ফন্ট সাইজ:
থিম:
মায়াজালের সমীকরণ

২য় পর্ব

লেখক: SADIYA AFRIN

#মায়াজালের_সমীকরণ 

#সাদিয়া_ আফরিন 
{কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ}
পর্ব ২
পরদিন ভোরে সকালের স্নিগ্ধ ও সোনালী রোদ এসে কড়া নেড়েছিল মাহির ভিলার সুবিশাল ও আভিজাত্যে ঘেরা উঠোনে। উঠোনের ঠিক মাঝখানে বুক ফুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা প্রাচীন কৃষ্ণচূড়া গাছটার পাতার ফাঁক গলে রোদের ছোট ছোট আলোর টুকরোগুলো নিচের সবুজ ঘাসের ওপর অদ্ভুত সুন্দর এক নকশা এঁকে চলেছে। দোতলার বিশালাকার ঝুলন্ত বারান্দায় দাঁড়িয়ে কফির কাপে ধীরেসুস্থে শেষ চুমুক দিচ্ছিলেন মাহির পরিবারের প্রধান অভিভাবক ফারুক মাহির। তাঁর চোখেমখে রাশভারী এক গাম্ভীর্য, চোখে সরু ফ্রেমের কাঁচের চশমা আর পরনে একদম পরিপাটি করে ইস্ত্রি করা কুচকুচে সাদা সুতির পাজামা-পাঞ্জাবি। তাঁর ঠিক পাশেই শান্ত কিন্তু সামরিক শক্তির দৃঢ় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন মেজো ভাই রাশেদ মাহির।
মাহির পরিবারের যৌথ সংসারের ক্ষমতার দাপট, কড়া নিয়মকানুন আর শৃঙ্খলার সুনাম পুরো শহরে সুপরিচিত। ফারুক মাহির বড় ভাই হিসেবে পরিবারের সর্বেসর্বা—তাঁর একটিমাত্র আদেশে বাড়ির প্রতিটি মানুষ নিয়ম ও শৃঙ্খলার কঠোর গণ্ডির মধ্যে থেকে চলে। তাঁর কথার ওপর কথা বলার সাহস বা অনুমতি পরিবারের কারো নেই।
"ফারুক ভাই, রাহাত ছেলেটা কেমন? সব দিক দিয়ে ঠিকঠাক মনে হলো তো?" রাশেদ মাহির নিজের স্বভাবজাত কড়া ও সোজা গলায় জানতে চাইলেন।
ফারুক মাহির চোখের চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে দিয়ে গম্ভীর গলায় জবাব দিলেন, "ইরহাম সরকারের বড় ছেলে। আচার-ব্যবহার খুব নম্র ও অত্যন্ত মার্জিত। তবে খবর নিয়ে জেনেছি, ওদের পরিবারে সিয়াব সরকারের বড় ছেলে, রুশান—ছেলেটা নাকি মারাত্মক মেধাবী, ট্যালেন্টেড আর বিচক্ষণ। নিজ বিজনেস সামলানোর পাশাপাশি ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডেও অনেক বড় দায়িত্ব পালন করছে।"
"হুম, আমিও শুনেছি," রাশেদ মাহির হালকা ভুরু কুঁচকে বললেন। "আমাদের চেনা কিছু সামরিক জুনিয়র অফিসারের মুখে শুনেছি, কাজের জায়গায় ওই সুপুরুষ রুশান সরকার নাকি চরম কড়া মেজাজের আর ভীষণ প্রফেশনাল। ঘাড়ে ছোঁয়া ট্রেন্ডি উলফ কাট চুলে তার ব্যক্তিত্বটাই নাকি সম্পূর্ণ আলাদা।"
"হুম," ফারুক মাহির অত্যন্ত সংক্ষেপে উত্তর দিয়ে মেপে মেপে যোগ করলেন, "আগামীকাল সিয়াব সরকার আর ইরহাম সরকারের পুরো পরিবার আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের বাসায় আসছে। রায়নার পছন্দের ওপর আমার পূর্ণ ভরসা আছে, তবে মাহির পরিবারের আভিজাত্য ও মর্যাদায় যেন কোনো ধরনের কমতি না থাকে, সেদিকে কড়া নজর রেখো।"
বারান্দার এই গম্ভীর ও প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনার ঠিক বিপরীত এক হুলস্থুল চঞ্চল চিত্র দেখা গেল তিনতলার মাস্টার বেডরুমে।
বিশাল নান্দনিক আলমারির সামনে দাঁড়িয়ে একের পর এক দামি শাড়ি টেনে বের করছিল রায়না মেহেরী। শাহি সিল্ক, খাঁটি ঢাকাই জামদানি, আর রাজকীয় কাঞ্জিভরম শাড়ির এক বিশাল পাহাড় জমে গেছে বিছানার ওপর। রায়নার চোখেমুখে রূপচর্চা, পরিপাটি থাকা আর কনে সাজার এক অদ্ভুত রাজকীয় ঔদ্ধত্য আর উপচে পড়া আনন্দ স্পষ্ট ফুটে উঠেছে।
ঠিক তখনই ভেজা চুল তোয়ালের ফিতায় পেঁচিয়ে বাথরুম থেকে বেরিয়ে এলো সাদু। ভেজা চুলের আগা থেকে পানির ফোঁটা গড়িয়ে পড়ছিল তার শ্যামলা-ফর্সা ঘাড়ে। গায়ে জড়ানো হালকা গোলাপি রঙের অতি সাধারণ এক সুতির থ্রি-পিস। চঞ্চল এই মেয়েটি নিজের পিঠ ছাপিয়ে কোমর অব্দি ধেয়ে যাওয়া কুচকুচে কালো ঘন চুল গামছা দিয়ে মুছতে মুছতে খাটের দিকে তাকাল।
চোখ দুটো গোল গোল করে সে অবাক গলায় বলে উঠল, "ওরে বাবাসা! রায়না আপু, তুমি কি আস্ত একটা শাড়ির দোকানটাই ঘরে তুলে নিয়ে এসেছ নাকি?! এত শাড়ি দিয়ে কী করবা?"
রায়না একটা গর্জিয়াস কাঞ্জিভরম শাড়ি গায়ের সাথে ধরে চোখ পাকিয়ে কড়া গলায় বলল, "তোর মতো অগোছালো আর ফাজিল মেয়েকে এসব অভিজাত ফ্যাশন বোঝাতে যাওয়াটাই চরম ভুল! শোন সাদু, কাল সরকার ভিলার সবাই আনুষ্ঠানিকভাবে আমাদের বাসায় আসছে। তুই তোর ওই বাঁদর নাচ আর বাচালতা বন্ধ করে একদম সভ্য ও শান্ত সেজে নিচে থাকবি, বুঝেছিস?"
সাদু ড্রেসিং টেবিলের সামনে গিয়ে চিরুনি দিয়ে নিজের কোমর অব্দি ধেয়ে যাওয়া ঘন কালো চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে আয়নায় নিজের গালে ভেসে ওঠা মিষ্টি ভ্যাম্পায়ার টিথ দুটি বের করে খিলখিল করে হেসে উঠল। "ওগো আমার রাজকন্যা আপু! তোমার হবু বর রাহাত ভাইয়া তো তোমাকে দেখেই অর্ধেকের বেশি কুপোকাত! কাল তো খালি বিয়াই বাড়ির বাকিদের এসে সই করা বাকি!"
কথাটা শেষ করেই সাদু এক দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে সোজা পাশের গেস্ট রুমে চলে গেল। সেখানে তখন তার সমবয়সী সেরা বান্ধবী বুশরা নিজের ট্রাভেল ব্যাগ গুছিয়ে নিয়ে শান্ত হয়ে অপেক্ষা করছিল।
"কী রে সাদু? মাহির ভিল্যায় তো সকাল থেকেই বিয়ের তোড়জোড়ে সবাই ব্যস্ত!" বুশরা হেসে বলল।
"আরে বলিস না! রায়না আপুর হুকুমের চোটে আমার দুই কান এখন একদম গরম!" সাদু সোফায় ধপাস করে বসে পড়ে টেবিল থেকে এক গ্লাস ঠান্ডা পানি খেয়ে নিল। "কাল নাকি রাহাত ভাইয়াদের পুরো স্কোয়াড আমাদের বাসায় আসছে। বরপক্ষের সামনে কীভাবে কী নাটক জমবে, চল কালকের জন্য মাথা ঠান্ডা করে প্ল্যান বানাই!"
একই সময়ে, একই শহরের অন্য প্রান্তে—গুলশানের আভিজাত্যে ঘেরা নিস্তব্ধ ‘সরকার ভিলে’ চলছিল শুভ সফরের চূড়ান্ত প্রস্তুতি।
বিশাল ড্রয়িংরুমে বসে কফির কাপে চুমুক দিচ্ছিলেন নাবিলা সরকার (রুশানের আম্মু)। সাবেক সেনাকর্তার মেয়ে হওয়ার কারণে তাঁর নিজস্ব গাম্ভীর্য, তেজ আর কড়া ব্যক্তিত্ব এখনো ভীষণ অপ্রতিরোধ্য। বাসার অভ্যন্তরীণ প্রায় প্রতিটি বড় সিদ্ধান্তেই ওনার কথাই শেষ কথা হিসেবে গণ্য হয়। পাশে বসে আছেন তাঁর স্বামী সিয়াব সরকার এবং সিয়াব সরকারের ছোট ভাই ইরহাম সরকার (যাঁর ছেলে রাহাত)।
নাবিলা সরকার আর সিয়াব সরকারের মধ্যে প্রায়ই ছোটখাটো মিষ্টি তর্ক আর পারিবারিক খুনসুটি লেগেই থাকে। সিয়াব সরকার জরুরি বিজনেস ফাইল দেখতে দেখতে মুচকি হেসে বললেন, "নাবিলা, কাল মাহির পরিবারে যাওয়ার সব তোড়জোড় ঠিকঠাক তো? ফারুক মাহির কিন্তু বেশ মেপে কথা বলা কড়া মানুষ।"
নাবিলা সরকার ভুরু সামান্য কুঁচকে কড়া গলায় জবাব দিলেন, "কারো কড়া মেজাজকে ভয় পাওয়ার পাত্রী নাবিলা সরকার নয়! আমাদের গাড়ি বহর আর গিফটের বড় বড় ডালা পারফেক্টলি রেডি আছে।"
তাদের এই হালকা নোখরা ও পারিবারিক ঝগড়া দেখে দূরে সোফায় বসে খিক করে হেসে দিল সামায়রা (রুশানের ছোট বোন)।
ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের আলিশান দরজায় এসে দাঁড়াল স্মার্ট নেভি ব্লু ব্লেজার পরা রাহাত সরকার। তার চুল সুন্দর করে পারফেক্টলি সেট করা। তার চোখেমুখে সেই চিরাচরিত উজ্জ্বল ও চঞ্চল আনন্দ। "আম্মু! আব্বু! কালকের গাড়ি আর সিকিউরিটি বহর একদম রেডি। কিন্তু রুশান ভাইয়া কোথায়?"
ঠিক সেই মুহূর্তে দোতলার রাজকীয় মার্বেলের সিঁড়ি বেয়ে ধীর, ভারী ও গম্ভীর পদক্ষেপে নিচে নেমে এলো সুপুরুষ রুশান সিয়াম সরকার।
উঁচু-লম্বা ড্যাশিং অবয়ব, ঘাড় ছুঁয়ে থাকা ট্রেন্ডি উলফ কাট চুল পরিপাটি করে আঁচড়ানো আর চোখে তার সেই সরু কালো ফ্রেমের চশমা। পরনে কুচকুচে কালো ইস্ত্রি করা শার্ট আর ডার্ক ট্রাউজার। রুশান নিচে নেমে আসতেই পুরো ড্রয়িংরুমে এক অদ্ভুত গম্ভীর আভিজাত্য আর শান্ত নীরবতা ছড়িয়ে পড়ল। অচেনা মানুষ বা বাইরের জগতের কাছে সে চরম একগুঁয়ে ও কঠোর মেজাজের পুরুষ হলেও, পরিবারের আপন মানুষগুলোর সামনে তার সেই কড়া ভাবটা কিছুটা শিথিল হয়ে আসে।
সামায়রা ছোট বোন হিসেবে এক দৌড়ে এসে রুশানকে জড়িয়ে ধরে আব্দারের সুরে বলল, "ভাইয়া! কাল কিন্তু আমাকে তোমার গাড়িতে করে নিয়ে যেতেই হবে! কোনো বাহানা শুনব না!"
রুশান ছোট বোনের মাথায় পরম স্নেহে হাত বুলিয়ে হালকা হেসে বলল, "হ্যাঁ রে পাগলী, যাবি। কাল আমাদের রাহাতের নতুন জীবনের শুভ আয়োজন, তোকে ফেলে যাব নাকি?"
পাশে থাকা পরিবারের প্রিয় বন্ধু ইশান চাবির রিং আঙুলে দ্রুত ঘোরাতে ঘোরাতে এগিয়ে এসে বাঁকা হেসে বলল, "কাল কিন্তু আমরা ভাইবোনেরা বাইকেই যাব রুশান, কারে নয়!"
"ডান," রুশান তার স্বাভাবিক গম্ভীর ও সংক্ষিপ্ত কণ্ঠে হালকা সম্মতি দিল।
পরিবারের সবার হাসি-ঠাট্টায় সরকার ভিলায় উৎসবের আবহ তৈরি হলেও, রুশানের মনে কালকের মিটিং নিয়ে কেবল একটাই কথা ঘুরছিল—দ্রুত মাহির ভিলার কাজ শেষ করে নিজের অফিসে ফিরে আসা।
সে তখনো বিন্দুমাত্র অনুধাবন করতে পারেনি, কাল মাহির ভিলার সুবিশাল দরজায় পা রাখা মাত্রই সাদুর চঞ্চল রূপ আর তার সেই মিষ্টি ভ্যাম্পায়ার টিথের অনন্য হাসি ধরে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঝড় তার জীবনের সব কড়া নিয়ম আর বরফ জমা অহংকারকে তছনছ করে দিতে অপেক্ষা করছে!
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন