#মায়াজালের_সমীকরণ
#সাদিয়া_আফরিন
[কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ]
পর্ব-৪
নিজের ভিজে একাকার হয়ে যাওয়া দামি পোশাক আর রুশানের সেই তীক্ষ্ণ ধমকের অতি কড়া কথাগুলো মনে পড়তেই সাদিয়ার গায়ের রক্ত যেন মুহূর্তে টগবগ করে ফুটছিল। রাগে তার দুই কান লাল হয়ে গরম হয়ে উঠছিল। নিজের এই অপমান সে কোনোভাবেই হজম করতে পারছিল না।
নিজের মাস্টার বেডরুমে ঢুকে দ্রুত ভেজা পোশাক বদলে নিয়ে একটা হালকা নীল রঙের চমৎকার ও আরামদায়ক সুতির সালোয়ার-কামিজ পরে নিল সাদু। নরম সুতির তোয়ালে দিয়ে দীর্ঘ ও ঘন কালো চুলগুলো চটপট ঝেড়ে নিয়ে মাথার ওপর অত্যন্ত চটপটে ভঙ্গিতে দ্রুত একটা উঁচু আর চঞ্চল খোপা বানিয়ে ফেলল সে।
ঘরে পা রাখতেই সাদিয়ার দুই পাশে এসে নিঃশব্দে দাঁড়াল তার সেরা বান্ধবী বুশরা আর মেজো চাচাতো বোন রাইসা। চটপটে স্বভাবের রাইসা সাদিয়ার থমথমে মুখের দিকে তাকিয়ে ডাগর চোখে ফিসফিস করে বলল, "সাদু আপু, ওই বরফ-খণ্ড রুশান ভাইয়ার ওপর তোর অত রাগ কেন বল তো? উনি তো দেখতে মাশাল্লাহ পুরাই কোনো বিখ্যাত কোরিয়ান ড্রামার ড্যাশিং হিরোর মতো! কী গম্ভীর আর কী দারুণ ও আকর্ষণীয় ব্যক্তিত্ব!"
"হিরো?!" সাদু চোখ দুটো গোল গোল করে ফুঁসে উঠল, "ওই বদমেজাজী খাঁটি রাক্ষসটা হিরো? আমায় সবার সামনে ‘Stupid’, ‘Dumbass’ বলে গেল! স্পেশাল ব্রাঞ্চের প্রধান পুলিশ সুপার ফারুক মাহিরের মেয়েকে এভাবে সবার সামনে অপমান করার সাহস সে পায় কীভাবে?! আজকের দিনের মধ্যে যদি ওনার এই বরফ জমা অহংকারের ওপর শক্ত কোনো বদলা না নিয়েছি, তবে আমার নামও সাদিয়া মেহেরী সাদু না!"
বুশরা নিজের চশমাটা নাকের ওপর একটু ঠেলে দিয়ে বেশ ভয় পেয়ে মৃদু কণ্ঠে বলল, "সাদু, তুই কি পুরো পাগল হয়ে গেলি নাকি? মাহির ভিলার ড্রয়িংরুমে দুই পরিবারের সব বয়োজ্যেষ্ঠ আর সম্মানিত মানুষেরা ভীষণ গম্ভীর হয়ে বসে আছেন! বড় কাকা, মেজো কাকা, কর্নেল কাকা—সবাই রয়েছে। আর তা ছাড়া ওই রুশান সরকার লোকটা চরম কড়া আর মারাত্মক চটপটে! তুই ওর সাথে কোনো শয়তানি করতে যাস না, ধরা পড়লে কিন্তু কপালে বড় সাইজের শনি আছে!"
"তুই একদম চুপ থাক তো বুশরা!" সাদু বাঁকা হেসে নিজের মিষ্টি ভ্যাম্পায়ার টিথ দুটি বের করে ড্রেসিং টেবিলের নিচের ড্রয়ার থেকে একটা বড় সাইজের কাঁচের গভীর বাটি আর জুসের একটা বড় কার্টন বের করল।
সাদু চোখের এক কোণে মারাত্মক শয়তানি বুদ্ধি ফুটিয়ে বলল, "আমি সব প্ল্যান একদম নিখুঁতভাবে সাজিয়ে নিয়েছি। নিচে বারান্দার সুন্দর বাগানের ছায়ায় রাহাত ভাইয়া আর ওই ক্ষ্যাপা রাক্ষসটা একসাথে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। আমি উপর থেকে এই আঠালো আম আর বিট লবণের জুসের ঘন মিশ্রণটা এমনভাবে ফেলব, যেন সোজা ওর সেই ইস্ত্রি করা কুচকুচে সাদা শার্টে গিয়ে পড়ে! ধরা পড়া তো দূরের কথা, ভেবে কূল পাবে না যে গাছ থেকে ডাল ভেঙে পড়েছে নাকি জুস পড়েছে!"
