ফন্ট সাইজ:
থিম:
জীবন পেন্ডুলাম

২২তম পর্ব

লেখক: তাজরীন ফাতিহা

#জীবন_পেন্ডুলাম

তাজরীন ফাতিহা
চারদিক সুস্বাদু খাবারের ঘ্রাণে মৌ মৌ করছে। ইফরা রান্নাঘরে পোলাও, রোস্ট, গরুর গোশত কষা, ফিরনী রান্না করছে। তার সাথে হেলপিং হ্যান্ড হিসেবে আছে রায়হান, রাহমিদ আর রুদ। রাহমিদ পাতিলে করে পানি এনে দিচ্ছে। বেচারা বয়সে ছোট হওয়ায় পানি আনতে হিমশিম খাচ্ছে। রুদ থালাবাসন এগিয়ে দিচ্ছে, ধুয়ে দিচ্ছে, কোনো কিছু লাগলে এগিয়ে দিচ্ছে। রায়হান রোস্ট আর গরুর গোশত রান্না করেছে। ইফরা শুধু পোলাও আর ফিরনী রাঁধবে।
রায়হানরা নতুন ফ্ল্যাটে উঠেছে গত মাসে। আগের বাসাটা তাদের থাকার জন্য যথেষ্ট ছোট ছিল। মেহমান আসলে তাদেরকে থাকতে দেয়া যেতো না। এছাড়াও রাহমিদ বড় হচ্ছে। দেবর ভাবির মধ্যে যেন দুরত্ব থাকে সেজন্য রায়হান বাসাটা চেঞ্জ করেছে। এখন চার রুমের একটা বাসা নিয়েছে। 
রায়হানের জন্য আরেকটি সুখবর ছিল দুইমাস আগে একটা সরকারি কলেজে লেকচারার হিসেবে জয়েন করেছে। সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত কলেজ আর কোচিংয়ে বিকেল থেকে রাত আটটা পর্যন্ত পড়িয়ে তবেই বেচারা বাসায় ঢুকতে পারে। এই দুই জায়গা থেকে মোটামুটি একটা ভালো অ্যামাউন্ট পায় রায়হান। আলহামদুলিল্লাহ ভালোই দিনকাল চলছে তার। এখন আর অভাব, অনটন তাকে ছুঁতে পারেনা। একটু ভালোমন্দ খাওয়ার জন্য রায়হান ও তার ভাইবোনের আহাজারি, লুকায়িত কান্না এখন সবকিছু ধোঁয়াশা। 
আজকে ইফরার খালামণি তাদের বাসায় আসবে। এই খালা রায়হানের সাথে তার বিয়ের ব্যাপারে সবচেয়ে উৎসাহী ছিল। রায়হানের মতো এরকম ছেলে পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার এরকম নানা কথা বলে ইফরাকে রাজি করিয়েছিল সে। উনি মাদ্রাসার একজন শিক্ষিকা। কথাবার্তায় ভীষণ স্মার্ট তিনি। বয়স হলেও কথাবার্তা এখনো বাচ্চাদের মতো। 
ইফরা গতকাল রায়হানকে বলেছে যেহেতু খালামণি আসছে সেহেতু কয়েকজন এতিমদের দাওয়াত দিয়েন। রায়হান মাথা নেড়ে সায় জানিয়েছে। তারা প্রত্যেক মাসের শেষেই এরকম গরীব, এতিম, অনাথদের ডেকে এনে ভালোমন্দ খাওয়ানোর চেষ্টা করে। এতিমদের প্রতি সদয় হলে আল্লাহ তায়ালা ভীষণ খুশি হন। আল্লাহ যেহেতু তৌফিক দিয়েছেন তাই সাধ্য মতো তাদের জন্য করার চেষ্টা করে। এতে হাতে টান পড়লেও রায়হান কখনো তাদেরকে খাওয়ানোতে পিছপা হয়না। 
রাহমিদ, রুদ প্লেট বের করে ধুয়ে সাজাতে গেছে। এখন রান্নাঘরে শুধু রায়হান আর ইফরা। রায়হানের অবশ্য রান্না শেষ। শুধু ইফরার রান্না বাকি। ইফরা পাতিলে ঘি দিয়ে পিঁয়াজ কুচি, এলাচ, তেজপাতা, লবঙ্গ, কিছুক্ষণ ভেজে পোলাওয়ের চাল দিয়ে কিছুক্ষণ চালটাকে ভেজে আদা বাটা আর রসুন বাটা দিয়ে আবার কিছক্ষণ ভাজলো। এরপর পানি আর লবণ দিয়ে ঢাকনা দিয়ে ঢেকে রেখে দিলো। ইফরা হাত ধোয়ার জন্য ঘুরে দাঁড়াতেই দেখতে পেলো রায়হান মুখ কালো করে দাঁড়িয়ে আছে। ইফরা হাত ধুতে ধুতে জিজ্ঞেস করলো,
"জাইম সাহেবের মুখ কালো কেন?"
"এই অবস্থায় তোমাকে রাঁধতে নিষেধ করেছিলাম। রাতে মাথা ব্যথা হলে আবার বইলো?"
ইফরা কাপড়ে হাত মুছতে মুছতে জবাব দিলো,
"ওমা ব্যথা হলে বলবো না। আপনার ব্যথা হলে আপনি বলেন না বুঝি?"
রায়হান তেড়ে এসে ইফরাকে ধরতে চাইলে ইফরা মুচকি হেঁসে অন্যপাশে সরে গেলো। রায়হান ভ্রু কুঁচকে বললো,
"আমার কথা আমাকেই ফিরিয়ে দিচ্ছো? পাজি মেয়েলোক।"
রায়হানের বলার ভঙ্গিমা দেখে ইফরার হেঁসে গড়াগড়ি খাওয়ার মতো অবস্থা। ইফরা এখন আর গম্ভীর হয়ে থাকে না। রাগও কমে এসেছে। তবে রগচটে ভাবটা এখনো আছে। ইফরা বললো,
"আপনি গোসল করে রেডি হয়ে নিন, যান।"
"না তোমার রান্না শেষ হলে যাবো।"
ইফরা পোলাও নাড়া দিতে দিতে বললো,
"আমার রান্না শেষ হলে তো আমিই গোসলে ঢুকবো। তখন কি সিরিয়াল ধরবো নাকি?"
"সিরিয়াল ধরবো কেন? একসাথে গোসল করবো। স্বামী, স্ত্রী একসাথে গোসল করা সুন্নত।"
ইফরা খুন্তি উঠিয়ে বললো,
"যাবেন নাকি বারি খাবেন?"
"যাচ্ছি তো। ওটা দেখানোর মানে কি? কিছু হলেই রাগ দেখায় খালি। আমি ভয় পাই নাকি?"
"তাই, ভয় পান না?"
রায়হান থতমত খেয়ে গেলো। আমতা আমতা করে বললো,
"মোটেও না। স্ত্রীর কাছে ভয় পাওয়ার কি আছে? ভয় পায় তো কাপুরুষরা, আমি তো বীরপুরুষ।"
রায়হান গেঞ্জির কলার ধরে একটু ভাব নিয়ে বলতে চাইলো। যেইনা চুলে হাত দিয়ে আরেকটু স্টাইল নিতে যাবে অমনি ইফরা বলে উঠলো,
"তা কিছু সুন্নতের নাম বলুন? আপনার তো সুন্নত সম্পর্কে অনেক ধারণা।"
ইফরা পোলাও নামিয়ে ফিরনী নাড়তে নাড়তে কথাটি বলে উঠলো। রায়হান মুখ কাচুমাচু করে বললো,
"বলতেই হবে।"
"ইয়েস।"
"আচ্ছা বলছি। খাবার আগে বিসমিল্লাহ বলা সুন্নত, বসে পানি পান করা সুন্নত, পানির পাত্রে নিশ্বাস না ফেলা সুন্নত, মেসওয়াক করা সুন্নত, চেনা অচেনা সবাইকে সালাম দেয়া সুন্নত, শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য সবাইকে ভালোবাসা সুন্নত, স্বামী স্ত্রী এক পাত্রে পানি পান করা সুন্নত, চার বিয়ে করা সুন্নত।"
শেষ কথাটা রায়হান ইচ্ছে করেই বলেছে ইফরার রিয়েকশন দেখতে। ইফরা খুন্তি নাড়ানো থামিয়ে চোখমুখ শক্ত করে রায়হানের দিকে তাকালো। রায়হান তা দেখে বললো,
"আরে রাগ করছো কেন?"
"হাজার হাজার সুন্নত থাকতে আপনার চার বিয়ের সুন্নত টানতে হবে কেন? কত সুন্নতের গাফিলতি করেন তার বেলায় কিছু না। যেই চার বিয়ের কথা ওঠে অমনি চোখমুখ চিকচিক করে, জিব্বা লকলক করে তাই না?"
ইফরা ভীষণ রাগী কণ্ঠে বললো। রায়হান পড়েছে মহা ফ্যাসাদে। রায়হান বললো,
"আমি কি বলেছি আমি চার বিয়ে করবো। হুদাই রাগারাগি করছো কেন?"
"আমি মনে হয় বুঝি না আপনার মনে কি চলে তাই না? মুখে বলেন না, আর মনে মনে ঠিকই কল্পনা করেন চার বিয়ের। নাহলে চার বিয়ের হাদীস উঠাতেন এতো হাদীস থাকতে।"
রায়হান কপাল চাপড়ে বললো,
"মহা মুসিবত তো। কিছুই বলা যাবে না দেখছি। কিছু হলেই বোম ফাটে মনে হয়।"
ইফরা চুলোর আঁচ কমিয়ে রায়হানের সামনে দাঁড়ালো। চোখ রাঙিয়ে বললো,
"বোম ফাটে মানে? আপনাকে কথা বলতে নিষেধ করেছি? উল্টো পাল্টা কথা বলে আমাকে রাগিয়ে দেন কেন?"
"উল্টো পাল্টা কি বললাম আবার? থাক রাগ করো না। আমি বরং গোসলে যাই।"
রায়হান বুঝেছে বেশিক্ষণ থাকলে তার কপালে দুঃখ আছে। তাই আগেভাগেই কেটে পড়তে চাইছে। ইফরা ভ্রু কুঁচকে বললো,
"কেন আমার সাথে গোসল করবেন না?"
"না। আমার দেরি হবে তাহলে। যোহরের আযান দিচ্ছে। আমি যাচ্ছি।"
কথাটি বলেই রায়হান একরকম দৌঁড়ে পালালো। বেশিক্ষণ থাকলে তার সাথে যেকোনো কিছু হয়ে যেতে পারতো। জীবন বাঁচানো ফরজ। 
______
রুদ আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল মুছছে । মাত্রই গোসল করে বের হলো সে। এরমধ্যেই রাহমিদ বাথরুম থেকে চিল্লিয়ে ডেকে উঠলো,
"আপুনি.. ই... ই।"
"কি হয়েছে? চেঁচাচ্ছো কেন?"
"আরে গামছা দিয়ে যাও।"
"চড়িয়ে তোমায় লাল করে ফেলবো। বড় হচ্ছো নাকি ছোট হচ্ছো দিন দিন? এখনো তোয়ালে নিয়ে ঢুকো না কেন?"
"উফ দাও না আপুনি।"
রুদ তোয়ালে নিয়ে রাহমিদকে দিলো। রুদ ফ্যান ছেড়ে চুল শুকাতে লাগলো। রাহমিদ তোয়ালে পড়ে বের হয়েছে কাঁপতে কাঁপতে। ভালোই শীত পড়েছে ইদানীং। রুদ সোয়েটার জড়িয়ে চুল মেলে বসেছে দ্রুত চুল শুকানোর জন্য। রাহমিদ ফ্যান ছাড়া দেখেই চিল্লিয়ে উঠলো,
"মাগো, কুত্তা মরা শীতে ফ্যান ছেড়েছো কেন? ডিস্কো ড্যান্স দিতে?"
রুদ ভাইয়ের কথা শুনে চোখ রাঙালো। বললো,
"এটা কেমন ভাষা তোমার? কুত্তা মরা কি? এসব কোথা থেকে শিখেছো তুমি?"
রাহমিদ মুখ কালো করে ফেললো। বললো,
"ওই আমার বন্ধুরাই তো মাঝে মাঝে বলে।
"তোমার বন্ধুরা বলবে দেখে তুমিও বলবে? এসব ওয়ার্ড আর যেন ইউজ করতে না দেখি।"
"আচ্ছা রে বাবা। এবার ফ্যান বন্ধ করো।"
"দাড়াও চুলটা একটি শুকাতে দাও।"
"ধুরু। অন্যরুমে যে যাবো তাও পারছি না। ভাবির সামনে প্রেস্টিজ পাঞ্চার হয়ে যাবে নাহলে।"
রুদ মুখ ঘুরিয়ে হাসলো। ভাইটা তার বড় হয়ে যাচ্ছে। সেই ছোট্ট গুলুমুলু বাচ্চা থেকে এখন দশ বছরের বালক। আগের মতোই গুলুমুলু আছে। কথাগুলোও কিউট কিউট। রুদের আদরের ভাই। বড় ভাইয়ের কলিজা। 
রুদ উঠে রাহমিদের জন্য জামাকাপড় নিয়ে আসলো। গেঞ্জি পড়িয়ে দিলো। রাহমিদ প্যান্ট পড়লো। টাখনুর উপরে প্যান্ট গোটালো। রুদ জ্যাকেট পড়িয়ে দিলো। মাথা ভালোভাবে মুছে তোয়ালে মেলে দিলো। বাথরুমে ঢুকে ছোট ভাইয়ের জামাকাপড় ধুয়ে বারান্দায় শুকাতে দিলো। তারপর ছোট ভাইয়ের চুল আঁচড়ে দিলো সাথে নিজেও চুল আঁচড়ালো। 
খুব দ্রুতই হিজাব পড়ে পরিপাটি হয়ে গেলো রুদ। রাহমিদের গায়ে আতর মেখে দিয়ে ওকেও পরিপাটি করে দিলো। একটু পর রায়হান জায়নামাজ হাতে রাহমিদকে ডাকতে লাগলো। রাহমিদ বললো,
"আসছি ভাইয়ু। আপুনি যাই।"
রায়হান ইতোমধ্যেই রুমে ঢুকে দেখে তার ভাই রেডি। সে রুদের কাছে গিয়ে বললো,
"কলিজা আমাদের দুজনকে দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে দিন।"
রুদ দোয়া পড়ে দুই ভাইকে ফুঁ দিয়ে সারা শরীর মুছে দিলো। দুই ভাই বোনের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেলো। রায়হান রাহমিদকে দাঁড়াতে বলে রান্নাঘরে ইফরার কাছে গেলো। মাথা ঝুঁকিয়ে ইফরাকে বললো,
"বিবি সাহেবা নামাজে যাচ্ছি। দোয়া পড়ে ফুঁ দিয়ে শয়তান হটিয়ে দিন তো।"
ইফরা রান্না শেষ করে সবকিছু গুছিয়ে রাখছিল। রায়হানের কথায় তার দিকে ফিরে ফুঁ দিয়ে দিলো। পাঞ্জাবির বোতাম লাগিয়ে দিয়ে চুল ঠিক করে দিলো। বললো,
"সোজা মসজিদে যাবেন। আশেপাশে তাকাবেন না। চক্ষু এদিক ওদিক করলে খবর আছে। আমার জন্য সুন্দর একজোড়া চক্ষু আর বরকত নিয়ে আসবেন। অপেক্ষায় থাকবো।"
রায়হান ইফরার কপালে, গালে চুমু দিয়ে তৎক্ষণাৎ প্রস্থান করলো। ইফরা আহাম্মক বনে গেলো। পরক্ষণেই লজ্জায় গাল দুটো লাল হয়ে উঠলো তার। 
______
----
"জানিস ইফরা, রায়হান আর রাহমিদকে কিন্তু আমি অনেক আগে থেকেই চিনি। তোর বিয়েরও বহু আগে থেকে।"
ইফরার ব্যস্ত হাত চট করে থেমে গেলো। ইফরার খালা কিছু হয়নি এমন ভঙ্গিমায় খাচ্ছে। ইফরা বললো,
"কি বললে খালামণি?"
ইসমাত মাহমুদা মুখের খাবার টুকু গিলে বললেন,
"বললাম, রায়হানকে অনেক ছোট থাকতে আমি দেখেছি। তখন ওর ছোট ভাই আরও পিচ্চি ছিল। এমনকি ওর ছোট ভাইয়ের খামচিও আমি খেয়েছি।"
ইফরা আগ্রহ নিয়ে বললো,
"কিভাবে, কোথায় দেখা হলো?"
"তোদের বাসা থেকে যাচ্ছিলাম আরেকটি জায়গায় একটা কাজে। অতটা খেয়াল নেই কোথায় যাচ্ছিলাম ঠিক। পথিমধ্যে রায়হানকে দেখলাম ছোট ভাইকে শিখাতে শিখাতে যাচ্ছে। বাচ্চাটা লাফাতে লাফাতে ভাইয়ের হাত ধরে যাচ্ছে। হাতে ছিল জায়নামাজ। ব্যাস, আমার এতো চমৎকার লাগলো দৃশ্যটা। আমার পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় বাচ্চাটার ধাক্কা লাগলো। অমনি কি বললো জানিস?"
"কি বললো?"
"চোকে দেকো না? দাক্কা দিলে কেনু?"
কথাটি বলেই ইসমাত মাহমুদা হাসতে লাগলেন সাথে ইফরাও হেঁসে চলেছে। ইসমাত মাহমুদা আবারও বললেন,
"এতো মাশা আল্লাহ বাচ্চাটা। কি যে কিউট কথাবার্তা! চাচ্ছিলাম গাল টিপে দিতে। সামান্য ধাক্কা লাগায় যেভাবে রেগে গেলো অপরিচিত একজন গাল টিপে দিলে ওখানে কামড়ে টামরে একাকার করে দিতো আমাকে। কি যেন একটা বলেছিলাম অমনি হাতে খামচে দিলো! তোর জামাই তখন আমার কাছে মাফ টাফ চাইলো আরকি। জানিস অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিলাম ওদের দিকে। আল্লাহর কাছে ছেলেটাকে তোর জন্য খুব করে চেয়েছিলাম সেদিন। আল্লাহ কবুল করেছেন। চাওয়ার মতো চাইলে আল্লাহ ফিরান না কখনোই।"
ইফরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো খালার কথা শুনে চলেছে এতক্ষণ। সে মনে মনে বহুবার আলহামদুলিল্লাহ পড়লো। ইসমাত মাহমুদা আবার বললেন, 
"তুই খাবি কখন? আমি একাই তো খাচ্ছি। তুইও বসে পড়।"
"উহু আমি তোমাদের জামাইয়ের সাথে খাবো। উনি আমাদের খাইয়ে না দিলে আমাদের কারো পেটের ভাত হজম হয়না। আমি তো নিজ হাতে খেতেই ভুলে গেছি।"
ইসমাত মাহমুদার কথাটি শুনে ভীষণ ভালো লাগলো। যাক আল্লাহ মেয়েটাকে একটা সুন্দর সংসার দিয়েছেন। ছোট থেকে মেয়েটা ভীষণ একলা। এখন তার সুখের সময়। খুশি আড়াল করে মেকি রাগ দেখিয়ে বললেন,
"সেকিরে, ছেলেটাকে জ্বালিয়ে খাচ্ছিস তোরা। বেচারা তোদের জন্য দম ফালানোর সুযোগও পায়না নাকি?"
"আরে পায় পায়। খালু আর এতিম বাচ্চাগুলোকে খাওয়ানোর পরই আমি আর আমার দেবর, ননদ ধরবো তোমার বেচারাকে। আমাদের না খাইয়ে কোথায় যাবে সে।"
কথাটি বলার সময় ইফরার চোখে মুখে খুশি চিকচিক করছিল। ঠোঁটে প্রফুল্লময় হাসি। ইসমাত মাহমুদার দারুন লাগলো মুহূর্তটা
শীতের আমেজ চারপাশে ভালোই বিরাজ করছে। প্রকৃতিতে কেমন শীত শীত গন্ধ লেগে আছে। যখন যে ঋতু শুরু হয় তখন সে ঋতুর ঘ্রাণ নাসারন্ধ্রে বারি খায় যেন। গ্রীষ্মকালে ঘেমে জবজবে অবস্থা, বর্ষাকালে বৃষ্টির রিনিঝিনি শব্দ, শরৎকালে কাশফুল ও মেঘের পেঁজা তুলোর মতো উড়াউড়ি, হেমন্তে ধান উঠানোর ধুম, শীতকালে হাড় কাঁপানো শীত। সর্বশেষে বসন্তে পাখপাখালির কলরব, নতুন পাতা গজানোর আমেজ। প্রত্যেকটি ঋতুই যেন আল্লাহ প্রদত্ত এক অপূর্ব সমাহারের সৃষ্টি। সুবহানাল্লাহ!
ইফরা আজকে ফজর পড়ে আর ঘুমায়নি। ফজরের নামাজ পড়ে নাস্তা খেয়ে সাধারণত একটু ঘুমায় সে। তবে আজকে ঘুমাচ্ছে না। ভার্সিটির শেষ বর্ষে এবার সে। পড়াশোনা রায়হান শেষ করতে বলেছে। ইফরা রাজি ছিল না পড়াশোনা করায় কিন্তু রায়হান বলেছে শুধু পরীক্ষা দিতে। তবুও যেন পড়ালেখাটা শেষ করে। ইফরা আর না করেনি। দেখতে দেখতে তার দাম্পত্য জীবনের প্রায় তিন বছর। আল্লাহ তাকে খুব উত্তম এক নিয়ামত দিয়েছেন। যে নিয়ামতের নাম রায়হান জাইম। 
গতকাল রাতে হঠাৎ করেই রায়হান ইফরাকে বলছিল,
"এই পৃথিবীতে আমি সবচেয়ে ঋণী কার কাছে জানো?"
ইফরা সরল মনে উত্তর দিয়েছিল,
"আপনার মা, বাবার কাছে।"
রায়হান মুচকি হেঁসে বলেছিল,
"উহু, মা বাবার ঋণ তো কখনোই শোধ করা যাবে না। তাদের নিজ সন্তান আমি। আমার চামড়া কেটেও তাদের ঋণ পরিশোধ করা সম্ভব নয়। ওনাদের অস্তিত্ব আমি। কিন্তু আমার আপন না এমন দুইজন মানুষের কাছে আমি চিরঋণী। তুমি তাদের দেখতে চাও?"
ইফরার খুব আগ্রহ জাগলো। সে বিনাবাক্যে রাজি হয়ে গেলো। রায়হান সকাল সকাল রেডি হয়ে থাকতে বলেছিল তখন। রুদ, রাহমিদকেও রেডি হয়ে থাকার জন্য বলে এসেছিল। 
রাতের কথা ভাবতে ভাবতে ইফরা রেডি হয়ে গেলো। রুদও এরমধ্যে তৈরি হয়ে ভাবির কাছে চলে এসেছে। ইফরা রুদকে দেখে বললো,
"রাহমিদ রেডি হয়েছে?"
"জ্বী ভাবি।"
"ভাইয়ু কোথায় ভাবি?"
"তোমার ভাইয়ু কোথায় যেন গেলো। বলেছে তৈরি হয়ে থাকতে। আমাদের এসে নিয়ে যাবে।"
"আচ্ছা।"
______
----
"আপনারে না কইলাম ওষুধটা লইয়া ঘরে আসতে। একটা কতাও হুনেন না কেন?"
জয়নয় বেগম আফজাল হোসেনকে শাসিয়ে কথাটা বললেন। আফজাল হোসেন কাশতে কাশতে ঘরে ঢুকে স্ত্রীর পাশে বসলেন। বললেন,
"হাতে টাকা নাই অহন। টাকা হইলে কিনোন যাইবো।"
"কতদিন ধইরা আপনের কাশি অথচ একখান ওষুধ কিন্না খাওয়ার টেকা আপনের কহনই থাহে না।"
"আরে কইতরী চেইতা যাইয়ো না তো। তোমার এমনিতেই হাঁপানির সমস্যা। বুড়া হইতেছি তো দুইজনই। এহন আর আগের মতো বল পাইনা শরীরে। আস্তে আস্তে রত বল সব চইলা যাইতেছে।"
জয়নব বেগম নিজেদের ছিড়া কাঁথাটা সেলাই করতে করতে দীর্ঘনিশ্বাস ফেললেন। আগামী দিন কিভাবে কাটবে মাবুদ ছাড়া কেউ জানে না। আফজাল হোসেনের শরীরে রোগ বাসা বেঁধে আছে। কবিরাজি চিকিৎসা করিয়ে ওষুধ খেয়েছে। এমনিতে ডাক্তার দেখিয়ে ওষুধ খাওয়ার সামর্থ্য তার নেই। মেলা দাম ওষুধের। এখন হোটেলে কেনা বেচাও অতো হয়না। কত নতুন নতুন হোটেল হয়েছে। আফজাল হোসেনের সেই পুরোনো ভাতের হোটেলের কদরও কমেছে। 
আফজাল হোসেনের দিকে তাকালে জয়নব বেগমের ভারী মায়া হয়। বেচারা জীবনে বহুত ভালো কাজ করেছে কিন্তু কারো কাছে কোনো মূল্য পায়নি। সারাজীবন বিনে পয়সায় মানুষের সেবাই করে গেছে কিন্তু নিজের সেবার দরকার হলে কাউকে পাননি। যাক আল্লাহ যেমনই রেখেছেন তাদের কোনো অভিযোগ নেই ওই মহান রবের প্রতি। কথাগুলো মনে মনে বলে জয়নব বেগম কাঁথা সেলাইয়ে মনোনিবেশ করলেন। 
আফজাল হোসেন স্ত্রীকে চুপ মেরে যেতে দেখে বিছনায় শুয়ে পড়লেন। গলায় মাফলার পেঁচিয়ে খাটের এক কোণে শুয়ে রইলেন। ইদানীং শরীরটা বেশিই খারাপ লাগছে। জয়নব বেগমকে ভয়ে বলেন না। তাহলে চিৎকার চেঁচামেচি করে হাঁপানি উঠিয়ে ফেলবে। তাদের দুই বুড়া বুড়িরই হাঁপানির সমস্যা। কোনদিন যেন দুনিয়ার মায়া ত্যাগ করে আল্লাহর ডাকে চলে যেতে হয়। জয়নব বেগমের জন্য তার ভীষণ চিন্তা হয়। সে না থাকলে তার স্ত্রীর কি হবে? এসব চিন্তা ইদানীং মাথায় জোঁকের মতো জেঁকে বসে থাকে। 
দরজায় ঠকঠক আওয়াজ আসছে। এইমাত্র বিছানায় পিঠ ঠেকালেন এখনই আবার কার আসতে হলো? আফজাল হোসেন জোরে বলে উঠলেন,
"কে?"
"চাচা আমি দিলদার। দরজাডা একটু খুলেন?"
"তোর এইসময় কি কাজ?"
বলেই আফজাল হোসেন কেশে উঠলেন। দিলদার কোনো কথা না বলে আবারও দরজা ধাক্কালো। জয়নব বেগম বললেন,
"উইঠা দেহেন। জরুরী কিছুও তো হইতে পারে।"
"হ কিছুর দরকার হইলে এই আফজাল হোসেনরে দরকার। এমনিতে খোঁজও পাওন যায়না।"
আফজাল হোসেন কাশতে কাশতে উঠে দরজা খুললেন। খুলেই বলতে নিলেন,
"তোর আসার আর সময় ছিল না?"
বাকি কথা শেষ করতে পারলেন না দরজার সামনে অপরিচিত কয়েকজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে হতভম্ব হলেন। এরা কারা? 
রায়হান মুচকি হেঁসে বলে উঠলো,
"আসসালামু আলাইকুম আংকেল। কেমন আছেন?"
আফজাল হোসেন এখনো ঠাহর করতে পারছেন না কিছু। রায়হান আফজাল হোসেনকে তব্দা খেয়ে দাড়িয়ে থাকতে দেখে আবারও বলে উঠলো,
"আংকেল চিনতে পারেন নি? আমি রায়হান।"
আফজাল হোসেন অস্ফুট স্বরে বললেন,
"রায়হান!"
"আংকেল আপনার শরীর এমন ভেঙে গিয়েছে কেন? খাওয়াদাওয়া করেন না?"
আফজাল হোসেনের হুঁশ ফিরলো যেন। চেহারায় কেমন অবিশ্বাস্য ভাব। রুস্তম পিছন থেকে বলে উঠলো,
"চাচা কি অহনো চিনবার পারেন নাই?"
"না পেরেছি। তবে সেই রায়হানের সাথে এই রায়হানের চেহারার ভীষণ তফাৎ। ভিতরে আসো বাবা।"
রায়হান হেঁসে বললো,
"রুদ, রাহমিদকে মনে আছে আংকেল?"
আফজাল হোসেন হেঁসে বললেন,
"মনে থাকবে না কেন? খুব মনে আছে। তোমার ছোট ভাইয়ের খামচির কথা কি ভুলা যায়। সব ভুললেও সেটা ভুলা সম্ভব না। ওরা কত ছোট ছিল। ওদের দেখলে এখন আর চিনবো না।"
ভাইয়ের পাশ থেকে বারো বছর বয়সী রাহমিদ বলে উঠলো,
"তাহলে চিনানোর জন্য কি আবার খামচি দিতে হবে?"
রুস্তম আর দিলদার হেঁসে উঠলো। আফজাল হোসেন বারো বছরের রাহমিদের দিকে মায়াভরা নজরে তাকালেন। সেই ছোট্ট রাহমিদ কি এইটা? গুলুমুলু গালের এই বালকটাই কি সেই এক বছর বয়সী গুলুমুলু বাচ্চাটা? কতকিছু ভেবে চলেছেন তিনি। রায়হান বললো,
"আংকেল কি ভাবছেন? সেই এক বছর বয়সী বাচ্চাটাই কিন্তু ইনি।"
আফজাল হোসেনের চোখ ছলছল করলো যেন। আগের রায়হান, রুদ, রাহমিদের সাথে বিস্তর ফারাক বর্তমানে দাঁড়িয়ে থাকা তিনজনের। উনি স্বাভাবিক হয়ে রায়হানদের ঘরে ঢোকালো। জয়নব বেগম সেলাইরত অবস্থায় দরজার দিকে তাকিয়ে ছিলেন এতক্ষণ। স্বামীকে অনেকক্ষণ কথা বলতে দেখে ভাবছিলেন, "কে এলো এই অসময়ে?" অপরিচিত কতগুলো মুখকে ঘরে ঢুকতে দেখে মাথায় শাড়ির আঁচল ভালোভাবে টেনে দিলেন। ছিঁড়ে কাঁথাটা লুকিয়ে রাখলেন ভালো কাঁথার ভাঁজে। আফজাল হোসেন বললেন,
"চিনতে পারো কিনা দেহো তো?"
জয়নব বেগম কিছুই বুঝতে পারলেন না। তিনি কিভাবে চিনতে পারবে এদের? এদের কি চিনার কথা তার? এসব ভাবছেন তিনি। রায়হান মুখ খুললো,
"আসসালামু আলাইকুম আন্টি। কেমন আছেন?"
"আন্টি" ডাকটা এর আগেও শুনেছেন তিনি। কিন্তু ওই মুখ আর এই মুখের মধ্যে বিস্তর ফারাক। চেহারা, পোশাকে আভিজাত্যে ভরপুর। রায়হান জয়নব বেগম আর আফজাল হোসেনকে পাশাপাশি বসিয়ে নিজে নিচে বসলো। দুইজনের প্রৌঢ় হাতের ভাঁজে হাত গলিয়ে দুইজনের দিকে তাকালো। অনেক মায়াময় দৃষ্টি ফেলে ধীরে ধীরে বলতে লাগলো,
"যখন আমাদের জন্য দুনিয়ার স্বার্থপর মানুষগুলো মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল ঠিক তখনই মহান রবের অনুগ্রহে দুইজন ফেরেশতারূপী মানুষের আগমন ঘটে আমাদের জীবনে। স্বার্থপর এই দুনিয়ায় আপন মানুষেরাই যখন দু মুঠো অন্ন দিতে কার্পণ্য করেছে তখন তারা একজন নয় দুজন নয় তিন তিনটি মুখের অন্নের ব্যবস্থা করেছিলেন। এইযে আমি রায়হান আজকে এখানে পৌঁছেছি তার পিছনে এই দুইজন মনুষের অনেক অবদান।"
কথাটুকু বলে রায়হানের গলা আটকে গেলো। আগের কিছু স্মৃতি তীব্রভাবে বারি খাচ্ছে মাথায়। থেমে থেমে আবারও বলতে লাগলো,
"যখন আমি তিনটি মুখের খাবারের যোগানই দিতে পারছিলাম না ঠিক তখন আফজাল হোসেন নামক এই মানুষটা আমাকে পড়াশোনা ছাড়তে বাধা দিলো। পড়াশোনা জানা থাকলে একটা না একটা কিছু করে এই পৃথিবীতে টিকতে পারবো অন্যথায় সারাজীবন পস্তাতে হবে এরকম নানা উপদেশ এই মানুষটা দিয়েছিল। আমার এখনো মনে আছে যেদিন ভর্তি পরীক্ষা দিতে যাই সেদিন রাহমিদকে ছেড়ে কিছুতেই যেতে পারছিলাম না। আমার এক বছর বয়সী দুধের ভাই আমাকে ছাড়া কিচ্ছু বুঝে না। ও আমাকে ছাড়তেই চাচ্ছিলো না। এদিকে আমার পরীক্ষার সময় পার হয়ে যাচ্ছে। তখন এই মানুষটা রাহমিদকে কোলে নিয়ে ওর খামচি খেয়ে হাত থেকে রক্ত বের হলেও পর্বতের মতো অটল ছিল শুধুমাত্র আমি পরীক্ষা যেন ভালোভাবে দিয়ে আসতে পারি সেজন্য।"
রায়হানের চোখ থেকে পানি টপ টপ করে ঝরছে। মাথা নিচু করে আবারও ভাঙা গলায় বলতে লাগলো,
"যেদিন ভর্তিপরীক্ষার রেজাল্ট দিলো সেদিন এই মানুষটার চোখে আমি সত্যিকারের খুশি দেখতে পেয়েছিলাম। আমার কাঁপা শরীর ধরে এই মানুষটা আমাকে ভরসা দিয়েছিল।"
রায়হান কিছুক্ষণ থেমে জয়নব বেগমের দিকে তাকিয়ে বলতে লাগলো,
"এই মানুষটা সম্পর্কে কি বলবো? যখন টিউশনি করাতাম রুদকে তার কাছে রেখে যেতাম। এই মানুষটা নিঃস্বার্থভাবে রুদকে আগলে রাখতো। ঘরে খাওয়ার কিছু না থাকলে নিজে খাবার দিয়ে আসতো। প্রতিবেশীদের খোঁচা মারা কথার জবাব দিতো। কখনো এই দুই চোখে বিরক্তি দেখিনি। তখন ভাবতাম আল্লাহর দুনিয়ায় এখনো এতো ভালো মানুষ আছে? যাদের আমাদের থেকে পাওয়ার কিছু ছিল না, বিনিময় ছিল না তবুও দিল খুলে এই দুটো মানুষ আমাদের জন্য করেছেন। আপনাদের দুজনের চোখে এতো অবিশ্বাস কেন আন্টি, আংকেল? কেন আপনাদের চোখ দুটো বলছে আপনাদের ভুলে গেছি? আপনাদের কি কখনো ভুলতে পারি আমি?"
কথাগুলো বলে রায়হান আরও ভেঙে পড়লো। ষোড়শী রুদ, বারো বছরের রাহমিদও কাদঁছে। তাদের অতীত মোটেও সুখকর ছিল না। ভাইয়ের মুখে কথাগুলো শুনে স্থির থাকতে পারেনি তারা। ইফরা, দিলদার, রুস্তম ওদেরও চোখে পানি জমেছে। 
আফজাল হোসেন আর জয়নব বেগমের চোখ থেকেও পানি পড়ছে। রায়হান ওনাদের হাত ধরে আবারও বলে উঠলো,
"আপনাদের এই এগারো বছরে অসংখ্যবার মনে পড়েছে কিন্তু আপনাদের সামনে আসতে পারিনি অপরাধবোধে। আপনার মেয়ে আমাদের জন্য শশুরবাড়ি যেতে পারছিল না কথাটা আমাকে আজও ভীষণ পীড়া দেয়। এগারো বছরে কোনো নামাজ নেই যে আপনাদের জন্য দোয়া করিনি। এই অধমের মাথায় কি একটু হাত বুলিয়ে দিবেন আংকেল, আন্টি?"
রায়হান মাথা বাড়িয়ে বললো। আফজাল হোসেন এবং জয়নব বেগম ইতস্তত করতে করতে হাত বুলিয়ে দিলেন। রুদ, রাহমিদও ভাইয়ের দেখাদেখি মাথা বাড়িয়ে দিলো। তারা ওদের মাথায়ও হাত বুলালেন। রায়হান আফজাল হোসেনের দিকে তাকিয়ে বললো,
"একটা আবদার করবো, রাখবেন?"
"বলো।"
"আমাদের সাথে যাবেন। আপনার এই ছেলের কাছে থাকতে আপনাদের সমস্যা আছে?"
"তা হয়না বাবা। তোমাদের দেখেছি এতেই শান্তি। নিজের ভিটে মাটি ছেড়ে কোথাও যাবো না। এখানেই শেষ নিঃশ্বাসটা ফেলতে চাই। তুমি আমায় এই অনুরোধ করো না বাবা।"
আফজাল হোসেন আকুল কণ্ঠে বললেন। রায়হান আর কিছু বলতে পারলো না। রায়হান একটা নিঃশ্বাস ফেলে বললো,
"ঠিক আছে। আপনার ইচ্ছে। তবে আপনাদের সাথে প্রতি সপ্তাহে সপ্তাহে নাহয় মাসে মাসে দেখা করার অনুমতি দিতে হবে।"
"আচ্ছা দিলাম।"
রায়হান খুশি হলো। বললো,
"আপনার মেয়ে কেমন আছে আংকেল?"
"আলহামদুলিল্লাহ ভালোই বাবা। ওর শাশুড়ি তো প্যারালাইজড হয়ে আছে গত পাঁচ বছর হয়। এখন নাকি খালি কাঁদে। তোমাদের কথা অনেকবার বলেছিল। তোমাদের কাছে নাকি মাফ চাইবে। আল্লাহ এতিমদের সাথে খারাপ ব্যবহারের শাস্তি তাকে এই দুনিয়াতেই দেখিয়ে দিয়েছে। আমাদের ক্ষমা করো বাবা। কিছু করার ছিল না তখন। তোমরা মনে অনেক কষ্ট নিয়ে এই বাসা ছেড়েছিলে ভাবলে এখনো আমার খারাপ লাগে।"
আফজাল হোসেন হাত জোর করে মাফ চাইলেন। রায়হান তৎক্ষণাৎ হাত ধরে নিলো। বললো,
"আপনার কোনো দোষ নেই আংকেল। সবই আমাদের ভাগ্যে ছিল। আমি ওসব মনে রাখিনি। আপনাদের বৌমাকে দেখছেন?"
"কোথায়?"
জয়নব বেগম তাড়াহুড়ো করে বললেন। রায়হান ইফরাকে দেখিয়ে দিলো। জয়নব বেগম দেখলেন বোরকা পরিহিত নিকাবে মুখ ঢাকা একজন অদূরে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি কাছে ডাকলেন। ইফরা গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গেলো। রায়হানের পাশে বসলো। জয়নব বেগম ইফরাকে উঠিয়ে তার পাশে বসালেন। বললেন,
"মাশাআল্লাহ। আল্লাহ তোমাগো সংসারে বরকত দিক। তুমি কি সন্তান সম্ভবা?"
ইফরা উপর নিচ মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানালো। জয়নব বেগম মাথায় হাত দিয়ে অনেক দোয়া করে দিলেন। বললেন,
"এই অধম মানুষ গুলারে সময় কইরা দেইখা যাইয়ো। এই বুড়ির কাছে কয়দিন থাইকা যাও তোমরা।"
রায়হান বললো,
"আমার বন্ধ নেই আন্টি। আপনাদের দুজনকে কয়েকদিন আমাদের সাথে থাকতে হবে। তাই আজকে এসেছি আপনাদের নিতে। এটা মানা করবেন না। তাহলে ভীষণ কষ্ট পাবো।"
আফজাল হোসেন মানা করতেই যাচ্ছিলেন কিন্তু জয়নব বেগম বাধা দিলেন। বললেন,
"আইচ্ছা যামু।"
সবাই খুশি হয়ে গেলো। দিলদার রায়হান যে জিনিসপত্র এনেছে সব মাটিতে নামিয়ে রেখেছে। কয়েকপদের ফলমূল, বিস্কুট, কয়েকদিনের বাজার সব কিছু করে এনেছে রায়হান। সবকিছু নামিয়ে দিলদার চলে যেতে নিলে রায়হান থামলো তাকে। বাইরে নিয়ে এসে কোলাকোলি করলো। রসিকতার স্বরে বললো,
"দিলদার ভাই, আমি কিন্তু এখন বাজার সদাই ভালোই করতে পারি।"
দিলদার লজ্জা পেলো। রুস্তম পিছন থেকে এসে দিলদারের মাথায় টোকা দিয়ে বললো,
"কিরে দিল। আমারে ভুইলা গেছস নাকি।"
দিলদার মুখ গোমড়া করে বললো,
"ভাই আমি বিবাহিত। বউয়ের সামনে প্রেস্টিজ নষ্ট কইরেন না। যেখানে সেখানে টুকা দিয়েন না। পাশের ঘরে বউ আছে।"
রায়হান, রুস্তম একসাথে হেঁসে দিলো। 
চলবে...

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২২তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন