#জীবন_পেন্ডুলাম
তাজরীন ফাতিহা
"দেয়ালের দিকে তাকিয়ে সময় নষ্ট করো না। সেখানে একা একা দরজা জন্মাবে না। ওপাশে যেতে চাইলে দরজা বানাতে চেষ্টা করো।"
~কোকো শ্যানেল
"পৃথিবীর সবচেয়ে শক্তিশালী যোদ্ধা হলো ধৈর্য এবং সময়।"
~লিও টলস্টয়
সময় নিয়ে এই দুটি উক্তি রায়হানের ভীষণ পছন্দের। সে যখন বিদেশী নভেল বা বিখ্যাত উক্তি পড়ে তখন বিখ্যাত লাইন বা উক্তিগুলো আন্ডারলাইন করে রাখে। অবশ্যই শিক্ষণীয় নভেল বা উক্তির প্রতি তার ঝোঁক প্রবল। সে নিজেকে ধৈর্যবান আর সময়নিষ্ঠবান ভাবতো এতদিন তবে আজ মনে হচ্ছে সে ভুল।
ধৈর্যশীল আর সময়নিষ্ঠবান হওয়ার জন্য জীবনে অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিকে ফলো করার চেষ্টা করেছে সে। তার মধ্যে নবীজী (সাঃ) সবার উপরে। এখন মনে হচ্ছে তার আদর্শকে সে ঠিকমতো ধারণ করতে পারেনি। নাহলে তার বউ হারিয়ে যায়।
রায়হান এখন ক্লান্ত শ্রান্ত হয়ে চুপচাপ বসে আছে। কত জায়গায় খুঁজেছে কিন্তু কোথাও পায়নি ইফরাকে। যেন মানুষটা হারিয়ে গেছে চোখের পলকে। রায়হানের এখন পাগল পাগল লাগে। দুইদিন ধরে নাওয়া খাওয়া বাদ দিয়ে সারাক্ষণ খুঁজে বেড়িয়েছে সে। তবে ইফরা তো ভালো ইফরার কোনো চিহ্নই কোথাও পায়নি সে।
ইফরার বাবাকে প্রথমে ইনফর্ম না করতে চাইলেও পরে রায়হান জানিয়ে দেয়। ইফরার বাবার মাথায় তো আকাশ ভেঙে পড়ে যেন। তার মেয়েটা কোথায় হারিয়ে গেলো সবাইকে কাঁদিয়ে। ইফরার মা ইয়াসমিন আহমেদ থেকে থেকে কান্না করছেন। ওনারা এখন রায়হানের বাসায়। ইফরার দাদি চোখ, মুখ শক্ত করে রেখেছেন। ইয়াসমিন আহমেদকে কান্না করতে দেখে বলে উঠলেন,
"তোমার ন্যাকা কান্না থামাও তো। জীবনে মাইয়াডার সাথে দুইডা ভালা কথা কইছো? এহন মরা কান্না জুইড়া দিছো কেন? আমার নাতিনের জীবনডা তামা তামা বানাই দিছো তোমরা সবাই। ভালাই করছে ভাগছে। তোমাগো লগে থাকলে আমার নাতিনডা মইরা যাইতো।"
উনি রাগ রাগ কণ্ঠে কথাগুলো বলে থামলেন। শাশুড়ির ধমকে ইয়াসমিন আহমেদ কান্না চাপা দিতে চাইলেন। কিন্তু পারলেন না। কান্নার আওয়াজ শোনা যেতেই লাগলো। সালমা হোসেন বিরক্ত ভঙ্গিতে উঠে রায়হানের রুমে চলে গেলেন। তারা এতক্ষণ রাহমিদ আর রুদের ঘরে বসে ছিলেন।
সালমা হোসেন রায়হানকে চুপচাপ মনমরা হয়ে বসে থাকতে দেখে তার পাশে গিয়ে বসলো। রায়হান চোখ তুলে তাকিয়ে দেখলো ইফরার দাদিকে। সালমা হোসেন দেখলেন রায়হানের চোখের নিচে কালি, চোখ ডেবে গেছে। তার মায়া লাগলো। পরক্ষণেই নাতনির চলে যাওয়ার কথা মনে পড়লে চোখ, মুখ শক্ত করে ফেললো। বললো,
"ওই চ্যাংরা, তোর বউ পালাইলো কেন? তোরে না হাত ধইরা কইছিলাম নাতিনডারে দেইখা রাখিস। এই তোর দেইখা রাখা?"
রায়হান কোনো জবাব দিলো না। দাদি আবারও কথা বলে উঠলেন। বললেন,
"কিরে থোতা বন্ধ কেন? এহন আর মুখ চলে না বুঝি? দেইখা রাখতে না পারলে বিয়া করছিলি কেন? তোরে কঠিন বাটনা বাটমু আমার নাতিনরে খুঁইজা না পাইলে।"
রুদ, রাহমিদ ভাইয়ের পাশে বসে আছে। রুদের চোখে মুখে উদ্বেগ, মন খারাপ থাকলেও রাহমিদের চোখেমুখে তার ছিটেফোঁটাও নেই। সে আরামছে বসে বসে পা দোলাচ্ছে। ইফরার দাদি বিষয়টা খেয়াল করে বললেন,
"ওই ছোট্ট চ্যাংরা, তুই অভদ্রের মতো ঠ্যাং লড়াস কেন? দেহিস না সামনে মুরুব্বী বসা। দেইখা তো মনে হয়না ভাবি হারানোর দুঃখে কোনো কষ্ট পাইছিস। মনের সুখে ঠ্যাং লড়াইয়া যাইতাছিস কহন থেকে।"
এতক্ষণ রাহমিদ ভাইকে ধমক খেতে দেখেও কিছু বলেনি। কিন্তু এখন তাকে সরাসরি ধমক দিয়ে কথা বলাতে তার ইগো হার্ট হয়েছে। সে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে বলে উঠলো,
"ঠ্যাং তো আমার। আমার ঠ্যাং আমি লাড়ামু তাতে আপনার কি? ভাইয়ুকে কথা শুনাচ্ছেন শুনান। সে আপনার নাত জামাই কথা শুনাতেই পারেন। কিন্তু আমি আপনার কোন নাতিনের জামাই যে ধমক মেরে কথা বলছেন। আমি কি আপনার কোনো নাতিনকে ভাগিয়েছি?"
ইফরার দাদি চোখ বড় বড় করে বললেন,
"তোগো কাছে আমি আমার আর কোনো নাতিন থাকলেও দিতাম না। নাক টিপলে দুধ বেড়োয় সেদিনের চ্যাংরা আসছে তেলেছমতি দেখাতে।"
"নাক টিপে দুধ বের করে দেখান। এক্ষুণি দেখাবেন।"
রাহমিদ আয়েশ করে বসে নাক বাড়িয়ে দিলো। সালমা হোসেন বিব্রত ভঙ্গিতে রাহমিদের দিকে বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইলেন।
রুদ ছোট ভাইয়ের কথা শুনে ওর পিঠে মারলো। ইফরার দাদি বড় বড় চোখ করে রাহমিদের দিকে এখনো তাকিয়ে আছেন। বেচারি বোধহয় বুঝে গেছে, বড়টার সাথে পারলেও ছোটটার সাথে পারবেন না তিনি। ভীষণ বজ্জাত আর বুদ্ধিমান ছোট টা। রায়হান ছোট ভাইকে ধমকে উঠলো,
"রাহমিদ, এটা কেমন বেয়াদবি? সে তোমার গুরুজন। এভাবে কথা বলছো কেন? এটা কেমন বিহেভ তোমার?"
রাহমিদ ভাইয়ের ধমকে মাথা নিচু করে বসে রইলো। সালমা হোসেন বললেন,
"থাক থাক। আর ঢং করা লাগবো না। আমার নাতিনরে ভাগাইয়া এহন সাধু সাজোন লাগতো না। সব কটা জাহেল। আমার নাতিনডা আছিলো কেমনে এই সংসারে?"
রায়হান এতক্ষণ পর মুখ খুলে বললো,
"দাদি আমাকে একটু ঘুমোতে দিবেন। আজকে দুইদিন ধরে আমি দু চোখের পাতা এক করতে পারছিনা। এখন প্রচুর ঘুম আসছে। বিশ্বাস করুন আমার জীবনে আমি একটু শান্তিতে ঘুমোতে পারিনি মা, বাবা ইন্তেকালের পর। কোনোদিন পারবো কিনা জানি না। তবে এখন আমার প্রচুর ঘুম আসছে। আমি কি একটু ঘুমোতে পারি? কথা দিচ্ছি ঘুম থেকে উঠে আপনার নাতনিকে আবার খুঁজবো।"
সালমা হোসেনের এই কথাটা শুনে কি হলো জানা নেই। তবে তার চোখের কোন ভিজে গেছে। তার সামনে বসা ছেলেটার অনেক দুঃখ। তার নাতনিও ছেলেটাকে সুখে রাখেনি সেটা তিনি জানেন। ইফরা যে রাগী। রাগ নিয়েই কথা বলতো সারাক্ষণ। নিশ্চয়ই এই ছেলেটার সাথেও রাগী, রূঢ় আচরণ করতো। তিনি আর কোনো কথা না বলে বেড়িয়ে গেলেন রুম থেকে।
ইফরার দাদিকে চলে যেতে দেখে রায়হান চুপচাপ বিছানায় শুয়ে পড়লো। নিমিষের মধ্যে সে ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে গেল।
________
-----
"তুই কি আর ফিরে যাবি না?"
ইফরার বান্ধবী ফিহা কথাটি বলে থামলো। ইফরা মুখ গম্ভীর করে বললো,
"সেটা সময় বলে দিবে। ফিরে গেলে তো দেখতেই পাবি। কেন আমি থাকায় তোর সমস্যা হচ্ছে নাকি?"
ফিহা বালিশে হেলান দিয়ে বললো,
"সমস্যা আমার না আমার পরিবারের। তারা তো ভাবছে তুই কয়েকদিন থেকে চলে যাবি। কিন্তু তুই তো একেবারেই চলে এসেছিস বললি। মা তো বলেই বসেছে, তোর বান্ধবী না বিবাহিত? তাহলে জামাই রেখে তোর কাছে কি? আবার জামাই ছেড়ে চলে এসেছে নাকি? বলা তো যায়না, যে রাগী ও। চলেও আসতে পারে।"
ইফরার কথাটি শুনে খুব খারাপ লাগলো। বিষন্নতায় মন ছেয়ে গেলো। ফিহা ব্যাপারটা লক্ষ করে বললো,
"শোন, জীবনটা নাটক সিনেমা না? তুই বললি আর সব কিছু হয়ে গেলো। আমরা একটা সমাজে বাস করি। এখানে কিছু নিয়ম কানুন আছে। এসব মেনেই আমাদের এই পৃথিবীতে টিকে থাকতে হয়। রাগারাগি প্রত্যেকটা সংসারেই হয়। আমাদের উচিত রাগারাগি হলে মাথা ঠান্ডা করে তার মীমাংসা করা। কারণ রাগ হলো শয়তানের অস্ত্র। জানিস শয়তান সবচেয়ে খুশি হয় কখন?"
ইফরা কথা বললো না। চুপটি করে ফিহার কথা শুনতে লাগলো। ফিহা আবার বলতে লাগলো,
"শয়তান সবচেয়ে খুশি হয় স্বামী স্ত্রীর তালাক হলে। তাই স্বামী স্ত্রীর বেশিক্ষণ রাগারাগি করে থাকা উচিত না। এতে করে শয়তান তার অস্ত্র ব্যবহার করে স্বামী স্ত্রীর ছাড়াছাড়ি করিয়ে ফেলে। স্বামী স্ত্রীর তালাক হয়ে গেলে সে তার অনুসারীদের নিয়ে উল্লাসে মেতে ওঠে। শয়তানের যে অনুসারী স্বামী, স্ত্রীর বিচ্ছেদ ঘটাতে পারে সারাদিনের কুকর্মের ফলাফল দেয়ার সময় ঐ অনুসারীর মাথায় সেরা মুকুট পড়িয়ে দেয় স্বয়ং শয়তান। অর্থাৎ সেরা অপকর্মের মুকুট পায় যে স্বামী স্ত্রীর মধ্যে তালাক করাতে পারে সে। ভাবতে পারছিস কি ভয়ংকর কথা?
ফিহা একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলো,
"তোর স্বামী যদি তোকে ভুল বুঝে তুই পারবি তাকে সঠিকটা বুঝাতে। এতদিন আমার কাছে ছিলিস তুই। কিন্তু সে যদি ভাবে আল্লাহ না করুক তুই কোনো পরপুরুষের সাথে ছিলিস। পারবি তার মনে সত্য উদ্রেক করতে। শয়তান তো এটাই চায়।"
ইফরার মনে ভয় ঢুকে গেলো। সে ভাবতে লাগলো কিভাবে কি করবে। তবে একটা বিষয়ে নিশ্চিত সে। সামনে কি করবে সব তার আগেই ভাবা শেষ। দেখা যাক তার কতটুকু বাস্তবায়ন করতে পারে। শয়তানকে সে কিছুতেই জয়ী হতে দিবে না। এটাই তার নিজের সাথে নিজের অঙ্গীকার।
শীতের আমেজ চারপাশে বিরাজ করছে। আকাশে হালকা রোদ উঁকি মারছে। মেঘের কারণে সূর্য ছেয়ে আছে। মেঘ আর রোদের দারুন লুকোচুরি খেলা চলছে। রায়হান জ্যাকেট গায়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। মনটা তার বিষন্নতায় ঘেরা। আজকে তিনদিন হলো ইফরার কোনো খোঁজ নেই। বিষন্ন মনে রায়হান আকাশের দিকে তাকিয়ে রবের উদ্দেশ্যে নানা কথা বলে চলছে। প্রতিদিন যেই কথাটা রবকে উদ্দেশ্য করে সবচেয়ে বেশি বলে তা হলো,
"আল্লাহ আমাকে স্বস্তি দাও।"
এর মধ্যেই বাসার দরজা কে যেন পিটিয়ে উঠলো। রায়হানের ধ্যান ভঙ্গ হলো যেন। মন খারাপি নিয়েই দরজা খোলার উদ্দেশ্যে হাঁটা শুরু করলো। রাহমিদ এর মধ্যেই দরজা খুলে দিয়েছে।
এই তিনদিন বাড়ির সবচেয়ে আশ্চর্যকর বিষয় ছিল সবাই চিন্তিত থাকলেও রাহমিদ ছিল রিল্যাক্স। খেয়েছে, ঘুমিয়েছে, স্কুলে গিয়েছে আবার খেলাধুলাও করেছে। রুদ প্রায়ই সন্দেহের নজরে তার দিকে তাকিয়েছে। বোনকে তাকাতে দেখলেই খানিক দুঃখী দুঃখী ভাব আনার চেষ্টা করেছে। ইফরার দাদি তো বলেই বসেছেন,
"এই ছোট্টডার মইধ্যে চরম ঘাপলা আছে। ওয় আমার সোনার নাতিনডারে আবার ভাগাইয়া দেয় নাই তো? ওর নজরও কেমন যেন। ছোডো হইলে কি হইবো? নজর তেমন সুবিধার লাগে না। কেমন নষ্ট নষ্ট।"
রাহমিদ তো এই কথা শুনে রেগে বোম হয়ে গিয়েছিল। তৎক্ষণাৎ বলে উঠেছিল,
"আমার নজর নষ্ট মানে? আমি আপনার কোথায় নজর দিয়েছি যে এরকম কথা বললেন। হ্যাঁ, আপনার সোনার নাতিনকে আমিই ভাগিয়েছি। বেশ করেছি। আরও ভাগাবো। আসার পর থেকে খালি খুঁচিয়েই যাচ্ছে। যেন আমি তার কোন বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছি। হুহ!"
রাহমিদের কথা শুনে দাদি থতমত খেয়ে গিয়েছিল। দাদি নষ্ট নজর বলতে খারাপ কিছু মিন করেননি। ইফরা চলে যাওয়ায় রাহমিদকে রিল্যাক্স হয়ে ঘুরতে ফিরতে দেখে বলেছেন ওকে রাগাতে। এই বিচ্ছুর সাথে তার ঝগড়া করতে ভালোই লাগে। একটু বিনোদন পাওয়া যায়। তাই বাচ্চাটাকে খোঁচায় সে। এতে ইফরার কথা সাময়িক ভুলতে পারে।
______
রায়হান ভাবনা থেকে বেরিয়ে এলো রাহমিদের ফিসফিস কণ্ঠে। দরজা খুলে মাথা হালকা বের করে কার সাথে যেন নিচু কণ্ঠে কথা বলছে। রায়হান এগিয়ে গিয়ে রাহমিদকে সরিয়ে দেখলো বোরকা পরিহিত তিনজন দাঁড়িয়ে আছে। রায়হান ভ্যাবাচেকা খেয়ে গেলো। রাহমিদ কাঁচুমাচু করছে। রায়হান স্বাভাবিক হয়ে জানতে চাইলো,
"কাকে চাচ্ছেন?"
বোরকা পরিহিত একজন বলে উঠলেন,
"আপনার বউকে দিতে আসলাম।"
রায়হান চমকে উঠলো যেন। বিদ্যুত খেলে গেলো যেন তার পুরো শরীরে। কথাটার মানে বুঝে উঠতে সময় লাগলো তার। তাই আবারও জিজ্ঞেস করলো,
"কি বললেন?"
বোরকা পরিহিত নারীটি আবারও বলে উঠলেন,
"কিছু বলছি না। দেখে নিন।"
বলেই পিছন থেকে বোরকা পরিহিত একজনকে টেনে রায়হানের দিকে ঠেলে দিলো। রায়হান এখনো বুঝে উঠতে পারছে না কিছু। রাহমিদ পরিবেশ স্বাভাবিক করতে বলে উঠলো,
"আরে ভাইয়ু ওনাদের বসতে দাও। ভাবির আত্মীয় হবেন মনে হয়।"
ভাবি কথাটা রায়হানের কানে ঝিঁঝিঁ করে বাজছে। রাহমিদ ভাইকে ধাক্কা দিলো। ছোট ভাইয়ের ধাক্কায় রায়হান ভাবনা থেকে বেরিয়ে ওনাদের ভিতরে বসতে বললো। তিনজনই ভিতরে ঢুকে গেলো। কারো দিকে না তাকিয়ে রায়হান নিজের রুমে চলে গেলো। রাহমিদ ভাইকে চলে যেতে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। ইফরাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠলো,
"এতোদিন কোথায় ছিলে ভাবি? ভাইয়ু ভীষণ রেগে আছে তোমার উপর।"
ইফরা নড়েচড়ে উঠলো। ঢোক গিলে বলে উঠলো,
"বেশি রেগে আছে নাকি?"
"ভীষণ ভীষণ রেগে আছে। ভাইয়ু এই কয়দিন তোমার বিরহে কাতর হয়ে গিয়েছে। আমাদের সাথেও আগের মতো কথা বলেনি। যদি কোনভাবে জানে আমি আছি তোমার চলে যাওয়ার পিছনে আমাকে সুদ্ধ বাসা থেকে বের করে দিবে। এখন বিরাট ভয়ে আছি।"
কথাটি শেষ হতেই কেউ তার কান টেনে ধরলো। বলে উঠলো,
"আমি বুঝছিলাম এইডা বহুত সেয়ানা। মাগো কিছু কইলেই ছ্যাত কইরা উঠতো। তোর চোরা নজর দেইখাই আন্দাজ করছিলাম কিছুতো একটা গড়বড় করছস। মাগো মা পিচ্চির বুদ্ধি কত?"
কথাগুলো বলেই দাদি হাঁপিয়ে উঠলেন। রাহমিদ কান ছাড়াতে ছাড়াতে বললো,
"শুধু আমার দোষ ধরছেন কেন? আপনার নাতিন আমার মতো পিচ্চির কথা শুনেছে কেন? আমাকে হেনস্থা করতে সারাক্ষণ খালি ওত পেতে থাকেন নাকি?"
দাদির হাত থেকে ছাড়া পেয়েই রাহমিদ ভোঁ দৌড় দিয়ে অন্যপাশে চলে গেলো। রুদ এতক্ষণ বাথরুমে ছিল। বাথরুম থেকে বেরিয়ে সবার এমন চিৎকার চেঁচামেচি দেখে বুঝে উঠতে পারলো না কিছুই। ইফরা এতক্ষণে নিকাব উঠানোর স্কোপ পেলো। নিকাব উঠিয়ে খাটের পাশে রাখলো। এখন তারা সবাই রাহমিদ, রুদের রুমে অবস্থান করছে। দাদি ছিল রায়হানের রুমে নামাজে। সেখান থেকেই আওয়াজ পেয়ে নামাজ শেষ করে দ্রুত উঠে এসেছে।
যেহেতু রুম মাত্র দুইটা তাই ইফরার মা, বাবা যেদিন এসেছিলেন সেদিনই চলে গিয়েছেন। দাদি ইচ্ছে করেই থেকে গিয়েছেন। তার কথা হলো, নাতনিকে না পাওয়া পর্যন্ত সে এক পাও নড়বে না।
রুদ ভাবিকে দেখে দৌঁড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরলো। ইফরাও রুদকে জড়িয়ে ধরলো। দাদি এটা দেখে বলে উঠলেন,
"আমি যে সামনা খাড়াই আছি তুই তো আমারে পাত্তাই দেস না। ও দেবর, ননদ পাইয়া এই বুড়িরে ভুইলা গেছস?"
ইফরা উঠে এসে বললো,
"তোমারে ভুলতে পারি? তুমি ছাড়া আমার আছে কেডা বুড়ি?"
"হইছে হইছে আর ঢং করোন লাগতো না। বোরকা, হিজাব খুল।"
"রুমে গিয়ে খুলবো। দাদি এরা আমার বান্ধবী ফিহা আর ফিহার খালা। ফিহার বাসায় এই তিনদিন ছিলাম।"
এতক্ষণ যে রুমে তারা ছাড়াও আরও দুইজন আছে তা ভুলেই গিয়েছিল সবাই। দাদি দুজনের হাত ধরে বললো,
"তোমগো অনেক অনেক শুকরিয়া। আমার অবুঝ নাতিনডারে ফিরাইয়া দেওনের লাইগ্যা।"
ফিহা হাসিমুখে বললো,
"আরে না দাদি। আমরা কিছুই করিনি। সবই উপরে যে বসে আছেন তার ইশারা। আমরা তো স্রেফ উছিলা মাত্র। আপনার নাতিনকে আপনাদের হেফাজতে রেখে গেলাম। দেখে রাখবেন। আমরা এখন উঠবো।"
ইফরা বললো,
"এখনই উঠবি কেন? কিছু মুখে দিয়ে যা।"
ফিহা দাঁড়িয়ে বললো,
"নারে সময় হবে না। অন্য একদিন আসবো। এখন আসি।"
"এরকম খালি মুখে যাবি? আমার খারাপ লাগছে।"
ইফরার দাদিও বলে উঠলেন,
"কিছু খেয়ে যাও।"
ফিহা বললো,
"না দাদি। সময় নেই। আসি। আল্লাহ হাফেজ।"
অনেক জোরাজোরি করেও ফিহাকে রাখা গেলো না। সবাইকে সালাম দিয়ে বেরিয়ে গেলো তারা। দাদি এবার ইফরার দিকে ফিরে বললো,
"নাত জামাইয়ের সাথে কথা কইছস?"
ইফরা কাঁচুমাচু করতে লাগলো। দাদি দেখেই বুঝে গেলেন। ইফরাকে ঠেলে বললেন,
"যা নাত জামাইয়ের কাছে যা। বেচারা তিনদিন বহুত কষ্ট পাইছে। বউয়ের কষ্টে সব বেডারাই এমন কষ্ট পায়।"
"একটু পরে যাবো দাদি।"
"একটু পরে না। এহনই যাবি। যাহ।"
দাদি ইফরাকে ঠেলে রায়হানের রুমে পাঠিয়ে দিলো। এরপর রাহমিদের দিকে চাইলো। রাহমিদ দেখে বললো,
"আমার কোনো দোষ নাই এখন। যদি কিছু বলছেন তাহলে কিন্তু আপনাকে আর পান এনে খাওয়াবো না।"
দাদি রাহমিদকে কিছু বলতেই নিচ্ছিলেন। এরমধ্যে রাহমিদের কথায় টনক নড়লো মনে হয়। বললেন,
"ওরে বিচ্ছু, তুই দেহি থ্রেটও মারোস?"
রাহমিদ শার্টের কলার উঁচিয়ে একটু ভাব নিলো। দাদি রুদকে বললেন,
"এই বিচ্ছু কি আসলেই তোগো ভাই নাকি টুকাই আনছে?"
রুদ রাহমিদের কালো মুখের দিকে তাকিয়ে ফিক করে হেঁসে দিলো।
_______
------
অনেকক্ষণ ধরেই ইফরা তাদের রুমে দাঁড়িয়ে আছে। রায়হান বারান্দায় দাঁড়ানো। সে কিছুতেই রায়হানের সামনে দাঁড়ানোর সাহস পাচ্ছে না। হঠাৎ করে রায়হানকে ভয় ভয় লাগতে শুরু করেছে। অনেকক্ষণ পর সামান্য কেশে উঠলো সে। রায়হান তারপরও আসলো না। এবার আগের থেকে জোরে কাশি দিলো ইফরা। রায়হান বারান্দা থেকে রুমে আসলো। এসেই কোনোদিকে না তাকিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়লো।
ইফরা কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। তার উপর কি খুব বেশিই রেগে আছে? ইফরা আস্তে আস্তে রায়হানের পায়ের কাছে বসলো। রায়হান উল্টো দিকে ঘুরে শুয়ে আছে। ইফরা চট করে রায়হানের পা ধরলো। রায়হান হুড়মুড় করে উঠে বসলো। ইফরা তাও পা ছাড়লো না। মুখ নিচু করে পা আঁকড়ে ধরেই থাকলো। রায়হান ঝট করে বলে উঠলো,
"আশ্চর্য পা ধরেছেন কেন? পা ছাড়ুন।"
রায়হান ইফরার থেকে তার পা ছাড়িয়ে আনলো। বললো,
"এখানে এসেছেন কেন? আমি তো খারাপ। এই খারাপ মানুষটার সাথে থাকতে সমস্যা হবে না? নাকি দুঃখ পেতে এসেছেন?"
ইফরা একটা চমকপ্রদ কাজ করে ফেললো। লজ্জার মাথা খেয়ে সোজা রায়হানকে জড়িয়ে ধরলো। মুখে তার কোনো কথা নেই। রায়হান এতোটাই চমকালো যে কথা বলতেই ভুলে গেলো। যে ইফরা একদিন বলেছিল তার অনুমতি ছাড়া স্পর্শ না করতে সেই ইফরাই কিনা তাকে জড়িয়ে ধরেছে? ব্যাপারটা হজম হচ্ছে না তার। ইফরা অনেকক্ষণ পর আস্তে করে বলে উঠলো,
"মাফ করে দিয়েন। আপনাকে না জানিয়ে চলে যাওয়ায় অন্যায় করেছি। ক্ষমা চাচ্ছি।"
রায়হানের মন গললো যেন। সেও ইফরাকে বুকে টেনে বললো,
"দোষটা তো আপনার না। দোষী হলাম আমি। আপনাকে অনেক কষ্ট দিয়ে ফেলেছি নিজের অজান্তেই। এই অধমকে কি ক্ষমা করা যায়?"
ইফরা রায়হানের বুকে মিশে গিয়ে বললো,
"যায়। ক্ষমা না করলে শয়তান খুশি হবে। আমি কিছুতেই শয়তানকে খুশি হতে দেবো না। আমাদের মধ্যে এখন থেকে আর কোনো দুরত্ব থাকবে না। স্বামী, স্ত্রীর মাঝে যত দুরত্ব বাড়বে শয়তান তত তাদের ছাড়াছাড়ি করাতে পারবে। আমি আপনার মতো মহৎ মানুষকে কিছুতেই হারাতে চাইনা।"
ইফরা রায়হানকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বললো। রায়হান বুঝে উঠতে পারছে না যে ইফরা সবকিছুতে শয়তানকে কেন টানছে? যাইহোক ইফরা আর তার মাঝে দুরত্ব মিটে গেলে তো ভালোই। আলহামদুলিল্লাহ। রায়হান ইফরার মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বলতে লাগলো,
"আপনি আমার তাহাজ্জুদের সঙ্গী হবেন? হবেন আমার ইহকাল পরকালের সুখ দুঃখের সাথী? হবেন কি আমার চক্ষুশীতলকারিণী?"
ইফরা চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বললো,
"হবো। সাথে রুদ, রাহমিদের যোগ্য ভাবিও হবো। আপনি কিন্তু আমাকে কখনো ছেড়ে যাবেন না। আমি বাদে অন্য নারীর দিকে ভুলেও তাকাবেন না। আপনি আমার মানে একান্তই আমার। আমার একান্ত বলার ছোটবেলা থেকে কেউ ছিল না। আপনি কি আমার একান্ত বলা মানুষটা হবেন?"
রায়হানকে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ফোঁপাতে লাগলো ইফরা। রায়হান ইফরার চোখের পানি মুছিয়ে দিয়ে বললো,
"হবো। আমি রায়হান আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আমার বউয়ের নামে নিজেকে লিখে দিলাম। যাতে বিচারের দিনে আমার বউ আমার চরিত্রের উত্তম সার্টিফিকেট দিতে পারে। এবার ঠিক আছে?"
ইফরা কান্নার মাঝেই মুচকি হেঁসে বললো,
"হান্ড্রেড পার্সেন্ট।"
চলবে.....