রাইসা আর বুশরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে ভয় পেয়ে জিভ কাটল। কিন্তু সাদিয়ার রোখ চেপে যাওয়া জেদ আর চঞ্চলতার সামনে তাদের না করার কোনো উপায় ছিল না। অগত্যা রাইসা আর বুশরা পাহারা দেওয়ার জন্য সাদুর পেছনে পেছনে দোতলার খোলা ঝুলন্ত বারান্দার আড়ালে এসে দাঁড়াল।
বারান্দার নিচে চমৎকার বাগানের আলো-ছায়ার এক নির্জন কোণে দাঁড়িয়েছিল সুপুরুষ রুশান সিয়াম সরকার। পরনে এখন তার উপহার দেওয়া নতুন সাদা ইস্ত্রি করা ধবধবে শার্ট, ঘাড় ছুঁয়ে থাকা উলফ কাট চুল আর চোখে সরু ফ্রেমে আঁটা সেই গম্ভীর চশমা। পাশে রাহাত ও ইশান দাঁড়িয়ে কিছু জরুরি বিষয়ে কথা বলছিল, কিন্তু রুশান একহাতে গরম কফির কাপ নিয়ে অত্যন্ত শান্ত মনে বাগানের সবুজ ডালপালার দিকে তাকিয়ে কিছু নিয়ে ভাবছিল।
উপর থেকে সাদু বাটিটা দুই হাতে শক্ত করে ধরে ঝুলন্ত অর্কিডের গাছের আড়ালে সুন্দরভাবে গা ঢাকা দিয়ে দাঁড়াল। বুশরা আর রাইসা বারান্দার খোলা দরজার কোণ থেকে হাতজোড় করে ভয়ে ভয়ে দাঁড়িয়ে দেখছিল।
সাদু নিজের টার্গেট স্থির করে জুস ভরা কাঁচের বাটিটা একটু বাঁকা করতে যাবে—
ঠিক সেই চরম মুহূর্তে নিচে থাকা ড্যাশিং ও প্রকাণ্ড অবয়বের রুশান একদম চোখের পলকে মুখ তুলে সোজা উপর দিকে সাদিয়ার চোখ বরাবর তাকাল!
তার টানা টানা কড়া চোখ দুটি চশমার ফাঁক দিয়ে সাদিয়ার ওপর সরাসরি নিবদ্ধ হলো। রুশান এক ফোঁটার জন্যও চমকাল না বা নিজের জায়গা থেকে এক ইঞ্চি সরুল না। সে পরম ধীরস্থিরে কফির কাপে এক চুমুক দিল, তারপর শার্টের পকেট থেকে হাত বের করে অত্যন্ত নিচু কিন্তু স্পষ্ট গম্ভীর স্বরে ওপরের দিকে তাকিয়ে বলল, "কোণ থেকে বাটিটা নিচে ফেলে আমার পোশাক নষ্ট করার এই প্ল্যানটা খুব একটা স্মার্ট হলো না, মিস সাদু।"
"ও মাগো!"
উপরে বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা রাইসা আর বুশরা একসাথেই নিজেদের কপালে হাত দিয়ে সাদিয়ার দিকে চরম বিস্ময়ে তাকাল। বুশরা চোখ বড় বড় করে আতঙ্কিত গলায় ফিসফিস করে বলল, "সাদু! তুই আজ সত্যি শেষ! লোকটার নজর আর খেয়াল তো পুরো শিকারী ঈগলের মতো রে!"
রাইসা ভয়ে থতমত খেয়ে বলল, "আমরা কিন্তু এই শয়তানির মধ্যে বিন্দুমাত্র নাই!"
কথা দুটি বলেই রাইসা আর বুশরা এক সেকেন্ডও অতিরিক্ত সময় দেরি না করে সাদুকে একা ফেলে রেখে এক দৌড়ে ঘরের ভেতরের দিকে দ্রুত সটকে পড়ল!
সাদু বারান্দায় জুসের বাটি হাতে একাই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার হাতটা বাতাসের মাঝখানে জমাট বেঁধে গেছে। নিচের থেকে রুশান তার এক ভুরু হালকা উঁচিয়ে, ঠোঁটের কোণে এক চিমটি বাঁকা আভিজাত্যের হাসি ঝুলিয়ে নিচ থেকে সাদিয়ার চোখ বরাবর সোজাসুজি চেয়ে রইল।
"কী সমস্যা, মিস?" রুশানের গম্ভীর ও থমথমে কণ্ঠ চিরে যেন রাতের বাতাস ভেদ করে এলো, "আমার পেছনে এভাবে লাগার কোনো বিশেষ কারণ আছে, নাকি এটা আপনার স্বভাবজাত চপলতা আর বাচালতা?"
সাদুর মুখের চিরচেনা চটপটে আর তেজস্বী ভাব নিমেষেই উধাও হয়ে গেল! সে মারাত্মক থতমত খেয়ে বাটিটা বুকের কাছে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আমতা আমতা করে বোকার মতো হাসার এক ব্যর্থ চেষ্টা করল, "হিহিহি... আ-আমি? আপনার পেছনে লাগতে যাব কেন?! ছি ছি! কী যে বলেন না আপনারা!"
রুশান হাত দুটো বুকের ওপর শক্ত করে ক্রস করে দাঁড়িয়ে শীতল চোখে অপলক তাকিয়ে রইল, "তাহলে উপরে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে বাটি বাঁকা করে ওটা কী করা হচ্ছিল?"
সাদু শুকনো ঢোক গিলে চোখ দুটো দ্রুত এদিক-ওদিক ঘুরিয়ে চট করে এক কাল্পনিক গল্প ফাঁদল, "আসলে... আসলে আমার বড় ভাই রিদ মাহির আছে না? ওই সাইবার সিকিউরিটি স্পেশালিস্ট রিদ ভাইয়া! ও আমার সাথে আজ দুপুরে একটু ঝামেলা করেছিল তো! তাই আমি ভাইয়াকে শায়স্তা করার জন্য জুসের বাটি নিয়ে ওপরে ওত পেতে তৈরি ছিলাম। ভাবলাম নিচ দিয়ে হয়তো রিদ ভাইয়া যাচ্ছে... কিন্তু আপনি যে হঠাৎ কোথা থেকে চলে এলেন! আমি তো আপনার ওপর এসব ফেলতে চাইনি, হিহিহি..."
নিজের মারাত্মক বাচালতা আর হাতেনাতে ধরা পড়ে যাওয়ার তীব্র লজ্জা ঢাকতে না পেরে সাদু আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ানোর সাহস পেল না। "আমি আসি!" বলে জুসের বাটিটা শক্ত করে ধরে সোজা উল্টো ঘুরে ঘরের ভেতরের দিকে উল্কার বেগে এক দৌড় মারল!
নিচে বাগানের ছায়ায় শান্ত হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা রুশান সাদিয়ার সেই চটপটে, লাল হয়ে যাওয়া মুখ আর তড়িঘড়ি করে দৌড়ে পালানোর দৃশ্যটা বেশ কিছুক্ষণ গম্ভীর চোখে দেখতে লাগল।
তার চেহারার চিরচেনা কঠোর ও কড়া ভাবটা এক মুহূর্তের জন্য কিছুটা শিথিল হয়ে এলো। শার্টের হাতাটা একটু ওপরে গুটিয়ে নিয়ে সে নিজের মনেই খুব হালকা এক টুকরো মুচকি হাসল—যে হাসি পরিবারের বাইরে খুব কম মানুষের দেখার ভাগ্য হয়।
চোখের সরু চশমাটা নাকের ওপর একটু ধীরেসুস্থে আঙুল দিয়ে ঠেলে দিয়ে রুশান নিচু স্বরে স্বগত বিড়বিড় করে বলল, "Interesting..."
চলবে...