ফন্ট সাইজ:
থিম:
মায়াজালের সমীকরণ

৩য় পর্ব

লেখক: SADIYA AFRIN

#মায়াজালের_সমীকরণ

#সাদিয়া_আফরিন
{কপি করা সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ}
পর্ব-৩
সন্ধ্যা নেমে আসতেই মাহির ভিলার সুবিশাল চত্বর নানারকম রঙিন আলোর ঝলকানিতে চমৎকারভাবে সেজে উঠেছে। বাইরের খোলা উঠোন আর নিচতলার প্রশস্ত ড্রয়িংরুমে আজ দুই পরিবারের জমকালো মেলবন্ধন। মাহির পরিবারের তিন ভাই ও দুই বোনের বিশাল যৌথ পরিবারে আজ আনন্দের যেন কোনো শেষ নেই। চারপাশের উৎসবমুখর পরিবেশ যেন এক রঙিন গল্পের জন্ম দিচ্ছিল।
ড্রয়িংরুমের একদিকে নান্দনিক সোফায় বসে বেশ অমায়িক ভঙ্গিতে হাসিগল্প করছেন পরিবারের তিন ভাই—বড় ভাই ফারুক মাহির, মেজো ভাই রাশেদ মাহির এবং ছোট ভাই ইউনিভার্সিটি প্রফেসর আর্মান মাহির। তাঁদের ঠিক পাশে বসে দুই বোন নুসরাত জাহান ও ফারিহা রহমান ঘরের ভাবিদের সঙ্গে গৃহস্থালি ও সামাজিক নানান গল্পে মেতে উঠেছেন। ঘরের ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা চারপাশে বেশ আনন্দে ছোটাছুটি করছে।
এদিকে তরুণ প্রজন্মের আসল আড্ডা আর হইচই জমছিল দোতলার ঝুলন্ত নান্দনিক বারান্দায়। সেখানে সাদুর বড় ভাই সাইবার সিকিউরিটি স্পেশালিস্ট রিদ মাহির অত্যন্ত শান্ত ও সুশীল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে ঠাণ্ডা জুসের গ্লাসে চুমুক দিচ্ছিল। তার পাশে সাদুর চাচাতো ভাই রায়ান, আফনান, তাহসিন এবং ফুফাতো ভাই রাজ ও রুহান দাঁড়িয়ে নানা গল্পে মেতেছিল। সাথে ছিল বোন আরোহী ও রাইসা। তারা সবাই সাদিয়ার চিরচেনা শয়তানি, চঞ্চলতা আর স্বভাবজাত বাচালতায় দারুণ মজা পাচ্ছিল।
এমন সময় বুশরা সাদিয়াকে ভিড় থেকে একটু দূরে টেনে এনে ফিসফিস করে বলল, "সাদু, বরপক্ষ তো ড্রয়িংরুমে এসে হাজির হয়ে গেছে। কিন্তু বর রাহাত ভাইয়ার সাথে তো তাঁর সেই গম্ভীর বড় ভাই রুশানকে কোথাও দেখছি না!"
সাদু তার কোমর ছুঁয়ে থাকা কুচকুচে কালো ঘন লম্বা চুলগুলো একঝটকায় হাতের আলতো ছোঁয়ায় একপাশে ঠেলে দিল। তারপর আয়নার মতোই আয়ত্তে থাকা মিষ্টি ভ্যাম্পায়ার টিথ দুটি বের করে এক চিলতে দুষ্টু হেসে বলল, "আরে দূর! এত হুলস্থূল আর আনন্দের মধ্যে ওই বরফ-খণ্ড বিয়াই না আসলেই বেঁচে যাই! এসে হয়তো তার সেই কঠিন মুখখানা বানিয়ে সবাইকে ভয় দেখাবে। ওসব বাদ দে, বরঞ্চ চল, ডাইনিং থেকে ঠান্ডা পানির জগটা নিয়ে আসি, মেজো কাকী নিচে জল নিয়ে যেতে বলেছেন।"
সাদু বুশরাকে রেখে ডাইনিংয়ের দিকে চলে গেল ভারী পানির জগের খোঁজে।
ঠিক সেই মুহূর্তে মাহির ভিলার সুবিশাল প্রবেশদ্বারের বাইরে বিকট গর্জন তুলে তিনটি দামি স্পোর্টস বাইক এসে থমকে থামল।
বাইকগুলোর ইঞ্জিন বন্ধ হতেই তিন চালক দ্রুত নেমে পড়ল। তাদের একজন ড্যাশিং সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার রাহাত সরকার, অপরজন তাদের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ইশান হায়দার এবং সবার শেষে হেলমেট খুলে নেমে এলো রুশান সিয়াম সরকার।
ধবধবে ফর্সা ত্বক আর আকর্ষণীয় ও প্রকাণ্ড ড্যাশিং অবয়বের অধিকারী রুশান সরকারকে দেখতে অত্যন্ত প্রভাবশালী মনে হয়। ঘাড় ছুঁয়ে থাকা ট্রেন্ডি উলফ কাট চুল, চোখে সরু ফ্রেমের চশমা আর পরনে নিখুঁতভাবে ইস্ত্রি করা কুচকুচে কালো শার্ট ও ডার্ক ট্রাউজার। তার এক হাতে স্পোর্টস বাইকের হেলমেট আর অন্য হাতে ধরা দামি একটি আইফোন। তার চোখের পাতায় ও চোয়ালের খাঁজে সেই অতি পরিচিত চরম কড়া, অনমনীয় ও শীতল মেজাজের স্পষ্ট ছাপ।
বাড়ির মেইন গেটের সামনে পা রাখতেই রাহাতের ফোনটা তীক্ষ্ণ শব্দে বেজে উঠল। স্ক্রিনের নামটার দিকে তাকিয়ে রাহাত বিরক্ত হয়ে বলল, "ধুর! ক্লায়েন্টের ফোন। তোরা দু’জন ভেতরে ঢুকে যা, আমি বাইকের কাছে দাঁড়িয়ে কথাটা সেরে আসছি।"
"ঠিক আছে, তাড়াতাড়ি ভেতরে আয়," ইশান হালকা হেসে উত্তর দিয়ে ভেতরের দিকে পা বাড়াল।
রুশান কোনো কথা না বলে নিজের ফোনের উজ্জ্বল স্ক্রিনে গভীর নজর রেখে মাহির ভিলার মেইন প্রবেশদ্বার দিয়ে ভেতরের দিকে ধীর পায়ে পা বাড়াল। সে একের পর এক জরুরি বিজনেস মেইল চেক করছিল। নিজের চারপাশে বা দুনিয়ায় কী ঘটছে, সেদিকে যেন তার কোনো খেয়ালই নেই।
"Idiot! এত রাতেও যদি ক্লায়েন্ট কাজ নিয়ে ডিস্টার্ব করে..." রুশান স্বগত বিরক্তি প্রকাশ করে ফিসফিস করে ফোনের পেজ স্ক্রোল করছিল।
ঠিক সেই অস সতর্ক মুহূর্তে সাদিয়া দু'হাতে কাঁচের পূর্ণ জলভরা ভারী জগটি পরম সাবধানে ধরে মেইন হলের দিক থেকে আসছিল। তার চঞ্চল মন তখন টেবিলের ওপর রাখা নানা পদের মিষ্টি আর মজাদার খাবারের চিন্তায় মগ্ন।
ধুম!
হলের ঠিক মোড়টা ঘোরার সময়েই সাদুর সোজাসুজি ধাক্কা লাগল এক শক্ত, পাহাড়ের মতো সুদীর্ঘ অবয়বের সাথে!
"ও মাগো!"
আকস্মিক ধাক্কায় সাদুর হাত থেকে কাঁচের জগের সমস্ত ভারসাম্য নিমেষে হারিয়ে গেল। জগের ভেতরে থাকা অতিরিক্ত বরফ-ঠান্ডা পানির সিংহভাগ ছিটকে গিয়ে রুশানের দামি শার্টের সামনের অংশ, তার হাতের ব্র্যান্ডেড ঘড়ি আর চোখের চশমার কাঁচের ওপর আছড়ে পড়ল। আর বাকি কিছুটা পানি সোজাসুজি সাদুর নিজের সাধারণ সুতির পোশাক, লম্বা কালো চুল আর বুকের ওপর ছিটে পড়ে তাকে এক মুহূর্তের মধ্যে ভিজিয়ে একাকার করে দিল!
কাঁচের ভারী জগটা তাদের দুজনের হাত ফসকে মার্বেলের চকচকে মেঝের ওপর পড়ে মারাত্মক শব্দে চুরমার হয়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল—ঝনঝনঝন!
সেই বিকট ভাঙার শব্দ শুনে ড্রয়িংরুমের সবার জমে ওঠা কথাবার্তা এক মুহূর্তের জন্য সম্পূর্ণ স্তব্ধ হয়ে গেল।
রুশান তীব্র ধাক্কা সামলে দ্রুত দু’পা পিছিয়ে গেল। তার চশমার কাঁচ ও ঘাড়ের পাশ বেয়ে ঠান্ডা পানির ফোঁটা গড়াচ্ছে। তীব্র চরম বিরক্তি আর অনাকাঙ্ক্ষিত রাগে তার টানা টানা চোখ দুটি ছোট হয়ে এলো।
সে চোখ থেকে চশমাটা খুলে হাতের আঙুল দিয়ে কড়া ভঙ্গিতে মুছল। তার শক্ত চোয়াল বেয়ে রাগের স্পষ্ট কড়া রেখা ভেসে উঠল। রুশানের সেই চিরচেনা নীরব কড়া মেজাজ মুহূর্তের মধ্যে যেন এক আগ্নেয়গিরির রূপ ধারণ করল।
"What the hell?!" তার রাশভারী, গম্ভীর গলার তীব্র ধমকের গর্জনে যেন কেঁপে উঠল পুরো হলঘর।
রুশান সাদুর দিকে এক চূড়ান্ত রক্তচক্ষু দৃষ্টিতে তাকিয়ে চরম কড়া ও অপমানজনক গলায় বলে উঠল, "Stupid! চোখে দেখতে পান না আপনি?!"
সাদু ওমন বরফ-ঠান্ডা পানিতে হঠাৎ ভিজে গিয়ে এক মুহূর্তের জন্য বাকরুদ্ধ ও অসার হয়ে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু রুশানের এই চরম অপমানজনক আর কড়া কথাটি কানে যেতেই চঞ্চল অথচ তেজস্বী মেয়েটির ভেতরের আত্মসম্মানের আগুন দাউদাউ করে জ্বলে উঠল। সে নিজের সামনের ভেজা চুলগুলো হাত দিয়ে পেছনে ঠেলে রুশানের সামনে সোজা মাথা তুলে দাঁড়াল।
সাদুও রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে একদম তড়পিয়ে বলে উঠল, "আপনি কাকে স্টুপিড বলছেন, অ্যাঁ?! মোবাইল ফোনের দিকে চোখ রেখে আপনি দেখতে দেখতে হাঁটছিলেন, আমি না! নিজে অন্ধের মতো ফোনের ভেতর মুখ গুঁজে ঢুকে আসছিলেন আর উল্টো দোষ দিচ্ছেন আমাকে?!"
"Shut up, idiot!" রুশান থমথমে গলায় ধমকে উঠল। তার মেজাজের রগ স্পষ্ট ভেসে উঠল রাগে। "You broke my focus and ruined my shirt! হাঁটার সাধারণ ম্যানার্স আপনার জানা নেই? Dumbass!"
"আপনি ডাম্বঅ্যাস! আপনি ইডিয়ট!" সাদু নিজের জায়গা থেকে দু’পা এগিয়ে গিয়ে তর্জনী উঁচিয়ে তীব্র স্বরে চিৎকার করে উঠল। "এত বড় একটা মানুষ, অথচ সামান্য কথা বলার ম্যানার্স নেই! আমাকে এভাবে অহেতুক অপমান করছেন কোন সাহসে, বলবেন?!"
ঠিক এই অত্যন্ত উত্তপ্ত ও ভয়াল মুহূর্তে বাইরে থেকে রাহাত ফোন রাখা শেষ করে হন্তদন্ত হয়ে ভেতরে ঢুকল। তার পেছনে থাকা ইশানও চোখ বড় বড় করে হলের দরজায় স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।
মেঝেতে চুরমার হয়ে ছড়িয়ে থাকা ভাঙা কাঁচের টুকরো, চারিদিকে থলথল করা পানি, আর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা দুই আগ্নেয়গিরির রক্তচক্ষু যুদ্ধ দেখে রাহাত একদম হা হয়ে গেল। বিশেষ করে ভেজা সাদুর দিকে তাকিয়ে তার চোখ কপালে উঠল। সাদুর থ্রি-পিস ভিজে শরীরের সাথে সেঁটে গেছে, আর কোমর ছুঁয়ে থাকা ঘন চুল থেকে পানি টপটপ করে নিচে গড়িয়ে পড়ছে।
রাহাত পরিস্থিতি দেখে আর নিজেকে সামলাতে না পেরে পেট চেপে ধরে ফিক করে হেসে দিল, "আয়হায়! আমার ছোট শালী যে! এই শালী সাহেবা, তুমি এভাবে এত ভিজে একাকার হলে কীভাবে? জামাকাপড় পরেই কি একবারে সোজা বাথরুমে শাওয়ার নিতে ঢুকে পড়েছিলে নাকি?!"
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বন্ধু ইশানও নিজের মুখ চেপে ধরে হেসে উঠল, "হা হা হা! রাহাত, তোর ছোট শালী তো দেখছি একদম কালবৈশাখী ঝড়ের নদী থেকে সাঁতরে মাত্র ডাঙায় উঠল!"
সাদু রাগে চোখ দুটো আরও বড় বড় আর গোল গোল করে রাহাতের দিকে তীব্র দৃষ্টিতে তাকাল, "রাহাত ভাইয়া! তুমি তোমার এই অসভ্য আর বদমেজাজী বন্ধুকে সামলাও! আমাকে অকারণে স্টুপিড বলছে!"
হট্টগোলের শব্দে ততক্ষণে দোতলার সিঁড়ি দিয়ে দ্রুত নেমে এলেন সাদুর বড় ভাই রিদ মাহির, সাথে রায়ান, আফনান আর বড় ফুফু নুসরাত জাহান। পুরো পরিবেশ তখন এক অদ্ভুত নীরব ও থমথমে রূপ ধারণ করেছে।
তবে সবাই হাসাহাসি করলেও রুশান কিন্তু এক ফোঁটাও হাসল না। তার চেহারায় হাসির বিন্দুমাত্র লেশমাত্র নেই।
সে চশমাটা আবার নিজের নাকের ওপর কড়া ভঙ্গিতে সেট করে নিল। তারপর এক পা এগিয়ে সাদুর একদম খুব কাছে এসে দাঁড়াল। অত্যন্ত নিচু, থমথমে অথচ মারাত্মক ক্ষোভ ও দাপট মেশানো গম্ভীর গলায় বলল, "অহেতুক আমার সামনে তর্ক করা বন্ধ করুন, মিস। আমার ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়ার ভুল কিন্তু ভুলেও করবেন না।"
কথাটি অত্যন্ত শীতল ও শক্ত গলায় বলেই রুশান সাদুকে পাশ কাটিয়ে অত্যন্ত কড়া ও দাপুটে পদক্ষেপে সোজা ড্রয়িংরুমের দিকে চলে গেল।
সাদু সেখানেই ভেজা কাপড়ে দাঁড়িয়ে রাগে হাঁসফাঁস করতে করতে মনে মনে প্রচণ্ড ক্ষোভ নিয়ে বিড়বিড় করে উঠল, "খাঁটি এক পিস ক্ষ্যাপা ও অহংকারী রাক্ষস! দাঁড়াও, তোমার এই অতিরিক্ত ভাব আর বরফ জমা অহংকার যদি না গলিয়ে ছুটিয়েছি, তবে আমার নামও সাদিয়া মেহেরী সাদু না!"
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন