ফন্ট সাইজ:
থিম:
মায়াজালের সমীকরণ

১ম পর্ব

লেখক: SADIYA AFRIN

#মায়াজালের_সমীকরণ

#সাদিয়া_আফরিন
[কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ]
পর্ব ১

ঢাকা শহরের এক নিভৃত কোণে শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে সেন্ট্রাল গার্লস হোস্টেল। সাঁঝের হালকা মায়া কেটে গিয়ে তখন গাঢ় রাতের নিস্তব্ধতা ডানা মেলেছে হোস্টেলের ৩২০ নম্বর ঘরটার ওপর। খোলা জানালাই দিয়ে দূরের নির্জন রাজপথের সোডিয়াম বাতির হলুদ আলোর এক বিষণ্ন আভা এসে পড়েছে মেঝের একপাশে। পড়ার টেবিলে জ্বলতে থাকা ল্যাম্পের আলোয় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে আছে ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার একগাদা মোটা বই, খোলা খাতা আর কয়েকটা রঙিন হাইলাইটার।

সেগুলোর মাঝখানে বসে ঘুমকে জয় করার এক চরম আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল ১৯ বছরের চঞ্চল ও প্রাণবন্ত তরুণী, সাদিয়া মেহেরী সাদু।

সাদুর রূপের মধ্যে অন্যরকম এক মিষ্টি আকর্ষণ আছে। শ্যামলা ও ফর্সার মাঝামাঝি তার ত্বকের রং। মিষ্টি অবয়ব, পাতলা দু’টি ঠোঁট আর টানা টানা ডাগর চোখ—যে চোখে সবসময় যেন একরাশ দুষ্টুমি ডানা মেলে থাকে। তার সবচেয়ে বড় সৌন্দর্য হলো কোমর অব্দি ধেয়ে যাওয়া কুচকুচে কালো ঘন চুল, যা যেকোনো মানুষের চোখ আটকে রাখার জন্য যথেষ্ট। সারা দিনের পরিশ্রমে তার চোখের পাতা দুটো ঘুমে জড়িয়ে আসছিল, কিন্তু পড়াশোনার অশেষ চাপের কারণে সে টেবিলে থুতনি ঠেকিয়ে রেখে না ঘুমানোর এক করুণ ভান চালিয়ে যাচ্ছিল।

ঠিক তখনই রাতের সেই নিঝুম নীরবতা চিরে ঝংকার দিয়ে উঠল তার সাধের স্মার্টফোনটি। স্ক্রিনের তীব্র আলোয় ভেসে উঠল একটি নাম—‘রায়না আপু’।

নামটা চোখে পড়তেই সাদুর দু’টি ভুরু আপনা থেকেই কুঁচকে গেল। এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফোনটা কানের কাছে তুলতেই অপর প্রান্ত থেকে চাবুকের মতো ভেসে এলো এক তীব্র ও তীক্ষ্ণ তোপ!

"আসতে পারবি না মানে কী, সাদু?!"

রায়না মেহেরীর সেই চড়া আর হুকুমের সুর শুনে সাদু চমকে উঠে তড়িঘড়ি করে ফোনটা কান থেকে খানিকটা দূরে সরিয়ে নিল। ২৫ বছর বয়সী বড় বোন রায়না মেহেরী হলো মাহির পরিবারের বড় মেয়ে। আভিজাত্য, ক্ষমতা আর তেজ যার রন্ধ্রে রন্ধ্রে রূপ পেয়ে ফুটে ওঠে। চেহারায় রাজকীয় রূপ রূপসী রায়নার প্রতিটা কথায় সবসময় এক অলিখিত আদেশের সুর থাকে।

সাদু নিজের গোল গোল ডাগর চোখ দুটো আরও বড় করে মুখ ভেঙচে ফোনটির স্ক্রিনের দিকে তাকাল। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে ফোনটা কানের কাছে এনে আদুরে অথচ একটু বিরক্তির মেজাজে বলল, "আহা আপু! এভাবে চিৎকার করছ কেন বলতো? সামনেই আমার ইন্টার ফার্স্ট ইয়ারের টেস্ট এক্সাম! বিশ্বাস করো, পরীক্ষা না থাকলে আমি কালকেই ছুটি নিয়ে চলে আসতাম।"

"একদম এসব অহেতুক বাহানা আমায় শোনাবি না!" রায়না অপর পাশ থেকে কড়া গলায় বলে উঠল, "আমি কোনো কথা শুনতে চাই না! তুই আমার একমাত্র ছোট বোন। মাহির পরিবারের এত বড় একটা আয়োজন, আমার বিয়ে আর এনগেজমেন্টের তোড়জোড় চলছে, আর তুই হোস্টেলে বসে পড়াশোনার দোহাই দিচ্ছিস? আমি চাই না তুই আমার বিয়ের মাত্র একদিন আগে এসে পুতুলের মতো গেস্ট হয়ে উপস্থিত হবি! তুই কালকেই চলে আসবি আমাদের বাসায়, দ্যাটস ফাইনাল!"

"কিন্তু আপু, কালকে যদি হঠাৎ ক্লাস মিস দিই, আর কলেজের কড়া নোটিস..."

"নোটিস আমি ধুয়ে পানি খাব?" রায়না বিন্দুমাত্র ছাড় না দিয়ে বলে চলল, "বাবা তোকে এসপি ফারুক মাহিরের ছোট মেয়ে বলে বড্ড বেশি মাথায় তুলে রেখেছে! সেই সুযোগে তুই হোস্টেলে বসে মনমতো চলছিস। কাল সকালের মধ্যে যদি তোকে বাড়িতে না দেখি, তবে তোর সাথে আমার চিরদিনের মতো কথা বন্ধ! রাখলাম ফোন!"

খট করে ফোনটা কেটে গেল।

সাদু একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ধপাস করে খাটের কোণে নিজেকে ফেলে দিল। তার সেই কোমর অব্দি ধেয়ে যাওয়া লম্বা কালো চুলগুলো তুলতুলে বিছানায় এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে পড়ল।

ঠিক পাশের খাট থেকে শান্ত চোখে মুখ তুলে তাকাল বুশরা। ১৯ বছরের বুশরা সাদুর সমবয়সী সেরা বান্ধবী এবং হোস্টেল রুমমেট। বুশরা নাকের ওপর চশমাটা একটু ঠেলে দিয়ে মিটিমিটি হেসে বলল, "কী রে সাদু? রায়না আপু তোকে একদম ডিরেক্ট আলটিমেটাম দিয়ে দিল তো?"

"হু," সাদু পাশ থেকে একটা কোলবালিশ বুকের কাছে টেনে নিয়ে জড়িয়ে ধরে ক্ষোভ প্রকাশ করল। "তুই শুনলি ওর চিল্লানি? বাবা স্পেশাল ব্রাঞ্চের পুলিশ সুপারিনটেনডেন্ট ফারুক মাহির বলে কি রায়না আপুর হুকুম দেওয়ার পারমিশন ডাবল হয়ে গেল? উফ! সরকার পরিবারে বিয়ে হচ্ছে বলে ওর ভাব যেন আকাশে গিয়ে ঠেকেছে! সেখানকার ২৮ বছর বয়সী ছেলে রাহাত ভাইয়া নামকরা সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার বলে কথা!"

বুশরা নিজের পড়ার টেবিল থেকে পানির বোতলটা নিতে নিতে বলল, "তা তো বুঝলাম, কিন্তু তুই আর আমি কাল ছুটি পাব কীভাবে? আমাদের কলেজের যে অবস্থা, স্যার পারমিশন না দিলে তো বিপদে পড়ব!"

"দাঁড়া, তুই কোনো চিন্তা করিস না। আমি সরাসরি স্যারকে ফোন দিয়ে ছুটির ব্যবস্থা করছি," সাদু চটপটে ভঙ্গিতে উঠে বসে নিজের ফোনের নম্বর টিপতে শুরু করল।

কয়েকবার রিং হওয়ার পর ওপাশ থেকে রিসিভ হতেই সাদুর ভেতরের সব বাচালতা যেন এক মূহূর্তে গায়েব হয়ে গেল। সে একদম লক্ষ্মী ও বাধ্য মেয়ের মতো মিষ্টি সুরে বলে উঠল, "অ্যাস সালামু আলাইকুম, স্যার। আমি ইন্টার ফার্স্ট ইয়ার থেকে সাদিয়া মেহেরী সাদু বলছিলাম।"

ওপাশ থেকে রাশভারী ও গাম্ভীর্যপূর্ণ গলায় শিক্ষক বললেন, "ওয়ালাইকুম আসসালাম। হ্যাঁ সাদিয়া, এত রাতে ফোন? কোনো সমস্যা?"

"স্যার, আসলে খুব বিপদে পড়ে আপনাকে এই অসময়ে ফোন দেওয়া," সাদু একদম করুণ ও মিনতি ভরা গলায় বলল, "আমার বড় বোন রায়না আপুর বিয়ের সব তোড়জোড় শুরু হচ্ছে। বাড়িতে খুব ইমার্জেন্সি ফ্যামিলি ফাংশন স্যার। আমি আর আমার ফ্রেন্ড বুশরা—দু’জনেই কাল থেকে কয়েকটা দিন ক্লাসে অ্যাটেন্ড করতে পারছি না। প্লিজ স্যার, যদি আমাদের ছুটিটা একটু অ্যাপ্রুভ করতেন..."

ওপাশে স্যার কিছুক্ষণ নীরব থেকে এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। "ঠিক আছে সাদিয়া। তোমার বোনের বিয়ে দেখে ছুটিটা দিয়ে দিলাম। তবে মাথায় রেখো, ৫ দিনের বেশি কিন্তু কোনো গ্যাপ দেওয়া যাবে না। আর শোনো, কলেজ খোলার পর কিন্তু নতুন টিচারের ক্লাসে একদম রেগুলার হতে হবে।"

"থ্যাংক ইউ সো মাচ, স্যার! আমি ৫ দিনের মধ্যেই ব্যাক করব!" সাদু আনন্দ চেপে রেখে ফোনটা কাটল।

ফোনটা ড্রয়ারে ছুড়ে মেরেই সাদু খাটের ওপর লাফিয়ে উঠল। তার শ্যামলা-ফর্সা গাল দুটোতে তখন বিজয়ের এক গাল হাসি ফুটে উঠল, আর সেই সাথে স্পষ্ট হয়ে উঠল তার হাসির মাঝে লুকিয়ে থাকা মিষ্টি দু’টি ভ্যাম্পায়ার টিথ—যা তার চেহারায় এক অদ্ভুত চঞ্চলতা আর মোহনীয় আকর্ষণ এনে দেয়।

"দেখেছিস বুশরা? কাজ হয়ে গেল! স্যার ছুটি দিয়ে দিয়েছেন। এখন খালি ঝটপট ব্যাকপ্যাক গুছিয়ে নে, কাল সকালেই আমরা সোজা গাড়ি ধরে আমাদের বাসায় চলে যাব।" সাদু হাত নেড়ে চঞ্চল ভঙ্গিতে বলল।

বুশরা ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চুল বাঁধতে বাঁধতে চশমার ভেতর দিয়ে তাকাল। "তোর চটপটে কথার কাছে তো সবাই রাজি হয়ে যায়! কিন্তু সাদু, রায়না আপুর হবু শ্বশুরবাড়ির পরিবেশ কেমন হবে কে জানে! অনেক তো নামডাক শুনলাম।"

সাদু হাত নেড়ে স্বাভাবিকভাবে হেসে উঠল। "দূর! ওসব নিয়ে ভেবে লাভ আছে? আমাদের নিজেদের ঘরেই তো বড় বাবা পুলিশ সুপার ফারুক মাহির, মেজো চাচা সেনাবাহিনীর কড়া অফিসার কর্নেল রাশেদ মাহির... কড়া মানুষ তো আমাদের মাহির পরিবারেই ভর্তি! তাই ওসব নিয়ে ভেবে লাভ নেই, চল প্যাকিং করি।"

একই শহরের অন্য এক প্রান্তে—গুলশানের আভিজাত্যে ঘেরা নিস্তব্ধ এক রাজকীয় পরিবেশে দাঁড়িয়ে আছে ‘সরকার ভيلة’।

বাড়ির দোতলার বিশাল লাইব্রেরি রুমে মৃদু আলো জ্বলছে। পুরো ঘরজুড়ে দামি বইয়ের সমাহার, আর মাঝখানের বিশাল এক্সিকিউটিভ টেবিলের পেছনে বসে আছেন ২৯ বছর বয়সী তরুণ রুশান সিয়াম সরকার।

৬ ফুট ১ ইঞ্চি লম্বা সুপুরুষ রুশান সরকারের ব্যক্তিত্ব এক কথায় অসাধারণ। ধবধবে ফর্সা গায়ের রং, আর ঘাড়ে ছোঁয়া ট্রেন্ডি উলফ কাট চুল তার অবয়বে এক আধুনিক ও আকর্ষণীয় রূপ দান করেছে। চোখে সরু কালো ফ্রেমের চশমা আর ইস্ত্রি করা কালো শার্টে তাকে অত্যন্ত কড়া ও গম্ভীর দেখাচ্ছে। রুশান মেজাজের দিক থেকে চরম গম্ভীর, একগুঁয়ে ও নিজের নিয়মে চলা এক পুরুষ। অচেনা মানুষ বা বাইরের দুনিয়ার সামনে সে কঠোর প্রফেশনাল, যার মুখে হাসির লেশমাত্র থাকে না। তবে পরিবারের প্রিয় মানুষ আর বন্ধুদের কাছে সে ভেতর থেকে দায়িত্বশীল ও শান্ত।

সে ল্যাপটপের স্ক্রিনে বিজনেসের গোপনীয় ফাইল রিভিউ করছিল। ঠিক তখনই লাইব্রেরির দরজায় এসে দাঁড়াল তার সমবয়সী ২৯ বছরের সেরা বন্ধু ইশান হায়দার। ৬ ফুট ১ ইঞ্চি লম্বা ইশানও শিক্ষকতা করে, মেজাজে বেশ হাসিখুশি হলেও কাজের জায়গায় বেশ নিয়মনিষ্ঠ। ইশান দরজায় হেলান দিয়ে চাবির রিং আঙুলে ঘোরাতে ঘোরাতে হেসে বলল, "কী রে রুশান! ছোট ভাইয়ের বিয়ে পাকা করার মিটিংয়ে যাবি না নাকি? সিলেট থেকে কাজ শেষ করে আমি ব্যাক করলাম শুধু তোদের সাথে জয়েন করব বলে!"

রুশান চশমাটা নাক থেকে একটু নামিয়ে ইশানের দিকে তাকাল। ঠিক তখনই সেখানে এসে ঢুকল তার ছোট চাচাতো ভাই ও বেস্ট ফ্রেন্ড, ২৮ বছর বয়সী সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার রাহাত সরকার। ৬ ফুট লম্বা রাহাতের হাসিখুশি মুখশ্রীতে কালকের অনুষ্ঠানের জন্য উপচে পড়া উৎসাহ।

রাহাত সামনের চেয়ারটায় বসে পড়ে বলল, "আহা ভাই! দিনরাত শুধু বাইক আর বিজনেসের ফাইল নিয়ে থাকলে হয়? পরশু তো মাহির পরিবারের বাসায় যেতে হবে, আমার আর রায়নার বিয়ের প্রাথমিক কথা বলতে। তুই তো যাচ্ছিস, তাই না?"

রুশান কফির কাপে চুমুক দিয়ে স্বাভাবিক গম্ভীর গলায় বলল, "আব্বু সিয়াব সরকার আর ছোটচাচা ইরহাম সরকার তো যাচ্ছেনই। তাছাড়া সেন্ট্রাল কলেজে নতুন জয়েনিং আর ট্রাস্টি বোর্ডের কিছু মিটিং আছে আমার।"

"আরে ভাই! তুই তো ওই কলেজের অনার প্লাস গেস্ট টিচার হিসেবে যোগ দিচ্ছিস, ওসব কাজ তো চলতেই থাকবে," রাহাত আব্দারের সুর তুলে বলল, "কিন্তু মাহির পরিবারে আমাদের সাথে তোকে যেতেই হবে!"

রুশান ল্যাপটপটা একপাশে রেখে চশমাটা টেবিলের ওপর রাখল। তারপর দুই ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে হালকা মেজাজে বলল, "তোরা দুজনে এক হলে আমাকে আর কিছু বলতে দিবি না, তাই তো? ঠিক আছে, পরশু আমি যাব। তবে বেশি দেরি করা যাবে না, রাতের দিকে আমার ইশানের সাথে বাইক রাইডে বের হওয়ার প্ল্যান আছে।"

রাহাত আর ইশান একে অপরের দিকে তাকিয়ে হেসে উঠল।

রুশান তার স্পোর্টস বাইকের হেলমেটটা টেবিল থেকে তুলে নিল। তার টানা চোখে সেই একই শান্ত আর কড়া ভাব। সে তখনো অনুধাবন করতে পারেনি, মাহির পরিবারের বাসায় পা রাখার পর তার এই শান্ত আর কড়া জীবনে সাদুর চঞ্চল রূপ ধরে কেমন এক ঝড়ের আগমন ঘটতে যাচ্ছে!

চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন