দে হাটতে হাটতে বাসায় চলে এলো। কিন্তু বাসার দরজার সামনে এসে তারা দুইজনেই ঠমকে দাড়ালো আমায় দেখে হয়তো তারা দুইজন আমায় এখন আশা করেনি। মাহনুরের আব্বু মিছি হাসি  দিয়ে বললো, 
“ একি আমার বাচ্চার আম্মু।  তুমি এই সময়? “
আমি রেগেমেগে বললাম, 
“ ফোন নিতে ভুলে গিয়েছিলাম।  যদি না আসতাম তাহলে তো আর এইসব কাহিনি দেখতে পেতাম না তাইনা। “ 
মাহনুর তখনো আইসক্রিম খাচ্ছে।  মাহনুর হেসে বললো, 
“ আম্মু আইচকিম কাও। আমার চোনা আম্মু নাগ কলে না।  আমার এততা মাত্ত পিও আম্মু। “
চলবে…… 

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন