#মোহাব্বত___কী__দাস্তান__পর্ব__০৭
#ইসরাত_জাহান_এশা
-আজ হসপিটাল থেকে অন্য দিনের তুলনায় বেশ তাড়াতাড়িই বাসায় ফিরলাম। সারাদিনের ক্লান্তি নিয়ে দরজা খুলে ভেতরে ঢুকতেই দেখি রান্নাঘরটা যেন পুরোপুরি বাপ-বেটির দখলে। দু'জনই নিজেদের জগতে এতটাই ব্যস্ত—কেউ সবজি কাটছে, কেউ আবার ছোট ছোট হাতে নেড়েচেড়ে রান্নায় সাহায্য করার ভান করছে। তাদের হাসি, খুনসুটি আর ফিসফিসে গল্পে যেন পুরো ঘরটা প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। মজার বিষয় হলো, আমি যে বাসায় ঢুকেছি, সেদিকে তাদের কারোরই যেন কোনো খেয়াল নেই। একবারও ফিরে তাকালো না, "এসেছো?"—এই একটি কথাও বলল না। সকাল থেকেই বাপ-বেটি দু'জন আমাকে এমনভাবে এড়িয়ে চলছে, যেন আমি এই বাড়িরই কেউ নই। কোনো কথা নেই, কোনো দুষ্টুমি নেই, এমনকি একটুখানি হাসিও না।
মুহূর্তেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন হালকা কষ্টে ভরে উঠল। আজ যে আমার জন্মদিন, সেটাও বুঝি তাদের একেবারেই মনে নেই! ভেবেছিলাম হয়তো অন্তত আজকের দিনটা একটু আলাদা হবে। কিন্তু না, সবকিছু যেন একেবারেই স্বাভাবিক। অভিমান আর রাগ চেপে রেখে নিঃশব্দে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে নিজের ঘরে চলে এলাম।
★
ফ্রেশ হয়ে ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে ঘরে পা রাখতেই চোখ আটকে গেল সামনের দৃশ্যে। কখন যে বাপ-বেটি দু'জন পোশাক বদলে ফেলেছে, তা টেরই পাইনি। দু'জনের গায়েই শুভ্র নির্মল রঙের পোশাক। সাদা রঙ যেন তাদের দু'জনকে আরও স্নিগ্ধ, আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। মাহনুরের আব্বুর গায়ে ধবধবে সাদা পাঞ্জাবি, আর আমার ছোট্ট রাজকন্যার পরনে সাদা ফ্রক। দু'জনকে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দেখে মনে হচ্ছিল, যেন শান্ত বিকেলের নরম আলোয় আঁকা কোনো স্নিগ্ধ ছবির অংশ। নিজের দিকেও একবার তাকালাম। আমিও অজান্তেই পরে নিয়েছি সাদার মধ্যে হালকা গোলাপি ছাপের একটি শাড়ি। আশ্চর্যের বিষয়, আমাদের তিনজনের পোশাকের রঙ যেন এক অদৃশ্য সুতোয় বাঁধা। এই রঙের মিলটুকু সম্পূর্ণই অনাকাঙ্ক্ষিত, তবুও দেখতে এতটাই সুন্দর লাগছিল যে এক মুহূর্তের জন্য আমিও অবাক হয়ে গেলাম।
তবু মুখে কোনো কথা আনলাম না। সকালের অভিমানটা এখনও বুকের ভেতর নীরবে জায়গা করে বসে আছে। তাই নির্বিকার মুখে ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে চুল ঠিক করতে লাগলাম।
আমার ছোট্ট মেয়েটা সবকিছুই যেন বুঝতে পারছিল। সে মুখ টিপে দুষ্টু হেসে একবার তার আব্বুর দিকে, আরেকবার আমার দিকে তাকাল। তারপর টুকটুক করে আমার কাছে এসে মিষ্টি গলায় বললো,
“ আম্মু শুব জন্মদিন। “
আমি অবাক হয়ে তাকালাম মেয়ের দিকে। মেয়ে আমার খিলখিল করে হেসে আমার গালে চুমু দিয়ে বললো,
“ আম্মু আমি চলি তুমালে স্যারপাইজ দিতে চাইসি তাই কুতা বুলি নাই। “
আমি হেসে মেয়েকে আমার কোলে বসিয়ে বেশ কয়টা চুমু দিয়ে বললাম,
“ আমার সোনা মেয়ে। মা কোখনো মেয়ের উপর রাগ করে থাকতে পারে। আমি তো আমার সোনা মেয়েটার উপর রাগ করে থাকতেই পারি না। “
মেয়ে এবারো হেসে দিলো একদম প্রাণোচ্ছল হাসি। এই হাসি দেখলেই তো মনটা এমনেই খুশি হয়ে যায়। মাহনুরের আব্বু পিছন থেকে এসে আমায় জড়িয়ে ধরে কাধে থুতনি রেখে বললো,
“ আমার রিম সোনাকে আরো বছর আল্লাহ বাচিয়ে রাখুক। আমার রিম সোনাকে ছাড়া আমার চলবেই না। তোমায় যেনো শত শত বছর আমার কাছেই যেনো রাখতে পারি। পরিশেষে বলছি শুভ হোক আজকের এই দিন। আর সকাল থেকে কথা না বলার জন্য খুব খুব সরি জান। “
আর অভিমান করে থাকা যায় বুঝি! উহু থাকা যায় না। আমিও থাকতে পারি নাই। মাহনুরের আব্বু আমায় ছেড়ে সামনে এসে দাড়াতেই ওর পেটে মাথা রেখে বললাম,
“ বাবা সেই বছর বলেছিল, "আমি তোমার সঙ্গে সুখী হতে পারব না। অভাব একদিন দরজায় কড়া নাড়লে ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালিয়ে যাবে।
কিন্তু সেদিন যদি বাবার কথায় তোমার হাত ছেড়ে দিতাম, তাহলে হয়তো আজ এই অমূল্য ভালোবাসার স্পর্শ কোনোদিনই পেতাম না। আমি বিশ্বাস করেছিলাম তোমাকে। সব ভয়, সব দ্বিধা, সব পরিচিত আশ্রয় পেছনে ফেলে তোমার হাত ধরেই ছেড়েছিলাম আমার বাবার বাড়ি। এসেছিলাম আমার নতুন ঠিকানায়—আমার শান্তিনিকেতনে। আজ বুঝি, ইট-পাথরের ঘর নয়, মানুষের ভালোবাসাই একটি ঘরকে শান্তিনিকেতন বানিয়ে দেয়। দিন শেষে তুমিই আমার শান্তি, আমার আস্থা, আমার ভরসা। তোমার বুকের আশ্রয়েই আমি নিরাপত্তা খুঁজে পাই, তোমার চোখের মায়াতেই আমি আমার পৃথিবী দেখি।
অভাব এসেছে, কঠিন সময়ও এসেছে। কিন্তু ভালোবাসা জানালা দিয়ে পালায়নি; বরং প্রতিটি ঝড়ের রাতে আমাদের হাত দুটো আরও শক্ত করে এক করে দিয়েছে। সুখে-দুঃখে, হাসি-কান্নায়, প্রতিটি মুহূর্তে তুমি প্রমাণ করে দিয়েছ—সত্যিকারের ভালোবাসা কখনো অভাবের কাছে হার মানে না। আজও যদি আমাকে নতুন করে কোনো জীবন বেছে নিতে বলা হয়, আমি আবারও নিঃসংকোচে তোমার হাতটাই ধরব। তুমিই আমার শান্তিনিকেতন, আমার শেষ আশ্রয়, আমার আজীবনের প্রার্থনা।”
মাহনুরের আব্বু আমার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আলতো করে আমার চোখের পানি মুছে দিল। তারপর নিজের কপালটা আমার কপালে ঠেকিয়ে শান্ত, দৃঢ় কণ্ঠে বলল,
— "আমিই তোমার আছি, আমিই তোমার থাকব। যতই ঝড়-ঝাপ্টা আসুক না কেন, আমি কোনোদিন তোমার হাত ছাড়ব না। সুখের দিনে যেমন তোমার পাশে থাকব, তেমনি দুঃখের রাতগুলোতেও তোমার হাত শক্ত করে ধরে রাখব।তোমার হাসির দায়িত্ব আমার, তোমার কান্নার ভাগও আমার। যতদিন নিঃশ্বাস চলবে, ততদিন তোমাকে আগলে রাখব। কখনো নিজেকে একা ভাববে না। কারণ তোমার প্রতিটি পথচলায় আমি তোমার ছায়া হয়ে থাকব।”
ছোট্ট মাহনুরের মাথায় এত শত জটিল অনুভূতি ঢোকার কথা নয়। বাবা-মায়ের কথার গভীরতা সে বুঝল না। শুধু তার ছোট্ট মনটুকু বুঝতে পারল—তার আম্মু কাঁদছে, তার বাবাও কাঁদছে। কিন্তু কেন কাঁদছে, সেই উত্তর তার অজানা।
কিছুক্ষণ পর টুকটুক করে দৌড়ে ঘরের বাইরে চলে গেল সে। তারপর ছোট ছোট হাতে দুটি মিষ্টি নিয়ে আবার ঘরে ফিরল। নিষ্পাপ মুখে একচিলতে হাসি, চোখেমুখে হাজারো সরলতা।
আমাদের দু'জনের মাঝখানে এসে কোমল, জড়ানো কণ্ঠে বলল,
— "আম্মু... বাবা... কাদো না। এই নাও মিত্তি কাও। মিত্তি অনেত মজা... আমি কাইচি।"
কথাগুলো বলেই একটি মিষ্টি আমার মুখের সামনে এগিয়ে ধরে আবারও আদুরে গলায় বলল,
— "আম্মু, কাও... অনেত মজা।"
মেয়ের নিষ্পাপ চেহারার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অজান্তেই আমার ঠোঁটের কোণে হাসি ফুটে উঠল। চোখের কোণে তখনও অশ্রু চিকচিক করছে, কিন্তু সেই অশ্রুর ভেতরেই যেন একফালি রোদ এসে পড়ল। আমি আলতো করে মেয়ের ছোট্ট হাত থেকেই মিষ্টিটা খেয়ে নিলাম। আমাকে মিষ্টি খেতে দেখে মাহনুর আনন্দে খিলখিল করে হেসে উঠল। যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় কাজটা করে ফেলেছে। তারপর একই ভঙ্গিতে আরেকটি মিষ্টি নিজের বাবার মুখের সামনে ধরে বলল,
— "বাবা... তুমিও কাও। কাদে না।"
মাহনুরের আব্বুও হেসে মেয়ের ছোট্ট হাত থেকে মিষ্টিটা খেয়ে নিল। মুহূর্তেই ঘরজুড়ে ছড়িয়ে পড়ল এক অন্যরকম উষ্ণতা। কিছুক্ষণ আগেও যে ঘরে কান্নার ভারী নীরবতা জমে ছিল, সেই ঘরেই এখন ছোট্ট মাহনুরের নিষ্পাপ ভালোবাসা সব কষ্টকে আলতো করে জড়িয়ে ধরে হাসিতে বদলে দিচ্ছে।
•••••••••••
( নোটের উত্তর দিবেন কষ্ট করে)
বিকেলের শেষ আলোটা তখন ধীরে ধীরে শহরের কোলাহলের গায়ে নরম সোনালি আভা মেখে দিচ্ছে। আমরা তিনজনও বেরিয়ে পড়লাম ধানমন্ডি লেকের উদ্দেশ্যে। আজ আর বাইক নেওয়া হলো না। পাশাপাশি হাঁটতে হাঁটতে, গল্প করতে করতে পথ পেরোনোর আনন্দটাই যেন বেশি টানছিল। কিছুক্ষণ পরই পৌঁছে গেলাম পরিচিত সেই লেকের পাড়ে।
ধানমন্ডি লেক যেন ব্যস্ত শহরের বুকের মাঝে লুকিয়ে থাকা এক টুকরো শান্তির ঠিকানা। হালকা বাতাসে লেকের জল চিকচিক করে উঠছে। পানির ঢেউগুলো তীর ছুঁয়ে মৃদু শব্দে ফিরে যাচ্ছে। চারপাশে সবুজ গাছের সারি, বেঞ্চে বসে থাকা মানুষ, কোথাও পরিবার, কোথাও বন্ধুদের হাসি-আড্ডা। সন্ধ্যা নামার আগমুহূর্তে পুরো পরিবেশটাই যেন প্রশান্তি আর ভালো লাগায় ভরে উঠেছে।
লেকের পাশের ছোট্ট পার্কটায় ঢুকতেই মাহনুর যেন খাঁচা থেকে মুক্তি পাওয়া ছোট্ট পাখি হয়ে গেল। এক দৌড় এদিক, এক দৌড় ওদিক। কখনো দোলনার দিকে ছুটছে, কখনো ঘাসের ওপর পা ফেলে খিলখিল করে হেসে উঠছে। ওর সেই নিষ্পাপ হাসিতে চারপাশটাও যেন আরও প্রাণবন্ত হয়ে উঠল। হঠাৎই মাঝপথে দৌড় থামিয়ে স্থির হয়ে গেল মাহনুর। বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে উঠল ওর দুটি চোখ। মুহূর্তের মধ্যেই সেই চোখে ছড়িয়ে পড়ল অন্যরকম এক উজ্জ্বলতা—যেন বহুদিনের অপেক্ষার মানুষটাকে খুঁজে পেয়েছে। কত মাস পর আজ আবার দেখা হলো তার "পচা ছেলে"র সঙ্গে। হ্যাঁ, সামনে দাঁড়িয়ে আছে ফাইজ। এক মুহূর্তও দেরি করল না মাহনুর। ছোট্ট দুই পা যতটা পারে দ্রুত চালিয়ে দৌড়ে চলে গেল ফাইজের কাছে। হাঁপাতে হাঁপাতে ওর সামনে দাঁড়িয়ে নিষ্পাপ মুখে মিষ্টি অভিমান মেশানো কণ্ঠে বলল,
— "পুচা চেলে... তুমি আমায় বুলে গেচো?”
চলবে………